004588
Total Users : 4588
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →
জন্ম— জুন, ০৬, ১৯৭৭। জন্মস্থান— উত্তর গোবীন্দর খীল, হাঁদু চৌধুরী বাড়ী, পটিয়া, চট্টগ্রাম। (শৈশব কৈশোর ও তারুণ্যের সময়যাপন) বেড়ে ওঠা (পূর্ব্ব বালিয়াদী, মীরশ্বরাই, চট্টগ্রাম) নানার বাড়ীতে। প্রকাশিত কবিতার বই— ফুলেরা পোষাক পরে না (সাল: ২০১৮, প্রকাশক : মনফকিরা, কলিকেতা)। প্রকাশিতব্য বই— অর্দ্ধনারীশ্বরবাদ : প্রকৃতিপুরুষতত্ত্ব (নন্দনতত্ত্ব), বটতলার বয়ান (ভাষাতাত্ত্বিক গদ্য) ও উদ্ভিদপ্রতিভা (কবিতা)। সম্পাদক— চারবাক।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

জাতিসংঘ নদি কনভেনশন ও বাংলাদেশের অনুসমর্থন প্রসংগ বাংলাদেশের অ আ ক খ

বাংলাদেশ নদিমাতৃক দেশ। আমরা যেমন মায়ের গর্ভ থেকে জন্মলাভ করেছি তেমনি বাংলাদেশ নদির গর্ভ থেকে জন্মলাভ করেছে। নদির গর্ভ থেকে জন্ম নেয়ায় এ দেশের গাছপালা, পশুপাখি, লতাপাতা, বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য সবকিছুর সাথে নদি ও পানির যোগাযোগ অনেক গভীর। বাংলাদেশের আর এক নাম ভাটির দেশ। উজানে ভারত, নেপাল, ভুটান, চিন ইত্যাদি রয়েছে কিন্তু আমাদের ভাটিতে কোন দেশ নেই। ভাটিতে আছে সমুদ্র, বঙ্গোপসাগর। প্রধান নদিগুলোর প্রায় সব উৎপত্তিই উজানের দেশ ভারত, নেপাল কিংবা চিনে। আর অভ্যন্তরিণ নদিসমূহের প্রবাহেরও প্রধান উৎস হলো সেসব প্রধান প্রধান নদি। ফলে আমাদের নদি ও পানি প্রবাহের প্রায় পুরোটাই আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহের উপর নির্ভরশিল।
এইসব অভিন্ন নদি অববাহিকার দেশগুলোর মধ্যে উজানের দেশসমূহের ভূ-প্রাকৃতিক গঠন অনেকটা খাড়া, হিমালয় পর্বতমালা থেকে ক্রমশ ঢালু হয়ে নেমে এসেছে এবং বর্তমানে বাংলাদেশ বলতে যে অংশটিকে বোঝায় তার শুরু থেকে প্রায় সমতলভাবে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। আমাদের ভাটিতে সমুদ্র থাকায় আর ভ‚মির গড়ন সমতল হওয়ায় নদির ন্যূনতম প্রবাহ বা তলানি প্রবাহ হিসেবে যে পরিমান পানিপ্রবাহ উজানদেশের নদিসমূহের জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত হতে পারে, আমাদের নদিসমূহের বেলায় তা নয়। কারণ কৃষি, শিল্প, মৎস্য, নৌপথ, গৃহস্থালি, বাস্তুতন্ত্র, জৈববৈচিত্র্যের জন্য প্রয়োজনিয় পানি ছাড়াও সমুদ্রের লবণাক্ততাকে রুখতে স্রোতস্বতি নদি প্রয়োজন। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলশ্র“তিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে ভ‚-স্তর পরিগঠনের জন্যও বাঁধ-ব্যারাজ-ড্যামহিন পলিবাহি স্রোতধারা আবশ্যক।
উপরোক্ত বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশের নদির পানির প্রয়োজন যখন ক্রমশ বাড়ছে বাস্তবে পানির সরবরাহ তখন আশংকাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ভারত তার নিজদেশের কৃষি, সেচ ও জলবিদ্যুৎ এর প্রয়োজন দেখিয়ে যে নদি ও পানি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রতি মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদির মধ্যে ৫৪টি নদি হয় ভারতের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে অথবা ভারতে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে। উক্ত ৫৪টি নদির প্রায় প্রত্যেকটি নদির উপরে ভারত কোন না কোন বাঁধ, ব্যারাজ বা ড্যাম হয় নির্মাণ করেছে অথবা করতে শুরু করেছে অথবা করার পরিকল্পনা করছে। এসব পরিকল্পনার মধ্যে সবচেয়ে বিপৎজনক উদ্যোগ হলো আন্তঃনদি সংযোগ প্রকল্প, যা নামে নদি সংযোগ প্রকল্প হলেও প্রকৃতপক্ষে বেসিন সংযোগ প্রকল্প। এ-প্রকল্প ‘হিমালয়ান বেসিনে’র নদিগুলোর সাথে ‘পেনিনসুলার বেসিনে’র নদিসমূহের সংযোগ ঘটাবে। পৃথিবীর ইতিহাসে নদির গতিপথ পরিবর্তনের মাধ্যমে পানি ব্যবহারের যতো উদ্যোগের নজির আছে তার সবই একই বেসিন বা একই অববাহিকার মধ্যে সিমাবদ্ধ। এক অববাহিকা থেকে অন্য অববাহিকায় পানি সরিয়ে নেয়ার কোন নজির ইতিহাসে না থাকায় পানি বা নদি বিষয়ক আন্তর্জাতিক আইনে এ বিষয়ক কোনো বিধিবিধানও নেই। এ-উদ্যোগ যে প্রকৃতির বিরুদ্ধে এক অভ‚তপূর্ব অপরাধ এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এ-প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হিমালয় অঞ্চলের নদিসমূহের পানি, যা বাংলাদেশের নদ-নদির পানিপ্রবাহের অন্যতম প্রধান উৎস, তা অন্যত্র সরিয়ে নেয়ায় বাংলাদেশ যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা বলাই বাহুল্য।
ভারত তার উন্নয়নের দোহাই দিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সারা দেশের নদ-নদির উপরই বাঁধ নির্মাণ করেছে তবে এক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে পছন্দের এলাকা হলো বিভিন্ন আদিবাসি অধ্যুষিত উত্তর-পূর্ব অঞ্চল। এ অঞ্চলের বিভিন্ন নদির উপরে তারা বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে এবং আরো প্রকল্প বাস্তবায়নাধিন আছে। এই বাস্তবায়নাধিন প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্প হলো ‘টিপাইমুখ ড্যাম’। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি উপেক্ষা করে নির্মিতব্য এ ড্যামের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণ ব্যাপক প্রতিবাদ ও আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে।
টিপাইমুখ ড্যামবিরোধি আন্দোলন অব্যাহত থাকা অবস্থাতেই ভারত তিস্তার উপর নির্মিত ‘গজলডোবা ব্যারাজে’ পানি আটকে মহানন্দা নদি দিয়ে বিহারের মেচি নদিতে সেই পানি সরিয়ে নিচ্ছে এবং এই প্রকল্পর মাধ্যমে আন্তঃনদি সংযোগ প্রকল্পে (প্রকৃতপক্ষে বেসিন সংযোগ প্রকল্প) যে ৩০টি সংযোগ খাল খননের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে তার একটি সম্পন্ন করা হচ্ছে। বর্তমানে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে সে আন্দোলন নদি ও পানি সমস্যার অনেক দিককেই সামনে এনেছে সত্য, কিন্তু তিস্তার পানি সরিয়ে নেয়ার মাধ্যমে ভারত যে প্রকৃতি বিধ্বংসি কথিত আন্তঃনদি সংযোগ প্রকল্পের (বেসিন সংযোগ প্রকল্প) প্রথম পর্ব বাস্তবায়ন শুরু করেছে সে বিষয়টি আন্দোলনকারিদের নজর এড়িয়ে গেছে।
তিস্তা ও টিপাইমুখের সমস্যার চেয়েও পুরনো কিন্তু ক্রমশ তিব্র থেকে তিব্রতর হচ্ছে যে সমস্যা তার নাম ফারাক্কা বাঁধ সমস্যা। ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ভারতের নিয়মিত পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশের এককালের প্রমত্তা পদ্মা বর্তমানে মরাগাঙে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন চুক্তি ও চুক্তিহীনতার মাধ্যমে বাংলাদেশ যে পরিমান পানি বর্তমানে পাচ্ছে তাতে শুধু যে পদ্মা একটি মৃত নদিতে পরিণত হয়েছে তাই নয় পদ্মার উপর নির্ভরশিল অপরাপর নদিও মরতে শুরু করেছে। নদি মরলে কৃষি, সেচ, মৎস্য সম্পদ, নৌপথ ইত্যাদির ক্ষতিসহ ভ‚-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, প্রকৃতি, পরিবেশ ও জৈব-বৈচিত্র্যের যে ক্ষয়ক্ষতি সাধারণভাবে হয়, তা বাংলাদেশেও হয়েছে এবং হচ্ছে কিন্তু বাংলাদেশ ভাটির দেশ হওয়ার কারণে এর সাথে বিশেষভাবে যুক্ত হয়েছে উপক‚লের লবণাক্ততা। উপক‚লিয় লবণাক্ততার কারণে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। এই লবণাক্ততা থেকে বাংলাদেশের উপক‚লিয় এলাকা রক্ষা করার জন্য আমাদের নদিসমূহকে শুধুমাত্র ন্যূনতম প্রবাহ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখলেই চলবে না, প্রয়োজন স্রোতস্বতি নদি। সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার কারণে উপক‚লে যে লবণ পানি প্রতিনিয়ত প্রবেশ করে নদি তার স্রোতের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্ব তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে সেক্ষেত্রে স্রোতস্বতি নদির প্রয়োজনও উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে।
উপরোক্ত প্রধান প্রধান নদিসমূহ ছাড়াও প্রায় সবগুলো আন্তর্জাতিক নদির উপর কোথাও বাঁধ, কোথাও ব্যারাজ, কোথাও জলাধার নির্মাণের মাধ্যমে স্বাভাবিক পানি প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।

ভারতের সাথে বন্ধুত্ব আর দরাদরি
ভারতের সাথে আন্তর্জাতিক নদিসমূহের পানিপ্রবাহ নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য উভয় দেশের রাষ্ট্রিয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যৌথ নদি কমিশন রয়েছে, ১৯৭২ সালের ২৪ নভেম্বর উভয় দেশের মধ্যে সম্পাদিত মোট ৯টি ধারা সম্বলিত এ চুক্তিটিতে সংক্ষেপে দুইটি বন্ধুরাষ্ট্র তাদের অভিন্ন নদিসমূহকে উভয় রাষ্ট্রের জনগণের জন্য কল্যাণকর ব্যবহারের উদ্দেশ্যের কথা ঘোষণা করেছে। চুক্তিটিতে প্রধানত বন্যা নিয়ন্ত্রণের উপরই জোর দেয়া হয়েছে তবে সেখানে উভয় দেশের সরকার একমত হলে পানি-নদি বিষয়ক অন্য যেকোন সমস্যাই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার সুযোগও রাখা হয়েছে। এ কমিশনের আর একটি উলে­খযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো কমিশনের দুই পক্ষের মধ্যে মতদ্বৈততা দেখা দিলে উভয় দেশের সরকার পর্যায়ে দ্বি-পক্ষিয় আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করার বিধান রাখা হয়েছে। এ চুক্তিরও আগে ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদি যে ‘মৈত্রি চুক্তি’ সম্পাদিত হয়েছিলো তার ৬নং দফায় উভয় দেশ বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নদি অববাহিকা, জলবিদ্যুৎ ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য যৌথ গবেষণা ও পদক্ষেপ গ্রহণে সম্মত হয়েছিলো।
উপরোক্ত দুটি চুক্তি বলবৎ থাকা অবস্থায় ১৯৭৫ সালে ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন করে। পূর্ব থেকে চলে আসা আলোচনা সম্পন্ন হওয়ার আগেই বাংলাদেশের তৎকালিন রাষ্ট্রপ্রধানের সম্মতিতে একটি যৌথ প্রেস রিলিজ জারি হয়। ভারত পরিক্ষামূলকভাবে ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে অর্থাৎ ৪১দিন সময়কালের জন্য ১১০০ কিউসেক থেকে ১৬০০ কিউসেক পানি প্রত্যাহারের সুযোগ পায়। পরবর্তিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর এ বিষয়ে ভারত কোন চুক্তিতে আসা ছাড়াই পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রাখে। দ্বি-পক্ষিয় সমাধানে ব্যর্থ বাংলাদেশ বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘে উত্থাপন করে। পরবর্তিতে ১৯৭৭ সালে মুরারজি দেশাই এবং জিয়াউর রহমান সরকারের মধ্যে ৫ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর সম্পাদিত এ চুক্তিটির মেয়াদ ১৯৮২ সালে সমাপ্ত হওয়ার পর ভারত আর এ চুক্তি নবায়নে রাজি হয়নি। বাংলাদেশে এ সময় ক্ষমতাসিন এরশাদ সরকার ভারতের সাথে একটি ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ সম্পাদন করে এবং পরবর্তি দুইবার তা নবায়ন করে। কোনরকম চুক্তির অবর্তমানে ভারত একতরফাভাবে ইচ্ছামতো পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশ এইসময়কালে সবচেয়ে কম পানি পেয়েছে। সামরিক শাসনের অবসানের পর নির্বাচনে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাসিন হওয়ার পর এ বিষয়ে পুনরায় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের দেবগৌরা সরকারের সাথে ৩০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি সম্পাদন সম্পন্ন হয়। ১২টি অনুচ্ছেদ ও দুইটি তফসিলে বিভক্ত এ চুক্তির ৯নং অনুচ্ছেদে ‘অপরের ক্ষতি না করা এবং ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ততার’ নীতির ভিত্তিতে গঙ্গার বাইরে অপরাপর অভিন্ন নদির পানিবণ্টনের ক্ষেত্রেও অনুরূপ চুক্তি সম্পাদনের অঙ্গিকার করা হয়েছে।
১৯৭২ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত সম্পাদিত সকল চুক্তির মধ্যে ১৯৭৭ সালে সম্পাদিত চুক্তিটিতেই শুধু গ্যারান্টি ক্লজ ছিলো এবং অত্যন্ত স্বল্পমেয়াদি এ সময়কালেই পানি প্রশ্নে বাংলাদেশ প্রতিশ্র“তি মোতাবেক তার হিস্যা বুঝে পেয়েছে। বর্তমানেও ভারতের সাথে বাংলাদেশের যৌথ নদি কমিশন এবং ফারাক্কা চুক্তি বহাল আছে এবং চুক্তি অনুযায়ি প্রতি তিনমাস অন্তর কমপক্ষে একবার নদি কমিশনের বৈঠকে মিলিত হওয়ার কথা রয়েছে, উভয়দেশ পানি ব্যবস্থাপনায় অন্যের ক্ষতি না করার জন্য অঙ্গিকারাবদ্ধ রয়েছে কিন্তু বাস্তবে ভারত সেসব শর্তের কোনোটিই মানছে না। প্রকৃতপক্ষে, ভারত টিপাইমুখ প্রকল্প কিংবা তাদের ভাষায় আন্তঃনদি সংযোগ প্রকল্প সম্পর্কে বাংলাদেশের মতামত গ্রহণ, কিংবা এসব প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে যৌথ সমিক্ষা তো দূরের কথা এইসব প্রকল্প সম্পর্কে বাংলাদেশকে কোন তথ্যই সরবরাহ করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ভারত মুখে দাবি না করলেও আন্তর্জাতিক নদির পানি নিয়ে এমন আচরণ করছে যাতে দেখা যাচ্ছে ভারত এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও আইনকানুনের তোয়াক্কা করছে না এমনকি বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে যেসব চুক্তি বিদ্যমান রয়েছে তাও তারা প্রতিপালন করছে না ।

আন্তর্জাতিক কনভেনশন বৃত্তান্ত
১৯৬৬ সালে গৃহিত ‘হেলসিঙকি রুলে’ ভ‚-গর্ভস্থ পানি ব্যবহারের বিষয়ে কোন নীতিমালার উলে­খ না থাকার বিষয়টি ‘জাতিসংঘ’র নজরে আসার পর ১৯৭০ সালে পানিপ্রবাহ সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা তৈরির জন্য ‘ইণ্টারন্যাশনাল ল কমিশন’কে দায়িত্ব দেয়া হয়। কমিশন ১৯৯৪ সালে তাদের প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার পর জাতিসংঘের ৬ষ্ঠ কমিটি উপরোক্ত কনভেনশনের খসড়া প্রস্তুত করে এবং ১৯৯৭ সালের ২১ মে প্রস্তাবটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কতৃক ১০৬ ভোটে গৃহিত হয়, প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট পড়ে তিনটি। ভারত ও পাকিস্তান ভোট প্রদানে বিরত থাকে। বাংলাদেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। একটি অনবদ্য ভ‚মিকা, ৩৭টি অনুচ্ছেদ এবং আরবিট্রেশনের পদ্ধতিসহ একটি পরিশিষ্ট সম্বলিত এ কনভেনশনের ৩৬নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ৩৫টি সদস্য দেশের অনুসমর্থনের (‘র‌্যাটিফিকেশন, একসেপটেনস, এপ্রোভাল বা একসেসনস’) ৯০দিনের অব্যবহিত পর থেকে এটি কার্যকর হবে। ২০১৪ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে কোস্টারিকা ৩৪তম দেশ এবং ১৯ মে ভিয়েতনাম ৩৫তম দেশ হিসেবে অনুমোদনের পর, অপর শর্ত অনুযায়ি ১৭ আগস্ট থেকে তা কার্যকর হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়কর সত্য হলো এই, বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত কনভেনশনটিকে র‌্যাটিফাই বা অনুসমর্থন করেনি।
আন্তর্জাতিক পরিসরে পানি ও পরিবেশ বিষয়ে যেসব বিরূপ প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যে দৃশ্যমান এবং সমস্যার সমাধানে যেসব আইন-কানুন তৈরি হয়েছে সেসব বিষয়কে বিবেচনায় রেখে পানির আন্তর্জাতিক ন্যায্য ব্যবহার জাতিসংঘের মূলনীতির আলোকে সমাধান করার লক্ষ্য নিয়ে এ আইনটি তৈরি করা হয়েছে। ভ‚মিকার বাইরে কনভেনশনটি ছয়টি ভাগে বিভক্ত। ১ থেকে ৪নং অনুচ্ছেদ নিয়ে গঠিত প্রথম ভাগে কনভেনশনের আওতা, টার্মসের ব্যবহার, পানিপ্রবাহ চুক্তিসমূহ এবং চুক্তির পক্ষসমূহের বিষয়ে বলা হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগ হলো সাধারণ নীতিমালা। এইভাগে অনুচ্ছেদ ৫ থেকে ১০ এর মধ্যে পানিপ্রবাহের ‘ন্যায়ানুগ এবং যুক্তিসঙ্গত ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবহার’, এইসব ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ উপাদানসমূহ, অন্যের গুরুতর ক্ষতি না করার দায়িত্ব, সহযোগিতামূলক আচরণের সাধারণ নীতিমালা, নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। চুক্তির তৃতীয় ভাগ হলো পরিকল্পিত পদক্ষেপ সংক্রান্ত। অনুচ্ছেদ ১১ থেকে ১৯ পর্যন্ত বিস্তৃত এ অধ্যায়ে কোন বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন হলে অপরপক্ষকে জানানো, এইসব পদক্ষেপের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা, জবাবদানের সম্ভাব্য সময়সূচি, পদক্ষেপ গ্রহণকারি পক্ষের অন্তবর্তিকালিন আচরণ, জবাবদানকারিদের জবাবদান, পক্ষসমূহের মধ্যে পরামর্শ ও মতভেদ হ্রাস, নোটিশ প্রদান না করা হলে সে ক্ষেত্রে সমস্যা সমাধানের উপায় এবং জরুরি অবস্থায় পদক্ষেপ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কি ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে সেসব বিষয়ের উলে­খ করা হয়েছে। পাঁচ নং অধ্যায়ে অনুচ্ছেদ ২০ থেকে ২৬ এর মধ্যে মূলত আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহের সংরক্ষণ, রক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, দূষণ হ্রাসকরণ, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কোন নতুন প্রাণি ঐসব প্রবাহে অন্তর্ভুক্ত না করানো, সমুদ্র ও উপক‚লের পরিবেশ রক্ষা করার ব্যবস্থা গ্রহণ, পানিপ্রবাহের ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনিয় বিধিবিধান প্রণয়ন, এবং প্রয়োজনিয় স্থাপনা গড়ে তোলার বিষয়সমূহ নির্ধারণ করেছে। ৬ষ্ঠ অধ্যায়ের দুইটি অনুচ্ছেদে ক্ষতিকর পরিস্থিতি হ্রাস কিংবা বন্ধ এবং জরুরি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ৭ম অধ্যায় হলো বিবিধ। এ অধ্যায়ে যুদ্ধকালিন সময়ে আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহ ব্যবস্থাপনা, পরোক্ষ পদ্ধতি, জাতিয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট তথ্যাবলি, বৈষম্যমূলক আচরণ রোধ, বিরোধ নিষ্পত্তি ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হয়েছে। সবশেষে স্বাক্ষর, অনুসমর্থন, কার্যকারিতা শুরু ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে।
উপরোক্ত বিষয়সমূহের সকল দিক নিয়ে এক্ষেত্রে আলোচনার সুযোগ নেই তবে কয়েকটি গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্নে সংক্ষেপে হলেও কিছুটা আলোকপাত প্রয়োজন। পূর্বেই উলে­খ করা হয়েছে কনভেনশনের ২য় অধ্যায় হলো সাধারণ নীতিমালা সংক্রান্ত। এ অধ্যায়ের ৫নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- কোন দেশ আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহের যে অংশ তার ভ‚-খণ্ডের মধ্যে পড়েছে তার ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘ন্যায়ানুগ ও যুক্তিযুক্ততার নীতি’কে মেনে চলতে হবে। নির্দিষ্ট করে বলা যায় একটি আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহ এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে যাতে সংশ্লিষ্ট দেশসমূহ সর্বোচ্চ উপকার পায় এবং একইসাথে পানিপ্রবাহটি যথেষ্ট সুরক্ষা পায়। অনূচ্ছেদ ৬ তে পানিপ্রবাহের ব্যবহারে ৫নং অনুচ্ছেদে ঘোষিত ‘ন্যায়ানুগ ও যুক্তিযুক্ততার নীতি’ মানা হচ্ছে কি-না তা নিরূপনে যেসব বিষয়কে বিবেচনায় নিতে হবে তা নিম্নরূপ-
১) সংশ্লিষ্ট দেশের ভ‚-প্রকৃতি, জলসম্পদ, জলধারা, জলবায়ু, বাস্তুতন্ত্র এবং পরিবেশের স্বাভাবিকতা বজায় রাখার জন্য আর যা কিছু বিবেচ্যে;
২) সংশ্লিষ্ট দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাহিদা;
৩) আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহের উপর নির্ভরশিল জনসংখ্যার পরিমাণ;
৪) সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের মধ্যে একদেশের ব্যবহারের কারণে অন্যদেশের উপর তার প্রতিক্রিয়া;
৫) বিদ্যমান ব্যবহার এবং সম্ভাব্য ব্যবহারের উপযোগিতা;
৬) সংশ্লিষ্ট পানিপ্রবাহটিকে অক্ষত রাখা, সুরক্ষা করা এবং এর উন্নয়নের জন্য খরচ এবং এর ব্যবহারের অর্থনীতিক মূল্য এবং উপরোক্ত ক্ষেত্রে যে সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তার অর্থমূল্য;
এবং ৭) বিদ্যমান ব্যবহার বা সম্ভাব্য ব্যবহারের বিকল্প আছে কি-না তা দেখা এবং থাকলে তার তুলনিয় মূল্যমান;
উপরোক্ত সবগুলো উপাদানকে একসাথে বিবেচনা করতে হবে, এবং এইসব উপাদানের তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।
উপর্যুক্ত ৫ ও ৬ নং ধারা দুইটি আমাদের খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে। এবং এই দুইটি ধারার আলোকে বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন নদিসমূহের পানিপ্রবাহের বিদ্যমান ব্যবহার এবং পানির প্রাপ্যতা, ভারতের গৃহিত পদক্ষেপসমূহের প্রতিক্রিয়া কি হচ্ছে এবং তার ঘোষিত এবং অ-ঘোষিত সম্ভাব্য পদক্ষেপসমূহের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে, তা পর্যালোচনা করা একান্ত আবশ্যক। এসবের নির্মোহ, বস্তুনিষ্ঠ এবং আন্তর্জাতিক মহল কর্তৃক স্বিকৃতিযোগ্য পর্যালোচনার ফলাফল থেকেই বুঝতে হবে ভারতের সাথে পানিপ্রবাহ নিয়ে বিদ্যমান দর কষাকষিতে সম্ভাব্য পানিপ্রবাহ আইন আমাদের সহায়ক হবে কি-না।
উপরোক্ত ধারাসমূহের সাথে আর যে যে ধারাসমূহ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তার একটি হলো ৭নং ধারা, এতে বলা হয়েছে-আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ ব্যবহারকারি কোন একটি দেশ তার নিজের এলাকায় বহমান অংশটি যখন ব্যবহার করবে তখন অপর দেশটির যাতে ‘উলে­খযোগ্য’ ক্ষতি না হয় তার জন্য সকল প্রয়োজনিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। যেক্ষেত্রে এরকম ক্ষতি সংঘটিত হয়েছে সেক্ষেত্রে ৫ ও ৬ নং ধারার উলে­খিত নীতিমালার আলোকে তা দূর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, উপযুক্ত ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের আলোচনা করতে হবে ।
গুরুত্বপূর্ণ দুইটি ধারা হলো ২০ ও ২৩ নং ধারা। ২০ নং ধারায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশসমূহকে আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহের বাস্তুতন্ত্র (‘ইকোসিস্টেম’) কে রক্ষা করতে হবে। ২৩নং ধারায় বলা হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ সংশ্লিষ্ট দেশসমূহকে, এককভাবে, প্রয়োজনিয় ক্ষেত্রে যৌথভাবে কোন আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ, যা সমুদ্র এবং উপক‚লের পরিবেশের জন্য প্রয়োজনিয়, তা রক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বিকৃত বিধিবিধান এবং মানদণ্ড অনুযায়ি প্রয়োজনিয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’
আলোচিত দুইটি ধারার সাথে ২৭নং ধারাটিও গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে, এই ধারায় সংশ্লিষ্ট দেশসমূহকে একক বা যৌথভাবে আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহকে সে সমস্ত অবস্থা থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনিয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে যা প্রাকৃতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট কারণে বন্যা, খরা, ভূমি-ভরাট, ভূমিক্ষয়, লবণ পানির অনুপ্রবেশ, মরুকরন বা পানিবাহিত রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
ভ‚-গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত আশংকাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে, তার অর্থ হলো সেচ, খাবার পানি বা অন্যান্য প্রয়োজনে যে পরিমান পানি আমাদের চাহিদা মেটাতে উত্তোলন করতে হচ্ছে তুলনামূলকভাবে তার পুনঃভরন হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করার কারণে আমাদের ভ‚-গর্ভস্থ পানি পুনঃভরন প্রক্রিয়া যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এ বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপনের অধিকার এ আইনেই অনুচ্ছেদ ২এ প্রথমবারের মতো প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ কনভেনশনে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ৩৩নং ধারায় বর্ণিত বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি। এই ধারায় ৩৩(২)তে বলা হয়েছে যদি পক্ষসমূহ নিজেরা কোন বিরোধিয় বিষয় নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হয় তবে তারা বর্ণিত পদ্ধতি অনুযায়ি আরবিট্রেশন অথবা আন্তর্জাতিক আদালতের স্মরণাপন্ন হতে পারবে। কনভেনশনের পরিশিষ্ট হিসেবে ১৪টি আর্টিকেল সম্বলিত একটি আরবিট্রেশন গাইডলাইনও দেয়া হয়েছে, যা প্রস্তাবিত আইনটিকে পূর্ণতা দিয়েছে বলা যায়।
আলোচ্য কনভেনশনের যেসব অনুচ্ছেদ ভারতের সাথে পানি বিরোধ নিষ্পত্তিতে বিশেষভাবে আমাদের কাজে আসতে পারে সংক্ষেপে সেসব দিক এখানে তুলে ধরা হয়েছে। উলে­খ করা প্রয়োজন বর্তমান প্রেক্ষাপটে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে হওয়ায় যেসব বিষয় আমরা এ পর্যায়ে আলোচনা করিনি সেসব বিষয় আসলে সবসময়ের জন্যই কম গুরুত্বপূর্ণ এরকম নাও হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ২১ অনুচ্ছেদের কথাই বলা যেতে পারে-অনুচ্ছেদটিতে আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করার দায়-দায়িত্বের বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। পানির তিব্র সংকটের কারণে বর্তমানে সকল দাবি-দাওয়া ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের মধ্যেই সিমাবদ্ধ কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে যদি দেখা যায় উজানের দেশসমূহ হতে যে পানি নদিতে আসছে তা মারাত্মক দূষিত তখন ২১ অনুচ্ছেদই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শেষকথা
সার্বিক বিবেচনায় আলোচ্য কনভেনশনটি আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহের উপর ভাটির দেশের অধিকারের একটি রক্ষাকবচ। আন্তর্জাতিক আইনে নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের প্রাচিন ধারণার সমর্থকরা আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহের উপর একচেটিয়া কর্তৃত্বের যে অযৌক্তিক ধারা বজায় রেখে ভাটির দেশসমূহকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চায়, আলোচ্য কনভেনশনটি তার বিরুদ্ধে আধুনিক বিশ্ববিবেকের এক সম্মিলিত প্রতিবাদ।
বাংলাদেশকে এ কনভেনশন অবিলম্বে অনুসমর্থন করা উচিত প্রথমত এ জন্য যে, এটি ন্যায্য। দ্বিতীয়ত এজন্য যে, এটি প্রকৃতি রক্ষার পক্ষে। তৃতীয়ত এ জন্য যে আধুনিক বিশ্বচেতনা এর স্বপক্ষে। এবং শেষ পর্যন্ত এ জন্য যে, এটি দেশ, দেশের মানুষ, গাছপালা, লতাপাতা পশুপাখি, ঝোপজঙ্গল, খালবিল, নদিনালা, আউলবাউল, জারি-সারি ভাটিয়ালি সকল কিছুর একান্ত পক্ষে।
এ কনভেনশন কার্যকর হলেই আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে কিংবা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আদালতে পৌঁছে যাবে কিংবা আন্তর্জাতিক আদালতে বিষয়টি উত্থাপন করা গেলেই আমরা আমাদের ন্যায্য হিস্যার পক্ষে রায় পেয়ে যাবো বিষয়টি মোটেও সে রকম নয়। তবে ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের জন্য আমাদের যে সুকঠিন লড়াই অব্যাহতভাবে চালিয়ে নিতে হবে সেই লড়াইয়ে যে সব হাতিয়ার শক্তি যোগাতে পারে নিঃসন্দেহে আলোচ্য কনভেনশন হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালি হাতিয়ার।

শেয়ার করুন: