004588
Total Users : 4588
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

ইতিহাস, ঈশ্বরের মতো, এগিয়ে যায় রহস্যময় পথে

মূল লেখক: এনগুগি ওয়া থিয়োঙ’ও

আফ্রিকার বিখ্যাত উপন্যাসিকদের অন্যতম, এনগুগি ওয়া থিয়োঙ’ও, তার সর্বশেষ উপন্যাস, Wizard of the Crow এবং বর্তমান আফ্রিকা মহাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন কেন্ ওলেন্ডের সাথে।

Wizard of the Crow হল নয়া-উপনিবেশবাদকে নিয়ে এক মহাকাব্যিক স্যাটায়ার। উপন্যাসের অবস্থান একটি কাল্পনিক দেশ আবুরিরিয়া’য়- পরাবাস্তবিকভাবে কল্পিত এক কেনিয়া, যার শাসক একজন স্বৈরাচারি, একনায়ক, পুরো উপন্যাসে তাকে ডাকা হয় রুলার (Ruler) নামে।

তার তিনজন চাটুকার মন্ত্রি প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে নিজেদের চোখ, কান এবং জিহ্বা অস্বাভাবিকরকম বড় করে নিয়েছে, আরো ভালভাবে দেখতে, শুনতে এবং বিতর্ক করতে। তার জন্মদিন উপলক্ষে তাদের একজন তাকে পরামর্শ দিল এত বড় একটা টাওয়ার বানাতে যাতে করে রুলার ঈশ্বরের কাছে আসা-যাওয়া করতে পারে-আর এভাবেই স্বর্গ-যাত্রা কর্মসূচির জন্ম হল।

আবুরিরিয়ান সরকার এই স্বর্গযাত্রা কর্মসূচিতে অর্থ যোগান দেয়ার জন্য গ্লোবাল ব্যাংককে ঋণদানের ব্যাপারে বুঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু বাঁধা এল এই কাজে গরিবদের সংগঠনগুলো থেকে এবং বিশেষভাবে মহিলাদের একটি  জঙ্গিদলের পক্ষ থেকে-যারা ব্যাংকের একগুঁয়েমি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একাট্টা হল।

‘একটা বিশেষ পন্থায় পশ্চিমা বিশ্ব বুঝানোর চেষ্টা করে যে, দুর্নীতি, চাহিদা, অনাহার এই বিষয়গুলো হল একান্ত আফ্রিকান-এমন কিছু যা আফ্রিকানদের জৈবিক চরিত্রের সাথে যায়’ এনগুগি বললেন।

‘চলমান ঘটনাপ্রবাহসমূহের ব্যাপারে তারা তাদের হাত এমনভাবেই ধুয়ে ফেলে যে, যেন এই দুর্নীতি, নির্বিচার, পশ্চাদপদতার ব্যাপারে তাদের কিছুই করার ছিল না। এইসব উপনিবেশিক বিকৃতিগুলো নিয়েই আমার কাজ। প্রচুর উপাদান ছড়িয়ে আছে যেগুলো নিতান্তই দেশজ, আবার তারা একই সাথে বহিরাগতও। আপনি একটাকে ছাড়া অন্যটাকে বুঝতেও পারবেন না। সমিকরণের সবগুলো উপাদান থেকে একটিকে বাদ দেয়ার একটা প্রবণতা প্রচলিত আছে। অথচ সমস্ত উপাদান ছাড়া কোন সমিকরণই প্রকৃতপক্ষে সমিকরণ হতে পারে না।’

একজন উপন্যাসিক হিসেবে, এনগুগি বলেন, তিনি ‘ধাপ্পাবাজি’ প্রথার দ্বারা বেশি মাত্রায় প্রভাবিত। ‘ধাপ্পাবাজ ধরনের চরিত্রগুলো পৃথিবীর সব জায়গার গল্পগুলোতেই দেখা যায়’, তিনি ব্যাখ্যা করে বুঝাতে চেষ্টা করলেন। ‘পশ্চিম আফ্রিকায় তাহল ‘অ্যানানসি’ নামের একটা মাকড়সা। আর অন্যান্য জায়গায় সেটা হচ্ছে খরগোশ অথবা কচ্ছপ।’

‘এইসব ধাপ্পাবাজ চরিত্রটি বেশ আগ্রহ জাগানিয়া কারণ সে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশিল। সে সবসময় একটা শব্দ অথবা বর্ণনা অথবা কোন ঘটনার সুস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করে। সে প্রতি মুহূর্তে নিজেকে আবিষ্কার এবং পুনঃবিষ্কার করতে থাকে। কে শক্তিশালি আর কে দুর্বল, বিরাজমান এই প্রজ্ঞাকে সে চ্যালেঞ্জ জানায়।’

উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হচ্ছে দরিদ্র হয়ে যাওয়া ‘কামিতি’, যে ঘটনাচক্রে একজন শক্তিশালি জাদুকর হিসেবে সুনাম অর্জন করে এবং বিখ্যাত হয়ে উঠে ভয়ঙ্করভাবে ক্ষমতাশালি ডরুধৎফ ড়ভ ঃযব ঈৎড়ি হিসেবে।

এক প্রগতিশিল রাজনৈতিক কর্মি এবং নারিবাদি, ‘নিয়াভিরা’র সাথে কাজ করতে করতে সে তার এই কুখ্যাতি ব্যবহার করে গরিবদেরকে সাহায্য করতে আর ধনিদের প্রতারিত করতে, তার যাদুর আয়না দিয়ে তাদের নানা ধরনের অসুস্থতা আংশিক সারিয়ে তোলার মাধ্যমে।

সবচেয়ে দুর্বলকারি অসুখ হল, ডযরঃবধপযব (সাদাশূল) নিজেকে সাদা করে তোলার এক অক্ষমকারি বাসনা। রুলারের বেলায়ও একই ধরনের সমস্যা হল অতিরিক্ত ফুলানো বেলুনের মতো তার স্ফীত হয়ে ওঠা।

আমি এনগুগি’র কাছে জানতে চাইলাম যে, সে কি মনে করে-প্রেম, ঘৃণা এবং হিংসার এই মিশ্রণ যা থেকে এই ডযরঃবধপযব-এর সৃষ্টি, পশ্চিমের লোকেরা তা আদৌ বুঝবে? তিনি বললেন, ‘আপনাকে মনস্তাত্তি¡ক অবস্থান থেকে উপনিবেশবাদের দিকে দেখতে হবে। এছাড়া আর যা কিছু সে করেছে, অর্থনৈতিক অথবা রাজনৈতিক, সেগুলো এখানকার মননের সাথে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে।

একটা দীর্ঘ সময় ধরে প্রাক্তন ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর বুর্জোয়াশ্রেণি পশ্চিমের বুর্জোয়াশ্রেণির প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিরাজমান ছিল। বাস্তবের সাথে তা সাযুজ্যপূর্ণ নাও হতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বুর্জোয়াদের একটা প্রতিচ্ছবি তাদের ছিল এবং তারা সবসময়ই স্বীকৃতির অন্বেষণে থাকত। কিন্তু একই সময়ে তারা দাবি করত যে, আমরা আলাদা।

কেনিয়ার রাজধানি নাইরোবিতে,-নরফোক হোটেল, মালয় ক্লাব এবং উপনিবেশ আমলের পুরোনো যে সব ক্লাব এখনো সচল-সে সব জায়গাতে এই পরিস্থিতি এখনো দৃশ্যমান। তাদেরকে অবশ্যই বলতে হয়, আমরা হচ্ছি উত্তরাধিকারি-কিন্তু একই সাথে তাদের এও বলতে হয়, ‘আমরা এটা জয় করে এনেছি’।

মূল চরিত্রদ্বয়, শাসকবিরোধি ক্ষুদ্র দল, কামিতি এবং নিয়াভিরা, হল ঐতিহ্যিক চরিত্র যারা অনেকগুলো বিষয়ের প্রতিনিধিত্ব করে। ‘কামিতি শব্দের অর্থ হল ‘বৃক্ষওয়ালা’, এনগুগি ব্যাখ্যা করে বুঝালেন, ‘ইংরেজিতে আপনি তাকে ডাকতে পারেন মি. উড্স্ হিসেবে (Woods মানে জঙ্গল)। নিয়াভিরা মানে হল ‘কাজওয়ালা মেয়ে’। সে একজন কর্মি। এ দু’টি আসলেই সাধারণত নাম হিসেবেই ব্যবহৃত হয়।

শ্রেণি বা সমাজচেতনা এবং জাতিয় চেতনার মধ্যে দ্বন্দ্ব, যা নিজেও হতে পারে এক ধরনের কৃষ্ণাঙ্গ বা সামাজিক চেতনা, তাও আকর্ষণিয়। বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধের একটা মিলনস্থলও আছে এখানে, কিন্তু প্রায়শই এরা নিজ নিজ জায়গা থেকে বিচ্যুত আর তা আমাকে সবসময়ই আকর্ষণ করে।’

উপন্যাসটি মূলত লেখা হয়েছে গিকুয়ু ভাষায়, কিকুয়ু সমপ্রদায়ের ভাষা, যে ভাষা এনগুগির নিজের মাতৃভাষা।

তিনি নিজের মতো করেই এর ইংরেজি অনুবাদ খাড়া করেছেন। তিনি প্রধানত লেখেন কেনিয়ার পাঠকদের জন্য, তাই আমার জন্য এটা বিস্ময়ের ছিল যে, কিভাবে মানুষ এটা গ্রহণ করেছে, যেহেতু এটা লেখা হয়েছে গিকুয়ু ভাষায়।

‘এই কেনিয়ায়, এখানে গিকুয়ু ভাষায় কোন সংবাদপত্র নেই। তাই এই উপন্যাসের ব্যাপারে কোন সমালোচনা পাওয়া যায় না। যা আপনি পাবেন, তা মৌখিক সমালোচনা, মুখের ভাষায়। আপনি এটা পড়বেন এবং অপরকে বলবেন। আর এভাবেই মুখের ভাষা অনেক ভাল কাজ করে, এমনকি সংবাদপত্রের কোন প্রকার সাহায্য ছাড়াই।’

বইটির বিচিত্র প্রকৃতির কথা উল্লেখ করে আমি অন্যান্য লেখকদের প্রভাব সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, যেমন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। ‘এ জায়গায় আমি মার্কেজকে একজন সুদক্ষ শিল্পি বলেই বিবেচনা করি। কিন্তু আমি অনেক বেশি প্রভাবিত হয়েছি আফ্রিকার বাচনিক ঐতিহ্য এবং লোককথার মাধ্যমে।

আফ্রিকার মুখে মুখে প্রচলিত গল্পগুলো যাদুকে গ্রহণ করে জীবনঘনিষ্ট একটি উপাদান হিসেবে, যার মূলকথা হচ্ছে-বাস্তবতা হচ্ছে অনেক বেশি যাদুময়। প্রকৃতি এবং মানুষের সমাজে পরিবর্তন হল স্বভাবসিদ্ধ ব্যাপার-প্রকৃতপক্ষে পরিবর্তন হল এক প্রকারের যাদু।

আমি মুগ্ধ হয়েছি এই দেখে, কিভাবে একটা গল্প বর্ণনা এবং পুনঃবর্ণনার মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হয়ে যায়, অনেক বেশি বৈচিত্রময় হয়ে উঠে এবং নানা ধরনের পর্যবেক্ষণ এবং সংশোধনের মাধ্যমে ঋদ্ধ হয়। এই কারণে প্রাচিন আফ্রিকা, ইউরোপ অথবা এশিয়ার কিছু গল্প এখনো টিকে আছে তাদের সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে-তারা হল একের উপর এক বারংবার সামষ্টিক সম্পাদনার ফসল।’

পুরো উপন্যাসটি প্রবাদ আর গানের উদ্ধৃতি দিয়ে পূর্ণ যেসবের অর্থ বদলে যায় এবং অনেক সময় পরস্পরবিরোধি। ‘যেকোন প্রবাদের বেলায় কিভাবে তা গ্রহণ করা হল সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার’, এনগুগি বললেন। ‘কিছু কিছু মানুষ প্রবাদের ভাবকেই দুর্বল করে দেয়, আর কেউ কেউ একেবারে উল্টে দেয়-তাই আপনি দেখবেন বর্ণনার ভেতর প্রবাদগুলো একটা আরেকটার বিপরিত কথা বলছে।’

উপন্যাসে পাশ্চাত্যের অনেক দার্শনিকের সূত্রও টানা হয়েছে রেনে দেকার্ত থেকে কার্ল মার্কস এবং জাঁ পল সার্ত্রে পর্যন্ত। একাধিক স্থানে, তাদের যুক্তিগুলো একেবারেই পাল্টে গেছে অথবা সেগুলোর ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে, বিশেষত শাসক পক্ষের দ্বারা।

‘আমাদের রাষ্ট্রিয় ঘোষণাসমূহের দিকে নজর দিলে আমাদেরকে সংশয়বাদি হয়ে যেতে হয়।’ এনগুগি বোঝাতে চেষ্টা করলেন। ‘আর তাই আমি দেকার্তকে উপস্থিত করেছি-সঠিকভাবে আবার ভুলভাবেও। দেকার্ত নিজে সংশয়ে ছিলেন রক্ষণশিল হবেন না-কি বিপ্লবি। তিনি হলেন পরস্পর বিপরিত মানসিকতার এক দ্বৈত চরিত্র। ভাষার দ্বি-প্রান্তিকতা এবং বাস্তবতার দ্বি-প্রান্তিকতা সেখানে সবসময়ই উপস্থিত। এটা সত্তার অস্তিত্বকে প্রশ্ন করে। ‘আমি প্রশ্ন করি তাই আমি অস্তিত্বশিল’ দেকার্ত সম্ভবত এভাবেই বলেছেন।

এই বইয়ে প্রচুর হাস্যরসের উপস্থিতি রয়েছে, এবং এটা তার তাচ্ছিল্য দেখানোর জন্য বালতি বালতি মনুষ্য-বিষ্ঠা শাসক শ্রেণির দিকে ব্যবহার করতে দ্বিধা প্রদর্শন করেনি। এনগুগি বুঝানোর চেষ্টা করলেন, ‘যাকে আমি নয়া-উপনিবেশবাদি রক্তচোষাদের বিকৃতি বলে ভেবেছি, তা সংজ্ঞায়িত করতে এটা অনেকবেশি স্বাস্থ্যকর হবে বলে আমি মনে করেছি। নৈতিক অবক্ষয় যা এ ধরনের সমাজের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি মনে করি এসব ‘Scatological’ হাস্যরস (এক ধরনের স্থূল হাস্যরস যা মলমূত্র, বমি, ময়লা-আবর্জনা ইত্যাদির সাথে সম্পর্কিত) এই নৈতিক অবক্ষয়কে আয়ত্ব করে। আপনি অবশ্যই চাইবেন না যে, মানুষকে এই নৈতিক অবক্ষয়ের দুর্গন্ধে একেবারে নিমজ্জিত করে দিতে। তাই সত্যিকারের বিভীষিকাকে সবসময় দেখানো ছাড়াই তা বুঝানোর জন্য এখানে আমি একটা পথ বেছে নিয়েছি। এর সাথে মিলিয়ে চলার জন্য এ ধরনের ভাষা পাঠকের জন্য একটা উপায় হিসেবে কাজ করে।’

 

‘সংখ্যাগুরু জনগণের কাছ থেকে আমরা জ্ঞান গোপন করে রাখি’

এনগুগি বেড়ে উঠেছেন কেনিয়ায় ‘মাউ মাউ যুদ্ধ’ (১৯৫০-এর দশকে) চলাকালিন সময়ে, যখন বিদ্রোহিরা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। তার বড় ভাই বনাঞ্চলের প্রতিরোধে যোগ দিয়েছিলেন।

এনগুগি এতে খুশি হয়েছিলেন যে, অবশেষে পশ্চিমা জনগণ শুনতে পেরেছে বহিরাগত বসতিস্থাপনকারি আর ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনির দ্বারা সংঘটিত দীর্ঘ সময়ের লুকানো অপরাধসমূহের কথা, ক্যারোলিন এলকিন্সের Britain’s Gulag এবং ডেভিড এন্ডারসনের Histories of the Hanged এর মতো বইগুলো থেকে।

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘসময় ধরে এইসব অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলার ব্যাপারে সাহিত্যে আমি ছিলাম নিঃসঙ্গ একক কণ্ঠস্বর’।

১৯৬০-এর দিকে আমি ছিলাম উগান্ডার ম্যাকেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র।

তখন আন্তঃকলেজ নাটক প্রতিযোগিতা হত এবং আমি এক দৃশ্যের একটা নাটক লিখেছিলাম যা কেনিয়ার মাউ মাউ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা। সেখানে, জনৈক মাউ মাউ বন্দি বাড়ি ফিরে আসে এবং এসে দেখে যে তার স্ত্রী একজন সাদা ঔপনিবেশিক অফিসার কর্তৃক ধর্ষিতা হয়েছে।

যদিও কোনভাবে নাটকটা শেষ হয়েছিল, বিচারকরা, যারা ছিল সব ব্রিটিশ শিক্ষক, বলেছিলেন যে, ওটা অতিরঞ্জিত হয়েছিল। তারা আমাকে বলেছিল, একজন ব্রিটিশ অফিসার কখনোই তা করতে পারে না।

সাধারণত যে নাটকটা প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়, সেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উগান্ডা ন্যাশনাল থিয়েটার-এ ব্রিটিশ কাউন্সিল আয়োজিত নাটক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে যায়। কিন্তু আমার নাটকটি সেখান থেকে চুইয়ে পড়ে যায়-ওটা আর কখনোই প্রদর্শিত হয়নি।

একটা মিথ প্রচলিত ছিল এখানে-কেনিয়ায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা কিভাবে আপন কর্ম সম্পাদন করে গিয়েছিল এবং তা বিশ্বাসও করা হত। আমি খুব আনন্দিত যে, সে সত্যটি এখন আলোচিত হচ্ছে, সেই সত্য যা আমাদের কিছু লোক অনেক দিন যাবৎ আলোচনা করে আসছিল এবং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার মাধ্যমে তা ফিরে আসছে।

১৯৬৭ সালের দিকে এনগুগি নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে বক্তৃতা রাখছিলেন এবং এটাকে একটা সাহিত্য বিভাগ হিসেবে রূপান্তর করার ব্যাপারে জোর দিচ্ছিলেন যা শুধুমাত্র ইংরেজি সাহিত্যের ভেতরই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং আফ্রিকার নতুন সাহিত্য এবং বিশ্বসাহিত্যকেও তার আওতায় নিয়ে আসবে।

তিনি এই নতুন ধারার সাহিত্যের প্রবল গুরুত্বের ব্যাপারে কথা বলেন। এখানে প্রকৃতই একটা উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছিল। আর তা ছড়িয়ে গিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে। সম্ভাবনাময়তায় তা ছিল টইটম্বুর।

যদিও খুব শিঘ্রই আমিও এর ভাল সমালোচক হয়ে গিয়েছিলাম কারণ আমরা ইংরেজি আর ফরাসি ভাষাকে বেছে নিয়েছিলাম আমাদের ভাব প্রকাশের বাহন হিসেবে। কিন্তু এই সাহিত্যের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো প্রকৃত দেশজ-আফ্রিকান লেখার জন্ম হয়েছিল। আপনি ওলে সোয়িংকা অথবা চিনুয়া আচেবের কাজগুলোকে লক্ষ করুন। ঐ লোকগুলোকেই আমাদের লেখক হিসেবে দেখা হয়। লোকেরা তাকে নাইজেরিয়ান লেখক বলে মনে করে না, যদিও তিনি নিজেকে তাই মনে করেন। তাকে কখনোই বহিরাগত হিসেবে স্বাগত জানানো হয় না, বরং আমাদের নিজেদের একজন হিসেবেই।

এনগুগি সাহিত্য বিভাগ খোলার ব্যাপারে তার তৎপরতায় সফল হয়েছিলেন, সেই বিভাগের তিনি প্রধানও ছিলেন, কিন্তু তিনি ক্রমবর্ধমানভাবে উত্তর-ঔপনিবেশিক সরকারের সমালোচকে পরিণত হয়েছিলেন।

তিনি অনেক বেশি হতাশও হয়ে যাচ্ছিলেন, কারণ তার সমালোচনার মূল শ্রোতা গরিব কৃষক আর শ্রমিক শ্রেণি না হয়ে বরং হয়েছিল ইংরেজি-ভাষি মধ্যবিত্ত শ্রেণি।

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তিনি নিজ মাতৃভাষা গিকুয়ুতে লিখতে শুরু করেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হল, তাঁর এই কৌশলের সাফল্য যথেষ্ট স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যখন তিনি টানা এক বছর সরকার কর্তৃক অবরুদ্ধ হয়েছিলেন, একটি অর্ধ-উদ্ভাবিত নাটক প্রযোজনায় কৃষকদের সংগঠিত করতে সহযোগিতা করার পর, যা I Will Marry When I Want, নামে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল। তবে তিনি ইতিমধ্যেই ইংরেজিতে সরকারের সমালোচনা করে অনেক কিছুই রচনা করে ফেলেছেন-মাউ মাউ যুদ্ধ নিয়ে একটি নাটক, The Trial of Dedan Kimathi Ges Petals of Blood নামে আধুনিক কেনিয়াকে নিয়ে একটি উপন্যাস।

কিন্তু ঠিক যে সময়ে তিনি সক্রিয়ভাবে শ্রমিক এবং কৃষকদেরকে সংগঠিত করছিলেন সে ভাষায় যে ভাষায় তারা কথা বলে তখনই রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল।

বন্দি অবস্থায় তিনি গিকুয়ু ভাষায় লিখলেন তার প্রথম উপন্যাস Devil On the Cross টয়লেট পেপারের উপর। আশির দশকে তিনি নির্বাসনে কাটিয়েছেন। তিনি গিকুয়ু ভাষায় তার দ্বিতীয় উপন্যাস Matigari লিখেন ১৯৮৭ সালে এবং Wizard of the Crow তখন পর্যন্ত তার লেখা প্রথম কল্পকাহিনি।

সাহিত্য এবং রাজনীতি নিয়ে এনগুগি সমালোচনামূক লেখা অব্যাহত রাখলেন, বিশেষভাবে দক্ষিণবিশ্বের লেখকদের তিনি আপন মাতৃভাষায় লিখতে উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠির কাছ থেকে জ্ঞানকে দূরে রাখি যে ভাষা তারা ব্যবহার করে তাকে অবজ্ঞা করে।

একজন মানুষকে এভাবে বলা অবশ্যই ভয়ানক গলদ হবে যে, ‘তোমার পা দু’টি আমাকে কেটে ফেলতে দাও, তার বদলে কৃত্রিম দু’টি পা দেব, যেগুলো অবশ্যই আসলগুলো থেকে উৎকৃষ্ট হবে।’ আমি শুধু এতটুকুই বলতে চাচ্ছি, চলুন আমরা আমাদের নিজেদের পায়েই হাঁটি।

এ মুহূর্তে একটা প্রজন্ম উপস্থিত আছে যারা সাহিত্য এবং সাহিত্যের যে কোন সম্ভাবনাকে আফ্রিকান ভাষাগুলোতেই ভাবতে আগ্রহি।

আর তা শুধুমাত্র আফ্রিকাতেই নয়, এটা পুরো দক্ষিণবিশ্বতেই প্রযোজ্য-এ অঞ্চলে রয়েছে বিপুল ঐতিহ্যিক ধারা, যেগুলো স্পর্শের বাইরেই থেকে গেছে। এটা সত্যিই আমাকে আন্দোলিত করে, বর্তমানে সেগুলো মূল যোগসূত্র না হলেও। আমাদের অবশ্যই এসব প্রান্তিক ভাষাকে সর্বজনগ্রাহ্য করে তোলা উচিত। এরপর একাধিক ভাষায় পটু হওয়ার পাশাপাশি, অনুবাদগত মানোন্নয়ন আধুনিক শিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিৎ।

‘ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয়’

Wizard of the Crow-কে প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল এ্যারাপ মই-এর শাসনকালের উপর একটি ব্যঙ্গ রচনা হিসেবে দেখা হয়, যার ইতি ঘটেছিল ২০০২-এ, যখন কেনিয়ায় মোয়াই কিবাকির ‘দুর্নীতিবিরোধি’ নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে। সেই দুর্নীতিবিরোধি সরকার এখন দুর্নীতির পাঁকে ডুবে আছে।

‘যখন মই নির্বাচনে পরাজিত হল আমি বলেছিলাম, ‘এখন মই ছাড়াই কেনিয়ায় আমাদের কাছে মইবাদ বিদ্যমান’, এনগুগি বলেন। ‘এখানে ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে। জনৈক ব্যক্তি হয়ত চলে যেতে পারে কিন্তু তার রচিত প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিরা তো সেই একই থাকে। আগের মাথাটা হয়ত আর নেই। আমরা এ থেকে মুক্ত হতে পারব না, যতক্ষণ না আমরা পুরো প্রক্রিয়াটিকে পরিবর্তন করতে সক্ষম না হব এবং উপলব্ধি না করব মইবাদ বলতে কি বুঝায়।

এখানে একটা বড় পার্থক্য আছে। তাহল এ অঞ্চলে মানুষ এখন বন্দিত্ব, হত্যা অথবা নির্বাসনের ভয় ছাড়াই কথা বলতে সক্ষম। তাই মানুষেরা এখন মই-এর শাসনকালের চেয়ে অনেক স্বাধিনভাবে দুর্নীতি সম্পর্কে কথা বলতে পারে, সম্ভবত এর বিরুদ্ধে সংগঠিতও হতে পারে।’

২০ বছরের নির্বাসন শেষে, এনগুগি তার স্ত্রী এনজিনিকে সাথে নিয়ে ২০০৪-এ কেনিয়ায় ফিরে আসেন Wizard of the Crow-এর গিকুয়ু সংস্করণের প্রচারের জন্য।

এই ভ্রমণের সময় অস্ত্রধারি একটি দল তাদের উপর হামলা চালায় এবং এই দম্পতিকে অপহরণ করে।

এনগুগির উপর নানারকম অত্যাচার করা হয় এবং তার শরীর জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁক দিয়ে পোড়ানো হয়, অন্যদিকে এনজিরিকে ছুরিকাঘাত এবং ধর্ষণ করা হয়।

শেষ পর্যন্ত তারা বেঁচে গিয়েছিলেন, উপরন্তু বইয়ের প্রচারণাও অব্যাহত রেখেছিলেন। যা হোক, তারা বসবাসের উদ্দেশ্যে কেনিয়ায় ফিরে আসেননি। আমি তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তিনি কি অনুভব করেন, তিনি এখনো নির্বাসনে আছেন।

তিনি বলেন, ‘লোকেরা বলে আমি স্ব-আরোপিত নির্বাসনে ছিলাম। তা সত্য নয়। সত্য কথা হল, নিহত হওয়া ছাড়া আমি কখনোই ফিরে আসতে পারতাম না। আর এখন নিজেদের ঘরেই আমাদের উপর এই পাশবিক আক্রমণ চলেছে।

আমি বিশ্বাস করি এই আক্রমণ ছিল রাজনৈতিক এবং ঐ একই শক্তির সাথে যুক্ত যা সবসময়ই আমার বিরোধিতা করে এসেছে। তাসত্তে¡ও সত্যিই আমি অনুভব করি আমি ফিরতে পারব এবং আমি যে কোন মুহূর্তেই ফিরে আসতে পারি।’

তিনি ‘সন্ত্রাসের নামে যুদ্ধ’ নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন কিন্তু বিশ্বময় পুঁজিবাদবিরোধি আন্দোলন নিয়ে অনেক বেশি উত্তেজিত। ‘ইতিহাস, ঈশ্বরের মতো, এগিয়ে যায় রহস্যময় পথে’।

ব্যক্তিগতভাবে আমি অনুভব করি যে সাম্রাজ্যিক এই নৈরাজ্য, বর্তমান পৃথিবীকে যা শাসন করছে, তা থেকেই আরো একটা বৈশ্বিক সচেতনতার আবির্ভাব ঘটবে যে, জোটবাদিতা (Corporatism)-যাকে আমি আমার উপন্যাসে নাম দিয়েছি ‘Corporonialism’ বলে-তা শুধুমাত্র বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে।

আর অবশ্যই অন্য কিছু একটা এর স্থলাভিষিক্ত হবে, যদিও সেটা আচরণে হবে বৈশ্বিক, কিন্তু বৈশ্বিক জোটবাদিতাকে পরাভূত করবে।

একদিকে বিশ্বায়ন অনেক উদ্বেগজনক, কিন্তু অন্য হিসেবে আমাদের বিশ্বায়ন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। যেমন, আফ্রিকা, ইউরোপ অথবা ল্যাটিন আমেরিকার সামাজিক আন্দোলনগুলো সংযোগ রক্ষা করতে পারে। তাই সম্ভাবনা হচ্ছে এই যে, বিশ্বায়নের এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই সত্যিকারের একটি বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের শেকড়।

এনগুগি খুবই আনন্দিত কারণ পশ্চিমের আরো অনেক মানুষ এখন তার এবং দক্ষিণ ভূ-ভাগের লেখকদের বই পড়ছে। একটা উপায় আছে যার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা বলা মানে যুক্তরাষ্ট্র এবং এ ধরনের অন্য সব রাষ্ট্রের নাগরিকদের পক্ষেও কথা বলা।

তাই এই সব সাহিত্য হয়ে ওঠে বৈশ্বিক সাহিত্য-যা জাগিয়ে তোলে বৈশ্বিক প্রণোদনা যার মাধ্যমে প্রত্যেকেই চিহ্নিত করতে পারে, যে প্রণোদনার ভেতর দিয়ে আমরা সবাই নিজেদেরকে দেখতে পারি।

সাধারণভাবে তিনি মনে করেন পরিবর্তনে হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে শিল্পকে অবমাননা করা হয়, ‘শিল্প সবচেয়ে’ শক্তিশালি একটি হাতিয়ার। শিল্পকে মনে করুন একটা ফুল। ফুল হল একটা সম্পূর্ণ গাছের অভিব্যক্তি, অধিকন্তু এই ফুলই বীজ সংরক্ষণ করে রাখে গাছের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।

ফুলেরা শোভাবর্ধক, তাসত্তে¡ও তারা এর চেয়ে বেশি কিছু। ঠিক একইভাবে, শিল্প হচ্ছে পুরো সমাজবৃক্ষের একটি ফলন এবং একই সাথে সে আমাদের ভবিষ্যতের বীজও সংরক্ষণ করে।

কল্পনার রঙ মাখানো না হলে, শিল্প তার স্বতঃসিদ্ধ প্রকৃতিতে বৈপ্লবিক। কোন আন্দোলন এবং পরিবর্তন ব্যতিরেকে আপনি শিল্পকে ভাবতে পারেন না-হোক সেটা দেয়ালে ঝোলানো একটা ছবি। আর এ জন্যই সমাজ বিপ্লবের প্রকৃত মুহূর্ত হল তখন, যখন আন্দোলন এবং শিল্প একটি সময়কালে একইসাথে চলে এবং এই জন্যই ঐ মুহূর্তটি-তা নতুন, পুরোনো বা আঁভাগার্দিয় হোক-তা আন্দোলনের সাথে সংযুক্ত থাকে। সেই মুহূর্তের পরে তারা সংযোগ বিচ্ছিন্ন প্রবণ হয়ে পড়ে।

আমার বই Penpoints, Gunpoints and Dreams-এ আমি সাহিত্য, শিল্প এবং সামাজিক আন্দোলনসমূহের তাত্তি¡ক অবস্থান দেখিয়েছি। রাষ্ট্র তার স্বভাবসুলভ কারণেই রক্ষণশিল-এমনকি সবচেয়ে বৈপ্লবিক রাষ্ট্রটিও। প্রতিদিনই একটা করে বিপ্লব ঘটা সম্ভব নয়। রাষ্ট্র সৃষ্টি করে আইনের, যাকে তার সংরক্ষণ করতে হয়। অন্যদিকে শিল্প তার স্বভাবগত রীতিতেই পরিবর্তনের ধারণাকেই বাস্তব রূপ প্রদান করে।

আবার এটা ভুলে যাওয়া যাবে না, অতীতের যে সমাজগুলোর কথা আমরা জানি তাদের কোন রাষ্ট্র ছিল না। সেসব রীতিসমূহের কথা চিন্তা করুন যেগুলো সেখানে মানা হত এবং যেগুলোর মাধ্যমে একজন মানুষের সাথে অন্যজনের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রিত হত। সেগুলো ছিল অনেক শক্তিশালি নৈতিক রীতি।

আমার দৃষ্টিতে মানবসমাজের লক্ষ শুধুমাত্র খাওয়ানো, পরানো আর আশ্রয় প্রদান করাই নয়। এখানে অবশ্যই একটা আধ্যাত্মিক মাত্রা থাকতে হবে। আমার মতে ধর্ম হল আমাদের আকাক্সক্ষা এবং আধ্যাত্মিক সত্তার প্রকাশ। কেন শিল্প সবসময় আমাদের নীতি-নৈতিকতা এবং আদর্শকে প্রকাশ করবে না, এর কোন উত্তর নেই। সেখানে সবসময়ই কাহিনি থাকবে। আমাদের নিজেদের পরিবর্তনের সংগ্রাম সবসময়ই থাকবে এবং শিল্পের মধ্য দিয়েই সেই সংগ্রাম সবসময় প্রকাশ পাবে।

শেয়ার করুন: