004587
Total Users : 4587
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

ধর্ম, নারী ও যৌনতা প্রসঙ্গ: হাওয়া-পুরাণ অথবা জননির স্ত্রীতে রূপান্তর

হাওয়া। আদম-স্ত্রী, এবং তাকে তার ঘুমন্ত স্বামির বুকের বাঁ পাজর থেকে সৃজন করা হয়েছে। তবে এভাবে বক্ষচ্ছেদেও স্বামির কোনও ব্যথা অনুভূত হয়নি। অন্যথায় কোনও মানুষই তার স্ত্রী থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারত না। একটি জীবন্ত সত্তা থেকে সৃষ্ট হওয়ায় আদম তার নাম দিলেন হাওয়া। আদমের সৃজন ঘটল ধূলি থেকে, হাওয়া হাড় থেকে, দিন যত যেতে লাগল পুরুষেরা দেখতে সুন্দর হতে লাগল, কিন্তু মেয়েরা হতে থাকল কুৎসিত। হাওয়ার নামটি কুরআনে নেই, তবে শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে তিনি নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করেন,-এই আদিপাপের কারণে তাকেই দোষি সাব্যস্ত করা হয়। ঐতিহ্য মতে, হাওয়া নিজ স্বামিকে প্রথমে মদ খেতে প্রলুব্ধ করেন, পরে তাকে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়ান-আদিপাপ সূচিত হয় এরূপেই। আর তখন থেকে মদ সবধরনের খারাবির উৎস বলে বিবেচিত হতে থাকে। অন্য বর্ণনা মতে, মদ চিরন্তন দুঃখ ডেকে আনে। হাওয়াকে প্রদত্ত দশ শাস্তি-রজঃস্রাব, গর্ভধারণ, কষ্টের মধ্যদিয়ে সন্তানপ্রসবসহ তার উত্তরাধিকারিণিদের নিকট মায়ের অবাধ্যতার স্মারক। তবে সান্ত্বনাস্বরূপ তাকে এরকম নিশ্চয়তা দেয়া হয় যে, সন্তানপ্রসবকালিন কষ্টের প্রতিদানে স্বামি অনুগত প্রতিজন সতিসাধ্বি স্বর্গবাসের অংশ পাবে। সন্তান জন্মদানকালে মৃত্যু হলে তার নাম শহিদের তালিকায় লিপিবদ্ধ হবে এবং স্বর্গে স্বামির সঙ্গে মিলিত হবে। ঈশ্বর, জিব্রাইল এবং অন্য ফেরেশতাদের উপস্থিতিতে সম্পাদিত আদম হাওয়ার বিয়ে নিয়ে ইহুদি এবং আরবসূত্রগুলো মোটমাট একই ধরনের শব্দাবলির প্রয়োগ করে।…-Islam, Shorter Encyclopaedia Of/Hawa
বাইবেলে নারী সৃজন সম্পর্কিত দুটি গল্প রয়েছে। প্রথমটি মতে, নারীকে সৃষ্টি করা হয়েছে সৃষ্টির ষষ্ঠ দিনে-আদমের সঙ্গিরূপে, একইভাবে। তথা নারী ঈশ্বরের প্রতিরূপ, পুরুষের মতোই এবং কর্তৃত্বেও সমঅংশিদার। তবে আদননিবাসি পুরুষটির ওপর নারীকে ‘দেখেশুনে’ রাখার দায়িত্ব অর্পিত হয়। কিন্তু পরে এসে ঘটনাধারা বদলে যায়। দেখা যায় যে, নারী (ইভ) সৃজিত হয়েছে আদমের পরে এবং আদমের দেহেরই অংশ; তাকে সৃজনের উদ্দেশ্য আদমের নিঃসঙ্গতা মোচন। এভাবে নারী তার স্বাধিন সত্তা এবং সমব্যক্তিত্ব খুইয়ে পুরুষেরই অধিনস্থ হয়ে পড়ে। এমনকি তার নামকরণও ঘটে সেইভাবে যে, পুরুষের দেহের অংশ হওয়ায় তার নামও হবে নারী বা স্ত্রীলোক। তৃতীয়ত, সৃষ্টি-পর্ব অতিক্রমণ শেষে ঘটে স্বর্গচ্যুতি। একদিন সাপ এসে তাকে প্ররোচিত করল এবং বলল যে, জ্ঞানবৃক্ষ তার চোখ খোলে দেবে; একইভাবে পুরুষটিরও। এতে করে তারা দু’জনই ঈশ্বরের সমকক্ষ হয়ে ওঠবে। নারী তখন বিভ্রান্ত হয়-প্রথমে নিজে নিষিদ্ধ ফল খায়, পরে তার পুরুষ-সঙ্গিকে খাওয়ায়। যার ফলে দুজন বস্ত্রহীন হয়ে পড়ে, আর দোষ এককভাবে নারীর ওপর চাপে। এরপর নেমে এল শাস্তি। প্রথমে শাস্তি পেল নারী এবং সাপ। বলা হল যে, সাপ ও নারী এবং সাপের বংশধর ও নারীর সন্তানদের সম্পর্ক হবে শত্র“তার। এছাড়া শাস্তি হিসাবে নারীর গর্ভকালিন কষ্ট বাড়িয়ে দেয়া হল। এভাবে জন্ম নিল লিঙ্গবৈষম্য। বলা হল, স্বামির জন্য তার কামনা জাগবে; আর স্বামি ব্যক্তিটিও তার ওপর কর্তৃত্ব ফলাবে।

কে এই হাওয়া?
এক.
ইভ (হিব্রু হাওয়া; Hawwah),…বাইবেলিয় জেহোবা ধারায় প্রথম নারীকে এই নাম দেয়া হয়েছে। অধ্যায় ৩ পঙ্ক্তি ২০ আদিপুস্তক মতে, প্রথম নারী হাওয়া নামে অভিহিত, কারণ তিনি ছিলেন জীবন্ত সকলের জননি (যবু)। বাইবেলিয় হাওয়ার মতো কুরআনি হাওয়ার উৎসও একই,-অর্থ সম্ভবত ‘জীবন’: ‘জীবন্ত’ অথবা ‘জীবনদাত্রির’ বদলে-হাওয়াকে হে’র (hayy), গোষ্ঠির সঙ্গে সংযুক্ত করে দেয়। তাছাড়া হাওয়া হতে পারে, সকল গোষ্ঠি, সকল মানুষ এক সাধারণ মায়ের বংশধর-এমন একটি ভাবনার ব্যক্তিয়ায়ন। ওয়েলহাউসেন একটি আদি ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন এবং অন্য অনেক আধুনিক পণ্ডিত মনে করেন হাওয়া অর্থ-‘সাপ’। এবং তারা আদিপুস্তকে একটি আদি বিশ্বাসের এরকম চিহ্ন খুঁজে পান যে, পৃথিবীস্থ জীবন সঞ্চারিত হয়েছে একটি সাপে, যেমন, কিছু বেবিলনিয় মহাজাগতিক ভাবনায়, সকল বস্তুরই উৎসারণ ঘটেছে আদি ড্রাগন তিয়ামাত থেকে। জিমারুর মতে, বাইবেলিয় ইভকাহিনি প্রভাবিত হয়েছে বেবিলনিয় দেবি ইশতার-পুরাণ থেকে। স্কিনার নাম হাওয়া এবং সেমিত শব্দ সর্পের মধ্যে যোগাযোগ দেখিয়েছেন। তাছাড়া-‘‘অতি স¤প্রতি ভাষাবিদ্যাগত সমিকরণ নতুন গুরুত্ব পেয়েছে একটি নামের আবিষ্কার থেকে… একটি সিসার ওপর পিউনিক টেবিলা ডেবোশেনিসে (Punic tabella devotionis)… যার ওপর রচিত প্রথম পঙ্ক্তি: ‘হে নারী,… দেবি, রানি…!’ লাইডজবারস্কির মতে, এই পৌরাণিক ব্যক্তিত্বময়ি একজন পাতাল দেবি যেভাবে তিনি একজন সর্পদেবি; এবং তিনি বাইবেলিয় হবা। হাওয়া এভাবে হয়ে যান এক ‘কেন্দ্রিয়’ উপাস্য-তার প্রতিরূপ ফিনিশিয় পাতাল দেবি, তিনিও পূজিত হতেন সাপের মুরতিতে, এবং খেতাব বহন করতেন ‘জীবন্ত সকলের জননি’।’’-Encyclopaedia of Ethics and religion/Eve
পণ্ডিতদের মতে, অধ্যায় ৩ পঙক্তি ২০ এবং অধ্যায় ৪ পঙ্ক্তি ১-২৫

আদিপুস্তকের ইভসূত্র প্রাচিনতম সৃষ্টিকাহিনি নাও হতে পারে, সেটি সম্ভবত পরবর্তি জেহোবা স্তরের। অধ্যায় ২ পঙ্ক্তি ২৩ আদিপুস্তকে দেখা যায় যে, মানুষের মানুষ নামকরণ ঘটেছে প্রথম নারী ‘ইশ্শা’র নামে [Ishshah (সাধারণ হিব্র“ অর্থ, নারী, কারণ তাকে একজন মানুষের ইশ থেকে নেয়া হয়েছিল, অথবা সবচে ভাল যে তার স্বামি ইশাহ ((ishah) থেকে] কিন্তু আধুনিক পণ্ডিতবর্গ এ ধরনের উৎপত্তিকরণ নির্দেশকে মেনে নেন না। তারা মনে করেন, ইশাশা (ishshah) এসেছে শ্ ((hsh) থেকে-মৃদু ও ভঙ্গুর, এবং ইশ্ ((ish), ইয়াশ (ysh) থেকে, ‘জোরদার হওয়া’। তাছাড়া ইশ্ একটি আদি বিশেষ্য, যেকোনও ক্রিয়াবাচক উৎস থেকে স্বাধিন।

বাইবেলিয় পুরুতধারা মতে, মানবজাতি সৃষ্টি হয়েছিল নারী ও পুরুষে এবং প্লাবন-পূর্ববর্তি সকল গোষ্ঠিপিতাই কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু বাইবেল গোষ্ঠিপিতাদের স্ত্রীদের ব্যাপারে কিছুই জানায় না, এমনকি তাদের কোন একজনেরও নাম নেয়নি। অধ্যায় ৭ পঙ্ক্তি ১৯ পুরুতধারা নোয়ার স্ত্রী এবং তার তিন পুত্র সম্পর্কে অনেকটা বিবরণ দেয়। তবে প্রথম নারী হাওয়া নিজ নাম-সহ পুরুতধারায় উলি­খিত হয়েছেন। জেহোবা এরই মধ্যে লেমকের দুই স্ত্রী-আদা এবং সিল­ এবং তার মেয়ে নয়মার নামের উলে­খ করেছে। তবে লেমক কোনও গোষ্ঠিপিতার পর্যায়ে পড়েন না।

ইভের পরিচয় দেয়ার ক্ষেত্রে কাবিলের জন্ম বিবরণ একটি বিশেষ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এ সম্পর্কিত শব্দগুলো ভীষণ দুর্বোধ্য এবং মূলপাঠও সম্ভবত বিকৃত। বাইবেলের সংশোধিত সংষ্করণে (রিভাইজড ভার্সন) অনূদিত রূপ: ‘আমি মানুষকে পেয়েছি ঈশ্বরের সাহায্য সহকারে’। অন্য অনুবাদ যে, ‘আমি একজন মানুষকে জন্ম দিয়েছি, এমনকি ইয়াহওয়েকে’-এই পঙ্ক্তিগুলো বোঝা হয় ইভবিশ্বাসের প্রকাশস্বরূপ যে অধ্যায় ৩ পঙ্ক্তি ১৫তে প্রতিশ্র“ত মসিহ এখন জন্ম নিয়েছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের নিকট এ বিষয়টি ব্যাখ্যারও অনুপোযোগি। শেনের মতে, বাইবেল রচয়িতারা এগুলোকে বিশুদ্ধ ঐতিহাসিক অথবা বিশুদ্ধ রূপক কোনওটিই করেননি,-তারা ঘটনাবলির সারাংশকে একটি প্রতিকি রূপ দিয়েছেন।… ‘আদম ও ইভের কিতাব’কে ‘শয়তানের সঙ্গে আদম ও ইভের সংঘাত’গ্রন্থ হিসেবেও অভিহিত করা হয়। পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ শতাব্দিতে এটি আরবি অথবা সিরিয় ভাষায় রচিত হয়েছিল একজন অর্থোডক্স খ্রিস্টানকে দিয়ে। কাহিনি শুরু হয় আদম ও ইভের যতটুকু সম্ভব বিস্তৃত বিবরণ-সহ, তবে গোষ্ঠিপিতারা খুব একটা গুরুত্ব পাননি। তাদের জন্য কম জায়গাই বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এতে ইব্রাহিম থেকে দ্বিতীয় আগমন পর্যন্ত বর্ণনার একটি সারনির্যাসই কেবল মিলে।

দুই.
এরকমও বলা হয় যে, একমাত্র সাপ ছাড়া আদি ইভের কোনও জোড় ছিল না, একটি জীবন্ত শিবলিঙ্গ-ইভ তাকে সৃষ্টি করেছিলেন আপন যৌনআনন্দ পেতে। কোনও কোনও আদি গোষ্ঠি দেবি এবং তার সাপকে নিজেদের আদি পিতা-মাতারূপে দেখে থাকে। পবিত্র চিহ্ন থেকে দৃষ্ট হয় যে, দেবি একজন মানুষকে জীবন দিচ্ছেন, যখন তার সাপ তার পিছনকার আপেল বৃক্ষের চারপাশ পেঁচিয়ে আছে। পণ্ডিতদের মতে, এ ধরনের চিহ্নের ভুল ব্যাখ্যা আদিপুস্তকের মত সংশোধিত সৃষ্টিপুরাণ রচনায় ভাবনা যুগিয়েছে। প্রথম খ্রিস্টপূর্ব শতাব্দির কিছু কিছু ইহুদি ঐতিহ্য, জেহোবাকে সর্পদেবতার সঙ্গে দেখিয়েছে-জেহোবা নিজের বাগানে জননিকে সঙ্গ দিচ্ছেন। এই জননিই কখনও ইভ, কখনও নেহেমাহ, নামা, অথবা নামরায়েল, যিনি আদমকে জন্ম দেন কোনও পুরুষ ব্যতিরেকেই, এমনকি সাপকেও।

জননি আদমকে জীবন দিয়েছিলেন, কারণ জেহোবা উদ্ধতভাবে একক জেহোবা হওয়ার ভান করতেন। নস্টিক শাস্ত্রমতে, জেহোবাকে শাস্তি দিতে ইভকে বাধ্য করা হয় (তবে এটি বলা হয়নি যে কি উপায়ে)। যদিও জীবন্ত সকলের জননি সবকিছুর আগে থেকেই অস্তিত্বশিল ছিলেন, কিন্তু ঈশ্বর ভুলে গিয়েছিলেন যে তিনি নিজেও একজন সৃষ্ট, এবং তার স্রষ্টাও সেই জননি। তাছাড়া জননি তাকে নিজ সৃজনক্ষমতারও কিছু দিয়েছিলেন। জেহোবা ‘এমনকি নিজ মাতাকেও বিস্মৃত হয়েছিলেন।…’ এটি হয়েছিল কারণ তিনি ছিলেন জননি সম্পর্কে নির্বোধ এবং অজ্ঞ, যে কারণে তিনি এ কথা বলতে পেরেছিলেন যে ‘আমি ঈশ্বর, আমা পাশে আর কেউ নেই।’ নস্টিক পাঠ ক্ষেত্রবিশেষে এও দেখায় যে, স্রষ্টা তারচেয়েও ক্ষমতাবান এবং আদ্য নারীশক্তি দ্বারা বকুনি খাচ্ছেন এবং ঔদ্ধত্য দেখাতে গিয়ে শাস্তিও পেতে হচ্ছে।

কাহিনি মতে, স্রষ্টার গোপন ইসমে আজম (Name of power), পবিত্র নাম, তার তিনভাগ শক্তি ইভের, ঈশ্বরের নিজের নয়। ইয়াহওয়ে (YHWH,  yod-he-vau-he) উদ্ভূত হয়েছেন হিব্র“ উৎস ইয়াহ (ঐডঐ), অর্থ ‘জীবন’ ও ‘নারী’ থেকে;-লাতিন হরফে ইভ (ঊ-ঠ-ঊ)। একটি অতিরিক্ত দও (ুড়ফ), এটি দেবির নামের শক্তির পরিমাপক করে হও (Word of creation) হিসেবে। এবং দেবির এরকম শক্তিশালিনি,-এই ভাবনার কোনও ব্যতিক্রম ছিল না,-মিশরসমেত অন্য প্রাচিন দেশগুলোতে তা ছিল একটি সাধারণ ব্যাপার। নস্টিক মত এই যে, ইভ কোনও ঈশ্বর সৃজিত নন, বরং ইভ আদমকে নিজের জবানের (Eve’s word) শক্তিদ্বারা সৃজন করেছেন। আদম নামের অর্থ- আদম গঠিত হয়েছিলেন রক্তের সঙ্গে মিশ্রিত মৃত্তিকা দ্বারা, আদামাহ অথবা ‘রক্তদাগ মাটি’র নারীজাদু। আদম নিজ পাঁজর থেকে জীবন্ত সকলের জননিকে সৃজন করেননি। আদি মেসোপটেমিয় কাহিনিগুলোতে বরং আদম নিজেই জীবন্ত সকলের জননিদ্বারা উৎপন্ন।

বিশেষজ্ঞ ভাষ্যমতে, বাইবেল আদিতম উৎস পুরাণকে অনুসরণ না করে ঠিক তার বিপরিত পুরাণ রচনা করেছে। যেমন আদিতম পুরাণে দেখা যায়, দেবি পুরুষজাতির আদিপিতাকে নিয়ে আসছেন, তারপর তাকে নিজের সঙ্গি নির্বাচন করছেন-এ ধরনের সর্বত্র উপস্থিত, প্রথামাফিক স্বর্গিয় নিকট-যৌন সম্পর্ক অন্য পুরাণগুলোতেও মিলে। তাছাড়া নস্টিকমতে, ইভ শুধু আদমসৃজন এবং তার স্বর্গেপ্রবেশ অনুমতি অক্ষুণœ রাখেননি-বরং তিনি তার সৃজিত আদমের ভেতরকারও পরম আত্মা ছিলেন, যে শক্তি প্রতিজন হিন্দু দেবতা এবং যোগির আত্মায় বিরাজমান থাকত। আদম বেঁচে থাকতেন ‘জননি থেকে প্রাপ্ত’ শক্তিদ্বারা-তাই পুত্রের মমতায় জননিও নেমে এলেন, আর সেই জননিই সুআত্মা। আদমের ঈশ্বরচিন্তা অভিহিত হল ‘জীবন’ (হাওয়া) নামে। জননি তার পুত্র আদমের ভেতর অনুপ্রবিষ্ট হলেন পুত্রের সচেতনতার পথনির্দেশক আত্মারূপে। জননিকে দিয়েই পুত্র অজ্ঞতার ঊর্ধ্বারোহণে সক্ষম হন-যা তার ওপর আবার পুরুষ ঈশ্বরই আরোপ করেছিলেন।

বলা হয়, এভাবে নস্টিক চিন্তা মিদরাশিয় রূপ পায়: আদম এবং ইভ মূলত অ্যান্ড্রোজিনাস, যেমন শিব এবং তার শক্তি। ইভ আদমের ভেতর বাস করতেন এবং আদমও বাস করতেন ইভের ভেতরে-তারা ছিলেন এক দেহে দুই আত্মা, পরে ঈশ্বর এদের বিচ্ছিন্ন করে দেন। কাব্বালিয়রা এ থেকে বিশ্বাস করে যে, আদনের স্বর্গ ফিরে পাওয়া সম্ভব এবং তা তখনই, যখন দুই লিঙ্গ একাধিকবার একত্রিত হবে; এমনকি ঈশ্বর নিজেও একত্রিত হবেন তার শেকিনাহর সঙ্গে।

খ্রিস্টান ধর্মতাত্তি¡করা আদমের স্বর্গচ্যুতি ঘটনায় ঈশ্বরের ওপর দোষ চাপান না। বরং তাদের নিকট আসল দোষি ইভ। তাদের মতে, ইভের কারণেই মানুষের পতন। মুসলিম ঐতিহ্যও একই-ইসলামি ভাষ্যগুলো বিরচিত হয়েছে এই বলে যে, মা হাওয়া যদি তার স্বামির খেয়ানত না করতেন তাহলে কোনও নারীই স্বামির খেয়ানত করত না। খ্রিস্টিয় মতে, ইভ সর্পদ্বারা গর্ভবতি হন এবং এরপর মৃত্যু আসে। নারী জাতির বীজ ইভের মধ্যে আগেই অস্তিত্বশিল হয়ে পড়েছিল। এর ফলে নারীর ‘দ্বিচারিত্বে’র হেতুও ইভ। যেসব নারী নিজ নিজ স্বামির চাহিদা মেটাতে অসম্মতি দেখাবে এবং ঈশ্বররূপে তার পূজা না করবে তারা স্বর্গবাসের অনুপোযোগি। যদিও এ প্রশ্নটিও উত্থাপিত করা হয় যে, ইভ না হয় মৃত্যুকে ডেকে আনলেন, কিন্তু অন্য প্রাণিদের মৃত্যুর কারণ কি, কে তা ডেকে আনল?

অ্যপোকেলিপসি অব আদম জানাচ্ছে: আদম তার পুত্র শামের সঙ্গে গল্প করছেন যে, তিনি এবং ইভ একত্রে সৃষ্টি হয়েছিলেন। কিন্তু ইভ তার ঊর্ধ্বতন! ইভ নিজের সঙ্গে করে গৌরব বয়ে এনেছিলেন। সেই গৌরব তিনি দেখেছিলেন ঈওনে, মানুষ যেখান থেকে এসেছে। পবিত্র নস্টিক গ্রন্থটি এও বলে যে, আদম এবং স্রষ্টার থেকেও ইভ বড়। তিনি ইভ, ঈশ্বর নন-যিনি আদমকে আত্মা দিয়েছিলেন, এরপর তার ভেতর সূচিত হয়েছিল জীবন। তিনি ইভ, ঈশ্বর নন-যিনি দুষ্ট দেবতাকে স্বর্গ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে পরে তাদেরকে দেওদানোতে পরিণত করেছিলেন। এবং ইভ, একজন চিরন্তন নারীশক্তিরূপে, কার্যত নিজসৃষ্ট ঈশ্বরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান,-তারপর তাকে দোষি দেখতে পেয়ে ধ্বংস করে দেন।

হাওয়া ধর্ষণ
বলা হয়, ইভধর্ষণ কাহিনি মূলত লাইলিত-পুরাণ এবং মানুষের স্বর্গপতন কিংবদন্তি সম্পর্কিত। ইহুদি রাব্বিনি সাহিত্য অনুসারে, লাইলিত ছিলেন আদমের প্রথম স্ত্রী। ঈশ্বর তাদেরকে সংযুক্ত করে একত্রে সৃষ্টি করেন। লাইলিত আদমের সমানত্বের দাবি জানান, বিশেষত যৌনকার্যকালে। লাইলিত তখন তার নিম্নগত হতে অসম্মতি জানালে আদম তাতে অসন্তুষ্ট হন। এ কারণে লাইলিত তাকে ছেড়ে লোহিত সাগরে চলে যান। অন্য কিংবদন্তি মতে, লাইলিত লোহিত সাগরে গিয়ে শয়তানের সঙ্গে মিলিত হন এবং তার গর্ভে প্রতিদিন প্রেতশিশু জন্ম নিতে থাকে। আদমের ক্রমাগত আবদারে বিগলিত ঈশ্বর লাইলিতকে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি আদমকে এক শান্তসুবোধ নারী দেন-তিনিই ইভ। কিন্তু এরপর ঘটনাধারা আবার মোড় নেয়, লাইলিত ইভকে আদমসঙ্গিনিরূপে দেখতে পেয়ে আবার ফিরে আসতে চান। ইভ তার নিকট এক দারুণ সুন্দরি হয়ে ধরা দেন। লাইলিত ইভের মধ্যে এক পবিত্র সৌন্দর্য অবলোকন করেন। কিন্তু, গল্প মতে, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। ঈশ্বর কারুবিদের দিয়ে আদমকে আটকে রাখেন।

পতন কিংবদন্তিতে দেখা যায় ইভ শয়তান দ্বারা প্ররোচিত হচ্ছেন। খ্রিস্টিয় বিশ্বাস মতে, সাপ ছিল ছদ্মবেশি শয়তান; শয়তানের অন্য নাম শামায়েল, লাইলিতের প্রেতপ্রেমিক। কাব্বালিয় মতে, নারীর ঋতুস্রাবকালিন রক্ত একটি অভিশাপ। এবং নারী এক্ষেত্রে ইভেরই উত্তরাধিকার। এই অভিশাপের পেছনে রয়েছে শামায়েলের ছদ্মবেশে হাওয়ার সঙ্গে লাইলিতের সঙ্গম। পুরাণকাহিনি জানায়, লাইলিত ইভকে প্ররোচনারত সর্পরূপধারি শামায়েলকে দেখতে পেলে লাইলিতের নিজেরই বাসনা জাগে সেই অভিজ্ঞতা-ঋদ্ধ হওয়ার। এবং তিনি ইভের ভেতর অনুপ্রবিষ্ট হন। ইভের ঋতুস্রাব রক্ত হয়ে ওঠে শামায়েলের প্রকৃত ‘বের করে দেয়া নোংরা বস্তু এবং পাপ বীর্য’। বলা হয়, এটি সম্ভবত রাব্বিনি শ্র“তিরই অনুসরণ যে, নারীর প্রকৃতিগত দুঃশ্চরিত্রতা এবং দুর্বলতার কারণে লাইলিত ইভকে প্ররোচিত করতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে নিজ ঋতুস্রাবকালে ইভ আদমকে প্রলুব্ধ করেন। একসময় আদমও এই নিষিদ্ধতায় জড়িয়ে নিজেকে ভ্রষ্ট করেছিলেন। ফলে লাইলিত ‘নিজের শরীর নিয়ে’ এলে আদম সেই অনিবার্যতা এড়াতে পারেননি। তাছাড়া আদম অনিচ্ছা দেখালেও লাইলিত তার নিকট থেকে বেশুমার দেওদত্যি-প্রেত আত্মা এবং পুত্র লিলিনদের জন্য বিপজ্জনক বীর্য চুরি করে নিয়ে যান। পণ্ডিতদের মতে, কাব্বালিয়রা শুধু এই হিব্র“ নিষেধ গ্রহণ করেনি যে মানুষ কোনও নারীর ঋতুস্রাবকালেই তার সঙ্গে যৌনমিলনে বিরত থাকবে, বরং পরবর্তি সাতদিনও তাকে ছুঁবে না। কাব্বালিয় বিশ্বাস এও যে, ইভের ঋতুস্রাব রক্ত ছিল সর্পরূপধারি শাময়েলের বীর্য এবং তা ঋতুকালিন রক্ত এবং কুন্দলিনি শক্তির মধ্যকার জোরাল সংযোগ নির্দেশ করে। যা সবসময় সর্পিয় বলে চিহ্নিত করা হয়। কাব্বালিয়রা মনে করে, ইভ যে কর্তৃত্ব আদমের ওপর খাটিয়েছিলেন, তা তার রক্তক্ষমতার বিশ্বাস নির্দেশক এবং নারীর অপ্রতিরোধ্যতা তুলে ধরে। এসময় একজন নারী কোনও পুরুষকে দিয়ে তার ইচ্ছাবিরোধি কাজও করিয়ে নিতে পারে, তথা পুরুষ তা করতে বাধ্য। এই প্ররোচনাকারি সক্ষমতা অথবা দান ইভকে শামায়েলের মাধ্যমে লাইলিতেরই দেয়া। তাই রাব্বিরা এটিকে বলতেন অভিশাপের দান। তাদের নিকট কাবিলের জন্মও ছিল এই অভিশাপের দান।

শেয়ার করুন: