004634
Total Users : 4634
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →
জন্ম— জুন, ০৬, ১৯৭৭। জন্মস্থান— উত্তর গোবীন্দর খীল, হাঁদু চৌধুরী বাড়ী, পটিয়া, চট্টগ্রাম। (শৈশব কৈশোর ও তারুণ্যের সময়যাপন) বেড়ে ওঠা (পূর্ব্ব বালিয়াদী, মীরশ্বরাই, চট্টগ্রাম) নানার বাড়ীতে। প্রকাশিত কবিতার বই— ফুলেরা পোষাক পরে না (সাল: ২০১৮, প্রকাশক : মনফকিরা, কলিকেতা)। প্রকাশিতব্য বই— অর্দ্ধনারীশ্বরবাদ : প্রকৃতিপুরুষতত্ত্ব (নন্দনতত্ত্ব), বটতলার বয়ান (ভাষাতাত্ত্বিক গদ্য) ও উদ্ভিদপ্রতিভা (কবিতা)। সম্পাদক— চারবাক।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

টুনুর গৃহস্থালি ও চাঁন মিঞার বিপ্লব

দুপুরে ভাত খাওয়ার পর গোয়ালঘরের দরজার পাশের খুপরিটায় মাচানের উপর পা তুলে বসতেই দুইচোখে ঘুমের ঢল নামে। মাথাটা ঝিম ঝিম করতে থাকে। পিছনের নারিকেলগাছের মাথায় বসে তখন তৃষ্ণায় গলাঝেড়ে কর্কশ চিৎকার করছে গোটাদুয়েক দাঁড়কাক। রোদের যে তিব্রতা তাতে বুঝি মাথার ঘিলু চুলে মাখানো তেলের সাথে চুইয়ে চুইয়ে গলে পড়বে। টুনুর চোখে ঘুম ক্রমশ জড়িয়ে আসে। অন্যদিন হলে কাড়াল নিয়ে বা ঢিল ছুঁড়ে কাক দুটিকে এলাকাছাড়া করতো। কিন্তু ঐ কর্কশ চিৎকারও এখন তার কানে ঢুকে মুহূর্তেই মিলিয়ে যাচ্ছে। কাঁঠালের বিচি আর কচুর লতি দিয়ে ঝাল ঝাল করে রান্না-করা চেপা শুটকির তরকারি দিয়ে আজ ইচ্ছেমতো ভাত ঢুকিয়েছে পেটে। কচুর লতি দিয়ে মাখানো ভাতের পিছল নলা একেবারে নেমে যায় পাকস্থলি বরাবর, চাবানোর কোনো কাজ নেই। ফলে এতে অল্প সময়েই পেটে গিয়ে জমা হয়েছে ভাতের স্তূপ। পেটটা ফুলে এখন পটকা মাছের মতো ঢোল হয়ে আছে। মনে হয়, গোটা শরীরটিকে নিয়ে ঢোলটি গভীর কাদার পাঁকের নিচে একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছে। শত চেষ্টা করেও টুনু মাথাটা সোজা ধরে রাখতে পারে না। ‘গিরস্থ কুন বালডা ফালায় ফাল্যাক’ বিড়বিড় করে সে শরীরটা ছেড়ে দেয় সোজা মাচানের উপর।
চোখটি বুঝি একটু লেগে এসেছে, নাকি সত্যি সত্যিই সে ঘুমিয়ে পড়েছে-এমন সময় গৃহস্থের বউ কাপড় নাড়তে দহলে আসে। ডানে-বাঁয়ে চারপাশ চোখ বুলিয়ে এমনকি দু’কদম এগিয়ে স্কুলঘর অবধি চোখ রেখে না-পেয়ে উঁকি দেয় ছোট্ট খুপরিটিতে। দৃশ্য দেখেই তার মেজাজ সপ্তমে উঠে। বাড়ির ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে চড়া গলায় স্বামিকে শোনায়:
‘প্যাট ভইরে খাওয়ায়ে দিলাম, দেহ কেমুন নিমকখারাম। নাক ডাইক্যা দিছে ঘুম। কুন বিবেক আছে?’
‘কেঠা?
‘কেঠা আবার, তুমার আতুড় কামলা’Ñ ঝাঁঝের সাথে সে স্বামির প্রশ্নের প্রতিধ্বনি তোলে। ‘কাম পায় নাই একটা অপদার্থরে বারিত থুইছে। ঐ ছেরা অইছে ফাঁকিবাজ। অর কামের কুন আগ্রহ আছে-গরুর চাড়িত তলানি পড়ছে আর ছেরা দিছে ঘুম!’
‘নাহ, এই শালা ত মাইনসের জাত না। শালায়ে গরুর চারি দেখবো না।’ গৃহস্থ বিরক্তিতে মুখ বাঁকায়।
‘দেকবো ক্যা। যেমুন গিরস্ত তেমুন কামলা। গিরস্ত শক্ত অইলে কামলার তাগত আছে দিনে দুফুরে ঘুমাবার যায়। শাসন যহন নাই, ছেরা আল­াদ পায়্যে এহন গিরস্তের ঘারে উঠছে। ছেরার কি দুষ?’
‘কাউ কাউ শুরু করছে, যা ত, কইলেম না তুইল্যে দিতাছি’Ñ নুরু মণ্ডল বিরক্ত হয়। কামলার কি দোষ’ তার নিজের চোখেও তো রাজ্যের ঘুম লেপ্টে আছে। দহলে পা রেখেই নুরু মণ্ডল ডাক দেয়, ‘টুনু, ঐ টুনু তুই কুঠায় রে !’
গৃহস্থের এক ডাকেই টুনু ধড়ফড় করে উঠে বসে। গরমে-ঘামে মজে আঠালো হয়ে যাওয়া ঘুমটার মধ্যেই সে গৃহস্থের স্বরটিকে বিশ্লেষণ করে ফেলেছে। সাথে সাথে ঢোক গিলে মাদা মাদা গলায় জবাব দেয়, ‘আহি।’
‘আ-হি-ই’ নুরু খিঁচিয়ে ওঠে। ‘শালায়ে এই দিনে দুফুরে ঘুমাইছে? এই শালা ত আমারে ফতুর করবার আইছে গো!’ টুনুকে খুপরি থেকে বের হতে দেখে গলার আওয়াজ দেয় আরও চড়িয়ে-
‘শালা গরুগুল্যারে মারবো? চুৎমারানির পুলা দিনে দুফুরে যে গুমাবার গেলি গরুর চাড়িত খেরপানি দিছস? এ্যাই শালা, তরে কি বেবাক কয়্যে কয়্যে করান লাগবো?’
টুনু অন্যদিকে মুখ করে লুঙ্গির গিঁট বেঁধে কলসি নিয়ে কুয়াপাড়ে যায়। সে জানে তাড়াতাড়ি কাজগুলো করার মাধ্যমেই গৃহস্থ আর গৃহস্থের বউকে ঠাণ্ডা করতে হবে। ‘সত্যিই তো সে কেমুন চসমখুর গো নিজের প্যাটটা ভইরেই দিছে ঘুম, গরুর দিকে হুশ আছে। গাইল পারবো না তো আদর করবো?’ দ্রুত খড়-বিচুলি-ঘাস লবণসহ চাড়িতে মিশিয়ে দেয়। নুরু সেদিকে তপ্ত চোখে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বাড়ির ভিতরে চলে যায়।
‘এটুক কামের জন্যে এ্যত ঝাল, এহন কামের কুন বালডা আছে?’ টুনু বিরক্ত হয় এবং লুঙ্গির গিঁট দিয়ে গালের লালা মুছে। ঘুমটা কেবলই জমে আসছিল। তারই ভুল হয়েছে ঘুমানোর আগে যদি গরুর চাড়িটা দেখে আসতো তাহলে এত কথা হতো না। কিন্তু অলসভাবে কাঁঠালগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে পরমুহূর্তেই ভাবে-না না, তা হলেও গৃহস্থের বউ ঠিকই চেঁচামেচি করতো। ‘কেমুন আজরাইল মেয়েমানুশ তুই, মাইনশের একটু আরাম সহ্য করবার পারস না।’ টুনু বিড়বিড় করতে থাকে।
করার কারণও আছে। আমন লাগানোর সপ্তাহ দুয়েক হল। তখন ইচ্ছে থাকলেও দম ফেলানোরও কোনো উপায় ছিলো না। আর তার আগে পাটের কাজ! পাট ঘরে তুলতেই তো তার জান-জীবন বুঝি অর্ধেক ক্ষয় হয়ে গেছে। অবশ্য ওসব ভারি কাজের সে যোগালি মাত্র। গৃহস্থও জানে তার বছরবান্ধা কামলার দৌঁড় কদ্দুর। বেশি চাপ দিলেই ছিঁড়ে পালাবে। তারপরেও কি কম কষ্ট! একটু অবসর যদি জুটেছে তা এই চার-পাঁচ দিন থেকে। এর ফাঁকে ফাঁকে টাল নিড়ানো, নতুন টালের জমি তৈরি করা, পাট হাটে নেয়া-এসব কাজতো আছেই। যদিও অত বেশি কাজ টুনুর ধাতে সয় না। ‘এইডাই অইছে গিরস্তের বউয়ের জ্বালা। দুই একটা দিন একটু আরাম করলে কি ক্ষতি? ছুটলুকের বাচ্চা না অইলে কেউ এভাবে খেউ খেউ করে।’ টুনু বিরক্তিতে মুখ ভার করে।
‘যুদি কই চাছি এহন তো কুন কাম নাই, এট্টু ঘুইরে আহি’-শুনামাত্র চিকন বাজখাই গলায় চিল­ায়ে উইঠে কবো, “কেরা কইলো কাম নাই। কুয়ের দড়িটা কহন যে ছিরে পড়ে! একটা দড়ি বুনবার পাস না। সব কাম তরে কয়ে কয়ে করানে লাগবো?” বা বলবে, “জাংলির খুটিগুল্যা নড়বড় করে দেহস না? কাম বলে নাই! কামচুরা ছেরার কতা দেহ!”

২.
টুনু জানে তার দুর্বলতা কোথায়। বেশি কাম-কাজ আসলেই তার ধাতে সয় না। সেজন্যে মা তারে সরকারবাড়িতে রাখে নাই। আতা সরকারের যত বড় গৃহস্থি তাতে সে সাতদিনও টিকতে পারতো না। নুরু মণ্ডলের জমি কম, কাজও কম। গৃহস্থ তাকে বেশ স্নেহ করে। বাচ্চা তিনটিও টুনুচাচা বলতে অজ্ঞান। শুধু গৃহস্থের বউটাই কারণে-অকারণে চেঁচামেচি করে। সেদিন টালে নিড়ানির ফাঁকে ফাঁকে সরকারবাড়ির কামলাদের সাথে টুনু রসালাপ করছিল। টুনুর গল্প জমানো দেখে ওরা ফোঁড়ন কাটে:
‘বালাই চাখরি পাইছস। যে রসের আলাপ জুরছস, তর কাম নাই?’
‘কাম, আর কি কাম থাকবো?’
‘সব কাম শেষ?’
‘হ, শ্যেষই তো। সুময়মুত কাম করলে কাম শ্যেষ অব না?’
‘চেঠুর কতা হুন! পাইছস ত নুরুরে। আমগরে গিরস্তের পাল­ায় পড়লে বুজতি গপ্প কারে কয়। পুটকি দিয়্যে নাল সুত্যে বারাইতো।’
‘গপ্প ত থাকবোই। আমার গিরস্ত ছুট, কামও কম। বড় গিরস্ত দিয়ে কি করমু, বড় গিরস্ত আমারে জমি লেইখ্যে দিব?’
‘হ হ তরই বালা বুদ্দি’, বলে টুনুর দিকে বিড়ির মুথা ছুঁড়ে দেয়। ‘শালা যেমুন অকর্মা গিরস্ত, তেমুন অকর্মা কামলা’, বলে ওরা ফিক করে হাসতে হাসতে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে।
টুনুর মনে হিংসা নেই। সমাজ-সংসারের জটিল হিসাব, কাজ-কারবার সে বুঝতে চায় না। কাজের মধ্যেও সে ফূর্তি খোঁজে। ঘাস ছিলতে বা বাঁশপাতা আনতে গেলে মনের সুখে গান ধরে। টুনু গান-পাগল। বাজারে বয়াতি গান হলে সে রাত জেগে গান শুনে। গৃহস্থের বউয়ের সাধ্য নেই তখন তাকে আটকায়। বয়াতিদের অঙ্গভঙ্গি ও সুর নকল করে এবং পরে তা অভিনয় করে গেয়ে শুনায় গ্রামের উৎসুক ছেলেমেয়েদের। সে জন্য টুনুর সাথে গ্রামের সব বয়েসি ছেলেমেয়েদের ভাবই আলাদা। মূলত গ্রামে টুনুর কোনো শত্র“ নেই।

৩.
এখন ঘুমের লেশমাত্র নেই। বেলা একটু একটু করে পড়তে শুরু করেছে। রাতের বাকি কাজটুকু এখন সারতে হবে। টুনু গোয়ালঘরে ঢুকে খড় ছড়িয়ে দেয়। গোয়ালঘরের এককোণে ধোঁয়ার আয়োজন করে। ইদানিং খুব মশার উৎপাত। ধোঁয়া একটু কম হলেই গরুগুলো মশার কামড়ে সারারাত দাপাদাপি করে। সন্ধ্যায় কলা আর লেবু নিয়ে বাজারে যেতে হবে। যে ক’টা টাকা হবে তুলে দিবে গৃহস্থের হাতে, গৃহস্থ সদাই-পাতি কিনে দিবে। ফেরার সময় গৃহস্থের বাকি দোকান থেকে চার আনার বিড়ি নিয়ে ছুটবে বাড়ির পথে। সরকারপাড়া থেকে বাজার পাক্কা আধামাইল দূরে। কিন্তু দিনশেষে বাজারে যেতে কারও বিরক্তি বা ক্লান্তি লাগে না। দিনের কাজ শেষে বাজারটাই তাদের বিনোদনের শ্রেষ্ঠ স্থান।
গোয়ালের কাজ শেষ হতেই টুনু গৃহস্থের বউকে বলে, ‘চাছি বেলা ত আছে ছিপট্যে নিয়্যে যাই?’
‘কই?’
‘সরকারবাড়ির পিছনের কুড়াটাত।’
‘কিছু কব না?’
‘কি কব, সবাই ছিপ ফেলায়।’
‘মাছ জানি বারিত আহে। খালি সুময় নষ্ট করা যানি না অয়!’
‘দেহ ত কতা। মাছ আমার ছিপে ঠুকর দিলে কি আমি কমু আহিস না?’
‘এই ছ্যারা পেছাল পারবি ন্যা। গেলে তারাতারি যা। কলা নিয়্যে বাজারে যাওয়া নাগবো, হুশ যানি থাহে।’ মেয়ের মাথা বিলি দিতে দিতে ফিক করে হেসে বলে, ‘এ্যাত ফাসেক!’
‘হ, টপ কইরেই আমু’Ñ বলে টুনু বাড়ির পিছনে ক্ষেতে যায় চিকন কেঁচো খুড়তে। চিকন কেঁচোতে শিং-টেংরা সমানে ওঠে।

৪.
সরকারবাড়ির পাশ দিয়ে জংলা পথটি ধরে আগাতে থাকলে কিছুদূর গিয়ে পথটা শেষ হয়। নেমে যায় ঢালু সরু একটা আইলের মতো পথ। আইলের দুই পার্শ্বে ধানক্ষেত, আর ক্ষেতের দুই ধারে ভাটপাতা-লজ্জাবতির জঙ্গল। এর মাঝে মাঝে দু’একটা বড় গাছ। সেই আইল বরাবর কয়েক গজ আগালেই বাবলার ঝোপে ঘেরা মাঝারি আকারের একটি কুড়া। কুড়ার ওপাশটায় ক্ষেতের পর ক্ষেত। তার পার্শ্বে বিল। আগে হয়তো এ জায়গাটিও বিল ছিল। সেই বিলে বর্ষার পানির স্রোতে গর্ত হয়ে এই কুড়ার সৃষ্টি।
আজ আর কেউ নেই দেখে টুনু স্বস্তিবোধ করে, ‘যাইক কিছুখন তাইলে চুপে চুপে মাছ ধরা যাবো।’ কুড়ার ওপাশটায় দু’তিনটে মাছরাঙা ঘুর ঘুর করতে করতে বাবলার ঝোপে গিয়ে বসে, ওদেরও লক্ষ্য মাছ। কায়দামতো একটা জায়গায় বসে সে বড়শি ফেলে পাতাকাঠির দিকে তাকিয়ে থাকে। টেংরা বা শিং-মাগুর হলে একটানে পাতাকাঠিটা টেনে নিবে পানির তলে। তখনই এক ঝাটকায় টানতে হবে ছিপ।
পাতাকাঠি অনেকক্ষণ নড়ানড়ি করে না। খানিক পর হঠাৎ টান পড়তেই দেয় খুট। গেঁথে ফেলে একটা মাঝারি সাইজের মাগুর। টুনুর মাছ ধরার উৎসাহে জোয়ার আসে। মাছটা মাগুর না হয়ে টেংরা-পুটি হলে সে এত খুশি হতো না। কেননা আর যদি না-ও পায় তবু এই একটা দিয়েই গৃহস্থের বউকে খুশি করা যাবে। টুনু ছিপের মাথা দিয়ে পানিটা ঘুলটে দিয়ে ছিপ রেখে বিড়ি ধরায় এবং সুখটান দিয়ে ধুঁয়া ছাড়ে। হঠাৎ তার বাপের কথা মনে পড়ে। বাপ ছিল তার মাছ ধরার ওস্তাদ। কিন্তু মাছ ধরার সময় তার কোথায়? সপ্তাহে প্রায় সাতদিনই সকালে উঠে সে দৌঁড়াতো জামালপুর শহরে। একটানা দশ-বারো দিন ব্যবসা করার পর দুই-তিন দিন দম নিতো। প্রায়ই তখন চলে যেত বড়শি হাতে নিয়ে বিলে। এমন কোনো দিন নেই যে বাপ তার খালি হাতে বাড়ি ফিরেছে। বাপের চেহারাটা টুনুর মাথার মধ্যে পাক খেতে থাকে। ‘লোকটার কি যে অইছিল? হাসপাতাল থাইকা বারিত আহোনের পর ধিরে ধিরে লোকটা কেমন যেন বদলাইয়া গেল। পা-টা হারানোই কি এর কারণ, না অন্যকিছু, কি এমন ঘটছিলো তার জীবনে?’ চানমিঞার পরিবর্তন সত্যিই অবাক করার মতো ছিল।

৫.
চান মিঞার চিড়ামুড়ির ছোট্ট দোকানটি ছিল জামালপুর শহরে। দোকান মানে ফুটপাত। স্টেশন রোডে সফি মিয়ার বাজারে এক গালামালের দোকানের সামনের ফুটপাতে ছিল তার বসার জায়গা। ঘর নেয়ার সামর্থ্য তার কোথায়! তবে, দুই পুরুষ ধরে চলা ব্যবসাটি গ্রামের বাজারেই শুরু। কিন্তু শ্রম আর নিষ্ঠার সাথে ব্যবসা করলেও শেষমেষ চানমিঞা টিকতে পারে নাই। এই অজ পাড়াগাঁয়ে বেচাবিক্রি কোথায়! গ্রামের চেয়ে শহরে বেচাকেনার গতি তুলনামূলক অনেক বেশি-এটা কে না জানে।
জমি-জিরোত নেই বলে ব্যবসাটিই চানমিঞার উপার্জনের একমাত্র ভরসা। যেভাবেই হোক ব্যবসাটি চালিয়ে যেতে হবে, তাছাড়া বাঁচার আর পথ নেই। ফলে প্রতিদিন শহরে যাওয়া-আসা কষ্টকর জেনেও চানমিঞা পাড়ি জমিয়েছিল শহরে। তাতে খারাপ হয়নি। যাতায়াত বাদ দিয়ে দিনে পাঁচ টাকা পর্যন্ত টিকতো। শিত মৌসুমে ব্যবসা হয়ে ওঠতো আরও জমজমাট। চানমিঞা তখন বাড়ি ফিরতো নানা খরচাপাতি নিয়ে। কিন্তু পরের বছরই দুর্ভিক্ষে তার ব্যবসা প্রায় লাটে উঠেছিল। দুর্ভিক্ষে মানুষের পেটে ভাতই জোটে না, গুড়-মুড়ি খাবে কে? তখন দুই টাকা আয় করাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছিল। অবশ্য সে দু টাকার ক্রেতাও ছিল হাতে-গোনা, যাদের এ অভাবের বাজারে খরচটা ঝঞ্ঝাট ছাড়াই দিব্যি চলে যেত। বিক্রিটা হতো তখন মূলত তাদের কাছে।
দুর্ভিক্ষে অনাহারে-অর্ধাহারে কেটে গেলেও পরের বছর তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মাঝে ছন্দপতন ঘটেছিল। সেই ঘটনাটি কি ছিল তা আট-নয় বছরের মূর্খ বালক টুনুর পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না। শুধু তার এটুকু মনে আছে, একবার তার বাপ অনেক দিন পর বাড়ি ফিরেছে বগলের নিচে ক্রাচে ভর করে। নিজ পায়ে দাঁড়ানোর মতো শক্তি তার ছিল না। বাপ যখন ফিরছিল না, দিনের পর দিন পার হয়ে যাচ্ছিল-তখন মায়ের চোখেমুখে ছিল দুশ্চিন্তার ছাপ, চোখের কোণে পানি। মা তখন লুকিয়ে লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতো। টুনু ও তার ছয় বছরের ছোট বোনটির খাবারের অভাব ছাড়া তখন আর অন্যকিছু বোঝার উপায় ছিলো না।
চানমিঞা প্রথম যেদিন বাড়ি ফিরে এলো না, দুশ্চিন্তায় রেজিয়ার সেদিন সারারাত ঘুম হয় নি। কেবলই ভেবেছে, ‘কই গেল লুকটা, এ রহম ত কুনদিন করে না? গাড়ির তলে চাপা পড়লো? নাহ্, তাইলে কি একটা খবর পাইতো না! আচ্ছে, কয়দিন থেইক্যা লুকটা যে কেমুন ছটফট করতো ওগুল্যে কিয়ের লক্ষণ আছিল? সে কি কুন বড় বিপদে পড়ছে? লুকটার খারাপ কিছু অয় নাই ত। যুদি অয় তাইলে মাসুম বাচ্চা দুইডে নিয়ে আমি কিভাবে চলমু? কেঠা আমাগরে পালবো? আমগরে কি জমি আছে যে আবাদ কইরে‌্য খামু?’ এমন নানান এলোমেলো দুঃস্বপ্নের ভাবনা ভাবতে ভাবতে রেজিয়া নির্ঘুম রাত পার করেছিল।

৬.
ভোরের আজান দিতেই ঘুমের বাচ্চা দুটিকে রেখে সে ছুটে যায় তেলিপাড়ায় বাপের বাড়িতে। বড়ভাই হাতু খা বোনের কাছ থেকে সব শুনে গম্ভির হয়ে যায়। রেজিয়া ওখানে থাকতে থাকতেই সে শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। বাড়ি ফিরে এস সারাটা দিন রেজিয়ার খানাপিনা নাই। বারে বারে সে খুলিতে যায়, আসে। রাস্তার মাথায় যায়, আবার আসে। ‘ভাই এহনো আহে না ক্যে? সত্যিই কি কুন খারাপ সংবাদ? কি অই সংবাদ?’
‘মানুষটারে খুজতে সুময় লাগবো না? জামালপুর কি রাস্তার ওপারে, বুজস না ক্যে? আসতে যাইতেই ত অর্ধেক দিন শ্যাষ। এত অধৈর্য্য অইলে চলবো। গেছে যহন এডা কুল-কিনারা কইরে‌্যই আবো’-রেজিয়ার নিজের মনটাই ওকে পাল্টা বোঝায়। কিন্তু তাতে ত মনটা বুঝতে চায় না। রাত এক প্রহর পার করে ক্লান্ত-অবসন্ন হাতু খা বোনের বাড়ি আসে। ডাক পেয়েই লাফ দিয়ে রেজিয়া চৌকি থেকে উঠে হারিকেনের সলতা বাড়িয়ে কবাট খুলে। হাতু খা ধপ চৌকিতে বসেই পানি চায়। পাঁচ মাইল পথ হাঁটা তো একেবারে কম না। রেজিয়া ধড়ফড় করে গ্লাসভর্তি পানি এনে দেয় এবং শুকনা মুখে বলে,‘ ভাই চারডে ভাতই না হয় খাও।’
‘পরে।’ হাতু খা’র সংক্ষিপ্ত জবাব। রেজিয়ার ছটফটানিতে দমটা যেন বার বার বন্ধ হয়ে যেতে থাকে সংবাদ কি তা শুনার জন্য। বিড়ি ধরিয়ে গলা কেশে হাতু খা বয়ান শুরু করে-
গতকাল যোহরের আজানের পর চানমিঞার দোকানের সামনে খদ্দেরবেশি দুইজন পুলিশগোছের লোক আসে এবং ওকে জাপটে ধরে হাতকড়া লাগিয়ে ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে যায় দুইশ গজ দূরে সন্তর্পণে দাঁড় করানো জিপটিতে। তারপর টেনে হিঁচড়ে তোলা হয় সেই জিপে এবং মুহূর্তে জিপটি চলে যায়।
রাস্তার দুইপাশের অসংখ্য মানুষ ঐ দৃশ্য দেখেছে। গালামালের দোকানদারের কাছ থেকে বিবরণ শুনে হাতু খা কাঁচুমাচু হয়ে জিজ্ঞাসা করে: ‘ভাইজান কি দুষে উনারে নিয়্যা গেল?’
‘কি দুষ করছে আমরা কমু কিভাবে? নিশ্চয়ই কুন কারণ আছে। এমনি এমনি কেউ কাউরে ধরে বুঝ না মিয়্যা। শুনলাম ওরা রক্ষিবাহিনীর লোক। আজরাইলের হাতে পড়ছে। জানডারে শ্যাষ কইরে ফালাবো। তুমার ভগ্নিপতির কফাল খারাপ।’
এরপর হাতু খা গালামালের দোকানের এক পার্শ্বে অনেকক্ষণ ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে। মহাজনেরও যে মনটায় দুশ্চিন্তা সেটা দেখেই বুঝা যায়। তিনি চানমিঞাকে বলতে গেলে খুবই পছন্দ করতেন। লোকটিকে তিনিই তো মায়া করে তার দোকানের সামনে বসতে দিয়েছিলেন। মহাজন বলেন, ‘বাড়িত যাও গা মিয়্যা। দাড়াইয়্যে থাইক্যে আর কি করবা? দেহা যাইক কি অয়।’
‘ভাইজান হের অবস্তাডা জানার কি কুন উপায় নাই?’ হাতু খা কাচুমাচু করে হাতজোড় করে।
‘অস্থির অইলে চলবো মিঞা, বুঝ না দিনকাল কি রহম যাইতাছে? দুইতিন দিন পর আহ, দেহি কিছু জানা যায় কি না। আমারই ত দোকানের সামনে বইতো, সেইটা বুঝি।’ মহাজন আক্ষেপ করেন, ‘দেহ তো মানুষটারে কুন ভূতে ধরছিল। তুই শালা গেরাম থাইকা আইছস ব্যবসা করবার, তরে ক্যা রক্ষিবাহিনি ধরে? শালা গরিবের ঘোড়া রোগ। এহন দেহ কি কাম বাজাইছে। কি করছে অইই জানে। দেহা যাইক, কি অয়।’
হাতু খা এরপর সোজা চলে আসে গ্রামে। সে আর থেকে কি করবে! আর কাকে কি বলবে সে, শহরে সে কাকে চিনে?
ভাইয়ের মুখে এই বিবরণ শুনে রেজিয়ার বুকটা ভয়ে ধড়ফড় করে ওঠে। সে আঁচলে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে। অস্থির মনটা যেন আরও কিছু শুনতে চায়। ক্লান্ত হাতু খা বোনকে ধমক দেয়, ‘এহন ভাইঙ্গে পরলে চলবো না। দেহা যাইক। ঐ মুহাজন দুই-তিন দিন পরে যাবার কইছে। চিন্তে করিস নে, ব্যবস্থা একটা অবই। তাইলে এহন আমি বারি যাই, কাইল একপাক আমু নি’-বলেই হাতু খা বাইরে বেরোয়। বাইরে তখন মিশকালো অন্ধকার। অন্ধকারে রেজিয়ার বুকটা আবারও ধক ধক করে ওঠে। এই অন্ধকার তার অজানা অশুভ ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি কি না কে জানে। হারিকেনটা ধরে ভাইকে এগিয়ে দিতে গিয়েও তার হাত কাঁপে। ‘লাগবো না, টছলাইট আছে’ বলে হাতু খা দুই ব্যাটারির টর্চের আলো ফেলে অন্ধকার চিড়ে হন হন করে হেঁটে মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে যায়।

৭.
গুণে গুণে তিনদিন পর রেজিয়া দুই সন্তানসহ ভোরে বাপের বাড়ি গিয়ে হাজির হয়। হাতু খা-ও ঠিক করে রেখেছিল আজ যাবে। বোনকে দেখে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নেয় এবং বেরিয়ে পড়ে। রেজিয়ার বাপের বাড়ির সবাই বুঝে একটা বিপদ এসেছে কিন্তু সেই বিপদ কি তা কেউ ঠিকমতো ঠাহর করতে পারে না। জামাই যে চুরি-ডাকাতি করে ধরা পড়ে নাই তা হাতুর সংক্ষিপ্ত কথাতেও বুঝতে পারা যায়। চানমিঞা ঐ ধরনের লোক না। তবে অপরাধ যাই হোক বিষয়টি যে জটিল এ বিষয়ে কারো কোনো সন্দেহ থাকে না। রেজিয়ার বাপ বোঁচা খা চোখ মিটমিট করে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখে মেয়েকে সান্ত্বনা দেয়।
জামালপুর স্টেশন পার হয়ে হাতু খা বাজারে গালামালের দোকানের পাশে এসে দাড়ায়। হাতুকে দেখেই মহাজন এক কোণে ডেকে নেয় এবং ফিসফাস করে যা জানায় তা হল চানমিঞাকে রক্ষিবাহিনির ভোকেশনাল ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। মহাজনের এক আত্মিয় গেইটপার এলাকার সরকারি দলের নেতাকে দিয়ে অনেক কষ্টে এই সংবাদ জানতে পেরেছে। চানমিঞা আসলে গণবাহিনিতে যোগ দিয়েছিল। তাকে রক্ষা করার কোনো উপায় বর্তমানে নেই। তবে মহাজন হাতুকে বলে হাতু যেন যোগাযোগ রাখে। তার যট্টুকু ক্ষমতা আছে সে চেষ্টার কোনো কমতি করবে না। ইতিমধ্যে তার আত্মিয় ঐ নেতার কাছে সে যা বলার বলেছে। ‘মূর্খ মানুষ, ও রাজনীতির কি বুঝে? বুঝলেন না, কারও পাল­ায় পড়ছিলো মনে অয়। লুকটা কিন্তু ঐ রহম না। খুব সরল মানুষ। বুঝেন না তাইলে কি আমার এখানে জায়গা পায়! আমি আপনেরে গ্যারান্টি দিবার পারি।’
‘আমাকে আপনি গ্যারান্টি দিয়ে কি করবেন। এখন ত ওসব কথায় কাজ হবে না। দেশের অবস্থা ভালো না। সরকারের বিরুদ্ধে কিছু নৈরাজ্যকারির ষড়যন্ত্র চলতেছে, বুঝেন না! সরকার এখন ওদের ব্যাপারে খ্বু সিরিয়াস। সরকারের চোখে এখন সে ভয়ংকর অপরাধি। মনে তো হয় না কিছু করতে পারা যাবে। আমার আর ক্ষমতা কতটুকু! তারপরেও আপনি আত্মিয় মানুষ যখন আসছেন, কথা দিতে পারছি না, দেখা যাক।’ মহাজন আর কথা না বাড়িয়ে চলে এলেন।

৮.
আসলেই দেশের অবস্থা ভালো ছিল না। দেশ স্বাধিনের পর গ্রামের নিভৃত জীবন-যাপন আরও মিইয়ে পড়ছিলো। চিরকালের কষ্ট সহ্য-করা গ্রামের মানুষ তার মাঝেই দিনাতিপাত করতো। দেশ স্বাধিনের পরের বছরের অনাবাদ ছিল তাদের জীবনের দুঃসহ স্মৃতি। যে ধান তাদের জীবনকে বাঁচিয়ে রাখবে, সেই ধানই যদি আবাদ না হয় তবে গ্রামবাসির জীবনে অমানিশা নেমে আসতে সময় লাগে না। পুষ্টিহীন মৌন হাহাকারে চলা গ্রামের মানুষের জীবনযাপন ধুঁকে ধুঁকেই এগিয়ে চলে। তাদের জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসে না-দেশ স্বাধিনের আগেও যেমন ছিল পরেও তাই-ই। কাঙাল তো কাঙালই। এর ওপর বছর দুই না যেতেই নেমে এল দুর্ভিক্ষের মরণাঘাত। দুর্ভিক্ষের বাতাস বইতে শুরু হতেই ঐ মানুষগুলো ঝড়ে বিধ্বস্ত গাছের মতো ডালপালা ভেঙে ছিন্নভিন্ন হয়ে ছিটকে গেল। চানমিঞাদের ঐ দুর্ভিক্ষের ঝড় উড়িয়ে নিয়ে গেল একেবারে নরকের প্রান্তে। একটুও প্রতিরোধ তারা গড়ে তুলতে পারেনি তাদের নড়বড়ে অস্বচ্ছল জীবনে। দুর্ভিক্ষের অতর্কিত ঝাপটায় মুহূর্তেই গ্রাম-শহরে মুষড়ে পড়লো হাজার হাজার মানুষ।
চুয়াত্তরের বর্ষা মৌসুমে বন্যা এলো ধেয়ে। বিশেষ করে, দেশের উত্তরে প্রথমেই বন্যা আঘাত হানলো আউশের আবাদে। এরপর নিয়ে গেল আমন। সেই বন্যা গেল। দিশেহারা মানুষ কোনোমতে দুই-চার আঁটি জোগাড় করে আবার জমিতে গুঁজে দেয়, যদি দুই-চার মুঠ মিলে এই আশায়। না হলে তো বাঁচার পথ নাই। কিন্তু বাঁচার পথ তাদের সত্যিই সংকুচিত হয়ে আসছিলো। আশ্বিনের ভয়ানক বন্যার দ্বিতীয় আঘাত তাদের সব প্রচেষ্টাকে ম্লান করে দিয়ে পথে বসিয়ে দিয়ে গেল। ভাদ্রমাস থেকেই একটু একটু করে দুর্ভিক্ষের কালোমেঘ তাদের ভাগ্যাকাশে উদিত হতে লাগল আর কার্তিকে এর মরণাঘাত তাদের জীবনে নিয়ে এলো ভয়ানক মৃত্যু-বিভীষিকা। খাদ্যের দাম বেড়ে হল আকাশচুম্বি। চারিদিকে শুধু হাহাকার। দিনের পর দিন আর কত উপবাসে থাকা যায়, জীবন চালানোর জন্য তো খাদ্য দরকার। কিন্তু কোথায় পাবে তারা মুখের সামান্য আহার! চারিদিকে শুধু আর্তনাদ। গ্রামে-গঞ্জের গরিব মানুষেরা-ভিখেরিরা মরতে লাগলো টপাটপ।
চানমিঞারা ঠাহর করতে পারলো এ দুর্ভিক্ষ হাজির হয়েছে তাদেরকেই যমদূতের দেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য। গ্রামে-গঞ্জে-শহরে নিরন্নের মিছিল দীর্ঘায়িত হতে লাগলো। তাদের আর্তনাদে ভারি হতে লাগলো মাথার উপর ছাতার মতো মেলে থাকা আকাশের অবশিষ্ট মেঘগুলো। এত মানুষের আহার কোথা থেকে সংস্থান হবে গো! এ কি একটা-দুইটা মানুষ! শহরে-গ্রামে দেখো লাখ-লাখ মানুষ গো লাখো লাখো! পথে-প্রান্তরে হাটে-ঘাটে দেখ জিন্দালাশের মতো কেমন পড়ে আছে। তাদের অসহায় চোখে-মুখে একটাই আকুতি, একটাই বিলাপ, ‘একটু ভাতের ফেন দেও গো মা, ভাত চাই না। কি কাম আছে সব কইরে‌্য দিমু মা, একটু দয়া করুইন গো বাবা। জানডা আর সহ্য করবার পায় না গো বাবা।’ সরকার প্রথম প্রথম হম্বিতম্বি করলেও শেষমেষ লঙ্গরখানা খুলতে বাধ্য হল। লঙ্গরখানায় আর কত মানুষ সামলানো যায়!
রেডিও’র খবরে চানমিঞা শুনেছে, দুর্ভিক্ষে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট এবং বরিশাল অঞ্চল। অর্থাৎ তাদের এলাকায় দুর্ভিক্ষ মরণকামড় দিয়েছে। সে দেখেছে শহরের এক ভয়ানক ছবি। এতো সেই চিরচেনা শহর নয়, শহরের ছবিটা এমন ভয়ানক রূপ ধারণ করলো কখন! শহরের পথের দু’পাশে কঙ্কালসার জ্যান্ত লাশের নিরব মিছিলের দিকে তাকালেই বোঝা যায় কি চলছে চারপাশে। শত শত মানুষ ভিক্ষার থালা নিয়ে দোকানে-বাড়িতে ঘুরছে একটুকু খাদ্যের জন্য। নিস্তেজ দেহটি টেনে-ছেঁচড়ে নিয়ে প্রাণপন শক্তিতে বেঁচে থাকার জন্য কি চেষ্টা!
ফজল ভাই কাল এসে বলে গেল, ‘স্টেশনের প্লাটফর্মের আশেপাশে ঢুকা যায় না। ময়লা দুর্গন্ধে একাকার চারপাশ। হাড়জিরজিরে দুর্বল নিথর দেহের আর্তনাদ, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে খালি কাকুতি-মিনতি করে। কারও কারও নড়াচড়া নাই। বেঁচে আছে কি না কে জানে। তবুও সবার মাঝে বাঁচার একটা তিব্র আকুতি।’ এ পৃথিবীতে কে মরে যেতে চায়! বাঁচার আকুতি সবারই থাকে। মরে যেতে যেতেও সবাই তাই একমুহূর্ত বেশি হলেও বাঁচতে চায়। টিকে থাকার কি-ই না আশা। কিন্তু এই দুর্ভিক্ষ মরণকামড় দিয়ে একে একে তুলে নিচ্ছে হাজারে হাজারে লাখে লাখে জান। যত দিন গেল, মৃত্যুর মিছিলও তত দীর্ঘ হতে থাকলো।
এর মধ্যেও চানমিঞা দেখেছে একশ্রেণির মানুষকে স্বচ্ছন্দে ঘোরাফেরা করতে। সফির মিয়ার বাজারে একদিন চানমিঞা মাছবাজারের এককোণে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে মাছ-গোশতের বাজারে, গালামালের দোকানে কি অসম্ভব ভিড়-দিনের বেলাতেও মাছহাটির কারেন্টের বাতির আলোয় বড় বড় রুই-কাতল-ইলিশ রুপোর মতো চকচক করে জ্বলছে। সব ছবির মতো সুন্দর লাগে গো। মাছহাটির এক কোণে দাঁড়িয়ে চানমিঞা কল্পনা করে বড় মাছের সুরুয়ার টাটকা গন্ধ। কবে কোথায় সে খেয়েছে, আদৌ খেয়েছে কি না কে জানে। বড় মাছ খাওয়ার কপাল কি তাদের আছে! ছিপ ফেলে এখানে-সেখানে যা পায় সেটাই তাদের মাছ খাওয়া।
চাকর নিয়ে বাজারে আসা এসব বড় বড় সাহেবেরা, মোটাতাজা লোকেরা কোন দুর্গে বাস করে গো। সেখানে কি ঝড়-বাদলাও পৌঁছতে পারে না? এদের কাছ থেকে কি মঙ্গাকে কেউ যাদুবলে সরিয়ে দিয়েছে? মানুষ বাঁচে না অথচ এদের কেনাকাটার কি ধুম! বড় বড় ব্যাগ ভর্তি করে তৃপ্তিতে বাজার নিয়ে রিকশায় চেপে-বসা এসব মানুষের কি অবাক করা দৃশ্য! চানমিঞা হা করে তাক লেগে এসব দৃশ্য দেখেছে। এ সময় তার দোকানে বেচাকেনা কম। তার খরিদ্দার তো সবই প্রায় সাধারণ মানুষ, যারা এখন সবচেয়ে বেকায়দায়। ভাতের চাল কেনারই তো পয়সা থাকে না, চিড়া-মুড়ি কিনবে কি দিয়ে! তবে যারা সামান্য কিছু কিনে নিয়ে যেত, বোঝাই যেত সেদিন তাদের চুলাতে আজ হাঁড়ি উঠবে না। যেমন অবস্থা তার নিজের। বাড়ি ফেরার সময় বউ-পোলাপান তাকে ঘিরে ধরবে। ওদের দোষ কি, কত আর উপোস করে থাকা যায়। সামান্য দু’পয়সা না হলে চানমিঞা বাড়ি ফিরে কি করে! তাই দোকানদারির সারাটা দিন তাকে আতঙ্কে থাকতে হয়, আজকের দিনটা-বা কেমন যায়! বেচাবিক্রি না হলে এক সের আটা কেনারও কোনো উপায় থাকবে না। অন্য সময় হলে বাকি খরচ করা যেত। কিন্তু এখন কে কাকে বাকি দেয়! চানমিঞা মোটেও অবাক হয় না যখন ফজল ভাই তাকে প্রশ্ন করে এবং নিজে নিজেই আবার বলতে শুরু করে, ‘বলেন তো, দেশটার এমন বেহাল দশা হলো কি করে? তাইলে স্বাধিন হয়ে লাভ কি হলো? স্বাধিনতার সুখ কি শুধু এই আকালের দিনেও ব্যাগভর্তি বাজার যারা করছে শুধু তাদের জন্য?’
‘বিড়ি দেন একটা’, ফজল ভাই তার গল্প আগাতে থাকে-‘এরপর বছর পার করেই নির্বাচন আসে। সেই নির্বাচনে শেখ মুজিবের দল আওয়ামিলিগ আবার নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। পরের বছর জারি করা হয় রাষ্ট্রপতির শাসন এবং তারপরের বছর সব দল ভেঙে দিয়ে একদলিয় বাকশাল কায়েম করা হল। সেইসাথে উদয় হলো রক্ষিবাহিনির।’ চানমিঞা হা করে তার কথা শুনতে থাকে।

৮.
ফজল ভাইয়ের সাথে কথা বলতে বলতে আজকাল চানমিঞা দেশের নানা বিষয় নিয়ে বথা বলতে বা শুনতে বেশ উৎসাহবোধ করে। এই লোকটা তাকে কেমন যেন চোখটা খুলে দিয়েছে। চানমিঞাও দেখেছে, সবাই বলাবলি করছে আওয়ামিলিগকে রক্ষা করার জন্যই না-কি রক্ষিবাহিনির আবির্ভাব। চানমিঞা নানা জনকে বলাবলি করতে শুনেছে দুর্ভিক্ষের বছর কিছু মানুষ খাদ্যের ডিলারি, কালোবাজারি করে টাকার পাহাড় না-কি জমিয়েছে। কেউ কেউ নকল রেশন কার্ড দিয়ে রেশন তুলে কালোবাজারিতে বিক্রি করেই ধনি। চুরি-ছিনতাই যে বেড়েছে তা তো সে নিজের চোখেই দেখছে। তাদের শায়েস্তা করতেই কি রক্ষিবাহিনির আগমন? বিষয়টি যে তা নয়-চানমিঞা এটা জলের মতো পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে আরও কিছুদিন পরে।
ততোদিনে চানমিঞা জাসদের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছিলো। জড়ানোটা ছিল অল্প ক’দিনের এবং এর মধ্যেই সে ধরা পড়ে যায় রক্ষিবাহিনির পাতানো জালে। দু’এক দিনের কথাতেই ফজল ভাই নতুন এক ভাবনায় তার মনটাকে নাড়িয়ে দিয়েছিলো। চানমিঞার দোকান থেকে চিড়া-মুড়ি কিনা থেকে ফজল ভাইয়ের সাথে তার একটু একটু করে ঘনিষ্ঠতা বাড়ছিলো । সহজ-সরল লোক, কোনো অহংকার নেই। ফুটপাতের দোকানদার বলে ফজল ভাই তাকে অবহেলার চোখে দেখতো না। খাতির জমার একপর্যায়ে তিনিই প্রথম চানমিঞাকে রাজনীতির কথা শোনান। সে এক নতুন রাজনীতি, শোষণমুক্তির রাজনীতি। ফজল ভাইরা এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায় যে সমাজে না-কি ধনি-গরিবের মাঝে কোনো বৈষম্য থাকবে না। দেশ স্বাধিনের ফল সকলেই ভোগ করতে পারবে। রাজনীতি না-বুঝলেও কথাগুলো চানমিঞার মনে খুব ধরেছিল।
এরপর একদিন ফজলের আহবানে সে আগেভাগে দোকান বন্ধ করে হাঁটা ধরেছিল পাথালিয়া। পাকারাস্তা থেকে নেমে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে গিয়ে ফজল ভাইয়ের কথামতো দাঁড়িয়েছিল ঈদগাহ মাঠের উত্তরকোণে। একটু পরেই সন্ধ্যার অন্ধকার জেঁকে বসেছিল। ফজল ভাই সে অন্ধকারে মিলিত হয়েছিল তার সাথে। তারপর দুইজনে হেঁটে আধামাইল দূরে এক প্রাইমারি স্কুলের বারান্দায় বসে থাকা ছয়-সাত জনের পাশে যোগ দিয়েছিল। আস্তে আস্তে এসেছিল আরও সাত-আট জন। চানমিঞা সে দিন খুব অস্বস্তিবোধ করেছিল। এতদিন শুধু সে ফজল ভাইয়ের সাথেই গল্প করতো। কিন্তু, এমন অভিজ্ঞতা তার জীবনে এই-ই প্রথম। রাজনীতিতে জড়ানোর সুযোগ তার জীবনে কখনও ছিলো না। এখানে না এলে সেটার প্রয়োজন হয়তো কখনই সে উপলব্ধি করতো না। রাজনীতি তার জীবনকে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করলেও রাজনীতিতে তার যুক্ত হওয়ার প্রশ্নই অবান্তর। সমাজে তার মতো লোককে কে মূল্য দেয়? তাছাড়া স্ত্রি-সন্তান নিয়ে উপবাস করে থাকলেও কার কি! তাদের আবার রাজনীতি কিসের! কিন্তু চানমিঞার ভালো লেগেছিলো যে ফজল ভাইদের রাজনীতির কথাগুলো হক-কথা। তাহলে তা আলোচনার জন্য এত আড়ালে বসতে হবে কেন। বৈঠকে নেতার কথাগুলো তার বুঝতে কোনো অসুবিধা হয়নি। ঐসব কথা বোঝার জন্য বিদ্যার প্রয়োজন নেই। নেতা একনাগাড়ে বলে যাচ্ছিল: ‘ঐ ধনি লুটেরাদের হাত থেকে ক্ষমতার বদল ঘটাতে হবে। নইলে দেশের স্বাধিনতার সুফল আমরা ভোগ করতে পারবো না। আপনারা দেখছেন-না, স্বাধিনতার পর কিছু লোক কিভাবে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু, আপনি আমি কি পাইতেছি? আজ সব দলকে বিলুপ্ত করা হয়েছে। দেশে আর কোনো দল থাকবে না। এখন একদলের শাসন চলবে, আপনারা বলেন তো এইটা কেমন কথা! দেশটা কি শুধুমাত্র আওয়ামিলিগের নেতাদের, কথা বলার অধিকার শুধু তাদের। আর কেউ কোনো কথা বলতে পারবে না। তাইলে পাকিস্তানিরা কি দোষ করেছিল? ওদের বিরুদ্ধে জান-জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করলাম কেন? ক্ষমতাসিন দলের নির্বিচার শোষণ-লুটপাটের জন্য তো আমরা একাত্তরে অস্ত্র হাতে জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধিন করি নাই। তাই লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধিনতার সত্যিকারের সুফল ভোগ করতে হলে ধনি-গরিবের বৈষম্যের সমাজ ভাঙতে হবে… লাল ঝাণ্ডা ওড়াতে হবে… আর এসব করতে গেলে জনগণের বাহিনি গড়ে তুলতে হবে। গণবাহিনি সেই জনগণের বাহিনি। মুক্তির একটিই পথ-গণবাহিনিকে শক্তিশালি করা। সরকার আমাদের পার্টিকে নিষিদ্ধ করেছে, করুক। আমরা জনগণকে নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করবো। কারো হুমকি-ধামকিতে আমরা মুখ বন্ধ করবো না। বিপ্লব কেউ থামাতে পারবে না। বিপ্লব অনিবার্য।’
চানমিঞা মন্ত্রমুগ্ধের মতোই নেতার কথাগুলো শুনছিলো। তাহলে ফজল ভাইদের পার্টিকে সরকার নিষিদ্ধ করেছে, সে জন্যে এতো লুকিয়ে গোপনে বৈঠক করা! সে পরিষ্কার বুঝেছিলো নেতার কথাগুলো মিথ্যা না এবং এর মধ্যে গভীর অর্থ আছে। তাদের এলাকাতেও তো সে দেখলো সরকারি দলের লোকজনেই ডিলারি করে। ওদের হাতেই সব ক্ষমতা। ওই নেতাদের সাথে অন্য কালোবাজারিদের দহরম-মহরম সম্পর্ক। আসলেই এ সবের পরিবর্তন হওয়া দরকার। চানমিঞার নিজের বাড়িতেও দেশ স্বাধিনের আগে হাল-গৃহস্থি ছিল। ওসবই তো দেখতে দেখতে চলে গেল সব মইজুদ্দি সরকারের পেটে। স্বাধিন দেশে এখন গ্রাম ছেড়ে পাঁচ মাইল দূরে শহরে এসে রোজগারের ধান্দা করা লাগে, নইলে খাওয়ন জুটে না। স্বাধিন দেশেই বাপের জমিগুলো পটাপট হজম করে ফেললো মইজদ্দি সরকার। দেশ স্বাধিনের দুই বছর না-যেতেই চানমিঞারা হলো ভূমিহীন।

৯.
চানমিঞা এরপর ফজলের সাথে আরও তিন-চারটে মিটিং-এ যোগ দিয়েছিলো। সব শেষ মিটিংটি ছিল বেলটিয়া হাইস্কুলের মাঠে। মিটিংয়ের শেষে ওরা যখন উঠছিলো তখনই প্রায়-শব্দহীন একটি গাড়ি এসে দাঁড়ায় স্কুলের সামনে মেইন রোডের পার্শ্বে। ফজল ভাইয়ের দৃষ্টিতে সেটি সবার আগে ধরা পড়ে। ফজল ভাইয়ের কুমিরের চোখ আর হরিণের কান। তাকে ফাঁকি দেয় সাধ্য কার! স্কুলের পেছনের রাস্তা দিয়ে সবাই আলাদা আলাদা ভাবে পা বাড়ায় গ্রামের রাস্তায় এবং একমুহূর্তে পথ ছেড়ে জঙ্গলের আইল। সবাই নিঃশব্দে যে যার মতো সরে যাচ্ছিল। ফজল ভাই চানমিঞাকে ছেড়ে যান নাই। তিনি তাকে নিয়ে সন্তর্পণে আইল-জঙ্গল ধরে নারিকেলি বাজারের কাছাকাছি ঢুকে পাকা রাস্তা পার করে দেন-‘যাই, তাড়াতাড়ি দেখেশুনে চলে যান’ এবং আরও কয়েকটি কথা-তারপর নিমেষেই উধাও। চানমিঞা উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে ঘন ঘন নিঃশ্বাসের সাথে লম্বা লম্বা পা ফেলে বাড়ির দিকে আগায়। ওখান থেকে তার বাড়ি মাত্র একমাইল। কিন্তু মাত্র ওটুকু পথই সেদিন মনে হয়েছিল অসিম দূরত্ব। তা যেন আর শেষ হতে চাইছিলো না। এর মাঝেও সে ভাবে ফজল ভাইয়ের কথা। লোকটি নিজের নিরাপত্তার কথা বাদ দিয়ে তাকেই কিনা আগে পৌঁছে দিল বাড়ির পথে। কে জানে এখান থেকে তার বাড়ি যেতে কতক্ষণ লাগবে। এতদিনের পরিচয়েও ফজল ভাইয়ের বাড়ি-টাড়ি কিছুই জানা হয়নি। ফজল ভাই যেমন তাকে এ ব্যাপারে কিছু বলেনি, সে-ও জিজ্ঞাসা করতে সুযোগ পায়নি। বা এমনও হতে পারে ফজল ভাই কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে গেছে অন্য কোনো কারণে। অথচ তার সম্পর্কে তেমন কিছু না -জানলেও এই অল্প ক’দিনে তার সাথে একটি আপনতর সম্পর্ক হয়ে গেছে। যাওয়ার সময় ফজল ভাই তার হাতটি চেপে ধরে ফিসফিস করে বলেছিলেন, ‘দুই-চার দিন জামালপুর যাওয়ার দরকার নাই। একটু সাবধানে থাকবেন। পিছনে টিকটিকি লাগছে।’ কথাটি শুনে আতঙ্কে চানমিঞার শিঁরদাড়া বেয়ে যেন কি একটি নেমে যাচ্ছিল।
এরপর চার-পাঁচদিন অসুস্থতার ভান করে বাড়িতে একরকম বদ্ধ জীবন কাটালেও পেটের দায়ে তাকে শহরে ঢুকতে হয়েছিলো। এই দিনক’টি মুষ্টির চাল, কচু-ঘেচু আর শাক-পাতা দিয়ে রেজিয়া পার করেছে। কিন্তু ব্যবসার টাকায় হাত দিতে দেয় নাই। সে জানে ঐ সামান্য টাকা কয়টা খরচ করে ফেললে স্বামির ব্যবসার মাল করা আর যাবে না। অভাবের দিন কার কাছে হাত পেতে তখন সে সমস্যার সমাধান করবে? ঐ চার-পাঁচ দিন পর চানমিঞা আজই প্রথম দোকানে। এক দুপুরও সে দোকানদারি করে নাই। এরই মধ্যে চান মিঞাকে দিনবদলের স্বপ্নটি দেখতে দেখতে রক্ষিবাহিনির ক্যাম্পে ঢুকতে হয় বুটের লাথি খেতে খেতে।

১০.
দোকানদারের পিড়াপিড়িতে গেইটপারের সেই সরকারদলিয় নেতা অনেক দৌঁড়ঝাঁপ করে তাকে ছাড়িয়ে আনতে সমর্থ হয়েছিলেন। ওরা তাকে এমনি ছাড়ে নাই, এর আগে নিশ্চিত হয়েছে লোকটি এই লাইনে নতুন। একজন ছাড়া আর কারও নামই বলতে পারে না। আবার সেই একজনেরও বৃত্তান্ত কিছু জানে না। তবে কবে কয়টি মিটিংয়ে সে ছিল সেখানে কি কি কথা হয়েছে এবং সেগুলো কোথায় তা সবই বলে দিয়েছে। তার কথায় কোনো চালাকি ছিল না এটি তারা বুঝতে পেরেছে। এ জন্যেই তাকে ছাড়িয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল।
চানমিঞার বাড়ি ফেরার রুটটি ছিল ভকেশনাল ক্যাম্প থেকে সদর হাসপাতাল, সেখান থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সেখান থেকেই গ্রামের বাড়ি। তবে সেটি অবশ্যই ক্রাচে ভর দিয়ে। কারণ নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা সে হারিয়েছিল। ক্যাম্পের নির্যাতনে তার ডান পা পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়েছিল এবং সে হারিয়েছিল স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তিও। ফলে ক্রাচের সাথে যোগ সোয়া দুইশ’ পাওয়ারের চশমা। তারপরেও চানমিঞা দারুণ খুশি যে সে শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরতে পেরেছিল। ক্যাম্প থেকে তাকে ছেড়ে দেয়ার ঘটনাটি সহজ ছিলো না। ক্যাম্পে তার সাথে ধরা-পড়া অনেককেই না-কি বেওয়ারিশ লাশ হয়ে হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকতে হয়েছিল। ভয়ে সে লাশ নিয়ে যেতেও কেউ সাহস পায়নি। তাই তার পা যাক, সবচে বড় কথা জীবনটি তো আছে। এটি হাতু খা এমনকি রেজিয়াসহ গ্রামের অনেকেরই কথা। চানমিঞার মনে পড়ে, জামালপুর হাসপাতালের বেডে অসহায়ের মতো পড়ে থাকার সময় একদিন এক যুবতি মেয়ে তাকে দেখতে এসে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে গিয়েছিল। তার নাম-পরিচয় চানমিঞা জানতে পারেনি। ‘পাশের কক্ষে আমার রোগি আছে তো, এমনিই এসেছি’ বললেও চানমিঞার মনে হয়েছে মেয়েটি বুঝি ফজল ভাইয়ের পাঠানো কেউ হবে।
রেজিয়ার কাছে চানমিঞা সব কথাই খুলে বলেছে। মায়ের কাঁধ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা উৎসুক টুনুও যেটুকু বুঝতে পেরেছে তাতে মনে হয়েছে বাপের অপরাধটি কেমন যেন একটু রহস্যময়। তার রহস্যভেদ করা অন্তত টুনুর পক্ষে পুরোপুরি সম্ভব ছিল না। অজমূর্খ রেজিয়া যতটুকু বুঝেছে তাতে শুনে তার মুখটি উজ্জ্বল হয়েছে এজন্যে যে স্বামি তার চুরি-ছ্যাঁচড়ামি করে ধরা পড়ে নাই। দেশ নিয়ে স্বামির চিন্তাটি রেজিয়ার মাথায় খুব একটা পরিষ্কার ধরা দেয় না।
পা-টা অচল হয়ে পড়ায় চানমিঞার পক্ষে সংসারের ভার বহন করা সম্ভব হয় না। সামান্য যে কয়টি টাকা পুঁজি ছিল, তা হাসপাতালেই শেষ। রেজিয়া বাপের বাড়ি থেকে ধার-দেনা করে সামান্য কয়টা টাকা জোগাড় করে আনে। সেই টাকায় কিছু মালপত্র কিনে দহলেই চানমিঞা ছোট্ট একটি মুদি দোকান সাজায়। শহর আর না, শহরে স্বামি যেতে চাইলেও রেজিয়া তাকে যেতে দেবে না। বাড়ির পেছনের টালের পেছনের ছোট্ট একখণ্ড জমিই তাদের একমাত্র জমি। রেজিয়া ছেলেকে নিয়ে টালের জমিতে তরি-তরকারির আবাদ করে। তবে এতে কি আর সংসার চলে! তাই রেজিয়াকে প্রায় প্রতিদিনই সরকারবাড়িতে ধান ভানা বা ধানসিদ্ধ শুকনার কাজ করতে হয়। এতকিছু করেও চারজনের সংসারে মুখের আহার মেটানো ভার। অজপাড়া গাঁয়ে ঐ ছোট্ট দোকানে বেচাকেনা আর কয় পয়সা! একবেলা উপোস করলেও অন্যবেলা তো খাবারের দরকার। শেষাবধি টুনুকে বছরে পঞ্চাশ টাকায় নুরুর বাড়িতে বছরবান্ধা কামলা হিসেবে রাখতে হয়।

১১.
আজকাল পঙ্গু চানমিঞার সময় আর কাটে না। কাটবে কেমন করে, সে শহর- ঘোরা কত ব্যস্ত মানুষ ছিল। সকাল হলেই ডালিতে করে মাল সাজিয়ে চলে যেতো শহরে। সারাদিন বেচাকেনা শেষে ফিরতো রাতে। তারপর আবার পরদিন সকাল যেন হা করে অপেক্ষা করে থাকতো তার বেরোনোর তাগাদা দেয়ার জন্য। সে সবই এখন অতীত। কমরেডরা সত্যিই তার জীবনটিকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। মাঝে-মধ্যে মনটা বড় উসখুস করে ফজল ভাইদের খবর কি তা জানার জন্য। ওরা কি বেঁচে আছে, তাদের সমাজ বদলের কাজ কতদূর এগোলো? একবার গ্রামের একজনের কাছে সে শুনেছে সারাদেশে নাকি হাজার হাজার নেতা-কর্মিকে হত্যা করা হয়েছে। কত মানুষ যে খুন-জখম হয়েছে তার হিসাব নেই। রক্ষিবাহিনির ক্যাম্প মানে আজরাইলের আস্তানা। ওখানে একবার ঢুকলে তার রক্ষা পাওয়া দায়, যদি বেঁচেও থাকে তবে ওই বেঁচে থাকাটা হচ্ছে জিন্দালাশের মতো।
ফজল ভাই কি বেওয়ারিশ লাশ হয়ে মর্গে পড়ে আছে, না-কি তারই মতো পঙ্গু হয়ে এখন সে জিন্দালাশ, তার সংসারটিই-বা চলবে কেমন করে কে জানে। ফজল ভাই যদি বেঁচেও থাকে জীবনে আর কোনোদিন কি লোকটিকে সে চোখের দেখাটা দেখতে পাবে না? লোকটার ভালোমানুষির শেষ নাই। নইলে ঐ অবস্থায় লোক পাঠিয়ে কেউ খোঁজ নেয়! আসলে লোকটার বুকভরা মানুষের জন্য মায়া। এ রকম মানুষেরই রাজনীতি করা মানায় যে মানুষের সুখ-দুঃখ-হাহাকার বোঝে। হাজারো প্রশ্ন এখন প্রতিমুহূর্তে চানমিঞাকে কুরে কুরে খায়।

১২.
টুনুর মাথা থেকে তার বাপ চানমিঞার মাথাটি অপসৃত হয়। ‘এই মাছ ধরার মধ্যে আবার বাপ আইলো ক্যামনে! হে ত পইর‌্যা বুঝি গোঙাইতাছে বিছানায়। অথবা দোকানে বইস্যা বইস্যা বিড়ি ফুঁকতাছে। বাপের মাথাটা তার মাথার মদ্যে হান্দাইলো কেমুন কইরে গো?’ নাকি দুই সপ্তা থাইক্যা বারি যাই-না বইল্যে বাপে আমারে ভেলকি দেহাইতাছে। ধুৎ, হেই আবার ভেলকি শিখবো কই থাইক্যে, হে কি মন্ত্র জানে যে ভেলকি দেহাবো? এমনি মনে অয় আমারে দেখবার জন্যে মন পুরাইতাছে। বাপ-মায়ে কি তারে কম আদর করে। করবোই তো একটাই পুলা। ছোটবেলা এমুন কুন দিন গেছে যে বাপ জামালপুর থাইক্যে ফিরার সুময় তার জন্যে কিছু নিয়ে আসে নাই। উপায় নাই বইল্যে মাইনষ্যের বারিত থুইছে, নইলে টুনুর মতো পুলা কি কোনোদিন মাইনষ্যের বারি কামলা দিয়ে খাইতো। নাহ্, কাইল একপাঁক বারি যায়্যে বাপটারে দেইখ্যা আসা দরকার। লুকটা তো আসলে এহন অসহায়, নিজের সন্তান হয়্যা যুদি সে এই জিনিসটা বুজতে না পারে, তাইলে কেঠা বুজবো?’
টুনু সম্বিৎ ফিরে পায়। সে তো পাতাকাঠির দিকেই তাকিয়ে আছে, কাঠিটা গেল কোথায়, ছিপটা তো টান টান হয়ে আছে। তাহলে কাঠিটা নিশ্চয় টেনে নিয়েছে মাছে। তাই তো! টুনু নিজের অজান্তেই হাতের সমস্ত শক্তি দিয়ে ছিপটিকে আটকিয়ে রেখেছে, নইলে কখন ছিপ মাছে টেনে নিয়ে যেতো কুড়ার জলের গভীরে। তাহলে পাতাকাঠিটা মাছে টেনে কখন ডুবিয়েছে? টুনুর ডানহাতে ছিপের গোড়া ধরাই ছিল, সে চকিতে ছিপে দেয় টান। সাথে সাথে উঠে আসে প্রায় একহাত সাইজের একটা শৈল। সে জন্য ছিপটা টানতে ধনুকের মতো বেঁকে যায়। মনে হয় এক্ষুণি বুঝি ওটা ভেঙে যাবে। খুশিতে টুনুর মন ভরে যায়। ‘কতখন আগে বশি খাইছে কেঠা জানে, ভাগ্যিস ছুইট্যে যাবার পায় নাই। যাউক, মাছ দেখলে দরজাল মহিলাডার মেজাজ ঠাণ্ডা অবো, এক্কেরে এডা কামের কাম অইছে’-টুনু তাড়াতাড়ি ছিপ গুটিয়ে খালই হাতে বাড়ির দিকে দেয় ছুট। তাড়াতাড়ি পা চালালে মাগরেবের আগেই হাটে পৌঁছা যাবে।

(রচনাকাল: আগস্ট-অক্টোবর ২০১৩)

শেয়ার করুন: