004637
Total Users : 4637
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →
জন্ম— জুন, ০৬, ১৯৭৭। জন্মস্থান— উত্তর গোবীন্দর খীল, হাঁদু চৌধুরী বাড়ী, পটিয়া, চট্টগ্রাম। (শৈশব কৈশোর ও তারুণ্যের সময়যাপন) বেড়ে ওঠা (পূর্ব্ব বালিয়াদী, মীরশ্বরাই, চট্টগ্রাম) নানার বাড়ীতে। প্রকাশিত কবিতার বই— ফুলেরা পোষাক পরে না (সাল: ২০১৮, প্রকাশক : মনফকিরা, কলিকেতা)। প্রকাশিতব্য বই— অর্দ্ধনারীশ্বরবাদ : প্রকৃতিপুরুষতত্ত্ব (নন্দনতত্ত্ব), বটতলার বয়ান (ভাষাতাত্ত্বিক গদ্য) ও উদ্ভিদপ্রতিভা (কবিতা)। সম্পাদক— চারবাক।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

ফ্যাসিবাদ তখন ও এখন

বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়কে স্মরণ করবার মাধ্যমে আমরা এই বিষয়টি প্রকৃত অর্থে কি ছিল তা নিয়ে আলোচনা করবার পাশাপাশি বর্তমান সময়ের কিছু প্রবণতা সম্পর্কেও আলোকপাত করবার সুযোগ পেয়েছি।
বুর্জোয়া ইতিহাস ফ্যাসিবাদের নানাবিধ বহিঃপ্রকাশকে মোটের ওপর উদার, গণতান্ত্রিক আধুনিক ইউরোপীয় ইতিহাসের সাময়িক ভ্রান্তি হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে। মূলত জার্মানির ওপরই আলোচনা কেন্দ্রীভূত থাকে। বর্তমানে নাৎসি জমানার গণ-অপরাধ প্রবণতা ও হিংসাকে মূলত ইহুদীদের গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতেই স্মরণ করা হয়। এবং এর ব্যাখ্যা হিসেবে হিটলার ও তার সঙ্গীসাথীদের জাতিবিদ্বেষ, যুক্তিহীন ভাবনা ও ব্যক্তিগত জিঘাংসার ওপর গুরুত্ব আরোপ করবার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ইতিহাসের এক বিস্ময়কর বিকৃতি ঘটিয়ে অধিকাংশ বুর্জোয়া প-িতেরা নাৎসি প্রকল্পের মূল কারিগর হিটলারের সঙ্গে স্ট্যালিনকে যিনি কি-না বিশ্ব ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে নেতৃত্ব দেন, তাকে একই রকম দোষী একনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করছেন। প্রখ্যাত জার্মান ঐতিহাসিক আর্নস্ট নল্ট এই দুই শক্তির সংগ্রামকে নিছক ‘এক আন্তর্জাতিক গৃহযুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এ জাতীয় সংশোধনবাদী ইতিহাস নির্মাণের ধারা বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমী দেশগুলোতে বিশেষভাবে আধিপত্য করছে। কেবলমাত্র বামপন্থীরাই ফ্যাসিবাদকে তার প্রকৃত রূপের কথা মাথায় রেখে স্মরণ করছেন। এবার আমি কয়েকটি মূল বিষয়কে সূত্রায়িত করতে চাই।
১। ঐ দিনগুলোতে ফ্যাসিবাদ নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের সীমায় আবদ্ধ না থেকে বিশ্বব্যাপী চরিত্র লাভ করেছিলো। যে সমস্ত দেশে ফ্যাসিবাদীরা ক্ষমতা দখল করে জার্মানি তার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিলো, তবে ইতালি, স্পেন ও পর্তুগালেও এরা ক্ষমতা দখল করে। ইউরোপের বাইরে জাপান থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত ফ্যাসিবাদের বিস্তার ঘটে। এশিয়া ও আফ্রিকায় নানাবিধ রাজনৈতিক গোষ্ঠী যেমন লেবাননে ফালাঙ্গে, ভারতে আর এস এস বা হিন্দু মহাসভা এবং মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড ফ্যাসিবাদী ভাবনার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। যতোদিনে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয় ততোদিনে ইউরোপের অধিকাংশ দেশেই ফ্যাসিবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত  হয়ে গিয়েছে। পুঁজিবাদী উদার গণতন্ত্রের ঠাঁই হয়েছিলো কেবল অ্যাংলো-স্যাক্সন ইংল্যা- ও আমেরিকায়। ফ্রান্স থেকে ডেনমার্ক সর্বত্র নাৎসিরা তাদের হাজার হাজার এমন সহযোগী পেয়ে যায় যারা নাৎসি আগ্রাসনকে সংহত করে এবং দেশে দেশে পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে। সোভিয়েতের যুদ্ধে অংশগ্রহণ তাই কেবল কমিউনিজমের প্রভাবাধীন অঞ্চলেরই বিস্তৃতি ঘটায়নি, ইউরোপে উদার বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলো।
২। ষাট লক্ষ ইহুদীকে হত্যা করা অবশ্যই নাৎসিদের একটি জঘন্যতম অপরাধ কিন্তু এই ঘটনাকেও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন। অবশ্যই নাৎসিরা মূল দোষী ছিলো কিন্তু ইউরোপের ‘পশ্চাৎপদ’ দেশ পোল্যান্ড থেকে শুরু করে সুসভ্য ফ্রান্স সর্বত্রই নাৎসিরা এই কাজে অসংখ্য সহযোগীকে পেয়ে গিয়েছিলো। ষাট লক্ষ সংখ্যাটা ভয়াবহ সন্দেহ নেই কিন্তু বুর্জোয়া প-িতেরা নিয়ম করে এই তথ্যকে অস্বীকার করেন যে, নাৎসিদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে ২ কোটি সোভিয়েতবাসীর প্রাণনাশ হয়েছিলো। এবং যখন নাৎসিদের মারণফাঁদ থেকে পালিয়ে যাওয়া জাহাজ ভর্তি ইহুদীদের ফেরত পাঠিয়ে ছিলো আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র তখন তাদের জন্য নিজেদের সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিয়েছিলো সোভিয়েত ইউনিয়ন।
৩। ইউরোপের সীমারেখার মধ্যে নাৎসিদের পরিকল্পনা মাফিক গণহত্যা ছিলো এক নতুন ঘটনা। কিন্তু ইউরোপের ইতিহাসে এতে কোনো নতুনত্ব ছিলো না কেননা এই ইতিহাসের শিকাররা এই হত্যালীলা দেখেছিলো ইউরোপের সীমানার বাইরে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এমনই এক গণহত্যার ভিত্তির ওপর নির্মিত হয়েছিলো যেমনটা কার্যত কানাডা থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত সমগ্র নতুন পৃথিবী, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ক্ষেত্রে ঘটেছিলো। আফ্রিকার দাসব্যবসা থেকে শুরু করে ভিয়েতনাম কিংবা বর্তমানের ইরাক থেকে আফগানিস্তান, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের নিয়মিত বৈশিষ্ট্যই হল সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীকে হত্যা করা।
৪। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং বলশেভিক বিপ্লবের পরই প্রথম ফ্যাসিবাদীরা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। কিন্তু এর বীজ দূর অতীতের গর্ভে নিহিত। ঐতিহাসিকরা ঊনবিংশ শতকে বিসমার্কের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জার্মান রাষ্ট্র, ঐ দশকেই ফ্রান্সে সোরেল ও মউরাসের তত্ত্বের প্রচার এবং বিশেষত জার্মান যুক্তিবাদ-বিরোধিতা ও সাধারণত আলোকপ্রাপ্তির মতাদর্শের প্রতিক্রিয়াশীল বিরোধিতার মধ্যে ফ্যাসিবাদের কোনো কোনো সূত্র খুঁজে পেয়েছেন। ১৮৮০ সাল থেকে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে এই প্রবণতা নিয়মিতভাবেই দেখা গিয়েছে যদিও বিশেষ ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে নিরংকুশ ক্ষমতা হস্তগত করবার জন্য তার উদগ্র প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। কি ছিলো এই ঘটনাবলী? দেশে দেশে এর ভিন্নতা ছিলো, ফ্যাসিবাদও তাই ভিন্ন ভিন্ন রূপ গ্রহণ করে। যদিও কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যকে সূত্রায়িত করা যায়:
১। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ইউরোপের মূল ভূ-খ-ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয়। অন্যদিকে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের সাফল্যের পর ইউরোপের বুর্জোয়ারা নিজ নিজ দেশে বৈপ্লবিক সম্ভাবনার কথা ভেবে আতংকিত হয়ে পড়ে। ১৯১৮ থেকে ১৯২২ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মূলত জার্মানি ও ইতালিতে ক্ষণস্থায়ী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পদশালী শ্রেণি দৃঢ়ভাবে এই সংকল্প গ্রহণ করে যে, যে কোনো মূল্যে, এমনকি উদারনৈতিক গণতন্ত্র বিসর্জন দিয়েও প্রতিবিপ্লব সংঘটিত করতে হবে।
২। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই ফ্যাসিবাদীরা পাঁচটি দেশে ক্ষমতাসীন হয়। জার্মানি, ইতালি ও স্পেন-যে তিনটি দেশে ফ্যাসিবাদ সর্বাপেক্ষা হিংস্র রূপ গ্রহণ করেছিলো সেই তিনটি দেশে সোভিয়েতের বাইরে শ্রমিক আন্দোলন সবচেয়ে শক্তিশালী চেহারা নিয়েছিলো, তার সাথে ছিলো বৃহৎ রাজনৈতিক দল ও ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ। ইতালি ও স্পেনে ব্যাপক কৃষি আন্দোলনেরও অস্তিত্ব ছিলো। এই সমস্ত দেশে ফ্যাসিবাদের উত্থানের মধ্য দিয়ে শ্রমিক-কৃষকের পরাজয় ঘটে, যা উদারনৈতিক গণতন্ত্র করে উঠতে পারেনি। ইতালিতে ফ্যাসিবাদীরা, শহরের আগে গ্রামাঞ্চলে আধিপত্য কায়েম করে। জমির মালিকরা গ্রামীণ মিলিশিয়া এবং সন্ত্রাসবাদী দল তৈরি করে যেগুলোকে পরবর্তীকালে প্রশিক্ষিত ফ্যাসিবাদী ক্যাডাররা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনে ও সেগুলোর ব্যাপক বিস্তার ঘটায়। এদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমর্থন জুগিয়েছিলো রাষ্ট্র এবং উদারনৈতিক সরকার একে বন্ধ করবার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। মুসোলিনিকে প্রথম থেকেই বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠিগুলো অর্থ জোগাতো। তার ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে এই জাতীয় সাহায্যকারীর সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পায়।
৩। ফ্যাসিবাদীরা কখনই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতায় আসেনি। মুসোলিনি ও হিটলার দু’জনেই মধ্যপন্থী দলগুলোর সহায়তায় ক্ষমতায় এসেছিলেন। ১৯১৯ সালে মুসোলিনি যখন মিলানে নির্বাচনে দাঁড়ান তখন ২ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ৫ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। তাকে জাতীয়তাবাদী জোট সরকারে অংশ নিতে আহ্বান জানানোর পর ১৯২২ সালের মধ্যে মুসোলিনি ইতালির প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান যদিও ফ্যাসিস্টদের চারশ আসন বিশিষ্ট সংসদে মাত্র ৩৫টি আসন ছিলো। ১৯২৮ সালে নাৎসিরা মোট ভোটের ৩ শতাংশও পায়নি। দু’বছর বাদে মধ্যপন্থী রক্ষণশীল ও উদারনৈতিক দলের অবক্ষয় এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছায় যে, লক্ষ লক্ষ লোক নাৎসিদের সুরে সুর মেলাতে শুরু করে এবং বুন্ডেসট্যাগে সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও হিটলারকে চ্যান্সেলর হতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এই দুই ক্ষেত্রেই উদারনৈতিক মধ্যপন্থীদের নিশ্চলতা এবং সহযোগিতার জন্যই ফ্যাসিবাদী শক্তি সংহত হওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। এই দুই ক্ষেত্রেই তীব্র অর্থনৈতিক সংকট এক বিপুল অংশের মানুষকে সামাজিক পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের অক্ষমতা সম্পর্কে মোহমুক্ত করে তোলে। এ সময়ে বাম অথবা দক্ষিণ কোনো একটা দিক থেকে সংকট থেকে মুক্তির জন্য দাবি ওঠে। সেই সময় চরম দক্ষিণপন্থীরা অনেক বেশি প্রস্তুত থাকায় এই রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করতে তারাই এগিয়ে আসে।
৪। ফ্যাসিবাদীদের সঙ্গে উদারনৈতিক ব্যবস্থার এই সুসম্পর্ক নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় ছিলো না। তিরিশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত মুসোলিনিকে সমর্থন জুগিয়েছে ব্রিটেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে, এই যুদ্ধ চলাকালীন ও তার পরবর্তীসময়ে পর্তুগালের সালাজারের সাথে ব্রিটেনের দারুণ সুসম্পর্ক ছিলো। যুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত নাৎসি শিল্পপতিদের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে আমেরিকার শিল্পপতিদের কোনো দ্বিধা ছিলো না। যুদ্ধশেষে, ফ্যাসিবাদ যখন অন্যত্র পরাভূত, স্ট্যালিন প্রস্তাব দিলেন যে, স্পেন ও পর্তুগালে ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করতে মিত্রশক্তি সেখানে প্রবেশ করুক। কিন্তু ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ কাজ করতে অস্বীকার করে। বরং এই দুই দেশকেই ধীরে ধীরে কমিউনিস্টবিরোধী মিত্র দেশ হিসেবে ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়। এই সম্পর্ক বজায় থাকে যতোদিন না আভ্যন্তরীণ কারণে এই একনায়কত্বের অবসান ঘটে।
৫। এই সমস্ত ক্ষেত্রেই সাম্রাজ্য ও তার উপনিবেশের প্রশ্ন ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যদিও বিভিন্ন দেশে তা বিভিন্নভাবে সামনে আসে। জাপানে জার্মানির মতো শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন ছিলো না কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ও ঔপনিবেশিক প্রকল্প নিয়ে জাপান অগ্রসর হচ্ছিলো সেজন্য ঐ দেশেও ফ্যাসিবাদী, একদলীয় স্বৈরাচারী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো। জার্মানিতে নাৎসিদের বিশ্বকে পুনরায় বিভাজিত করবার লক্ষ্য ছিলো না। তারা প্রথমে ইউরোপকে এবং পরে বিশ্বের বাকি অংশের যতোটা সম্ভব ততোটা দখল করে আন্তঃমহাদেশীয় সাম্রাজ্যবাদী রাইখের প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিলো। মুসোলিনি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ইতালির আধিপত্য বিস্তারের সাথে সাথে আফ্রিকার উপনিবেশগুলোতে দখলদারি কায়েম করতে চাইছিলেন। স্প্যানিশ ফ্যাসিবাদীদের লক্ষ্য ছিলো উত্তর-আফ্রিকার উপনিবেশগুলো এবং তারা আবার লাতিন আমেরিকার হিস্পানিক দেশগুলোর নেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলো। ৪৫ শতাংশ নিরক্ষরতা নিয়ে পর্তুগাল ছিলো ইউরোপের সবচেয়ে পশ্চাৎপদ দেশ কিন্তু এর এক বিরাট ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ ছিলো। কেবল আফ্রিকাতেই বিশাল আধিপত্য ছিলো তাই নয় সুদূর গোয়া ও ম্যাকাওতেও উপনিবেশ ছিলো।
এইসব ছিলো অতীতের ঘটনা। কিন্তু এখন? আজকের পৃথিবীতে ১৯৩০ এর দশকের চেহারায় ফ্যাসিবাদের পুনরাবির্ভাবের সম্ভাবনা কম। কিন্তু কিছু বিপৎজনক ইংগিত রয়েছে:
১। ছয় দশক আগে, ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের ওপর বিজয় অর্জন করবার পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে কমিউনিজম ও বৈপ্লবিক জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে বিশেষত অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের যুদ্ধ চালিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া, চিলিসহ বিভিন্ন দেশে কমিউনিজমকে প্রতিহত করবার নামে উদারনৈতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করবার কাজে মদত জুগিয়েছে।
২। ১৯৪৮ সালে ‘ট্রুম্যান ডকট্রিন’ ঘোষিত হওয়ার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসলামী ধ্যান-ধারণাকে পরিকল্পিতভাবে প্রগতিশীল শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করবার উদ্দেশ্যে আরব দুনিয়ায় ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’, পাকিস্তানে জামাত-ই-ইসলামী এবং সৌদি আরবের মিত্র দেশগুলোতে ওয়াহাবি ভাবনাকে প্রশ্রয় দেয়। এই সমস্ত কার্যকলাপ আফগানিস্তানে উত্তুঙ্গ শিখরে পৌঁছয় যেখানে সিআইএ ইসলামী মৌলবাদী হাজার হাজার যোদ্ধাকে পিডিপি এর কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে একত্রিত করে। এই বিশ্বজোড়া ইসলামের প্রবক্তারা কেউ কেউ এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রয়েছে কেউবা বিরুদ্ধাচরণ করছে। কিন্তু এই ভাবনা গত ষাট বছর সাম্রাজ্যবাদী ক্রিয়াকলাপেরই প্রত্যক্ষ ফসল।
৩। নাৎসি মতাদর্শে জাতি যে ভূমিকা পালন করতো বর্তমানে রাজনীতিতে ধর্ম সেই ভূমিকাই পালন করছে। অন্যদিকে পশ্চিমী দুনিয়াজুড়ে অত্যন্ত ভয়ংকর ও তীব্র জাতিবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে।
৪। ইউরোপ জুড়ে নানা ধরনের ফ্যাসিবাদী প্রবণতা সক্রিয় ও সজীব যদিও এই নাম তারা আর ব্যবহার করে না। বিশেষত অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স ও ডেনমার্কে এই প্রবণতা ক্রিয়াশীল। এই ধরনের কিছু প্রবণতা কোনো কোনো দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলে যেমন ব্রিটেনে টোরি কিংবা ফ্রান্সে সারকোজির জোটে স্থান পেয়েছে। আমেরিকার রিপাবলিকান রাইটদের মধ্যেও এরা স্থান করে নিয়েছে।
৫। আমাদের যুগের অন্যতম স্থিতধী চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কির মতে বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা ক্রমশ তিরিশের দশকে হিটলারের জার্মানির মতো হয়ে যাচ্ছে। মন্দার ফলে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছে লক্ষ লক্ষ পরিবার। সরকার ব্যাংকগুলোকে লক্ষ লক্ষ কোটি ডলার সাহায্য করলেও সংকটাপন্ন মানুষদের কোনো সাহায্য করছে না। এই সমস্ত মানুষ পুরো মার্কিনী ব্যবস্থার ওপর ক্ষুদ্ধ। জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের আস্থা ‘ইভাঞ্জেলিকাল ক্রিশ্চিয়ানিটি’র ওপর। কুড়ি শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন যে তাদের এই যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারে কোনো আস্থা নেই। তিরিশ শতাংশ মানুষের মতে সরকার তাদের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে। প্রায় আঠারো শতাংশ মনে করছেন যে, অতি দক্ষিণপন্থীদের নিয়ে নবগঠিত ‘টি পার্টি’ তাদের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।
ভারতের শাসকশ্রেণি বিশ্বশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মোহে আচ্ছন্ন। বিকাশের সাম্প্রতিক হার এবং সম্পদের কেন্দ্রীভবন এই উন্মাদনাকে বাড়িয়ে তুলেছে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড় অংশকে এর অংশীদার করে নিয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ফলে যদি দেশীয় অর্থনীতি ধাক্কা খেতে থাকে তাহলে এ জাতীয় ঘটনার সম্ভাবনা আরো জোরদার হবে। সে ক্ষেত্রে ভারত কেবল একমাত্র অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হবে না, যা কি-না ফ্যাসিবাদের একবিংশ শতকের সংস্করণের খুব কাছে চলে যাবে। আট শতাংশ বিকাশ নিয়ে অত্যধিক উচ্ছ্বাস আসন্ন বিপদের মধ্যেও নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়ার সবচেয়ে সহজতম রাস্তা।

মূল: আইজাজ আহমদ

ভাষান্তর: অর্ণব ভট্টাচার্য

শেয়ার করুন: