004636
Total Users : 4636
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →
জন্ম— জুন, ০৬, ১৯৭৭। জন্মস্থান— উত্তর গোবীন্দর খীল, হাঁদু চৌধুরী বাড়ী, পটিয়া, চট্টগ্রাম। (শৈশব কৈশোর ও তারুণ্যের সময়যাপন) বেড়ে ওঠা (পূর্ব্ব বালিয়াদী, মীরশ্বরাই, চট্টগ্রাম) নানার বাড়ীতে। প্রকাশিত কবিতার বই— ফুলেরা পোষাক পরে না (সাল: ২০১৮, প্রকাশক : মনফকিরা, কলিকেতা)। প্রকাশিতব্য বই— অর্দ্ধনারীশ্বরবাদ : প্রকৃতিপুরুষতত্ত্ব (নন্দনতত্ত্ব), বটতলার বয়ান (ভাষাতাত্ত্বিক গদ্য) ও উদ্ভিদপ্রতিভা (কবিতা)। সম্পাদক— চারবাক।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

ভাষার অধিকার এবং নোয়াম্ চোমস্কি

শুরুতেই একটা সংশয়বাদি প্রশ্ন তোলা যাক- ভাষা নিয়ে আলোচনার আদৌ কোনও প্রয়োজন আছে কি? সংশয়বাদিকে নিরস্ত করার জন্য আপাতত তিন রকম উত্তর দিয়ে রাখা যাক :

(ক) ভাষার মাধ্যমেই আমরা আমাদের চারপাশের জগতকে বুঝতে, ব্যাখ্যা করতে, এমনকি পরিবর্তন করতেও সচেষ্ট হই। এক-একটা নতুন বাক্য অনেক সময় জগতকে জানা-বোঝার এক-একটা নতুন দরজা হয়ে ওঠে। জগতকে যত ভালভাবে জানা যাবে এ জগতে আমাদের টিকে থাকার সম্ভাবনাও ততই বাড়বে। ভাষাকে তাই ভাল ভাবে জানার (বা, ভাষা নিয়ে আলোচনা করার) প্রয়োজন থাকছে।

(খ) ভাষার মধ্যে অন্তহীন বৈচিত্র্য লীন হয়ে আছে। অনাবিষ্কৃত ভূখণ্ড, অনারোহিত পাহাড় যেমন মানুষকে, আহবান করে, ভাষার নিজস্ব রহস্যও তেমনই মানববুদ্ধির কাছে রহস্যভেদের ডাক দেয়। নিজস্ব রহস্যময়তার কারণেই ভাষা গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বস্তু।

(গ) চোম্স্কির কাছে ভাষা-আলোচনার প্রয়োজনটা একটু অন্যরকম। তিনি মনে করেন, ভাষা মানবমনের নির্ভরযোগ্য দর্পন। সরাসরি যে মানবমনকে ধরাছোঁয়া যায় না সেই মানবমনকে ভাষায়-প্রতিফলিত-পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। যেসব বিমূর্ত নীতি মানবমনের গঠন এবং ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে সেগুলো, চোম্স্কির মতে, মানুষের প্রজাতিগত মানসবৈশিষ্ট্য থেকেই সঞ্জাত; এসব নীতি আপতিকভাবে উদ্ভূত নয়, মানবপ্রজাতির জৈব আবশ্যিকতা থেকেই উৎপন্ন। কেবলমাত্র ভাষা-বিশ্লেষণের মাধ্যমেই আমরা এসব নীতির সন্ধান পেতে পারি এবং ফলত মানবমন সম্পর্কেই আমরা অনেক কিছু জানতে পারি। মূলত এখানেই, চোম্স্কির কাছে, ভাষা আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা বর্তমান।(১)
‘প্লেটোর সমস্যা’ বা ‘উদ্দিপকের-অপ্রতুলতা-সংক্রান্ত সমস্যা’

আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় এটা বারে বারে চোখে পড়ে যে কোনও ভাষাগোষ্ঠিতে জন্মানো কোনও শিশু নগন্যসংখ্যক এবং অসংগঠিত ভাষা-নমুনা থেকে তার মাতৃভাষার জ্ঞান অর্জন করে ফেলে। বার বার দেখায় চোখ-সয়ে-যাওয়া এই ঘটনায় আমরা বিস্মিত হই না। কিন্তু একবার যদি এই ঘটনা প্রসঙ্গে আমরা প্রশ্ন করি ‘এমনটা কি ভাবে ঘটে?’-তাহলেই দেখতে পাব প্রাত্যহিকতা দীর্ণ বিষয়টা বিস্মিত হওয়ার মতো বহু উপাদানে আকীর্ণ হয়ে আছে। চোম্স্কি এই ব্যাপারটিকে ‘প্লেটোর সমস্যা’ বা কোনও কোনও সময় ‘উদ্দিপকের-অপ্রতুলতা-সংক্রান্ত সমস্যা’ বলেছেন।(২) ভাষাতাত্তি¡ক তথ্যের উপস্থিতি সামান্য হলেও আমাদের জ্ঞানতত্তে¡র সমৃদ্ধি অপরিমেয়। চোম্স্কি মনে করেন, ‘সব মানুষের মধ্যেই এক ভাষাবৃত্তি প্রজাতিগতভাবে নিহিত রয়েছে’ এমনটা ধরে না নিলে অতি সামান্য ভাষা-উপাত্ত থেকে ভাষার অতিজটিল বিন্যাস যে কিভাবে আমরা জানি তা অব্যাখ্যাতই থেকে যাবে। ভাষাবৃত্তিকে তাই চোম্স্কি মানবমনের অন্যতম উপাদান হিসেবে ধরে নিচ্ছেন। যে-কোনও ভাষায় ব্যুৎপত্তি-অর্জনের উৎস এই ভাষাবৃত্তি। এই বৃত্তির বৈশিষ্ট্যগুলোকে এমন এক ভাষা কাঠামোগত বৃহত্তর তত্তে¡র প্রেক্ষিতে পরীক্ষা করা যেতে পারে যে তত্তে¡র সাহায্যে সব মানবভাষায় সার্বিকভাবে উপস্থিত কিছু নিয়ম এবং উপাদানের এক তন্ত্র আবিষ্কৃত হতে পারে। চোম্স্কি এই তত্তে¡র নাম দিয়েছেন ‘সার্বিক ব্যাকরণ’ (Universal Grammer); এখন থেকেই এই তত্ত্বকে আমরা ‘UG’ বলে উলে­খ করব।(৩)

ভাষা-আলোচনার তিনটি প্রাক-স্বীকৃতি বা আদর্শায়ন
ভাষা রহস্যের সন্ধানে এগোনোর পথে চোম্স্কি তিনটি প্রাক-স্বীকৃতি ব্যবহার করেছেন :
(ক) ‘ভাষা’ বলতে বোঝায় এমন সব উচ্চারণ যা কোনও সমসত্তাক ভাষাগোষ্ঠিতে করা সম্ভব;
(খ) এমন ‘ভাষা’ UG-র একটি যথার্থ দৃষ্টান্ত; এবং
(গ) UG দিয়ে মানবমনের যে বা যেসব বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হবে সেগুলিকে মানবপ্রজাতিরই মানসবৈশিষ্ট্য বলে বুঝতে হবে।

এই সবক’টি প্রাক-স্বীকৃতিই আদর্শায়িত। উদাহরণত: ‘সমসত্তাক ভাষাগোষ্ঠি’-র ধারণাটা আদর্শায়িত, কেননা এমন ভাষাগোষ্ঠি বাস্তবে কোথাও নেই। তত্ত¡গঠনের প্রয়োজনেই এই প্রাক-স্বীকৃতিগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু কথা হল, যে-ভাষা একান্তভাবে মূর্ত, যে-ভাষা আমাদের নিয়ত ব্যবহারের বিষয়, সেই ভাষাকে এতসব আদর্শায়নের মধ্যে দিয়ে দেখলে বড় বিমূর্ত ব্যাপার বলে মনে হয়।(৪) বিভিন্ন দিক থেকে, বিশেষত দৃষ্টিবাদি দার্শনিকমহল থেকে, ভাষাকে এমন বিমূর্তভাবে দেখার বিরুদ্ধে আপত্তি উঠেছে, বলা হয়েছে, চোম্স্কি প্রাক্সিদ্ধতা-মতবাদ (apriorism) প্রচার করেছেন। কিন্তু যেকোনও শাস্ত্রে যেকোনও তত্ত¡গঠনেই কিছু-না-কিছু প্রাক-স্বীকৃতির ব্যবহার ঘটে থাকে; চোম্স্কিও দেখিয়েছেন যে এটা যদি সঙ্গত অভিযোগ হয় তবে এমন অভিযোগ দৃষ্টিবাদিদের বিরুদ্ধেও আনা যায়, কেননা দৃষ্টিবাদিরাও তাঁদের তত্ত¡গঠনে বেশ কিছু প্রাক-স্বীকৃতি ব্যবহার করেন (উদাহরণ: শিক্ষণ প্রক্রিয়া-সংক্রান্ত তত্ত¡ গঠন করতে গিয়ে দৃষ্টিবাদিরা ধরে নেন যে ‘শিক্ষণ’ ব্যাপারটার ভিত্তি হল ‘অনুষঙ্গ’ (association), ‘নবশক্তিশালিকরণ’ (reinforcement), ‘আরোহি প্রক্রিয়া’ (inductive procedures) ইত্যাদি।(৫) আর, একথাও মনে রাখা ভাল যে এসব প্রাক-স্বীকৃতিবিশিষ্ট দার্শনিক মতবাদের ব্যবহারিক প্রয়োগও হয়ে থাকে; যেমন, যৌক্তিক দৃষ্টিবাদের (Logical Positivism) দার্শনিক প্রাক-স্বীকৃতিগুলোর অনুসিদ্ধান্ত হিসেবেই গঠনাত্মক-ভাষাতত্ত্বের (Structural Linguisties) উদ্ভব। [প্রসঙ্গত বলা যায়, গঠনাত্মক-ভাষাতাত্ত্বিক জেলিগ্ হ্যারিস্ (Zelling Harris) এবং যৌক্তিক দৃষ্টিবাদি দার্শনিক নেলসন গুড্ম্যান্ (Nelson Goodman) দুজনেই চোম্স্কির শিক্ষক, কিন্তু উভয় গুরুর ধারা থেকেই চোম্স্কি দ্রুত সরে এসেছেন। দৃষ্টিবাদিরা যেখানে মনে করেন যুক্তিবিদ্যা ভাষারই বিস্তারমাত্র সেখানে চোম্স্কি মনে করেন যে ভাষা বুদ্ধিবৃত্তির বিস্তার এবং সেজন্যই ভাষার মূল গঠন মানব প্রজাতির সহজাত।]

চোম্স্কির বিরুদ্ধে প্রাকসিদ্ধতার অভিযোগ ওঠার পিছনে মূল কথাটা এই যে, ‘ভাষা’-কে বিমূর্ত কিছু হিসেবে দেখলে ভাষার মূর্ততাকেই (যে মূর্ত রূপটা ভাষার পরিচিত বৈশিষ্ট্য) অস্বীকার করা হয়; একান্ত মূর্ত ভাষার নানান সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষিত বর্তমান-ভাষাকে ‘বিমূর্ত’ বললে সেই প্রেক্ষিতগুলোই যেন অস্বীকৃত হয়। চোম্স্কি কিন্তু ভাষা যে সমাজে উদ্ভূত একটা ব্যাপার সে কথা আদৌ অস্বীকার করছেন না। এখানে দুটো ব্যাপার আলাদা করে বুঝে নিতে হবে: ‘ভাষার জ্ঞান’ এবং ‘ভাষার ব্যবহার’-এ দুটো একই কথা নয়। ভাষার ব্যবহার একান্ত ভাবেই সামাজিক প্রেক্ষিতের সঙ্গে যুক্ত; কিন্তু চোম্স্কি মূলত ভাষার জ্ঞান কি ভাবে হয় সে প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করছেন এবং সেই সূত্রেই ভাষাকে বিমূর্ত হিসেবে দেখার প্রশ্ন উঠছে। ভাষাকে সামাজিক প্রেক্ষিতে দেখতে হলেও যে মন এই ভাষাকে ‘জানে’ সেই মনের বৈশিষ্ট্য বিষয়ে কিছু ধরে নিয়ে এগোতে হয় এবং সে জন্যই কিছু আদর্শায়ন, কিছু প্রাকস্বীকৃতি, কিছু বিমূর্ততা আবশ্যিক ভাবেই এসে পড়ে।

একথা যদি আমরা আপাতত ধরে নিই যে মানবভাষার মূল মানবচিন্তায় প্রোত্থিত, তা হলে একথাও মানতে অসুবিধে নেই যে, ভাষাবিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা হয়ত সেই প্রক্রিয়ার সন্ধান পেতে পারি যে প্রক্রিয়ায় আমাদের যাবতিয় অভিজ্ঞতা এক জ্ঞানতন্ত্রে রূপান্তরিত হয় এবং এই জ্ঞানতত্তে¡র সন্ধান পেলে হয়ত ‘মানুষ’ বলতে ঠিক কি বোঝায় তা’ জানা যাবে।

‘ভাষা’র সংজ্ঞা
চোম্স্কির মতে, ‘ভাষা’ বলতে ‘মানবভাষা’ই বোঝায়; মানবভাষা ব্যতিরেকে অন্য কোনও ভাষার অস্তিত্ব নেই। ‘ভাষা’র সংজ্ঞা তিনি এইভাবে দিয়েছেন: ভাষা এমন নানা বাক্যের সীমিতাকার-বা-অসীমিতাকার গুচ্ছ যে বাক্যগুলির প্রত্যেকটিই সীমিত দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট এবং সীমিতাকার-উপাদান গুচ্ছ থেকে নেওয়া কিছু উপাদানে গঠিত।(৬)

স্পষ্টতই সংজ্ঞাটি এমনভাবে দেওয়া হয়েছে যাতে করে এটি স্বাভাবিক ভাষা এবং কৃত্রিম ভাষা-উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হয়।(৭) কৃত্রিম ভাষা বলতে বোঝানো হচ্ছে সেইসব ভাষা যেগুলো শিখতে প্রত্যেকেরই সচেতন প্রয়াসের প্রয়োজন হয়। এস্পেরান্টো, ইডো প্রভৃতি ভাষাকেও এই অর্থে ‘কৃত্রিম ভাষা’ বলা যায় বটে; তবু বলতে হয় এসব ভাষা স্বাভাবিক ভাষার খুব কাছাকাছি, কেননা স্বাভাবিক ভাষার পরিবর্ত হিসেবেই এগুলোর সৃষ্টি হয়। প্রকৃত ‘কৃত্রিম ভাষা’ (বা, আকারসর্বস্ব ভাষা) বলতে বোঝায় গাণিতিক ভাষা, যুক্তিবৈজ্ঞানিক ভাষা, কম্পিউটার-প্রোগ্রামের ভাষা ইত্যাদি, যেগুলো দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু কাজ করানো হয় এবং সেজন্য এগুলোর স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যাত আকারগত তন্ত্র থাকে। কৃত্রিম ভাষার গঠন ও শব্দভাণ্ডারগত উপাদানের অর্থ যথাক্রমে কঠোরভাবে নিয়মাবদ্ধ ও নির্দিষ্ট। এ ধরনের ভাষা শিখতে হলে ওইসব নিয়ম এবং শব্দার্থ সচেতন প্রয়াসে শিখতে হয়। প্রতিটি কৃত্রিম ভাষার উদ্ভবের এক একটি নির্দিষ্ট ইতিহাস আছে, আর সেজন্যই প্রতিটি কৃত্রিম ভাষার এক একটি নির্দিষ্ট তন্ত্র আছে। বিপরিতপক্ষে, যেকোনও স্বাভাবিক ভাষার উদ্ভবের ইতিহাস অস্পষ্ট, রহস্যময়। স্বাভাবিক ভাষার উচ্চারণ অনেক সময়েই দ্ব্যর্থবোধক এবং এই দ্ব্যর্থবোধকতাই স্বাভাবিক ভাষার শক্তি। বিভিন্ন প্রসঙ্গে একই শব্দের বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার স্বাভাবিক ভাষায় সম্ভব বলেই অপেক্ষাকৃত কম শব্দে আমরা অনেক বেশি ভাব বিনিময় করতে পারি। এই স্বাভাবিক ভাষার সবচেয়ে উলে­খযোগ্য বৈশিষ্ট্য এই যে, প্রতিটি স্বাভাবিক ভাষার ক্ষেত্রেই সেই ভাষা ব্যবহারকারি অন্তত এমন কয়েকজন ব্যক্তি থাকবে যারা, সেই ভাষাগোষ্ঠিতে জন্মানোর সুবাদে, কোনও সচেতন প্রয়াস ব্যতিরেকেই, ভাষাটি শিখেছে। বর্তমান নিবন্ধে ‘ভাষা’ বলতে আমরা মূলত ‘স্বাভাবিক ভাষা’-ই বুঝব।

ভাষা: তিনটি প্রধান লক্ষণ
(ক) অবাধ প্রসারতা: যেকোনও ভাষার যেকোনও বাক্যের ক্ষেত্রেই একথাটা প্রযোজ্য যে, যেকোনও বাক্যের অন্তর্গত অন্বয়গত উপাদানের পুনঃব্যবহার (recursive use) সম্ভব এবং সেভাবে সব সময়েই সংশ্লিষ্ট বাক্যের থেকে দীর্ঘতর অন্য একটি বাক্য তৈরি করা সম্ভব। এই পুনঃপ্রয়োগ সংক্রান্ত বিধিগুলো এমনই যে এগুলোকে কোনও বাক্যের অন্বয়ে অনির্দিষ্টবার পুনঃপ্রয়োগ করা সম্ভব; সেজন্যই সামান্য সংখ্যক নিয়ম এবং তন্বয়গত উপাদানের (syntactic categories) সাহায্যে অসংখ্য বাক্যের উৎপাদন সম্ভব হয়। এই অবাধ প্রসারতা প্রধান ভাষার একটি লক্ষণ। অন্য ভাবে বলা যায়, মানবভাষায় বাক্য সঞ্জননের কোন শেষ সীমা নেই; মানবভাষা কিছু নির্দিষ্ট বাক্যাংশ ও বাক্যের কোনও সীমাবদ্ধ সঞ্চয় নয়।(৮)

পুনরাবর্তন সম্ভব নিয়মগুলোই ভাষা ব্যবহারকারির কাছে অসীম সংখ্যক বাক্য সঞ্জননের সুযোগ করে দেয়; কিন্তু কোনও ভাষা ব্যবহারকারি তার সীমিত জীবদ্দশায় অসীম সংখ্যক বাক্য উচ্চারণ করার বা শোনার সুযোগ পায় না। তেমনই, পুনরাবর্তন সম্ভব নিয়মের জন্যই কোনও বাক্যের দৈর্ঘ্যসীমা কখন নির্দিষ্ট নয়, যদিও বাস্তবিক পক্ষে কোনও সীমাহীন দৈর্ঘ্যরে বাক্যই নির্মিত হয় না। তবু, ক্রমাগত বৃহত্তর বাক্য সঞ্জননের সামর্থ্য থাকার কারণেই, ভাষা ব্যবহারকারি বহু বিচিত্র বাক্য নির্মাণ করে তার নিজস্ব বর্ণ ও সৃজনের ইচ্ছা তৃপ্ত করতে পারে। চোম্স্কিই যে প্রথম এই পুনরাবর্তন সম্ভব নিয়মের স্বকীয়তার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন এমন নয়; বহু যুগ আগেই ভারতিয় ব্যাকরণ দর্শনেও, বিশেষত ভর্তৃহরির রচনায়, এমন নিয়মের সন্ধান মিলেছে।

(খ) সৃষ্টিধর্মিতা: দেশকালগত উদ্দিপকের সঙ্গে ভাষার উচ্চারণ কোনও অবধারিত সম্পর্কে আবদ্ধ নয়। চোম্স্কি এই লক্ষণটিকে ‘সৃষ্টিধর্মিতা’ (creativity) বলেছেন। ভাষার সৃষ্টিধর্মিতা সৃষ্টবস্তুর (output) দিক থেকে অসীম, যদিও প্রদত্ত উপাদানের (input) দিক থেকে সীমাবদ্ধ, কেননা মানব প্রজাতিতে সহজভাবে নিহিত এক বিশিষ্ট তন্ত্র থেকেই ভাষার উদ্ভব, ওই তন্ত্রটিই ভাষার উৎপত্তিগত সীমা।(৯)

কার্তেসিয় দর্শনেও ‘সৃষ্টিধর্মিতা’ বিষয়ে আলোচনা আছে, দার্শনিক দেকার্ত ‘অন্য ব্যক্তিমন’ (ড়ঃযবৎ গরহফং)-এর অস্তিত্ব প্রমাণ করার কাজে ‘সৃষ্টিধর্মিতা’-কে একটি মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করেছেন। চোম্স্কি কিন্তু ‘সৃষ্টিধর্মিতা’-কে সে কাজে ব্যবহার করছেন না, ভাষার এই লক্ষণটিকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে তিনি মানুষকে এক স্বাধিন, অনিয়ন্ত্রিত সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। ‘সৃষ্টিধর্মিতা’ বলতে অবশ্য কিছু ভাষাতাত্তি¡ক উপাদানের পুনরাবর্তন করা মাত্র বোঝায় না। রূপকের ব্যবহার ভাষাগত সৃষ্টিধর্মিতা প্রকাশের চমৎকার উদাহরণ। এজন্যই ভাষাবিদ জ্যর্কসন ভাষাগত আলোচনায় সংশ্লিষ্ট ভাষার কাব্যিক প্রকাশ লক্ষ করার দিকে জোর দিয়েছেন।

(গ) প্রসঙ্গ যাথার্থ্য: ভাষার স্বাভাবিক ব্যবহার আর মাতাল বা উন্মাদের অস্বাভাবিক প্রকাশের মধ্যে আমরা যে পার্থক্য করতে পারি তার হেতু এই যে, ভাষায় প্রসঙ্গ অনুরূপ বা প্রসঙ্গ যথার্থ হওয়ার লক্ষণ বর্তমান।(১০)

এবং চোম্স্কি
ভাষাবিদ লিওনার্দ ব্লুম্ফিল্ড, দার্শনিক ভিট্গেন্ষ্টাইন্ বা দার্শনিক কোয়াইন্ ভাষাকে কিন্তু অন্যভাবে দেখছেন। তাঁদের মতে, ভাষা এমন এক স্বতন্ত্র নির্মাণ যার সঙ্গে মানসবৈশিষ্ট্যের কোনও যোগ নেই; ভাষা বিশেষ ধরনের কিছু ব্যবহারের সমষ্টি মাত্র।
ব্লুম্ফিল্ড্(১১) এবং ভিট্গেন্ষ্টাইন্(১২) মনে করেন, ভাষার উপায়াত্মিক ব্যবহারটাই মূল। ভিট্গেন্ষ্টাইন্ মনে করেন, প্রতিটি ভাষা ব্যবহারের দৃষ্টান্তে ভাষার সম্পূর্ণ কলনবিন্যাস যে স্থায়ি প্রেক্ষাপট হিসেবে মানব মনে নিহিত রয়েছে এমন মনে করার কোনও আবশ্যিকতা নেই।(১৩) তাঁর মতে, যেকোনও ভাষা শিখতে গেলে সংশ্লিষ্ট ভাষার শব্দভাণ্ডারের শব্দগুলোর অর্থ আবশ্যিকভাবেই শিখতে হবে, নবিন শিক্ষার্থিকে বার বার অনুশিলন করিয়ে, ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে, ভাষাটি শেখাতেও হবে। কোয়াইন্ও মনে করেন উদ্দিপক বাক্য সাপেক্ষিকরণের (stimolus sentence conditioning) বা বাক্য-বাক্য-অনুষঙ্গ স্থাপনের (sentence-sentence association) প্রক্রিয়ার সাহায্যেই ভাষা ব্যবহারকারি তার ভাষার বাক্যগুলো শেখে।

এভাবে বর্ণিত ভাষাকে আমরা ‘বহিকৃত ভাষা’ (Externalized Language বা E-language) বলতে পারি।(১৪) আর মানবমনের কোনও বিশেষ গঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে বর্ণিত ভাষাকে আমরা ‘অন্তকৃত ভাষা’ (Internatized Language বা I-Language) বলতে পারি। চোম্স্কি মূলত ভাষার এই শেষোক্ত বর্ণনাতেই আগ্রহি।(১৫) তিনি মনে করেন, এতাবৎ-অশ্র“ত বাক্যগঠনের ও বাক্যার্থবোধের সামর্থ্যকে ব্লুম্ফিল্ড্-ভিট্গেন্ষ্টাইন-কোয়াইন্ প্রদর্শিত পথে ব্যাখ্যা করা যায় না। বাক্যকে/শব্দকে বিচিত্র অপ্রথাগত পথে ভেঙে জুড়ে আমরা আমাদের ভাষাগত সৃষ্টিধর্মিতার প্রকাশ ঘটাতে পারি। উদ্ভট রসের কবিতা এর চমৎকার উদাহরণ। এ ধরনের কবিতায় আমাদের পাঠক হিসেবে চমক লাগে, কেননা এ ধরনের কবিতায় ব্যবহৃত বাক্য সংশ্লিষ্ট ভাষার অন্বয়গত নিয়ম আপাতভাবে মেনে চলে, বাক্যগুলো উচ্চারণ করলে ব্যাকরণ সম্মতই মনে হয়, আবার একই সঙ্গে, অভাবিত পথে, বাক্যগুলো ভাষাগত নিয়ম লঙ্ঘনও করে। এ ধরনের সৃষ্টিধর্মিতাকে ব্লুমফিল্ড্-ভিট্গেন্ষ্টাইন-কোয়াইন মতবাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।(১৬)

মানবভাষা ও মানবেতর প্রাণির ভাবজ্ঞাপন
দার্শনিক দেকার্ত মানবেতর প্রাণির ভাবজ্ঞাপন প্রক্রিয়াকে মানবভাষা থেকে গুণগতভাবেই ভিন্ন ধরনের বলে মনে করেছেন।(১৭) চোম্স্কিও বলেন সে, যেকোনও স্বাভাবিক মানুষই তাঁর মাতৃভাষার জ্ঞান অর্জনে সক্ষম, কিন্তু মানবভাষার একান্ত প্রাথমিক রূপ আয়ত্ত করাও অন্যদিক থেকে যথেষ্ট বুদ্ধিমান কোনও মানবেতর প্রাণির পক্ষে সম্ভব নয়।(১৮)
এই প্রসঙ্গে আমরা একটি পরীক্ষণ রিপোর্টের উলে­খ করতে পারি।(১৯) চারজন ভাষাবিজ্ঞানি এইচ.এস. টেরেসা, লরা পেটিটো, আর. স্যান্ডার্স এবং টি. বেভার, একসঙ্গে মিলে একটি মেয়ে শিম্পাঞ্জিকে মানবভাষা শেখাতে শুরু করেন। শিম্পাঞ্জিটির নাম দেওয়া হয় ‘নিম্ চিম্প্স্কি’ (স্পষ্টতই নোয়াম চোম্স্কিকে মনে রেখে; ব্যক্তিগত ভাবে, ব্যাপারটা শিষ্ট রুচিসম্মত হয়নি বলেই মনে করি)। এঁরা এই মতটা প্রতিষ্ঠা করতে চান যে উপযুক্ত শিক্ষণের সাহায্যে মানবেতর প্রাণিকেও মানবভাষা শেখানো যায়; এভাবে তাঁরা শেষ অবধি এটাই দেখাতে চান যে মানবভাষাকে মানব প্রজাতির প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্যপ্রসূত বলে দাবি করা অসঙ্গত। কিন্তু দেখা গেল, দীর্ঘ প্রশিক্ষণের পরেও ‘নিম্’ যেসব সংকেত-বাক্য (sign-sentence) ব্যবহার করেছে সেগুলো আদৌ স্বতঃস্ফূর্ত নয়, নির্দিষ্ট উদ্দিপকের প্রতি প্রতিক্রিয়া মাত্র।

আমরা আমাদের ভাষায় কোনও কথা বললে কোনও কোনও মানবেতর প্রাণি সে ধরনের উচ্চারণে এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে যে মনে হয় সেই প্রাণিটি যেন আমাদের কথা বুঝতে পারছে। কোনও কোনও পাখি মানুষের কিছু কথাকে নিজের স্বরে উচ্চারণও করতে পারে। কিন্তু তা দিয়ে একথা প্রমাণ হয় না যে এসব মানবেতর প্রাণির ভাষাজ্ঞান আছে, কেননা সীমিত উপাদানগুচ্ছ থেকে তারা এ তাবৎ-অশ্র“ত কোনও উচ্চারণ সৃষ্টি করতে বা তেমন উচ্চারণ বুঝতে কখনই সক্ষম হয় না। তাই, চোম্স্কির মতে, স্বাভাবিক ভাষা ব্যবহারের সৃষ্টিধর্মিতা লক্ষণটি এমন এক মৌল লক্ষণ যা দিয়ে মানবভাষাকে অন্য সব মানবেতর জ্ঞাপনতন্ত্র থেকে আলাদা করে ফেলা যায়।(২০)

ব্লুম্ফিল্ডও অবশ্য মনে করেন যে, যেকোনও ভাষায় আমরা সীমিত উপাদানকে অসীম সংখ্যক ভাবে সংযুক্ত করতে পারি; তবে এই সামর্থ্যকে তিনি সাদৃশ্য অনুধাবনের (analogy) ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করেছেন।(২১) তাঁর মতে, মানব ভাষাতন্ত্র এবং মানবেতর প্রাণির ভাবজ্ঞাপনতন্ত্রের মধ্যে কোনও মৌল পার্থক্য নেই, কেননা দুটি তন্ত্রই শিক্ষণ ও অভ্যাস সঞ্জাত।(২২) যেহেতু শিক্ষণ ও অভ্যাসের ক্ষেত্রকে বাহ্য পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা যায় তাই, ব্লুম্ফিল্ড মনে করেন, ভাষার স্বরূপ বুঝতে গেলে আমাদের আরোহভিত্তিক অনুমানের সাহায্য নিতে হবে। তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, নির্দিষ্ট কয়েকদিনের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ভাষাগত উচ্চারণ কতবার উচ্চারিত হবে তা পরিসংখ্যানমূলক অনুসন্ধানের মাধ্যমে আগেই নিশ্চিতভাবে বলে দেওয়া সম্ভব।(২৩)

ব্লুম্ফিল্ডের এই বক্তব্যের উত্তরে চোম্স্কির তির্যক মন্তব্য এই যে, ব্লুম্ফিল্ডের বক্তব্যটি অবশ্যই সঠিক, কেননা পরিসংখ্যানমূলক অনুসন্ধানের ভিত্তিতেই বলা যায় যে, প্রায় যেকোনও স্বাভাবিক উচ্চারণের নির্দিষ্ট কয়েকদিনের মধ্যে উচ্চারিত হবার সম্ভাবনা ‘শূন্য’।(২৪)

মানবভাষা: বিবর্তিত বৈশিষ্ট্য?
ধরে নেওয়া যাক যে মানব ভাষাতন্ত্র এবং মানবেতর জ্ঞাপনতন্ত্র এক নয়, মানবেতর প্রাণি কিছু মৌল ভাব নির্দিষ্ট কিছু ধ্বনির সাহায্যে জ্ঞাপন করে, কিন্তু আমরা এর অতিরিক্ত কিছু করি, আমরা কথা বলি। কিন্তু এমন কি বলা যাবে না যে অভিন্ন না হলেও, মানবভাষাতন্ত্র মানবেতর ভাববিনিময়তন্ত্র থেকেই বিবর্তনের পথে উদ্ভূত হয়েছে? মানবেতর জ্ঞাপনতন্ত্র যে বিবর্তনের ‘নিম্নতর পর্যায়’ মানবভাষাতন্ত্র সেই বিবর্তনেরই ‘উচ্চতর পর্যায়’? কার্ল পর্পা তাঁর ‘ক্লাউডস্ অ্যান্ড ক্লকস’ শীর্ষক ‘আর্থার কম্পটন্ বক্তৃতা’য় এমন একটা কথাই বলেছেন। কিন্তু পর্পা তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে যেসব যুক্তি দেখিয়েছেন তা চোম্স্কির কাছে খুব একটা গ্রাহ্য বলে মনে হয়নি, কেননা, চোম্স্কির মতে, সংশ্লিষ্ট বিবর্তন প্রক্রিয়ার তথাকথিত ‘উচ্চতর’ ও ‘নিম্নতর’ পর্যায়ের মধ্যে কোনও সংযোগসূত্র স্থাপন করতে বা কোনও প্রক্রিয়ায় যে নিম্নতর স্তর থেকে উচ্চতর স্তরে উত্তরণ ঘটে তা দেখতে পর্পা সফল হননি।(২৫) তাই মানবেতর জ্ঞাপনতন্ত্র (তথাকথিত ‘নিম্নতর স্তর’) থেকে মানবভাষাতন্ত্র (তথাকথিত ‘উচ্চতর স্তর’) বিবর্তিত হয়ে এসেছে-এমন কথা মানতে চোম্স্কি রাজি নন।

ভাষা: এক অন্যান্য অর্জন
ভাষা সম্পর্কে ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলেই মানব ভাষাতন্ত্র এবং মানবেতর প্রাণির জ্ঞাপনতন্ত্রের মধ্যে সাদৃশ্য সন্ধানের প্রবণতা আসে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, ভাষার এক এবং অদ্বিতীয় কাজ হল জ্ঞাপন (comunication) দার্শনিক সার্ল (J. Searle) মনে করেন, রক্ত সঞ্চালন করা যেমন হৃৎপিণ্ডের কাজ (সার্ল্ ‘purpose’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন), তেমনই ভাষার একমাত্র কাজ হল ‘জ্ঞাপন’। এই ‘কাজ’ বা ‘উদ্দেশ্য’-র কথাটা বাদ দিয়েও অবশ্য হৃৎপিণ্ডের বা ভাষার গঠনের আলোচনা করা সম্ভব, তবে সে আলোচনা একান্তই অবান্তর।(২৬)

অন্যদিকে, চোম্স্কির মতে, মানবভাষা একটি ‘বিশেষ মানস প্রত্যঙ্গ’ (particular mental organ)।(২৭) ব্যবহারবাদি ব্যাখ্যার যেকোনও মূল্য নেই তা চোম্স্কি বলছেন না; তবে, তাঁর মতে, এমন ব্যাখ্যা, সে হৃৎপিণ্ডের ক্ষেত্রেই দেওয়া হোক বা ভাষার ক্ষেত্রেই দেওয়া হোক, হৃৎপিণ্ড বিশিষ্ট কোনও প্রজাতির পর্যায়ে বা ভাষার বিবর্তনের পর্যায়ে প্রাসঙ্গিক হতে পারে, কিন্তু কোনও প্রাণির হৃৎপিণ্ড বা ব্যক্তির ভাষাজ্ঞান অর্জনের পর্যায়ে, প্রাসঙ্গিক হতে পারে না। কোনও প্রাণির শরীরে তার হৃৎপিণ্ডটা এই জন্য তৈরি হয় না যে সেটি একটি নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করার জন্যে প্রয়োজনিয়; সেটি তৈরি হয় এই জন্য যে সংশ্লিষ্ট প্রাণির জিন্ এর গঠনই নির্দিষ্ট করে দিয়েছে যে তার শরীরের হৃৎপিণ্ডটা ঠিক এমনটি হয়েই গড়ে উঠবে।(২৮)

‘জ্ঞাপন’ বলতে আমরা যদি শুধু ‘তথ্যপ্রেরণ’ বা এই ধরনের কিছু বঝি তাহলে ভাষাকে কখনই এমন ‘কাজ’-এর সঙ্গে অভিন্ন মনে করা যায় না। একথা ঠিকই যে ভাষা দিয়ে আমরা ভাব বা তথ্য জ্ঞাপন করি, কিন্তু অভাষিক চিহ্ন দিয়েও জ্ঞাপনের কাজ চালানো যায়। অন্যদিকে এমন ক্ষেত্রও রয়েছে যখন আমরা ভাষা ব্যবহার করি, অথচ কিছু জ্ঞাপন করি না। ‘জ্ঞাপন’ কথাটার যা স্বাভাবিক অর্থ সেই অর্থ অনুসারে অন্তত গাণিতিক বা যুক্তিবৈজ্ঞানিক ভাষা কিছু জ্ঞাপন করার জন্য ব্যবহৃত হয় না। যখন আমরা নির্জনে চিন্তা করি বা আত্মকথনে মগ্ন থাকি তখন, কোনও শ্রোতা না থাকার জন্যই, ‘আমরা কিছু জ্ঞাপন করছি’ এমন বললে অদ্ভুত শোনাবে। যদি স্বগতোক্তিকেও ‘জ্ঞাপন’ শব্দের অর্থের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়ে আমরা বলতে চাই যে এক্ষেত্রেও আমরা নিজের কাছে কিছু জ্ঞাপন করছি, তাহলে ‘জ্ঞাপন’ শব্দের অর্থের কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ই থাকবে না। ‘জ্ঞাপন’ ভাষার অন্যতম কাজ বটে, কিন্তু কখনই কোনও আবশ্যিক বা মৌল কাজ নয়; মূর্ত কোনও লক্ষে পৌঁছোনোর জন্য ভাষার ব্যবহার (বা, অন্যভাবে বলা যায়, ভাষার উপায়াত্মক ব্যবহার) ভাষার অন্যতম কাজ বটে, তবে গৌণ কাজ।

আমরা ভাষা ব্যবহারে সীমিত সংখ্যক ধ্বনিকে অসীম সংখ্যক পরম্পরায় সাজাতে পারি, কিন্তু মানবেতর প্রাণি তাদের ধ্বনিকে কেবলমাত্র খুব প্রাথমিক স্তরের পরম্পরায় সাজিয়ে নিতে পারে। পরিবেশগত কোনও উদ্দিপকের মুখোমুখি হলে মানবেতর প্রাণি যে ধ্বনি উচ্চারণ করে তা আমাদের ব্যথায় আর্তনাদ করা বা বিপদে চিৎকার করার সঙ্গে তুলনিয়, কিন্তু ওইরকম অবস্থায় আমরা যে ধরনের বাক্য ব্যবহার করি তার সঙ্গে কোনও ভাবেই তুলনিয় নয়। চোম্স্কি মনে করেন প্রাণিজগতে মানব ভাষা এক অনন্য অর্জন, অন্য কোনও জীবপ্রজাতিতে এর অনুরূপ কিছু দেখা যায় না।

উপসংহার
ব্যবহারবাদিরা মনে করেন মানবভাষার ব্যাকরণ এমন এক প্রক্রিয়া যেখানে ইচ্ছামতো বেছে নেওয়া যেকোনও শব্দের ব্যবহার দিয়ে পরবর্তি কোনও শব্দ ব্যবহৃত হবে তা চূড়ান্তভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। এমনটা যে ঘটে না তা চোম্স্কি তাঁর ‘থ্রি মডেলস্ র্ফ দি ডেস্ক্রিপসন্ অফ ল্যাঙ্গুয়েজ’ নিবন্ধে ভাষার আকারগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন। ভাষা আলোচনায় ব্যবহারবাদ সম্মত যান্ত্রিক ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়, কেননা ভাষা ব্যবহার বৌদ্ধিক ব্যবহার এবং বৌদ্ধিক ব্যবহার যান্ত্রিকভাবে ব্যাখ্যাত হতে পারে না।(৩০) আমরা আগেই লক্ষ করেছি, চোম্স্কির কাছে ভাষার একটি প্রধান লক্ষণ হল সৃষ্টিধর্মিতা, আর চোম্স্কি এ ব্যাপারে দার্শনিক দেকার্তের সঙ্গে একমত যে সৃষ্টিধর্মিতা উদ্দিপক নিয়ন্ত্রিত নয়।
দেকার্তের বৌদ্ধিক ব্যবহার সংক্রান্ত আলোচনাকে দার্শনিক রাইল্ ‘অতিকথা’ (myth) বলেছেন।(৩১) কিন্তু রাইল, বৌদ্ধিক ব্যবহার প্রসঙ্গে নিজস্ব মত ব্যক্ত করতে গিয়ে ‘শক্তি’ (power), ঝোঁক (propensity) ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেছেন। চোম্স্কি মনে করেন, দেকার্তের ‘মানসদ্রব্য’ (mental substance)-এর ধারণাকে যেমন দুর্বোধ্য ও রহস্যময় মনে হয় রাইলের ‘শক্তি’ বা ‘বোধ’-এর ধারণাও তার থেকে কিছু কম দুর্বোধ্য বা কম রহস্যময় নয়; ফলত ‘কার্তেসিয় অতিকথা’ বর্জন করতে গিয়ে রাইল্ নিজস্ব কিছু ‘অতিকথা’-র সৃষ্টি করেছেন।(৩২) ‘সামর্থ্য’, ‘প্রবণতাগুচ্ছ’ ইত্যাদি ব্যবহারবাদি ধারণা দিয়ে মানুষের জ্ঞানতন্ত্রের গঠনসংক্রান্ত আলোচনা করলে সে আলোচনা আমাদের সেই রাইল্ কথিত ‘যন্ত্রস্থিত অশরীরী’ (ghost in the machine)-র স্বরূপ নির্ধারণে কোনও সাহায্য করে না; এমন কোনও অশরীরীকে দূর করার প্রকৃত পথ হল মনের গঠন এবং মনের গঠনজাত কার্যাবলির বৌদ্ধিক অনুসন্ধান।(৩৩) ভাষাকে মানববুদ্ধির সঙ্গে আবশ্যিকভাবে সম্পৃক্ত করে চোম্স্কি সেই মানব মনেরই সন্ধান করে চলেছেন।

শেয়ার করুন: