004587
Total Users : 4587
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →
জন্ম— জুন, ০৬, ১৯৭৭। জন্মস্থান— উত্তর গোবীন্দর খীল, হাঁদু চৌধুরী বাড়ী, পটিয়া, চট্টগ্রাম। (শৈশব কৈশোর ও তারুণ্যের সময়যাপন) বেড়ে ওঠা (পূর্ব্ব বালিয়াদী, মীরশ্বরাই, চট্টগ্রাম) নানার বাড়ীতে। প্রকাশিত কবিতার বই— ফুলেরা পোষাক পরে না (সাল: ২০১৮, প্রকাশক : মনফকিরা, কলিকেতা)। প্রকাশিতব্য বই— অর্দ্ধনারীশ্বরবাদ : প্রকৃতিপুরুষতত্ত্ব (নন্দনতত্ত্ব), বটতলার বয়ান (ভাষাতাত্ত্বিক গদ্য) ও উদ্ভিদপ্রতিভা (কবিতা)। সম্পাদক— চারবাক।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

কবির নির্বাসন

প্লেটো তাঁর আদর্শ রাষ্ট্র থেকে কবিকুলকে নির্বাসিত করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল যে কবিরা চরিত্রহীন, অসংযমি এবং সত্যভ্রষ্ট। চরিত্রহীন, তার প্রমাণ তাঁরা পরস্পরবিরোধি বিভিন্ন চরিত্রের কল্পনা করে তাদের সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন। অসংযমি, তার কারণ তাঁরা প্রেরণার দ্বারা পরিচালিত এবং প্রেরণার উপরে যে কোনো সংযম চলে না এ তো সকলেরই জানা। আর যেহেতু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের অনুকরণের মধ্যে কবি-কল্পনা স্ফ‚র্তিলাভ করে, সেই কারণে সত্য কখনও কাব্যের ধ্যেয় হতে পারে না। সত্য অজর, অমর, অতিন্দ্রিয়। শুধু দার্শনিকের একাগ্র সাধনার মধ্যেই সত্যের প্রতিফলন সম্ভব। সুতরাং জ্ঞান, ন্যায়নিষ্ঠ এবং চারিত্রের উপরে ভিত্তি করে কোনও আদর্শ রাষ্ট্র যদি গড়ে তুলতে হয় তবে সে রাষ্ট্র থেকে, যত ব্যথিত মনেই হোক, কবিদের বিদায় দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।

প্লেটোর অন্যান্য চিন্তার মতো কাব্য সম্বন্ধে এ-যুক্তি পরবর্তিকালের পশ্চিমি ভাবুকদের মন আলোড়িত করেছে। এঁদের মধ্যে যাঁরা কাব্যের সপক্ষে নানা কথা বলেছেন, তাঁদের অধিকাংশই প্লেটোর অভিযোগের মারাত্মক মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারেননি। সম্ভবত এক এরিস্টটলই বুঝতে পেরেছিলেন যে প্লেটোর দার্শনিক প্রত্যয়গুলোকে খণ্ডন করতে না পারলে কাব্য-বিষয়ে তাঁর অভিযোগের কোনও যথার্থ সদুত্তর সম্ভব নয়। এমনকি সিডনির মতো সুরসিক কাব্যানুরাগি এবং শেলির মতো খাশ কবির পর্যন্ত মনে হয়েছিল প্লেটোর অন্যান্য প্রস্তাব মেনে নিয়েও কাব্য সম্বন্ধে তাঁর রায়কে বুঝি অগ্রাহ্য করা চলে। প্লেটোর মতো কবিপ্রাণ দার্শনিক যদি শেষপর্যন্ত কবিতার দাবি দর্শনের নামে খারিজ করে থাকেন, তবে তা যে অনেক ভেবেই করেছিলেন, এঁদের মতে প্লেটোভক্তরাও সেকথা বুঝতে পারেননি ভাবতে তাজ্জব লাগে।

প্লেটোর সিদ্ধান্তে কোনও খাঁটি সাহিত্যরসিক স্বভাবতই সায় দিতে পারবেন না। কিন্তু সায় না-দেওয়া এক কথা, আর এ সিদ্ধান্ত বেঠিক বলে খারিজ করা আর এক কথা। মনে রাখা দরকার, প্লেটো মূলত সাহিত্য সমালোচক ছিলেন না; তিনি দার্শনিক, পৃথিবীর সেরা দার্শনিকদের মধ্যে সর্বস্বিকৃতভাবে তিনি একজন। সুতরাং তাঁর বক্তব্যের সুবিচার করতে হলে যে দর্শনের কষ্টিপাথরে তিনি সাহিত্যকে যাচাই করেছেন, তার সঙ্গে নির্ভরযোগ্য পরিচয় থাকা দরকার। চারিত্র, সত্য ও প্রেরণা বলতে প্লেটো যা বুঝেছেন তা যদি আমরা মেনে নিই, তবে সাহিত্য বিষয়ে প্লেটোর অভিযোগ খণ্ডন করা শুধু কঠিন নয়, বোধ হয় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

দুই
প্লেটোর মতে আদর্শ সমাজে প্রতি ব্যক্তির একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব এবং কর্মবিধি থাকা দরকার। তার জীবন এই দায়িত্ব এবং কর্মবিধির দ্বারা নিরূপিত হবে। যেমন, যে যোদ্ধা, তার জীবন ক্ষাত্র আদর্শের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; আবার যে দাস, তার সার্থকতা আদর্শ দাস হিসেবে গড়ে ওঠায়। সমাজে নিজের নির্দিষ্ট স্থানটি মেনে নিয়ে সেই স্থানের উপযোগি হয়ে ওঠার নাম চারিত্র। নিজের স্থানানুযায়ি কাজ করার নাম ন্যায়, আর সে স্থানের অনুপযোগি কাজ করার নাম অন্যায়। প্রজা প্রজার মতো থাকবে, রাজা রাজার মতো। অর্থাৎ ব্যক্তি তার নিজের খেয়ালখুশি মতো জীবনযাপন করতে চাইবে না। তার জীবন কর্তব্যের সরলরেখায় চালিত হবে এবং সে রেখা নির্দিষ্ট হবে সমাজসংগঠনের প্রয়োজন বিচার করে। ব্যক্তিচরিত্রে কোনও অস্পষ্টতা, জটিলতা, বিরোধ, কি বহুমুখিতা থাকবে না। আধুনিক জীবন থেকে উপমা নিলে যদি দোষ না-হয় তবে বলা যায়, তার চরিত্র হবে কারখানায় তৈরি যন্ত্রের মতো। যে বিশেষ উদ্দেশ্যের জন্যে সে তৈরি, সে উদ্দেশ্য সাধনের পক্ষে তার চরিত্র কতটা উপযোগি শুধু এটুকু বিচার করে ব্যক্তির মূল্য নির্ধারিত হবে। ব্যক্তির নিজস্ব কোনও মূল্য নেই; সমাজযন্ত্রের অংশ হিসেবেই তার দাম। এ চিন্তার সঙ্গে হিন্দুসমাজের বর্ণভেদ এবং কমিউনিস্ট সমাজব্যবস্থার সাদৃশ্য হয়তো অস্পষ্ট নয়।

চারিত্রের উপরোক্ত ব্যাখ্যা যদি আমরা মেনে নিই, তবে সাহিত্যিক যে চরিত্রবান অথবা চারিত্রের প্রতি খুব শ্রদ্ধাশিল-একথা বলা চলে না। কেননা সাহিত্যিকের কৌত‚হল কোনও বিশেষ কর্তব্য বা কর্মবিধির মধ্যে আবদ্ধ নয়। সমাজে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থান অধিকার করে সেই স্থানের উপযোগি হয়ে ওঠাতেই ব্যক্তির পরমার্থ, কোনো সৎ সাহিত্যিক এ তত্ত¡ মেনে নিতে গররাজি। সাহিত্যিকের কারবার সেই মানুষকে নিয়ে যে মানুষ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিঃশেষিত নয়, যে মানুষের মন কোনও পূর্বনির্দিষ্ট সরলরেখায় ধরা যায় না, যে মানুষ জটিল, বহুমুখি, আত্মবিভক্ত, যে মানুষ বহু সহস্র শতাব্দির বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মনুষ্যত্বের বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। সে মানুষের দেহমনের পরতে পরতে কত যুগের কত রূপান্তরের স্বাক্ষর প্রচ্ছন্ন; সে মানুষের অস্তিত্বে একই সঙ্গে আদিম অরণ্যের অন্ধকার স্মৃতি, আর ভবিষ্যৎ সভ্যতার উজ্জ্বল পূর্বকল্পনা মিশে আছে। এই জটিল, জঙ্গম, অসম্পূর্ণ অথচ সমগ্র ব্যক্তিমানুষকে সমাজপরিকল্পনার ছকে ফেলে তাকে চরিত্রবান করায় এক ধরনের দার্শনিক মন হয়তো তৃপ্তি লাভ করতে পারে, কিন্তু খাঁটি সাহিত্যিকের চোখে সে চেষ্টা মূঢ়তা ছাড়া কিছু নয়। এ মূঢ়তা যতক্ষণ পর্যন্ত দর্শনের পাতার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, ততক্ষণ তা শুধু কৌতুকাবহ; কিন্তু যখন তা দর্শন ছেড়ে সামাজিক জীবনে প্রয়োগের আকার নেয়, তখন সে কৌতুক বড় মর্মান্তিক হয়ে ওঠে।

সাহিত্যিক মানুষের সমগ্র অথচ অসম্পূর্ণ রূপটিকে তাঁর রচনায় ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেন। আগে থেকেই যদি তাঁর মন কোনো এক নির্দিষ্ট চারিত্রের ছকে বাঁধা পড়ে, তবে তিনি এ চেষ্টা করবেন কি করে? তাঁর সেই উন্মুক্ত উন্মুখ সহানুভূতিশিলতা থাকা দরকার, যার গুণে তিনি বিচিত্র প্রকৃতির স্ত্রি-পুরুষের সঙ্গে প্রকৃত আত্মিয়তা অর্জন করতে পারেন। একই সঙ্গে ওথেলো এবং ইয়াগোর অন্তরঙ্গ হতে পারেন বলেই না শেক্সপিয়র বড় সাহিত্যিক; বুড়ো লিয়ার এবং কিশোরি ওফেলিয়া উভয়েই তাঁর সহানুভূতিতে সমান অংশিদার। গোয়েটে যদি ফাউস্ট, মেফিস্টোফেলিস এবং মার্গারেটা তিন জনের সঙ্গেই একাত্ম না হতে পারতেন, তবে কে তাঁকে মহাকবি বলে স্বিকার করত? সাহিত্যিক শাস্ত্রপ্রণেতা নন, তিনি মানবতন্ত্রি।

অতঃপর সত্য সম্বন্ধে প্লেটোর ধারণার কথা ধরা যাক। প্লেটোর দর্শনে সত্য বিমূর্ত (abstract) কল্পনা। এ কল্পনা নিত্য, অজর, অব্রণ। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতে আমরা যা-কিছু দেখতে পাই, তাদের প্রত্যেকটিরই না-কি একটি আদি শাশ্বত রূপ আছে। এ রূপ অতিন্দ্রিয়, এর নিবাস পরিবর্তনশিল ভৌতিক জগতের বাইরে। পৃথিবীতে নানা জাতের পশুপাখি, গাছপালা, মানুষ ইত্যাদি চোখে পড়ে। প্লেটোর মতে আসলে এরা সত্য নয়। প্রতি জাতের পশুর (যেমন ঘোড়া কি গরু) একটা আদর্শ রূপ আছে। জগতে আমরা যে সেই জাতের নানা পশু দেখি, তারা এই আদর্শের অনুকরণ বা ছায়ামাত্র। অনুকরণে শুধু যে নানা ত্র“টি থাকে তাই নয়, অনুকরণ মাত্রই অস্থায়ি। শুধু আদর্শ রূপটিই চিরস্থায়ি এবং ত্র“টিহীন। মানুষের ক্ষেত্রেও তেমনি কতকগুলো মূল আদর্শ রূপ আছে। পার্থিব ব্যক্তি-মানুষেরা এইসব রূপের ভঙ্গুর বিকৃত অনুকরণ মাত্র। শিল্পি-সাহিত্যিকেরা আবার এই অনুকরণের অনুকরণ করে তাঁদের শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টি করেন। শিল্প-সাহিত্যের সৃষ্টি তাই আদি সত্যের শুধু বিকার নয়, বিকারেরও বিকার। সত্যসন্ধিৎসু দার্শনিকের কাছে সাহিত্য নিতান্তই মূল্যহীন। অথবা শুধু মূল্যহীন নয়, মারাত্মক ভ্রমের আকর হিসেবে বিষবৎ পরিত্যাজ্য।

সত্য সম্বন্ধে প্লেটোর এই ধারণা কতখানি সত্য? প্রায় দু’হাজার বছর আগে পাইলেট ‘সত্য কি?’ প্রশ্ন করেছিলেন। আজ পর্যন্ত সে প্রশ্নের এমন কোনও জবাব মেলে নি, যার যাথার্থ্য অন্তত দার্শনিকের কাছে সন্দেহাতিত, কিন্তু এই জবাব না মেলার মধ্যেই কি প্লেটোনিক ভ্রান্তির হদিশ মেলে না? সত্য জ্ঞানের উপাদান, এবং শেষ পর্যন্ত সব জ্ঞানই ইন্দ্রিয়নির্ভর। ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতার উপরে বুদ্ধির প্রয়োগ ঘটলে তবেই জ্ঞানের উদ্ভব সম্ভবপর হয়। নিজের এবং পূর্বপুরুষদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে তবেই-না প্লেটো আদর্শ রূপের কল্পনা করেছিলেন। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতে যদি একটিও ঘোড়া না-থাকত, তাহলে কেউ কি আদর্শ ঘোড়া কল্পনা করতে পারত? যদি বলা হয়, এমন অনেক কল্পনা আছে, যার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রতিরূপ জগতে দেখা যায় না, তবে সে ক্ষেত্রেও বিশ্লেষণ করলে চোখে পড়বে এসব কল্পনার উপাদান ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ থেকে সংগৃহিত। পাখি এবং ঘোড়া দুই-ই আছে বলে তবেই না আমরা পক্ষিরাজ ঘোড়ার কথা ভাবতে পেরেছি।

আমাদের জ্ঞান ইন্দ্রিয়নির্ভর বলে সে জ্ঞানে কখনো সম্পূর্ণতা আসতে পারে না। আমরা বহু স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতার তুলনা এবং বিশ্লেষণ করে তবে একটি ধারণায় পৌঁছই। এবং এ জগৎ বাস্তবিকই অনন্ত হোক বা না-হোক, আমাদের মানসিক সামর্থ্যরে হিসেবে তার অন্ত অকল্পনিয়। তা যে শুধু ব্যপ্তিতে বিশাল, তাই নয়; সময়ের দিক থেকে বিচার করলে অতীত ঘটনার আমরা কতটুকুই-বা জানি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার প্রায় কিছুই তো জানি না। তা ছাড়া প্রতি বস্তু, ব্যক্তি বা ঘটনার অগণিত দিক আছে। ফলে অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে আমরা যে সব ধারণা গড়ে তুলি, তাদের অসম্পূর্ণতা অবশ্যম্ভাবি। অথচ অভিজ্ঞতা ছাড়া অন্য কোনো পথে ধারণা গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। কেননা যে সব ধারণা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করি, সেগুলোও আসলে আমাদের পূর্ব-পুরুষদের অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করে একদা গড়ে উঠেছিল। তবে জ্ঞান অভিজ্ঞতানির্ভর বলে এ সিদ্ধান্ত করা চলে না, যে ধারণা মাত্রই মায়া বা মিথ্যা। ব্র‏হ্মজ্ঞান মানুষের অনায়ত্ত, কেননা ব্র‏হ্মজ্ঞান অসম্ভব কল্পনা। কিন্তু আপেক্ষিক সত্য মানুষের আয়ত্ত সাধ্য। একদিকে ব্যাপ্তি এবং বিস্তৃতির দিক থেকে মানুষের অভিজ্ঞতা যত সমৃদ্ধি অর্জন করে এবং অন্যদিকে সে অভিজ্ঞতার তুলনা বিশ্লেষণের উপায়-পদ্ধতি যত সূক্ষ্ন এবং নিপুণতর হয়, ততই জগৎ সম্বন্ধে মানুষের ধারণা এবং সিদ্ধান্তে অধিকতর যাথার্থ্য এবং নির্ভরযোগ্যতা আসে। মানুষের জ্ঞান নিত্য নয়, তা বিকাশধর্মি।

এখন সাহিত্যিক প্লেটোনিক অর্থে সত্যসন্ধ নন। পূর্বকল্পিত কোনও আদর্শ মানুষের কাহিনি রচনায় তাঁর কল্পনা-স্ফ‚র্তি পায় না। স্থূল দেহবিশিষ্ট ব্যক্তিমানুষের মধ্যেই তিনি মানবিয় সত্যের অনুসন্ধান করেন। প্রতি মানুষই তাঁর কাছে অফুরন্ত রহস্যের আধার। তিনি ব্যক্তির চেতন, প্রাক্চেতন এবং অপরিস্ফুটচেতন সমগ্র রূপটি বুঝবার চেষ্টা করেন। তাঁর কাছে প্রতি ব্যক্তি একদিকে অনন্য, অন্যদিকে সব মানুষের প্রতিভূ। অন্য সব সত্যসন্ধানিদের মতো তাঁর অন্বেষণও অসম্পূর্ণ। সব দেশের সব কালের সব মানুষের খবর রাখা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। আর কোনো একটি মানুষের সবখানি খবর কেই-বা কবে জেনেছে! তবু এখানেও জানার কম-বেশি আছে। যে সাহিত্যিক মানুষ সম্বন্ধে যতবেশি অনুসন্ধান তৎপর, তাঁর সাহিত্যসৃষ্টি ততবেশি মূল্যবান হবার সম্ভাবনা। চসার তাই ওয়ার্ডসওয়ার্থের চাইতে অনেক বড় কবি; আনা কারেনিনার পাশে হেরমান হেসের সিদ্ধার্থ তাই জোলো ঠেকে। এই অর্থে সাহিত্যের সাধনাও সত্যের সাধনা। এ সত্য প্লেটোনিক দর্শনের অবাস্তব ব্র‏হ্মসত্য নয়। এ সত্য অভিজ্ঞতানির্ভর বিবর্তনশিল আপেক্ষিক মানব সত্য।

তিন
পূর্বের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে এটুকু স্পষ্ট হয়ে থাকবে যে আদর্শ রাষ্ট্র সাহিত্যের স্থান বিষয়ে প্লেটোর সিদ্ধান্ত শুধু সাহিত্য বিশ্লেষণের দ্বারা নিরূপিত হয়নি; সে সিদ্ধান্ত মুখ্যত দার্শনিক প্রত্যয়ের দ্বারা নির্দিষ্ট হয়েছে। তাঁর দর্শনে সত্য, ন্যায় বা চারিত্রের যে ব্যাখ্যা, তা মেনে নিলে সাহিত্যিককে সত্যসন্ধ, ন্যায়নিষ্ঠ কি চরিত্রবান বলা চলে না। প্লেটোর সিদ্ধান্তে যদি আমরা সায় দিতে না পারি, তবে তার কারণ, প্লেটোর দার্শনিক প্রত্যয়গুলো আমাদের কাছে যথার্থ ঠেকে না। উল্টে আমাদের মনে হয়, প্লেটোর এই প্রত্যয়গুলো ভ্রান্ত এবং এ জাতিয় প্রত্যয়ের দ্বারা পরিচালিত চিন্তা এবং ব্যবহার মানুষের পক্ষে সমূহ ক্ষতিকর। কোনও সৎ-সাহিত্যিকের মন যে এ-জাতিয় প্রত্যয়ে আরাম পায় না, সাহিত্য সম্বন্ধে এটা মস্ত বড় ভরসার কথা; এবং আমাদের ধারণা সাহিত্যিকেরা প্লেটোনিক অর্থে চরিত্রবান, ন্যায়নিষ্ঠ কি সত্যসন্ধ নন বলেই মানুষের কাছে সাহিত্যের দাম বেশি।

কথাটা প্রথম নজরে ধৃষ্টতার মতো মনে হতে পারে; সুতরাং এ বিষয়ে হয়তো আর একটু বিশদ হবার প্রয়োজন আছে। জানবার ইচ্ছা যেমন মানুষের একটা মূল সহজাত বৃত্তি, মানবার প্রবণতা তেমনি মানুষের একটা সামান্য লক্ষণ। এ দুয়ের মধ্যে বিরোধ স্পষ্ট; কিন্তু জীবদেহে স্থিতিস্থাপকতার সামর্থ্য অনেকখানি বলে মানব-প্রকৃতিতে অন্য পাঁচটা বিরোধের মতো এটিও সব সময়ে আত্মঘাতি সংঘাতরূপে দেখা দেয় না। প্রাগৈতিহাসিক যুগে এ বিরোধ মানুষের চিন্তায় এবং জীবনে কি ভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল আমরা জানি না। যখন থেকে মানুষের ভাবনা উত্তরকালের মানুষদের বোধ্য রূপ নিতে শুরু করেছে, তখন থেকে আমরা সভ্যতার ইতিহাসে এই মৌল বিরোধের বিচিত্র প্রকাশ দেখতে পাই। সিমাবদ্ধ অভিজ্ঞতা-সমষ্টির মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে কিছু বুদ্ধিমান রক্ষণশিল মানুষ কতকগুলো সামান্য ধারণা এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছয়; তারপর সেইসব ধারণা সিদ্ধান্তের উপরে নির্ভর করে জীবন-পরিচালনার প্রয়োজনে তারা সেই আংশিক জ্ঞানে পূর্ণতা আরোপ করে। তাদের তারা নিত্য-সত্য বলে মানে এবং নানা প্রকরণপদ্ধতির সাহায্যে আপন আপন গোষ্ঠির বাকি মানুষদের মানায়।১ মানুষি বুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতাই যে এসব প্রত্যয়ের একমাত্র উৎস, একথা জানতে পারলে পাছে অন্য মানুষেরা তাদের যাথার্থ্য সম্বন্ধে প্রশ্ন তোলে, তাই তারা সেসব প্রত্যয়কে কোনও অতিপ্রাকৃত শক্তির নির্দেশ বলে চালাবার চেষ্টা করে। অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণার উপরে মেকি ব্র‏‏হ্মজ্ঞানের তকমা চাপিয়ে আরোহি বুদ্ধির মনে সন্ত্রাস জাগাবার চেষ্টা সভ্যতার ইতিহাসে অতি প্রাচিন ও পৌনঃপুনিক ঘটনা। এই তকমা যার প্রতিক, তার সম্বন্ধে বেশি প্রশ্ন করলে ধড় থেকে মুণ্ডটি খসে পড়তে পারে-প্রাচিন ভারতের এক তথাকথিত ব্র‏হ্মজ্ঞ ঋষি একদিন এ- জাতিয় ভয় দেখাতে কণ্ঠিত হননি। মুসা থেকে মুহম্মদ, যাজ্ঞবল্ক্য থেকে যিশু, স্রেফ মানুষ হিসেবে মানুষের কাছে এঁরা কেউই নিজেদের বক্তব্য উপস্থিত করেন নি। এঁরা কেউ-বা ব্র‏হ্মজ্ঞানি, কেউ-বা ঈশ্বরানুগৃহিত পুরুষ, আবার কেউ-বা খোদ ঈশ্বরের সন্তান। কিন্তু আংশিক জ্ঞানকে আপ্তবাক্য বলে মেনে নেওয়াই যদি মানুষের একমাত্র বৃত্তি হতো তাহলে দর্শন-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সমাজ-প্রতিষ্ঠান, এককথায় মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনের কোনো বিকাশ সম্ভব হতো না। মানুষ যেমন আংশিক ধারণাকে ব্র‏হ্মসত্য বলে মেনেছে এবং মানিয়েছে, তেমনি তারই সঙ্গে সে ধারণার যাথার্থ্য সম্বন্ধে সংশয়ি হয়েছে, সে ধারণাকে নিত্য-নতুন অভিজ্ঞতা এবং চিন্তার কষ্টিপাথরে যাচাই করতে চেয়েছে। তার জন্য তাকে দাম দিতে হয়েছে বিস্তর-বিশ্বাসের বাড়া শান্তি নেই, আর অবিশ্বাসের বাড়া অশান্তি নেই-তবু দাম দিতে সে গররাজি হয়নি বলেই মানুষের জ্ঞান পারমেনিদিস, কুংফুৎসে কি মনুতে এসে স্তব্ধ হয়ে যায়নি। মানুষের জিজ্ঞাসু বুদ্ধি তাকে বার বার স্বনির্মিত সংস্কারের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছে। শুধু যে প্রোটাগোরাস, চুয়াঙৎসু, চার্বাক কি এরাজমুসের মতো মুক্তবুদ্ধি দার্শনিকেরাই মানসিক জাড্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন তা নয়, সংস্কারবদ্ধ সাধারণ মানুষের মনেও তাদের সহজাত যুক্তিবৃত্তি নতুন নতুন অভিজ্ঞতা এবং প্রয়োজনের তাড়নায় সক্রিয় হয়ে উঠে অভ্যস্ত ভাবনা-ধারণা সম্বন্ধে তাদের সংশয়ি করে তুলেছে।

বস্তুত সত্যসন্ধিৎসা মানবপ্রকৃতির অন্যতম মূলবৃত্তি এবং এ বৃত্তি যে মানুষদের সাধনার মধ্যে সবচাইতে সার্থকতা লাভ করে, সাহিত্যিক তাঁদেরই একজন। প্রচলিত সংস্কারের ঐতিহ্যে আর-পাঁচটা মানুষের মতো সাহিত্যিকেরও বয়ঃপ্রাপ্তি ঘটে, কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক মন তাঁকে এ ঐতিহ্যের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকতে দেয় না। ধারণার চাইতে অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে বেশি মূল্যবান, বিমূর্ত আদর্শের চাইতে বাস্তব বিষয়ে তিনি অধিকতর কৌত‚হলি। প্রচলিত ধারণা যে কত অসম্পূর্ণ, তার নিত্যতার দাবি যে কত ভিত্তিহীন, জীবন সম্বন্ধে তাঁর তিব্র অনুভূতিশিলতা সে বিষয়ে তাঁকে ক্রমেই সজাগ করে তোলে। দার্শনিকের মতো সচেতনভাবে তিনি হয়তো এসব ধারণার বিচার করতে বসেন না; কিন্তু তাঁর শাণিত জীবনবোধের স্পর্শে এদের মেকি ব্র‏হ্মত্ব সহজেই খসে পড়ে। বোকাচ্চিও, রাবলে, শেক্সপিয়র, সর্ভান্তিজ, গোয়েটে, স্তাঁদাল, ইবসেনের মতো সত্যসন্ধ পুরুষ ইয়োরোপের ইতিহাসে ক’জন চোখে পড়ে? এঁরা আমাদের কোনও নিটোল, নিরন্ধ্র ব্র‏হ্মতত্তে¡র হদিস দিয়ে যাননি; কিন্তু আমাদের কৌত‚হল উদ্দিপ্ত করেছেন, বোধকে সূ²তর করেছেন, চলতি ধারণার ঠুলি খসিয়ে মানুষের জটিল রহস্যময় অস্তিত্বের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটিয়েছেন। এ কাজ এঁরা পেরেছেন, তার কারণ, প্লেটোনিক আদর্শ রূপের ধ্যান এঁদের দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করেনি। পার্থিবকে অপার্থিব, পরিবর্তনশিলকে নিত্য, জটিলকে সরল, বহুকে এক, উন্মুক্তকে গণ্ডিবদ্ধ কল্পনা করে নিজেদের ব্র‏হ্মজ্ঞ বলে জাহির করতে এঁদের বেধেছে। এঁদের জ্ঞান অসম্পূর্ণ, আপেক্ষিক, কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই সত্যবিমুখ নয়। মানুষের আত্মজিজ্ঞাসার ইতিহাসে তাই শঙ্করাচার্য কি টমাস একুইনাসের চাইতে শেক্সপিয়র ও টমাস মানের দাম অনেক বেশি।

চার
যেমন জ্ঞানের ক্ষেত্রে তেমনি ন্যায় এবং চারিত্রের ক্ষেত্রেও সাহিত্যিকের দৃষ্টিভঙ্গি সমানভাবেই সত্যসন্ধ, সংস্কারমুক্ত এবং ফলপ্রসূ। সাহিত্যিকদের কাছে সমাজ বা শাস্ত্র-নির্দেশের চাইতে ব্যক্তিমানুষ বেশি মূল্যবান। এখানে প্লেটোনিক প্রত্যয়ের সঙ্গে সাহিত্যিক মনোভাবের বিরোধ অতি সুস্পষ্ট। সব মানুষই একদিকে যেমন মানুষ, অন্যদিকে তেমনি প্রতি মানুষই অপর মানুষ থেকে স্বতন্ত্র। তার প্রাতিস্বিক সমগ্রতায় সে অনন্য; সেখানে সে সকল সমিকরণের ঊর্ধ্বে। কিন্তু মানুষ সমাজে বাস করে, আর ব্যক্তির রফাহীন অনন্যতার উপরে ভিত্তি করে সমাজ গড়া শুধু কঠিন নয়, বোধ হয় একেবারেই অসম্ভব। পাঁচজন শুধু একত্র হলেই সমাজ হয় না; পাঁচজনের আচার-ব্যবহার, ভাবনাচিন্তা একই বিধিব্যবস্থা, একই নীতিনির্দেশনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলে তবেই সমাজ সম্ভব। অর্থাৎ ব্যক্তি তার অনন্যতার দাবিকে কিছু পরিমাণে খর্ব না-করা পর্যন্ত সমাজ-প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে না। তবু একথা সব সময়েই স্মরণে রাখা দরকার যে সেই সমাজই আদর্শ সমাজ, যেখানে সামাজিকতার প্রয়োজনে ব্যক্তিত্বের সঙ্কোচন সবচাইতে কম, যেখানে সহযোগিতার ফলে প্রতিটি স্ত্রি-পুরুষের স্বকিয় ব্যক্তিত্ব বিবর্ধমান।
মুস্কিল হল, সভ্যতার ইতিহাসে এতাবৎ অধিকাংশ সমাজেই ব্যক্তির অনন্যতাকে যতদূর সম্ভব খর্ব করে সামাজিক সামান্যতাকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা চোখে পড়ে। এতে অবাক হবার কিছু নেই, কেননা সংখ্যার গুরুত্বে সমাজ ব্যক্তির চাইতে প্রবল। ফলে ক্রমে এমন অবস্থার উদ্ভব হয়, যেখানে সমাজ ব্যক্তির আত্মবিকাশের মাধ্যম না হয়ে তার আত্মবিলোপের যন্ত্র হয়ে ওঠে। ব্যক্তি তার নিজের স্বভাবকে অস্বিকার করে সমাজনির্দিষ্ট ছাঁচে নিজেকে ঢালাই করার মধ্যে পরমার্থ খোঁজে। তার আচার-ব্যবহার, ভাবনা-চিন্তা, প্রত্যয়-প্রচেষ্টা, এমনকি আবেগ-অনুভূতি পর্যন্ত সামাজিক বিধিনিষেধের দ্বারা নিরূপিত হতে থাকে। সে তখন আর ব্যক্তি নয়, সে তখন সমষ্টির অংশমাত্র। তার মধ্যে যেটুকু অনন্যতাবোধ এ অবস্থাতেও টিকে থাকে, তা নিয়ে তার মহালজ্জা। গড্ডলবৃত্তিই তখন তার বিবেকের মুখ্য অবলম্বন, সামাজিক বিধির অনুবর্তন তখন তার জীবনের মূলনীতি। এ অবস্থায় কি ব্যক্তি, কি সমাজ-দ্ইুয়ের মধ্যেই যে বিকাশের সম্ভাবনা দ্রুত ক্ষিণ হয়ে আসবে-এ আর বিচিত্র কি! মধ্যযুগের ইউরোপিয় সমাজে মনুষ্যত্বের বিকাশ একদিন এইভাবেই ক্ষিণ হয়ে এসেছিল। দূরদেশের কথা থাক, এ দেশের হিন্দু এবং মুসলমান সমাজেও কি দীর্ঘদিন ধরে আমরা এই মূঢ়তার আত্মঘাতি প্রভাব দেখে আসছি না?

এ মূঢ়তা থেকে সাহিত্য বার বার মানুষকে উদ্ধার করে এসেছে। কেননা যদিচ ভাষা ছাড়া সাহিত্য সম্ভব নয় এবং ভাষা সমাজেরই সৃষ্টি, তবু ব্যক্তিমানুষের অনন্যতাকে অবলম্বন করেই চিরদিন সাহিত্যকল্পনা স্ফ‚র্তি লাভ করে। সমাজের প্রভাবে আমরা বারবার প্রতি মানুষের অনন্য সমগ্র রূপটিকে ভুলতে বসি এবং সাহিত্যিক বার বার সেই রূপটি সম্বন্ধে আমাদের বোধকে জাগ্রত করেন। মানুষ যে শুধু সামাজিক জীব নয়, কোনও পূর্বকল্পিত আদর্শের ছাঁচে যে তার সবখানি অস্তিত্বকে ধরানো যায় না, সে যে অনন্য, তার মধ্যে যে অগণিত সম্ভাবনা বিকাশের জন্যে অপেক্ষমান-এ চেতনা সব সৎ-সাহিত্যের কেন্দ্রে সক্রিয়। ব্যক্তির অনন্যতার স্বাদ না-দিতে পারা পর্যন্ত ভাষা সাহিত্যের ব্যঞ্জনা অর্জন করে না।

লিরিক কবিতা, গাথাকাহিনি, মহাকাব্য, নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প, এমনকি সাহিত্যপদবাচ্য প্রবন্ধের মধ্যেও অনন্য ব্যক্তিমানসের স্বাক্ষর সুস্পষ্ট। সামাজিক লঘুকরণের অন্তরালে ব্যক্তির যে জটিল, রহস্যময়, অমেয় অস্তিত্ব বর্তমান, সাহিত্যিকের মানবতাবোধ এবং সত্যসন্ধিৎসা তাকে বুঝতে এবং ভাষার মধ্যে ফুটিয়ে তুলতে চায়। ইলিয়াড-অডিসি কিংবা রামায়ণ-মহাভারতের মানুষ-মানুষি, দেব-দেবি, রাক্ষস-বানর, মায়াবিনি-কুহকিনিরা সমাজকল্পিত টাইপ নয়। তা যদি হতো, ওসব বই পণ্ডিতদের গবেষণার বিষয় হয়েই থাকতো, সাধারণ মানুষদের মনে যুগ যুগ ধরে সাড়া তুলতো না। মহাকাব্যের এইসব চরিত্র বিচিত্র ব্যক্তিমানুষের স্বাদে সরস বলেই তারা আজও আমাদের মনে সংবেদনার সঞ্চার করে। তারা প্রত্যেকেই জটিল, অনন্য, রহস্যময়-কোনও ঔচিত্যের ছাঁদে তাদের গড়া হয়নি। দান্তের মহাকাব্য এক ভক্ত ক্যাথলিকেরা ছাড়া কেই-বা পড়ত, যদি-না তাঁর নরকের স্তরে স্তরে অসংখ্য ব্যক্তিমানুষের বিচিত্র মুখ উঁকি মারত। আর কি রহস্যময়, কি ইঙ্গিতপূর্ণ সে-সব মুখ। এক লেওনার্দোর স্কেচ এবং কখনোও-বা ডুয়েবার-এর ড্রইংয়ের মধ্যে ছাড়া কোথায় তার তুলনা আছে? ওই একই গুণে সমৃদ্ধ না হলে ‘ক্যান্টরবেরি টেলস্’ কি অমর সাহিত্যের কোটায় পড়ত? লিরিক কবিদের রচনায় অবশ্য বহু চরিত্রের স্বাদ থাকে না; তাঁরা মুখ্যত নিজেদের কথাই লিখে থাকেন। কিন্তু সেখানেও তাঁরা যা ফুটিয়ে তোলেন, তা কোনও শাস্ত্র নির্দেশের ছাঁচে ঢালা ব্যক্তিচরিত্র নয়। তাঁদের নিজেদের মধ্যে যে জটিল বহুমুখিতা আছে, নানভাবে তারই নানা দিক নির্মোহ সততায় ফুটিয়ে তুলতে পারলে তবেই তাঁরা যথার্থ লিরিক কবি। কাটুল­স কি লিপো, ডান কি হাইনে, বোদলেয়ার কি র‌্যাম্বোর কবিতায় ওই ওই কবির অনন্য ব্যক্তিত্বের বিচিত্র দিক প্রকাশিত, উদ্ঘাটিত হয়েছে বলেই-না তাঁরা দেশকালের ব্যবধান পেরিয়ে সব দেশের রসিকদের আত্মিয়তা অর্জন করেছেন।

ব্যক্তিবিষয়ে এই অনন্যচিত্ত কৌত‚হল নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্পের ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট-এখানে তার প্রকাশ আরও বিচিত্র। ইউরিপিদিস্, শেক্সপিয়র, ইবসেন কি ও’নীল-এর চরিত্রেরা সামাজিক টাইপ নয়, তারা প্রত্যেকেই অনন্য ব্যক্তি। শুধু তাই নয়; ন্যায় বা ঔচিত্যের সংস্কারার্জিত গজকাঠি দিয়ে তাদের মাপতে গেলে শুরু-শেষের হদিস মেলে না। সামাজিক রীতিনীতি, আচার-ব্যবহারে অভ্যস্ত আমাদের মন বার বার এ কথা ভুলে যায় যে ব্যক্তি মাত্রই মূল্যবান এবং অদ্বিতীয়, প্রতি মানুষের মধ্যে এমনসব গূঢ় সম্ভাবনা বর্তমান যা অনির্দেশ্য, যাকে কোনও হিসাবের ছকে ফেলা যায় না। শুধু ভুলি না, ব্যবহারিক জীবনে এই অনন্যতার আভাস পেলে আমরা শঙ্কিত হয়ে উঠি; হয় তাকে এড়াতে চাই, নয় তার শাস্তি বিধান করি। অথচ ওই গূঢ় অনির্দেশ্যতা আছে বলেই মানুষের ইতিহাস অন্য সব জীবজন্তুর ইতিহাসের তুলনায় এত সমৃদ্ধ, এত বিচিত্র। সমাজ শুধু মানুষে মানুষে ব্যবহারিক সম্বন্ধ স্থাপন করতে পারে। সাহিত্য তার ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানবতাবোধের সামর্থ্যে মানুষকে মানুষের অন্তরঙ্গ করে তোলে। সাহিত্য পাঠের ফলে মানুষ সম্বন্ধে আমাদের বোধ সূ²তর হয়; এদিকে আমাদের নিজেদের মন যেমন সরস, সজাগ এবং সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে, অন্যদিকে তেমনি অপরের সঙ্গে আমাদের আত্মিয়তা সহজতর হয়। টলস্টয় কি দস্টেয়ভস্কির উপন্যাস, ক্যাথরিন ম্যানসফিল্ড কি রবীন্দ্রনাথের গল্প পড়ার পর মানুষকে আমরা নতুন করে বুঝতে শিখি। ব্যক্তি যে কোনও উদ্দেশ্য সাধনের উপায়মাত্র নয় (তা সে উদ্দেশ্য যত মহৎই হোক-না কেন), সে যে স্বয়ংসিদ্ধ এবং সে কারণে মূল্যবান-সব মহৎ সাহিত্য সৃষ্টির কেন্দ্রে এই মানবতন্ত্রি প্রত্যয় সক্রিয়। মানুষের যেটি পরিবশ নিরূপিত বাইরের রূপ, যার চরম উৎকর্ষের নাম চারিত্র-সমাজ আমাদের শুধু তারই হদিস দিতে পারে। কিন্তু যাকে আমরা ব্যক্তিত্ব বলি-ব্যক্তির চেতন, অচেতন, অবচেতন, জানা-অজানা, পরিবর্তনশিল অস্তিত্বের বিচিত্র সেই যে প্রাতিস্বিক সমগ্রতা-সে বিষয়ে জানতে হলে সাহিত্যিকের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া আমাদের উপায় নেই। আর এই জানাই হল যথার্থ নীতিবোধের মূল উৎস। যে ন্যায় মানুষকে শুধু খণ্ডিত খর্বিত করতেই জানে, যে বিবেক শুধু নিগ্রহেই পরিতৃপ্তি পায়, যে নীতিতত্ত¡ মানুষের বাহ্যিক ব্যবহারিক রূপের আড়ালে তার জটিল পরিবর্তনশিল সমগ্র অস্তিত্বের স্বিকারে পরাক্সমুখ, তা শুধু অনুপযোগি নয়, মনুষ্যত্বের বিকাশে তা মস্তবড় বাধা। এ বাধা অপসারণে সাহিত্যের দান অবিস্মরণিয়। সাহিত্যিকের কাছ থেকে আমরা আপনাকে এবং অপরকে ব্যক্তি হিসেবে মূল্য দিতে শিখি, শিখি যে ব্যক্তির বিকাশই সব নৈতিক মূল্যায়নের উৎস এবং মানদণ্ড, শিখি যে ব্যক্তি তার কর্মের চাইতে বড়, আর তাই শুধু বাইরের ব্যবহার দিয়ে কোনও মানুষের বিচার করা মূঢ়তা মাত্র। সাহিত্যিক অবশ্য কোনও নীতিকথার মাধ্যমে এ শিক্ষা দেন না; সাহিত্যপাঠজাত কৌত‚হল এবং সংবেদনা পাঠককে নিগূঢ়ভাবে এই শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলে। যেমন জ্ঞানের দিক থেকে, মনুষ্যত্ব বিকাশের দিক থেকেও তেমনি সাহিত্যিকদের দান তাই শাস্ত্রকারদের চাইতে বেশি মূল্যবান।

পাঁচ
এতাবৎ কাব্য তথা সাহিত্য-বিষয়ে প্লেটোর তৃতীয় দফা অভিযোগের আমরা আলোচনা করিনি। কাব্যের উৎস, প্রেরণা এবং প্লেটোর মতে কোনও ব্যক্তির মনে যতক্ষণ পর্যন্ত এতটুকু যুক্তিক্ষমতা সক্রিয় থাকে, ততক্ষণ তার পক্ষে অনুপ্রেরিত হওয়া সম্ভব হয়। সত্য এবং ন্যায়নিষ্ঠার মতো প্রেরণা কথাটিরও প্লেটোনিক দর্শনে একটি বিশেষ অর্থ আছে। এ অর্থ তাঁর স্বকপোলকল্পিত নয়, তৎকাল প্রচলিত হেলেনিয় সংস্কার থেকে পাওয়া। গ্রিক ভাষায় প্রেরণার যেটি প্রতিশব্দ enthousiasmos (মূল en+theos), যা থেকে ইংরেজি এনথুজিয়াজম-এর উদ্ভব-তার সোজা মানে হল দেবতায় পাওয়া। আমরা যেমন বলি ‘অমুকের ভর হয়েছে’, গ্রিকরাও তেমনি বিশ্বাস করত বিশেষ বিশেষ অবস্থায় বিশেষ মানুষদের উপরে দেবতার ভর হয়। তখন তারা আর নিজেদের বশে থাকে না; যুক্তি-বহির্ভূত অলৌকিক শক্তিদের হাতের যন্ত্রে পর্যবসিত হয়। তাদের বুদ্ধিবিবেক তখন একেবারে মোহগ্রস্ত, সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ বিভেদ করার শক্তি তখন সাময়িকভাবে লুপ্ত, তখন তারা কি যে বলছে, কি যে করছে, তা তারা নিজেরাই জানে না। আজকের দিনের অশিক্ষিত এবং অর্ধশিক্ষিত নর-নারির মতো সেদিনের গ্রিক জনসাধারণও এ-জাতিয় প্রেরণাকে দৈবানুগ্রহ মনে করে এইসব দেবতায় পাওয়া মানুষদের কাছে আপ্তবাণির খোঁজ করত। সে বাণির কোনো মাথামুণ্ডু থাক বা না-থাক, তবু তা স্বতঃসিদ্ধ, কেননা তার উৎস ভ্রান্তিশিল মানুষ নয়, তার উৎস স্বয়ং দেবগোষ্ঠি।

প্লেটোর মতে পূর্বোক্ত অর্থে কবিরা অনুপ্রেরিত জীব। প্লেটোর পূর্বে কবি পিন্ডারও কাব্যপ্রেরণা সম্বন্ধে এ ধরনের উক্তি করেছিলেন। প্লেটো আরও বিশদভাবে এ তত্ত¡ তাঁর নানা রচনায় গুরু সক্রেটিসের জবানিতে ব্যাখ্যা করেছেন। ‘আয়ন’ গ্রন্থে তিনি বলেছেন, মহৎ কাব্যের রচয়িতারা কোনো যুক্তিসম্মত বিধি-নিয়মের বা আর্টের চর্চা করে তাঁদের কল্পনায় মহত্ত¡ অর্জন করেন না, তাঁদের সে মহত্ত¡ দৈবসূত্রে পাওয়া; কাব্যরচনার সময় তাঁরা অলৌকিক শক্তিদের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন। পরে তিনি আরও বলেছেন যে বুদ্ধিবৃত্তির সম্পূর্ণ লোপ না-ঘটলে, দেবমন্দিরের নর্তকিদের মতো বাহ্যজ্ঞান সম্পূর্ণ না-হারাতে পারলে, এককথায় একেবারে উন্মাদের দশায় না-পৌঁছতে পারলে যথার্থ কবি হওয়া অসম্ভব। শুধু তাই নয়, কাব্যপ্রেরণার প্রভাব চুম্বকের মতো; তিনিই সার্থক কবি যাঁর কাব্য স্থানকাল নির্বিশেষে আবৃত্তিকারের পর আবৃত্তিকারকে, শ্রোতার পর শ্রোতাকে, মূল প্রেরণার চৌম্বক প্রভাবে আত্মবোধহীন উন্মাদে পর্যবসিত করতে পারে। সুতরাং কাব্য থেকে আমরা যা পেতে পারি তা জ্ঞান নয়, তা উন্মাদনা। কেননা, জ্ঞান যুক্তিনির্ভর, অপরপক্ষে যুক্তির লেশমাত্র বজায় থাকা পর্যন্ত না সম্ভব কাব্যসৃষ্টি, না কাব্যসম্ভোগ।

এই যদি কাব্যপ্রেরণার চরিত্র হয় তবে নিয়ম-নিয়ন্ত্রিত ন্যায়রাষ্ট্রে কবিদের কি করে স্থান হতে পারে? কবিরা কি দার্শনিক, কি ব্যবহারিক, কোনো জ্ঞান দিতেই অক্ষম; তাঁরা ঔচিত্যের নির্দেশ মানতে অনিচ্ছুক; আর সবচেয়ে সাংঘাতিক কথা যে ক্ষমতার জোরে তাঁরা কবি, সে ক্ষমতা অনতিক্রমনিয়ভাবে যুক্তিবিরোধি এবং সে কারণে তার নিয়ন্ত্রণ একেবারেই অসম্ভব। সুতরাং আদর্শ রাষ্ট্র থেকে কবিদের নির্বাসিত করা ছাড়া গত্যন্তর রইল না। প্লেটোর প্রথম যুগের রচনায় কাব্যপ্রেরণা সম্বন্ধে তাঁর বক্তব্যের মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা বিরোধ চোখে পড়ে। কবিরা জ্ঞানমার্গের সাধক নন; তাঁদের ভাবনা ব্যবহার ন্যায়নিষ্ঠার দ্বারা সংস্কৃত নয়; তবু অনুপ্রেরিত অবস্থায় তাঁরা দৈবশক্তির অধিকারি। প্রেরণার বলে তাঁরা অলৌকিক জগতের অপরোক্ষানুভূতি লাভ করেন। এ কারণে প্রেরণাকে যুক্তিবিরোধি এবং অনিয়ন্ত্রণিয় বলা সত্তে¡ও প্লেটো গোড়ার দিকে ব্যতিক্রম হিসেবে তার যে একটা বিশেষ মূল্য আছে তা স্বিকার করেছেন। কিন্তু পরবর্তিকালে কাব্যপ্রেরণার এই বিশেষ মূল্যকে তিনি তাঁর দর্শনচিন্তায় তেমন আমল দেননি। ব্র‏‏হ্মসত্যের অপরোক্ষানুভূতি তখনও তাঁর কাছে মূল্যবান ছিল; কিন্তু সে দুর্লভ অভিজ্ঞতা অর্জনের পথ তখন আর প্রেরণা নয়, ক্ষুরধার ডায়ালেকটিকের সুকঠিন সংযমেই তার প্রস্তুতি। বস্তুত আথেনিয় গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতাক্রমেই প্লেটোর মনে এ প্রত্যয় দৃঢ়মূল করেছিল যে প্রতিটি স্ত্রী-পুরুষের চিন্তা, ব্যবহার, এককথায় চরিত্র, যতক্ষণ-না কর্তব্যবোধের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, ততক্ষণ মানবসমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। সুতরাং যা-কিছু এই নিয়ন্ত্রণের প্রতিবন্ধক, তার সমূল উৎপাটন অবশ্য কর্তব্য। প্লেটোর পরিণত কালের চিন্তাধারায় তাই এ যুগের সার্বিক (totoliarian) সমাজাদর্শ এবং শাসনপদ্ধতির পূর্বাভাস চোখে পড়ে। প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রে প্রতি ব্যক্তির চরিত্র ও আচার-ব্যবহার পূর্ব-পরিকল্পিত এবং নীতি- নির্দেশের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু যাঁরা প্রেরণার দাস, আদর্শ রাষ্ট্রের দার্শনিক শাসনকর্তারা তাঁদের চরিত্র এবং ব্যবহার কি করে নির্দিষ্ট করবেন? ‘রিপাবলিক’-এর গোড়ার দিকে সক্রেটিসের মুখ দিয়ে প্লেটো অবশ্য বলেছেন যে কবিরা রাষ্ট্র পরিচালকদের নির্দেশ অনুযায়ি শুধু নীতিসঙ্গত কথা লিখবেন এ প্রতিশ্র“তি দিলে রাষ্ট্র তাঁদের পোষণ এবং সমর্থন করবে। কিন্তু কবিরা এ প্রতিশ্র“তি দিলেও তা পালন করার সামর্থ্য তো তাঁদের নেই। কেননা প্রেরণার বশে তাঁরা যে কি লিখবেন কি বলবেন তা তো আগে থেকে তাঁরা নিজেরাও জানেন না। ফলে ‘রিপাবলিক’-এর শেষ অধ্যায়ে প্লেটো রায় দিলেন যে আদর্শ রাষ্ট্রের চৌহদ্দি থেকে কবিদের খেদানো ছাড়া উপায় নেই। ‘কেননা, প্রিয় গ্লোকন, যদিও জনসাধারণ সে কথা পুরো বোঝে না, তবু মানুষের সৎ হওয়া কি অসৎ হওয়ার উপরে অনেক কিছুই নির্ভর করছে এবং সে কারণে কি খ্যাতি, কি বিত্ত, কি পদমর্যাদা, কি কাব্য কোনোকিছুর সম্মোহনেই ন্যায় এবং অন্যান্য নৈতিক আদর্শকে কিছুতে অবহেলা করা চলবে না।’ অতএব দার্শনিকের রাষ্ট্র থেকে কাব্যল²িকে, যত বিষণ্ন চিত্তেই হোক, শেষ পর্যন্ত বিদায় দিতে হল।

ছয়
কিংবদন্তি অনুসারে প্লেটো প্রথমযৌবনে কবি ছিলেন। গুরু সক্রেটিসের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সেসব কবিতা না-কি তিনি পুড়িয়ে ফেলেন। গ্রিক কাব্যসংকলনে তাঁর লেখা বলে প্রচলিত কিছু কিছু টুকরো কবিতাও পাওয়া যায়। এ কিংবদন্তি সত্য কি না, এসব কবিতা যথার্থই প্লেটোর রচনা কি না, তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে। এ বিষয়ে শেষ সিদ্ধান্ত যা-ই হোক-না কেন, তাঁর নানা দার্শনিক রচনা থেকে এ বিষয়ে নিঃসন্দেহে হওয়া যায় যে এই ঘোর কাব্যবিরোধি দার্শনিক প্রকৃতির দিক থেকে অনেকখানিই কবিদের সমধর্মি ছিলেন। ফলে কাব্যপ্রেরণা বিষয়ে তাঁর বিবরণে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার স্পর্শ পাওয়া যায়। দেবতায় পাওয়া ইত্যাদি আদিম ধারণা কল্পনা বাদ দিলে এ কথা বোধ হয় সব সাহিত্যিক এবং সাহিত্যরসিক স্বিকার করবেন যে সাহিত্যসৃষ্টির মূলে এমন এক শক্তি সক্রিয়, যার উপরে কোনো হুকুম খাটে না। এই শক্তিরই নামকরণ করা হয়েছে প্রেরণা। আধুনিককালে মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে সর্বগ্রাসি রাষ্ট্ররা এ শক্তিকে পর্যন্ত নিজেদের তাঁবেদার করার চেষ্টা করেছে। ফলে যদিও সে সব দেশে বছরে বছরে কেতাব ছাপা হয়েছে বিস্তর, কিন্তু সাহিত্য প্রেরণা এসেছে শুকিয়ে। যাঁরা জাত সাহিত্যিক, তাঁরা হয় দেশ ছেড়েছেন (যেমন টমাস মান কি ইভান বুনিন), নয় আত্মহত্যা করেছেন (যেমন মায়াকোভস্কি), নয় কারাগার, দাসশিবিরে কি গ্যাসচেম্বারে প্রাণ দিয়েছেন। তবু অসিম ক্ষমতা সত্তে¡ও রাষ্ট্রশক্তি আজ পর্যন্ত শিল্পি-সাহিত্যিকের প্রেরণাকে পুরোপুরি আপন মুঠোয় আনতে সমর্থ হয়নি। এসব অভিজ্ঞতা প্রেরণা বিষয়ে প্লেটোর বিশ্লেষণকে স্পষ্টই সমর্থন করে।

প্রেরণার উৎস যে কি তা আমরা আজও জানি না; তবে এটুকু আমরা জানি যে তা শুধু সমাজ এবং রাষ্ট্রের আয়ত্তের বাইরে নয়, শিল্পি-সাহিত্যিকের নিজেরও তার উপরে বিশেষ কোনো হাত নেই। এই হাত না-থাকা দু’ অর্থে সত্য। অত্যন্ত সংযমি লেখকও যখন ভিতরকার তাগিদে লিখতে বসেন, তখন সে লেখা শেষ পর্যন্ত কি রূপ নিয়ে গড়ে উঠবে আগে থেকে সেটি তাঁর পক্ষে নিশ্চিত করে জানা অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, সৃষ্টি-প্রেরণা যতক্ষণ সক্রিয় ততক্ষণ তার দাবি অস্বিকার করার সামর্থ্য সে প্রেরণার অধিকারির নেই। এ দিক থেকে শিল্পি-সাহিত্যিক প্রেরণার অধিকারি হয়েও প্রেরণার দাস। লেখকের মনে যখন লেখার প্রেরণা আসে, তখন তাকে লিখতেই হবে, কাগজ-কলম না পেলে অন্তত মনে মনে, অন্তত মুখের ভাষায় তার সে প্রেরণাকে প্রকাশ করতে হবে। অন্য শ্রোতা কি পাঠক না-থাক, সে রূপ নিজের কানে শুনতে হবে, নিজের চোখে দেখতে হবে। এ না-হওয়া পর্যন্ত তার শান্তি নেই, অন্য কাজে মন নেই, অন্য চিন্তার অবসর নেই।

কিন্তু প্রেরণাই তো সাহিত্যের একমাত্র সূত্র নয়। সার্থক সাহিত্যসৃষ্টির জন্য সুকঠিন সংযমেরও একান্ত প্রয়োজন আছে। প্লেটো এ দিকটি একেবারে অবহেলা করেছেন। শিল্পকর্মের অনুশিলন যে সাহিত্যিকের পক্ষে প্রেরণার (ingenium) চাইতে কম আবশ্যিক নয়, পরবর্তিকালে বৈজন্তিয় এবং রোমান আলঙ্কারিকেরা এ সত্য বিশদ বিচার-বিশ্লেষণের দ্বারা প্রমাণিত করেন।২ প্রেরণার উপরে সাহিত্যিকের হাত নেই, কিন্তু আত্ম-প্রস্তুতির উপরে অন্য মানুষের মতো তাঁরও পুরোপুরি হাত আছে। আত্ম-প্রস্তুতি সচেতন প্রয়াসসাপেক্ষ। তার নানা দিক আছে-সাহিত্যের ক্ষেত্রে তার দুটি দিক বিশেষভাবে উলে­খযোগ্য। সব শিল্পই মাধ্যমনির্ভর এবং মাধ্যমকে বশে না-আনতে পারা পর্যন্ত সে মাধ্যমে শিল্পসৃষ্টি অসম্ভব। বশে আনার অর্থ সে মাধ্যমের বিচিত্র সম্ভাবনা বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং সে সব সম্ভাবনাকে প্রকাশের উপায়রূপে ব্যবহার করার সামর্থ্য অর্জন করা। সাহিত্যের মাধ্যম ভাষা। ভাষা তো সকলেই ব্যবহার করে কিন্তু ভাষার মধ্যে কতখানি প্রকাশের শক্তি নিহিত আছে তার খোঁজ শুধু সাহিত্যশিল্পি রাখেন। সে খোঁজ পাবার জন্য তাঁকে গভীর অধ্যবসায়ের সঙ্গে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়।৩ ধ্বনিতে ধ্বনিতে ছন্দোব্যঞ্জনার কত যে পার্থক্য, শব্দচয়ন এবং বাক্য গঠনের বিচিত্র কৌশলে অল্পকথার মধ্যে কত বেশি অর্থ যে ধরানো যায়, ঠিক কোন শব্দটি কিভাবে প্রয়োগ করলে একটি উদ্দিষ্ট ভাব বা অভিজ্ঞতা তার যথার্থ প্রকাশ লাভ করে এ সব বিষয়ে সূ²জ্ঞান এবং সে জ্ঞান প্রয়োগে নিপুণতা বড় সহজে অর্জন করা যায় না। সাহিত্যিকের আত্মপ্রস্তুতির জন্য তাই মাধ্যম চর্চা একান্ত প্রয়োজন; সুতরাং মননশিলতা সাহিত্যসাধনার অপরিহার্য অঙ্গ।

দ্বিতীয়ত, সাহিত্যসৃষ্টির জন্য লেখকের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধি থাকা দরকার। অভিজ্ঞতা ছাড়া কল্পনার বিস্তার এবং বৈচিত্র্য সম্ভবপর নয়। অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ উভয় সূত্রেই অর্জিত হতে পারে। কিন্তু যে সূত্রেই লব্ধ হোক, সে অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যের বিষয়বস্তু করতে হলে তাকে মননের দ্বারা জারিত করে নিতে হয়। শুধু অভিজ্ঞতা থাকলেই সাহিত্যিক হওয়া যায় না; সাহিত্যের উপাদান হল তাৎপর্যের দ্বারা অন্বিত অভিজ্ঞতা। এ কাজও সাধনাসাপেক্ষ। একদিকে মাধ্যমের সাধনা এবং অন্যদিকে অভিজ্ঞতার সাধনা, এ দুয়ের সমাবেশ ঘটলে তবে সাহিত্য প্রেরণা সাহিত্যরূপে ফলপ্রসূ হতে পারে। এতখানি মননশিলতার সংযম যাঁরা স্বেচ্ছায় স্বিকার করে থাকেন, তাঁদের অসংযমি কি অস্থিরবুদ্ধি বলে অভিযুক্ত করা নিশ্চয়ই যুক্তিসঙ্গত নয়।
প্লেটোর যুক্তিতে এ ছাড়া আরও একটি মারাত্মক ভুল বর্তমান। যৌক্তিকতা এবং মুক্তিস্পৃহার মধ্যের প্রবণতার দিক থেকে বিরোধ আপাতদৃষ্টিতে অনতিক্রমণিয় মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে এ দুয়ের মধ্যে গূঢ় সহযোগিতার ফলেই মানুষের বিকাশ সম্ভবপর হয়।৪ একথা ঠিক যে মুক্তিস্পৃহার প্রবণতা সমস্ত নিয়ম-শৃঙ্খলা ভেঙে ফেলার দিকে; অপরপক্ষে যুক্তি শুধু যে নিয়মানুগ তাই নয়, যা আপাত দৃষ্টিতে শৃঙ্খলাহীন তার মধ্যে নিয়মের সন্ধান করাই তার কাজ। তবু মুক্তি যদি শুধু নঞর্থক না-হয়, তবে জ্ঞানের সহযোগ ছাড়া তার উদ্দেশ্য সাধিত হতে পারে না। এবং সংসারে নিয়মের রাজত্ব আবিষ্কার করা নিরর্থক যদি-না সে জ্ঞানের সাহায্যে মানুষ পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ ঘটিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করতে পারে। বিকাশের এ ডায়ালেকটিক যাঁরা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন না, তাঁদের দর্শনে হয় যুক্তি-বুদ্ধি নয় মুক্তিস্পৃহা অবহেলিত হয়। প্রথমটির উদাহরণ রুশো, দ্বিতীয়টির উদাহরণ প্লেটো। এবং এদের মধ্যে একটিকে অবহেলা করলে অন্যটির রূপও যে বিকৃত হয়, এই দুই অসামান্য প্রভাবশালি দার্শনিকের রচনা তারই প্রমাণ। মুক্তিস্পৃহাকে অবহেলা করার ফলে প্লেটোর চিন্তায় যুক্তি-বুদ্ধি স্বমার্গ ত্যাগ করে অতিপ্রাকৃত সাধনায় নিয়োজিত হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তিকে পরিহার করার ফলে রুশোর দর্শনে মুক্তিস্পৃহা শেষ পর্যন্ত পর্যবসিত হয়েছে যূথবদ্ধ গড্ডলবৃত্তিতে।

এখন প্রেরণা এই মুক্তিস্পৃহারই একটি বিশেষ প্রকাশ। সাহিত্য প্রেরণাসঞ্জাত বলে সাহিত্যের মধ্যে মুক্তির এক অতি গূঢ় দুর্লভ স্বাদ পাওয়া যায়। প্লেটো সম্ভবত তা জানতেন এবং হয়তো সে কারণেই তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রে প্রেরণার জন্য কোনও স্থান রাখেননি। তাঁর আশংকা ছিল সাহিত্যের মারফত মানুষ যদি মুক্তির স্বাদ পায়, তবে তারা আর তাঁর নিয়ম-নিয়ন্ত্রিত দার্শনিক রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা মানতে চাইবে না। তাঁর আশংকা যে ভিত্তিহীন, এ কথা বলতে পারি না; কিন্তু সে আশংকাই কি প্রমাণ করে না যে তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রের বুনিয়াদ অত্যন্ত দুর্বল, যে তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রের আদর্শটাই অত্যন্ত মারাত্মকভাবে ভ্রান্ত? ব্যক্তির মুক্তিস্পৃহাকে অবদমিত করতে চায় যে রাষ্ট্র, তাকে কোন অর্থে আদর্শ বলতে পারি? সাধারণভাবে মুক্তিস্পৃহাকে, বিশেষভাবে প্রেরণাকে আত্মপ্রস্তুতির দ্বারা মার্জিত, শিলিত করার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। কিন্তু সে স্পৃহা ও প্রেরণাকে সমূহে উৎপাটিত করা যে প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে, তাকে আত্মঘাতি ছাড়া আর কি বলা যায়? বাস্তবিক পক্ষে মানুষের জীবনে সাহিত্য যে এত মূল্যবান, এই প্রেরণাগুণ কি তার অন্যতম প্রধান হেতু নয়? কেননা, প্রেরণা শুধু সাহিত্যস্রস্টাকেই মুক্তির স্বাদ দেয় না, সাহিত্যভোক্তাকেও সে স্বাদে সমৃদ্ধ করে থাকে। মানুষের জীবনে এ স্বাদের কোনো তুলনা নেই। প্লেটো নিজে এ স্বাদে অনভিজ্ঞ ছিলেন না, কিন্তু তিনি তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রের নাগরিকদের এ স্বাদে বঞ্চিত করতে চেয়েছিলেন।

সৌভাগ্যবশত প্লেটোর সে চাওয়া বাস্তব জীবনে কার্যকরি হয়নি। কাহিনি আছে যে তাঁর শিষ্য ডিওনিসিয়স যখন সিরাকুসের শাসনকর্তা, তখন তিনি শিষ্যের মারফত সে দেশকে নিজের আদর্শ অনুযায়ি গড়ে তুলবার চেষ্টা করেছিলেন। ফলে সে দেশে রাষ্ট্রবিপ্লব দেখা দেয় এবং প্লেটোকে আত্মরক্ষার জন্যে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। তাঁর প্রৌঢ় বয়সের রচনা ‘খধংি’ গ্রন্থে তিনি যে দর্শনের চাইতে ধর্মের উপর বেশি জোর দিয়েছিলেন, অনেক পণ্ডিতের মতে এটি আসলে ঐ রূঢ় অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়া। সে যাই হোক, প্রত্যক্ষভাবে তাঁর জীবনাদর্শকে রাষ্ট্রিয় কাঠামোর মধ্যে রূপ দিতে না-পারলেও, পরোক্ষভাবে সে দর্শন যে পরবর্তি প্রায় আড়াই হাজার বছরের পশ্চিমি চিন্তা এবং জীবনযাত্রার উপরে প্রবল প্রভাব ফেলেছে তাতে সন্দেহ নেই। হোয়াইটহেড তো বলেছেন যে পশ্চিমি চিন্তার ইতিহাস প্লেটোর পাদটিকা মাত্র। এটি অতিশয়োক্তি; কিন্তু আজও যে ইউরোপিয় মানস প্লেটোনিক জীবনদর্শনের মারাত্মক প্রভাব অতিক্রম করতে পারেনি, তার হাজারো প্রমাণ চোখে পড়ে।৫ আমাদের শতকে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে যে সব সার্বিক জীবনদর্শন এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে, তাদের সঙ্গে প্লেটোনিক চিন্তার আত্মিয়তা স্পষ্ট। এবং অন্য কোনও যুক্তিপ্রমাণ যদি না-ও দেখানো হয়, শুধু এইসব রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকেই সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে যে প্লেটোনিক জীবনদর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে কি শিল্প-সাহিত্য, কি মানুষের মুক্তি সাধনা উভয়ের ভবিষ্যতই গাঢ় তমসাচ্ছন্ন।৬

টিকা
১. কেন এবং কি উপায়ে নিজস্ব নৈতিক সিদ্ধান্তকে সর্বজনগ্রাহ্য করার উদ্দেশ্যে সৎ এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তিও তাকে ঐশ্বরিক নির্দেশরূপে উপস্থিত করে থাকেন, টমাস মান তাঁর The Tables of the Law কাহিনিতে তারই একটি বড় সহৃদয় এবং বিদগ্ধ বর্ণনা দিয়েছেন। এই কাহিনির নায়ক ইহুদি ইতিহাসের মুখ্য চরিত্র মুসা বা মোজেস। ভারতবর্ষে মান-এর মতো প্রাজ্ঞ এবং সুরসিক লেখক থাকলে মহাভারতের কৃষ্ণকে নিয়েও এমনিতর উপন্যাস হয়তো রচিত হতো।
২. এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ আছে J.F. D’Alton-Gi Roman Literary Theory and Criticism গ্রন্থে।
৩. পশ্চিমি সাহিত্যে মালার্মে, পেটার, এলিয়ট প্রমুখ অনেকেই এই দিকটির উপরে বিশেষ ঝোঁক দিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে এদিকে যাঁরা দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তাঁদের মধ্যে বঙ্কিম, প্রমথ চৌধুরী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বিশেষভাবে স্মরণিয়।
৪. মানবেন্দ্র নাথ রায় তাঁর Reason, Romanticism and Revolutionগ্রন্থে যুক্তি ও মুক্তির পরস্পর নির্ভরতার উপরে প্রচুর আলোকপাত করেছেন।
৫. প্লেটোর প্রতিক্রিয়াশিল চিন্তা এবং প্রভাবের সবচাইতে বিশ্লেষণাত্মক বিচার পাওয়া যাবে কার্ল পপারের The Open Society and Its Enemies মহাগ্রন্থের প্রথম গ্রন্থে। তাছাড়া লাঙ্গে-The History of Materialism এবং রাসেলের  A History of Western Philosophy-তেও এদিক নিয়ে আলোচনা আছে।
৬. ‘সাহিত্যচিন্তা’ গ্রন্থের অন্তর্গত হয়ে এই প্রবন্ধটি যখন প্রকাশিত হয় তখন এটির নাম ছিল ‘প্লেটোর সাহিত্যবিচার’। ঐ গ্রন্থের বিস্তারিত আলোচনা করেন পি. ফালোঁ (‘সাহিত্যপত্র’, অষ্টম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, ১৩৬৩)। তিনি বিশেষ করে প্লেটো সম্পর্কে আমার বক্তব্যে আপত্তি তোলেন।

 

প্রবন্ধটি নেয়া হয়েছে শিবনারায়ণ রায়ের ‘কবি নির্বাসন ও স্রোতের বিরুদ্ধে’ গ্রন্থ থেকে।
শেয়ার করুন: