004588
Total Users : 4588
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

কাব্যের স্বভাব

কাব্য আজকাল সাধারণের মনোযোগ এত কম আকর্ষণ করে যে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন হতে পারে, এর সত্যিকার গুরুত্ব আছে। কিন্তু যে-কেউ যিনি সভ্যতার ইতিহাস পাঠ করেন এই সিদ্ধান্তে না আসা তার পক্ষে কঠিন হবে যে, কাব্য সর্বদাই মানব সংস্কৃতিতে কেন্দ্রিয় অবস্থানটি ধরে রেখেছে। এমন গোষ্ঠি নেই বললেই চলে যারা এতটাই আদিম যে তাদের কোনো কাব্যিক প্রকাশ রীতি নেই। এমনকি সবচাইতে অনগ্রসর অসভ্যরা, যেমন আমেরিকান ইন্ডিয়ান এবং ইস্টার দ্বীপের স্থানিয়রা সৃষ্টি করেছিল ধর্মসংগীত (chants) ও গাথাসংগীত (ballads) যেগুলো নিঃসন্দেহে কাব্যিক। কাব্য মিশরিয় ও ব্যবিলনিয় সভ্যতার মতো দূরতম সভ্যতাগুলোকে তেজোদীপ্ত করেছিল এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি সংস্কৃতিতে মুখ্য উপাদান হয়েছে। যেখানেই এটা আবির্ভূত হয়েছে, শুধু বিনোদনের উপায় হিসেবেই নয়, ব্যবহৃত হয়েছে ধর্মিয়বিশ্বাস ও নৈতিক বিধিবিধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুভূতি ও ভাব (ideas) প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেও। হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থসমূহ, ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রফেটস-এর মতো অংশসমূহ, দ্য বুক অব সাল্‌মস (The book of Psalms) ও দ্য বুক অব জব (The Book of Job) কাব্যে লেখা। গ্রিক এবং রোমানরা সভ্যতার প্রতি তাদের মহৎ অবদানগুলো লিখেছিল মহাকাব্য, গীতিকবিতা ও কাব্যনাট্যে (dramatic poems)। চিন ও জাপানে কাব্যকলা শিক্ষায়, নৈতিক পথনির্দেশনায় এমনকি শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আজকের দিনে কাব্য সম্পর্কে ব্যাপকমাত্রায় আগ্রহের অভাবের মানে এই নয় যে, এটা একটা মৃত কলা। এর পাঠক, আধুনিক পাঠকসম্প্রদায়ের মানদণ্ডে বিচার করলে ক্ষুদ্র, কিন্তু এটা বই এবং সাময়িকপত্রে বিশাল সংখ্যক নতুন কবিতা প্রকাশে সমর্থন দান এবং খুবই সক্রিয় প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা ও সাহিত্য-সমালোচনায় উৎসাহদানের মতো যথেষ্ট সাড়াদায়ক।

এই প্রশ্ন করা যুক্তিসঙ্গত যে, কেন কাব্য যা লেখা এবং পাঠ করা গদ্যের চেয়ে দূরূহতর বিশ্বের সংস্কৃতিতে প্রায় সর্বদাই একটি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অধিকার করেছে। কাব্যের কিছু বিশেষ কাজ এবং বৈশিষ্ট্যের বর্ণনার মাধ্যমে এই প্রশ্নের সবচাইতে ভাল উত্তর দেয়া যাবে।

ভাষা ভাব-প্রকাশের জন্যে সবচাইতে নমনীয় এবং সবচাইতে সূক্ষ্ম মাধ্যম। কিন্তু প্রত্যেকে কোনো-না-কোনো সময়ে উপলব্ধি করেছে যে এর রয়েছে সীমাবদ্ধতা। একটা কারণ, এটা কেবল সবচাইতে সাদামাটা প্রভেদগুলো করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে অব্যর্থ। গাছের পাতার রঙ বর্ণনা করার জন্যে আমাদের একটি শব্দ ‘সবুজ’ আছে এবং আমরা হাল্কা সবুজ, গাঢ় সবুজ ও অন্যান্য নির্দিষ্ট সংখ্যক রঙের মাত্রার পার্থক্যকরণে সক্ষম। কিন্তু ছায়ায় অবস্থিত একটি সবুজ পাতার চেহারা যখন এটা সূর্যালোকে থাকে তার তুলনায় খুবই ভিন্ন প্রকৃতির। তথাপি আমাদের ভাষা এই পার্থক্যের ভাব বিনিময়ের জন্যে কোনো সহজ ও চেনাজানা রাস্তার যোগান দেয় না। একইভাবে, থরথর, ঝনঝন, দুম্, ক্যাচক্যাচ এবং ঝপাং-এর মতো আওয়াজের জন্যে আমাদের অসাধারণ শব্দসম্পদ আছে। কিন্তু একটি ঘণ্টা বা পিয়ানো-চাবিতে আঘাতের ফলে ক্রমক্ষিয়মাণ অতিস্বর অনুসৃত একটি একক উচ্চস্বরের প্রপঞ্চটির জন্যে কোনো অভিব্যক্তি (expression) নেই। এই অভাবগুলো ভাষার অপর্যাপ্ততাকে প্রতিফলিত করে না। এরা স্রেফ সবার জানা একটি সত্যের পরিণতি, যে সত্যটা হল, এমনকি সবচাইতে মামুলি অভিজ্ঞতাও ভাষার পক্ষে যতটা জটিল হয়ে ওঠা সম্ভব তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

ভাষার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে যায় যখন আমরা আবেগ এবং অনুভূতি বিনিময় করতে চেষ্টা করি। কমলার স্বাদ কেমন, ঢাকের বাজনা শুনতে কেমন কিংবা মখমলের উপর আঙুল বুলাতে কেমন লাগে এই অভিজ্ঞতাগুলো যার কখনোই হয়নি তার কাছে এগুলো আপনি কি করে ব্যাখ্যা করবেন? এই সমস্যাটি বিবেচনা করা মানে এটা উপলব্ধি করা যে, প্রাথমিক যে অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের জীবনের বুনট (texture) তৈরি করে সেগুলো শেষ পর্যন্ত বিনিময় অযোগ্য। এগুলো জ্ঞাপনের চেষ্টা করতে গিয়ে একজন ব্যক্তি সবচাইতে অভিব্যক্তিপূর্ণ শব্দের খোঁজ করেন। কিন্তু তিনি শব্দকে অতিক্রম করে যেতে পারেন এবং আশ্রয় নিতে পারেন ব্যাখ্যা, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা এবং তুলনায়। কাব্য হল এই প্রকারের ভাষা। এর স্বাভাবিক বিষয়বস্তু হল সেই ধরনের অভিজ্ঞতা যা গতানুগতিক ভাষা বিনিময় করতে পারে না। কাব্য জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার ওপর কাজ করে, চেষ্টা করে অপ্রকাশ্যকে প্রকাশ করতে।

নিগূঢ় ও তড়িৎ (fleeting) অনুভূতি কাব্যের একটি সাধারণ বিষয়। এবং যেসব ক্ষুদে কবিতা প্রকৃতির প্রেম, দুঃখ এবং উল্লাসের মতো অভিজ্ঞতার তীব্র ও বিশিষ্ট অনুভূতিগুলো ধরতে চেষ্টা করে তাদের গীতিকবিতা বলা হয়। সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সুপরিচিত কবিতাগুলো এই শ্রেণির অন্তর্গত। কিন্তু কাব্য কাহিনিবয়ানে, দর্শন আলোচনায়, নাট্য রূপায়ণে, বর্ণনা প্রদানে এবং অন্যান্য ধরনের বিশাল সংখ্যক অভিব্যক্তিকরণে সমর্থ। স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতি প্রকাশে এটা যদি উপযোগি হয়ে উঠতে পারে, তবে এটা একটি সুশৃঙ্খল ও স্থায়ীভাবে অর্থপূর্ণ উপায়ে অভিজ্ঞতার বিশাল ক্ষেত্রকে বিন্যস্ত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জন মিল্টনের প্যারাডাইজ লস্ট (Paradise Lost) বহু চরিত্র  পর্ব, কথোপকথন এবং বর্ণনার বারটি পুস্তকের এক সুদীর্ঘ কবিতা যাতে কাজে লাগানো হয়েছে অতি বিশাল পরিমাণের জ্ঞান ও ঐতিহ্যকে। এ সবকিছু গ্রন্থিত হয়েছে একটি একক জটিল কবিতায় যা নৈতিক ও ধর্মিয় দর্শনের এক মহৎ প্রকাশ।

কাব্যের স্বভাব বোঝার চেষ্টা করছেন এমন একজন পাঠকের মাথায় প্রথমদিকে স্বভাবতই আসে একটি প্রশ্ন, তাহল : কাব্য ও গদ্যের মধ্যে পার্থক্য কি? দুর্ভাগ্যবশত, এ দু’য়ের মধ্যে এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট বিভাজনরেখা নির্ণয় করা যায়নি। গণিতে বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয়ের সমস্যাটির মতো সাহিত্যে এ সমস্যাটি বিখ্যাত। তবু, কাব্যের স্বভাব সম্পর্কে ভাবতে গিয়ে আপাতত এটা ধরে নেয়া সুবিধাজনক যে, কাব্য চরিত্রগতভাবে অনুভূতি জাগায় বা প্রকাশ করে এবং কল্পনাকে আহ্বান করে যেখানে গদ্য চরিত্রগতভাবে তথ্য জ্ঞাপন করে এবং বুদ্ধিকে আহ্বান করে।

একই বিষয়কে গদ্য ও কাব্য কিভাবে নেয় তার তুলনা থেকে পার্থক্যটি কিছুটা স্পষ্ট করা যেতে পারে।

To sleep I give my powers away ;

My will is bondsman to the dark…

(ঘুমের কাছে সঁপে দিই সব শক্তি আমার

ইচ্ছে আমার এখন যেন অন্ধকারের দাস…)

টেনিসনের লাইনগুলোর সমতুল্য গদ্য হবে ‘I fell asleep’ (আমি ঘুমিয়ে পড়লাম)। গদ্যাকার এই সরল বিবৃতিটি প্রাথমিকভাবে তথ্যমূলক (রহভড়ৎসধঃরাব)। এর উদ্দেশ্য হল একটি ঘটনা জানানো। তবে কাব্যের লাইনগুলোতে ঘটনা অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যতটা এর সাথে যুক্ত অনুভূতিগুলো। টেনিসন, In Memoriam এর অবশিষ্টাংশের সাথে সংশ্লিষ্ট কারণে, ঘুমিয়ে পড়াকে বর্ণনা করেছেন কারো আত্মনিয়ন্ত্রণ বিসর্জন দেয়ার ব্যাপার হিসেবে এবং জোর দিয়েছেন অসহায়ত্বের অনুভূতি ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট অন্য কারো বশ্যতা স্বীকার করে নেয়ার অনুভূতির ওপর। একটি নিবিড় পরীক্ষা প্রকাশ করে যে, গদ্যিয় ও কাব্যিক বর্ণনা, যথাযথভাবে বলতে গেলে, একেবারেই ভিন্ন। টেনিসনের লাইনগুলোর বিষয়বস্তু এই ঘটনাটির একটি বিশেষ আবেগময় প্রতিক্রিয়া। অন্য সাধারণ কবিতার মতো, টেনিসনের লাইনগুলো বিষয়টিকে তথ্য হিসেবে নয়, বরং অনুভূত অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে, বর্ণনা দু’টিকে ন্যায়সঙ্গতভাবেই বলা যায়, ভিন্ন ভিন্ন ব্যাপার সম্বন্ধে যারা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সংঘটিত এবং মনের ভিন্ন ভিন্ন অংশের সাথে সংশ্লিষ্ট।

কিন্তু কাব্য ও গদ্যের মধ্যে এই উপায়ে পার্থক্য করলে অনেক পরিমার্জনের প্রয়োজন হয়। একটা কারণ, উপন্যাস-জাতিয় গদ্য, যা নিশ্চিতভাবেই কাল্পনিক এবং প্রায় সর্বদাই অনুভূতি প্রকাশ করে, তার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য তেমন ফলপ্রসূ নাও হতে পারে। কিন্তু সাধারণত উপন্যাসে যে তথ্য থাকে তার মাধ্যমেই এটা তার কাজ করে, কাব্যের ক্ষেত্রে যা সত্য নয়। এটা বলে নেয়া উচিত যে, কাব্য কেবলই আবেগাত্মক নয়, বরং এর জন্যে ভাল স্মৃতিশক্তি, সঙ্গতিবোধ, যৌক্তিকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা এবং সূক্ষ্ম সংযোগ তৈরির সামর্থ্য থাকা চাই। এটা নিশ্চিন্তে বলা যায় যে, অধিকাংশ ভাল কাব্য ভাল গদ্যের চেয়ে বেশি পরিমাণে যৌক্তিক চিন্তার জন্যে চ্যালেঞ্জ ও উদ্দিপনা প্রদান করে। গদ্যের চেয়ে কাব্যে বেশি অনুভূতির দরকার হয়; এবং বেশি বুদ্ধিবৃত্তিরও দরকার হয়। কবি কোলরিজ (Coleridge) বলেন যে, কাব্যিক শক্তি গঠিত হয় যা দিয়ে তা হল : ‘… গতানুগতিক আবেগের চেয়ে অতিরিক্ত কিছু, তার সাথে গতানুগতিক শৃঙ্খলার চেয়ে বেশি কিছু; সদাজাগ্রত বিচক্ষণতা এবং নিরবচ্ছিন্ন স্থৈর্য্য তার সাথে উদ্যম এবং প্রগাঢ় বা প্রবল অনুভূতি…’ (Biographia Literaria XIV) তা সত্ত্বেও, কাব্যের সনাক্তকারি বৈশিষ্ট্য, যে গুণগুলোর জন্যে এটা কাব্য হয়েছে, যুক্তি শৃঙ্খলা বা যথার্থতা নয় (যদিও এগুলো খুবই কাক্সিক্ষত হতে পারে), বরং কাল্পনিকতা (imaginativeness) ও অনুভূতিই প্রধান।

কবি জন কিটসের একটি বিখ্যাত ভুল এই মানদণ্ডের বৈধতার পক্ষে প্রমাণ যোগায়। কিটস একবার হোমারের কাজগুলোর একটি অনুবাদ পাঠ করার জন্যে রাত্রির বেশিরভাগ অংশ জেগে কাটালেন, যা তাকে প্রথমবারের মতো এগুলোর সত্যিকার মহত্ত্ব উপলব্ধিতে সক্ষম করল। পরদিন সকালে তাঁর আবিষ্কারের অনুভূতি বর্ণনা করার জন্যে তিনি একটি সনেট লিখলেন যাতে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতাকে তুলনা করলেন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানির একটি নতুন গ্রহ দেখতে পাওয়া এবং যে ভ্রমণকারি প্রথমবারের মতো প্রশান্ত মহাসাগর আবিষ্কার করেন তাঁর অভিজ্ঞতার সাথে। তবে, তিনি ভ্রমণকারির ভুল নাম দিলেন। বালবোয়ার পরিবর্তে কর্টেজ বলে। এখন, যদি কিটসের কবিতার মূল্য এর ভেতরকার তথ্যের যথার্থতার ওপর নির্ভর করত, (তাহলে) এই ভুল অবশ্যই এটাকে মূল্যহীন করে ফেলত। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠকরা একমত হয়েছেন যে, কবিতাটির তথ্যগত ত্রুটি এর আবেগময় অভিজ্ঞতার বর্ণনার ক্ষেত্রে মোটেই ব্যঘাত ঘটায়নি।

যদিও কাব্যকে সাধারণভাবে এর আবেগময়তা ও কাল্পনিকতার গুণ দ্বারা গদ্যের থেকে আলাদা করা হয়, তবে একে আরো সহজে সনাক্ত করা যায় এর কিছু গৌণ বৈশিষ্ট্যের দ্বারা। কাব্য বিশেষ আলংকারিক কৌশল যেমন উপমা ও রূপক ব্যবহার করে, যা এর আবেগ প্রকাশের লক্ষ্য অনুযায়ি বিশেষভাবে অভিযোজিত হয়। আবার, যেহেতু এটা প্রবল অনুভূতি প্রকাশ করে, কাব্য প্রায় সর্বদাই দোলাময় (rhythmical) হয়। দোলা (rhythm) হতে পারে ছন্দ, কবিতাকে ছন্দের এককে বিভাজনকারি লাইনসমূহ এবং অন্ত্যমিল ও অনুপ্রাসের মতো বিশেষ ক্রিয়া দ্বারা। যেহেতু এই বৈশিষ্ট্যগুলোর এক বা একাধিক দ্বারা কাব্য চিহ্নিত করা হয়, এটা (কাব্য) আত্ম-পরিচয় (identity) না হারিয়ে অনেকদূর পর্যন্ত গদ্যের সাথে কার্য বিনিময় করতে পারে। যার ফলে যে গদ্য কাল্পনিক ও অনুভূতিপূর্ণ তা গদ্যই রয়ে যায়, যেখানে কাব্য হতে পারে তথ্যমূলক বা বুদ্ধিবৃত্তিক এবং কাব্যই থেকে যেতে পারে।

তিনটি ভ্রান্ত ধারণা অনেক পাঠকের কাব্য বোঝার এবং উপভোগের ক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটায়। কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর জ্ঞান আমাদেরকে এই ধারণাগুলো সংশোধনে সাহায্য করে। এগুলো হল :

১.      এই ধারণা যে, কাব্য হল ভাষার কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক ব্যবহার।

২.      এই ধারণা যে, এটা হল এমন কিছুকে বিশদভাবে বলা গদ্যে যাকে আরো পরিষ্কারভাবে বলা সম্ভব।

৩.      এই ধারণা যে, এটা সর্বদাই অতিরঞ্জিত বা ভাবালুতাপূর্ণ আবেগ প্রকাশ করে।

কাব্য কৃত্রিম বা বাহুল্য তো নয়ই, বরং মনে হয় শিল্পকলাগুলোর মধ্যে প্রাচীনতম ও সবচাইতে ব্যাপক। বস্তুতপক্ষে, অন্যান্য দিক দিয়ে অসভ্য লোকদের মধ্যে সমৃদ্ধ কাব্যিক ঐতিহ্যের অস্তিত্ব থাকাটা এই সিদ্ধান্তে নিয়ে যায় যে, প্রাগৈতিহাসিক মানুষের মধ্যে গদ্য নামক ভাব বিনিময়ের রীতিটির পূর্বে যাকে আমরা কাব্য বলি তা হয়ত ভালভাবেই বিদ্যমান ছিল। আদিম মানুষের প্রবলতম অভিব্যক্তির প্রয়োজনগুলো সম্ভবত তথ্যমূলক ব্যাপারের চেয়ে অনুভূতিমূলক ব্যাপারের সাথে বেশি সম্পর্কিত ছিল। এবং সম্ভবত তাদের কল্পনা তাদের বুদ্ধির চেয়ে অনেক সমৃদ্ধতর ও অধিক শক্তিশালি ছিল। মানবজাতি বৈজ্ঞানিক মনোভাবের অংশ হিসেবে নির্ভুল, নৈর্ব্যক্তিক বর্ণনার মূল্য উপলদ্ধি করেছে তুলনামূলকভাবে দেরিতে। ডাইনি, ভূত ও পরী এসেছে অণু (molecules) ও আলোকবর্ষের আগে, যদিও উভয় রকম ধারণা একই উদ্দেশ্য সাধন করে : এরা হল সেই উপায় যাদের দ্বারা মানুষ নিজের কাছে মহাবিশ্বের বাস্তবতার ব্যাখ্যা দেয়। পার্থক্য হল, পূর্বোক্তটি কাল্পনিক আর শেষোক্তটি বুদ্ধিবৃত্তিক। আদিম মানুষ অবশ্যই বিদ্যুতের ঝলকানি, ভূমিকম্পের গুরু গুরু ধ্বনি বর্ণনা করত কিন্তু তার বর্ণনায় বাস্তব তথ্যমূলক উপাদান সম্ভবত তার অভিজ্ঞতার আবেগময় প্রকাশের মধ্যে সীমিত থাকত। তার বিবরণ সত্য হবে নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতার জন্যে নয়, বরং তার অনুভূতির জন্যে। এইসব শর্তের ফলশ্রুতিতে যে অভিব্যক্তি দাঁড়াবে তা কাব্য। তাহলে এটা সম্পূর্ণ স্পষ্ট যে, কাব্য যার প্রাথমিক সংশ্লিষ্টতা অনুভূতির সাথে এবং যার প্রাথমিক হাতিয়ার কল্পনা, একেবারে প্রাথমিক স্তরের গদ্য ছাড়া অন্য যে কোনো কিছুর থেকে মানব ক্রমবিকাশের ধারায় আগে এসেছে। অতি প্রয়োজনিয় টুকরো কথাবার্তার বাইরে গদ্যের উদ্ভব হত না যদি না অহং (self) থেকে আলাদা নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতার তুলনামূলক অগ্রসর ধারণার উন্নতি ঘটত। কাব্য, অতএব, শুধু জ্যেষ্ঠই নয়, গদ্যের চেয়ে আরো বেশি আদিম এবং আরো বেশি সহজাত।

আমাদের কাব্যের বর্ণনা থেকে আমরা আরো দেখতে পাই, কেন একে বিবেচনা করা যায় না কেবলমাত্র আড়ম্বরপূর্ণ ও বাক্যবহুল উপায়ে এমন কিছু বলবার পন্থা হিসেবে যাকে আরো সরাসরি প্রকাশ করা যেত। কাব্য এবং গদ্যের বিষয়বস্তু এক নয়, কেননা কাব্য চরিত্রগতভাবে এমন বিষয়বস্তু নিয়ে কারবার করে যা গদ্যে সন্তোষজনকভাবে বর্ণনা করা যায় না। এটা হল ভাষা যা বিনিময় করতে অক্ষম বলে মনে হয় তা বিনিময়ের উদ্দেশ্যে ভাষার সম্পদসমূহকে এদের সাধারণ ক্ষমতার বাইরে প্রসারিত করার একটি উপায়। এই কিঞ্চিৎ অসামান্য কর্মটি সম্পাদন করতে গিয়ে, কাব্য প্রায়শই এমন ফল উৎপাদন করবে যা নিবিড় অধ্যয়ন দাবি করার মতো যথেষ্ট কঠিন ও জটিল। কাব্যের ভাব গদ্যের সম্পদসমূহের মাধ্যমে সহজতরভাবে ও আরো সরাসরি বিনিময় করা যায়— কিছু আনাড়ি পাঠকের মতো এরকম বলার মানে হল এই বলা যে, ‘শস্যকণার চেয়ে কম কষ্টে আহরণযোগ্য কিছু দ্বারা রুটি তৈরি করা’। একটি ভাল কবিতার চিন্তা ও অনুভূতি এরা যে উপায়ে প্রকাশিত হয় তার ওপর নির্ভর করে, এবং কবিতাটি ভাষা থেকে আলাদাভাবে অস্তিত্বশিল থাকতে পারে না।

সম্ভবত কাব্য সম্পর্কে সবচাইতে ব্যাপক এবং সবচাইতে ক্ষতিকর ভ্রান্ত ধারণা হল এই বিশ্বাস যে, এটা সর্বদাই অতি আবেগময় ও ভাবালুতাপূর্ণ। এটা সত্য যে রোমান্টিক ঐতিহ্য, যা তীব্র আবেগ ও প্রকৃতি বন্দনার উপযোগি হয়েছে, অনেক প্রজন্ম ধরে যার প্রবাহ ছিল। এ-ও সত্য যে, অপটু কবিদের দ্বারা এটা গৃহিত হয়েছে যারা সেই ধরনের পংক্তি রচনা করেন যেগুলো সানডে পত্রিকার ক্রোড়পত্রে এবং মাতৃদিবসের কার্ডে পাওয়া যায়। কিন্তু এই ধরনের জনপ্রিয় পংক্তি প্রকৃত কাব্যের সাথে ততটাই সম্পর্কিত যতটা সার্কাসের ঝাঁঝরিতে প্রস্তুত একটি হ্যামবার্গার সত্যিকার রান্নার সাথে সম্পর্কিত। দুর্ভাগ্যবশত সাধারণ মানুষ এই হীনমূল্য দৃষ্টান্তগুলোর প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তাদের কাব্য সম্পর্কিত ধারণা গঠন করে এবং সম্পূর্ণ সঠিকভাবেই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, এই ধরনের জিনিস সহ্য করার মতো নয়।

অনেক কাব্য-বিরাগি কাব্য পছন্দ করতেন যদি তাঁরা ভাল কাব্য খুঁজে পেতেন এবং এতে যা আছে তা গ্রহণ করতে শিখতেন। এর প্রতি তাদের মনোভাব এক্ষেত্রে শেক্সপিয়রের চরিত্র পরাক্রমশালি সৈনিক হট্স্পারের মতো। হট্স্পার কাব্যকে ঘৃণা করার কথা ঘোষণা করেন এবং বলেন যে চারণদের সংগীত তার দন্তপেষণের কারণ হয়। মজার ব্যাপার, তিনি নিজে একজন উচ্চস্তরের অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ যার কল্পনা-ও বীরত্বপূর্ণ জীবনদৃষ্টি শেক্সপিয়রের কিছু মহৎ কাব্যনাট্যের বিষয়বস্তুর যোগান দিয়েছে। হট্স্পার কাব্যের দুর্নাম করতে গিয়ে যখন কাব্যকে ‘ছলনাময়ি নারীর ন্যাকামিভরা চলন’ বলেন তখন নিজেকে প্রকাশের জন্য তিনি একটি শক্তিশালি কাব্যিক চিত্রকল্পেরই আশ্রয় নেন। শেক্সপিয়র বোধ করি হট্সপারের মাধ্যমে বলছেন জনপ্রিয় পংক্তির ‘কাব্য’ যা বিভিন্ন সময়ে নানা ত্রুটিযুক্ত থাকে, কিন্তু সর্বদাই কপটতাপূর্ণ তা আসল কাব্য নয়। হট্স্পার নাটকটির সর্বত্র যে ভাষায় কথা বলেছেন তা-ই আসল কাব্য, যা কল্পনা ও অনুভূতির ভাষা।

যারা মনে করেন ভাবালুতা (sentimentality) ছাড়া কাব্যের আর কিছুই দেবার নেই তারা একটি কবিতা পাঠের সময় কেবল ভাবালুতারই খোঁজ করেন। এবং যদি অন্য কোনো অনুভূতি প্রকাশিত হয়, তারা হয়ত কবিতাটিকে খাপছাড়া মনে করেন। কিন্তু প্রত্যেক শিল্পকলার মতো কাব্যের রয়েছে শৈলি ও বিষয়ের বিশাল ক্ষেত্র। এটা ভাবালু হওয়ার সাথে হতে পারে নিরাবেগ ও তিক্ত যেমনটা শেক্সপিয়রের একটি সনেট থেকে উদ্ধৃত নিচের লাইনগুলো যথেষ্ট পরিমাণে প্রকাশ করে :

When my love swears that she is made of truth

I do belive her, though I know she lies…

(যখন আমার প্রেমাস্পদ শপথ করে বলে সত্যি প্রেমে সে

বিশ্বাসই করি তাকে আমি, যদিও জানি মিথ্যা বলছে সে।… )

কাব্য আনন্দপূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে উচ্ছ্বাসময় হতে পারে, উচ্ছ্বাসের সাথে সাথে প্রকাশ করতে পারে ভয় বা নিরুৎসাহও। এমনকি মহৎ কবিতা আছে যেগুলো বিদ্বেষপূর্ণ, ভ্রষ্টাচারি বা মানবতার প্রতি অবজ্ঞাপূর্ণ এগুলোর মহত্ত্ব অলভ্যই থেকে যাবে যদি-না পাঠক মুহূর্তের জন্যে, এগুলো যে মনোভাব প্রকাশ করছে তা গ্রহণ করেন। উদাহরণস্বরূপ, ‘ইতিহাসের কেঁচো’ (The Worm of History)-তে রবার্ট গ্রেভস ‘দ্য বুক অব জেনেসিস’ (The Book of Genesis)-এর পুনর্লিখন করেন এই বলে যে, সৃষ্টির শুরুর পর অষ্টম দিনে ঈশ্বর মারা গেলেন এবং কেঁচোদের আহার্য হলেন।

Adam was buried in one grave with God

And the worms ranged and ravaged in between.

(আদম কবরস্থ হলেন ঈশ্বরের সাথে একই কবরে

আর মধ্যিখানে কিলবিল করতে লাগল কেঁচোরা।)

তাসত্ত্বেও ‘ইতিহাসের কেঁচো’ গ্রন্থটি কেবল বাইবেলিয় আখ্যানের একটি বিরোধি মতের চেয়ে বেশি কিছু এবং এমনকি একজন পাঠক যার ধর্মিয় অনুভূতি গ্রেভসের ধারণায় আপাত ঈশ্বর নিন্দা দ্বারা আহত হয়, তিনি কবিতাটি সমগ্রভাবে বিবেচনা করে দেখতে পাবেন যে, এটা এমন এক ধারণার কল্পনাসমৃদ্ধ প্রকাশ যা অধার্মিকতা থেকে বহু দূরে। এখানে যে ব্যাপারটা বলা দরকার তা হল ভাল কাব্য কল্পনাকে কাজে লাগায় ; এটার প্রভাব নিহিত থাকে নতুন কিছুতে, বিস্ময়কর কোনো উপাদানের মধ্যে। ফলে, একটি বিশেষ কবিতা কি বলছে বা কিভাবে বলছে সে বিষয়ে যেকোনো পূর্ব-ধারণা (preconception) এড়িয়ে চলে যা কাব্যপাঠকের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ।

কাব্যের উৎকৃষ্টতম অবস্থা এক ধরনের ভ্রমণ (exploration)। এটা আমাদের প্রকাশের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে, ঠিক যেমনিভাবে পৃথিবীর উপরিতল সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের সীমা অতিক্রম করতে ভ্রমণ করা হয়। যখন একজন কবি বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে নতুন কিছু বলতে সফল হন বা পুরাতন কিছুকে এমন উপায়ে বলেন যা এটাকে আমাদের কাছে আরো বোধগম্য করে তোলে, তখন তিনি আমাদের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারে নতুন কিছু যুক্ত করেন। যেমনভাবে এটা করেন একজন ভ্রমণকারি একটি নতুন দ্বীপ আবিষ্কারের মাধ্যমে।

ভ্রমণকারির সাথে কবির তুলনা কাব্য সম্পর্কে আরেকটি সত্যকে ব্যাখ্যায় সহায়তা করে। কবিকে ভ্রমণকারির মতোই, কোনো কিছু করতে হলে বহুল ব্যবহৃত পথ থেকে দূরে থাকতে হয়। ফলস্বরূপ কবির কাজ, বিশেষত মহৎ কর্মগুলো, প্রথমদিকে প্রায়শই কঠিন মনে হয়; যেমনভাবে সদ্য-আবিষ্কৃত একটি নতুন দেশে পৌঁছা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। গুরুত্বপূর্ণ কাব্য, বিশেষত তা যদি সাম্প্রতিক হয়, অতি অল্প আয়াসে তৎক্ষণাৎ বুঝে ফেলার আশা করাটা স্রেফ অযৌক্তিক হবে; যেমন অযৌক্তিক হবে একজন ভ্রমণকারির আবিষ্কৃত একটি স্থানে নিয়মিত বিমানসেবা, রাস্তাঘাট, হোটেল ও গাইড আশা করা।

(মূল The Nature of Poetry)

মূল: জেকব কর্গ

অনুবাদ : সাহিদ সুমন

বর্ষ ২, সংখ্যা ৪, আগস্ট ২০০৩

শেয়ার করুন: