004637
Total Users : 4637
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

ইউটোপিয়া, আদর্শ রাষ্ট্র এবং প্লেটোর কবির নির্বাসন

যথার্থই প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রকে কল্প-রাষ্ট্র বা ইউটোপিয়া বলা যাবে কি-না তা নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক আছে। টমাস মুরের ইউটোপিয়ার কল্যাণে শব্দটি ব্যাপক পরিচিতি পেলেও প্লেটোর রিপাবলিক’কে কিছুতেই কাল্পনিক আখ্যান/ নাটক/ উপন্যাস বলা যাবে না। প্লেটো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ‘রিপাবলিক’ রচনা করেছিলেন, যার পেছনে অনেকগুলো সক্রিয় ইচ্ছা ছিল ক্রিয়াশিল। প্লেটোর বিশ্বাস এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা যাতে সমাজের অসাম্যগুলো অনেক অংশে কমে আসে। বিপর্যস্ত-বিশৃঙ্খল সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা-সুশাসন কায়েম করা। আদর্শ রাষ্ট্রের শাসনভার দার্শনিকের উপর অর্পণ করতে চেয়েছেন তিনি। তার বিবেচনায় দার্শনিক শাসক রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণ করলেই বিষয়গুলোর সমাধান আশা করা যায়, যাতে উন্নত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা সম্ভব। যে প্রেক্ষাপটে তিনি এই গ্রন্থ রচনা করেছিলেন তা বোঝা জরুরি। খ্রিস্টপূর্ব ৪৪০ থেকে ৪০০ পর্যন্ত এথেন্স এবং স্পার্টার মধ্যে যুদ্ধ চলেছিল। এই যুদ্ধ ইতিহাসে পিলোপনেশিয় যুদ্ধ নামে বিখ্যাত। এই যুদ্ধে এথেন্স স্পার্টার নিকট পরাজিত হয়। দাস এবং শ্রমজীবী মানুষের শোষণের ভিত্তিতে বৃহৎ সামুদ্রিক এবং উপদ্বিপিয় গ্রিক বসতি ও সাম্রাজ্যের নেতা হিসেবে এতোকাল এথেন্সের যে আর্থিক ও রাজনীতিক শৌর্যবির্য ছিল তা এই যুদ্ধে সংকটগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সমাজ ও রাষ্ট্রিয় জীবনে আইন, শৃঙ্খলা, শ্রদ্ধা, সম্মান, রাষ্ট্রিয় ভয়, দায়িত্ববোধ ইত্যাদির ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। গুপ্তহত্যা, বিদ্রোহ, ষড়যন্ত্র, দেশদ্রোহ, দলিয় প্রভুত্বের অদলবদল এথেন্সিয় রাষ্ট্র এবং সমাজের সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। পুরাতন প্রতিষ্ঠিত নীতি বর্তমানের অরাজকতায় বিপদগ্রস্ত হয়ে এথেন্স সর্বদিকে হীনশক্তি হয়ে পড়ে। প্লেটোর বিশ্বাস ছিল, সেই সমস্ত মৌলিক নীতিকে যুক্তির ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্রিয় জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই সমাজে আবার সুস্থতা ফিরিয়ে আনা যাবে। ন্যায়কে সমাজের সর্বক্ষেত্রে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যদিও ন্যায় সূ² ব্যাপার। চোখের শক্তি পরিক্ষার মতো ন্যায়কে বৃহৎ অবয়বে প্রত্যক্ষ করতে পারলে পরবর্তিকালে তাকে ব্যক্তির ক্ষুদ্র অবয়বে প্রত্যক্ষ করা সহজতর হবে। রাষ্ট্র ব্যক্তির চেয়ে বৃহৎ। রাষ্ট্র হচ্ছে ব্যক্তিরই বৃহদাকার সংগঠন। সুতরাং রাষ্ট্রের মধ্যে ন্যায়কে আবিষ্কার করতে সক্ষম হলে ব্যক্তির মধ্যে তাকে নির্দিষ্ট করা সহজে সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তব রাষ্ট্রে ন্যায় বিরল ব্যাপার। ন্যায়কে পাওয়া যাবে আদর্শ রাষ্ট্রে। এই সংকটগ্রস্ত সময়েই প্লেটোর গুরু সক্রেটিস অন্যায়ভাবে রাষ্ট্রিয় নিপিড়নের শিকারে পরিণত হন, তার নামে মিথ্যা মামলা সাজানো হয়। অভিযোগ করা হয় যে তিনি তরুণদের মনন কলুষিত করে তুলছেন তার ভ্রান্ত প্রচারণার দ্বারা এবং প্রচলিত দেবদেবিকে অস্বিকার করেন তিনি। বিচারে সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড হয়। প্লেটোর বয়স তখন আঠাশ। একদিকে রাজনৈতিক সংকট, গুরুর নির্মম হত্যাকাণ্ড, এথেন্সের সামাজিক বিপর্যয় রাষ্ট্র নিয়ে অন্যভাবে ভাবতে প্লেটোকে বাধ্য করে। যার ফলশ্র“তিতে তিনি রচনা করেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রিপাবলিক’।

প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে কতগুলো নীতির উপর। রাষ্ট্রে ন্যায়ের অবস্থান নিয়ে প্লেটো তার পথচলা শুরু করলেও শেষ করেছিলেন একটি আদর্শ রাষ্ট্রের কাঠামো, নীতি-আদর্শ, আইন-কানুন, শিক্ষা, বিবাহ-সন্তান ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দিয়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে রাষ্ট্রগঠনের জন্য প্লেটো পাঁচটি অর্থনীতিক শ্রেণির কথা বলেন: ১. উৎপাদক: কৃষক এবং কারিগর, ২. বণিক বা আমদানিকারক, ৩. নাবিক বা নৌযান মালিক, ৪. ব্যবসায়ি, ৫. শ্রমিক বা দৈহিক শ্রম ভাড়াদানকারি দিনমজুর। এর বাইরেও আরেকটি শ্রেণির কথা বলেন তিনি- রাষ্ট্রের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাবাহিনি। তবে দেখার বিষয় হলো কর্মনীতির ভিত্তিতে আদর্শ রাষ্ট্রের উপাদানগুলো তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ পালন করবে। শ্রমবিভাজনের যে ক্যাটাগরি তিনি নির্ধারণ করেন অর্থাৎ যোগ্য লোকের যোগ্য প্রতিস্থাপন সেভাবেই আদর্শ রাষ্ট্র কাঠামো কাজ করবে। যোগ্যতা অনুযায়ি নির্ধারিত একশ্রেণি অন্যশ্রেণির কাজ করতে পারবে না বা করবে না।

প্লেটো রাষ্ট্রগঠনে সামাজিক চুক্তিমূলক ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করছেন। তার মতে, কোনো কৃত্রিম চুক্তির ফলে রাষ্ট্র উদ্ভূত হয়েছে, কাজেই রাষ্ট্র প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক সংগঠন নয়, একথা ঠিক নয়। কিংবা রাষ্ট্র মানুষের আদিকালের যদৃচ্ছা চলার অবস্থাকে বিনষ্ট করে দিয়েছে এরূপ ধারণাও ঠিক নয়। মানুষ স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা হিসেবে জন্মগ্রহণ করে না। রাষ্ট্র হচ্ছে একটি পরস্পর নির্ভরশিল সংগঠন। মানুষের স্বভাব এবং প্রয়োজন থেকেই রাষ্ট্রের উৎপত্তি। এর সাথে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তকদের দ্বিমত করার সুযোগ আছে। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তকগণ মনে করেন রাষ্ট্র আসলে সামাজিক চুক্তিরই ফসল। এখানে বসবাসকারি প্রত্যেকে তার নিজের কিছু কিছু অধিকার খর্ব করে অর্থাৎ কিছু আইনকানুনের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে থাকে এবং যা মেনে চলতে সে বাধ্য থাকে। এই স্বেচ্ছা-অধিকার ছেড়ে দেবার ফলেই একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র সুচারুভাবে কর্ম সম্পাদন করতে পারে। ইউটোপিয়া বা কাল্পনিক চিন্তা দ্বারা চালিত হলে প্লেটো এতো পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনায় যেতেন না, দরদ ও সদিচ্ছা রিপাবলিকের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে। এমনকি প্লেটো রাষ্ট্রে নাগরিকদের খাদ্য, পানিয়, বাসস্থান কিরূপ হবে তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বলেছেন রাষ্ট্র এই নাগরিকদের জন্য খাদ্য, পানিয়, বস্ত্র, পাদুকা এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে। গম এবং বার্লির ময়দা হবে তাদের প্রধান খাদ্য। এ দিয়ে তারা বিভিন্ন প্রকার খাদ্যবস্তু প্রস্তুত করবে। পরিচ্ছন্ন পত্রই তাদের খাদ্যদ্রব্য পরিবেশনের পাত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে। মোটকথা এটি একটি সরল সমস্যাহীন রাষ্ট্র। সর্বকালের ও দেশের সমস্যাদির্ণ মানুষই এরূপ অতীতকালের সরল সমস্যাহীন জীবনের কল্পনা করে। কিন্তু বহু পর্যায়ের মাধ্যমে উত্তির্ণ এবং বিকশিত জটিল সমাজ ও রাষ্ট্রিয় সংগঠনে সংগঠিত সমস্যাদির্ণ মানুষের পক্ষে কি সেই সরল প্রকৃতির জীবনে প্রত্যাবর্তন সম্ভব? প্রশ্ন উঠতে পারে। আধুনিক পুঁজি ও ভোগবাদি সমাজে বেড়ে ওঠা মনন হয়তো প্লেটোর এইরূপ জীবনযাত্রায় আস্থা আনতে পারবে না, পারবে না এইরূপ জীবনযাত্রা মেনে নিতে। তারপরও প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের আজকের আধুনিক সমস্যাসংকুল জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে একটি সাম্যবাদি সমাজের যে চিত্র প্লেটো আঁকতে চেয়েছেন তা অবশ্যই বিস্ময়ের বিস্ময় স্বিকার করতেই হবে। তিনি পারিবারিক জীবন তুলে সামষ্টিক পারিবারিক জীবনের কল্পনা করেন। যৌথতায় যা সমাধা হবে। সমাজে ছেলে বা মেয়ের একক পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব থাকবে না, প্রচলিত বিবাহ বলে কিছু থাকবে না। যোগ্যতা এবং সন্তান উৎপাদনের প্রয়োজনে যৌনমিলন সম্পন্ন হবে। শিক্ষার অনেকগুলো স্তর অতিক্রম করার পরই একজন দার্শনিক হিসেবে গণ্য হবেন। এবং তিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসিন হবার যোগ্যতা অর্জন করবেন। এহেন যে আদর্শ রাষ্ট্র সেখানে কবি-শিল্পিদের অবস্থান কি হবে? এ নিয়ে প্লেটো রিপাবলিকের শুরু থেকেই সচেতন ছিলেন। অনেক জায়গায় মন্তব্য পেশ করেছেন। আর যা তিনি রাখঢাক না করেই বলেছেন তাহলো কবিদের আদর্শ রাষ্ট্র থেকে দিতে হবে নির্বাসন। প্লেটোর কবিদের উপর এই উষ্মার কারণ কি? রিপাবলিকের ছত্রে ছত্রে লুকিয়ে রয়েছে কাব্যিকতা, সৌন্দর্য, সর্বোপরি কবিতা। যৌবনে কবিতা লিখতেন প্লেটো। প্রশ্ন প্লেটো কি তার আদর্শ রাষ্ট্রে মুক্তবুদ্ধির কোনো লোক রাখতে চাননি, যারা তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। ধরতে পারেন খুঁত, প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে পারেন। অনেকটা যান্ত্রিক মানুষ চেয়েছেন প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানে।

‘হ্যাঁ, একথা আমার স্মরণ আছে সক্রেটিস।
কিন্তু যুদ্ধ কি একটি শিল্পকর্ম নয়?
যুদ্ধ অবশ্যই একটি শিল্পকর্ম।
পাদুকা তৈরিতে যে অধ্যবসায়ের আবশ্যক, যুদ্ধ করতেও সেই অধ্যবসায়ের আবশ্যক।
একথা সত্য।
অথচ পাদুকা প্রস্তুতকারককে একই সঙ্গে আমরা জমিকর্ষণকারি কিংবা বস্ত্রবয়নকারি অথবা গৃহনির্মাণকারি বলে স্বিকার করিনি। কারণ, আমরা চেয়েছি পাদুকাশিল্পি উত্তমরূপে আমাদের পাদুকাই প্রস্তুত করবে। এজন্য প্রকৃতিগতভাবে যে ব্যক্তি যে কাজের উপযুক্ত আমরা তার উপর কেবলমাত্র সেই কাজের দায়িত্ব ন্যস্ত করেছি, অপর কাজের নয়। যার উপর যে দায়িত্ব ন্যস্ত সে জীবনব্যাপি সে দায়িত্বই পালন করবে, অপর কোনো দায়িত্ব নয়। তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের কোনো সুযোগকেই সে উপেক্ষা করবে না। আর এই একাগ্র সাধনাতেই সে উত্তম শিল্পি হিসেবে উত্তির্ণ হবে।’ যোগ্য লোকের যোগ্য জায়গায় কর্মসম্পাদনের এই অভিপ্রায় স্বিকার করে নিলেও যুদ্ধকে কোনোভাবেই শিল্পকর্ম হিসেবে মেনে নেয়া যায় না। পাদুকা প্রস্তুতকারি যে জমিকর্ষণে নিযুক্ত হতে পারবেন না এমন সিদ্ধান্ত আধুনিক রাষ্ট্র কারো উপর চাপিয়ে দিতে পারে না। তবে অন্যভাবে বিষয়টিকে যদি বিবেচনায় নেয়া যায় আর তাহলো নিজের আয়ত্তের বাইরে কাউকে কথা বলার অধিকার না দেয়া প্রসঙ্গে। অর্থনীতির উপর যিনি পারদর্শিতা অর্জন করেছেন তিনি চিকিৎসাবিদ্যার উপর কথা না বললেই ভালো হয়। আমাদের এখানে দেখা যায় প্রায়শই চিকিৎসাবিজ্ঞানি খনিজসম্পদ নিয়ে কথা বলেন কোনো ধরনের যোগ্যতা দক্ষতা অর্জন ব্যতিরেকেই।

‘আমি বলছি কবিকুলের কথা আর সেই কবিকুলশ্রেষ্ঠ হোমার এবং হিসিয়ডের বর্ণিত কাহিনির কথা। হোমার আর হিসিয়ড যে মানবজাতির কাহিনিকারদের শ্রেষ্ঠ, একথা তো আমরা জানি।
কিন্তু তাদের কোন গল্পের কথা তুমি বলছো আর সে গল্পের ত্র“টিই-বা কি?
তাদের গুরুতর ত্র“টি হচ্ছে এই যে, তাদের ভাষণ মিথ্যা আর কেবল মিথ্যাই নয়, নিকৃষ্ট প্রকারের মিথ্যা।
কিন্তু কখন তারা এরূপ ত্র“টির প্রশ্রয় দিয়েছে বলে তুমি মনে করো?
কেন? যখনই তারা দেবতাদের আর কাহিনির নায়কদের কথা বর্ণনা করেছে তখনই তারা এই মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেছে। তাদের এ-ত্রটি তুমি শিল্পির অলিক চিত্রের সঙ্গে তুলনা করতে পারো। শিল্পি যখন মূল বস্তুর সঙ্গে বিন্দুমাত্র সাদৃশ্য ব্যতিরেকে তার চিত্র অঙ্কিত করে তখন সে যেমন এক মিথ্যার সৃষ্টি করে, এই কবির দলও তেমনি তাদের কাহিনিতে এক অলিক জগৎ তৈরি করে।’ রিপাবলিকের পাতায় পাতায় এমনতরো উক্তির কমতি নেই।

‘তখন কবিদের আমরা স্তব্ধ হতে বলবো। আমরা বলবো, তোমাদের বিষাদাত্মক বা অপর কোনো কাব্যরীতিতেই প্রটিউস এবং থেটিসকে অপপ্রচারিত করতে পার না। … তোমাদের এমনিধারা মিথ্যার এবার শেষ হোক।’
‘আমরা বলবো কবিকে: আপনি যদি অঙ্কিত করেন দেবতাদের চিত্র, তবে দোহাই আপনার, আপনার কলমের মুখে আমাদের দেবাদিদেবকে যেন বলতে না হয়:
‘হায়বে কপাল! আমার নিজের চোখে দেখতে হচ্ছে, আমার প্রিয় সুহৃদ পশ্চাদ্ধাবিত হচ্ছেন নগরের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে আর আমার হৃদয় ভরে উঠছে বেদনায়!’

‘কারণ আমাদের বলতেই হবে যে, কবি এবং কাহিনিকার-এরা সাধারণ মানুষ সম্পর্কে যখন বলেন যে, জগতে যারা অন্যায়কারি তারাই সুখি এবং যারা উত্তম তারা অসুখি এবং অসহায়; যখন তারা বলেন, অন্যায়কর্ম ধরা না পড়লে লাভজনক এবং ন্যায় ধর্ম একের লোকসান আর অপরের লাভ ছাড়া কিছু নয়, তখন তারা মারাত্মক রকমের মিথ্যাচারে লিপ্ত হন। এরূপ মিথ্যাভাষণকে কবি এবং কাহিনিকারদের জন্য অবশ্যই নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করতে হবে। এর বিপরিতধর্মি কাব্য এবং কাহিনি রচনার জন্য তারা আদিষ্ট হবেন। এ ব্যাপারে তোমার কি মনে হয়?
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন: অবশ্যই কবি এবং কাহিনিকারদের উপর এরূপ আদেশই আমরা জারি করবো।’

‘আর এ কারণেই অন্য কোনো রাষ্ট্রে না হলেও আমাদের রাষ্ট্রে জুতা তৈরিকারক জুতা তৈরিকারকই হবে, সে নৌচালক হবে না, কৃষক কৃষকই হবে, একই সঙ্গে সে বিচারক হবে না, এবং যে সৈনিক সে সৈনিকই হবে, একই সঙ্গে সে বণিক হবে না। কর্মের অপর সবক্ষেত্রে এই একই কথা।
অ্যাডিম্যান্টাস বললেন: যথার্থ।

কাজেই সবকিছুর অনুকরণে দক্ষ এই যে মূকাভিনেতাগণ-তাদের কেউ যদি আমাদের রাষ্ট্রে আসেন এবং প্রস্তাব দেন যে আমাদের রাষ্ট্রের মধ্যে তিনি তার কাব্য-শক্তি এবং অভিনয়শক্তি প্রদর্শন করবেন তা হলে আমরা নতজানু হয়ে তাকে মধুর এবং পবিত্র এবং বিস্ময়কর বলে প্রশংসা করবো, কিন্তু সেই সঙ্গে তাকে আমরা জানিয়ে দেবো যে আমাদের রাষ্ট্রে তার মতো ব্যক্তির কোনো স্থান নেই। আমাদের আইন তার এরূপ গুণ প্রদর্শনের অনুমতিদানে অক্ষম। আর তাই সুগন্ধি নির্যাসে তাঁকে যখন আমরা লিপ্ত করেছি, তার মস্তকোপরি পশমের মাল্য স্থাপন যখন আমাদের সম্পন্ন হয়েছে, তখন ভিন্নতর একটি রাষ্ট্রে আমরা তাকে প্রেরণ করে দেবো। কারণ আমাদের আত্মার স্বাস্থ্যের জন্য আমাদের প্রয়োজন কাঠিন্যের, আমাদের প্রয়োজন কঠিন এবং দৃঢ়তম এমন কবি এবং কাহিনিকারের যারা কেবলমাত্র ন্যায়বানের রীতি অনুকরণ করবেন এবং আমাদের দেশরক্ষা বাহিনির শিক্ষার জন্য যে আদর্শ আমরা প্রণয়ন করেছি কেবল সেই আদর্শকে অনুসরণ করবেন।’

‘তা হলে আমাদের রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সিমা কি হবে? আমাদের কবিদের বলবো, তারা তাদের সৃষ্টিতে উত্তমের ছবি তুলে ধরবেন। এর অন্যথা হলে আমাদের রাষ্ট্র থেকে তাদের বহিষ্কৃত হতে হবে। কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণ কেবল কি কবিতে সিমাবদ্ধ থাকবে? অথবা ভাস্কর্য, নির্মাণ কিংবা সৃজনশিল অপর সকল শিল্পক্ষেত্রের শিল্পিকেও আমরা বলবো, তারাও তাদের সৃষ্টিতে অধর্ম, অন্যায়, অধৈর্য, হীনতা এবং অসুন্দর কোনো ভাবের প্রকাশ ঘটাতে পারবে না। এবং কেউ যদি এই নির্দেশ অনুসরণ করতে না পারেন তাহলে তার শিল্পচর্চাকেও নিষিদ্ধ করা হবে। না হলে তার শিল্পকর্মের প্রভাবে আমাদের নাগরিকদের মন কলুষিত হয়ে যাবে। কেননা আমাদের রাষ্ট্রের শাসককুলকে আমরা নৈতিক বিকারের মধ্যে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে দিতে পারিনে। তেমন হলে বিষাক্ত এঁদো চারণভূমিতে চরে বিষাক্ত লতাগুল্ম ভক্ষণ করার ন্যায় দিনে দিনে নিঃশব্দে বিন্দু বিন্দু করে বিকারের ঘায়ে তাদের আত্মা বিষাক্ত হয়ে উঠবে। কাজেই আমাদের শিল্পি হবে তারা যারা সৌন্দর্য এবং কমনিয়তার যথার্থ প্রকৃতিকে অনুধাবন করতে সক্ষম।’

মোদ্দাকথা প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র হলো এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে বিরুদ্ধ বিপক্ষিয় মতকে স্বিকার করে না। যেখানে কঠোর হস্তে বিরুদ্ধ মতকে অংকুরে বিনাশ করার ব্যবস্থা রাখা হয়। কবি-শিল্পিদের নির্বাসনের মাধ্যমে সেটিকেই রাষ্ট্রে আরো একবার প্রতিষ্ঠা করলেন; তিনি শিল্পির স্বাধিনতায় হস্তক্ষেপ করে শিল্পের সিমানা বেঁধে দিয়েছেন। স্পষ্ট করে বলবার চেষ্টা করেছেন তারা কি কি বিষয়ে কথা বলতে পারবেন, কি কি বিষয়ে কথা বলতে পারবেন না। রাষ্ট্রের বিপক্ষে কথা বলার সমস্ত সুযোগ রহিত করে দেয়া হয়েছে সেখানে। যতো আদর্শের কথাই বলুক নানাদিক বিবেচনায় প্লেটোর এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে কিছুতেই সমর্থন করা যায় না যেখানে শিল্পির কোনো স্বাধিনতা থাকবে না। সম্ভবত প্লেটো-পরবর্তি অনেক রাষ্ট্রচিন্তক নেতিবাচক এই দিকগুলো তাদের চিন্তায় অন্তর্ভুক্ত করেন, রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তায় স্বৈরতান্ত্রিক অনেক ঘটনাবলির জন্য তাকে দায়ি করা যায়।

শেয়ার করুন: