004588
Total Users : 4588
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →
জন্ম— জুন, ০৬, ১৯৭৭। জন্মস্থান— উত্তর গোবীন্দর খীল, হাঁদু চৌধুরী বাড়ী, পটিয়া, চট্টগ্রাম। (শৈশব কৈশোর ও তারুণ্যের সময়যাপন) বেড়ে ওঠা (পূর্ব্ব বালিয়াদী, মীরশ্বরাই, চট্টগ্রাম) নানার বাড়ীতে। প্রকাশিত কবিতার বই— ফুলেরা পোষাক পরে না (সাল: ২০১৮, প্রকাশক : মনফকিরা, কলিকেতা)। প্রকাশিতব্য বই— অর্দ্ধনারীশ্বরবাদ : প্রকৃতিপুরুষতত্ত্ব (নন্দনতত্ত্ব), বটতলার বয়ান (ভাষাতাত্ত্বিক গদ্য) ও উদ্ভিদপ্রতিভা (কবিতা)। সম্পাদক— চারবাক।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

এ্যালেন গিন্সবার্গের সাক্ষাৎকার

{এ্যালেন গিন্সবার্গ জন্মেছিলেন নিউ জার্সির পেটারসনে, ১৯২৬ এর জুন ৩। পিতা ল্যুই গিন্সবার্গ, কবি ও স্কুলশিক্ষক। পেটারসনে বিদ্যালয়-শিক্ষা শেষ করে কলম্বিয়া থেকে ১৯৪৮-এ স্নাতক হন এ্যালেন। চল্লিশ দশকের শেষ থেকে পঞ্চাশের প্রথমাবধি নানা ধরনের কাজ করেছেন-ম্যানহাটনে ডিশওয়াশার থেকে ব্রুকলিন নেভিইয়ার্ডে মিস্ত্রির কাজ, ডেনভাবের মে কোম্পানির কুলিগিরি থেকে নিউজউইক পত্রিকার পুস্তক পর্যালোচনা— এসব করেছেন এ্যালেন। তাঁর দীর্ঘ, রাগি কবিতা ‘Howl’ ১৯৫৬ সালে সানফ্রান্সিসকো থেকে বেরোনোর পরই মার্কিন শুল্কদপ্তর ও স্থানিয় পুলিশ তা বাজেয়াপ্ত করে। অভিযোগ অশ্লিলতার। অবশ্য অনেক কবি ও সমালোচক কাব্যটির পক্ষে মত প্রকাশ করলে, তা প্রকাশিত হতে পারে। বিট জেনারেশান কবিদের সর্বস্বীকৃত নেতা গিন্সবার্গ কবিতা লেখা ও পাঠের জন্য প্রচুর ভ্রমণ করেছেন। পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে তিনি নিজেই তার ভ্রমণের বর্ণনা করেছেন— ‘পশ্চিম উপকূলে তিন বছর, তারপর আর্কটিক সমুদ্র, ট্যাঞ্জিয়ের, ভেনিস, এ্যামস্টারডাম, প্যারিস; কবিতাপাঠ অক্সফোর্ড হার্ভার্ড কলাম্বিয়া শিকাগোতে।’

তারপরেও গিন্সবার্গ দীর্ঘদিন ধরে বেড়িয়েছেন লন্ডন, হাভানা, কলকাতা ও প্রাগে, অনেক সময়ই আবার তাঁকে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে নানা আইনি জটিলতায় ও বিতর্কে। নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর কবিতা— ফরাসি, ইটালিয়, ফিনিশিয়, জাপানি, বাংলা ইত্যাদি। দু’টো চলচ্চিত্রেও নেমেছেন তিনি ‘Pull My Daisy (1961) এবং ‘Guns of the Trees’ (1962)। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘Pull My Daisy (1961) (১৯৬০), ‘Guns of the Trees’ (1962) (১৯৬০) ও ‘Empty Mirror’ (১৯৬৩) উল্লেখযোগ্য। নানা কারণে গিন্সবার্গের সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল ব্যাপক— যুদ্ধবিরোধি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, অশ্লিলতা, ড্রাগ ও যৌন ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে দেশের আইন পরিবর্তনের জন্য লড়েছেন। ১৯৬৫-র মে দিবসে প্রাগে চেক ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে King of the May নির্বাচিত করেছে। অবশ্য তার পরেই চেক সরকার তাঁকে দেশ থেকে বহিষ্কার করে। তারপর তিনি যান কিউবা, রাশিয়া ও লন্ডনে।
এ্যালেন গিন্সবার্গের এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন টমাস ক্লার্ক। তাঁর কথায়— ‘এক সন্ধ্যায় ব্রিস্টলে আমি গিন্সবার্গকে কবিতা পাঠ করতে দেখি। প্রথম দেখাতেই চমৎকৃত হই, যেভাবে তিনি অত্যুচ্চ আবেগে তাঁর কবিতা পাঠ করেছিলেন, তা শ্রোতাদের কাছেও নতুন আবিষ্কারের মতো।’ ক্লার্ক গিন্সবার্গের সঙ্গেই পায়ে হেঁটে ব্রিস্টল থেকে ওয়েলস ক্যাথেড্রাল, গ্লাস্টনবেরি, বাথ হয়ে লন্ডন পৌঁছান। এর সপ্তাহ দুয়েক পর কেমব্রিজে কবিতা পড়েন গিন্সবার্গ এবং এখানেই ক্লার্ক তাঁকে এই সাক্ষাৎকারের জন্য অনুরোধ জানান। দিনদুয়েকের মধ্যে ক্লার্ক তাঁর এই সাক্ষাৎকারটি টেপরেকর্ডারে বদ্ধ করেন। ক্লার্ক বলছেন— ‘খুব আস্তে আস্তে, ভেবে ভেবে গিন্সবার্গ প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন, এবং ঘণ্টা দুয়েক পরেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। খাবারের বিরতি এবং এই সময় তাঁর সঙ্গে কয়েকজন দেখা করতে এলেন, গিন্সবার্গ যখন জানতে পারলেন যে ওদের মধ্যে একজন বায়োকেমিস্ট, তিনি তখন এক ঘণ্টা ধরে তার সঙ্গে ভাইরাস ও ডিএনএ নিয়ে নানা প্রশ্ন করেন। এসব শেষ হলে আমরা আবার সাক্ষাৎকারের পরবর্তী অংশ শুরু করি।’ এই সাক্ষাৎকারের সময় জুন, ১৯৬৫ এবং এটি প্রথম ছাপা হয়েছিল মে, ১৯৬৬-তে।}

প্রশ্ন : আমার মনে পড়ছে ডায়ানা ট্রিলিং কলাম্বিয়াতে আপনার কবিতা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন যে আপনার কবিতা ইংরেজি ভাষার কবিতার মতো সিরিয়াস বিষয়ের ক্ষেত্রেই আয়াম্বিক পেন্টামিটার ছন্দ-নির্ভর হয়ে ওঠে। আপনি কি এই বিষয়ে একমত হবেন?

গিন্সবার্গ : না, আমার তা ঠিক বলে মনে হয় না। আমি কোনোদিনই তেমনভাবে বসে ছন্দের টেকনিক্যাল দিকগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করিনি। আমার ছন্দ প্রায় গ্রিক ছন্দ কোরিয়াম্বিক-এর কাছাকাছি, মিটারের দিক থেকে ডিথিরাম্বিক, এটা এইরকম হতে পারে— de DA de DA de de… এই আর কি! ড্যাকটাইলিকও হতে পারে। উইলিয়ামস্ একসময় বলেছিলেন যে আমেরিকার কথনভঙ্গি মূলত ড্যাকটালিকের। কিন্তু আমার কবিতা আরো জটিল। কারণ ড্যাকটালিকের তিনটে পর্ব, আর আসল ছন্দ— স্পন্দ পাঁচ, ছয় অথবা সাত পর্বের হতে পারে। যেমন DA de de DA de de DA de de DA DA। এসব অনেকটা গ্রিক নৃত্য ছন্দের মতো, এই কারণে সবাই একে কোরিয়াম্বিক বলে। বস্তুত এই কারণে ট্রিলিং যা বলেছেন তা টেকনিক্যালি সঠিক নয়। তবে কোন কবিতার ক্ষেত্রে সত্য হতেই পারে, যেমন Howl-এর কিছু অংশ এবং Kaddish-এর কোনো কোনো জায়গা। কিন্তু নির্দিষ্ট তালটি হল ধ্রুপদি, গ্রিক ধ্রুপদি তাল, ঠিক ইংরেজি নয়। এমন অনেক কবিতা আছে যা কোনো মাপেই আসে না। তাই ওই মন্তব্যে আমার কবিতার টেকনিক্যাল কৃতিত্বগুলোকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। আসলে ওঁরা ধরতেই পারেননি।

প্রশ্ন : Howl এবং Kaddish-এ তাহলে আপনি এক ধরনের ধ্রুপদি আঙ্গিকে কাজ করেছেন— এমন বলা ঠিক হবে কি?

গিন্সবার্গ : হ্যাঁ, কিন্তু তেমন ভাল কিছু এতে বোঝান যায় না। কেননা আমি ধ্রুপদি আঙ্গিকে কাজ করব বলে তো করিনি। আমি কাজ করেছি আমার মনের তাড়নাগুলোকে নিয়ে। দেখুন, পার্থক্যটা হল এই রকম— একজন কবিতা লিখতে বসেছেন প্রাক-নির্দিষ্ট একটি ছন্দ প্যাটার্নে লিখবেন বলে, আর একজন কবিতা লিখছেন সেখানে তার মনস্তাত্ত্বিক আন্দোলনগুলোকে প্রকাশ করতে এবং ক্রমশ একটা ছন্দ প্যাটার্নে পৌঁছে যাচ্ছেন, যার নির্দিষ্ট নাম থাকতেই পারে, ধ্রুপদি ব্যবহারও থাকতে পারে। আয়াম্বিক পেন্টামিটারেও কোনো আপত্তি কারো থাকে না যদি সেটি মনেরও কোনো গভীর সূত্র থেকে উঠে আসে-বা বলা যায় উঠে আসছে শ্বাস-প্রশ্বাস থেকে, পেট ও ফুসফুসের মধ্যে থেকে।

প্রশ্ন : ইংরেজি কবিতার নির্দিষ্ট ছন্দ থেকে ইংরেজ কবিদের আগেই ভেঙে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন আমেরিকার কবিরা। আপনার কি মনে হয় ইংরেজদের কথনরীতির সঙ্গে এর কোনো যোগ আছে?

গিন্সবার্গ : না, আমার তা মনে হয় না। ইংরেজরা তো আয়াম্বিক পেন্টামিটারে কথা বলে না। যে প্যাটার্নে কথ্যরীতি, সেই প্যাটার্নে তারা লেখেও না। তাদের কথনভঙ্গির অনুজ্জ্বলতা ও আবেগের বৈচিত্র্যের অভাবের পাশাপাশি চলেছে অনুজ্জ্বল কাব্যভাষা ও এখনকার কবিতার সাহিত্য-ব্যবহার। কথ্যরীতির উপরের ঠোঁট-নির্গত উচ্চারণ, উচ্চশ্রেণির মানুষের উচ্চারণ এসব ছাড়াও কিছু বিভিন্নতা আছে— কিন্তু সেসব এখনকার কবিতার সুরের সঙ্গে মেলে না।

প্রশ্ন : কোনো ব্যতিক্রম চোখে পড়ে না?

গিন্সবার্গ : এটাই সাধারণত দেখা যায়, এমনকি তথাকথিত আভাগার্দ কবিরাও তাই। এঁরা লেখেন খুব নিচু সুরে, toned-down অবস্থায়।

প্রশ্ন : বেসিল বান্টিং-এর মতো কবি?

গিন্সবার্গ : হ্যাঁ, উনি কাজ করেছেন পুরোনো দিনের সব বন্যমানুষদের নিয়ে, যারা মনে হয় নতুন কিছু করছিল। তো বান্টিং-এর এইসব অভিজ্ঞতা ছিল। তাছাড়া তিনি ফার্সি জানতেন, ফার্সি ছন্দ জানতেন। এক অর্থে সমস্ত ইংরেজ কবির চেয়ে তিনি অধিকতর শিক্ষিত।

প্রশ্ন : Howl-এ যে ধরনের ভাষাবিন্যাস আপনি ব্যবহার করেছেন তা কি আপনার এখনকার কাজপত্রের আর দরকার নেই?

গিন্সবার্গ : না, এটা তখন যা করতে চেয়েছিলাম, তার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ছিল। এমনকি ওটা কোনো সচেতন প্রচেষ্টাও ছিল না।

প্রশ্ন : আচ্ছা, এর সঙ্গে কি সে সময়কার আপনার প্রিয় সংগীত বা জ্যাজের কোনো যোগ ছিল?

গিন্সবার্গ : হ্যাঁ… কেরোয়াক যেভাবে লেস্টার ইয়ং-এর মিথটিকে ব্যবহার করেছেন, Lady be Good-এর ঊননব্বইটি সম্মিলিত সুর একরাতে তোলা, অথবা আমার শোনা ইলিনার জ্যাকোয়েট-এর Jazz at the Philharmonic, নাম ছিল মনে হয় Can’t Get Started।

প্রশ্ন : তাছাড়াও আপনি ক্রিস্টোফার স্মার্ট-এর মতো কবির নাম উল্লেখ করেছেন। স্মার্টের কাছে আপনি অনেক analogy পেয়েছেন। এটা কি আপনি পরে লক্ষ করেছেন?

গিন্সবার্গ : হ্যাঁ, যখন আবার পড়লাম, বুঝতে পারলাম। আসলে, আমি সবসময়ই পড়ি, আগেও পড়তাম। ফলে আমি কেনেথ ফিয়ারিং ও কার্ল স্যাল্ডবার্গের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ি। কিন্তু ক্রিস্টোফার স্মার্ট, ব্লেকের Prophetic Books, হুইটম্যান এবং বাইবেলে ব্যবহৃত অলংকারের কোনো-কোনো দিক সম্পর্কে খুবই সচেতন ছিলাম। এছাড়াও অনেক গদ্যরচনা সম্পর্কেও সচেতনতা ছিল— যেমন জেঁনে, জেঁনের Our Lady of the Flowers, এর অলংকার এবং সেলিন; তবে কেরোয়াক-এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি— কেরোয়াকের গদ্য।

প্রশ্ন : আপনি বারোজ-এর লেখার সংস্পর্শে কখন এসেছিলেন?

গিন্সবার্গ : দেখুন… হ্যাঁ, বারোজ-এর প্রথম লেখা আমি পড়ি ১৯৪৬-এ, একটি নকশাজাতিয় রচনা, যেটি পরে প্রকাশিত হয়েছিল এবং তাঁর অন্য একটি রচনা ঝড় So Proudly We Hail -এর সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। এতে টাইটানিক-এর ডুবে যাওয়ার বর্ণনা এবং The Star Strangled Banner নামের একটি অর্কেস্ট্রাবাদন আছে যখন সবাই প্রাণভয়ে লাইফবোটের দিকে ছুটছে, আর একজন মহিলার পোশাক পরে ক্যাপ্টেন পার্সারের অফিসে ঢুকে তাকে হত্যা করে সব টাকাপয়সা চুরি করে নিচ্ছে, এদিকে যারাই বোটে উঠতে যাচ্ছে, তাদেরই হাতে মারছে ভোজালির কোপ— হার্ভার্ডে থাকতে বারোজ এটা লিখেছিলেন বন্ধু কেল্স এলভিন্স-এর সঙ্গে, আর এটা হয়ে উঠেছিল ডুবন্ত আমেরিকার প্রতিক— সময় সম্পর্কে এরকম দূরদৃষ্টি তাঁর ছিল। তারপর বারোজ ও কেরোয়াক দুজনে মিলে ১৯৪৫ বা ১৯৪৬ সালে একটা গোয়েন্দাকাহিনি লেখেন। বইটি এখন কোথায় আমি জানি না। তবে যাই হোক, আমার মনে হয় কেরোয়াকই বারোজকে গদ্য লিখতে উৎসাহিত করেছিলেন। কেরোয়াক গদ্য সম্পর্কে অত্যন্ত আগ্রহি ছিলেন— গদ্য লেখা সম্বন্ধে, লিরিসিজম সম্বন্ধে, লেখালেখির সম্মান সম্বন্ধে… টমাস উল্ফ সুলভ একধরনের আনন্দ এসব থেকে পেতেন। তাঁর মধ্যেই বারোজ খুঁজে পেয়েছিলেন এমন একজন সঙ্গিকে, যিনি চিত্তাকর্ষকভাবে লিখতে পারেন। কেরোয়াক নিপুণভাবে অনুকরণ করতে পারতেন ড্যাশিয়েল হ্যামেট ও বিলকে, বিলের স্বাভাবিক গদ্যভঙ্গিটিকে। সেই সময় বারোজ পাঠ করেছিলেন জন ওহারার লেখা— অবশ্য তথ্যের জন্য, কোনো স্টাইলের জন্য নয়, কেননা তিনি ছিলেন অনুসন্ধিৎসু প্রতিবেদক মাত্র।
এরপর ১৯৫১-তে মেক্সিকোয় তিনি লিখতে শুরু করেন Junkie; এখন এর সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক এখন আর মনে করতে পারছি না, তবে মনে হয় আমি প্রায় এজেন্টের ভূমিকায় নেমে পড়েছিলাম— নিউইয়র্কে গ্রন্থটি প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি। মনে হয় উনি আমাকে বইটির কিছু অংশ সে সময় পাঠিয়েছিলেন— কিভাবে সেসব এখন মনে পড়ছে না। ১৯৪৯ বা ১৯৫০-এ তিনি একটি ব্যক্তিগত দুর্যোগের মধ্যে পড়েন, স্ত্রী মারা যান, এটা মেক্সিকো বা দক্ষিণ আমেরিকা হবে… কিন্তু ভাল ব্যাপার হল, এসময় তিনি আবার লিখতে শুরু করেন। বারোজ খুবই নরম প্রকৃতির মানুষ ছিলেন, বেশ মর্যাদাবোধসম্পন্ন, অথচ লাজুক এবং অন্তর্মুখি। এমন একজনের পক্ষে এতবড় আত্মজীবনীমূলক রচনা নির্মাণ করা আমার কাছে অনন্তকালের একটা খণ্ড তৈরির মতো মনে হয়েছিল, সেই যে আছে না— Eternity is in love with the productions of Time? তিনিও যেন তখন production of time-এর কাজে নিয়োজিত হয়েছিলেন। যাই হোক, আমি রচনাটি নিয়ে প্রকাশকদের কাছে ঘুরতে থাকলাম। কাদের কাছে গেছিলাম সব বিস্তারিত মনে নেই। হয়ত লুই সিম্পসনের কাছে, বব্‌স-মেরিল-এ ও তখন কাজ করে। ওর কাছে কি গেছিলাম? জেসন এপ্সটেন-এর কাছে গেছিলাম। জেসন তখন মনে হয় ডাব্‌ল ডে-তে। ওর প্রতিক্রিয়া এখনও মনে আছে। আমি যখন ওর অফিসে গেলাম, ও খুব মজার কথা বলেছিল। বলেছিল যে রচনাটি চিত্তাকর্ষক, তবে ততটা চিত্তাকর্ষক নয়, যদি এটা উইন্সটন চার্চিলের আত্মজীবনী হত, তাহলে যেমনটি হত তেমন হয়। আসলে এটা তো অনামি একজনের রচনা, তাই চিত্তাকর্ষক হতে পারছে না। এরপর আমি দেখালাম কার্ল সলোমনকে, যিনি এখন এ এ উইন কোম্পানিতে, আর এখানেই অবশেষে বইটি গৃহিত হল। ১৯৫২ সাল। কিন্তু এটি প্রকাশিত হয়েছিল সস্তা পেপারব্যাক হিসেবে। তবে বইটি সম্পর্কে সেন্সরের ভয় ছিল ওদের। ওদের ভয় ছিল নাকি কংগ্রেসের তদন্তের বা ওই ধরনের কিছুতে, আমি ঠিক জানি না। মনে হয় নার্কোটিক্স সম্পর্কে সে সময় একটা হট্টগোল চলছিল… খবরের কাগজের হৈ চৈ… প্রকাশকের পক্ষ থেকে তাই একটা ভূমিকাও যোগ করে দেওয়া হয়েছিল।

প্রশ্ন : সেন্সরের ভয় বা ওই ধরনের কোনো ঝামেলার কারণে আপনার নিজেকে রচনায় ব্যক্ত করতে কোনো সমস্যা কখনও তৈরি হয়েছে?

গিন্সবার্গ : এটা খুব জটিল বিষয়। আমার ভয়টা প্রথমদিকে শুরু হয়েছিল এইভাবে যে আমি যা লিখব তা পড়ে আমার বাবা কি বলবে? Howl রচনার সময় যেমন আমার মনে হয়েছিল এটি প্রকাশিত হলে এমন কিছু এতে আছে যা আমি চাই না বাবা পড়–ন। আমার যৌনজীবন সম্বন্ধে বাবা পড়ছেন, এইসব ভাবতাম। এই অবস্থা অবশ্য দীর্ঘস্থায়ি হয়নি কেননা যা লিখেছি তা তো সত্যি। তাই ওসব ব্যাপারকে আর গুরুত্ব দিইনি। এটা লিখতে সাহায্যই করেছে, কেন না আমি মনে করে নিতাম যে এসব তো আর প্রকাশিত হচ্ছে না। তাই যা মনে আসত, লিখতে পারতাম। সুতরাং নিজের জন্যে অথবা আমি ভালভাবে জানি এমন কারোর জন্যে, ও যেসব লেখকরা সহনশিলতা নিয়ে আমার লেখা সমালোচনা করতে পারবেন তাদের জন্য Howl জাতিয় লেখা, যারা কোনো নৈতিক মানদ- থেকে একে দেখবে না, দেখবে মানুষের অভিজ্ঞতার ফসল হিসেবে, গোপন চিন্তার দলিল হিসেবে অথবা নিছক সত্যবাদিতা হিসেবে।
এরপর সমস্যা ছিল ছাপানোর। এ নিয়ে অনেক ভুগতে হয়েছে আমাদের। প্রথমে তো ইংরেজ প্রকাশকরা ছাপতে চাইত না, আর আমাদের ভয় ছিল কাস্টম্‌স-এর, এই কারণে প্রথম সংস্করণে কিছু কিছু (নোংরা) শব্দের জায়গায় তারকাচিহ্ন বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যখন এভারগ্রিন রিভিউ-এর সংস্করণ বেরোল, সেখানেও ওরা এই তারকাচিহ্ন রেখে দিয়েছিল, আইনত সিটিলাইটস্ সংস্করণকে অনুসরণ করা হয়নি। ইহুদি লেখকদের একটা সংকলন বেরিয়েছিল, কে সম্পাদনা করেছিলেন মনে নেই, তো আমি ওদের অনুরোধ করেছিলাম সিটিলাইটস সংস্করণটিকে গ্রহণ করতে, কিন্তু ওরা ওই তারকাচিহ্নকেই ব্যবহার করল। সংকলনটির নাম New Generation of Jewish Writing গোছের কোনো কিছু হবে— ফিলিপ রথ ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রশ্ন : এই সমস্যাগুলোকে আপনি কিভাবে দেখেন— সামাজিক সমস্যা, সাধারণ জ্ঞাপনের সমস্যা, না-কি মনে হয় এর ফলে নিজের কাছে নিজেকে প্রকাশ করার ক্ষমতা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে?

গিন্সবার্গ : সাহিত্যের ক্ষেত্রে সমস্যাটা হচ্ছে এইরকম। আমরা সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলি এবং সাধারণভাবে পরস্পরকে বোঝার একটা ব্যাপার আছে; আর আমরা যা বলতে চাই, তা-ই বলি, আমরা গুহ্যদ্বার নিয়ে যেমন কথা বলি, তেমনি বলি যৌনাঙ্গ নিয়ে, কথা বলি, কার সঙ্গে গত রাতে শুয়েছি, আগামি রাতেই-বা কার সঙ্গে শুতে যাব, আমাদের মধ্যে ভালবাসার সম্পর্ক কেমন, কখন মাতাল হয়ে পড়েছিলাম ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়ে— যা সাধারণত বন্ধুদের কাছে বলা যেতে পারে। এখন এরপর যদি পার্থক্য টেনে দেওয়া হয় বন্ধুদের সঙ্গে যা বলব, এবং বাগ্‌দেবির কাছে যা বলব, এই দুয়ের মধ্যে? তবে কি হবে? সমস্যা হল এই পার্থক্যটি তুলে দেওয়ার। অর্থাৎ বাগ্‌দেবির কাছে গিয়ে তা-ই অকপটে বলা যা বন্ধুদের কাছে বা নিজের কাছে বলা যায়। বারোজ বা কেরোয়াক বা গ্রেগরি কর্সোর সঙ্গে, আমি ভালভাবে জানি এমন মানুষজনের সঙ্গে কথা বলে আমি দেখলাম যে যেসব বিষয় সত্য বলে আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করি, তা সাহিত্যে একদম আলাদা হয়ে যায়। কেরোয়াক-এর On the Roads যেন এরই সত্যানুসন্ধান। কেরোয়াক নীল ক্যাসাডির সঙ্গে যেসব বিষয়ে কথা বলেছে, একসময় দেখল ও তাই-ই লিখতে চায়। অর্থাৎ সাহিত্য যেমন হওয়া উচিত এই ধারণাটাই সংশোধিত হয়ে গেল। স্বভাবতই সাহিত্য সমালোচকেরা বলল, কাঠামো ঠিক হয়নি বা ওই রকম কিছু, আসলে স্বীকৃতি না পাওয়ার কারণই হল অপছন্দের বিষয়বস্তু।

প্রশ্ন : সুতরাং বিষয় কোনো ব্যাপার নয়, যেমন যৌনতা বা অন্য কিছু—

গিন্সবার্গ : ব্যাপারটা হল লেখার প্রতি কমিটেড থাকার ক্ষমতা— লিখতে হবে, যেভাবে যেমনভাবে আপনি আছেন। অনেক লেখক আছেন, যাঁদের মনে সাহিত্য কেমন হবে সে বিষয়ে পূর্ব-নির্ধারিত ধারণা আছে। এই ধারণাটি হল ব্যক্তিগত কথোপকথনে যেসব সুন্দর দিক থাকে সেসব বাদ দেওয়া। অথচ লিখতে বসে আমরা যা জানি এবং যা লিখব, তার কোনো প্রভেদ রাখলে চলবে না। যেভাবে আমরা দৈনন্দিন জীবনে একে অপরকে জানি। সাহিত্যের কপটতাই হল এই যে ফর্মাল সাহিত্য বলে কিছু ধরে নেওয়া, যা বিষয়ে, ভাষায়, গঠনে আমাদের থেকে আলাদা হবে। এটা আবার সেইরকমও, যা হুইটম্যানে আছে— I find no fat sweater than that which sticks to my own bones; অর্থাৎ বিষয় হিসেবে সত্যি সত্যি বেঁচে আছে এমন নিশ্চিন্ত বোধযুক্ত মানুষ ও তার অস্তিত্ব অন্য যে কোনো বিষয়ের চেয়ে খারাপ বিষয় হতে পারে না।

প্রশ্ন : শারীরবৃত্ত-ও কি এর মধ্যে পড়ে? যেমন আপনার লম্বা নিঃশ্বাসের পংক্তির সঙ্গে উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়াম্স-এর ছোট ছোট পংক্তির পার্থক্যের মতো?

গিন্সবার্গ : রচনার পর বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় এসব অনুভূতির ব্যাপার, আপনি জানতেই পারবেন না কি হতে যাচ্ছে। তারপর আমি এটাকে এইভাবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছি— ‘ঠিক আছে, উইলিয়াম্স-এর চেয়ে আমি লম্বা লম্বা লিখি, কিংবা আমি ইহুদি, কিংবা আমি যোগচর্চা করি, কিংবা আমি লম্বা লাইনের গান গাই…’ কিন্তু আসল ব্যাপারটা হল এটাই আমার চলন, ধ্বনিময় লম্বা লম্বা বিবৃতিতেই আমার অনুভূতি বেশি ধরা পড়ে। হতে পারে এটা আমি কেরোয়াকের বড় বড় গদ্যপংক্তি থেকে পেয়েছি, ওঁর ভাষাতে বললে, কবিতাই। ওঁর Doctor Sax অথবা Railroad-এর একটি বাক্যের পৃষ্ঠা যদি দেখা যায়, তাহলে দেখব এর মধ্যে লুকিয়ে আছে কাব্যের ঘনত্ব, কাব্যের সৌন্দর্য, ছন্দের স্পন্দন।

প্রশ্ন : আপনি কি কখনও এই স্পন্দনের অনুভূতিকে কোনো জান্তব চিৎকারের মধ্যে প্রয়োগ করেছেন?

গিন্সবার্গ : লম্বা লাইনের ছন্দও তো একধরনের জান্তব চিৎকার।

প্রশ্ন : আপনি তাহলে ওই অনুভূতিকেই অনুসরণ করছেন, কোনো চিন্তা বা দৃশ্যোপমা নয়?

গিন্সবার্গ : এটা পর্যায়ক্রমেই ঘটে। কবিতা সাধারণত অনুভূতির ছন্দময় সংহতি। আর এই অনুভূতি একটা তাড়নার মতো, যা ভেতরে জেগে ওঠে, বলা যায় যৌনতাড়নার মতো— পেটের মধ্যে থেকে শুরু হয়ে উঠে আসে বুকে, তারপর বেরোতে থাকে মুখ-চোখ দিয়ে, গোঙানি বা দীর্ঘশ্বাস হয়ে। এখন আপনি যদি এই অবস্থাটিকে, এই অনুভূতিটিকে খুব সংহতভাবে বর্ণনা করার চেষ্টা করেন, দেখবেন এই অনুভূতিই কবিতা হয়ে উঠছে। অর্থাৎ যা ঘটছে, তার একটা শারীরিক ছন্দবদ্ধতা আছে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট শব্দ নেই, হয়ত একটা বা দুটো প্রধান শব্দ পাওয়া যেতে পারে, এখান থেকেই অনুভূতিকে রূপ দিতে হয় লিখে, পারিপার্শ্বিকতার সহযোগে লেখাটি গড়ে উঠতে থাকে, বাকিটুকু বিবৃতিমাত্র। পারিপার্শ্বিকতা থেকে আমার মনে এল, যেমন ধরুন, ‘মোলক’, ‘কে মোলক’, এখান থেকে স্পন্দময় তাড়নাটি শুরু হল DA de de DA de de DA DA— ‘Moloch whose eyes are a thousand blind windows’ এভাবেই আমি পেয়ে যাই শব্দগুলো— ‘Moloch, Moloch, Moloch’ আর যেহেতু আমার মধ্যে ছন্দটি ছিল DA de de DA de de DA de de DA DA সেহেতু কবিতাটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আর সমস্যা হয়নি, শুধু তাকিয়ে দেখা বাইরে অগুনতি বাড়ির জানালা, আর লিখে ফেলা— জানালা, কেমন জানালা— ‘Moloch whose eyes’ যা এমনিতেই সুন্দর, কিন্তু মোলকের চোখ কেমন বোঝাতে এল thousands শব্দটি, ঠিক আছে, কিন্তু thousands কি? thousands blind শেষে রি windows-এরপর আর সমস্যা হয়নি, ব্যাপারটা ভালই দাঁড়াল।
ধাপে ধাপে, শব্দের পর শব্দ, বিশেষণের পর বিশেষণ যোগ করে রচনাটি স্বাভাবিকভাবেই খুব স্বতঃস্ফূর্ত হয়। সবসময় তা অর্থবহ হয়ে ওঠে কি-না আমি জানি না। জানি না সম্পূর্ণ অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় কি-না, তবে আমার চিৎকার শুরু হয়, কেননা আমি জানি যে বিষয়টি আমার এলাকা, তা সম্পূর্ণভাবে সত্য। আর এই অর্থে তা সার্বজনীন এবং সর্বজনের বোধগম্য। এই অর্থে আমি সময়ের সঙ্গে টিকে থাকতে পারি, লোকে পড়তে পারে, কেঁদে ফেলতে পারে, এটা কয়েক শতক পরেও হতে পারে, এক অর্থে তো ভবিষ্যৎবাণী, কেননা সাধারণ একটি মাত্রাকে স্পর্শ করছে। ভবিষ্যৎ দেখার মানে তো এই নয় যে আমি জানি ১৯৪২-এ বোমা পড়বে, বরং এটা হল আমি এমনকিছু জানি বা অনুভব করছি যা অন্য কেউ জানে এবং আগামি কয়েকশ বছরেও অনুভব করবে।

প্রশ্ন : আপনি একবার বলেছিলেন যে সেজানের মধ্যে একটা কিছু পেয়েছেন। মন্তব্যটি ছিল সেজানের ছবিতে অভিজ্ঞতার পুনর্গঠন বিষয়ে এবং আপনি এটিকে তুলনা করেছিলেন আপনার কবিতার পদ্ধতির সঙ্গে।

গিন্সবার্গ : ১৯৪৯ সাল নাগাদ, কলাম্বিয়াতে থাকার শেষ বছরে যখন আমি মেয়ের স্কাপিরোর সঙ্গে পড়াশুনা করছিলাম, সেজানের ছবি দেখে মুগ্ধ হই। মুগ্ধতা কিভাবে তৈরি হয়েছিল জানি না, তবে ওই সময় আমি ব্লেকের কল্পনার অভিঘাতের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম। ব্লেক পড়ে আমি যা বুঝেছিলাম তা হল, সময়কে অগ্রাহ্য করে কোনো বার্তা পৌঁছে দেওয়া যায় শিক্ষিত মানুষজনের কাছে, কবিতার এমন নির্দিষ্ট প্রভাব আছে। মানুষের অস্তিত্বের কিছু মৌল বিষয় কিংবা অস্তিত্বের তলদেশে পৌঁছতে পেরেছিল তাঁর কবিতা। যাই হোক, আমি যে ধারণা লাভ করলাম তা হল ব্লেকের রচনা একটা টাইম মেশিন যা দিয়ে তিনি মূল চেতনাকে সম্প্রচার করতে পারেন এবং পৌঁছে দিতে পারেন অন্যের কাছে, এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরও। অন্যভাবে বললে, তিনি একটা টাইম মেশিন তৈরি করতে পেরেছিলেন।
ঠিক এই সময়েই আমি সেজানের ছবি দেখি এবং তাঁর ক্যানভাসে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত কেঁপে ওঠার অনুভূতি তৈরি হয়েছিল— চোখের সামনে থ্রি-ডাইমেনশান খুলে গেছিল, ক্যানভাসকে মনে হয়েছিল দারুকাজের মতো, solid-space বিষয়ের মতো। সেজানের ল্যান্ডস্কেপে বিশাল স্পেস ধরা পড়ে, ফিগারগুলোতে জড়িয়ে থাকে রহস্যময়তার গুণ। কখনও তাদের মনে হয় বিশাল থ্রি-ডি কাঠের পুতুল। রহস্যময়, ভৌতিক মনে হয়। অর্থাৎ, একটা অদ্ভুত অনুভূতি তাঁর ছবির ক্যানভাসে তাকালে ধরা পড়ে। এটাকে আমি মেলাতে পারি মহাজাগতিক অনুভূতির সঙ্গে, ব্লেকের Sunflower, Sick Rose ইত্যাদি কবিতার শেষে এমনই হয়েছিল আমার অভিজ্ঞতা। আমি তাই খুঁটিয়ে বুঝতে চেষ্টা করি সেজানের উদ্দেশ্য, তাঁর পদ্ধতি এবং নিউইয়র্কে তাঁর যতগুলো ছবি দেখার সুযোগ হয়েছে, দেখেছি। তাঁকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছি কলাম্বিয়ায় ফাইন-আর্টস কোর্সের জন্যে।
cynic ব্যাপারটা কাজ করেছিল দু’ভাবে। প্রথমত, আমি সেজানে, কম্পোজিশান বিষয়ে আর্ল লোরানের একটি বই পড়ি, যেখানে অনেক ছবি, ছবির বিশ্লেষণ, মূল motif-গুলোর ছবি এবং এসবের পাশাপাশি আসল ছবিগুলোও ছিল। এর একবছর পর আমি সত্যি সত্যি আইক্সে যাই, এবং জায়গাগুলো দেখি যেখানে সেজান এঁকেছিলেন Mont-Sainte-Victoire, ওঁর স্টুডিওতেও যাই, ওঁর ব্যবহৃত motif-গুলো যেমন ওঁর কাল বড় টুপি, ওঁর ঘড়ি ইত্যাদি দেখি। বুঝতে পারি, সেজানের মধ্যে আগে থেকেই নানা ধরনের সাহিত্যগত প্রতিক কাজ করত। এসময় আমারও সময় ও চিরন্তনতার Plotinian terminology-গুলো মনে ছিল, তাই সেজানের প্রথম দিকের ছবিতে ঘড়ি ও বইয়ের তাক এসবকে আমি সময় ও চিরন্তনতার প্রতিক হিসেবে দেখি এবং আমার মনে হতে থাকল যে সেজানও গোপনে একজন বড় অতিন্দ্রিয়বাদি। লোরানের বইয়ে আমি সেজানের স্টুডিও-র একটা ছবি দেখেছিলাম, এঁরও ছিল একজন এ্যালকেমিস্ট বা অপরসায়নবিদের স্টুডিও। সেখানে ছিল মাথার খুলি, লম্বা কাল কোট, আর সেই বড় কাল টুপিটি। সুতরাং সেজানকে আমি একজন ম্যাজিক চরিত্র হিসেবে দেখতে থাকি, একজন হের্মেটিক বা রহস্যবাদি হিসেবে এবং প্রতিক হিসেবেই তাঁর ক্যানভাসগুলো দেখি ও বোঝার চেষ্টা করি এবং আগ্রহ তৈরি হয়। তাঁর ক্যানভাসের মধ্যে আমি এমন অনেক কিছু দেখি যেগুলো হয়ত সেখানে নেই। যেমন একটা আঁকাবাঁকা পথ এক জায়গায় শেষ হয়েছে, এই ছবিটা— আমি দেখি একটা রহস্যময় পথ যা গ্রামের দিকে চলে গেছে এবং পথেও শেষটা দেখা যায় না… তারপর The Cardplayers ছবিতে আমি আবিষ্কার করতে থাকলাম এমন সব অশুভ প্রতিক, যেমন উদাসিন মুখের এক ব্যক্তি ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেওয়ালের গায়ে, তারপর দু’জন চাষির এমনভাবে তাকানো যেন মৃত্যুর চিঠি তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এইসব ক্যানভাস দেখার পর আমি মারিজুয়ানা খাই এবং নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টের বেসমেন্টে যাই। এখানে সেজানের জলরংয়ের কাজগুলো দেখি আর এখানেই সত্যি সত্যি করে আমি সেজানের স্পেস-ধারণার মুখোমুখি হই। একটা কাজ ছিল, নাম সম্ভবত Rocks at Garonne— কিছুক্ষণ এগুলো দেখার পরই সত্যি সত্যি মনে হয় ওগুলো শিলা বা শিলাখণ্ড, কিন্তু আপনি জানেন না ওগুলো কোথায় আছে, মাটিতে, আকাশে বা পাহাড়ের মাথায়— মেঘের মতো শূন্যে ভাসছে, কখনো মনে হবে চক্ষুহীন মুখমণ্ডলের মতো। পুরো ভাবনাটাই রহস্যঘেরা।… এতসব অনন্ত বিষয় আছে সেজানের মধ্যে। তারপর আমি যখন ওঁর চিঠিপত্র পড়লাম, খুঁজে পেলাম মূল ও অমোঘ শব্দগুলো— mes petite sensations, যা তিনি প্রকৃতি থেকে পেয়েছেন এবং পুনর্গঠিত করেছেন ছবিতে। সেজানের হের্মেটিক পদ্ধতির এই হল মূল শব্দবন্ধ। প্রত্যেকেই তাঁর দক্ষতার কথা জানে, ছবি আঁকার পদ্ধতির কথা জানে, সবই উঁচুদরের, কিন্তু এসবের পেছনে যে রোমান্টিকতাযুক্ত মোটিফ, তা অসাধারণ— আপনি বুঝতে পারবেন যে তিনি একজন ঋষি, নিজের যোগপদ্ধতিতে কাজ করছেন সবসময় একটা নির্জন ছোট গ্রামের পরিবেশে।

এই কারণে সেজানের অনেক বিষয় আমি Howl-এর প্রথম পর্বের শেষ অংশে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছি— Sensation of Pater Omnipotens Aeterna Deus; আর Howl-এর শেষ অংশ আসলে শিল্পের প্রতি নিবেদন, কিন্তু বিশেষভাবে দেখলে এটা সেজানের পদ্ধতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন; এক অর্থে, লেখার মধ্যে যতটুকু গ্রহণ করা সম্ভব ততটাই আমি সেজান থেকে গ্রহণ করেছি। এটা অবশ্য ব্যাখ্যা করা খুবই কঠিন, তবে খুব সহজ করে বলতে গেলে বলব— সেজান যেমন স্পেস তৈরি করতে পরিপ্রেক্ষিতের রেখা আঁকেন না, তিনি শুধু একটা রংয়ের বিপ্রতিপে অন্য একটি রংয়ের ব্যবহার করেন (যা তাঁর স্পেসের একটি উপকরণ মাত্র), তেমনি আমারও সূক্ষ্ম ধারণা ছিল যে অ-ব্যাখ্যাত, ব্যাখ্যার অতীত, দৃশ্যহীন রেখা, যা হল— একটি শব্দকে অন্য একটি শব্দের বিপ্রতিপে ব্যবহার, দু’টো শব্দের মধ্যেকার শূন্যতা তৈরি (ক্যানভাসে যেমন স্পেসের শূন্যতা), যা মন পূর্ণ করে দেবে অস্তিত্বের অনুভব থেকে। অন্য ভাষায়, শেক্সপিয়ার যখন বলেন— In the dread vast and middle of the night, তখন dread vast I middle-এর মধ্যে কিছু একটা ঘটছে। এটা অন্ধকার রাত্রির গোটা শূন্যতাটিকেই তৈরি করছে— শুধু শব্দের একসঙ্গে ব্যবহার করে। অথবা যেমন হাইকুতে ঘটে— দু’টো আলাদা চিত্রকল্পকে পাশাপাশি বসানো হচ্ছে কোনো যোগসূত্র তৈরি না করেই, কোনো যুক্তিগ্রাহ্য সংযোগ ছাড়াই, এই যোগটুকু তৈরি করে দিতে হচ্ছে মনকে।

O ant

crawl up Mount Fujiyama,

but slowly, slowly

এখন দেখুন একটা ছোট পিঁপড়ে, আর অন্যদিকে মাউন্ট ফুজিয়ামা, এর পরে পাচ্ছেন ‘আস্তে আস্তে’ শব্দ দু’টি। আপনি অনুভব করতে পারছেন এই বিশাল শূন্যতার জগৎকে, যেন এক স্পর্শন্দ্রিয়ের বিষয়। ইসারের এই ছোট্ট হাইকুতে এইভাবে তৈরি হচ্ছে একটা অনুভূতি যাকে বলতে পারি Phenomenon-sensation। তো, কবিতায় আমি এইরকম একটা ব্যাপার তৈরি করতে চাইছিলাম নানা juxtapositions ব্যবহার করে, যেমন hydrogen juke-box, অথবা… winter midnight smalltown streelight rain; সেজান যেমন ঘনক ও চতুর্ভুজ ও ত্রিভুজের পরিবর্তে ত্রিভুজ, ঘনক ও রং ব্যবহার করে পুনর্গঠন করেছেন, আমাকেও তেমনি শব্দ, অবশ্যই ছন্দ, এবং শব্দবন্ধ ব্যবহার করে অস্তিত্বের পুনর্গঠন করতে হচ্ছে কবিতায়। এখন সমস্যা হল, মনের বিভিন্ন অংশের কাছে পৌঁছান, কেননা এক একটি অংশ পর্যায়ক্রমে থাকলেও পরিপার্শ্ব ভিন্ন, একারণে দুই জায়গা থেকে উপকরণ নিতে হচ্ছে। জ্যাজ, জিউকবক্স-এই পরিপার্শ্ব থেকে নিয়েছি jukebox এবং রাজনীতি, হাইড্রোজেন বোমা ইত্যাদি থেকে নিয়েছি hydrogen এবং তৈরি হচ্ছে hydrogen jukebox— সব বিষয়গুলো এক জায়গায় ঘনসন্নিবদ্ধ হচ্ছে। Sunflower কবিতায় যখন cunts of wheelbarrows, rubber doller bills, skin of machinery ইত্যাদি ব্যবহার করেছি, তখন সত্যিই এসবের কি অর্থ দাঁড়াবে জানতাম না, কিন্তু অর্থ কিছু একটা পরে তৈরি হয়ে গেল; দু-এক বছর পর দেখলাম অবচেতনেই একটা স্পষ্ট দ্যোতনা তৈরি করেছি। একটা ফটো ডেভেলপ করার সময় আস্তে আস্তে ছবিটা ফুটে ওঠে। কারণ আমরা মনের সব গহন এলাকা সম্পর্কে সচেতন থাকি না, অর্থাৎ আমরা সচেতন হওয়ার অনেক বেশি জানি, এটা সাধারণত ঘটে, কেননা কখনও কখনও তো মনে হয় আমরা পুরোপুরিই সচেতন।

প্রশ্ন : বিগত পাঁচ ছয় মাসে আপনি কিউবা, চেকোস্লোভাকিয়া, রাশিয়া ও পোলান্ডে গেছেন। এর ফলে কি সাম্প্রতিক বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার ধারণায় স্বচ্ছতা এসেছে?

গিন্সবার্গ : হ্যাঁ, আমার মনে হয় না, আগেও কখনও মনে হত না, যে লেনিনবাদ-মার্কসবাদ কোনো সমাধান হতে পারে, কিন্তু এখন আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে আমার ইচ্ছেগুলোর কোনো সমাধান ওতে নেই। এটা একটা ধর্মীয়তত্ত্বের মতো ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ একে সিরিয়াসলি নেয় না, কেননা এর কোনো মানেও হয় না। এক-এক দেশে এর অর্থ এক-এক রকম। তবে মার্কিন নির্বুদ্ধিতার বিরুদ্ধে বিপ্লবের সাধারণ ধারণাটি ভাল, কিউবার পক্ষে এটি ভাল। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে তো খুবই ভাল।
কিন্তু এই মতবাদ থেকে যে গোঁড়ামি তৈরি হয়, তা খুবই বাজে। সবাই গোঁড়ামির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ-ও বলে যে মার্কিন অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এ হল স্বাভাবিক ফলশ্রুতি। এটা সত্যও হতে পারে।
সে যাই হোক, আমি একটা ব্যাপারে খুবই নিশ্চিত যে সাম্যবাদ বা পুঁজিবাদে কোথাও মানুষের অস্তিত্বের সমাধান মিলবে না। পুঁজিবাদ আমেরিকায় অনুসরণ করা হয়, কিন্তু দেশের অন্তর্জগতটি অত খারাপ নয়, অন্তত আমার চোখে, কিন্তু কিউবা ও ভিয়েতনাম ভ্রমণ করে আমি বুঝতে পেরেছি, আমেরিকার খারাপ দিকগুলোর জন্য ওদের ভুগতে হচ্ছে, এটা তো সাম্রাজ্যবাদেরই মতো। আমেরিকার লোকদের হাতে টাকা আছে, তাদের গাড়ি আছে; আর অন্য সব লোককে মার্কিন বিদেশনীতির জন্য অনাহারে থাকতে হচ্ছে, বোমা খেতে হচ্ছে, রাস্তায় রক্তাক্ত হচ্ছে— এসব আমেরিকাতেও মারাত্মক ব্যাপার বলে পরিগণিত হবে। নিগ্রোদের কথা অবশ্য আলাদা।
এইসব কারণে আমি জানি না, দেখতেও পাই না কোনো সমাধান। এই মাসে আমার মনে হচ্ছিল এই বুঝি এ্যাটমিক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল— দু’ পক্ষই এত অন্ধ ও ভিত যে কোথাও যাওয়ার নেই, যুদ্ধ ছাড়া আর কিছু করার নেই। প্রত্যেকেই আপোসহীন, প্রত্যেকেরই হীন-মানসিকতা। সত্যিই হয়ত যুদ্ধ ঘটবে না, কিন্তু মার্কস-এর মতো কারোর দরকার হয়ে পড়েছে যিনি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে বসে কোনো নতুন পদ্ধতির ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করবেন। একটা শতাব্দি চলে গেছে, প্রযুক্তির ফলে সবকিছু পরিবর্তিত হয়ে গেছে, তাই এখন দরকার হয়ে উঠেছে আর একটা নতুন ইউটোপিয় সমাজব্যবস্থার। বারোজ তো প্রায় এমন কাজই করতে শুরু করেছেন।

কিন্তু যা খুব উল্লেখযোগ্য, তা হল ব্লেকের জেরুজালেমের ধারণা— যা আমার মনে হয় এখন বেশ শক্ত জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। ব্লেক সম্পর্কে অবশ্য এখনও আমার বিভ্রান্তি দূর হয়নি। এখনও ব্লেক আমি এতটা আগাগোড়া পড়িনি যাতে তিনি কোন দিকে আমাদের নিয়ে যেতে চেয়েছেন তা বুঝতে পারব। আমার মনে হয় এটা হল naked human form divine, যা একটা শক্তি, Sexualization হতে পারে, আবার যৌন স্বাধীনতাও হতে পারে— যেসব দিকে আমাদেরও বিশ্বাস আছে। আবার ওঁর imagination সম্পর্কে কিছু নিজস্ব কথা আছে, যা অবশ্য আমি বুঝতে পারিনি। এটা শরীরের বাইরের জিনিস, যা শরীরকে অগ্রাহ্য করে— এসব আমি ভাল বুঝি না। এমনকি মৃত্যুর পরেও জীবনের কথা আছে। এ-ও আমি এখনও বুঝতে পারি না। ফিজউইলিয়াম মিউজিয়ামে একটা চিঠি রাখা আছে, চিঠিটি তিনি মৃত্যুর কয়েক মাস আগেই লিখেছিলেন। তিনি লিখেছেন— ‘আমার শরীর নানা রকম অসুবিধা ও চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে, কিন্তু আমার চিন্তা, আমার চিন্তাক্ষমতা ও আমার কল্পনা আগের চেয়েও শক্তিশালি অবস্থায় আছে।’ আমি এসব বুঝতে পারি না। আমার মনে হয় আমি যদি মৃত্যুশয্যায় থাকি, শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করি, আমি আত্মসমর্পণ করে বসব, কারণ আমি জানি, আমার মনে হয় না শরীরের বাইরে আমার কোনো অস্তিত্ব থাকবে। উনি কিন্তু ভাবতে পেরেছিলেন যে থাকবে। মনে হয় না উইলিয়ামও এরকম ভেবেছিলেন। অর্থাৎ, উইলিয়ামের জগৎ-ও শারীরিক জগতের সঙ্গে বাঁধা ছিল। কিন্তু ব্লেকের পৃথিবী শরীরের বৃত্তে বাঁধা ছিল না। খুবই রহস্যময় ব্যাপার, কোনো দূর পৃথিবী বা অন্য সমুদ্রের মতো দূরবর্তী। এখনও ধাঁধার মতো হয়ে আছে।

ব্লেকের জেরুজালেমিয় জগৎকে Mercy-Pity-Peace-এর জগৎ বলে চেনা যায়। এর একটা মানবিক চেহারা আছে।

প্রশ্ন : ব্লেক বলেছিলেন যে এই যুগে আত্মার প্রধান প্রবেশ পথগুলো হল চেতনা। এ সম্পর্কে আপনার ধারণা কি? আমি তো ‘এই যুগ’ বলতে কি বোঝায় বুঝতে পারিনি। ‘এই যুগ’-এর পাশে কি অন্য এই যুগ আছে?

গিন্সবার্গ : উনি যা বলেছেন তা খুবই মজার, কারণ হিন্দুপুরাণেও একই কথা বলা আছে। ওখানেও এই যুগকে বলা হয়েছে ‘কলিযুগ’, ধ্বংসের যুগ অথবা বস্তুতান্ত্রিকতায় নিমজ্জিত একটি যুগ। অনেকটা এই রকম ধারণা ভিকো-তে আছে। স্বর্ণযুগ থেকে লোহাযুগ, তারপর আবার প্রস্তরযুগ। হিন্দুরা বলেন যে এই যুগটা হল কলিযুগ বা কলিচক্র, এবং আমরা সবাই বিষয়ে ডুবে আছি, আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ই বিষয়; চেতনায় পৌঁছতে মনন, চিন্তা, সংযম, অনুশিলন, সাধনা, জ্ঞানযোগ বা কর্মযোগ দরকার।
খুব অদ্ভুতভাবে বৃন্দাবনে এক মহিলা গুরুমাতা শ্রীকৃষ্ণজি আমাকে বলেছিলেন ব্লেককে গুরু হিসেবে গ্রহণ করতে। গুরু বিভিন্ন রকমের আছে— গুরু মৃতও হতে পারে, জীবিতও হতে পারে, যিনিই আপনাকে দীক্ষা দিচ্ছেন, তিনিই গুরু। সেই অর্থে, আমি তো দীক্ষিত হয়েছি ব্লেকের কাছ থেকে— পেয়েছি আনন্দঘন অভিজ্ঞতা। এই কারণে কেমব্রিজে ফিরেই আমি ছুটেছিলাম ফিজউইলিয়াম মিউজিয়ামে।

প্রশ্ন : ব্লেক সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতার কথা কি বলছিলেন?

গিন্সবার্গ : ১৯৪৫ সাল নাগাদ আমি Supreme Reality সম্পর্কে আগ্রহান্বিত হয়ে উঠি। এই Supreme Reality-র খোঁজে আমি লম্বা লম্বা কবিতা লিখে ফেলি। দস্তয়ভস্কি বা টমাস উলফের ধারণার মতো, কিংবা র‌্যাবো, যাঁর ভাষায় new vision, তাই তো? ১৯৪৮-এ ইস্ট হার্লেমে আমি ছিলাম— এটা সেই Ancient Mariner-এর মতো, যা আমি অনেকবার বলেছি আগেই : Stoppeth one of three./ ‘by the long grey beard…’ গলায় একটা এ্যালবাট্রস ঝুলিয়ে ঘুরছি… সে সময় আমার মনে হয়েছিল যে আমি যখন দু’ এক দশক পর কোনোদিন সবার কাছে আমার এই অভিজ্ঞতার কথা বলব, তখন একটা সাংঘাতিক গা-ছমছমে ব্যাপার হবে। একটা দীর্ঘকবিতাও লিখেছিলাম, তাতে ছিল— I will grow old, a grey and groaning man,/ and with each hour the same thought, and with each thought the same denial./ Will I spend my life in priase of the idea of God?/ Time leaves no hope. We creep and wait. We wait and go alone-`Psalm II’— যা আমি কখনও ছাপতে দিইনি। যাই হোক, সেই দিনগুলোতে আমি খুবই নির্জন নিঃসঙ্গতার মধ্যে ছিলাম, আত্মার অন্ধকার রাতের মতো আর কি, পড়েছি ‘সেন্ট জন অব দ্য ক্রস’, আর আমি দূরে থাকার জন্যই হয়ত অন্যরাও সব দূরে দূরে— বারোজ ছিলেন মেক্সিকোয়, জ্যাক চলে গেছিল লং আইল্যান্ডে,— এদের সবার সঙ্গেই আমার অনেক বছরের সম্পর্ক। হাংক সম্ভবত জেলে, বা ওইরকম কিছু। আমি জানি এমন কেউ নেই। সেই সময় আমার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এন-সি-র সঙ্গে, সেই এন-সিও আমাকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল, সম্পর্ক শেষ, আমরা আর নিজেদের প্রেমিক বলে মনে করব না। অথচ আমাদের বেশ ভাল ও কোমল প্রেমিকদ্বয়ের বোঝাপড়া ছিল। নীল ক্যাসাডিকে আমি এন-সি বলতাম। কিন্তু আমার চলে আসাটা ও মেনে নিতে পারল না। তিন হাজার কিলোমিটার দূরে ও, আর ওকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য ওর ছ’হাজার মেয়েবন্ধু— ওরাই ওকে ব্যস্ত রেখেছে। তাই ও চিঠি— এ্যালেন, আমাদের নতুন পথ দেখতে হবে। আর এটাই আমার সমস্ত কোমল আশা-ভরসার ওপর শক্ত আঘাত হানল। আমার মনে হল, আমার অস্তিত্বের সাইকোস্পিরিচ্যুয়াল দিকগুলো আর পূর্ণতা পাবে না। আমি তখন গ্রাজুয়েশান করছিলাম, মনে হল কোথাও যাওয়ার নেই, চাকরি পাওয়াও মুস্কিল। শেষমেষ আমার তাই কিছুই করার ছিল না— ভেজিটেবলস খাওয়া ও হার্লেমে বাস করা ছাড়া। একটা এপার্টমেন্টে অন্য একজনের সাবলেট করা ফ্লাটে থাকতাম।

আশাভরসাহীন এইরকম একটা অবস্থায় বলা ভাল একটা পরিবর্তনের অধ্যায় তৈরি হচ্ছিল। এটা একধরনের স্থিতিস্থাপকতা, মানসিক ক্ষমতা— নতুন Vision নেই, Supreme Reality নেই, শুধু আমার সামনে যে পৃথিবী তাই সব, এমন ভাবনা। আমি জানি না এই পৃথিবী নিয়ে আমি কি করব। তো, এইরকম একটা অবস্থায় যখন ব্লেকের বই হাতে এল, আমি তো পড়তেই পারছিলাম না, চোখ বোলাচ্ছিলাম Ah, Sunflower -এর পাতায়, তখন হঠাৎ-ই আগে অনেকবার পড়া কবিতাটি চোখের সামনে যেন উঠে এল— এর অনেক জায়গার অর্থই আমার কাছে স্পষ্ট ছিল না। এখন আমি হঠাৎ আবিষ্কার করলাম কবিতাটি আমাকে নিয়েই কথা বলছে। Ah, Sun-flower! weary of time,/ Who countest the steps of the Sun;/ Seeking after that sweet golden clime,/ Where the traveller’s journey is done— অর্থ বোধগম্য হতে শুরু করল। হঠাৎ দেখা এবং সেই সঙ্গে বুঝতে পারার পাশাপাশি আমি ঘরে একটা খুব গাঢ় পার্থিব কণ্ঠ শুনতে পেলাম এবং আমি সঙ্গে সঙ্গে, দুবার ভাবতে হয়নি, চিনতে পারলাম এই কণ্ঠস্বর ব্লেকের। আমার চোখ কবিতায়, পাশাপাশি শ্রাব্য হ্যালুসিনেশন, বা আর যে টার্মিনোলজিই ব্যবহার করি না কেন, এই ভৌতিক কণ্ঠস্বর আমার ঘরে— আমাকে আরো গভীরভাবে কবিতাটির বোধগম্যতায় নিয়ে গেল, ওই কণ্ঠস্বরে ছিল এমন পুরোপুরি পেলবতা ও সৌন্দর্যময় প্রাচীনতা। Ancient of Days এর মতো। কিন্তু কণ্ঠস্বরে যে অদ্ভুত গুণ ছিল, তা হল ওই কণ্ঠস্বর ভোলার নয়, কেননা তা মনুষ্যকণ্ঠে ঈশ্বরের মতো— Where the youth pined away with desire,/ And the pale Virgin shrounded in snow,/ Arise from their graves, and aspire/ Where my Sun-flower wishes to go— জানলার বাইরে তাকিয়ে, জানলা দিয়ে আকাশ দেখে আমার মনে হল আমি যেন এই ব্রহ্মাণ্ডের গভীর অবধি দেখতে পাচ্ছি। শুধু পুরোনো আকাশের দিকে তাকিয়েই এই উপলব্ধি হল আমার। আকাশকে খুবই প্রাচীন মনে হল। এই সেই প্রাচীন স্থান যার কথা ব্লেক বলছিলেন— সুন্দর সোনালি দেশ। আমি উপলব্ধি করলাম এই হচ্ছে সেই অস্তিত্ব আর আমি জন্মেছিলাম এই মুহূর্তের অভিজ্ঞতা লাভ করার জন্য যে এই অস্তিত্ব আমার। অর্থাৎ, এই মুহূর্তের জন্যেই আমি জন্মেছিলাম। এটাই শুরু— নিজের মধ্যে বেঁচে থাকার ও সৃষ্টিকর্তার মধ্যে নিজে বেঁচে থাকার চেতনা বা ভিশন। এই সৃষ্টিকর্তা, যিনি আমাকে স্নেহ করেছেন, যাঁর পুত্র হিসেবে আমি অনুভব করলাম তিনি আমার ইচ্ছের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছেন। এই ইচ্ছে দুদিক থেকেই।
যাই হোক, আমার প্রথম ধারণা হল এই উপলব্ধির জন্যই আমার জন্ম; আর দ্বিতীয় ধারণা হল আমি কখনই এটা ভুলতে পারব না, অস্বীকারও করতে পারব না। ওই কণ্ঠস্বর কখনও অস্বীকার কর না, না কখনও ভুলে যেও না, কখনও অন্য জগতে মানসিকভাবে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে, বা কাজের জগতে, বিজ্ঞাপনের জগতে বা যুদ্ধ পৃথিবী বা মাটির পৃথিবীতে হারিয়ে যেও না। বিশ্বের শক্তিকে উপলব্ধি করার জন্যে আমি যেন জন্মালাম। যেদিকেই তাকাই, দেখি বিরাজমান হাতের চিহ্ন— এমনকি ইটপাথরে, ইটের সাজানোর মধ্যে। কোনো হাত যেন ওসব রেখেছে ওখানে— কোনো হাত যেন গোটা বিশ্বকে ওখানে স্থাপন করেছে। কোনো হাত আকাশকে স্থাপন করেছে, না, ঠিক হল না, বরং আকাশ নিজেই যেন ওই নীল হাত। অথবা ঈশ্বর যেন আমার চোখের সামনে— এই অস্তিত্বই যেন ঈশ্বর। তখন অবশ্য আমি এইসব শব্দ প্রয়োগ করে লিপিবদ্ধ করতে পারিনি। আমি যা দেখছিলাম তা অবশ্য কাল্পনিক ব্যাপার, আমার শরীর হালকা হয়ে উঠেছিল, আমি অনুভব করছিলাম এক মহাজাগতিক চেতনা, আন্দোলন, জ্ঞান, ভয় ও বিস্ময়।
কিন্তু সেই একই ধরনের ‘petite sensation’ আবার ঘটেছিল কিছুক্ষণ পর, সেই একই কণ্ঠস্বর শুনলাম, যখন আমি The Sick Rose কবিতাটি পড়ছিলাম। এর একটা অর্থ ছিল যা আমি এখন তেমনভাবে ব্যাখ্যা করতে পারব না। তবে sick rose হচ্ছে আমার সেল্ফ অথবা জীবন্ত শরীর। sick কেননা মন হচ্ছে একটা পোকা— that flies in the night, in the howling storm, অথবা যুক্তি; অথবা বলা যায় পোকাটি হল মৃত্যু, মৃত্যুর স্বাভাবিক প্রক্রিয়া— একধরনের রহস্যময় প্রাণ শরীরে ঢুকে শরীরকে খেয়ে ফেলতে চাইছে, শরীর এই গোলাপ। ব্লেকের এই ছবিটা বেশ জটিল-গোলাপটি তেমন প্রাণবন্ত নয়, দুর্বল, কেননা তার মৃত্যু হচ্ছে, তার ভেতরে আছে পোকা। এটা ভয় পাওয়ার মতো— মৃত্যু সম্পর্কে এই ধারণা। এটা ব্লেকের ভবিষ্যৎবাণীর মতো, ভবিষ্যৎবাণী ঠিক মানবিক অর্থে নয়, এটা হল এই অর্থে যে সমগ্র বিশ্বের গোপন অন্তঃস্থলে যেন ব্লেক প্রবেশ করেছেন এবং বেরিয়ে এসেছেন কিছু জাদুময় ফর্মুলার বিবৃতি নিয়ে যা-কবিতায়, ছন্দে প্রকাশ পেয়েছে। অন্তরের শ্রবণেন্দ্রিয় দিয়ে যদি শোনা যায়, তবে তার ছন্দস্পন্দন আপনাকে বিশ্বের বাইরে নিয়ে যাবে।
এরপর আরো একটি কবিতা একই দিনে একই ধরনের অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করল। কবিতাটি হল—
The Little Girl Lost—

Do father, mother weep?

Where can Lyca sleep?

How can Lyca sleep

If her mother weep?

If her heart does ache

Then let Lyca wake;

If my mother sleep

Lyca shall not weep.

এটা এমন মোহাচ্ছন্ন করে রাখে যে আমি বুঝতে পারলাম আমিই লাইসা; পিতা, মাতা লাইসাকে খুঁজছে, ঈশ্বর সন্ধানের মতো, পিতা তো সৃষ্টিকর্তা, আর If her heart does ache/ then let Lyca wake-কোথায় জাগবে? জাগার অর্থ সেই একই চেতনায়, জাগ্রত হওয়া, যার কথা আমি এতক্ষণ বলছিলাম,— এই সমগ্র বিশ্বে অস্তিত্বের চেতনা। সমগ্র চেতনা তাহলে সম্পূর্ণ বিশ্বের চেতনা, যা ব্লেক বলেছেন।
তারপর এমন একটা সময় এল যখন মাঝে মাঝেই ফ্ল্যাশের মতো এই পরম সুখ (আমার এই অভিজ্ঞতাই তো পরম সুখ) ফিরে ফিরে এল। এই সব বর্ণনা করা আছে The Lion for Real-এ— বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কাহিনির মধ্যে দিয়ে। বস্তুত, সে এক কঠিন সময় গেছে। কারণ হঠাৎ-ই আমার মনে হল— ওহ্, আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। এটাও Howl-এর ‘Who thought they were only mad when Baltimore gleamed in supernatural eestasy’ বা ‘who thought they were only mad…’ কিন্তু এত সহজ তো নয়। পাগল হলে তো ব্যাপারটা খুবই সহজ হয়ে যেত। অন্যদিকে, এ তো সত্য, আর আপনি এই মহাজাগতিক বিশ্বে জন্মেছেন spirit angel হয়ে— এই অবস্থার মুখোমুখি হওয়া অত্যন্ত কঠিন। আর সে সময় আমি যা করেছিলাম তা মনে আছে। পাশের ঘরগুলোতে কিছু মেয়ে বাস করত, আমি হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে তাদের জানলায় শব্দ করেছি, আর বলেছি— ‘আমি ঈশ্বরকে দেখেছি।’ আর ওরা দুড়্‌দাড়্ জানলা বন্ধ করেছে। ওহ্, ওরা জানে না— যদি আমাকে ভেতরে ঢুকতে দিত, কি অবিশ্বাস্য কাহিনি আমি ওদের শোনাতে পারতাম। কারণ আমি তখন মনের এক অতি উচ্চ অবস্থায় ছিলাম এবং আমার চেতনা তখনও ছিল। আমার মনে আছে আমি তৎক্ষণাৎ প্লেটো খুলে বসি এবং Phaedrus-এর কিছু অসাধারণ চিত্রকল্প পড়তে থাকি, যেখানে অশ্বরা আকাশে উড়ে যাচ্ছে, আমি খুলেছি সেন্ট জন এবং অংশবিশেষ পড়তে থেকেছি, যেখানে আছে con un no saber sabiendo… que me quede balbuciendo; এরপর বুকসেল্ফের অন্যদিকে গিয়ে তুলে নিই Plotinus— এটি অবশ্য আমার পক্ষে ব্যাখ্যা করা বেশ কঠিন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আমি আমার চিন্তাপ্রক্রিয়াকে বাড়িয়েই চললাম। তখন আমি যে কোনো বই পড়েই তার মধ্যে ঈশ্বরিক তাৎপর্য খুঁজে পেতে লাগলাম। ওই সপ্তাহে বা মাসে জন স্টুয়ার্ট মিলের বিষয়ে আমাকে পরীক্ষায় লিখতে হয়েছিল। কিন্তু, তাঁর ভাবনা সম্পর্কে লেখার পরিবর্তে আমি তাঁর পাঠ-অভিজ্ঞতায় মগ্ন থাকি। তাঁর ওয়ার্ডসওয়ার্থ পাঠ। ওয়ার্ডসওয়ার্থ পাঠ করে প্রকৃতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ ঘটে তাঁর। ‘Sense sublime’ বা ওইরকম কোনো শব্দবন্ধে তাঁর চোখ আটকে পড়ে। সত্যিই ওটা ওয়ার্ডসওয়ার্থের খুব ভাল বর্ণনা,— the Sense sublime of something far more deeply interfused/ whose dwelling is the setting sun, and the round ocean and the living air— ওয়ার্ডসওয়ার্থ এইরকম বলেছিলেন, না? the living air— দেখুন, আবার সেই হাতের চিহ্ন, মানুষের অন্তরে। সুতরাং আমার মনে হয় যে কোনো মহৎ কবিতার বৈশিষ্ট্যই হল এই অভিজ্ঞতা। আমি বলতে চাই যে এভাবেই আমি কবিতাকে কোনো নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার জ্ঞাপন হিসেবে দেখতে শুরু করি। যে কোনো অভিজ্ঞতা নয়, এই অভিজ্ঞতা।

প্রশ্ন : এই অভিজ্ঞতা কি আর পরে হয়েছে?

গিন্সবার্গ : হ্যাঁ, কিন্তু আমি ওই সময়ের কথা এখনও শেষ করিনি।… তো, আমি বুঝতে পারছি না কি করব, অথচ এই উপলব্ধিটা ফিরিয়ে আনতে চাইছিলাম। আমি তাই ব্লেক ছাড়াই পরীক্ষা করতে চাইলাম। একদিন আমার রান্নাঘরে… রান্নাঘর বলতে অবশ্য সেকেলে রান্নাঘর, একটা সিংক ও টাব, ওপরে একটা বোর্ড লাগানো; তো সেখানেই আমি ঘুরতে শুরু করি গোটা শরীর ঝাঁকিয়ে, নাচতে থাকি এদিকওদিক, আর মুখে বলি— Dance! dance! dance! dance! Spirit! Spirit! Spirit! Dance! আর হঠাৎ আমার ফাউস্টের মতো মনে হল… আর তারপরই সেই উপলব্ধি আমার মধ্যে আসতে শুরু করল— দীর্ঘ লতানো অনুভূতি, আর আমি ভয় পেয়ে নাচ ছেড়ে দিই।
কলাম্বিয়াতে ঘুরতে থাকি, একদিন গেছি কলাম্বিয়া বুকস্টোরে, আবার ব্লেক পড়ছি। হাতে নিয়েছি ব্লেকের The Human Abstract বইটি, পাতা ওল্টাচ্ছি Pity would be no more… ইত্যাদি ইত্যাদি। তখনই হঠাৎ ওই বুকস্টোরে একই অভিজ্ঞতা ভর করল আমার ওপরে। আবার আমি অনন্ত স্থানে বিরাজ করতে থাকলাম। সবার মুখের দিকে তাকাই, দেখি সব মুখই বন্যপ্রাণির। বুকস্টোরের কেরানিটির মুখটি ছিল লম্বা জিরাফের মতো, লম্বা নাক। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে তার নিপীড়িত আত্মাটিকে দেখতে পেলাম, আর তাকে অত্যন্ত আপনার, এই বিশ্বের আমার একজন ভ্রাতা বলে মনে হল। আমি আরো উপলব্ধি করলাম, এই আত্মিয়তার কথা সে-ও জানে আমার মতোই। দোকানের অন্যরাও জানে, অথচ সবাই গোপন করছে। তাদের সবার চেতনা আছে, অথচ বিশাল অচেতনতার মতো আমাদের মধ্যে আছে। আমাদের দৈনন্দিন কাজে, অভিব্যক্তিতে, ব্যবহারে, কথায় মুখোশের আড়ালে দিচ্ছি আমাদের চেতনাকে। সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল যে এখন যদি আমরা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করি, তবে তা মারাত্মক ব্যাপার হবে— ধ্বংস হয়ে যাবে এই বইয়ের দোকান। আবার যে অবস্থার মধ্যে সবাই আছে, তা-ও হাস্যকর। প্রত্যেকেই বই নিয়ে একে অপরের কাছে ফেরি করছে। এখানে, এই বিশ্বে! কাউন্টারে পয়সা দিচ্ছে, বই মুড়ে ব্যাগে ঢোকাচ্ছে, দরজা পাহারা দিচ্ছে, বই চুরি করছে, কেউ উপরের তলায় হিসেব কষছে, কেউ পরীক্ষা নিয়ে চিন্তিত হয়ে দোকানে এসে ঘুরছে— এদের সবার কত লক্ষ লক্ষ ধরনের চিন্তা মাথায়— এসব নিয়ে আমি চিন্তিত হচ্ছি। আমি সবার অদ্ভুত মুখোশগুলো দেখতে পেলাম; অদ্ভুত— কেননা একে অপরের কাছ থেকে জ্ঞান লুকিয়ে রাখছে। অথচ সবাই তা জানে পুরোপুরি— যে অর্থে আমি বলছি সেই অর্থেই ওরা সব জানে।

প্রশ্ন : আপনার কি এখনও তা মনে হয়?

গিন্সবার্গ : এখন অবশ্য আমি আর নিশ্চিত নই। এখন আবার ওই রকম চেষ্টা করলে বোঝা যাবে। আপনি বুঝতে পারছেন যে ওরা জানতে পারছে যখনই আপনি ওদের জানাতে চাইছেন। ওই মুহূর্ত তৈরি না হওয়া পর্যন্ত কোনো কমিউনিকেশন সফল হচ্ছে না।

প্রশ্ন : কেন এমন বলছেন?

গিন্সবার্গ : গ্রহণ না-করার ভয় তো থাকেই। ওইসব লোকের বাঁকাচোরা মুখাবয়ব মনে করুন, মেনে নিতে না-পারার জন্যই তো এমন হয়েছে। এছাড়া শেষ পর্যন্ত নিজেদের প্রতি ঘৃণাভাব। অর্থাৎ মেনে নিতে না-পারাটার আত্মিকরণ ঘটছে। অনন্ত আত্মার মধ্যে তৈরি হচ্ছে অবিশ্বাস। আসলে আমরা যে চেতনা বহন করছি, তা খুবই কষ্টকর, ওই না-মেনে নিতে পারার জন্য। যে ইচ্ছেটা তৈরি হয় তা রুদ্ধ থাকছে। ‘Where the youth pined away with desire,/ And the pale Virgin Shrouded in snow’ অথবা ব্লেক যেমন বলেছেন On every face I see, I meet/ Marks of weakness, marks of woe; তো, বুকস্টোরে দাঁড়িয়ে আমি এই দুর্বলতার চিহ্নগুলোই দেখছিলাম। আপনি এখনও যে কোনো মুখের দিকে তাকিয়েও এই চিহ্ন খুঁজে পেতে পারেন, যেভাবে ঠোঁট দুটো ফাঁক হচ্ছে, চোখের পাতা নড়ছে, যেভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ হচ্ছে কোথাও— সর্বত্রই ওই চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু সমস্যা হল এসব উপলব্ধি করার, উপলব্ধি করে কমিউনিকেট করার।…
এর এক সপ্তাহ পরে আর একটা অভিজ্ঞতা হল আমার যখন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যের একটা রাস্তায় লাইব্রেরির পাশ দিয়ে সন্ধ্যাবেলায় হাঁটছিলাম। আমি ওই শক্তিকে জাগ্রত করার চেষ্টা করলাম। ঘটলও তাই। ওই সময়ে ওটাই ছিল শেষবার। সেই একই গভীর চেতনা, মহাজাগতিক চেতনা, কিন্তু পরম সুখের ছিল না তা, বরং ভীতিপ্রদ। আকাশটা নীল হাতের মতো ছিল না। আর, বরং তা হয়ে উঠেছিল মৃত্যুর হাত— যা আমার উপর নেমে আসছিল। আমি যেন প্রায় ঈশ্বরকে দেখলাম, অথচ এই ঈশ্বর পিশাচের মতো। এই চেতনা ছিল এত ব্যাপক যে তার অভিজ্ঞতা আগে হয়নি। এই অভিজ্ঞতা মানবিকও নয়— আমি যেন ওই অ-মানবিকের মধ্যে মৃত্যুলাভ করতে যাচ্ছি। অভিজ্ঞতাটা সম্পূর্ণভাবে Gates of Wrath-এর মুখোমুখি হওয়ার। ব্লেকের এ সম্পর্কে একটি কবিতা আছে : ‘To find a Western Path/ Right through the Gates of Wrath’— আমি এগোনোর চেষ্টা করিনি আর, আমি বুঝতে পেরেছি যে আমি অত্যন্ত বেশি দূরে চলে গেছিলাম।

প্রশ্ন : এই অভিজ্ঞতার পরবর্তী অবস্থাই কি আপনার মাদকাসক্তি?

গিন্সবার্গ : হ্যাঁ, আমি যখন বুঝতে পারলাম যে আমি যে অবস্থায় আছি, এটাই আমার অস্তিত্ব, তখন স্বাভাবিকভাবেই ড্রাগ গ্রহণ আমার চেতনার সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার একটা পদ্ধতি হয়ে উঠল। একই ভিশনের নানা এলাকা, নানা ধাপ, নানা সাদৃশ্য, নানা ধ্বনি-প্রতিধ্বনি আমি অনুভব করতে চাইলাম। মারিজুয়ানার মধ্যে এইসব ছিল— সেই ভয়, মহাজাগতিক ভয়, যা আপনি এতে পেতে পারেন। লাফিং গ্যাস ও ইথারের প্রভাবে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে যখন চেতনা একই ধরনের অবস্থার— আমার ভিশন, ব্লেকের ভিশনকে ব্যবচ্ছেদ করতে পারে। লেক পোয়েটদের কাছে গ্যাস ড্রাগ খুবই চিত্তাকর্ষক ছিল; স্যার হামফ্রি ডেভি তাঁর নিউম্যাটিক ইন্সটিটিউটে এ নিয়ে অনেক গবেষণা করেছিলেন। আমার মনে হয় কোলরিজ, সাউদি ও অন্যান্যরা যেতেন, ডি কুইন্সিও। এরা কিন্তু সবাই সিরিয়াস লোকজন। এ নিয়ে খুব বেশি মনে হয় লেখা হয়নি। এক শনিবারের মধ্যরাতে হামফ্রি ডেভির বাড়িতে কোলরিজ পৌঁছেছিলেন লেক ও জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পায়ে হেঁটে, কি হচ্ছিল সেখানে? তারপর ধরুন, অপিয়াম, হেরোইন ইত্যাদির প্রভাবে নানা ধরনের অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাওয়া যায়— প্রায় বিমূর্ত চেতনার অবস্থা— মৃত্যুর পর আপনি আছেন এমন একটা জায়গা থেকে নিচে পৃথিবীকে তাকিয়ে দেখছেন এই রকম। সবসময় এক অনুভূতি হয় না, কিন্তু অবস্থাটা বেশ মজার, কাজেও লাগে। এক অর্থে এটাই স্বাভাবিক অবস্থা, এক ধরনের পুতঃঅবস্থা। নানা হ্যালুসিনেশনের মধ্যে দিয়ে আপনি পান চেতনার স্তর, ব্যক্তিচেতনায় এটা cosmic-ecstatic বা cosmic-demonic হতে পারে।
সুতরাং সংক্ষেপে বললে, ইন্দ্রিয়সংযোগে উপলব্ধি, বিভিন্ন সম্ভাবনার বিচার, চেতনার পদ্ধতি এবং ‘petite sensations’-এর বিভিন্ন অবস্থার বীক্ষণে ড্রাগ খুবই উপকারি। রচনার সময়ও এর উপকারিতা আছে খুব— Howl-এর দ্বিতীয় খণ্ডে লিখেছিলাম পেয়োটের প্রভাবে, পেয়োট ভিশনের সময়ই এর রচনা। সানফ্রান্সিসকোতে Moloch, Kaddish লেখা হয়েছিল এমফিটামিন ইঞ্জেকশন নেওয়ার পর। এমফিটামিন ইঞ্জেকশনের সঙ্গে সামান্য মর্ফিন ও পরে ডেক্সিড্রিন দরকার হয়েছিল লেখা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য, কারণ Kaddish একটানা লেখা হয়েছিল— শনিবার সকাল থেকে রবিবার রাত পর্যন্ত। এমফিটামিন থেকে একটা অদ্ভুত মেটাফিজিক্যাল ঝোঁক আসে। আমি অবশ্য অভ্যস্ত ছিলাম না এতে, ওই একটা সপ্তাহেই নিয়েছিলাম। এটা আমার আবেগের বহিঃপ্রকাশকে অবশ্য রুদ্ধ করেনি।

প্রশ্ন : এর সঙ্গে আপনার এশিয়া ভ্রমণের কোনো যোগ ছিল?

গিন্সবার্গ : হ্যাঁ, এশিয়ার অভিজ্ঞতা আমাকে বাইরে বেরোতে সাহায্য করেছিল। তার আগে আমার মনে হত আমি আমার চেতনাকে বাড়িয়ে চলেছি— এর মধ্যে দিয়েই আমাকে যেতে হবে, অথচ আমাকে নিয়তই ক্রূর দানবের মুখোমুখি হতে হচ্ছিল। অহসনীয় একটা অবস্থা। এমন হয়েছিল যে আমি ড্রাগ নিলেই বমি করে ফেলছিলাম। আমি ধরে নিয়েছিলাম যে আমার কর্তব্য হল ব্যক্তিসত্তা ভেঙে ফেলা ও প্রকৃতির সরাসরি সংস্পর্শে আসা। এই কারণে যখন আমি ভারতে গেলাম, ভারতের মধ্যে ভ্রমণ করলাম, মনের সব কথা যেসব সাধুদের দেখা পেলাম তাদের বললাম। তাদের কোনো পরামর্শ আছে কি-না জানতে চাইলাম। পরামর্শও পেলাম। খুবই ভাল ভাল উপদেশ সব। প্রথমে যার দেখা পেয়েছিলাম, তার নাম মার্টিন বুবের, জেরুজালেমে আমি ও পিটার তার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তার সুন্দর সাদা দাড়ি, বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার। ওর সঙ্গে আমার দীর্ঘসময় ধরে কথাবার্তা হয়েছিল। কি ধরনের ভিশন দেখে থাকেন, পিটার জিগ্যেস করেছিল তাকে। তিনি কিছু ভিশন দেখার অভিজ্ঞতার কথাও বলেন। কিন্তু এ-ও বললেন যে ভিশনে আর তার আগ্রহ নেই, তার ভিশনগুলো ছিল মোটামুটি আধ্যাত্মিক। জানালা দিয়ে অশরীরী ঘরে ঢুকেছে, অবশ্য ব্লেকিয় কোনো দেবদূত মাথায় আঘাত করেনি। আমি ব্যক্তিসত্তা হারানোর কথা ভাবছিলাম এবং অ-মানবিয় বিশ্বের সম্মুখিন হওয়ার সমস্যা তখন আমার ছিল। আমি ভাবছিলাম, এই অবস্থায় মানুষও কি বদলাবে এবং অ-মানবিয় হয়ে উঠবে? বুবের বললেন, তিনি মানুষের মধ্যেকার সম্পর্ক, হিউম্যান-টু-হিউম্যান সম্পর্কে বিশ্বাসি। তিনি বিশ্বাস করেন যে এই বিশ্ব মানুষের বিশ্ব এবং এখানে মানুষের বসবাসই বিধেয়। ‘আমার কথা মনে রেখ যুবা, দু’বছরের মধ্যেই তুমি বুঝতে পারবে আমি যা বলছি তা ঠিক’। তিনিই সঠিক ছিলেন, আমি তার কথা মনে রেখেছিলাম।
এছাড়া, ভারতের ঋষিকেশে ছিলেন স্বামি শিবনানন্দ। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমার নিজের অন্তরই তোমার গুরু।’ এটা শুনে আমার খুবই ভাল লেগেছিল ও স্বস্তি পেয়েছিলাম। আর হঠাৎ-ই আমি বুঝতে পারলাম যে এই অন্তরই আমি খুঁজে চলেছি। অর্থাৎ, এটা চেতনার কথা নয়, petite sensationsও নয়— এখানেই আমি আমার মনে ব্লেকের কল্পনা সম্পর্কে বিভ্রান্তি দেখতে পেলাম। মনের ভেতরেই আমরা নানা ধরনের বিশ্ব গড়ে তুলি, আর স্বপ্নে ও কল্পনায় গড়া যায় আদর্শ বিশ্ব; আর লাইসার্জিক এ্যাসিডের মাধ্যমে আপনি বিকল্প বিশ্বের মধ্যে প্রবেশ করতে পারেন আলোর গতিতে এবং নাইট্রাস অক্সাইডের মাধ্যমে আপনি দ্রুত লক্ষ লক্ষ বিশ্বের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। সমস্ত রকমের বিশ্বের সম্ভাবনা আপনি অভিজ্ঞতায় পেতে পারেন, এমনকি কোনো বিশ্বের না থাকার সম্ভাবনাও সেখানে বিদ্যমান— ঠিক এটাই ঘটে গ্যাসের মাধ্যমে, যখন আপনি অচেতন হয়ে পড়ছেন। আপনি চাক্ষুস করতে পারবেন আপনার চৈতন্য হারানোর সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বও উবে যাচ্ছে, দেখবেন যে এসব আপনার চেতনার ওপর নির্ভরশিল।
সে যাই হোক, ভারতের অনেক জ্ঞানি ও সাধুরাই অঙুলি নির্দেশ করেছে শরীরের দিকে— শরীরের অভ্যন্তরে প্রবেশ, শরীর থেকে বাইরে যাওয়া নয়। জীবিত থাকা এবং মনুষ্যদেহে বেঁচে থাকাই আসল। এ-ও পুনরায় ব্লেকের কাছে ফিরে যাওয়া— the human form divine— বোঝাতে পারছি কি? অর্থাৎ, যে মানসিক সমস্যায় আমি ভুগছিলাম তা কমবেশি এইরকম ছিল যে মৃত্যুই সবচেয়ে বেশি কাম্য। অথবা, মৃত্যুকে ভয় পেও না, মৃত্যুরই কাছে যাও। অ-মানবিয়ের দিকে যাও, মহাশূন্যের দিকে যাও— মৃত্যু ঈশ্বর, ঈশ্বরকে পেতে গেলে তোমাকে মরতে হবে। আমার তাই মনে হয়েছিল যে শরীরকে ভেঙে ফেলাই আমার নিয়তি, যদি অবশ্য আমি সম্পূর্ণ চেতনা অর্জন করতে চাই। পরবর্তী পর্যায়ে গুরুরা একের পর এক বললেন, শরীরেই বাস কর— এই অবস্থার জন্যই তোমার জন্ম। এইসব কাহিনি অতি দীর্ঘ। অনেক সাধুসঙ্গ আর নানাধরনের কথাবার্তা। এ সবকিছুর পরিসমাপ্তি ঘটল এক বছর পর জাপানের এক ট্রেনে, The Change কবিতার মধ্য দিয়ে, যেখানে অকস্মাৎ আমি ড্রাগ পরিত্যাগ করছি। না ঠিক পরিত্যাগ করছি না, তবে অ-মানবিয় কোনোকিছু আমার ওপরে আর আধিপত্য করতে পারবে না— চেতনা পরিবর্ধনের ইচ্ছাও নয়। সবকিছুই করতে পারি, শুধু যেন হৃদয়ের অনুবর্তী হই। তখনই আমার খুব উৎফুল্ল অভিজ্ঞতা হল। আমি এখন নিজেকে ভালবাসতে পারি, ফলত ভালবাসতে পারি আমার চারপাশের মানুষজনকে। বুকস্টোরের অভিজ্ঞতা অথচ অন্যরকম— এখন আমি সম্পূর্ণভাবে শরীরের মধ্যে বর্তমান, আমার কোনো রহস্যময় তাড়না নেই। যে রূপে জন্মেছি, সেই রূপেই মরতে চাই। এবার আমি কাঁদতে শুরু করি, এই সময়টা এত আনন্দের। সৌভাগ্যক্রমে আমি কবিতা লিখতেও পারলাম ‘So that I do will die’ কোনো মহাশূন্যের চেতনা, অমরত্ব, Ancient of Days চিরকালের চেতনা হওয়া নয়। আমি যখন ভ্যাংকোভারে গিয়ে পৌঁছলাম, ওলসন বলেছিল, আমি শুধু চর্মসার একজন মানুষ। আমার মনে হয়েছিল, ভাঙ্কোভারের প্রত্যেকেই আমার সঙ্গেই তাদেরও শরীরের মধ্যে ঘনসন্নিবিষ্ট হয়েছে। কপর্দকশূন্য হয়ে ফিরেছি। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৩— আমার সমস্ত শক্তি যেন পুরোপুরি লোপ পেয়েছে। কিয়োতোর ট্রেনে আমি ব্লেককে অস্বীকার করেছি, অস্বীকার করেছি তার কল্পনাপ্রভা! ব্লেকের কল্পনাপ্রভা থেকে আমার যে জীবনচক্র শুরু হয়েছিল, কিয়োতের ট্রেনে তা শেষ হয়েছে। শুধু ‘এখন’কে নিয়েই আমার আসল চেতনা এখন। আমার চারপাশে যা ঘটছে তার সচেতনতা। আমি জানি এখন আমাকে কল্পনাপ্রভ অবস্থায় পৌঁছানোর সমস্ত চিন্তাপ্রক্রিয়া পরিত্যাগ করতে হবে, এসব এত জটিল, আর বোকামি মাত্র।

প্রশ্ন : মনে পড়ছে আপনি একবার বলেছিলেন Howl গীতিকবিতা ও Kaddish মূলত কাহিনিধর্মী হওয়ায় আপনার মধ্যে একটি মহাকাব্য রচনার অভাববোধ কাজ করছিল। এরকম কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

গিন্সবার্গ : হ্যাঁ, এটা একটা ধারণামাত্র, যা বেশ অনেকদিন ধরে আমার মধ্যে আছে। খুব শিগগির আমি যেটা করতে চাই, তাহল একটা দীর্ঘ কবিতা রচনা— যেটা হবে কাহিনিধর্মী ও সেইসঙ্গে যেসব ভিশনের মধ্যে আমি থেকেছি, তার বর্ণনা। এটা হবে Vita Nuova-র মতো। ভ্রমণও থাকবে। আর একটা খুব বড় দীর্ঘকবিতা লেখার ইচ্ছে ছিল, এতে আমি তাদের সবার কথা লিখব, যাদের সঙ্গে আমার যৌনসম্পর্ক ঘটেছে। যৌনপ্রেমের কবিতা। বেশ বড় প্রেমের কবিতা। সারাজীবনের সমস্ত শরীরী সম্পর্কের কথা। এটা অবশ্য মহাকাব্য নয়। মহাকাব্য এমন কবিতা, যাতে ইতিহাস থাকবে, যেভাবে ইতিহাসের সংজ্ঞা দেওয়া হয় সেইভাবে। বর্তমান রাজনীতি থাকবে। অনেকটা লিখেছি। Kaddish কাহিনি, কিন্তু মহাকাব্যের ব্যাপারটাই আলাদা। এটা হবে রাজনৈতিক বিষয়গুলোর ওপরে সহজ ও মুক্ত সংযোগ। এটাকে বারোজের মতো মহাকাব্য হতে হবে।

প্রশ্ন : পাউন্ডের মতো মহাকাব্য?

গিন্সবার্গ : না, পাউন্ডের মতো নয়, কেননা পাউন্ড আমার মনে হয় অনেকদিন ধরে তার কাহিনি বুনেছেন— পড়াশুনার মধ্যে দিয়ে ও সাহিত্যের ভাণ্ডার থেকে। কিন্তু আমার বিষয় হবে সমসাময়িক ইতিহাস, খবরের কাগজের হেডলাইন, স্টালিনবাদ ও হিটলার, জনসন ও কেনেডি, ভিয়েতনাম ও কংগো, লুমুম্বা ও দক্ষিণ আমেরিকা, স্যাকো ও ভ্যানজেটি— অর্থাৎ যা কিছু ব্যক্তিচেতনায় ভেসে ওঠে।

প্রশ্ন : কবিতায় এই সময়ে কি ঘটছে?

গিন্সবার্গ : আমি এখনও ঠিক জানি না। নানা বিভ্রান্তি সত্ত্বেও আমার মনে হয় কেরোয়াকই আমেরিকার সবচেয়ে বড় কবি। বছর কুড়ি কেটে গেছে, তবুও মনে হয়। প্রধান কারণ হল উনি হলেন খুবই স্বচ্ছন্দ ও স্বতঃস্ফূর্ত। তাঁর কবিতার বিষয় ও চিত্রকল্পের ব্যাপ্তি আছে। Mexico City Blue— বিষয় হিসেবে খুবই উচ্চস্তরের। যদি এর নাম দিতে হয় তবে বলব— এটা হল প্রোজেক্টিভ ভার্স। এছাড়া, বড় কবি হওয়ার আর একটা গুণ ওঁর আছে, উনি আমেরিকার একমাত্র কবি যিনি খুব ভাল হাইকু লিখেছেন। অনেকেই চেষ্টাচরিত্র করে হাইকু লিখছেন, কিন্তু কেরোয়াক ভাবেন হাইকুতে। যখন যা লেখেন, ভাবেন ও কথা বলেন সেইভাবে। এটা ওঁর কাছে খুবই স্বাভাবিক। এটা স্নাইডার লক্ষ করেছিলেন। তাই একটা হাইকু লেখার জন্য জেন মনাস্টারিতে তিনি দু’ বছর কষ্ট করেছেন। কিন্তু ভাল হাইকু ওই দু’একটি পর্যন্ত। আসলে হাইকু রচনাই হল বড় পরীক্ষা। সেক্ষেত্রে কেরোয়াকই হাইকুতে সবচেয়ে দক্ষ। তার স্টাইল তো আছেই। তিনি তো গদ্য ও পদ্যের পার্থক্যও ভেঙে দিয়েছেন। এমনভাবে ভেঙেছেন যে আমি তো বলছিলাম মহাসামুদ্রিক কোনো কোনো পৃষ্ঠা মহাকাব্যের উচ্চতা পেয়ে যায়। আর এখানেই মনে হয় যে তিনি আরো এগিয়ে লেখার অস্তিত্ববাদি বিষয়কে অপরিবর্তনিয় কর্ম বা বিবৃতি হিসেবে ভেবেছেন, আর ভাবনা একবার রূপ পেলে তা অসংশোধনিয় থেকে গেছে। আমি বস্তুত গতকালই ভাবছিলাম যে একটা সময় কেরোয়াক যখন আমাকে বলেছিলেন যে ভবিষ্যতে সাহিত্য বিবেচিত হবে শুধু যা লেখা হয়েছে, তার ওপরে, লেখা হয়েছে এমন ধরে নেওয়ার জায়গা থাকবে না— এটা আমাকে খুবই বিস্মিত করেছিল।

প্রশ্ন : অন্যান্য কবিদের সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?

গিন্সবার্গ : আমার মনে হয় কর্সোর নতুন কিছু করার প্রতিভা আছে। লামান্টিয়ার সলজ্জ বন্যতাও ভাল লাগে। ও যাই লেখে, আমার ভাল লাগে। ওর মধ্যে আত্মার এগিয়ে যাওয়ার বোধ কাজ করে— আধ্যাত্মিক নিরীক্ষা আছে, ধারাবাহিকতা অনুসরণ করলে ওর লেখা খুবই উত্তেজক মনে হবে। হোয়ালেন ও স্নাইডার খুবই বিজ্ঞ এবং নির্ভরযোগ্য। অবশ্য হোয়ালেন আমি তেমনভাবে ধরতে পারি না। প্রথমদিকে পারতাম, তবে এখন আমাকে সময় নিয়ে বসে ওর লেখা বিচার করতে হবে। প্রথম দিকে ওর লেখা জল-মেশানো মনে হলেও পরে দেখেছি ঠিকই আছে। ম্যাকলিউয়ের আছে দুর্দান্ত প্রাণশক্তি। ও এক জায়গায় থেমে নেই। আর উইনার্স— আমি সব সময় ওর সঙ্গে কাঁদি। এত উজ্জ্বল! এরা সবাই প্রবীণ কবি— সবাই এদের সম্পর্কে জানে। বারোজও কবি, সত্যি কবি এই অর্থে যে ওর একপাতা গদ্য সঁ জঁ র‌্যাবোর মতোই চিত্রকল্পে ঘন। এই গদ্যের বিশাল স্পন্দন আছে, ছন্দ আছে, মিলও আছে কখনও কখনও। আর কে?… হ্যাঁ, ক্রিলির লেখাও খুব বলিষ্ঠ। আমি ওর এক ধরনের লেখা খুবই পছন্দ করি, যেগুলো আগে বুঝতাম না। যেমন The Doors, এটা প্রথমে আমাকে খুবই বিভ্রান্ত করেছিল কারণ আমি বুঝতে পারিনি ও যে ভিন্নগামি যৌনতার সমস্যার কথা বলছে, তা আমারও চিন্তার বিষয়। ওলসনের যে রচনাটি আমার ভাল লেগেছিল, তা হল The Death of Europe এরপর অন্যান্য আরো কিছু। ডর্নের বড় গুণ হল ওর কোমলতা— ‘Oh the graves not yet cut’ ইত্যাদি। এছাড়াও আমি এ্যাশবেরি, ও ’হারাও কোচের লেখাপত্র পড়ি, ওরা কেমন লিখছে লক্ষ রাখি। এ্যাশবেরির কণ্ঠে ‘The Skaters’ কবিতাটির পাঠ শুনছিলাম, এবং The Rape of the Lock-এর মতো খুবই নতুন ও সুন্দর বলে মনে হয়েছিল।

প্রশ্ন : আচ্ছা, আপনি যখন লেখেন, তখন কি মনে হয় পুরো ব্যাপারটাই আপনার দখলে থাকছে?

গিন্সবার্গ : কখনও কখনও আমার দখলে থাকে বলে মনে হয়। যখন আমি সত্যিকারের চোখের জলের উত্তাপের মধ্যে লিখি, তখন একথা সত্যি। পুরোপুরি আমার নিয়ন্ত্রণে তখন সবকিছু। অন্য সময় তা হয় না। আমার বেশির ভাগ কবিতার মতোই আমি তখন ঠকাই, ঘষামাজা করি, একটা আকার দেওয়ার চেষ্টা করি। তবে কখনও আমি পুরোপুরি আমার নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় থাকি, যেমন ধরুন Howl-এর কোনো অংশে, Kaddish-এর কোনো অংশে, The Change-এর কোনো অংশে। অন্যান্য কবিতারও দু’এক জায়গায়।

 

গ্রহণ : টমাস ক্লার্ক

ভাষান্তর : সৈয়দ কওসর জামাল

বর্ষ ৬, সংখ্যা ১০, ফেব্রুয়ারি ২০০৭

শেয়ার করুন: