004588
Total Users : 4588
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →
জন্ম— জুন, ০৬, ১৯৭৭। জন্মস্থান— উত্তর গোবীন্দর খীল, হাঁদু চৌধুরী বাড়ী, পটিয়া, চট্টগ্রাম। (শৈশব কৈশোর ও তারুণ্যের সময়যাপন) বেড়ে ওঠা (পূর্ব্ব বালিয়াদী, মীরশ্বরাই, চট্টগ্রাম) নানার বাড়ীতে। প্রকাশিত কবিতার বই— ফুলেরা পোষাক পরে না (সাল: ২০১৮, প্রকাশক : মনফকিরা, কলিকেতা)। প্রকাশিতব্য বই— অর্দ্ধনারীশ্বরবাদ : প্রকৃতিপুরুষতত্ত্ব (নন্দনতত্ত্ব), বটতলার বয়ান (ভাষাতাত্ত্বিক গদ্য) ও উদ্ভিদপ্রতিভা (কবিতা)। সম্পাদক— চারবাক।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

কবি দিলওয়ার ও তার কবিতার কিছু পাঠ বিবেচনা

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দৈশিক এবং বৈশ্বিক কবি দিলওয়ার নিজ ঘরে নিখোঁজের মতো পড়ে থেকে জীবনের একটা বড় অংশ কাটিয়ে গেছেন। জীবনের নানা চড়াই উতরাইয়ে রাজধানীর মুখ ও মুখোশ তিনি দেখেছেন বটে, কিন্তু তিনি শিকড়ের অবস্থান থেকে বিচ্যুত হননি, পলায়ন করেননি জীবন ও সাহিত্য থেকে। কবিতা হয়ে উঠে তার সাধনার অংশ। ১৯৩৭ সালের ১ জানুয়ারী দিলওয়ার সিলেটের ভার্থখোলা গ্রামে এক মধ্যবিত্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ঐতিহ্যবাহী রক্ষণশীল পরিবারে তার বেড়ে ওঠা হলেও শৈশবেই কবিতার স্ফুরণ ঘটে। দিলওয়ার মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা শেষ করে, আই,এ ক্লাশে অধ্যয়নকালীন সময় থেকে শারিরীক অসুস্থতার স্বীকার হন। এর পর থেকে শরীরের রোগ ব্যাধি তার পিছু ছাড়ে নি, কিন্তু তিনিও কবিতার পিছ ছাড়েননি আমৃত্যু।

১৯৪৯ সালে দিলওয়ারের প্রথম কবিতা “সাইফুল্লা হে নজরুল” সিলেটের প্রাচীনতম সাপ্তাহিক যুগভেরীতে প্রকাশিত হয়। অত:পর দিলওয়ার সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে লেখালেখিতে বৃষ্টির মতো যুক্ত হয়ে পড়েন। তিনি ছড়া, কবিতা, গান ইত্যাদি লিখতে থাকেন। তার ক্ষুরধার ছন্দময় ছড়ায় স্বদেশে ও বিদেশের বিখ্যাত কাগজসমূহে ছড়িয়ে পড়ে। তার একহাজার লাইনের দীর্ঘ ছড়া হচ্ছে “এই দেশ কোন দেশ” সম্ভবত এত দীর্ঘ ছড়া বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয়টি খোঁজে পাওয়া যাবে না।

এসময় ঔপনিবেশিক পাকিস্তান বিরোধী আলোড়ন-বিলোড়ন থেকেও দিলওয়ার এড়িয়ে যান নি। স্বদেশ স্বজাতি নিয়ে তার কবিতা, গান প্রকাশিত হতে থাকে। তার কবিতা গানে উচ্চারিত হয়েছে চলছে মিছিল, চলবে। কিংবা ভাষার গান “আয়রে চাষী, মজুর কুলি, মেথর কামার কুমার/বাংলা ভাষা ডাক দিয়েছে, বাংলা তোমার আমার।”

১৯৬৭ সালে দিলওয়ার দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসাবে যুক্ত হন। সংবাদ পত্রিকা এ সময় প্রগতিশীলদের একটা ঠিকানা হিসাবে ভূমিকা রেখেছে। দিলওয়ার তখন ঘনিষ্ট হন সত্যন সেন, রণেশ দাশ গুপ্ত, শহীদুল্লাহ কায়সার, শুভ রহমান প্রমুখের সঙ্গে। এছাড়া সংবাদ কেন্দ্রিক সম্পর্ক গড়ে উঠে জিয়া উদ্দিন, আখতার হোসেন, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, মালেকা বেগম, মতিয়া চৌধুরী প্রমুখের সঙ্গে।
মুক্তিযোদ্ধের প্রাক্কালে দিলওয়ারের নেতৃত্বে সিলেটে “সমস্বর শিল্পী” সংগঠন গড়ে উঠে। এ সংগঠনের উদ্যোগে প্রতিবাদী যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন, মিছিল অনুষ্ঠিত হয়, তাতে শাসকগোষ্ঠীর চক্ষুশুল হয়ে উঠে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দিলওয়ার পাঞ্জাবী সেনার টার্গেট হয়ে উঠেন। দিলওয়ার বাড়ী ছেড়ে দূর গ্রামে গিয়ে অবস্থান নেন। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে তার অবস্থান দৃঢ় হয়ে উঠে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তার তিনটি গান নিয়মিত প্রচারিত হয়। দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুর সরকার তাঁকে “পলিটিক্যাল পেনশন” সম্মানে ভাতা প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর দিলওয়ার “পলিটিক্যাল পেনশন” আর গ্রহণ করেন নি।

দিলওয়ার আয়-রোজগারের জন্য কোন পেশায়ই যুক্ত থাকেন নি। তিনি লেখালেখিতে একজন কবিতার সার্বক্ষণিক কর্মীর মতো কাটিয়ে দিয়েছেন। তিনি একজন আড্ডাবাজ কবি হিসাবে পরিচিত ছিলেন। সাহিত্যের আড্ডায় তিনি দিনভর কাটিয়ে দিতে পারতেন। তিনি প্রায়শই মফস্বলের গ্রামে ঘুরে বেড়াতে যেতেন। গ্রামঞ্চলের স্কুল কলেজ পড়–য়া তরুণ তরুণী ঝাঁকে ঝাঁকে তার কবিতার সঙ্গী হয়েছে। দিলওয়ার তাদের কথা মনযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং তাদের কবিতা ও ছড়া লেখায় উৎসাহিত করেছেন। অনেকেই অনুপ্রারিত হয়ে লেখালেখিত যুক্ত হয়েছে। দিলওয়ারের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট হচ্ছে, তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ কামনা করেছেন। এজন্য তিনি যেখানেই গেছেন কবিতার পাশাপাশি মানুষের সুখ-দু:খের কথা শুনেছেন। গ্রামের দু:খী সাধারণ মানুষের সঙ্গে আড্ডায় বসে কথা শুনেছেন।

দিলওয়ার জীবদ্দশায় বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন-তম্মধ্যে বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার ১৯৮০, একুশের পদক-২০০৮ সম্মাননা উল্লেখ্য। তিনি ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সংঘ কর্তৃক ২০০১ সালে ভারতের আগর তলায় সম্মানিত হন। দিলওয়ারের কবিতা ভারতের বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে বিবেচ্য। খ্যাতিমান লেখিকা মৈত্রী দেবী ও দেবদুলাল বন্দোপধ্যাসহ আরো অনেকে তার কবিতার গুণগ্রাহী ছিলেন। এ পর্যন্ত দিলওয়ারের প্রকাশিত উল্লেখ্য রচনা সমূহের মধ্যে কটি হচ্ছে ‘জিজ্ঞাসা (কাব্যগ্রন্থ) ১৯৫৩, ঐক্যতান (কাব্যগ্রন্থ) ১৯৬৪, পূবাল হাওয়া (গানের বই) ১৯৬৫, উদ্ভিন্ন উল্লাস (কাব্যগ্রন্থ) ১৯৬৯, বাংলা তোমার আমার (গানের বই) ১৯৭২, ফেসিং দি মিউজিক (ইংরেজী কাব্যগ্রন্থ) ১৯৭৫, স্বনিষ্ঠ সনেট (কাব্যগ্রন্থ) ১৯৭৭, রক্তে আমার অনাদী অস্থি (কাব্যগ্রন্থ) ১৯৮৩ প্রভূতি। এছাড়া প্রবন্ধ, নাটক, গল্পও রয়েছে।

 

(০২)

কবি দিলওয়ার কবিতার এক সার্বক্ষণিক কর্মী হিসাবে লিখেছেন নিরবধি, কিন্তু তিনি তার লেখালেখির মধ্যেও জীবন ও জগৎ সম্পর্কে সচেতন থেকেছেন। স্বদেশ ও পৃথিবীর রাজনীতি, কুটনীতি, রাষ্ট্রনৈতিক জটিল বিষয় আশয় এর গতি প্রকৃতি সম্পর্কে নজর রেখেছেন। তিনি কবি হলেও এসব বিষয় হাত ছাড়া করেন নি। এমনকি তিনি পূজিবাদী ও সমাজবাদী তথা মার্কসীয় দর্শন সম্পর্কেও অজ্ঞাত ছিলেন না। তিনি সমাজ পরিবর্তনের চালিকা শক্তি হিসাবে মার্কসীয় দর্শনকেই বিবেচ্য করেছেন। তিনি প্রাচীন ধর্ম ও পুরান, মিথ, ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান রাখতেন। তিনি ধর্ম হিসাবে ইসলামের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে গভীরভাবে মূল্য দিয়েছেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে মহামতি লেলিনের নেতৃত্বে রুশ বিপ্লব একটা বিরাট জাগরণ ঘটায় তেমনি মানব জাতির ইতিহাসে ইসলামের জাগরণও কম নয়।

দিলওয়ার মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের একজন কবি হিসাবে যেমন কবিতা, গান লিখেছেন, তেমনি মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বকে একজন প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী নেতার চরিত্র হিসাবে দেখেছেন। তিনি দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুর সরকারের অস্থির পরিস্থিতি নিয়ে উৎকন্ঠিত থেকেছেন। তিনি আশংকা করেছেন অশুভ শক্তির এবং বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিপন্নতা নিয়ে। তিনি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর কিছুদিন আগে তখনকার চলমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়ে ছয় টাকা পঁচাত্তর পয়সা খরচ করে টেলিগ্রাম পাঠান।
টেলিগ্রামটি ছিল-“ Wipe out all parasites
Keep give up salute of the world ”

এই টেলিগ্রামটি তৎকালীন সময়ের সিকন্দর আবু জাফর সম্পাদিত মাসিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর বহু চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে গেছে। দিলওয়ার মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ কামনা করেছেন, কিন্তু তার জীবদ্দশায় প্রত্যাশিত বাংলাদেশ খোঁজে না পেয়ে বার বার উদ্বিগ্ন হয়েছেন। তার লেখায় এসবের স্ফুরন ঘটেছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে এতসব অন্যায়, দুর্নীতি, লুটপাট কিছুতেই সহ্য করতে পারেন নি। কিন্তু তারপরও দিলওয়ার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি দ্বিধাহীন থেকেছেন। দিলওয়ার তখন গভীর বেদনার সঙ্গে একটি কাব্যগ্রন্থ লিখেন ‘বঙ্গবন্ধু আমি তোমার পেশাদার মিত্র নই’ ২০১০ সালে কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। দুইশত পঁঞ্চাশ লাইনের এই কবিতায় ঐতিহাসিক সমাজতাত্বিক ও পৌরাণিক ইত্যাদি দৃষ্টিকোণ থেকে লিখেছেন-সমকালীন সাহিত্যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এমন দূর ইতিহাসধর্মী কাব্যগ্রন্থ নজরে পড়ে না।
দিলওয়ার বঙ্গবন্ধুর শাসনের বলয়ের কেউ ছিলেন না। এ সময়ে তার শাসনকালকে ঘিরে কবি সাহিত্যিক লেখকদের ভিড়ের অভাব ছিল না ছিলনা স্থাবকতার তথাকথিত বীরদের। দিলওয়ার চোখে এসব এড়ায় নি। তার কবিতায় অর্ন্তনিরুদ্ধ কষ্টের গভীরতর এসব কথা উঠে এসেছে। ‘বঙ্গবন্ধু আমি তোমার পেশাদার মিত্র নই’-কবিতার শুরু হয়েছে এভাবে-

ভবিষ্যতে কে-কোথায় অবস্থান করবে
বর্তমান নিজেই তার রায় দানে দ্বিধান্বিত।

একজন কবি-র সান্নিধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন
একগুচ্ছ মহামানবীয় রুহানি-মহাত্মা,

আড়াই-তিন হাজার বৎসর পূর্বেকার
কালোত্তীর্ণ মানবপুত্রগণ সাহসাই
আমার মধ্যে বিলীন হয়ে যান,
অস্তিত্বের শ্বাস-প্রশ্বাস হয় ধ্রূব রাগিণী!

সম্মিলিত আমার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়-
বঙ্গবন্ধু, আমি তোমার পেশাদার মিত্র নই, ১০

বাংলাদেশ স্বাধীনের পর অস্থির পরিস্থিতিতে দিলওয়ার যে টেলিগ্রাম পাঠান তার মর্মবাণী কিভাবে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে, তা মর্মবাণী কিভাবে তার কবিতায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে, তা এখানে উদ্ধৃত করা যেতে পারে,

বঙ্গবন্ধু, আমি তোমার পেশাদার মিত্র নই,
তাই জুলাই মাসের মাঝামাঝি এক সকালে
দেউড়ীতে পা রাখতেই
নাকে আঘাত হানলো প্রবল এক দুর্গন্ধ,
কোরবাণী-র পশুর জমা বাধা রক্তে
সূর্যরশ্মি পাতে জন্মায় হেন বিকট গন্ধ,

পুকুর সমেত সারা বাড়িতে খোঁজা হলো
কেউ গলিত পশু কিংবা মানুষের লাশ
===================
টুকরো দলিল হয়ে মুদ্রিত সেই সত্য
পাওয়া যাবে সিকান্দার আবু জাফর-এর
প্রবর্তিত মাসিক ‘সমকাল’ এ
একটি তারবার্তা, একটি সনেট!

সেই লোমহর্ষক দুর্গন্ধ জানিয়ে ছিলো
দুর্দমনীয় এক হত্যাকান্ড আসছে
জামার আস্তিনে লুকিয়ে থাকা কালসাপ
অনিবার্য আঘাত হানতে কপালে কিংবা বক্ষে… ১৪

দিলওয়ার রাজনীতির কিংবা সরকারের পেশাদারিত্বের কোন দায়িত্বের অবতীর্ণ লেখক বা কবি না হয়েও বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা, হৃদয়ের অনুভব উৎসারিত ছিল। তা সহজেই বুঝা যায়। যখন তিনি তার বিপদের আশংকায় বার্তা পাঠান। এই বার্তাই মর্মবাণী হয়ে ২০১০ সালে ‘বঙ্গবন্ধু, আমি তোমার পেশাদার মিত্র নই’ কবিতায় উঠে এসেছে। এই সময় দিলওয়ারের অনুভব বা অনূভূতি তাকে কিভাবে নাড়া দিয়েছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। মুক্তিযুদ্ধের এমন বাংলাদেশ কেমন হয়ে উঠলো তা ভেবে দিলওয়ারের কবি মনে, গভীরতর প্রশ্ন দেখা দেয় কিভাবে চেতনার এমন বিনাশে চক্রান্তের ডালপালা এমন মেলে উঠে।তিনি এ কবিতায় প্রশ্ন রাখেন এভাবে-
শেখ মুজিবুর, মাত্র ৩৯ বৎসরে
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ভেতরে
‘২৩৩১০ কোটিপতি, জন্মালো কী করে?
ওরা নাকি বৈধ কোটিপতি?
রাণী নেফারতিতি জিজ্ঞাসু হতে পারেন,
বলতে পারেন-অবৈধের সংখ্যা কতো?

বাংলার ডেমসথিনিস, ৭ই মার্চের তোমার ভাষণ
ক্রমশ: গর্জনশীল হয়ে উঠছে,
নেতৃবর্গকে যারা স্বর্গে পাঠিয়ে সুগন্ধী ঢেকুর তুলছে
তাদের আস্তানার দিকে আসছে ভাষণ-
রসনা তার রক্তজবা-
আবু লাহাবেরা সস্ত্রীক শোনো,
লির্বাটি ইজ নট লাইসেন্স,” ২২

কাব্যগ্রন্থটিতে এভাবে দিলওয়ারের কবিতা আবর্তিত হয়েছে ইতিহাসের উর্মিমালার মতো। কবিতাটিতে ইতিহাস, মিথ, সমাজতত্ব, ধর্মতত্ব ইত্যাদি কিছুই বাদ যায় নি-আছে উপমাও। দিলওয়ার নিজস্ব কায়দায় নিজস্ব ধারায় রচনা করেছেন, তাতে তা হয়ে উঠেছে কবির নিজস্ব স্টাইল। দিলওয়ার অধুনা কবিতার মতো আধুনিক কবি কিনা, তিনি কবিতার শরীর নির্মাণে, বক্তব্যে আধুনিক কি না এমন তর্ক কেউ উঠাতে গেলে সকল ক্ষেত্রে দিলওয়ার একজন আধুনিক কবি হিসাবে আখ্যায়িত হবেন। আধুনিকতার অর্থ যদি সকল ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীলতা, অগ্রসরতা তাহলে দিলওয়ার অবশ্যই আধুনিক এক্ষেত্রে দিলওয়ারের কবিতার একটা চমৎকার লাইন হচ্ছে-

‘কবিতা সুহৃদ হলে, কাল তারে শিরোধার্য করে’, তেমনি জীবন দর্শনের ক্ষেত্রেও তার কবিতার একটি চরণ উদ্ধৃত করা যেতে পারে,

“মানুষ তুমি, যে যেখানেই থাকো না কেনো, আমাকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না, যেমন পৃথিবী নামের গ্রহ,
যেমন পৃথিবী নামের গ্রহ, সুর্যোদয় আর সুর্যাস্তকে, ছাড়িয়ে যেতে অক্ষম”।
বিজ্ঞান মনস্ক দিলওয়ায়ের ছড়ায়, ‘গ্রহে ভালোবাসা’ যেভাবে ধরা পড়ে তার একটি ছড়ায় উঠে আসে এভাবে-
এই গ্রহ, এই বাসভূমি
এই মাটি, এই খাসভূমি
দিনরাত, রবি ঘিরে তার
চলছেই আলোর বিহার
প্রিয়তমা, তার ঘাস তুমি !
এই ঘাসে চির যৌবন,
সবুজেই আলোর জীবন’। ৬

ছড়া ও কবিতা রচনায় দিলওয়ার জীবন দৃষ্টিকে প্রধান্য দিয়ে বক্তব্যকে গুরুত্ব প্রদান করে কবিতার শরীর নির্মাণে শব্দে শব্দে যেভাবে অলংকার নির্মাণ করেন, তাতে তিনি হয়ে উঠেন শব্দের ‘গোলাঘর’ যেন। ছন্দ ও সনেট নির্মাণেও তিনি যেভাবে লিখে গেছেন, সমকালীন বাংলা সাহিত্যে তার জুড়ি মেলা ভার। ‘বঙ্গবন্ধু, আমি তোমার পেশাদার মিত্র নই’ এক ভিন্নতর বক্তব্য ও স্টাইলের অবতারণা করেছেন। এ কাব্যগ্রন্থে তিনি ইতিহাস, মিথ এর এমন সব ব্যবহার করেছেন, তা থেকেও এসবের এক আলাদা পাঠ রচনা করা যায়। এ কাব্যগ্রন্থটি ইতিহাসের একখানা লক্ষভেদী দলিল হিসাবে অভিহিত করা যায়।

সহায়ক তথ্য:
১. বঙ্গবন্ধু, আমি তোমার পেশাদার মিত্র নই (১০,১৪ ও ২২ নং পৃষ্ঠা)
২. দিলওয়ার (৭নং পৃষ্ঠা)

 

 

শেয়ার করুন: