004637
Total Users : 4637
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

ক্লার্ক এম. জ্যোৎচিত্ত’র সাথে বোর্হেসের সাক্ষাৎকার

ক্লার্ক : বহুদিন আগে উরুগুয়ে ব্রাজিল-এর সীমান্ত এলাকা সান্তানা দে লিভ্রামেন্তোয় আপনার কি হয়েছিল?
বোর্হেস : ঐ সময়টায় আমি একটা মানুষ খুন হতে দেখি, জীবনে মানুষকে মেরে ফেলতে দেখেছি ঐ একবারই। ব্যাপারটা কিন্তু তখন আমাকে নাড়া দেয়নি। আমার স্মৃতিতে দিন দিন এটা বাড়তে থাকে। ভেবে দেখুন, একটা মানুষ খুন হয়ে গেল!
ক্লার্ক : আপনি সত্যি সত্যি এটা দেখেছিলেন?
বোর্হেস : হতে পারে আমি দেখিনি। (হেসে) আমরা সবাই মিথ্যুক।
ক্লার্ক : না, না, আমি সেরকম কিছু বলতে চাইনি… আমি আসলে জানতে চেয়েছিলাম ঘটনাটি যখন ঘটে আপনি তখন স্বচক্ষে কাছ থেকে দেখেছিলেন না-কি একই ঘরে ছিলেন?
বোর্হেস : আমি তো তাই মনে করি। যাই হোক, ঐদিন সকালে… কয়েক ফিট দূরে এক বার— এর মধ্যে ঘটনাটি ঘটে। গভর্নরের ছেলের দেহরক্ষি কৃষ্ণাঙ্গ লোকটি সেখানে ছিল… উরুগুয়ের এক গরুর ব্যবসায়ি প্রবেশ করে। আমার মনে হয় সে মাতাল ছিল। আসলেই মাতাল ছিল। ঐ কৃষ্ণাঙ্গ লোকটিকে মারার কোনো কারণই ছিল না, তবুও লোকটিকে খুন করে সে, পর পর দু’টো গুলি করে।
ক্লার্ক : এর আগে ঘটনাটি এত বিস্তৃতভাবে শুনিনি।
বোর্হেস : কারণ সময় বয়ে যাচ্ছে আর আমি বলার একঘেয়েমি থেকে বাঁচার জন্যে একে অলংকৃত করছি।
ক্লার্ক : আর অন্য লোকজন…।
বোর্হেস : হ্যাঁ, অন্য লোকজন সৌভাগ্যক্রমে মরে গেছে যার ফলে আমি আর বিরোধিতার সম্মুখিন হই না। তাদের মধ্যে একজন ছিল এমরিখ এমোরিম যাকে আমার চাচাতো ভাই বিয়ে করেছিল এবং আরেকজন আর্হেন্তিনার প্রত্নতত্ত্ববিদ মার্কেস মিরান্দা। তাই আর তদন্তের কোনো প্রয়োজন ছিল না। এটাই হল সহজ কাজ, তাই না?
ক্লার্ক : ঐ অভিজ্ঞতা কি আপনার কথাসাহিত্যকে কোনোভাবে প্রভাবিত করেছে?
বোর্হেস : আমি তো সেরকমই ভাবি, ঐ ঘটনাটি এবং আমি যা পড়েছি তাই আমাকে প্রভাবিত করেছে। আমি এমার্সনের একটি বিশ্বাসের সাথে একমত যিনি বলেছিলেন, ‘কবিতা থেকেই স্ফুরিত হয়।’ বা ‘কবিতা থেকেই কবিতার জন্ম।’
আমি ঠিক পরিষ্কার মনে করতে পারছি না… পড়াটা খুবই জরুরি। আলোন্সো কিহানো যিনি দন কিহোতে হয়ে উঠেছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি কিছু জানতেন। কেননা, কোনো পাঠক যখন দন কিহোতে পড়েন তখন একই সাথে ‘আমাদিস অব গল’, ‘টাইর‌্যান্ট টু ব্ল্যান্স’, ‘পালমেরিন অব ইংল্যান্ড’ এবং উজ্জ্বল বর্মে শোভিত বীরদের নিয়ে লেখা ‘বুকস অব শিভালরি’ও তার পড়া হয়ে যায়।
ক্লার্ক : তখনকার কমিক বইগুলোর কথা বলছেন?
বোর্হেস : হ্যাঁ, অবশ্যই।
ক্লার্ক : আমার আর একটি প্রশ্ন হচ্ছে…
বোর্হেস : শুধু একটাই?
ক্লার্ক : এই মুহূর্তে একটাই। গতবছর এক আর্হেন্তাইন পত্রিকায় পড়লাম যেখানে আপনি উল্লেখ করেছেন যে, সিসিলিয়া ইনজেনিয়েরোস-এর সাথে আপনার প্রেমের সম্পর্ক ছিল…।
বোর্হেস : হ্যাঁ, ঠিক।
ক্লার্ক : তবে সাংবাদিক এ নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাটি করেননি। আপনি কি এ সম্পর্কে কিছু বলবেন?
বোর্হেস : বেশ। সে একসময় বিরক্ত হয়ে আমাকে ছেড়ে চলে যায়। আমি নিশ্চিত সে যথার্থ কারণেই চলে গেছে। অনেকদিন যাবৎ তার সাথে আমার দেখা নেই, এখন সে… বিবাহিতা। সন্তানাদিও আছে। কিন্তু কেন বলব না যে, এক সময় আমরা খুবই অন্তরঙ্গ ছিলাম? আমি এখনও তাকে প্রেমভরে স্মরণ করি। আমি মনে করি এটা বলাসঙ্গত যে ভাল মানুষ জয়লাভ করে। এটা এখন বলতে পারি, কিন্তু তখন আমার তা মনে হয়নি। সে অবশ্য খুব সম্মানজনকভাবেই সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে গেছে। আমাকে একবার সে মাইপু ও কর্দোবার এক চা-এর দোকানে দেখা করার জন্যে বলে। তার সাথে কিছু সময় কথা বলার পর মনে হল, ‘কি অদ্ভুত মেয়ে!’ খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম তার সেদিনের ব্যবহারে। কিছুক্ষণ পর সে বলল, ‘আমি তোমাকে কিছু বলতে চাই, তুমি হয়ত কোনো-না-কোনোভাবে শুনবে। কিন্তু আমি চাই সংবাদটা তুমি আমার মুখ থেকেই প্রথম শোনো, আমার এনগেজমেন্ট হতে যাচ্ছে, খুব শিগগিরই বিয়ে করব।’ আমি তাকে অভিনন্দন জানাই এবং তার সাথে কথাবার্তা ঐটুকুই ছিল। সিসিলিয়া সত্যিই খুব ভাল মেয়ে। একসময় সে নাচের ছাত্রী ছিল। জনৈক মার্কিন নৃত্যশিল্পি মার্থা গ্রাহাম-এর কাছে নিউইয়র্কে বছরখানেক নাচ শিখেছে। আমার মনে হয় নিউইয়র্কে কোনো এক গ্রামে সে নাচ শিখত।
ক্লার্ক : আপনি বলেছিলেন যে গ্রেটা গার্বোর এমন কিছু আছে যা খুবই আকর্ষণিয়। গ্রেটা গার্বোর সেই আকর্ষণিয় দিকটি আসলে কি?
বোর্হেস : আহা! গ্রেটা গার্বো পৃথিবীতে এরকম একজনই হয়। অপূর্ব! ক্যাথেরিন হেপবার্নকেও আমি ভালবেসেছিলাম। আরেকজন অভিনেত্রির কথা মনে পড়ছে। মিরিয়াম হপকিন্স, আমাদের প্রজন্মের সবাই তাকে ভালবাসত। সে সত্যিই সুন্দরি ছিল এবং ইভলিন ব্রেন্টকেও ভালবাসতাম যিনি ‘প্রিন্স অব গ্যাংস্টারস’ হিসেবে পরিচিত জর্জ ব্যাংক্রফট-এর সঙ্গে ‘ড্রাগনেট’ ‘শোডাউন’ইত্যাদি ছবিতে অভিনয় করেছেন। আমরা সবাই মিরিয়াম হপকিন্স, গ্রেটা গার্বো, কেথেরিন হেপবার্ন এবং আরও কয়েকজনকে ভালবাসতাম।
ক্লার্ক : আপনার জীবনী ধরনের একটি ছবি বিবিসি তৈরি করেছিল…
বোর্হেস : ছবিটি খুবই ভাল হয়েছিল। খুবই ভাল। আমার নিজের দেশে (আর্হেন্তিনায়) আমি তখনও সু-পরিচিত নই। সেখানে তা তৈরি হয়নি। হয়েছিল প্যারিসের ‘হোটেল ডালসাসে’ নামের এক হোটেলে যেখানে গত শতাব্দিতে ১৯০০ সালের শেষ বছরে অস্কার ওয়াইল্ড মারা যান। হোটেলটির বেসমেন্টে ছবিটির কিছু অংশ চিত্রায়িত হয়। বেসমেন্টটি ছিল বৃত্তাকার। বড় সিলিন্ডার আকৃতির এবং দেয়ালগুলো ছিল আয়নায় আবৃত। কাজেই মনে হত বেসমেন্টটি অসীম। তারপর ছবিটি উরুগুয়ের একটি রেঞ্জে চিত্রায়িত হয়। কলোনিয়া শহরের নিকটবর্তী মন্টেভিডিওর পর্বতচূড়াসমূহে ছবিটির চিত্রায়ণের জন্যে আমরা উরুগুয়ের অভিনেতাসহ হাজির হই। ছবিটি আমার জীবনীভিত্তিক বলেই আমি এতে অভিনয় করি। মারিয়া কোদামাও এতে অভিনয় করে এবং অনেক দৃশ্য আমার ছোটগল্পেরই রূপায়ণ। যেমন, ছবিতে আমি প্রথমে গগলস পরিহিত বার কি তের বছরের একটি বালকের সঙ্গে আলাপ করি যে আমার বাল্যকালের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং এই অংশটি এসেছিল আমার ছোটগল্প ‘দি আদার’ থেকে। এরপর আমি আরও অল্পবয়েসি এক ছেলের সঙ্গে কথা বলি আমার গল্পে যে রকম ছিল। ছবিটি সত্যিই খুব উঁচুমানের হয়েছিল।
ক্লার্ক : ছবিটি কি দেখা যাবে?
বোর্হেস : আপনি বলতে চাচ্ছেন এই বুয়েনস আইরেস-এ?
ক্লার্ক : যে কোনো জায়গায়।
বোর্হেস : সম্ভবত নগর কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলে আপনি ছবিটি দেখতে পারেন। সেখানে ডেভিড নামে এক লোক ছিল, আমি তার নামের শেষাংশ মনে করতে পারছি না। যাই হোক…
ক্লার্ক : প্রায়ই আপনি স্পেনের প্রধান এলাকা কাস্তিলের প্রতি বিতৃষ্ণা দেখান। কেন?
বোর্হেস : হ্যাঁ, বিশেষ করে কাস্তিলের প্রতি, স্পেনের প্রতি না। আমি গালিসিয়া, কাতালোনিয়া, আন্দালুসিয়ার মতো প্রিয় জায়গাগুলোর কথা বলি না যেগুলো সত্যিই প্রশংসনিয় জায়গা। বস্তুত পুরো দেশটাই আমার প্রিয় শুধু কাস্তিলে ছাড়া। সাধারণত অধিকাংশ স্পেনিয়রাই পৃথিবীতে সজ্জন হিসেবে পরিচিত। কিন্তু স্পেনিয় সাহিত্য আমাকে আলোড়িত করতে পারেনি। তবে কিছু ব্যতিক্রম আছে যেমন সের্ভান্তেসের ‘দন কিহোতে’ ফ্রে লুইস দে লিয়ন… কিন্তু কাস্তিলে, কাস্তিলে সেই জায়গা যেখান থেকে কনকিস্তাদোররা এসেছিল। নির্বোধ সামরিক লোকজন, গোঁড়া ক্যাথলিকরা এসেছিল যারা আমাদের দেশগুলোয় (লাতিন আমেরিকায়) তাদের ছাপ রেখে গেছে। সামরিকবাদ, ধর্মীয় উন্মত্ততা, সবকিছুর উৎস কাস্তিলে। আমাদের সব ধরনের সামরিকবাদ, একনায়কত্বের উৎস এই কাস্তিলে।
ক্লার্ক : সামরিকতন্ত্রের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, সামরিক জান্তা যখন পেরনের বিধবা স্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করে, ১৯৭৬ সালে আর্হেন্তিনার রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে, আপনি তখন আনন্দিত হয়েছিলেন।
বোর্হেস : হ্যাঁ, কিন্তু তারা কোনো কাজ করার আগে আমি কিভাবে জানব পরবর্তী সময়ে তারা কি করবে? এবং পরবর্তীতে সেন্সরশিপের কারণে আমরা বহু অত্যাচার, গুম, হত্যা সম্পর্কে জানতে পারিনি। হ্যাঁ আমি ভুল করেছিলাম।
ক্লার্ক : চিলির স্বৈরাচারি শাসক জেনারেল পিনোচেট আপনাকে বেশ আড়ম্বরের সাথে হাজির করেছিল…
বোর্হেস : না, না, সেখানে কোনো আড়ম্বর ছিল না। আমি চিলির সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই যেখান থেকে আমি ডক্টরেট উপাধি লাভ করি, ডক্টরেট উপাধি গ্রহণের জন্যে সান্তিয়াগোতে গেলে প্রেসিডেন্ট আমাকে ডিনারের আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে ডিনার ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আর আমি যেহেতু সান্তিয়াগোতে তাই এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে পারিনি। পারতাম কি?
ক্লার্ক : নৈরাজ্যবাদ কি সমাজের একটি গ্রহণযোগ্য রূপ?
বোর্হেস : মনে হয় আমাদেরকে দু’শ বছর অপেক্ষা করতে হবে— খুবই কম সময় না? যখন সরকার থাকবে না, পুলিশ থাকবে না, মানুষেরা হবে আমাদের চাইতে আলাদা ধরনের। কিন্তু এই মুহূর্তে— এটা তো আর সোভিয়েত ইউনিয়ন নয়… সরকার একটা দরকারি অপশক্তি। এখন আমার ধারণা এই দেশে আমাদের আশা রাখার অধিকার আছে, আশা রাখার অতিরিক্ত আর কিছু নয়। আমার বিশ্বাস বছর পাঁচেক পরে… দেখুন, প্রতিক্ষিত পুনরুজ্জীবনের পর বলা চলে, এতটা অত্যাচারের পর… পেরনবাদ, সন্ত্রাসবাদ, সামরিক জান্তা, ‘গায়েব’ বলে অভিহিতরা, অপহরণ, নির্যাতন, মৃত্যু, আর তারপর… এসব জিনিস জগতের অর্থকেই সংকুচিত করে ফেলে, তাই না? কিন্তু আমি মনে করি… সে যাই হোক, আলফনসিনকে (প্রেসিডেন্ট হিসেবে) পাওয়াটা আনন্দের কথা, যদিও আমি তার র‌্যাডিক্যাল পার্টির সদস্য নই।
ক্লার্ক : একই সময়ে প্রকাশিত আপনার প্রথমদিককার কবিতা এবং ট্যাঙ্গো গীতি কবিতার মধ্যে কোনো পারস্পরিক প্রভাব কাজ করেছে কি?
বোর্হেস : মনে হয় না। কারণ ওগুলো ভাল কিছু নয় (হাসি)। আমার মনে হয় ট্যাঙ্গো সেরকম নয়। বরং মিলোঙ্গা কিছুটা। আমি মিলোঙ্গা গীতিকবিতার একটি বই লিখেছি। মিলোঙ্গা হচ্ছে জনসাধারণের কিন্তু ট্যাঙ্গো তা নয়। আপনি হয়ত জেনে থাকবেন, ট্যাঙ্গোতে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় পিয়ানো, বাঁশি এবং বেহালা। ট্যাঙ্গো যদি জনসাধারণের জন্যেই হত তবে সেখানে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে থাকত গিটার যেমন রয়েছে মিলোঙ্গাতে। গিটার সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই গিটারের শাব্দিক ব্যুৎপত্তি সম্পর্কে জানা দরকার। গিটার শব্দের আদিরূপ হচ্ছে Zyther এটার অর্থ প্রায় একইরকম। যখন আপনি স্পেনিয় ভাষায় Guitarra অথবা Citara বলবেন, স্বরবর্ণগুলো একইরকম থাকে, তাই নয় কি? এটা মনে করা হয় যে, বাদ্যযন্ত্রগুলো মধ্য-এশিয়ারই কোনো অঞ্চলে উদ্ভাবিত। এবং হাপ, ভায়োলিন, জাইদার, গিটার ইত্যাদি তারের বাদ্যযন্ত্রেরই বিকশিত রূপ। কিন্তু Zyther গ্রিসে Kithara হিসেবে পরিচিত। শুধুমাত্র ব্যুৎপত্তিগত কৌতূহল থেকে জানতে চাচ্ছি, আচ্ছা আপনার জন্মস্থান কোথায় বলুন তো?
ক্লার্ক : আমি জন্মেছি নিউজার্সিতে। তবে বাফেলোর কাছাকাছি নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে পড়াই, বাফেলো শহরের কাছাকাছি।
বোর্হেস : হ্যাঁ, ব্যাফেলো আমি চিনি। নায়েগ্রা জলপ্রপাত আমি দেখেছি। নিউজার্সিতে, এটাতো নিউইয়র্কের পশ্চিমদিকে, তাই না?
ক্লার্ক : হ্যাঁ, নিউইয়র্ক শহরেরই পশ্চিম ভাগ, হাডসন নদীর তীরেই।
বোর্হেস : ও, হ্যাঁ, হাডসন… আপনি বোধহয় জানেন, মিসিসিপির অর্থ ‘জলরাশির পিতা’। কিছুটা আমাদের বিখ্যাত জলপ্রপাত ইগুয়াসুর মতো যার অর্থ হচ্ছে ‘বিপুল জলরাশি’।
ক্লার্ক : চলুন, আমরা আবার ট্যাঙ্গো এবং মিলোঙ্গার প্রসঙ্গে ফিরে যাই। বাদ্যযন্ত্রের কাঠামোগত দিক ছাড়া মিলোঙ্গা এবং ট্যাঙ্গোর মধ্যে সুরের পার্থক্যটা আসলে কি?
বোর্হেস : মিলোঙ্গা হচ্ছে এক ধরনের বন্যসংগীত। ভীষণ স্ফুর্তির গান। অন্যদিকে ট্যাঙ্গো হচ্ছে অত্যন্ত আবেগঘন ‘গম্ভীর’ সংগীত। হ্যাঁ, ট্যাঙ্গো কখনো সাধারণ মানুষের ছিল না। যেমন, অনভিজাত বাসাবাড়িতে কখনো ট্যাঙ্গো নৃত্য দেখা যায়নি। অনভিজাত বাসাবাড়িগুলো ছিল বুয়েনস আইরেসের সাধারণ লোকজনের আবাসস্থল। তারা কখনোই সেখানে ট্যাঙ্গো গায়নি। তবে মিলোঙ্গা গেয়েছে। ট্যাঙ্গো বেশ্যালয়ে বেশ জনপ্রিয় ছিল। আর স্বাভাবিক কারণেই সাধারণ মানুষ এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু আমি লোকদেরকে একত্রে ট্যাঙ্গো নৃত্য করতে দেখেছি। তবে, এই ট্যাঙ্গো নৃত্য কোনো নারীকে করতে দেখা যায়নি, যতদিন না এটা বেশ্যালয়ের আচার অনুষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই দু’টো নাচেরই উৎপত্তি আফ্রিকায়। এমনকি মিলোঙ্গা এবং ট্যাঙ্গো, এই শব্দ দু’টোও ধ্বনিগতভাবে আফ্রিকান, তাই না? কঙ্গো শব্দটার মতোই অ্যাঙ্গো, ওঙ্গা, ওঙ্গো ইত্যাদি শব্দগুলো আফ্রিকান ভাষা থেকে এসেছে।
ক্লার্ক : আপনি কোনো একসময় বলেছিলেন যে, আপনার অনধিকার প্রবেশকারি The Intrader গল্পটি আপনার বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ গল্প।
বোর্হেস : না, আমার তা মনে হয় না। আর শুনুন, এই গল্প নিয়ে যে ভয়ংকর ছবিটি তৈরি হয়েছে, আমি চাই সেটা এড়িয়ে যান। তারা এর মধ্যে এমন সব জিনিস ঢুকিয়েছে যেগুলো আমার গল্পে ছিল না। আমার সঙ্গে যেগুলোর কোনোই সম্পর্ক নেই। এগুলো হচ্ছে— অজাচার আর সমকামিতা। আর হ্যাঁ, পায়ুকামিতাও। এ ছবির পরিচালক ক্রিস্টেনসেন তার ভাইকিং পুরুষদের নাম ডুবিয়েছে। আমার গল্পে ঢুকিয়েছে অজাচার, সমকাম, পায়ুকাম আর হাস্যকর সব দৃশ্য… যেমন ধরুন, আমার গল্পে ছিল যে দুই ভাই একই নারীকে উপভোগ করে। বোঝাই যাচ্ছে, ব্যাপারটা ঘটে আলাদা আলাদাভাবে। একই সময়ে নয়। কিন্তু ক্রিস্টেনসেন হাস্যকর করার জন্য দেখালেন, একজন নায়িকা দাঁড়িয়ে আছে বস্ত্রহীন অবস্থায়, তারপর বামদিক থেকে একজন তার দিকে এগিয়ে আসছে; একই সময়ে অপরজন ডানদিক থেকে। তারা একই সাথে মেয়েটির সঙ্গে যৌনকর্মে মিলিত হল। আমার ধারণা, এটাকে হাস্যকর করার জন্যে এমন করা হয়েছে।
ক্লার্ক : আপনি কি সত্যি মনে করেন এটা হাস্যকর করার জন্যেই?
বোর্হেস : আমার তাই মনে হয়। যদি তাই না হবে তাহলে এ থেকে কি পাওয়া যায়? দু’জন নগ্ন পুরুষ, একজন উলঙ্গ রমণি যার দিকে দু’জন দু’দিক থেকে এগিয়ে আসছে… এটা পাগলামি। এটা আমার গল্প নয়। কিন্তু আমাকে সবচেয়ে যে ব্যাপারটি ক্ষুদ্ধ করেছে তাহল ‘অনধিকার প্রবেশকারি : কাহিনি হোর্হে লুইস বোর্হেস’ এই শব্দগুলোর ব্যবহার। আপনি যদি আমাকে বলতেন ‘মূলকাহিনির প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে চাই’ তাহলে আমি বলতাম না, ‘চলচ্চিত্র মূলকাহিনির প্রতি বিশ্বস্ত থাকার জন্য নয়। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে মূলকাহিনিটা হচ্ছে বিষয়ান্তরে যাওয়ার একটা উপায়। আপনি যদি চান… চলচ্চিত্রে আপনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন, অনেক নতুন ব্যাপার আপনি ঘটাতে পারেন, সেক্ষেত্রে আপনি আমার নাম ব্যবহার করবেন না। শিরোনাম বদলে নিন।’ কিন্তু ছবিটিতে রয়েছে আমার গল্পের শিরোনাম এবং আমার নাম। তার সাথে রয়েছে অজাচার, সমকামিতা এবং পায়ুকামিতা। মজার বটে।
ক্লার্ক : রাফায়েল কানসিনোস আসেন্স সম্পর্কে কি কি মনে করতে পারেন?
বোর্হেস : আমি যদ্দূর জানি, আমার জীবনে যারা সবচেয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন তিনি তাঁদের অন্যতম। কেবল তাঁর কথাগুলো পড়ে আপনিও আমার মতোই অনুভব করবেন কি-না জানি না। তাঁর সঙ্গে কথা বলাটা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। তিনি একদিন কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমি চৌদ্দটি ভাষা জানি, আমি প্রাচীন এবং আধুনিক চৌদ্দটি ভাষায়ই নক্ষত্রদের অভিবাদন জানাতে পারি।’ তিনি গলসওয়ার্দির সমগ্র রচনাবলি অনুবাদ করেছিলেন এবং ডি-কুয়েন্সির অংশবিশেষও অনুবাদ করেছিলেন। আঁরি বার্বুস-এর ‘লা এফেয়ার’সহ আরও বেশকিছু লেখা অনুবাদ করেছিলেন ফরাসি থেকে। এরপর তিনি আরবি থেকে সরাসরি ‘সহস্র এক রজনি’ অনুবাদ করেন। আমার মতো তিনিও ইহুদি বংশোদ্ভূত এবং তালমুদ (ইহুদিদের ধর্মশাস্ত্র)-এরও একটি সংকলন তৈরি করেন। এছাড়া তিনি ‘জুলিয়ান দ্য অ্যাপোস্টেটে’র রচনাকর্ম গ্রিক থেকে অনুবাদ করেছেন। ল্যাটিন ভাষাও জানতেন। প্রথম সাক্ষাতের দিন আমরা সারারাত কাটিয়েছিলাম থমাস ডি-কুয়েন্সি সম্পর্কে আলোচনা করে। কানসিনোস আসেন্স জন্মগ্রহণ করেন সেভিল-এ কিন্তু থাকতেন মাদ্রিদে। সমুদ্র নিয়ে তিনি একটি অনুপম কবিতা লিখেছিলেন। এ জন্য আমি তাঁকে অভিনন্দন জানালে তিনি বলেন : ‘হ্যাঁ, সমুদ্র নিয়ে কবিতাটি সুন্দরই। কোনো একদিন হয়ত সমুদ্র দেখার সৌভাগ্য হবে।’ তিনি কখনোই সমুদ্র দেখেননি!
ক্লার্ক : আপনি একটু আগে উল্লেখ করলেন যে আপনি ইহুদি বংশোদ্ভূত এবং আপনি একবার বলেছিলেন যে, আপনার মা’র কুমারি বয়সের নামটি ছিল আসেবেদো যা পর্তুগিজ ইহুদি বংশোদ্ভূত নাম। আপনি এটা কিভাবে জানলেন?
বোর্হেস : হ্যাঁ, ব্যাপারটা কৌতূহলোদ্দিপক। আসেন্স একদিন সরকারি সেরেস্তায় ঘাঁটাঘাটি করতে গিয়ে তাদের পারিবারিক নামটি পেয়ে যান। তিনি কানসিনোস নামটিও পেয়ে যান আর তখন থেকেই তিনি বিশ্বাস করেন যে, তিনি একজন ইহুদি যার পূর্বপুরুষ বলপূর্বক ইহুদি থেকে সরাসরি ক্যাথলিক ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। এ সবই তাকে হিব্রুভাষা শেখার প্রতি অনুপ্রাণিত করে। তিনি ‘দ্য সেভেন ব্রান্সড্ ক্যান্ডেলাব্রাম’ নামে একটি প্রেমের সামগান রচনা করেন। যাই হোক, আমার বেলায় ঘটনাটি ঘটে ‘রোসাস এন্ড হিজ লাইনস’ [হুয়ান মানুয়েল দে রোসাস (১৭৯৩-১৮৭৭) ছিলেন তৎকালিন বুয়েনস আইরেস প্রদেশের ফেডারেল পার্টির প্রধান] নামক একটি বই-এর সঙ্গে পরিচিত হতে গিয়ে। বইটিতে বুয়েনস আইরেসের তৎকালিন পর্তুগিজ-ইহুদি বংশোদ্ভূত পরিবারসমূহের নামের তালিকা ছিল। যতদূর মনে পড়ে প্রথম নামটি ছিল ওকাম্পো। বুয়েনস আইরেসের উঁচু সমাজের কিছু লোক বিক্তোরিয়া ওকাম্পোকে ভূঁইফোড় ইহুদি বলে ডাকত, (হেসে) ঠিক আছে? আমার মনে হয় প্রথম নামটি ছিল ওকাম্পো; বা পিনেইরো (আমাদের পরিবারের একটি নাম) আসেবেদো (আমার মায়ের কুমারি নাম) পর্তুগিজ ইহুদি বংশোদ্ভূত কিছু পুরোনো নাম। তবে বোর্হেস নামটি কিন্তু ইহুদি নয়। বোর্হেস শব্দটি ইংরেজি বার্জেস (Burgess) শব্দের সমার্থক : এর অর্থ হচ্ছে বুর্জয়েস (Burgeois) অর্থাৎ শহরের (Burg) মানুষ, যেমন এডিনবার্গ, হ্যামবার্গ, রোদেনবার্গ, স্পেনের বার্গোস (Burgos) ইত্যাদি… কি আশ্চর্য, আমার নামের প্রথম অংশের অর্থ হচ্ছে ‘গ্রামের লোক’ কারণ হোর্হে (ইংরেজিতে George) মানে ‘মাটির মানুষ’ (Man of the soil); আপনি জানেন ভার্জিলের Georgies এবং জিওগ্রাফি মানে ভূমিসংক্রান্তবিদ্যা। অতএব আমার নামের প্রথম শব্দটি ‘কৃষক’ জাতীয় অর্থ থেকে উদ্ভূত, তাই না? অবশ্যই তাই, আর আমার নামের শেষাংশটির অর্থ তার বিপরীত যার অর্থ ‘শহরের মানুষ’ বুর্জয়েস…
ক্লার্ক : একটা কূটাভাস।
বোর্হেস : হ্যাঁ, কমিউনিস্টরা যখন আমাকে বুর্জয়েস বলে, আমি তখন বলি, না, আমি বুর্জয়েস (হিস্পানিতে বুর্হিস) নই; আমি বোর্হেস। বিয়ামন্ত সড়কে… আপনি জানেন কি-না জানি না এক সময় বিয়ামন্তে নিষিদ্ধ পল্লি ছিল এবং বিয়ামন্ত থেকে এল বাহো এবং সান মার্তিন ও পাসেও দে হুলিও-এর মধ্যবর্তী আলেম নামে একটি জায়গা আছে। এই জায়গাগুলোতে ছিল বেশ্যালয়। পরবর্তীতে লাভাইয়ে এবং হুনিন-এও নিষিদ্ধ পল্লি গড়ে উঠেছিল। আর এসব জায়গায়ই ট্যাঙ্গোর উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া রোমারিও (শহর) এবং মন্তেবিদেওতেও এটি উদ্ভাবিত হয়েছিল। ট্যাঙ্গোর উৎপত্তির ব্যাপারটি একটা বিতর্কের বিষয়। তবে পার্থক্য আর কতটুকুই-বা, তাই না? আশপাশের অপরাধ এবং বেশ্যাপনা নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে একবার এক পুলিশ অফিসারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘বুয়েনস আইরেসের সবচেয়ে’ বিপদজনক এলাকা কোনটি?’ তিনি বললেন, ‘বোধহয় ফ্লোরিডা এবং করেন্টিসের কোনাকুনি এলাকাটি।’ (হেসে) কারণ ওখানে বেশিরভাগ অপরাধ সংঘটিত হয়, যেহেতু ঐ অঞ্চলেই যতসব দামি দামি পণ্যের দোকানগুলো রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি সবচেয়ে’ বিপদজনক এলাকাটি হচ্ছে ফ্লোরিডা এবং করেন্তিসে।’ এটা সত্যিই ভয়ংকর ব্যাপার যে, আপনি যখন এখানকার জনগণের দারিদ্রের কথা ভাবছেন তখন সেখানে বেচাকেনা হচ্ছে উচ্চমূল্যের বিলাসদ্রব্য। এটা ভয়ংকর। বহু বছরের অব্যবস্থা, সামরিকবাদ… তারা হয়ত বলবে যে (প্রেসিডেন্ট) আলফনসিন একজন মাঝারি মাপের মানুষ কিন্তু তাহলেও তিনি একজন সৎ মানুষ। যদিও কাউকে সৎ রাজনীতিবিদ বলাটা স্ববিরোধাত্মক ব্যাপার বলে মনে হবে।
ক্লার্ক : আপনি চিনের তথাকথিত প্রথম সম্রাট সাই হুয়াং তি সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন…
বোর্হেস : হ্যাঁ, ‘দ্য ওয়াল এন্ড দ্য বুকস’ সিলবিনা ওকাম্পো (বিক্তোরিয়া ওকাম্পোর ছোট বোন এবং বোর্হেসের সহলেখক আদোল্ফো বিঅয় কাসারেস-এর স্ত্রী) আমাকে বলেছিল, এই লেখাটির মাধ্যমে একটি নতুন ঘরানা তৈরি করেছি। তবে এটা লেখার ধারণাটি পেয়েছিলাম চুয়াংৎসু থেকে অনূদিত হার্বার্ট এলেন গাইলস-এর ‘চিনের ইতিহাস’ বইটি থেকে। অস্কার ওয়াইল্ড চুয়াংৎসু-এর ঐ প্রথম অনুবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন। চুয়াংৎসু এখন পুরোনো, আমার ধারণা খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম বা ষষ্ঠ শতকের হবে। ওয়াইল্ড বইটি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমার বিশ্বাস এই অনুবাদটি মূল বইয়ের ২৬০০ বছর পরে প্রকাশিত এবং নিশ্চিতভাবেই অপরিণত।’
ক্লার্ক : অপরিণত?
বোর্হেস : হ্যাঁ, অপরিণত। অস্কার ওয়াইল্ড খুব গভীর বোধসম্পন্ন লোক ছিলেন। আমার মনে হয় তিনি তাঁর নিজস্ব গভীরতায় বিব্রত ছিলেন এবং তার রসবোধ ছিল দারুণ মৌলিক। আপনি হয়ত জেনে থাকবেন তিনি একজন সমকামি ছিলেন। আজকাল অনেক লোকই সমকামি হওয়ার ভান করছে। তার এক বন্ধুকে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন ‘কেউ সমকামি হলে তা বলা নি®প্রয়োজন। কারোর মনোযোগ আকর্ষণ না করার জন্য বলা প্রয়োজন সে সমকামি না।’
ক্লার্ক : চলুন, আমরা আপনার দ্য ওয়াল এন্ড দ্য বুকস প্রসঙ্গে ফিরে যাই।
বোর্হেস : হ্যাঁ, চলুন। আমার মনে হয় ওটার কথা মনে করতে পারব। আমি কখনোই আমার লেখা দ্বিতীয়বার পাঠ করি না। এই বাসায় আপনি আমার লেখা একটি বইও পাবেন না এবং আমার সম্পর্কে কোনো বইও এখানে নেই। কারণ আমি আমার লাইব্রেরিকে ওই সব বই থেকে মুক্ত রাখতে চাই। সেখানে আপনি পাবেন এমার্সন, বার্নার্ড শ অথবা কোলরিজ কিংবা ওয়ার্ডসওয়ার্থের বই।
ক্লার্ক : সেই প্রবন্ধে চিনের সম্রাট ধ্বংস করেন ইতিহাসকে, তিনি সম্রাট হওয়ার আগে লেখা সমস্ত বই ধ্বংস করেন। তিনি…
বোর্হেস : হ্যাঁ, কারণ তিনি অতীতকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন এবং এভাবেই তাকে দিয়ে শুরু হল ইতিহাস।
ক্লার্ক : এবং একই সময়ে তিনি বিখ্যাত প্রাচীরের নির্মাণ কাজ শুরু করার আদেশ দেন।
বোর্হেস : এক ধরনের কুহকি ক্ষেত্র তৈরির লক্ষ্যে, তাই না?
ক্লার্ক : আমার মনে হয়, এসব কিছুর সাথেই আপনার কৃতকর্মের মিল রয়েছে, কারণ আপনি ইনকুইজিসিওনেস-এর মতো পূর্বলিখিত রচনাকর্ম ধ্বংস করে দিয়েছেন…
বোর্হেস : যথার্থ কারণেই করেছি। আমি বিশ্বাস করি যে… উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস বলতেন, ‘আমি নিজেকেই পুনঃনির্মাণ করি।’ তিনি যখন অতীতকে সংশোধন করেন তখন নিজেকেই সংশোধন করেন, কেননা অতীতটা খুবই প্লাস্টিকের মতো।
ক্লার্ক : আপনি যখন প্রবন্ধটি লিখছিলেন, তখন কি আপনার এবং সাই হুয়াং তির মধ্যে কোনো সাদৃশ্য খুঁজে পাননি?
বোর্হেস : অবশ্যই না। আমি নিজের অপরিণত বই ছাড়া কখনোই অন্য কোনো বই পোড়াইনি এবং কোনো প্রাচীরও তৈরি করিনি। না, না।
ক্লার্ক : আপনি অন্যান্য যে সাহিত্যকর্ম তৈরি করেছেন তা চিনের প্রাচীরের মতো, তাই নয় কি? আপনার পরবর্তী যে রচনাকর্ম প্রাচীরের মহিমায় গড়ে উঠেছে সেগুলো আপনাকে নিঃসন্দেহে গৌরবান্বিত করেছে। অন্যদিকে আপনি যেগুলো পুড়িয়ে ফেলেছেন সেগুলো আপনাকে অভিযুক্ত করতে পারত…
বোর্হেস : ওটার সঙ্গে এর মোটেই তুলনা করা যায় না। আমি যা লিখেছি তা বিখ্যাত প্রাচীরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। এগুলো তেমন কিছু নয়, প্রাথমিক খসড়া মাত্র…
ক্লার্ক : এ ক্ষেত্রে অন্যরা আপনার সঙ্গে একমত না।
বোর্হেস : হ্যাঁ, কিন্তু আমি একমত। পাশাপাশি সুইডেনের অনেক মহৎ লোকই আমার সঙ্গে একমত হবেন যারা শ্রদ্ধাভাজন সুইডিশ একাডেমির কর্মকর্তা এবং তারা খুবই সংবেদনশিল। হ্যাঁ, খুবই সংবেদনশিল। যাই হোক, বলুনতো আপনার দেশ কোথায়?
ক্লার্ক : নিউজার্সি তবে বাফেলোর দক্ষিণে ফ্রিডোনিয়ায় থাকি।
বোর্হেস : আমি আমেরিকাতে আর্হেন্তাইন সাহিত্যের অনেক কোর্সের ওপর শিক্ষকতা করেছি। আমি প্রথম হার্ভার্ডে শিক্ষকতা করি। হার্ভার্ড থেকে অনারারি ডক্টরেটও লাভ করি। এরপর মিশিগানের ইস্টল্যান্সিং নামের ছোট শহরে এবং ইন্ডিয়ানা ব্লুমিংটনেও শিক্ষকতা করি। এছাড়া আরও এক জায়গায়…
ক্লার্ক : টেক্সাসের অস্টিনে।
বোর্হেস : অবশ্যই, এটাই প্রথম এবং সবচেয়ে স্মৃতিময় জায়গা। স্মৃতিটা আমার মাকে ঘিরে। ১৯৬১ সালে সেই আমেরিকা আমি আবিষ্কার করি। আমার মা সেখানে একটি ভয়ংকর অঘটন বাধিয়ে বসেন। সেখানে দু’টি মূর্তি ছিল। লোকজন আমার মাকে বলল ‘এটা হচ্ছে ওয়াশিংটনের মূর্তি’…। মা বললেন, ‘হ্যাঁ, অন্যটি হচ্ছে লিংকনের’— একথা বলার পর উপস্থিত সবাই মা’র দিকে খর দৃষ্টিতে তাকাল। গৃহযুদ্ধ, কনফেডারেসি— এসব নিয়ে মায়ের অনুভূতি যে কি ছিল, আপনি জানেন, ‘আমেরিকার গৃহযুদ্ধ ছিল ঊনবিংশ শতাব্দির সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ, বিসমার্ক এবং নেপোলিয়ানদের যুদ্ধের চেয়ে এ যুদ্ধে ঢের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল… এখানে যে স্বাধীনতা যুদ্ধ সংঘটিত হয় তার চেয়েও এই হত্যাযজ্ঞ ছিল ব্যাপক। গেটিসবার্গের যুদ্ধটা ছিল তিন দিনের। তুলনা করে দেখলে যুদ্ধগুলো ছিল আসলে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ‘দাঙ্গা’ মাত্র। ঐ সময় ৪০ মিনিটের হুনিন-এর যুদ্ধে আমার পিতামহ অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল মূলত তরবারি ও বল্লম। একটা গুলিও ছোঁড়া হয়নি। এগুলো ছিল ছোটখাটো লড়াই। কিন্তু গেটিসবার্গের যুদ্ধটা ছিল তিন দিনের। আর ওয়াটারলু যুদ্ধটি ছিল একদিনের। গেটিসবার্গের চাইতে ওয়াটারলুর যুদ্ধে কম লোকই মারা গিয়েছিল।
ক্লার্ক : ইউনিয়ন থেকে স্বাধীন হওয়ার জন্য সদস্য কনফেডারেসিগুলো যতটা আগ্রহি ছিল, উত্তরাঞ্চল যতটা আগ্রহি ছিল দক্ষিণাঞ্চলকে ইউনিয়নে রাখায়, দক্ষিণ আমেরিকার এই অঞ্চলগুলোকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে স্পেনিয়দের আগ্রহ কি তুলনায় তারচেয়ে কম ছিল?
বোর্হেস : হ্যাঁ, এখানে মোতায়েনকৃত হিস্পানি সেনাশক্তি ছিল দুর্বল। কেননা জেসুইটদের নেতৃত্বে আগের যুদ্ধগুলোয় হোয়ারানি ইন্ডিয়ানরা সহজেই হিস্পানিদের পরাস্ত করে। পর্তুগিজ বা হিস্পানিদের চেয়ে এসব ইন্ডিয়ানরা ছিল তুলনায় অধিকতর কুশলি যোদ্ধা।
ক্লার্ক : আপনার ‘দ্য সিক্রেট মিরাকল’ গল্পে ইয়ারোমির লাদিক…
বোর্হেস : ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে… এর আইডিয়াটা… একেবারেই প্রাচীন একটি আইডিয়া… তাহল সময়কে সংকুচিত করা যায়, তাই না? অথবা সময়কে প্রলম্বিতও করা যায়। এ গল্পে সময়কে প্রলম্বিত করা হয়েছে, তাই নয় কি?
ক্লার্ক : হ্যাঁ, সময় নিয়ে আপনি খেলেছেন, তাই না?
বোর্হেস : ঠিক তাই।
ক্লার্ক : কিন্তু আমি জানতে চাচ্ছিলাম… লাদিক একটা স্বপ্ন দেখেছিল। জানি না আপনার মনে আছে কি-না।
বোর্হেস : না।
ক্লার্ক : স্বপ্নটিতে…
বোর্হেস : হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়ছে। সে মানচিত্রে ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছিল, তাই তো?
ক্লার্ক : হ্যাঁ, ওটা ছিল গল্পে দ্বিতীয় স্বপ্ন।
বোর্হেস : একটি গল্প আমি একবারই লিখি আর আপনি সেটা পড়েছেন বহুবার, তাই তো? সেদিক থেকে গল্পটা যতটা না আমার তার চেয়ে বেশি আপনার। আপনি এর পেছনে আমার চাইতে বেশি সময় ব্যয় করেছেন। এটা বেশ কৌতূহলোদ্দিপক যে, আমি এগুলো লিখি কিন্তু দ্বিতীয়বার আর পড়ি না। এক্ষেত্রে মহান মেহিকান লেখক আলফনসো রেইয়েস-এর সঙ্গে আমার আলাপচারিতার কথা মনে পড়ছে। তিনি আমাকে খুবই ভালবাসতেন। আমি প্রতি রোববার মেহিকান দূতাবাসে তার সঙ্গে ডিনারে অংশ নিতাম (এ সময় তিনি আর্হেন্তিনায় মেহিকোর রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। সেখানে থাকতেন দোন আলফনসো, তাঁর স্ত্রী, তাঁদের ছেলে এবং আমি। আমরা সেখানে— আসলে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে আলাপ করতাম। তিনি আমাকে একদিন প্রশ্ন করলেন, ‘আমরা কেন বই প্রকাশ করি?’ ‘হ্যাঁ,’ আমি বললাম, ‘আমিও প্রায়ই নিজেকে এই প্রশ্ন করি, পৃথিবীতে কেন এসেছি?’ তিনি বললেন, ‘আমি মনে হয় উত্তরটি পেয়ে গেছি।’ ‘কি সেটা?’ আমি জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ‘জীবনের ভুলগুলো শোধরানোর কাজে যেন আমাদের সারা জীবন কেটে না যায় তাই বই বের করি।’ আমি এতে একমত হলাম। যদি কেউ একটি বই প্রকাশ করে তারপর সে অন্য কাজেও যেতে পারে।
ক্লার্ক : যেটা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে…
বোর্হেস : কেননা, যা কিছুই আমি প্রকাশ করি তা সবই খসড়া। সব মৌলিক রচনাই অবিরাম সংশোধনযোগ্য।
ক্লার্ক : প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত।
বোর্হেস : প্রকাশিত হওয়ার পর, প্রকাশিত রূপটির দিকেই তার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ বের হওয়ার পর সে অবশ্যই এটা শোধরানোর চেষ্টা করবে।
ক্লার্ক : ওটা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়… বইটিকে ভুলে যাওয়ার জন্য প্রকাশের ধারণা এবং বিষয়ান্তরে চলে যাওয়া… একটা সমান্তরাল ব্যাপার। এটাকে কি সেই বিষয়ের সাথে তুলনা করা যায় যেটা সম্পর্কে আপনি কোনো এক জায়গায় একবার বলেছিলেন যে, কেউ যখন কোন নারীকে ভালবাসে তখন তাকে ভুলে যাওয়ার জন্যেই?
বোর্হেস : হ্যাঁ, তবে স্বভাবতই ঐ নারী যদি পুরুষটির ভালবাসার প্রতিদান না দেয়, পুরুষটির ভালবাসা যদি প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হয় তাহলে সে ঐ প্রণয়ির চিন্তাতেই মগ্ন থাকে। তবে প্রণয়ি যদি তার প্রেমিকের প্রতি কিছুটা মনোযোগি হয়… হ্যাঁ, তখন ধারণাটি অবশ্যই সমান্তরাল।
ক্লার্ক : চলুন, আমরা এবার ‘দ্য সিক্রেট মিরাকল’-এর প্রথম স্বপ্নের প্রসঙ্গে ফিরে যাই।
বোর্হেস : কিন্তু ঐ কাহিনিতে স্বপ্ন তো মাত্র একটিই।
ক্লার্ক : না, প্রথম স্বপ্নটি ভারতিয় মানচিত্রকে নিয়ে নয়। এটা সেই স্বপ্ন যেখানে লাদিক একটি ‘বৃষ্টিস্নাত মরুভূমি’র মধ্য দিয়ে দৌড়াচ্ছিল, দাবার চাল দিতে সময় মতো পৌঁছানোর লক্ষ্যে—
বোর্হেস : হ্যাঁ, এখন মনে পড়ছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ।
ক্লার্ক : আপনার বর্ণনানুযায়ি খেলাটি কেবল দু’জন খেলোয়াড়ের মধ্যেই হয়নি বরং এটা ছিল দুইটি বিখ্যাত পরিবারের মধ্যে দাবা খেলা। এবং লাদিক স্বপ্নে দাবা খেলার নিয়মকানুনগুলো ভুলে গিয়েছিল।
বোর্হেস : ও হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তবে আমি নিশ্চিত নই এটা (দাবা খেলার স্বপ্নটি) ঐ গল্পে ছিল কি-না।
ক্লার্ক : হ্যাঁ ছিল। গল্পের শুরুতেই স্বপ্নটি ছিল। গল্পের প্রথম বাক্যটিই শুরু হয়েছে স্বপ্নের বর্ণনা দিয়ে।
বোর্হেস : হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। গল্পে ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্ম রয়েছে এবং বিশেষ একটি প্রজন্মের প্রত্যেক সদস্য একটি করে চাল দেয়। ঐ রকমই… হ্যাঁ, অবশ্যই… এর ভিতরে আমি ঐ স্বপ্নটিকে ঢুকিয়ে দিয়েছি, কারণ এটা মূল আখ্যানের বিপরিত। প্রথমেই আমরা সেখানে একটি দাবা খেলা এবং অনেকগুলো প্রজন্মের উল্লেখ পাই আর তারপর এক মিনিটের একটি নাটক রচনার প্রসঙ্গ আসে। এ কারণেই আমি এটি গল্পের মধ্যে ঢুকিয়ে দেই। মধ্যবর্তী বৈপরিত্যটুকু ধরার জন্যে… খেলাটির পাশাপাশি সামগ্রিক ধারণাটিকে পাওয়ার জন্য যা অনেকগুলো প্রজন্মের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়। হ্যাঁ, এটা ঠিক তাই। কিন্তু আপনি কি পুরোপুরি নিশ্চিত যে ঘটনাটি একই গল্পের অন্তর্ভুক্ত?
ক্লার্ক : হ্যাঁ, ‘দ্য সিক্রেট মিরাকল’ গল্পটি ঐ স্বপ্ন দিয়েই শুরু।
বোর্হেস : ও হ্যাঁ, এটা অবশ্যই একই গল্পের অন্তর্ভুক্ত। কারণ যদি না…
ক্লার্ক : লাদিকই স্বপ্নটি দেখে।
বোর্হেস : হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, এটা ঘটেছিল প্রাগে। আমি একটি জার্মান চরিত্র (কাল্পনিক জুলিয়াস রোথে)-এর কথা উল্লেখ করেছি যাতে সে শোপেনহাওয়ার, রিসটার, নোভালিস, শিলার পড়ার সুযোগ পায়।
ক্লার্ক : স্বপ্নের মধ্যে সময়ের পরস্পরবিরোধি ব্যবহার এবং গল্পের মধ্যে এর কার্যকলাপ-এর পাশাপাশি এটা ভাবাও কি সম্ভব নয় যে, স্বপ্নের দাবা খেলাটি প্রকারান্তরে যুদ্ধ? ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তির চাইতেও জাতির বিরুদ্ধে জাতি বা যুদ্ধের প্রতিকায়ন?
বোর্হেস : হ্যাঁ, আপনি যা মনে করেন। হ্যাঁ, দাবা খেলার চেয়ে যুদ্ধটা সম্ভবত কম মজার।
ক্লার্ক : কেন আপনি বলেন তারা শুধুমাত্র একটি পুরস্কারের জন্য খেলেছিল? অথচ কেউ মনে করতে পারে না পুরস্কারটি কি ছিল, শুধু জানে পুরস্কারটি অপরিমেয় এবং সম্ভবত অসীম।
বোর্হেস : কেউ যদি না-ই জানে পুরস্কারটি আসলে কি, এটা না বলাতে ভালই হয়েছে। আপনি জানেন সাধারণ লোকজন দাবা খেলে এমনিই। আমি বলতে চাচ্ছি, তারা কখনোই টাকার জন্যে খেলে না। যেমনটি টুসো (এক ধরনের তাস খেলা)-এর বেলায় দেখা যায়। কিন্তু আপনি যখন পোকার খেলেন তখন নগদ টাকা নিয়ে বসেন। তাই নয় কি?
ক্লার্ক : হ্যাঁ।
বোর্হেস : কিন্তু টুসোতে নগদ টাকার কোনো ব্যাপার নেই। যেমন, কেউ বলে না, আমি টুসোতে এত টাকা জিতেছি। তারা বলে, আমি অমুককে অমুককে হারিয়েছি। সুতরাং এটা খুবই ব্যক্তিগত ব্যাপার। কেউ ক্যান্ডির জন্যই খেলুক আর টাকার জন্যই খেলুক, এটা কোনো ব্যাপার নয়।
ক্লার্ক : আমি জানি যে টুসো হচ্ছে এক ধরনের তাস খেলা। কিন্তু কিভাবে খেলতে হয় তা জানি না।
বোর্হেস : এটা খেলার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। মন্তেবিদিওতে টুসো খেলার একটি জটিল ধরন খুব জনপ্রিয়, যার নাম Truco up-to-Two এবং বুয়েনস আইরেসে ব্লাইন্ড টুসো নামে এক ধরনের টুসো খেলার পদ্ধতি আছে যা আমি খেলতে পারি। এটা তিনটি কার্ডের মাধ্যমে খেলা হয়। তবে পোকারে আপনি অনবরত খেলতেই থাকবেন কিন্তু টুসোতে ভাল খেলোয়াড় বলতে বোঝায় তাকেই যে খেলা থামিয়ে একটি গল্প কিংবা কতগুলো চুটকি শোনাবে— এভাবে তার বিপক্ষকে সে বিরক্ত করার চেষ্টা করে। তারপর আপনার কাছে যখন ফ্লাওয়ার থাকে— ফ্লাওয়ার বলতে বোঝায় একই রং-এর তিনটি তাসকে— ঠিক আছে? এখন এই ব্যাপারটি আপনি শ্লোকের মাধ্যমে প্রকাশ করবেন। শ্লোকটি হবে : …বাগে একটি গোলাপ পেয়েছি কুঞ্জবনে/নিজেকে রাখ…। শ্লোকটি অশ্লিলও হতে পারে। যেমন ‘সে পেয়ে গেছে চিমসে পাছার মাগি/ প্রেমিকাটি তার ফুল হয়ে ভাসে নোংরা নালার জলে’। অথবা আপনি হাতের কার্ডগুলো এক পাশে নামিয়ে রেখে একটা গল্প শুরু করে দিলেন। এভাবেও আপনি খেলাটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন… অথবা বলতে পারেন, ‘সর্বনাশ! আমার হাতে কি বাজে কার্ড।’ একথার মাধ্যমে প্রকাশ পায়, আপনার হাতে খুব ভাল কার্ড পড়েছে এবং আপনি তা লুকাতে চাইছেন অথবা আপনার হাতে সত্যিই খারাপ কার্ড পড়েছে। তবে হ্যাঁ, এটা খুবই মন্থর খেলা। যাদের কিছুই করার নেই এটা মূলত তাদেরই খেলা। সময় কাটানোর জন্যই যেন খেলাটি এভাবে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু পোকার— যদি আমার ভুল না হয়— মুখ্যত সময় কাটানোর জন্য নয়। অত্যন্ত গতিশিল খেলা এবং এ খেলায় কোনো ভুল সহ্য হয় না। কারণ আমার ধারণা পশ্চিমা সোনার খনির শ্রমিকরাই খেলাটির উদ্ভাবক যারা খুবই দ্রুত ধনি হতে চাইত। কিন্তু নোংরা হচ্ছে অন্যগুলোর তুলনায় অনেক বেশি অবসরের খেলা। টুসো খেলার ব্যবহার— বিরল একটি পদ্ধতির নাম ফিফ্টিন-ফিফ্টিন কিংবা টুয়েনটি-সামথিং-অর-আদার। খেলোয়াড় যদি ভাল হয় এ খেলাটি পাঁচ থেকে বার ঘণ্টা চলতে পারে।
ক্লার্ক : লোকজন কি এখনও টুসো খেলে?
বোর্হেস : কোনো সন্দেহ নেই, এখনও খেলে। সান্তা ফে এবং হুয়ান বি হুস্তোর কোণাকুণি পালোমার টি-রুমে টুসো চ্যাম্পিয়নশিপ প্রতিযোগিতা হত।
ক্লার্ক : ঐ প্রতিযোগিতা কি এখনও হয়?
বোর্হেস : না, আমার তা মনে হয় না। উরুগুয়ান প্রদেশের তিন সঙ্গিসহ আমি প্রায়ই সেখানে যেতাম। টর্টনির ক্যাফেতে দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়।
ক্লার্ক : আপনার সেই গোয়েন্দা গল্পটিতে যেখানে স্থান, কাল এবং পুরাণের গোলকধাঁধা রয়েছে… এসব আপনি কি উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন? কোন উদ্দেশ্য আছে কি?
বোর্হেস : না। আমি মূলত গোয়েন্দা উপন্যাসের একজন বড় পাঠক। এই-ই। আমি এমন একজনের দেখা পেয়েছিলাম যিনি এলারি কুইন হিসেবে নিজের স্বাক্ষর দিতেন। আরও একজন ছিলেন তিনি বোধ হয় এখন আর বেঁচে নেই।
ক্লার্ক : সে কি ড্যাশেল হ্যামেট?
বোর্হেস : না, না, ড্যাশেল হ্যামেট মননশিল গোয়েন্দা উপন্যাসের চাইতে বরং মারদাঙ্গা উপন্যাসই লিখতেন। আমি যতদূর জানি, এই ধরনের উপন্যাস লিখেছেন এলারি কুইন। কিন্তু এলারি কুইনের রহস্যগুলো দু’জন লোকের লেখা; এই মুহূর্তে আমি তাদের নাম স্মরণ করতে পারছি না। তবে তাদের একজন মারা গেছেন। অন্যজনের সাথে আমার দেখা হয়েছিল, রহস্যোপন্যাসিকদের এক ভোজসভায়।
ক্লার্ক : গোয়েন্দাকাহিনির আবেদনের আংশিক কারণ কি এই যে পাঠক এতে সহলেখক হওয়ার অনুভূতি পেয়ে যায়। এই কারণে, লেখকের মতো সে নিজেও একসময় রহস্যের সমাধান করে এবং এর ফলে সে একধরনের কাজ সম্পাদন করার অনুভূতি লাভ করে? সুপিরিওরিটির এক অনুভূতি?
বোর্হেস : সুপিরিওরিটি… ড. ওয়াটসনের প্রতি সম্মান রেখেই বলা যায়, হ্যাঁ, তবে শার্লক হোমসের ক্ষেত্রে সম্ভবত না, তাই না? ফাদার ব্রাউনের চেয়েও বড়, তাই না? হ্যাঁ, মনে পড়ছে, আমার বোন ডিকেন্সের বন্ধু উইলকি কলিন্সের দ্য মুনস্টোন উপন্যাসটি আবারও পড়ছিল। আমার দাদি সারা ইংল্যান্ড চষে বেড়াবার সুবাদে ডিকেন্সের নিজের কণ্ঠে তাঁর উপন্যাসের দু’টো অধ্যায় পড়ে শোনার সুযোগ পেয়েছিলেন। অধ্যায় দু’টোর একটি ‘পিকউইক পেপারস’-এর দ্য ট্রায়াল সিন এবং এর বিষয়টি ছিল বিল সিকেজ বলে একটি মেয়ের খুন হওয়া। আমার দাদির ভাষা অনুযায়ি ‘ডিকেন্স কেবল একসেন্ট, ডাইরেক্টই পরিবর্তন করতেন না, তিনি যখন ‘পিকউইক’-এর দ্য ট্রায়াল সিন— যাতে, আমার ঠিক জানা নেই, ১০ থেকে ১৫টির মতো চরিত্র রয়েছে— পড়ে শোনান তখন তার চেহারাও বদলে যেত। তিনি ছিলেন আমাদের পিকউইক এবং তিনিই আমাদের টপম্যান এবং তিনি ছিলেন… এদের সবাই। যথার্থরূপেই তিনি ছিলেন এদের সব। তিনি দু’টো অধ্যায় পড়েছিলেন। প্রথমে দ্যাট ভেরি গ্রিম মার্ডার অব ন্যান্সি বাই সিকেক। আর অন্যটি হচ্ছে পিকউইকের ট্রায়াল সিন।
ক্লার্ক : আপনি কি এলা রব গ্রিয়ে-এর লেখার সঙ্গে পরিচিত?
বোর্হেস : রব গ্রিয়ে। না, আমি তার কোনো লেখা পড়িনি।
ক্লার্ক : আমি জানতে চাইলাম এই জন্যে যে, আমার মনে হয় তিনি আপনার দ্বারা প্রভাবিত।
বোর্হেস : দেখুন, পড়াশুনা করে আমার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছি ১৯৫৫ সালেই। তবে আমি প্রচুর বই বারবার পড়েছি। অন্যের মাধ্যমেও প্রচুর পড়ে নিয়েছি। মেয়ে বা পুরুষ যে কেউ আমার কাছে এলে আমি তাদেরকে পড়ে শোনানোর জন্যে বলি। সম্প্রতি আমি এভাবেই (ভ্যান উইক) ব্রুকস-এর লেখা এমার্সনের জীবনী আবারও পড়তে শুরু করেছি।
ক্লার্ক : লোকজন আপনাকে পড়ে শুনিয়ে যায়?
বোর্হেস : এছাড়া আমার আর কিই-বা করার আছে? আমি যদি পড়তে না পারি তাহলে লিখতেও পারব না। এ থেকে মুক্তি নেই। কোনো মানুষ নিজেকে নিজেই পরিত্যাগ করতে পারে। পরিত্যক্ত হওয়া সহজ। আমি জন্মের পর থেকে ক্রমাগত আমার দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছি। আমার দৃষ্টিশক্তি হারাবার সময়ে এক মুহূর্তেরও নাটকিয়তা ছিল না। ধীরে-ধীরে আমার চোখের সামনে থেকে সব কিছু মুছে গেছে। আমার গল্পের ভুলে যাওয়া চরিত্রদের মতোই। কি সৌভাগ্য যে ঘটনাটি আমার বেলায়ই ঘটেছে।
ক্লার্ক : আপনার লেখায় অভ্যন্তরিণ প্রতিরূপতার— যেমন গল্পের ভেতরে গল্পের উদ্দেশ্য কি?
বোর্হেস : আমার মতে, গল্পটি যেহেতু কাল্পনিক (Fantastic) তাই সেখানে একজন কবি থাকে যার দ্বারা আমি উপস্থাপন করি গল্পের আখ্যানভাগ। কবি সৃষ্টি করেন অন্য এক কবিকে যিনি একই সঙ্গে সৃষ্টি করে তার রচনাকর্ম… এটা প্রাচীনরীতি। সহস্র এক রজনির কথাই ধরুন কিহোতেও তাই। এই বইগুলোর মধ্যে রয়েছে গল্পের ভেতরে গল্প… চিনা উপন্যাস… চিনা উপন্যাসগুলোয় অনেকগুলো স্বপ্নের কথা থাকে আবার ঐ স্বপ্নগুলোর মধ্যেও থাকে আরও কিছু স্বপ্ন। এটা হচ্ছে এক ধরনের দক্ষতা, বলতে পারেন কৌশলও। এটাই স্বাভাবিক, তাই নয় কি? স্বপ্নের ভিতরে স্বপ্ন।
ক্লার্ক : আপনার ন্যারোটিভ আর্ট ম্যাজিক প্রবন্ধের ধারণাগুলোকে আপনি কিভাবে প্রয়োগ করেছেন?
বোর্হেস : আমি সেগুলো প্রয়োগ করার চেষ্টা করিনি। ঐ প্রবন্ধটির কথা আমি মনে করতে পারছি না। এখন আপনাকে এমন কিছু বলতে চাই যা সম্পর্কে আপনি কৌতূহলি হবেন। যে পদ্ধতিতে আমি লিখি— আপনি হয়ত জানেন— আমি একটি নম্র প্রকাশের আশ্রয় নেই, নম্র প্রকাশ। হ্যাঁ। এই নম্র প্রকাশভঙ্গির মধ্যে আমি গ্রহণ করি একটা গল্পের প্রারম্ভ এবং অন্তিম পর্যায়টি। চমকপ্রদ সূচনাবিন্দু এবং গন্তব্য। কিন্তু এই দুয়ের মাঝে অর্থাৎ গল্পের মধ্যপর্যায়ে কি ঘটে সেটা আমি জানি না। এই মধ্য পর্যায়টি আমাকে আবিষ্কার করতে হয়। অবশ্যই, কখনো কখনো আমার ভুল হয়। তবে সূচনা ও শেষ সম্পর্কে আমি সবসময়ই সচেতন কিন্তু পরবর্তীতে কেমনটি লিখব তা আমি খুঁজে বের করি, এটা কি উত্তম পুরুষে লিখব না-কি নাম পুরুষে লিখব এবং এর কালিক ও দৈশিক পটভূমিই বা কি হবে এটাই আমার কাজ। এই কাজে আমার কখনো কখনো ভুল হতে পারে প্রকাশভঙ্গির ব্যাপারে আমি যথাসম্ভব কম নাক গলানোর চেষ্টা করি। আমি বিশ্বাস করি লেখক হচ্ছেন মূলত তিনি যার গ্রহণক্ষমতা আছে; যার গভীর অনুধ্যান রয়েছে। আমি যা বলছি অবশ্যই তা নতুন কিছু নয়।
ক্লার্ক : কোলরিজ ‘কুবলা খান’কবিতাটি স্বপ্নের মধ্যে যেভাবে পেয়েছিলেন, সেভাবেই কি?
বোর্হেস : অবশ্যই। এখানে এসে বোর্হেস ‘কুবলা খান’কবিতার প্রারম্ভিক চরণগুলো নাটকিয় ভাবাবেগের সঙ্গে আবৃত্তি করেন।
জানাডু-তে কুবলা খান
গড়েছিল রাজকিয় প্রমোদ-মিনার
যেখানে পবিত্র নদী আলফ বহমান
মানুষের অপ্রমেয় এক গিরিখাতে দিনমান
খুঁজে এক রবি রশ্মিহীন পারাবার।

(এরপর তিনি কবিতার শেষ স্তবকে চলে আসেন)

দ্যাখো তার তড়িৎ-নয়ন, তার ঢেউ-তোলা চুলের বাহার!
সাত পাক দিয়ে তাকে তিনবার কর তাকে গড়
নয়ন মুদিত কর পবিত্র তরাস,
চুমুক দিয়েছে সে যে সোমের গেলাসে,
খেয়েছে নির্লিপ্ত মোহে অমৃতের সর।
(অনুবাদ : সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ)
চমৎকার! যদি এরকম লিখতে পারতাম! আমার কাজ হচ্ছে ক্ষৌরকর্ম। আমি আসলে একটা আন্তর্জাতিক কুসংস্কার যার কোনো অস্তিত্ব নেই অথচ টিকে আছে। আমি একটা উছিলা মাত্র কিংবা অবলম্বন। কেবলই একটা অবলম্বন।
ক্লার্ক : এ ব্যাপারে কেউ-ই আপনার সাথে একমত হবে না।
বোর্হেস : কিন্তু ঈশ্বর বলেন, বোর্হেস একমত। (হাসি)
ক্লার্ক : কোন বোর্হেস— যিনি লিখেন তিনি নাকি যিনি এখন কথা বলছেন?
বোর্হেস : হ্যাঁ, বোর্হেস অথবা বোর্হেস? হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আমার পারিবারিক নামগুলো পর্তুগিজ : বোর্হেস এবং আসেভেদো। আর কেন-ই বা নয়। আমি যখন ব্রাজিলে ছিলাম— সাওপাওলোর সান্ত আনাদো লিব্রামেন্তোতে, তখন-কথা বলতাম হিস্পানি ভাষায় আর ওরা বলত পর্তুগিজ ভাষায়, আমরা পরস্পরকে পুরোপুরি বুঝতাম। হিস্পানি-পর্তুগিজ… ডগ লাতিন ছাড়া বেশি কিছু না। লে লাতিন দে কিসিনে…
ক্লার্ক : আপনি বলেছিলেন ‘এল সুয়েনো দে লোস এরায়েস’ লেখাটি আদোম্ফো বিঅয় কাসারেস-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ। কেন?
বোর্হেস : অবশ্যই উল্লেখযোগ্য।
ক্লার্ক : হ্যাঁ, কিন্তু কেন? কেন সবচেয়ে ভাল কাজ, বলবেন কি?
বোর্হেস : হ্যাঁ, কারণ এটা আমি পড়েছি।
ক্লার্ক : আপনি তো তার অন্যান্য লেখাও পড়েছেন। তাই না?
বোর্হেস : আমি যখন বিঅয় কাসারেসের লেখা পড়ি… তার প্রেমের গল্পগুলো তেমন উঁচু মানের নয়, কিন্তু তার কল্পনাপ্রবণ (ফ্যান্টাসি) গল্পগুলো খুবই উঁচুমানের। তিনি আমাকে বলতেন যে একজন লেখকের প্রতিদিন লেখা উচিত। আমার যে বোন কয়েকদিন আগে তার বিরাশিতম জন্মবার্ষিকী পালন করলেন, তিনি প্রতিদিন ঘণ্টা দুয়েক পেইন্টিং অথবা ড্রয়িং এর পেছনে ব্যয় করেন। তিনি প্রায়ই বলতেন যে, কবির কাজ গভীরভাবে চিন্তা করে অবিরাম লিখে যাওয়া। এভাবেই তার চিন্তা-চেতনা এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা অর্জন করে যাতে করে কাব্যলক্ষ্মি প্রসন্ন হয়ে নেমে আসে, তাই নয় কি? লেখাটি অভ্যাসে পরিণত হওয়া উচিত। কিন্তু দৃষ্টিহীনতার কারণে আমি লেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। কাজেই লোকজন যখন আমাকে দেখতে আসে তখন ডিকটেট করে লিখিয়ে নেই।
ক্লার্ক : ইদানিং আপনি কি লিখছেন?
বোর্হেস : মারিয়া কোদামার সঙ্গে একটি বই লিখছি যাতে থাকবে ভ্রমণসংক্রান্ত প্রচুর তথ্যাদি। তার আলোকচিত্রসহ বইটি হবে কিছুটা চিত্রধর্মী। আমি প্রচুর ভ্রমণ করেছি টেক্সাসের অস্টিন, নিউইয়র্কের হিল্টন, ইস্টল্যান্সিং আইসল্যান্ড, জাপান, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ইসরায়েল, সুইটজারল্যান্ড এবং জেনেভাতে আমি দীর্ঘদিন ছিলাম। আমি জেনেভাতেই পড়াশুনা করি। যখনই আমি ইউরোপে যাই জেনেভাই হয়ে ওঠে আমার অবস্থানের কেন্দ্রবিন্দু। ফ্রান্সে বেশ কিছুদিন ছিলাম। তবে লন্ডনে অবস্থানকালে আমাকে ক্যাম্বিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট উপাধি দেয়া হয়।
ক্লার্ক : সম্প্রতি আপনি কি আরও কোন গল্প লেখার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন?
বোর্হেস : হ্যাঁ, হ্যাঁ। একটি ছোট গল্পের বই যার নাম হবে শেক্সপিয়র’স মেমরি— এ বইটি শেক্সপিয়রের কোনো স্মৃতিকথা নয়, তার যশ ও খ্যাতির উৎসগুলোকে কেন্দ্র করেই লেখা। হ্যাঁ লা-মেমোরিয়া দে শেক্সপিয়র বইটির ওপর আমি এখন কাজ করছি এবং একটি কবিতার বই-এর ওপরে। হায় খোদা, এসবের পাশাপাশিই আমাকে লিখতে হবে চুরানব্বইটি বইয়ের জন্য চুরানব্বইটি ভূমিকা। এগুলোর জন্যে আমাকে কমপক্ষে একশ বছর লিখে যেতে হবে, তাই নয় কি? আমি খুবই ধীর গতির লেখক। যেমন বার্নার্ড শ’র কথা বলা যায় যাকে আমি অত্যন্ত পছন্দ করি।
ক্লার্ক : ‘অন্ত্রে দে লা এস্কিনা রোসাদা’ (রাস্তার ধারে মানুষ)-এ…।
বোর্হেস : এটা একটা ভয়ানক গল্প। এ সম্পর্কে আমি কিছু বলতে চাই না।
ক্লার্ক : না, না…
বোর্হেস : এটা একেবারে হাস্যকর।
ক্লার্ক : এটা সম্পর্কে এমন কিছু আছে যা আমার জানতে ইচ্ছে করে।
বোর্হেস : না, না। এটা আমাকে মোটেই আগ্রহি করে না। এটার জন্য আমি লজ্জিত, আমি ভীষণ লজ্জিত। (নরমান থমাস) দি জিওভান্নি আমাকে বলেছিলেন, এটা অপেরার মতো মনে হয়। হ্যাঁ, তিনি ঠিকই বলেছেন।
ক্লার্ক : এটার মধ্যে একটা চরিত্র ছিল যার নাম লা লুহানেরা এবং এই ডাকনামটি এরকম হওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কারণ বোধ হয়, মেয়েটি বুয়েনস আইরেসের লুহান প্রদেশের বলে। কিন্তু আপনি কি এ কারণেই তাকে এই নামে ডাকেন নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল?
বোর্হেস : না, না, সে লুহান-এর বলেই…. লুহান এখান থেকে বেশি দূরে নয়। এছাড়া আমি এখানে আর অন্য কোনো কারণ দেখতে পাচ্ছি না।
ক্লার্ক : কেউ একজন বলেছিলেন লা লুহানেরা নামের অশুভ তাস থেকেই নামটি এসেছে।
বোর্হেস : হ্যাঁ, হতে পারে। আমার যদ্দূর মনে হয়, আমি এটা এস্কাসুবির লেখায় পড়েছিলাম। কিন্তু যখন আমি নামটি দিয়েছিলাম তখন এভাবে চিন্তা করে দেখিনি। এটা ঠিক এরকম যে, যেহেতু প্রত্যেকেরই কেতাবি নামের সঙ্গে একটা ডাক নাম থাকতে হয় তাই দিয়েছি, কাজেই জেন অথবা মেরি ইত্যাদির সঙ্গে এটা সেটা যুক্ত হয়ে লা লুহানেরা নামটির উদ্ভব হয়েছে— এরকমও হতে পারে। তবে আমি শুধু লুহানই বোঝাচ্ছি যেটি একটি শহরের নাম।
ক্লার্ক : আপনি একসময় বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয় কনরাড এবং কিপলিং এমন একধরনের ছোটগল্প প্রবর্তন করেছেন খুব ছোট নয়, আমরা যাকে দীর্ঘ ছোটগল্প (Long short story) বলে আখ্যায়িত করতে পারি, যা পাঠকদের ওপর খুব একটা চাপ না দিয়েই উপন্যাসের সার্বিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পারে।
বোর্হেস : হ্যাঁ, অবশ্যই।
ক্লার্ক : আপনি কি এখনও সে রকমই ভাবেন?
বোর্হেস : হ্যাঁ, যদিও কথাটি আমিই বলিনি তবে আমি একমত (হেসে)। হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়। সম্ভবত আমি একটা ভাল উদাহরণ পছন্দ করেছি, তাই না?
ক্লার্ক : কাদিকামো বলতেন যে, নব্বই মিনিটের একটি চলচ্চিত্র যা প্রকাশ করতে পারে তিন মিনিটের একটি ট্যাঙ্গো গীতিকবিতা সফলভাবে তা উপস্থাপন করতে পারে। গল্প এবং উপন্যাস প্রসঙ্গে আপনি মূলত যে ধারণার কথা বলেছিলেন এটা কি সে রকমই?
বোর্হেস : হ্যাঁ কাদিকামোর মধ্যে প্রচুর আজেবাজে ব্যাপার ছিল, তাই না? শুধু এটাই তার একমাত্র সঠিক ধারণা। সাধারণত সে যা লিখত তা ছিল খুবই বাজে… চটুল। খিস্তি হিসেবে কেউ লুনফার্দো (গালাগাল বা অশ্লীল অর্থে ব্যবহৃত হয়) ব্যবহার করে না। লুনফার্দো হচ্ছে সম্পূর্ণ কৃত্রিম প্রাদেশিক ভাষা। সাধারণত সবাই তাকে বলত, বন্ধুবর, তুমি এসব লিখো না। কিন্তু সে লিখেই যেত। তার সব বন্ধুই পরামর্শ দিত।
ক্লার্ক : দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে আর্হেন্তাইন ট্যাঙ্গো প্যারিসে খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। কেন? কেনই-বা প্যারিসে?
বোর্হেস : আমার জানা নেই। এর উত্তর আমি জানি না। আমার নিজের দেশের ব্যাখ্যাও যদি কেউ জানতে চায় আমি বলতে পারব না। অথবা যদি কেউ আমাকে নিজের রচনাকর্মের ব্যাখ্যা দিতে বলে তা-ও আমার পক্ষে খুব একটা সম্ভব নয়। আমি নিজেই জানি না আমি কে।
ক্লার্ক : আপনি হচ্ছেন বস্তুবিশ্বের অভ্যন্তরে প্রবেশকামি এক আদি ছাঁচের হাতিয়ার, ঠিক বলিনি কি?
বোর্হেস : হ্যাঁ। আপনার ব্যাখ্যাটি যথার্থই। ওয়াল্ট হুইটম্যান বলেছিলেন : আমি জানি না আমি কে। এবং ভিক্টর হুগো এ সম্পর্কে আরো সুন্দরভাবে বলেছেন, ‘আমি নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখা এক মানুষ; ঈশ্বর জানেন শুধু আমার আসল পরিচয়।’

অনুবাদ : রাজু আলাউদ্দিন

বর্ষ ৩, সংখ্যা ৫, ফেব্রুয়ারি ২০০৪

শেয়ার করুন: