004634
Total Users : 4634
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

অনিকেত শামীমের কবিতা : নিকানো উঠোনে পড়ে থাকা স্মৃতিময় পংক্তিমালার দেহাবশেষ

সবকিছু থমকে আছে বৃত্তাবদ্ধ জীবন
উজান টানে সময়ের নৌকো
টালমাটাল
কিছুতেই অতিক্রম করতে পারি না পরস্পরকে…
অতিক্রম জরুরি
ভয়ের ট্যাবু আমাদের পায়ে শিকল পরায়
আর আমরা অতিনিয়ন্ত্রণবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠি
পুঁজির প্রবল স্রোতে ভেসে যায় স্বকীয়তা
ঘামের সোঁদাগন্ধ, ভাটিয়ালি সুর
রাঙা বউয়ের বিনম্র চাহনি কি অনুবাদযোগ্য?
এইখানে এসে থমকে দাঁড়ায় তৃতীয় বিশ্ব
পাশ্চাত্য-তাত্তি¡কদের ফুটনোট লেখা ছাড়া
কোনো কাজ নেই আমাদের
/লক্ষণরেখা

 

কবিতায় সময় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, বিশেষ করে বাংলা কবিতায়। যাপন প্রক্রিয়ায় মানুষের প্রতিদিনের প্রাত্যহিকতা কবিকে কোনো না কোনোভাবে আলোড়িত, বিলোড়িত, বিমোহিত করে সন্দেহ নেই। একটি ভালো কবিতার সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা নেই, তেমনি একটি কবিতা কেনো কবিতা, কেনো ভালো লাগলো তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ গাণিতিক সূত্র প্রয়োগ করে নির্ধারণ করা প্রায় অসাধ্য। আমি কেনো একটি কবিতা পড়বো, অন্যভাবে বললে একটি কবিতা আমাকে পড়তে কেনো বাধ্য করা হলো অথবা আমি পড়তে কেনো বাধ্য হলাম তা একমাত্র একটি ভালো কবিতাই নির্ধারণ করে দেয়/ দিতে পারে। একটি কবিতার জন্য কবিতাপ্রেমি পাঠকের হাহাকার সবসময়ের, সর্বকালের। তাহলে এই যে হাজার কবি হাজার হাজার পঙ্ক্তি রচনা করছেন তার কি কোনো মূল্য নেই; শুধুমাত্র একক পাঠের বিবেচনায়ই কবিতার মানদন্ড নির্ধারিত হবে?- আমি তা মনে করি না। কবিতার নানা ধরনের পাঠ হতে পারে, হয়ও। রচিত পঙ্্ক্তিমালার হাজার পাঠ-বিবেচনা, উৎকৃষ্টতা-নিকৃষ্টতা যেখানে গৌণ। সময়ের বিবর্ধনের সাথে প্রাত্যহিকতার যেমন পরিবর্তন হয়, তেমনি কবিতার বিষয়বস্তুও যাপিত জীবনের সাথে নানা ঘাত-প্রতিঘাত, দৈশিক আঞ্চলিক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট দ্বারা প্রবলভাবে আলোড়িত হয়। ফলে কবিতায় যুক্ত হয় নতুন মাত্রা, অভিজ্ঞান, ইতিহাস, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। চর্যাপদীয় বাংলা কবিতা আধুনিক সময়ে যুক্ত হবার পর ইউরোপীয় ছোঁয়ায় তার খোল নালচে পাল্টে যাবার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও যেনো নতুনরূপে যুক্ত করে নেয়। বিষয়বৈচিত্র্য যেমন প্রত্যাশিত তেমনি চরিত্র-রূপ-গন্ধ তার চারিত্র্যমহিমা আমাদের মুগ্ধ না করুক নিশ্চিতভাবে ভাবায়, আমরা ভাবতে বাধ্য হই। আজকের কবিতা শুধু পাঠের নয়, কল্পনার নয়, ভাবনারও বটে। কবি অনিকেত শামীমের কবিতা প্রচলিত ধাঁচে শুধু পাঠ-কল্পনা-ভাবনার অনুষঙ্গ যুক্ত করে না- ক্রোধ, হতাশা, জিঘাংসাকেও উস্্কে দেয় নিশ্চিতভাবেই। তার কবিতায় দেশজ প্রেক্ষাপট উপাদানের সাথে যুক্ত- পরিবর্তিত সময়, বৈশ্বিকতা চিরাচরিত বাংলা কবিতার নিজস্বতা। বাংলা কবিতার সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সাথে অবলীলায় অবগাহন করেন তিনি। সার্বজনীন পরিবর্তিত পরিবর্ধিত বৈশ্বিক ধ্বংসস্তূপে ভেঙ্গে পড়া আধুনিক ক্রোধি চেহারা নিজস্ব আয়নায় প্রতিবিম্বিত এই সমাজ, এই রাষ্ট্র; নস্টালজিয়ার সাথে যুক্ত ধূসর ইতিহাস, খন্ডিত মানবতাবোধ, বিপন্ন বিস্ময় ইত্যাদি তার একান্ত, যেখানে অন্যের প্রবেশাধিকার সীমিত, সীমাবদ্ধ।


অনিকেত শামীম মূলত কবি; সম্পাদনায়ও সিদ্ধহস্ত তিনি। তার সম্পাদিত ‘লোক’ বাংলা ভাষাভাষীদের পত্রিকা। এটি তার উল্লেখ্যযোগ্য সৃষ্টিকর্মেরও একটি। অপরিসীম দরদ, মমত্ব দিয়ে পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন তিনি। নব্বই দশকে লেখালেখি শুরু করলেও তার সৃষ্টির সংখ্যা কিন্তু বেশি নয়। লেখা অল্প হলেও তার লেখনির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অপরিসীম দরদ, মহত্ব, মানুষের প্রতি ভালোবাসা। গতানুগতিক ধারার কবি তিনি নন। পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলীর সাম্প্রতিকতার ছাপ স্পষ্ট তার কবিতায়। একদিকে মাটিময়তার ঘ্রাণ, হারিয়ে ফেলা শৈশব, দুরন্ত বোহেমিয়ানতা তাকে গ্রাস করে। তিনি প্রলুব্ধ হন-

হাট মানেই অনন্ত শৈশব, জাগ দেয়া পাটের গন্ধ…
উজান বাতাসে ধূসর নস্টালজিয়া
দূরে কোথাও বাঁশি থেমে গেছে
নিরন্তর প্রবহমান তার রেশ হঠাৎ হঠাৎ
থমকে দাঁড়ায় রাখালিয়া বোহেমিয়ান…
শৈশবের আরেক নাম হাহাকার, হারিয়ে যাওয়া প্রবেশপথ
/দূরাগত পাহাড়ের সুর

 

এই বিষয়টিই তার অন্য একটি কবিতায় ধরা দেয় ভিন্নভাবে আমাদের সামনে-

একটি ট্রেন প্রতিদিন হুইসেল বাজিয়ে
প্রতিদিন হুইসেল বাজিয়ে চলে যায়
হুইসেলের শব্দ শোনে প্রতিদিন অনড় দাঁড়িয়ে থাকি
প্রতিদিন অনড় দাঁড়িয়ে থাকি শস্যখেতে
সবকিছু খানখান ভেঙেচুরে লোপাট
এক খুঁটি থেকে আরেক খুঁটি- তারগুলো উথাল-পাথাল
জমির আইলগুলো দিকচμবাল
আর ভাবনার বিন্যাস মাকড়শা জাল বুনে বুনে
দিগি¦দিক ছুটে চলে
একটি ট্রেন প্রতিদিন হুইসেল বাজিয়ে
প্রতিদিন হুইসেল বাজিয়ে চলে যায় নিরুদ্দেশ ঠিকানায়

/নিরুদ্দেশ যাত্রীর খোঁজে

নিরুদ্দেশ যাত্রীর ছুটে চলার এই বিরামহীনতা একজন মানুষের নিত্যদিনের। একজন কবির জন্য বোধ হয় বিষয়টি আরো বেদনার, স্মৃতিকাতরতার যা তার কবিতার প্রধান স্পর্শময়তা, সুখময়তাও বোধ হয়।


ইউরোপীয় আধুনিকতার পথ বেয়ে আসা ত্রিশের কবিদের প্রধান বিষয় ছিলো হতাশা, বিষন্নতা, ভুলুণ্ঠিত মানবতার জন্য সীমাহীন দরদ। সম্ভবত সেখান থেকে যে স্রোতধারা ফল্গুধারার ন্যায় পরিপ্লাবিত চল্লিশ-পঞ্চাশ-ষাট পেরিয়ে আজো তার ধারা অক্ষুন্ন ক্লান্তিহীন। বরং সাম্প্রতিক সময়ের নানা ঘটনাবলী তাকে আরো করে ফেলেছে জটিল। পণ্যায়নের খেসারত দিতে হচ্ছে মধ্যবিত্ত নাগরিক মননকে। আর সেখানে মুক্তির অন্বেষায় মানুষ নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে চলেছে নিরন্তন। ঘূর্ণাবর্তের এই দীর্ঘ তপস্যাময় ভালোবাসার পর শান্তির আশ্রয়ের অন্বেষণ সন্ধান মিলবে তার নিচের কবিতাটিতে-

তামস রাত্রির বুক চিরে চিরায়ত ক্ষুধার আহাজারি, এখানে এক টুকরো রুটি এবং ভালোবাসার দীর্ঘ তপস্যা কদাকার লুসিফার গ্রাস করে, বারবার ঘূর্ণাবর্তে পথ ভুল হয়, অলিগলি ভুলপথ হেঁটে হেঁটে শ্মশানের কাছে যাই, শ্মশানের কাছে বাড়ি নেবো- প্রতিদিন আগুনে পোড়া মানুষ দেখে চোখের জল নিঃশেষ হলে পর নিজেকে গড়ে নেবো খাঁটি সোনা, শ্মশানের কাছে বাড়ি নেবো আমি শ্মশানের কাছে…
/দাবানল হৃদয়

এই বিষয়টি তার আরেকটি কবিতায় এসেছে একটু অন্যভাবে-

অন্ধকারে শুয়ে আছে নিদ্রাহীন মাকড়সা
পলাতক খেলা খেলে কতদূর যাওয়া যায়
জানে না বোবা মাছ, মাছি ও মাকড়সা
ডাইনিং টেবিল
মৃত মাছের তাকিয়ে থাকা অপলক চোখ
হান্ড্রেড পাওয়ারের বেলকো বাল্ব
স্ফটিক জলে পুচ্ছ নাড়ে নাইলোটিকা
আনচান মন খুঁজে ফেরে প্রচ্ছায়া লোনা স্বাদ
কোথায় হারালো তাকে গরলে চুমুক দিয়ে
/প্রচ্ছায়া

ভোর কবিতায় এই নাগরিক যন্ত্রণা ক্লেদ প্রোর্টেট হয় আমাদের সামনে-
সরীসৃপের মতো এঁকেবেঁকে চলে যায় অন্ধকার
অন্ধকার গহবর থেকে জন্ম নেয় আলোর উৎস
ক্রমশ সজারু আলোয় নেয়ে ওঠে পৃথিবী।
মৃদুময় বাতাসে মনের বিহবলতা কুসুমের মতো ছড়িয়ে থাকে
এই তো সবেমাত্র যেন
আজীবনের সমস্ত পাপ-পঙ্কিলতা ভেদ করে
কুসুমিত জলে সড়বান সেরে উঠে দাঁড়ালেন রুপোলি রোদে
পৃথিবী এবং পৃথিবীর শাশ্বত মানুষগুলো।
/ভোর


আধ্যাত্মিকতা বাংলা কবিতার নিজস্ব সম্পদ। আধ্যাত্মিক কবিতায় মানুষের ভেতরের মানুষ, অচিন মানুষের সন্ধান করেছেন কবি। অনিকেত শামীম বিষয়টি একটু অন্যভাবে উপস্থাপন করেন কচুপাতা জীবন কবিতায়।

তিনজন ফেলো খুঁজে ফেরে জীবনের সংজ্ঞা…
নীলাচল থেকে নামতে নামতে
একজন আখতার হামিদ খান বলে দেন কানে কানে
এই তো জীবন এই তো জীবন
তোমাদের অতি নিকটেই গড়াগড়ি যায়
/ কচুপাতা জীবন

বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখেন অন্য আরেকটি কবিতায়-
অন্তর্গত চেতনায় এক কাঠঠোকরা পাখি
অবিরল রক্তাক্ত করে ধু ধু প্রান্তর
অতিক্রান্ত কালবেলায় কানামাছি ভো-ভো
নিরুদ্দেশ ঠিকানায় ছোটে ট্রাম, আর
মহাপৃথিবীর প্রান্তরে নদীর ছলচ্ছল শব্দে ঘুমায়
রূপসী বাংলা
/সে এক বিস্ময়

আরেকটি কবিতায়-
মাঝখানে বিভাজন শীত আমাদের অলিন্দে ঢেউ তোলে কোথায় কতদূর চলে যায়… আমি একা পাহাড়ের উত্তুঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘার সঙ্গে লুটোপুটি খেলতে খেলতে শীতনিদ্রায় হারিয়ে যাই। শীতঘুম শেষে তপ্ত দাবদাহে পুড়তে থাকি, বৃষ্টির জলে সড়বাত হই।
ঐ যে দূরে শুকনো পাতার মর্মরধ্বনি, আমার হৃদয়ে নূপুরের নিক্কন হয়ে বাজে। চুপি চুপি কথা বলি শুকনো পাতার সাথে। আমি একা হয়ে যাই। দীর্ঘ শীতনিদ্রা আমাকে আমূল বদলে দেয়।
/একাকী শীতের সঙ্গে

অন্য একটি কবিতায়-
হাতের মুঠোয় থরথর করে কাঁপছে আমার পৃথিবী
আমার সমস্ত অনুভূতি আর জাগ্রত বিবেক দিয়ে
যে পৃথিবীকে আঁকড়ে ধরেছিলাম
সে আজ শাসনের বাইরে আমার।
সূর্য থেকে ছিটকে এসে
শীতল হওয়ার বদৌলতে ভীষণ উত্তপ্ত হয়ে
ক্রুর নিষ্ঠুর মত্ততায় দাউ দাউ করে জ্বলছে।
/সজল পৃথিবীর বুকে
আবার-

ক্রমশ একটি বিন্দুর দিকে যাত্রা এইভাবে ঘড়ির পেন্ডুলাম একবার এদিক একবার ওদিক রুটিনমাফিক- অথচ রুটিনমাফিক কিছুই হয় না, যাত্রাপথে ভুলমানুষ সারিবদ্ধ লাইনে ঢুকে পড়ে যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় বেমালুম পাশ কাটিয়ে তো যাওয়া যায় না, কিছু বিষয় অস্পষ্ট থেকেই যায় ডাকবিভাগের সিলের মতো সবকিছু খোলাসা হোক এবার
/লক্ষ্যবস্তুর দিকে যাত্রা


গণতন্ত্র নিয়ে বিশ্বব্যাপী নোংরামি, নষ্টামি আর দুর্তামির স্বরূপ উন্মোচিত হয় তার ফানুস কবিতায়। বিশ্বমোড়ল মগডালে বসে পৃথিবীব্যাপি হুঙ্কার ছাড়ে/ গণপেচ্ছাপের ফুৎকারে ছত্রখান সেই হুঙ্কার চমৎকার উপমায় বিশ্বমোড়লদের স্বরূপ তিনি উন্মোচন করেই ক্ষান্ত হন না গণপেচ্ছাপের ফুৎকারে তাদের উড়িয়ে দেন ফানুস আকারে।

তোমাদের হিংসার আগুনে পোড়া তেলাপোকা
পিচ্ছিল শরীরে ছাইয়ের স্তূপ
দীর্ঘশ্বাসে তপ্ত হাওয়া এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়ে
আমরা সড়বাত হই হাঁটুজলে
ইচ্ছেপূরণের অতৃপ্ত কাক্সক্ষায় লোল-জিহবা লেলিহান
শিশেড়বর ডগায় লুটোপুটো লিংকনের গণতন্ত্র
বিশ্বমোড়ল মগডালে বসে পৃথিবীব্যাপি হুঙ্কার ছাড়ে
গণপেচ্ছাপের ফুৎকারে ছত্রখান সেই হুঙ্কার
শুধুই ফানুস শুধুই ফানুস
/ফানুস

মিডিয়াবাজী আর ধান্ধাবাজীর স্বরূপ তিনি তুলে ধরেন অনিশ্চিত ভবিতব্য কবিতায় এভাবে-

উলঙ্গ শিশুরা জলে লাফ দিলে তুমুল করতালি ধ্বনিত হয় আর করতালির বিপরীতে প্রতিধ্বনিত হয় তীব্র হাহাকার, এই ঘনঘোর বর্ষায় ফি-বছর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় ত্রাণলাইন আর ক্লিক ক্লিক ফ্লাশ, মিডিয়ার দৌরাত্ম্যে এখন শুধু ফ্লাশ নয় ভিজ্যুয়াল প্রক্রিয়ায় বিক্রি হয় ভাসমান দেশ…
ভাসছে মানুষ পশুপাখি খেতখামার যৌবনবতী শস্য কী সুন্দর (!) ভিজ্যুয়ালাইজড ডকুমেন্টারিতে বেচাকেনা হয় মানুষের অসহায়ত্ব হাঃ হাঃ আর দেখো কী সুন্দর উলঙ্গ শিশুরা জলে লাফ দিয়ে আলোড়ন তুলে, বিশ্বমানবতার চোখে গড়িয়ে পড়ে জল এবং পাতানো গামছায় টুপটাপ জমা পড়ে ইউরো ডলার রিয়েল, যদিও খসড়া জরিপে জানা যার তোমার থলেতে পড়েছে পঁচিশ পয়সা মাত্র
/অনিশ্চিত ভবিতব্য


দশক ও সমসাময়িক লিটল ম্যাগাজিন, ছোট কাগজ বড় কাগজ নিয়ে তার ভাবনা তার কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে-

অচল মুদ্রার মতো পড়ে থাকে
প্রথাবৃত্তে ঘুরপাক প্রাক-আশি
যেন মধ্যমাঠে পড়ে থাকা পিনাদ্ধ যন্ত্রণা।
/নব্বই দশক

দ্বিধাদ্বন্দ্ব বড় কঠিন ব্যাধি জেনেও ছোটকাগজ বনাম বড়কাগজের বিতর্ক চলে, আর সেই বিতর্কে তোমার অপেক্ষার দৃশ্য ভেসে ওঠে কেননা তুমি চেয়েছিলে তোমার আনন্দ দিনে আমার উপস্থিতি নিশ্চিত হোক অথচ একটু পরেই তুমি এলজিইডি কর্মকর্তাকে কবুল করবে, যদিও জানি কবুল বলার সময়ও তুমি খুঁজতে থাকবে আমাকে আর আমি বিজ্ঞ বিচারপতিদের মতো বিব্রতবোধ করতে থাকবো আর রহস্য ক্রমেই উন্মোচিত হতে থাকবে
/তোমার আনন্দের দিনে


একাকী ভাসানের দিকে গেলে ফেরে না চাকা…/ লোভাতুর চোখ স্পর্শ করে তোমার মিহিন কারুকাজ/নিকানো উঠোনে পড়ে থাকে স্মৃতিময় পঙ্ক্তিমালার দেহাবশেষ/ নৌকোর গলুইয়ে পড়ে থাকে সোনালি সকাল- এ ধরনের নানা পঙ্ক্তিমালা তার কবিতায় ব্যবহৃত হয়েছে, যা আমাদের মুগ্ধ করে, শব্দচয়নের মুন্সিয়ানায় চমৎকিত হই আমরা।


কবি অনিকেত শামীম। মানুষ অনিকেত শামীম। সম্পাদক অনিকেত শামীম। লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের একজন সক্রিয় সহযোদ্ধা। নানা পরিচয়ের পরও তার সবচেয়ে বড় গুণ তাহলো তার বন্ধুবাৎসল্য। প্রতিটি মানুষের রয়েছে নিজস্ব দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, নিজস্ব জগৎ। স্বরূপের সেই অন্বেষায় কবির সাথে সুর মিলিয়ে বলতে চাই-

মানুষ দেখার খুব শখ তোমার
বিচিত্র রকম মানুষ
প্রতিটি মানুষের থাকে নিজস্ব জগৎ
প্রতিটি মানুষের ভেতর আরেক মানুষ
মানুষকে পাঠ করা মানেই অনন্ত রহস্যকে উন্মোচন করা।
/মানুষের মেলা

 


পঞ্চাশ পূর্তিতে অভিনন্দন জানাই তাকে। পথচলা মসৃণ হোক। শুভ কামনা।

শেয়ার করুন: