004588
Total Users : 4588
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

আমি কবিতায় প্রাত্যহিক নন্দনপ্রিয়তাকে প্রত্যাখ্যান করতে ইচ্ছুক

আমি তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক অথবা দুই ক্লাসের শেষ বেঞ্চে; নিরীহ মানবশাবক। খাপছাড়া লম্বাটে এক মেয়ে আমাকে বিরক্ত করে। স্কুল ছুটির পর পিছু নিতে ভুলে না সে। হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় ঘুরপথে; যে পথে ছড়িয়ে থাকে দমকা বাতাসে উড়ে আসা পাখির বাসা, ভেঙে যাওয়া ডিম; চোখ না ফোটা পাখিশাবক। শিমুলদীঘির পথে জাদু ছড়ানো মরা রোদ; শীতঋতু; মরাদীঘির বুকে ভীনদেশি পাখি; পাখির চোখের মতো মায়াবী জলের স্বচ্ছতায় ভেসে আছে কলাপাতারং কচুরিপানার ফাঁকে নীলরঙা তাজা কচুরিফুল।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহপাঠি বালিকা আমাকে টেনে নামায় সেই নীলকষ্টের কাছে; একেবারে নীলের কাছাকাছি; তখন ভাষার সীমানায় ‘নীল’ শব্দটি হয়ে ওঠে কষ্ট প্রকাশের পরিপূরকধ্বনি; কষ্টপ্রকাশ, সূচকধ্বনি।

বিদ্যালয়ফেরা সেই সন্ধ্যায় ডাহুক ডেকে ওঠে। আমি চেতনা ফিরে পেলে আমাকে পেয়ে বসে ডাহুকনেশা। আর তখন ময়েন কাকা শিমুলদীঘির কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা এক-দশ-শ অথবা হাজার গাছের রস, তালপাতার শরীর জুড়ে মৌদেহ তালরস অথবা খেজুরপাতার চিকন ধারালো তীক্ষèতা ভেদ করে জেগে ওঠা মিইয়ে পড়া জীবন্ত বিকেল অতিক্রান্ত হয়। সহসা চোখ খুলে গেলে, সন্ধ্যার কাছাকাছি সেই বিদ্যালয়ফেরৎ ঘরে ফেরা বিকেল হাটু ভেঙে বসে থাকে শিমুলদীঘির জলের ওপর; যেন বা রূপকথা ভেসে আছে সন্ধ্যার জলে।

আর তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেই শ্যামারঙের মেয়েটি আমার চোখ বরাবর তার চিকন সবুজ আঙুল তুলে দেখায়, ঐ যে, ঐ দূরে সীমাহীন দূরে, দিনের আলো ডুবে যায়। ঠিক সেই সময়, দিগন্তের ওপর মৃতপ্রায় আলোর ওপাড় থেকে ঝাঁক ঝাঁক ভ‚তের নিঃশ্বাস ঝাঁক বেঁধে এসে আমাদের শরীরে ভর করলে আমরা ভুলে যাই বিদ্যালয়ের ২য় ক্লাসে ইসহাক স্যারের যোগ-বিয়োগ রহস্য। সেই ‘রহস্য’ সন্ধ্যা-সময়ের ভাষাদেহ অতিক্রম করে ভেসে থাকে মায়াকাতর আকাশের দেহে।

ঠিক তখন, মেঘবিহীন আকাশ অথবা শুকিয়ে ওঠা দীঘিজলকাদার একপাশে শুয়ে থাকা একটি ধবধবে শাদা বক; আর আমরা বকশাবকের কাছে ছুটে গেলে আমি অবাক হই; কী হতবাক বিস্ময়ে ঘুমিয়ে আছে বকশাবক আমি হাত বাড়িয়ে দেই বকশিশুটির দিকে; নীরব নিথর ওর শরীর। আমি বুঝি না কেনোই বা এই ভর সন্ধ্যায় অসময়ে এভাবে ঘুমিয়ে আছে বকশাবক কচুরিঝোপের পাশে একা! ঠিক তখন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহপাঠি বালিকা আমাকে পৃথিবীর প্রথম পাঠ শেখায়, যে পাঠের শিরোনাম, ‘মৃত্যু’। বকশাবক মৃত। আমি বুঝে উঠতে পারি না এই সত্য। আমি মেনে নিতে পারি না এই সত্য। আমি বহুদিন বিদ্যালয়ের ব্যাকবেঞ্চে বসে অথবা বহু বহু দিন বিদ্যালয় থেকে ফিরে গিয়ে মা-র কাছে, বাবার কাছে অথবা দাদি অথবা চাচার কাছে ফুপুর কাছে জানতে চেয়েছি; অথচ আমার জানা ছিলো না, কী আমার জিজ্ঞাসা, মৃত্যু বিষয়ে কী-ই বা আমার জানার আছে! শুধু ক্ষত বিঁধে থাকে, মেনে নিতে পারি না, কেনো একক সন্ধ্যায়, একাকি ধবধবে দেহ নিয়ে, একাকি শুয়ে থাকে মৃত ধবধবে বকশাবক? ক্ষত বিঁধে থাকে; প্রশ্ন জেগে ওঠে; অথচ সেই প্রশ্নকে ভাষার শরীরে গেঁথে নেওয়ার মতো কোনো শব্দ আমার বোধে নেই।

সুতরাং আমার কষ্টকে চিহ্নিত করতে না পারার যন্ত্রণা থেকে এক ধরনের অবদমন অবযাতনা অথবা অবকষ্ট আমাকে ক্রমাগত ভাষাবোধের দিকে ঠেলে দিতে থাকলে একদিন অথবা বহু বহু দিন পর আমি বুঝতে শিখেছিলাম আমার সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বালিকা বন্ধুটি আমাকে কতোটা ভালোবাসতো। অথচ সেই ভালোলাগা বুঝে নেয়ার মতো কোনো ‘ভাষাবোধ-আশ্রিত-শব্দ’ আমার মেমোরিতে তখনো জমে ওঠেনি; সুতরাং আমি ভাষাবোধহীন বোবাশিশু। অথচ কী এক অমোঘ প্রাত্যহিক সহজাত তাড়না আমাকে সেই বালিকা বন্ধুর পিছে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায়।

অতঃপর একদা আমার বোধে ভাষাবোধ জেগে উঠলে, অথবা বোধের শরীরে সারার্থের সবুজ-আভা জেগে উঠলে আমি অপেক্ষায় থাকি, যেভাবে বকশাবকের মৃত্যুর পর বকপিতা অথবা বকমাতা সন্ধ্যার শেষ সীমানায় বসে অপেক্ষায় থাকে, কখন-কীভাবে বকশাবকের ধবধবে দেহ শিমুলদীঘির জলে ভেসে উঠবে; অথবা জেগে উঠবে ডাহুকশিশুর কণ্ঠধ্বনি; রাতদুপুরের চিরায়ত সঙ্গীত। চিরায়ত সেই সঙ্গীত বকপিতাকে অথবা বকমাতাকে ভাষাশিক্ষা দেয়। আর যখন সেই ভাষাশিক্ষার অবারিত পাঠ ছুঁয়ে দেই আমি, তখন সেই ভাষার শরীরে ভর দিয়ে বুঝে যাই, সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সবুজ-সীমানায় জেগে থাকা বালিকা-বন্ধুটির নাম ছিল ‘কবিতা’।

অবলীলায় কবিতা উচ্চারণের ধ্বনিমৌনতা অথবা অর্থ-বিস্ময়-স্তরে মনোযোগী হলে কবিতার অন্তর্গত রহস্যের সামান্য হলেও বোধের সাথে মিলিয়ে নেয়া সম্ভব। কবিতা বোধের পাখা দিয়ে ছুঁয়ে দেওয়ার বিষয়; কবিতা দৃষ্টিগ্রাহ্য অথবা ব্যাখ্যাযোগ্য শিল্প নয়। প্রকৃত কবিতার ব্যাখ্যাবিস্তার দুঃসাধ্য অথবা সেই ব্যাখ্যা ঠিক কবিতার কাছাকাছি পৌঁছে কিনা, সেখানেও সংশয়। সে কারণেই বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই, কবিতা-বিশ্লেষক পন্ডিতদের ‘অর্থহীন-বাচাল’ হিসেবে কটাক্ষ করা হয়; জীবনানন্দ দাশ শুধু নয় অনেকেই একাডেমিক পন্ডিতদের মূর্খজ্ঞানে উপহাস করতে ছাড়েননি। আসলে পন্ডিত অথবা একাডেমিশিয়ানদের দোষ নয়; বরং আমাদেরকে স্বীকার করতেই হচ্ছে শিল্প-বিশ্লেষকদের কিছুটা হলেও শিল্পসত্তা থাকা জরুরী। একজন শিল্পীর হাতে শিল্পের ব্যাখ্যা যেভাবে উঠে আসে, সেভাবে একাডেমিশিয়ানদের কলমে সম্ভব হয়ে ওঠে না। এক্ষেত্রে একাডেমিক স্তরে, অন্তত ‘শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি’ বিষয়ে আর্টিস্টদের অংশগ্রহণ অধিক ফলদায়ক হতে বাধ্য। এ কারণেই শ্রেণিকক্ষে কবিতা যেভাবেই আলোচিত হোক না কেন, আমরা যখন কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের নিয়ে সেমিনার-আলোচনা-আড্ডার আয়োজন করি তখন তা অধিক অর্থবোধক মাত্রা লাভ করে। এই মাত্রাকে শুধুমাত্র বোধের পাখা দিয়েই স্পর্শ করা সম্ভব। যার পাখা নেই তার পক্ষে কবিতাকে ছুঁয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এই ছুঁয়ে দিতে না পারা, এটি আসলে পাঠকের ব্যর্থতা। কেননা সমসাময়িকগণ যদি পড়তে না শেখেন সে দায়ভার শিল্পীর বা কবির নয়। এক্ষেত্রে মালার্মে সব শ্রেণির জনগণকে তুষ্ঠ করতে পারে এমন কবিতাকে এক কথায় নাকচ করে দিয়েছেন।

কবিতা আদৌ অলস সময় যাপনের জন্য মনোরঞ্জক উপাদেয় কোনো শিল্পমাধ্যম নয়। নাটক, নৃত্য, সঙ্গীত অথবা ক্রিকেট, ফুটবল ইত্যাদি ইত্যাদি বহুবিধ শিল্পমাধ্যমে যেভাবে আনন্দ-রিল্যাক্স অথবা জৈবিক চাহিদার পরিপূরক পরিবেশ পাওয়া সম্ভব ঠিক সেভাবে কবিতার মাধ্যমে সে চাহিদা কোনোক্রমেই মেটানো সম্ভব নয়; এমনকি কবিতা কখনো কোনো সামাজিক নীতিশিক্ষাও পরিবেশন করে না, অথবা কোনো সামাজিক দায়বোধের কাছে আটকে থাকে না; কবিতা কখনো দর্শনসূত্র পরিবেশন করে না; অথচ তারপরও মানব প্রজন্ম যাতে সামাজিক চোখ অথবা দার্শনিক চোখ তৈরি করার সুযোগ লাভ করতে পারে সে বিষয়ে কবিতা আমাদের অজ্ঞাতে আমাদেরকে প্ররোচিত করে।

হতে পারে ধর্মপুস্তকের কাজ ন্যায়শিক্ষা দেওয়া, সমাজশিক্ষা দেওয়া অথবা দর্শনশিক্ষা দেওয়া; তারপরও অবশ্যই ধর্মপুস্তক এবং কবিতা এক বিষয় নয়; বিষয়-আঙ্গিক অথবা রস আহরণে, যে ক্ষেত্রেই বলি না কেনো কবিতা আর ধর্মপুস্তক সম্পূর্ণ পৃথক অভিধা। সামাজিক বাস্তবতা আর সভ্যতার বিবর্তনের সত্যতা অনুসারে আমরা দেখতে পাচ্ছি মানুষ ধর্মপুস্তক থেকে ক্রমশ বিযুক্ত হতে চলেছে; অপরপক্ষে ক্রমশ বিজ্ঞানচেতনাসহ নন্দনচেতনার সাথে সংশ্লিষ্ট হতে শুরু করেছি আমরা। সে হিসেবে সত্যিকার অর্থেই কবিতার চর্চা যে তুলনায় বেড়েছে সে তুলনায় ধর্মপুস্তকের চর্চা বাড়েনি। জ্ঞানের রাজ্যে এটাই স্বাভাবিক যেভাবে বিজ্ঞান-দর্শনসহ জ্ঞানরাজ্যের নানাবিধ বিষয়াদির চর্চা মানবসভ্যতা টিকে থাকার স্বার্থে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সে অনুপাতে ততোটাই ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মচর্চা পিছিয়ে পড়তে শুরু করেছে। কবিতাসৃষ্টির রহস্য উদ্ঘাটনে এ বিষয়গুলোও ভেবে দেখার বিষয়। এক্ষেত্রে ভাবা সম্ভব, ভাষাবোধে জীবন-প্রকাশের সময়-উপযুক্ত অনুভ‚তি কি শেষ পর্যন্ত কবিতাকে আশ্রয় করে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে? ধর্মরস সেক্ষেত্রে কি যথেষ্ঠ নয়? অথবা যথেষ্ঠ ভ‚মিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে?

অবশ্যই ব্যর্থ হচ্ছে। যদি ধর্মপুস্তক প্রশান্তি প্রদায়ক যথেষ্ঠ ভাষা-অভিধা হতো তা হলে সভ্যতায় শিল্প-সাহিত্য চর্চার কোনো প্রয়োজন হতো না। মানব সভ্যতা টোটেম-ট্যাবু, ফোকবিলিভ অথবা ঐশিগ্রন্থ ও বিশ্বাসের ভেতর আটকে থাকেনি; বরং ক্রমশ এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা প্রিজার্ভ করাই মানব সভ্যতার বৈশিষ্ট্য; এই বৈশিষ্ট্যের সাথে কবিতার বাঁক বদলের বিষয়টিও জড়িত।
কবিতা মূলত চেতনাগত সুর ও ভাষিক অনুরাগের যোগসূত্র। প্রতিটি মানুষের ভেতর কবিতা এক ধরনের প্রাচীন প্ররোচনা। ফলে অনিবার্যভাবেই কবিতা প্রথমত ছিলো মৌখিক-প্রকাশ। তারপর বোধে ও স্মৃতি থেকে এখন লিখিত রূপ। কবিতা মানুষের সবচেয়ে মানবিক অংশটুকুতে টোকা দেয়, বোধ ও অর্থের প্রণোদনায়।

পাঠক যদি কবিতার টোন এবং মেজাজকে টাচ করতে না পারেন, তা হলে কবিতাকে উপলব্ধিতে নিয়ে আনা সম্ভব নয়। আর অবশ্যই প্রত্যেক প্রতিভাবান কবির কবিতামেজাজ পৃথক। মেজাজের সেই ভিন্নতা থেকেই উঠে আসে কবিতার অর্থবিস্তারী পরিভ্রমণ-প্রক্রিয়া।

এই পরিভ্রমণগুণ একজন কবিকে সমকাল থেকে পৃথক করে চিহ্নিত করে। হতে পারে কবিতা মৃদু অথবা তীব্র; হতে পারে তা এতোটাই জীবনঘনিষ্ঠ যে সেখানে কবিতার কুহক নেই; বরং আছে কবিতার মায়া; যে মায়া আমাদের সম্মোহিত করে; ক্রমশ ডুবিয়ে রাখে জীবনের সীমাহীন অমীমাংসিত প্রশ্নে।

তারপরও আমি বলবো কবিতার কুহক আসলে বিভ্রান্তির বেড়াজাল নয়; বরং তা মায়াবিস্তারী অর্থব্যকুলতার হাতছানি। তারপরও আমি মনে করি, মালার্মে যেভাবে ভেবেছেন, কবিতা এখন মালার্মের সেই ভাবনা থেকে অনেকটা সরে এসেছে। কবিতা এখন শুধু ছন্দ অথবা শব্দঝঙ্কারের অথবা শুধুই রহস্যবুননের খেলা নয়; শুধুমাত্র কণ্ঠধ্বনি নির্ভর ছন্দময় ঝঙ্কার আর অর্থহীন রহস্যকে আমি কবিতা বলে মেনে নিতে কুণ্ঠা বোধ করি; যদি না সেখানে সীমাহীন ভাবনার স্তরসমূহ উন্মোচিত হবার অবকাশ পায়; যদি না সেখানে দৈনিকতা অতিরিক্ত ভ্রমণ-প্রক্রিয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়; যদি না সেখানে পাঠকের বোধে সৃজনশীলবোধ সক্রিয় হয়ে ওঠার সুযোগ লাভ করে; যদি না সেখানে নিত্য ব্যবহার্য শব্দরাশি নতুন অভিব্যক্তি প্রকাশজ্ঞাপক শক্তিতে নতুন হয়ে ওঠে; যদি না সেখানে চিত্রকল্পের সৌহার্দ্যে প্রতিদিনের শব্দসমূহ অথবা দৃশ্যকল্পসমূহ অভিধানে আটকে থাকা অর্থের অতিরিক্ত কোনো অর্থময়তায় পাঠককে গ্রাস করে, তবে তা কখনোই নতুন কবিতা নয়; বরং তা বহু লিখিত বহু পঠিত ও ব্যবহৃত রুগ্ন ভাষা-প্রকাশ মাত্র; এগুলো লেখা হয়ে গিয়েছে, বলা হয়ে গিয়েছে, পঠিত হয়েছে; আপনাকে আর আবেগ-আপ্লুত হয়ে দ্বিতীয়বার তা লেখার দরকার নেই।

আমি মনে করি, একজন কবি মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের স্তরসমূহের সাথে পরিচিত হতে বাধ্য; পরিচিত হতে বাধ্য বিজ্ঞানের ক্রমবিবর্তনের প্রভাবে মানব পরিবারের মননগত চেতনস্তরের সাথে। কেননা কবি জানেন তিনি কী বলতে চান; অযথা উদ্দেশ্যহীন কথাস্তম্ভ নির্মাণ করতে ইচ্ছুক নন তিনি; সেক্ষেত্রে তিনি মানব-প্রকৃতি বোঝেন সেই সাথে বোঝেন সভ্যতার গতিবিধি। এ বিষয়ে যারা একমত নন; অবশ্য একমত হবার ক্ষেত্রে বোধগত মানবীয় চোখ থাকা জরুরী; যাই হোক তারা অপ্রস্তুত পাঠকের অজ্ঞানতার সুযোগ গ্রহণ করেন মাত্র; এবং তিনি নিজেও যেহেতু অন্ধ সেহেতু নির্বোধ বাক্যবিন্যাসকে তিনি কবিতা জ্ঞান করে জীবনভর লিখতে থাকেন; এবং বিভ্রান্তি ছড়াতে থাকেন।

অসংখ্য প্রতিষ্ঠান অজস্র মিডিয়া প্রস্তুত আছে সেই অজ্ঞানতাকে স্বীকৃতি দেবার জন্য; আর যখন পুরস্কার অথবা মিডিয়াবাজি চেগিয়ে উঠতে থাকে তখন আর জনগণের দোষ দেবো কেনো, এর মধ্যেই তো এভাবে মিডিয়াবাজির ধাক্কায় অপকবিতাকে কবিতা হিসেবে চিনতে শিখে গেছে সোসাইটি। আর লিখিয়েদের যে অংশটি মিডিয়ার নজরে চুক্তিবদ্ধ হতে ব্যর্থ হচ্ছেন তারা সংগঠন, ফোরাম, গ্রæপ, ইচ্ছেমত পত্রিকা প্রকাশ অথবা গোষ্ঠীবদ্ধ হতে যতœবান অথবা নিদেনপক্ষে ফেসবুকের আলোক দেয়ালে কবিতা লেপটে দিচ্ছেন; এমন কি বিনা অনুমতিতে আমার অথবা আপনার টাইমলাইনে ট্যাগ করে দিচ্ছেন প্রতিদিন কবিতার নামে শত শত শব্দের অপ-আচরণ।

যাই হোক, আমি অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিভাধর কবিদের বেলায় দেখে আসছি, প্রতিভাগুণে কখনো বা কোনো বহুব্যবহৃত রুগ্ন শব্দও হয়ে উঠেছে নতুন; আবার কখনো বা তীক্ষè শব্দ হয়ে উঠেছে মৃদু। সত্যিকার কবিতার শরীরে দেখা যেতে পারে শব্দসংখ্যার স্বল্পতা অথচ সেই চ‚ড়ান্ত ও সীমিত শব্দপ্রয়োগ কী প্রচÐরকম অর্থ-আগ্রাসী পরিবেশ নির্মাণ করতে পারে; যার উদাহরণ একমাত্র একটি উৎকৃষ্ট কবিতাই হতে পারে। অথবা অব্যবহৃত শব্দের সহসা ব্যবহার কবিতার পরিবেশকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, পাঠককে নির্দেশনা অথবা ইশারা দিচ্ছে, পাঠক কী ভাববেন অথবা কোন পথে পরিভ্রমণে অগ্রসর হবেন এ সব কিছুই নির্ভর করছে শব্দের বিনির্মাণ অথবা প্রতিনির্মাণের ওপর।

কবিতা বুঝতে হলে শব্দ ব্যবহার অথবা বাক্যবিন্যাসের এমনতর কৃৎকৌশল নিয়েও ভাববার অবকাশ আছে। আমার অভিজ্ঞতায় আমি প্রতিভাধর কবির কবিতায় এমনটিও দেখেছি, বর্ণনা ধীর ও হ্রস্ব; ফলে লাইন ছোট ও কমপ্যাক্ট হয়ে উঠেছে এবং নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকলেও তা কখনো নির্দিষ্ট সীমানায় আটকে থাকছে না; হতে পারে বিরামচিহ্নহীন অথবা প্রায় বিরামচিহ্নবিহীন প্রবহমান ছন্দের ধীরস্রোতে স্বচ্ছ অথচ রহস্যমুখর অথবা প্রচলিত ছন্দের সীমানা তার জন্য যথেষ্ঠ নয় ফলে কবিতার ভাষা সেই সীমানা অতিক্রম করেছে; তারপরও সব মিলিয়ে কিন্তু নির্মাণ নয় বরং কৃত্রিমতা ও আঁতলামো বর্জিত সেই কবিতা; সেই কবিতার পদবিন্যাসে রয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত ও অনিবার্য পদবন্ধন; অথবা হতে পারে সেই কবিতা ধারাবাহিক ও লক্ষ্যাভিমুখী, গন্তব্য বিদ্যমান; ফলে পাঠ-উত্তর পাঠকের প্রাপ্তিযোগ ঘটে।

আবার এ কথাও ঠিক, কবিতা প্রয়োজনের দাবিতে দীর্ঘ হয়ে উঠতে পারে; অথচ তারপরও সেই কবিতা বাহুল্যবর্জিত; হয়তো আপনি সেই কবিতার দীর্ঘ বয়ানে বিরক্ত হবার পরিবর্তে ক্রমশ পাঠবিস্তারে, ক্রমশ মুগ্ধতায় উন্মুখ হয়ে উঠবেন।

প্রতিভাধর কবিদের ক্ষেত্রে এও দেখেছি, ভাষার কাঠামো-নির্ভরতা অপেক্ষা কবিতায় শিল্পের জীবনীশক্তির সমাবেশ ঘটে পদবন্ধন জনিত অর্থময়তার কারণে; ফলে দৈনন্দিন বস্তুজগৎ আশ্রিত ঘটনাবলীর চিত্রায়ন ও জীবন-জগতের মর্মার্থের প্রতিভাস হয়ে উঠতে পারে কবিতা।

এক্ষেত্রে কবিতার বহু ব্যবহৃত কাঠামো-খোলসকে অস্বীকার করে কবি কবিতার পৃথক পোশাকে উপস্থিত হতে বাধ্য। তা না হলে পুরোনো কবিতা নতুন করে ভিন্ন কলমে বা ভিন্ন কণ্ঠে শোনার কোনো যৌক্তিকতা নেই; আমি সেই কবিতা শুনতে বাধ্য নই। এই যে নতুন করে কবিতাকে সামনে নিয়ে আসা; এই নতুন করে নিয়ে আসার মধ্যে থাকে না কোনো চটুল নৃত্য; বরং সেখানে রয়েছে গভীরতার যাত্রাপথ উন্মোচন-প্রক্রিয়া।

এ অবস্থায় এসে আমি বিনয়ের সাথে বলতে চাই, এমনতর কবিতার মুখোমুখি আমি হয়েছি তার অর্থ এই নয় যে এগুলোই হতে হবে কবিতার আদর্শ; কেননা আমি মনে করি সৃজনশীলতা কোনো সুনিয়ন্ত্রিত ছকে বা আদর্শে আটকে থাকে না বা সীমাবদ্ধ থাকে না; আটকে থাকলে সেখানে সৃজনশীলতা থাকে না; সৃজনশীলতা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। যদিও আমি আমার কবিতার কৃৎকৌশল বিষয়ে আজকাল ভাবতে শুরু করেছি, আমি কবিতায় প্রাত্যহিক নন্দনপ্রিয়তাকে খুব সচেতনভাবেই প্রত্যাখ্যান করতে ইচ্ছুক; এতে কবিতায় জন্ম নিতে পারে এক ধরনের বিরুদ্ধ প্রতিক্রিয়া; যেখানে লুকিয়ে থাকে প্রতিবেশ অথবা দৈনিকতার ওপর অনাস্থা অথবা ক্ষোভ। এ অবস্থায় প্রচল কবিতারীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। অর্থাৎ কবিতা মুক্ত হতে চলেছে অলঙ্কারসর্বস্বতা থেকে। আর এভাবে বিপৎজনক পথে কবিতার পদবিন্যাসকে মুক্ত করে দিতে গিয়ে আমি ঝুলে থাকতে পারি তীক্ষ্ন অথচ ধারালো সুতোর ওপর।

এভাবে কবিতা নিয়ে ভাবনার সীমানা খুলে দেয়া যেতেই পারে। আবার এভাবেও ভাবা যেতে পারে, কবিতা তো আসলে সৃজিত হয় না; কবিতা ছড়িয়ে আছে বাস্তব অথবা জান্তব অভিজ্ঞানের ভেতর। সেই ছড়িয়ে থাকা কবিতাকে নিজ নিজ ভাষায় অনুবাদ করে নিতে গিয়ে যে কষ্ট আর প্রশান্তির পলি জমে ওঠে সেটাকে ছেঁকে তুলে নেওয়াই কবির কাজ। তারপরও আমি বলবো, কবিতা মানবসভ্যতার জন্য কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়; এটি ভাষানির্ভর মানস-প্রক্রিয়া; কবিতা বিজ্ঞাননির্ভর কোনো সৃজনজগত নয়; যদি মনে করি কবিতা রচনা করে সভ্যতা উদ্ধার করবো, তা হলে তা বৃহত্তর অর্থে হাস্যকর। আবার এ কথাও ঠিক, ব্যক্তিমানস এমনকি গোষ্ঠী-মানসকল্পে কবিতা অবশ্যই ভ‚মিকাবিস্তারী ভাষাপ্রকাশ।

চূড়ান্ত অর্থে, আত্মলেহনের তাড়নায় মানবভাষাকে প্রতিনিয়ত ‘রেপ’ করার মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় কবিতা; সেই ‘রেপ’ হয়ে উঠতে পারে পরকীয়া। তবে মনে রাখতে হবে এখানে ‘রেপ’ শব্দটি দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট জেন্ডার বোঝানো হয়নি; অথবা এমন বাক্যবিন্যাস দিয়ে পুরুষবাচক ভাষাবোধ বা দৃষ্টি উপস্থাপন করা হয়নি। জেন্ডার অথবা পুরুষকেন্দ্রীক চেতনা এক্ষেত্রে কবিতার সীমানাকে টেনে নামায় নিচে; সমকালে কবিতার বিষয়, সত্তা ও আঙ্গিক বুঝতে হলে কবিতার ভাষাকে বচন ও লিঙ্গনিরপেক্ষ দৃষ্টি থেকে রিসিভ করা প্রাসঙ্গিক।

শেষাবধি দার্শনিক হয়ে উঠেছিলেন নরওয়ের ইয়স্তেন গার্ডার। তাঁর ‘মায়া’ উপন্যাসে নিজের কৈশোর নিয়ে, ‘ঘটনাটা আমার অষ্টম জন্মদিনের আগের, তখন আমাদের পরিবার চার বছরের জন্য মাদ্রিদে পাড়ি জমায়। পকেট ভর্তি হ্যাযেলনাট নিয়ে একটা বুনো পথে দৌড়াচ্ছিলাম আমি; হ্যাযেলনাটগুলো কুড়িয়ে পেয়েছিলাম আমি। দৌড়াচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম মা-কে দেখাবো নাটগুলো। হঠাৎ বনের মধ্যে স্যাঁতসেতে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলাম ছোট একটা হরিণের বাচ্চা। শরতের ঝরা পাতার ওপর শুয়েছিলো হরিণশাবক।

পাতাগুলোর ছবি আমার মনে গেঁথে আছে; ছোট্ট হরিণ-বাচ্চাটির গায়ে লুটিয়েছিল সেই ঝরে পড়া পাতা। আমি ভেবেছিলাম হরিণশিশুটি ঘুমিয়ে আছে। নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়েছি আমি, গায়ে হাত বুলিয়ে সরিয়ে দিলাম ঝরে পড়া পাতা; কী চমৎকার মায়া। অথচ শিশুটি ঘুমাচ্ছিলো না; মারা গিয়েছিলো হরিণশাবক।’

এরপর ইয়স্তেনের বোধগত জগতের বিবর্তন ঘটে। ইয়স্তেন কোনোদিন এই অপ্রত্যাশিত যন্ত্রণার কথা মা-কে অথবা প্রিয়জনকে বলতে পারেননি। বরং তিনি, নিজেকে এবং নিজের ক্ষুদ্র জীবনকে আরও ব্যাপক প্রেক্ষিতে স্থাপন করে সান্ত¡নার আশ্রয় খোঁজার প্রয়াস পেয়েছিলেন। ‘নিজেকে এই বলে তুষ্ট করার অভ্যাস করেছিলেন যে, জীবনের মহা অভিযাত্রায় আমি একটা ক্ষুদ্র অংশ মাত্র; এমন কোনও কিছুর ক্ষণস্থায়ী অংশ বিশেষ যা আমার চেয়ে ঢের বিশাল এবং শক্তিশালী।’
ভালো দার্শনিক হওয়ার জন্যে প্রয়োজন বিস্মিত হবার ক্ষমতা। এই বিস্মিত হবার ক্ষমতা থেকে ভাষা-স্তরের অবচেতনে ঘটে যায় বিবর্তন; যে ঘটনাটি ঘটেছিল ইয়স্তেনের ক্ষেত্রে; যে ঘটনাটি ঘটেছিলো আমার ক্ষেত্রে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমানায়। প্রকৃত প্রস্তাবে, এই বিস্মিত হবার ক্ষমতা থেকেই জন্ম হয় কবিতার। ২০০৭ এ প্রকাশিত ‘কবিতাশিল্পের জটিলতা’ প্রবন্ধপুস্তকের ভ‚মিকায় বলেছিলাম, মানব-জগতের চেয়ে কবিতার জগৎ বিশাল এবং জটিল। এই জটিলতাকে যতোটা-না বিচার বিশ্লেষণ দিয়ে উপলব্ধি করা সম্ভব, তার চেয়েও অধিক উপলব্ধি সম্ভব সরাসরি কবিতার রস আহরণে। সুতরাং কবিতা-শৃঙ্গারের কোনো বিকল্প নেই। অথচ এই শৃঙ্গাররস উপলব্ধির ক্ষমতা সবার সমান নয়; অতএব কবিতা সবার কাছে সমান অর্থ নিয়ে উপস্থিত হয় না। কবিতা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে নিজেই সৃষ্টিশীল; সুতরাং কবিতার অর্থমাত্রা নির্দিষ্ট অর্থে স্থির অথবা সীমাবদ্ধ নয়। এ অর্থে একটি সফল কবিতা সৃষ্টি হয়ে ওঠার পর সেখানে কবির আর কোনো অংশগ্রহণ থাকে না; বরং কবিতা তখন নিজেই হয়ে ওঠে স্বয়ম্ভ‚ এবং তা সময়ের পরিবর্তনে নতুন ব্যাখ্যা দাবি করে। যদিও শেষাবধি কবিতার কোনো চ‚ড়ান্ত ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। আর এই ব্যাখ্যাতীত উপলব্ধির জগৎই আমার পরম অহম।

প্রকৃত প্রস্তাবে, সীমাবদ্ধ ভাষাশব্দের ব্যবহারকে অস্বীকার করে অজস্র অব্যবহৃত শব্দের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে দিতে গিয়ে যে নবতর উপমার জন্ম দেওয়া হয় তার মধ্য দিয়ে আমার ভাষাপ্রকাশ আমাকে আর সবার থেকে পৃথক করে ফেলে। এই পৃথকীকরণ প্রক্রিয়াই আমার পরম অহম। আর আমি এহেন পৃথকীকরণের সীমানায় হয়ে উঠি কবিমানব। চূড়ান্ত অর্থে একজন চূড়ান্ত সংবেদনশীল মানবীয় মানুষ; যে মানুষটি পরিচিত জগতের দৈনিকতার ভেতর হাজারটা চোখে দেখে ফেলে এমন সব দৃশ্যকল্প যা আর সবাই দেখলেও তা পক্ষান্তরে থেকে গিয়েছিলো আর সবার চোখের আড়ালে; অথবা এভাবে নতুন অর্থ ও বোধ নিয়ে প্রাত্যহিক বিষয়াদি এর আগে এতটা মহার্ঘ্য হয়ে ওঠার সুযোগ পায়নি; বরং তা সাধারণের কাছে পরিচিত বিষয়াদি হিসেবে আড়ালে থেকে গিয়েছে; অথচ কবির বোধে সেই প্রাত্যহিক সাধারণ হয়ে উঠতে পারে বহুমাত্রিক বোধের আধার।

অথচ তারপরও এই যে কবি, যিনি শেষাবধি একজন মানুষ; যে মানুষটির অবস্থান মহাজগতের এই সীমাহীন সময়ের ভেতর এক সামান্য বুদবুদ; কবিতা এই সামান্য বুদবুদের ভেতর প্রবেশ করিয়ে দেয় অসামান্য বোধ; যেমনটি করে থাকেন একজন পৌরাণিক ঈশ্বর; যিনি নিথর মাটির দেহে ফুৎকার দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দেন ‘আত্মা’; ঈশ্বর মানবদেহে ‘প্রাণ’ সঞ্চার করালেন; কবিতাপাঠের যোগ্যতা অর্জিত হলে ঈশ্বরের ফুৎকারের মতো মানববোধে এভাবেই প্রাণের সঞ্চার ঘটে; এবং প্রাণীজগতে একমাত্র মানবক‚লই তখন হয়ে ওঠে অনুভূতিপ্রবণ জীব; যদিও জীবজগত শুধুমাত্র যৌনতা দ্বারা বংশবিস্তার ঘটিয়ে থাকে; কিন্তু জীবজগতে শুধুমাত্র মানবক‚লই যৌনতার সাথে প্রেমকে সংযুক্ত করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করে; আর যৌনতার সাথে যখন সংযুক্ত হয় প্রেম, তখন মানবকুলের বংশবিস্তার নিশ্চিত হয়; শুধুমাত্র যৌনতা নয়, বরং প্রেম ও যৌনতা দ্বারা আমরা বংশবিস্তার ঘটাই; এই প্রেম ও যৌনতার নামই কবিতা।

প্রশ্ন উঠতে পারে রহস্যময়তার জগৎই কি কবিতার জগৎ? না-কি শিল্পীর নির্মাণ-দক্ষতার ওপরই কবিতার সাফল্য? না-কি উভয় বিষয় পরস্পর পরিপূরক? এক্ষেত্রে প্রকৃত কবিতার জগতে প্রবেশের ক্ষমতা বিষয়ে মালার্মে মনে করতেন, আবেগকে ঘনীভ‚ত ও পরিশুদ্ধ করে সমস্ত আলঙ্কারিকতা ত্যাগ করতে হবে। কবিতার রহস্যময়তা আর তার জাদুকরী প্রভাব বিষয়ে মালার্মে পাঠককে মনে করিয়ে দেন, আমরা যা-ই লিখি না কেনো তার শুরু আর শেষটা ছেঁটে ফেলতে হবে; কেননা যা কিছু বিশুদ্ধ অথবা বিশুদ্ধ থাকতে চায় তা সত্যিকার অর্থেই অর্থবোধক সীমাহীন রহস্যের অবগুণ্ঠনে আবৃত থাকে।

সুতরাং বিশুদ্ধ কবিতার সন্ধানে দৈনিকতার নগ্নতায় জড়িয়ে পড়লে তা আর কবিতা থাকে না; হয়ে ওঠে প্রাত্যহিক বাজারী বচন; যা আমরা হরহামেশা ছড়া অথবা অন্ত মিল-সমৃদ্ধ শব্দবুননের ভেতর দিয়ে সৃজন করে চলেছি। এবং তা মঞ্চায়নযোগ্য কথাশিল্পে উন্নীত করে হাততালির প্রত্যাশা করি। অথচ কবিতা কোনো উপস্থাপনযোগ্য শিল্প নয়; কবিতা আত্মবোধের ব্যক্তিক আহরণ। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, আত্মবোধের আহরণ হয়ে উঠলে সেই কবিতা কীভাবে যাপিত সময়ের সাথে মহার্ঘ্যতা অর্জন করে? হ্যাঁ, মহার্ঘ্যতা অর্জন করে এবং সেই মহার্ঘ্যতার করনকৌশল আবিষ্কার করা সম্ভব, যখন আমরা কিছুটা আত্মমগ্ন অথবা কিছুটা সচেষ্ট হই; তখন আমরা আমাদের প্রজ্ঞাপ্রাপ্তি চোখে দেখে ফেলি কবিতার সেই মহার্ঘ্য সত্তা, কবিতার ভেতরমহল। কিন্তু তারপরও আমি মনে করি কবিতার কোন ব্যাখ্যা হয় না বরং কবিতা এক রকম অনুভব মাত্র যাকে স্পর্শ করাই যথেষ্ঠ।

মানবচেতনা প্রকাশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও অভিজাত ভাষাপ্রকাশ কবিতা; যা মূলত অনুভবের মখমলে মোড়ানো থাকে। এবং এও ঠিক যে শুধুমাত্র শব্দার্থের জ্ঞানে কবিতাকে ছুঁয়ে দেয়ার চেষ্টা যথেষ্ঠ নয়; কেননা শব্দার্থের বাইরেও থাকে কবিতার গুপ্ত অর্থ। যার জন্য ভাস্কর চক্রবর্তী কবিতা বিষয়ে ভাবতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘কবিতা লেখার প্রথম থেকেই ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হতো, যে-কোনো লাইন থেকেই একটা কবিতা শুরু হতে পারে, আর যে-কোন লাইনেই শেষ হয়ে যেতে পারে সেই কবিতা। কবিতা হবে আপাত-সরল। হাজারমুখো। বিষয়ের কোন বাছবিচার থাকবে না। আর কবিতার একটা লাইন থেকে আরেক লাইনের দূরত্ব হবে কয়েকশো কিলোমিটার। কিন্তু অদৃশ্য একটা তলদেশে থাকবে মিলিমিটারের নিবিড় সম্পর্ক।’

শেয়ার করুন: