004637
Total Users : 4637
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

বিতর্ক: প্রধানত বৌদ্ধ ও আদিবাসী ধর্মের লোকেরাই বাঙালি মুসলমানের পূর্বপুরুষ

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অনেকেই মস্তিষ্কপ্রসূত আবেগ দ্বারা বিষয়টিকে দেখবার চেষ্টা করছেন। আবার কেউ কেউ কূটতর্কে নিজস্ব যুক্তিকেই প্রাধান্য দিতে চাইছেন, যেখানে তথ্য-ইতিহাস অস্বীকার করা হচ্ছে, বিকৃত করা হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে। অজ্ঞতা বিকৃত ইতিহাস প্রচারিত হচ্ছে। ফয়েজ আলম বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন দীর্ঘ দিন ধরে। তিনি ইতিহাসের অনুদ্ঘাটিত অধ্যায়কে সামনে এনে অনেক অজানা তথ্যকে হাজির করেছেন পাঠকের সামনে। অনুসন্ধিৎসু পাঠকের জন্য তার লেখাটি আমরা প্রচার করলাম। সম্পাদক

 

কিছুদিন থাইকা দেখতেছি অনেকে কোন একটা উপলক্ষে পাইলেই লেখেন ‘বাংলাদেশ হিন্দুসম্প্রদায়ের মানুষদের দেশ ছিলো। হিন্দু থাইকা সবাই মুসলমান হইছে। তাই হিন্দুসংস্কৃতির চিহ্ন থাকতেই পারে।’ এই আজগুবি কথা তারা কোথায় পাইলেন তার কোন তথ্য সূত্র কেউ দেন না। এই কথাগুলা আসলে একটা বড় মাপের মিথ্যা।

প্রাচীন আমলে বাংলা ছিলো বৌদ্ধদের দেশ, পরে মুসলমান শাসনে আসে। বাংলাদেশের মুসলমানরা আসছে প্রধানত অস্ট্রিকগোষ্ঠীর বৌদ্ধ ও আদিবাসী ধর্মের মানুষদের থাইকা ধর্মান্তরিত হয়া। সেই তুলনায় হিন্দু, জৈন, আজিবীক সম্প্রদায়ের মানুষ মুসলমান হইছে খুবই কম। উপনিবেশি শক্তির উস্কানিতে উনিশশতকে সাম্প্রদায়িক আবেগের তাড়নায় ইতিহাস নাম দিয়া যে বানোয়াট কাহিনী লেখা হইছে ‘হিন্দু থাইকা সকল মুসলমান আসা’র এই গল্পতারই অংশ, যার না আছে কোনো ঐতিহাসিক তথ্য সমর্থন না যৌক্তিকভিত্তি। এইটাই নীরব ধারনা আকারে পুরা সমাজে ছড়ায়াছিল। এখন নানা উপলক্ষে সরবে উপরে আসতেছে।

আমরা এইখানে ছোট আকারে তথ্যভিত্তিক ইতিহাসের কথা তুইলা ধরব। জানা ইতিহাসের শুরু থাইকা ১১৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশ ছিলো বৌদ্ধশাসনে। এরপর আশি বছরের (১১২৫-১২০৫ খ্রি.) মত হিন্দু সেনদের সময়। পরে আবার ১২০৪ থাইকা ১৭৫৭ পর্যন্ত মুসলমানদের শাসন। অর্থাৎ বাংলার প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে হিন্দুধর্মীয় সম্রাটদের শাসন আশি বছরের। এই পুরাসময়টায় বাংলায় ধর্মীয় দিক থাইকা প্রথমে বৌদ্ধরা, পরে মুসলমানরা ছিলো সংখ্যাগুরু। সেনদের আগে বাংলায় আর্যরা তেমন বসতি করে নাই, সুযোগও ছিলো না। কেবল সংখ্যাল্প কিছু বৌদ্ধশ্রমণ ও ব্রাহ্মণ ছাড়া। এরও বহুআগে আসা কিছু দাবিড়ভাষী, মঙ্গোলয়েড আর আলপাইন মানুষদের মিশ্রণবাদে পুরাজনগোষ্ঠীই ছিলো অস্ট্রিক।

বিভিন্ন সময়সীমানায় হেরফের হওয়াসত্ত্বেও বলা যায় গোটা ঢাকা ও বরিশাল বিভাগ, ময়মনসিংহের বেশির ভাগ, খুলনা বিভাগের দক্ষিণদিকের একট বড় এলাকা এবং কুমিল্লার পশ্চিমদিকের কিছুটা নিয়া বঙ্গদেশ গইড়া উঠে। পুন্ড্রবর্ধন, বরেন্দ্র ও রাঢ় বঙ্গদেশ থাইকা সবসময়ই ভিন্ন ছিলো। এইসব এলাকা এবং তার বাসিন্দারা অনেক পরে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহর সময়ে (১৩৪২-৫৮) বঙ্গ ও বাঙালি জাতিত্বের পতাকাতলে আসে। ভারতের পশ্চিবঙ্গের মানুষেরা আমাদের তুলনায় বেশ নবীন বাঙালি।

এই বঙ্গদেশ ও তার মানুষেরা বাঙালি সংস্কৃতির মূল জমিন। বাঙালি সংস্কৃতি হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতি না, ইসলাম ধর্মীয় সংস্কৃতিও না। কয়েক হাজার বছর ধইরা বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ হইছে। তার শুরুতে এ অঞ্চলে কোনো ধর্ম মতই এ কালের মত বিকশিত ও সংগঠিত অবস্থায় ছিলো না। ফলে প্রথম যুগে মানুষের সাংস্কৃতিক স্বভাবে ধর্মের ছাপ তেমন পড়ে নাই। প্রাচীন বাংলায় সবচেয়ে আগে বৌদ্ধধর্মই সুসংগঠিত ধর্ম হিসাবে মানুষের মধ্যে ছড়ায়, পাশাপাশি ছিলো কম সংগঠিত জৈন ও আজিবীক। আর আদিবাসী প্রকৃতি পূজারি নানা ধর্মমতের মানুষ, যারা ছিলো অস্ট্রিক এবং সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। সেই কারণে বাঙালি সংস্কৃতিতে ধর্মের ছাপ যতটা দেখা যায় তার মধ্যে বৌদ্ধধর্ম এবং আদিমপ্রকৃতি পুজারি ধর্মের ছাপই প্রবল।

আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের (৩২৭ খ্রি.পূ.) সময় থাইকা দুইশতক পর্যন্ত সেই কালের গ্রীক ও অন্যান্য ভিনদেশি লেখক হেরোডোটাস, মেগাস্থিনিস, দিওদেরাস, প্লিনী, পেরিপ্লাস অব দ্যা ইরিত্রিয়ানসী’র অজ্ঞাতলেখক, প্লুটার্ক, টলেমি, এদের মারফত জানা যায় সেই ৫০০ বছর এই অঞ্চলে গঙ্গা রিডি বা গঙ্গারিড়ী নামে একটা শক্তিশালী স্বাধীন রাজ্য ছিলো। আর্যগোষ্ঠীগুলা, এমনকি আলেকজান্ডারও তাদের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর ভয়ে এদিকে আগায় নাই। বিদেশি লেখকদের বর্ণনা অনুযায়ী স্বন্দীপ থাইকা আরম্ভ কইরা পশ্চিমদিকে আজকের গোটা দক্ষিণবঙ্গ নিয়া ছিলো গঙ্গারিড়ি বা গাঙ্গাড়ি।

পুন্ড্রবর্ধন, রাঢ়, বরেন্দ্র এলাকাগুলি গুপ্তদের শাসন (৩২০-৫৫০ খ্রি.) ভুক্ত হইছিলো। বঙ্গ এবং পাশের সমতট (কুমিল্লা) তখনো স্বাধীন। ফরিদপুরের কোটালিপাড়া, কুমিল্লা, সিলেট, ঢাকার আশরাফপুরসহ নানা জায়গায় পাওয়া সেকালের তামারপাতে লেখা বিবরণ অনুযায়ী দেখা যায় পালশাসনের আগ পর্যন্ত এমনকি পালদের শাসনামলের বিভিন্ন যুগে বঙ্গ ও সমতটে ছোট ছোট স্বাধীন রাজ্য ছিলো। ছয় থাইকা দশশতক পর্যন্ত সময়টায় কুমিল্লায় বৈন্যগুপ্ত, ফরিদপুরে গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেব, কুমিল্লার খড়গবংশ, রাতবংশ, দেববংশ ও চন্দ্রবংশপুব ও দক্ষিণবঙ্গে স্বাধীন ছিলেন। এইদিকে পালেরা ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ থাইকা ১১৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্ষমতায় ছিলেন।

পাল আমলে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রসার হয়। শুরুর দিকেই বৌদ্ধসহজিয়াদের নানাধারার উদ্ভব ঘটে। এই অঞ্চলের প্রায় সবমানুষের ভাষা ছিলো অস্ট্রোএশিয়াটিক পরিবারের মুন্ডাগোষ্ঠীর ভাষা। বৌদ্ধদের প্রায় সকলেই ছিলো স্থানীয়দের থাইকা ধর্মান্তরিত। ৬-৮ শতকে মুন্ডাগোষ্ঠীর ভাষা আর বৌদ্ধসাধকদের দাপ্তরিক প্রাকৃত ভাষার সংযোগ মাইনা এদের দ্বারা বাংলাভাষা বিকশিত হইতে শুরু করে, লেখা হইতে থাকে চর্যাপদের মত বইপত্র। অবশ্য সেই আলোচনার জায়গা এইটা না।

৬৩৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে হিউয়েন সাঙ কর্ণসুবর্ণ, পুণ্ডবর্ধন, সমতট ও তমলুক ভ্রমণ আইসা লেখছেন, তখন বাংলায় বৌদ্ধধর্মের পসার সবচেয়ে বেশি, এরপর জৈনধর্ম, তিন নম্বরে হিন্দুধর্ম। এর বাইরে বহুধর্মের অসংখ্য অনুসারীর কথা তিনি বলছেন যারা স্থানীয় আদিবাসী ধর্মের অনুসারী। এরাই ছিলো জনসংখ্যার বড় অংশ।

১১২৫ খ্রিস্টাব্দে কর্নাটকের সেনেরা বাংলায় ক্ষমতায় আসে। মূলত সেনদের মাধ্যমেই বাংলায় হিন্দুধর্মরে সুসংগঠিত ধর্মমত হিসাবে প্রসারের চেষ্টা চলে এবং সংস্কৃত সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। ভারত থাইকা প্রচুর সংখ্যক ব্রাহ্মণ আইনা দেশের বিভিন্ন জায়গায় টোল খোলানো হয়। রাজার উস্কানি পায়া বাঙালি হিন্দুকবিরা বাংলাভাষা বাদ দিয়া সংস্কৃতে কবিতা লেখতে শুরু করেন। যেমন আমাদের অতিপ্রিয়ভাজন জয়দেব (গীতগোবিন্দ)।  বৌদ্ধ, জৈন ও প্রকৃতিধর্মের অনুসারীদের উপর রাজকীয় নির্যাতন নাইমা আসে। চর্যাপদের বেশকিছু চর্যায়ও তার ইঙ্গিত আছে। রাষ্ট্রীয় নির্যাতনে বৌদ্ধ ও জৈনদের একটা অংশের মনোবল ভাইঙ্গা পড়ে এবং তারা শ্রেণিবহির্ভূত অবস্থান স্বীকার কইরা বিভিন্ন সহজিয়াধর্মের ছদ্মবেশে বাঁচার চেষ্টা চালায়। বাংলাভাষা ও বাঙালি জাতিত্বের এই চরম দু:সময়ে বৌদ্ধদের সঠিক ভূমিকার কারণেই বাংলাভাষার আদি নিদর্শনগুলা সেনদের ধ্বংসকান্ড থাইকা রক্ষা পায়। বৌদ্ধদের একাংশ নেপাল তিব্বত আরাকান প্রভৃতি দেশে পাড়ি জমায়। অধিকাংশই নেপালে আশ্রয় নেয়, সাথে করে নিয়া যায় বাংলাসাহিত্যের প্রথম লিখিত দলিল চর্যাপদ (চর্যাচর্যবিনিশ্চয়)। এই কারণে সেনদের শাসনের এই আশিবছর এবং তার প্রভাব হিসাবে পরের প্রায় শ’খানেক বছর বাংলাভাষায় সাহিত্য চর্চা হয় নাই। এইসময়টাই হলো বাংলাসাহিত্যের “অন্ধকারযুগ”। আরো পরে স্থিতিশীল মুসলিম শাসন শুরু হওয়ার পরে তাদের উৎসাহে বাংলাচর্চা আরম্ভ হয়।

হিউয়েন সাঙের বিবরণ থাইকা আন্দাজ করা যায় তখন কমপক্ষে অর্ধেক আদিবাসী ধর্মের অনুসারী। তাহলে বাকি অর্ধেক ছিলো বৌদ্ধ, জৈন ও হিন্দু। এরমধ্যে বৌদ্ধরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সে হিসাবে আমরা আন্দাজ করতে পারি জনসংখ্যার অন্তত ২২-২৫% বৌদ্ধ, ১৪-১৫% জৈন ও আজিবীক, ১২-১০% হিন্দু ছিলো। পরিবর্তী ৫০০ বছরে পাল শাসনামলে বৌদ্ধদের সংখ্যা কমে নাই, বরং বাড়ছে। তবে দশশতকের পরে জৈনদের সংখ্যা কমছে। এর মধ্যে জৈনধর্ম বদল, আদিবাসী ধর্ম বদল এবং সেনদের নির্যাতনের কারণে আরও ১০-১২% লোক হিন্দু হইছে ধইরা নিলেও বখতিয়ার খিলজীর অভিযানের আগে বাংলায় হিন্দুর স্ংখ্যা কোনোমতেই ২৫%-এর বেশি থাকার কথা না।

 

এই পরিস্থিতিতে ১২০৪ সালে বখতিয়ার খিলজির মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। এর আগেই মুসলমানরা বাংলায় বসতি স্থাপন করে। সেই নয়শতকেই রীতিমত একটা মুসলমান উপশহর ছিলো চাঁটগায়ের কাছাকাছি। উত্তরবঙ্গ,  নেত্রকোনা মুন্সীগঞ্জ বগুড়া প্রভৃতি এলাকায় মুসলিম বসতির প্রমাণ রয়া গেছে। মুসলিম শাসন শুরু হওয়ার পরের একশবছরে প্রচুর সুফি দরবেশ বাংলায় বসিত করেন। তখন একদফা এবং পরে বিশেষ করে স্বাধীন সুলতানী আমলে একদিকে মধ্য এশিয়া, ইরান, আরবদেশসমূহ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থাইকা দলে দলে মুসলমানরা বাংলায় পাড়ি জমায়। সাড়ে পাঁচশ বছরের মুসলিম শাসনামলে দিল্লীর বিভিন্ন অপশাসনের যুগে ভারত থেকেও প্রচুর মুসলমান বাংলায় আসে।

এই সময় পর্বে নির্যাতিত বৌদ্ধ-জৈন ও প্রকৃতিধর্মের অনুসারী ৭৫%-এর মত মানুষের মধ্য থাইকা ব্যাপকহারে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। তাদের ধর্মের সাম্যনীতির সাথেও ইসলামের অনেক মিল। ব্যাপকহারে ইসলামধর্ম গ্রহণের কারণেই বাংলায় বৌদ্ধ ও আদিবাসীধর্মের অনুসারী কমতে থাকে। বৃটিশ আমলের আদমশুমারিতে দেখা গেছে নগরকেন্দ্রের বাইরে প্রান্তিক এলাকায় মুসলমানের সংখ্যা বেশি। আদিবাসীরাই ছিলো প্রান্তিক মানুষ। এটাও একটা প্রমাণ যে, বৌদ্ধ ও আদিবাসী ধর্মের লোকদের থাইকাই সবচেয়ে বেশি মুসলমান হইছে। এরপর হিন্দু থাইকা মুসলমান হওয়া মানুষের অবস্থান, যার মধ্যে সুবিধাবাদী উচ্চশ্রেণির প্রশাসক, জমিদার, ভুস্বামীও ছিলো অনেক। সব মিলায়া হিন্দু থাইকা মুসলমান হয় সবচেয়ে কম। যে কারণে তখন থাইকা আরম্ভ কইরা বৃটিশ আমল পর্যন্ত হিন্দুজনসংখ্যার হার কমে নাই।

বৃটিশ আমলে বাংলায় হিন্দুর সংখ্যা ছিলো ৩৭-৩৮%-এর মত। একটা সহজ হিসাবে গেলেও চলে। ১২০০ খ্রিস্টাব্দে হিন্দুধর্মীয়দের হার ছিলো বড়জোর ২৫%। বৃটিশআমলে ১৮৯০-এর আদমশুমারিতে বাংলায় হিন্দুধর্মাবলম্বীদের হার দাড়ায় ৩৭-৩৮%-এ। বাকী প্রায় সবই মুসলমান। এইসংখ্যা গুরু মুসলমান যদি হিন্দুধর্মাবলম্বীদের থাইকা আসতো তাইলে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা কমে যাওয়ার কথা, বাড়ে কি করে? কমছে বৌদ্ধ, জৈন ও আদিবাসী ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা। এর থেকেও সিদ্ধান্ত নেয়া যায় যে, মূলত বৌদ্ধ, জৈন ও আদিবাসী মানুষদের বেশিরভাগ মুসলমান হইছে, আর বাকিরা হিন্দু হইছে। সেইজন্য মুসলমান দ্রুত ও অনেক বাড়ছে, আর তুলনামূলকভাবে কম হইলেও বাংলাদেশে হিন্দুরসংখ্যাও বাড়ছে।

উনিশশতকে এইসব তথ্য গোপন রাইখা, কখনো কখনো ভুলভাল ব্যাখ্যা কইরা লেখা হইছে বাংলায় হিন্দু থাইকাই মুসলমান জনগোষ্ঠীর উৎপত্তি। আর বিস্ময়করভাবে এইদেশের মুসলমানরা তা যাচাইয়ের দরকার বোধ করে নাই। ঐতিহাসিক বিবরণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক উৎসে লেখা আসল তথ্যের দিকে ফিইরাও তাকায় নাই। উনিশশতকের ইতিহাস হিসাবে যা দেয়া হইছে তাই ২০০ বছর ধইরা গিলছে, এখনো গিলতেছে। আর সেই সবকথাই মুখস্থবিদ্যার মত জপতেছে। ফেসবুকেও সেইরকমই দেখতেছি। আমি উৎসের নাম লেইখা দিছি। এইসব ‘পণ্ডিতেরা’ চাইলে মুখস্থ নাম জপ বাদদিয়া সঠিক ইতিহাসটা জাইনা নিতে পারেন।

শেয়ার করুন: