004636
Total Users : 4636
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

ধর্ম, ধর্ষণ ও যুদ্ধ

১৯৯৩ সালে আমি ধর্ষণ সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম যার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া ও বসনিয়ার যুদ্ধকালে ধর্ষিত নারীগণকে। আমি সেখানে বলেছিলাম— ‘নির্যাতনের পরিমাণ এতই ব্যাপক যে বিশ্ব সম্প্রদায় এখন  আর একে এড়িয়ে যেতে পারছে না এবং সচেতন মানুষেরা এ বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য হচ্ছে’, হয়ত আমার এ বিবেচনা ভুল ছিল।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অর্গানাইজেশন-এর প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়, পূর্ব যুগোস্লাভিয়ায় যৌন নিপীড়নকারি মাত্র তিনজন সৈনিককে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে এবং এ বিচার প্রক্রিয়ায় ধর্ষণকে গণ্য করা হয়েছে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে। তার মানে হল, নারীর ব্যক্তিত্ব কোনো স্বতন্ত্র অনুভূতি নয়, এটি মানবতার সাথে একিভূত।

এমনকি এই চিন্তাগত অবমূল্যায়ন এতদূর বিস্তৃত যে ২০,০০০ জন নারী সৈনিকের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে প্রতি ৩ জন নারী সৈনিকের ২ জন কর্মক্ষেত্রে কোনো-না-কোনোভাবে যৌন-নিপীড়নের শিকার। খোদ নারী সৈনিকদের অবস্থাই যদি এই হয় তাহলে অন্যসব সাধারণ স্তরের নারীর অবস্থা নিশ্চয়ই এর চেয়ে খুব একটা উন্নত হবার কথা নয়।

নারীর প্রতি এহেন অমানবিকতা, যা মূলত যুদ্ধকালে ব্যাপক ও হিংস্র হয়ে ওঠে, তার কারণ অনুসন্ধান করতে হলে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে পিতৃতান্ত্রিক ধার্মিকতার দিকে, যেখানে প্রথম রোপিত হয়েছিল এ ‘ধর্ষণ’ নামক বিষবৃক্ষটি।

পুরাতন নিয়মে ধর্ষণকে উপস্থাপন করা হয়েছে অন্যতম যুদ্ধকৌশল ও প্রতিশোধ গ্রহণের উপায় হিসেবে। মেয়েরা সর্বকালেই পুরুষের সম্পত্তি এবং শত্রুপক্ষ পদানত হলে তাদের মেয়েরা হয়ে পড়ে ‘গনিমত’ বা ‘যুদ্ধলব্ধ ধন’। পাশাপাশি বাইবেল এ ধারণাও প্রতিষ্ঠা করে যে ধর্ষণ পুরুষের অপর দশটি কাজের মতোই একটি কাজ মাত্র। সুতরাং যোদ্ধা, দস্যুদল, পথিক, প্রেমিক, নিকটাত্মীয় এমনকি পিতা কর্তৃক যৌন-নিপীড়নের গল্পে পুরো বাইবেল ভর্তি।

দৃষ্টান্তস্বরূপ, মুসা ঈশ্বরের আদেশে মাদিয়ানবাসিদের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছিলেন, বিজয়লাভের পর স্বীয় সৈনিকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন— ‘সেসব নারীকে হত্যা কর যারা সম্ভোগ স্বাদপ্রাপ্ত’ অথচ কুমারিদের ব্যাপারে তার নির্দেশনা ছিল— ‘তাদেরকে স্বীয় সম্ভোগের জন্য বাঁচিয়ে রাখ’।

দ্বিতীয় বিবরণে যুদ্ধকালে সৈনিকদের আচরণ কেমন সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশ দেয়া আছে এর ২০তম অধ্যায়ে— ‘নগরির নারী, শিশু ও গবাদি পশুসমূহ তোমরা দখল করবে’। যদি কোনো বীর যোদ্ধা ‘যুদ্ধবন্দিদের মাঝে কোন সুন্দরি রমণি দেখতে পায় ও তার জন্য কামনা অনুভব করে, তাহলে সে বিনা বাধায় তাকে নিজের ঘরে নিতে পারবে, তার মাথা কামিয়ে, কাপড় পাল্টে, নখ কেটে তাকে নিজের করে তুলতে পারবে’ এবং একমাস পর ‘তার ভেতরে প্রবেশ করবে’ অর্থাৎ তাকে ধর্ষণের অধিকার প্রাপ্ত হবে। বিপক্ষদলের নারীদের সম্ভ্রমহানির হুমকিও একটি যুদ্ধকৌশল।

নবী ইশাইয়াও দাবি করেছিলেন যে, ঈশ্বর তাকে নির্দেশনা দিয়েছেন যেন ব্যাবিলনের ‘শিশুদেরকে নগরবাসিদের চোখের সামনে টুকরো টুকরো করা হয়, তাদের বসতভিটা ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হয় এবং তাদের নারীদের ধর্ষণ করা হয়’।

বাইবেলে স্বীয় গোত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিজ নারীদেরকে ব্যবহারের গল্পও বর্ণনা করা হয়েছে। আদি পুস্তকের ১৯তম অধ্যায়ের একটি গল্প এরকম দুজন ফেরেশতা সাদুম শহরে লুতের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। সাদুমবাসিগণ তখন ফেরেশতাদের আক্রমণ করতে উদ্যত হলে লুত তার দু’টি কুমারি কন্যাকে তাদের হাতে তুলে দিয়ে বলেন, ‘এদের সাথে যা ইচ্ছা হয় কর কিন্তু ঐ দুজনকে কিছু করো না’।

অন্য একটি গল্পও উদ্ধৃত করছি— এক ধর্মযাজক তার পালিয়ে যাওয়া রক্ষিতাকে ধাওয়া করতে করতে তার বাড়ি গিয়ে হাজির হন। রক্ষিতা মেয়েটির বাবা তাকে দেখতে পেয়ে আনন্দের সাথে তার জিনিস তার হাতে তুলে দেয়। মেয়েটিকে সাথে নিয়ে আসার পথে রাত হয়ে গেলে যাজক বিনইয়ামিন গ্রামে এক বৃদ্ধের গৃহে আশ্রয় নেন।

কিন্তু রাতে একদল বিকৃত যৌনাচারসম্পন্ন পুরুষ সেই ঘরের দরজা ধাক্কাতে থাকে এবং বৃদ্ধকে তার অতিথিসহ বেরিয়ে আসতে বলে যেন তারা সেই অতিথির সঙ্গিনি মেয়েটিকে ধর্ষণ করতে পারে।

চিরাচরিত ধারণা হল, পুরুষ তার পরিবারের রক্ষাকর্তা। কিন্তু এক্ষেত্রে দেখা যায় অতিথিই নমস্য, যেহেতু সে-ও পুরুষ যার কারণে বৃদ্ধ গৃহস্বামি বাইরে এসে বলে— ‘এই লোকটি আমার অতিথি। তোমরা আমার কন্যা ও এ লোকটির সঙ্গিনির সাথে যা মনে চায় তাই কর। কিন্তু এ লোকটির কোনো ক্ষতি কর না’।

সকালে ধর্মযাজক দেখতে পেলেন মেয়েটি দরজার চৌকাঠের কাছে পড়ে আছে। তিনি আদেশ দিলেন ‘ওঠো, যাওয়া যাক’। কিন্তু মেয়েটি নড়ছে না দেখে তার দেহ একটি গাধার পিঠে তুলে তাকে নিয়ে বাড়ি আসেন এবং মেয়েটির দেহ কেটে চারটি টুকরো করে ইসরাইলের চারটি গোত্রের কাছে পাঠান। এ নৃশংসতার উদ্দেশ্য ছিল ইসরাইলের প্রতিটি গোত্রকে বিনইয়ামিনের বিপক্ষে ক্ষেপিয়ে তোলা।

এরপর উভয়গোষ্ঠি এক রক্তক্ষয়ি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কিন্তু কোনো পক্ষই স্বীকার করেনি যে, মেয়েটির প্রতি যে আচরণ করা হয়েছিল তারা তার জন্য ক্ষিপ্ত, বরং এটি ছিল তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের লড়াই।

পুরাতন নিয়মে স্ত্রী, রক্ষিতা, কুমারি, চালিকা সবই সমার্থক অর্থে ব্যবহৃত হত এবং তখন ‘স্ত্রী’ শব্দটি ব্যবহৃত হত অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘ধর্ষণ’কে বৈধতাদানের কৌশলরূপে।

তখন হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ করে বৈধতা পাওয়া যেত যেহেতু ‘ইসরাইলের কোনো রাজা ছিল না, প্রতিটি মানুষই তার বিবেচনায় যা সঠিক তাই করত।’ আসলে সর্বক্ষেত্রেই ‘ধর্ষণ’ পুরুষের প্রতি পুরুষের, যোদ্ধার প্রতি যোদ্ধার এক গোপন ইংগিত, সাধারণ বিশ্বাস হল, ধর্ষিতা নারী তার পরিবারের জন্য ‘লজ্জার কারণ’ কিন্তু অন্তর্নিহিত সত্য হল, ধর্ষিতার আত্মীয় পুরুষগণ লজ্জিত হয় ও অপমানিত বোধ করে কারণ তাদের মতোই এক পুরুষ তাদের নিজস্ব নারীদেরকে ‘দূষিত’ করেছে।

এ কারণেই রাজা দাউদের পুত্র আবসালোমকে তার মন্ত্রণাদাতা নবী হোশিয়াও উপদেশ দিয়েছিলেন— ‘তোমার পিতার রক্ষিতাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ কর (অর্থাৎ ধর্ষণ কর)… এতে করে পুরো ইসরাইল জানবে যে তুমি তোমার পিতাকে ঘৃণা কর এবং এভাবেই তোমার দল ভারি হবে’

দাউদ এরপর গতানুগতিক পিতৃতান্ত্রিক বিবেচনায় তৎক্ষণাৎ তার সকল রক্ষিতাদের নির্বাসন দিয়েছিলেন, তিনি সেই নারীদের সুরক্ষার জন্য এমনটি করেননি, বরং তিনি এটা করেছিলেন যেন অন্য কেউ তাঁর নিজের জিনিসে ভাগ বসাতে না পারে।

এমনকি আজো একজন মুসলিম ধর্ষিতাকে বেঁচে থাকার জন্য তার পরিবারের পুরুষদের দয়ার মুখাপেক্ষি হয়ে থাকতে হয়, যারা তাকে ‘মুখরক্ষা’ কিংবা ‘পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য হত্যা করার অধিকার রাখে’। ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বসনিয়ার ইসলামি নেতৃবৃন্দ সাত পৃষ্ঠার একটি আবেদনলিপি বিশ্ব দরবারে পেশ করেন। যেখানে বলা হয়েছে— ‘আমাদের মাতা, কন্যা ও বধূদের সাথে যা ঘটছে তা মর্মান্তিক। মুসলিম দর্শনে জীবন মূল্যবান কিন্তু সম্মানের মূল্যই সর্বোচ্চ।’

বাইবেলও বলে ‘ধর্ষণ এক পুরুষ কর্তৃক অন্য পুরুষের সম্পদের ক্ষতিসাধন, কিন্তু কখনো কোথাও বলেনি যে এটি নারী ব্যক্তিত্বের ক্ষতিসাধন। এজন্য ধর্ষিতা যদি কারো স্ত্রী অথবা বাগদত্তা হয়ে থাকে, তাহলে ধর্ষণের শাস্তি কঠিন হয়ে থাকে।

কিন্তু কুমারিদের ধর্ষণ করলে ধর্ষক মেয়েটির বাবাকে অর্থ উৎকোচ প্রদান করে তাকে বিয়ে করতে পারে। এতেই তার পাপমুক্তি ঘটবে। কারণ ধর্ষণ হেতু মেয়েটি ‘দোষ লাগা পণ্য’ এবং সে এ জন্য কোনো রকম সম্মানের অযোগ্য।

অন্য একটি গল্পে এবার চোখ ফেরাই, যা বর্ণিত আছে বাইবেলের শামুয়েল খণ্ডের ১৩তম অংশে। আমর নামক কুমারিকে তার সৎ ভাই এমনোন ধর্ষণ করে এবং এরপর বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় যেন তাকে বিয়ে করতে না হয়।

আমর তখন বলে— ‘আমাকে তাড়ানোর পাপ আমার সাথে তার পূর্বে যা করেছ, তার চেয়েও মারাত্মক’ অর্থাৎ ধর্ষণ করলে পাপ নেই যদি ধর্ষক তাকে বিয়ে করে তার প্রভু সেজে বসে। এরপর আমরের নীল পোশাক সমাজপতিরা জনসমক্ষে খুলে নেয়, কারণ এমন পোশাক ‘কুমারিত্বের প্রতিক’।

সাম্প্রতিককালে টিভি রিপোর্টে জনৈক কুয়েতি শেখ রিপোর্টারকে বলেছে যে, তার চাকরানিটি ‘অপ্রকৃতিস্থ’। তাই সে তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তুলেছে, আর আদালত বলছে ‘মেয়েটি পেশাদার পতিতা, যেহেতু সে বলছে তাকে চারবার ধর্ষণ করা হয়েছে’। তার মানে একাধিক যৌন সম্পর্ক হয়ে থাকলে সে দোষ মেয়েটির, যদিও সেটা তার অমতে হয়েছে।

হাজার বছর আগে ধর্ষণ-সম্পর্কিত বিচারের নীতিমালা নির্ধারিত হয়েছে এভাবে— ‘যদি কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে যে ক্রিতদাসি, কারো বাগদত্তা নয়, তাহলে তাকে চাবুক মারা হবে এবং পুরুষটির অর্থদণ্ড হবে…। এভাবে ওদের পাপমুক্তি ঘটবে।’

নারীদের প্রতি এ অমানবিকতার ধরন বুঝতে হলে নারীকে কিভাবে নির্দিষ্ট একটি ‘অমরত্বের’ ধারক ভাবা হয় সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে, সকল পিতৃতান্ত্রিক ধর্ম যেমন খ্রিস্টান, ইহুদি ও মুসলিম বলে যে পুরুষগণ স্ত্রীদের ওপর কর্তৃত্বকারি যেন তাদের রক্তের ধারা সচল থাকে এবং তাদের উপাধি ও সম্পদ তাদের পুত্রদের মাঝে বেঁচে থাকে।

ঈশ্বর ইব্রাহিমকে বলেছিলেন যে তার সন্তানেরা ‘তারকারাজির ন্যায় অসাধারণ’ হবে। আদি পুস্তকের ১২তম অধ্যায়ে আছে ‘প্রভু ইব্রাহিমকে বললেন, যখন তোমার বীর্যকে তোমার ভূমিতে অর্পণ করবে। তুমি প্রথম পুত্র লাভ করবে যে তোমার সবকিছুর উত্তরাধিকার প্রাপ্ত হবে’।

দাউদ এরকম আশ্বাস পেয়েছিলেন এভাবে— ‘তোমার উত্তরপুরুষগণ এ দেশ শাসন করবে এবং তুমি পুত্রদ্বারা রাজত্বের অমরত্ব উপভোগ করবে।’

মজার ব্যাপার হল, ধর্ষণ একটি ধর্মিয় শাস্তি ও ইশাইয়া জেরুসালেমের কন্যাদেরকে তাদের অহংকার ও স্বাধীন চেতনার জন্য হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর ওদের গুপ্ত অঙ্গগুলো প্রকাশিত করবেন’ অর্থাৎ ধর্ষণ দ্বারা তাদের অপমানিত করবেন।

ইজকিয়েল ঈশ্বরের ভাষ্যে বলেছেন— ‘বৃদ্ধ ও যুবকদের হত্যা কর, নারী ও শিশুদের শেষ করে দাও’। তার ছিল দুজন স্ত্রী, এর মধ্যে একজন যুবক বয়সি এক সৈনিকের প্রতি আকৃষ্ট হলে তিনি তাকে আশেরিয়দের হাতে তুলে দেন, কারণ মহিলা আশেরিয় দেবতার অনুসারি ছিল।

আশেরিয়গণ তাদের দেবতার আদেশ অমান্যের অপরাধে মহিলাদের ‘নগ্ন ও হত্যা করে’ এবং তার সন্তানেরা ‘ক্রিতদাসে পরিণত হয়’। ইজকিয়েল বলেন— ‘সে ঠিক তাই পেয়েছে, যা সে কামনা করেছিল’। অথচ ক্রিতদাসে পরিণত হওয়া সন্তানেরা কিন্তু তারই ঔরসজাত।

অ্যানি লরি গেইয়্যার তার War to the Women এবং The Bible tells me so-তে বলেছেন— ‘অসম যৌনতার ওপর কর্তৃত্বকারি নীতিসমূহ নারী শরীর এবং নারীব্যক্তিত্ব, উভয়ের প্রতি অসুস্থ ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ। এটা বিস্ময়কর যে আমাদের সংস্কৃতি এমন একটি গ্রন্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় যেটি থেকে তার সহকর্মীকে ধ্বংসের প্রেরণা পাওয়া যায়।

যদিও জেনেভা কনভেনশনে ধর্ষণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু এটি যুদ্ধ অপরাধরূপে বিবেচিত হয়নি। এমনকি অধিকাংশ ধর্ষণের তদন্ত কিংবা বিচার হয় না। আমেরিকান যোদ্ধাদের ধর্ষণকে সর্বোচ্চ অপরাধরূপে গণ্য করা উচিত, যারা তাদের সহকর্মী নারী যোদ্ধাদের ওপর নিপীড়ন চালায়। ম্যাডেলিন অলব্রাইটও জাতিসংঘে প্রস্তাব করেছেন যে ‘ধর্ষণ একটি যুদ্ধ-অপরাধরূপে গণ্য হওয়া উচিত এবং সেভাবেই তার বিচার ও শাস্তি হওয়া উচিত।’

আমার মনে হয় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীগণেরও উচিত এ-স্পর্শকাতর বিষয়টিকে তাদের নির্বাচনি প্রচারণায় স্থান দেয়া যাতে জনসমর্থন বৃদ্ধিই পাবে।

মূল: আইরিস জে. স্টুয়ার্ট

অনুবাদ : লায়লা ফেরদৌস ইতু

বর্ষ ৬, সংখ্যা ১০, ফেব্রুয়ারি ২০০৭

শেয়ার করুন: