004588
Total Users : 4588
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
জন্ম— জুন, ০৬, ১৯৭৭। জন্মস্থান— উত্তর গোবীন্দর খীল, হাঁদু চৌধুরী বাড়ী, পটিয়া, চট্টগ্রাম। (শৈশব কৈশোর ও তারুণ্যের সময়যাপন) বেড়ে ওঠা (পূর্ব্ব বালিয়াদী, মীরশ্বরাই, চট্টগ্রাম) নানার বাড়ীতে। প্রকাশিত কবিতার বই— ফুলেরা পোষাক পরে না (সাল: ২০১৮, প্রকাশক : মনফকিরা, কলিকেতা)। প্রকাশিতব্য বই— অর্দ্ধনারীশ্বরবাদ : প্রকৃতিপুরুষতত্ত্ব (নন্দনতত্ত্ব), বটতলার বয়ান (ভাষাতাত্ত্বিক গদ্য) ও উদ্ভিদপ্রতিভা (কবিতা)। সম্পাদক— চারবাক।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

ভাষা, বিশ্বায়ন ও ক্ষমতা

ব্রিটিশ শাসন একদিকে ভারতের নিজস্ব সমাজকাঠামোকে ভেঙ্গে তছনছ করে দিচ্ছে, কিন্তু পরিবর্তে কোন বৈপ্লবিক গতিশিলতার সৃষ্টি হচ্ছে না। আধুনিক ইউরোপের পুঁজিবাদি রীতিনীতি, কলাকৌশল, রাষ্ট্রিয় গঠনপ্রক্রিয়া, আইনকানুন, ধ্যানধারণা সেখানে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বটে, কিন্তু দেশজ সমাজপ্রক্রিয়ার সংমিশ্রণে তা এক উদ্ভট চেহারা নিচ্ছে। ফলে ঔপনিবেশিক স্বার্থে ভারতবর্ষের মানুষের ওপর শোষণের চাপ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু অন্য দিকে কোনও অগ্রসর সমাজব্যবস্থার ভিত রচিত হচ্ছে না।
বাংলার গ্রাম সমাজ সম্পর্কে কার্ল মার্কস, ইতিহাসের উত্তরাধিকার, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ২০০০

খ্রিস্ট ধর্ম চেয়েছিল পৃথিবীর সব মানুষ খ্রিস্টান হয়ে এক জাতিতে পরিণত হয়ে যাক-হয়নি। একই বাসনা ছিল বৌদ্ধ ও ইসলাম ধর্মের। প্রাগাধুনিক যুগের ঐ সকল ধর্মিয়-আন্তর্জাতিকতা ব্যর্থ হয়ে যাবার পর দেখা দেয় আধুনিক আন্তর্জাতিকতার দর্শন। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক সেই আধুনিকতারই সন্তান। ব্যর্থতা জুটেছে তার ভাগ্যেও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আত্মস্বরূপের যথার্থ উপলব্ধি ঘটে আধুনিকতার। ‘সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ’ বা টঘঙ-র জন্ম দিয়ে সে বিদায় গ্রহণ করে। অবশেষে, এই উত্তর-আধুনিক যুগে ডাক পড়েছে ‘ভুবনিকরণ’-এর।…
পরমাভাষার সংকেত, কলিম খান, প্যাপিরাস, ঢাকা, ২০০১

‘ক্ষমতা’ শব্দ অর্থ চিন্তাগত দিক থেকেও বহু পুরোনো, এর সাথে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রনৈতিক রাজনৈতিক ব্যাপার স্যাপার। ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তর পরিমণ্ডলে আষ্টপৃষ্টে ক্ষমতার রজ্জুই সবকিছুর নিয়ন্ত্রকশক্তি। প্লেটো থেকে শুরু করে মিশেল ফুকোর ভাবনার জগতে তাই ক্ষমতা আলাদা গুরুত্ব পায়। কিন্তু আমরা একে কিভাবে বিবেচনায় আনব, শুধু রাজনৈতিক রাষ্ট্রনৈতিক ব্যাপার স্যাপারের মধ্যেই কি ঠেলে দেব? বিশ্বায়ন এরই মধ্যে আলাদা মহিমায় ভাবনার জগতে জায়গা করে নিয়েছে। বিশ্বায়ন প্রশ্নে স্পষ্ট ভিন্ন ভিন্ন শিবির এখন, যদিও তথাকথিত অনুন্নত বিশ্বে বিশ্বায়ন সদর্থক অর্থ বহন করে না, নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়, হচ্ছে। বর্তমান অস্থির বিশ্বে একটু চোখ কান খোলা রাখলেই বিষয়গুলো টের পাওয়া যায়, ম্যালা ধরনের উপাচার উপঢৌকন সামনে এসে হাজির। বিপনন বণিকতার নামেই চলছে এর বানিজ্যিকিকরণ। এককালে বণিক ক্লাইভ এবং ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানিকে উপনিবেশিকতা স্থাপনের জন্য মূল্য দিতে হয়েছিল, স্বদেশে নিন্দাবাদ কম হজম করতে হয়নি। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি?- উপনিবেশিকতা স্থাপিত হচ্ছে আজ ভিন্নভাবে ভিন্ন কৌশলে। সরাসরি রাষ্ট্রের যোগ কমেছে, বেড়েছে বহুজাতিক কোম্পানির প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক: এ কয় বছরে মোবাইল কোম্পানিগুলো কথাবিক্রি করে যে পরিমাণ টাকা সরিয়েছে তা রীতিমত বিস্ময়কর, ব্রিটিশদের দু’শ বছরের শাসনেও এত টাকা পাচার হয়নি। কিন্তু এ নিয়ে কোন উচ্চবাক্য এ পর্যন্ত শোনা যায়নি। নেপথ্য নায়ক কারা, আমরা সবাই জানি। দেশিয় কিছু দালাল তারা আবার সমাজে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে সম্মানিতও বটে।
ভাষার সাথে বিশ্বায়নের কি যোগ? অথবা অন্যভাবে বললে আজকের ভূগোলোকায়নের যুগে অন্তর্জাল যেভাবে ইথারে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তাতে ভাষার উপর এর প্রভাব কেমন, অথবা ভেতরে ভেতরে কি হচ্ছে তা তলিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়ে। আবার আমরা ক্ষমতার সাথে একে টেনে আনছি কেন বিষয়গুলি বিস্তারিত করা দরকার। জাতি হিসেবে আমাদের উত্তরাধিকার নিঃসন্দেহে গৌরবের। ভাষার প্রশ্নেই একটি জাতি স্বাধিন হয়েছে এরকম নজির বিশ্ব ইতিহাসে খুব কমই আছে। দুঃখজনক বিষয় যে ভাষা বর্ণমালার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষ জীবন বাজি রেখেছিলেন আজ বিশ্বায়ন গোলোকায়নের খপ্পরে পড়ে সেই আমরা নিজের অজান্তেই মোবাইলে ফেসবুক অন্তর্জালে ইংরেজি হরফে বাংলা লিখে চলেছি হরদম কোন ধরনের আত্মশ্লাঘা ছাড়াই।
এটি কিভাবে সম্ভব হল? কোন অদৃশ্য শক্তির তোপে তোড়ে আজ আমাদের মননের এই ভগ্নদশা। বিশ্বায়ন কি তাহলে অমোঘ নিয়তি, পরাভূত দৈত্য, রাবণের রাক্ষস। ধ্বংস নেই, যার রক্তবীজ থেকে শত সহস্র রাক্ষস প্রতিনিয়ত জন্ম নেয়। মানুষের যে বৈশিষ্ট্যগুলো আর সব প্রাণি থেকে প্রকৃতিরাজ্যে তাকে অনন্য করে তোলে ভাষা তার একটি নিঃসন্দেহে। আদি সংস্কৃতি কৃষি যার উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে মানুষ প্রকৃতির সাথে তার খাদ্য সম্পর্কটিও বদলে নিয়েছিল, মানুষের সাংস্কৃতিক বিবর্তনে কৃষি আবির্ভাবের তাৎপর্য তাই নিঃসন্দেহে উলে­খযোগ্য। ভাষা কিন্তু তারও আগের অর্জন। যা কিছু ঘটমান
বাস্তবে হাজির নেই তাকেও বাস্তবতার অনুষঙ্গ করে ফেলবার মানবিয় যে সামর্থ্য তা মানুষ অর্জন করে ভাষার মাধ্যমেই। ভাষার আবির্ভাব মানুষের প্রজাতিগত জৈবযুথবদ্ধতার সূত্র বা শর্তাবলিকে বদলে দেয়ার পরে মানুষের যুথবদ্ধতার ইতিহাস হয়ে উঠেছে ব্যক্তি, সমাজ, সভ্যতা আর রাষ্ট্রের ইতিহাস। সাংস্কৃতিক মানুষ হচ্ছে তার প্রাকৃতিক বা জৈবিকসত্তা হতে নিষ্ক্রমণের ফলাফল আর এই নিষ্ক্রমণ পথে মানুষের যুথবদ্ধ প্রয়াসের ভিত্তি কাঠামো নিঃসন্দেহে সাংস্কৃতিক জ্ঞানের ভাষা নির্ভর বিস্তার। সাংস্কৃতিক মানুষের যা কিছু ঐতিহাসিক অর্জন, ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্র কাঠামো জুড়ে যে বিশাল সংস্কৃতির দেহ তার শিরা-উপশিরা-ধমনি জুড়ে ভাষার স্রোত নিরন্তর বয়ে চলে বলেই তা প্রাণবান। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ‘ব্যক্তি আমি’র আবির্ভাবই ভাষা আশ্রিত সংস্কৃতির সূত্র মুছে দিয়ে মানুষের যুথবদ্ধতার সূত্রগুলোকে বিন্যস্ত করেছিল ক্ষমতার বিন্যাসে। সাংস্কৃতিক সমস্বত্ত¡ বা বৈচিত্র্যের চেয়েও ক্ষমতার বিন্যাসই অনেক বেশি বিন্যস্ত করেছিল মানুষের আধুনিকতম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রকে। পশ্চিমা সভ্যতার ছায়ায় এই রাষ্ট্রের প্রকৃষ্টতম বিকাশটি উপনিবেশিকতায় ভর করে পৃথিবীর মানুষের অনিবার্য ঐতিহাসিক নিয়তি করে তুলেছে। যুথবদ্ধ সৃজনযজ্ঞের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি মানুষের সাথে জুড়ে দেয়া হয় আরো নানা পরিচয়। ক্ষমতার ইতিহাস এই সৃজনযজ্ঞের নিয়ন্তা হয়ে উঠবার পর এই ইতিহাসের সবচেয়ে পরিশিলিত অর্জন আধুনিক জাতিরাষ্ট্র। অনিবার্য আইনি পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় জাতিরাষ্ট্র, ব্যক্তি পরিচয়ের পাশাপাশি এই রাজনৈতিক পরিচয়ের চর্চা সভ্য আধুনিক মানুষের অমোঘ নিয়তি। অনড় সংস্কৃতির প্রাচিরঘেরা অর্থনৈতিকভাবে অন্তর্মুখিন প্রাচিন ভারতিয় গ্রামসমাজের যে দিকটি কার্ল মার্কসসহ পশ্চিমা ইতিহাসবিদদের ভাবনার বিষয়, তাহলো কেন্দ্রিভূত কোন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি এই গ্রামসমাজগুলোর স্থবির নির্লিপ্ততা। গোড়ায় কার্ল মার্কস এই স্থবিরতার প্রতিষেধক হিসেবে সম্ভাব্য কার্যকরি ঔষধ বাতলেছিলেন আধুনিক রাষ্ট্রের অস্ত্রসজ্জিত ব্রিটিশ শাসনকেই। ব্রিটিশ শাসনের আগে হিন্দু রাজবংশ, বা মুঘল শাসন আমলেও এই গ্রামসমাজে বসবাসকারি মানুষের রাষ্ট্রের ব্যাপারে খোঁজখবরে তেমন একটা আগ্রহ ছিল না। রাষ্ট্রনীতি রাজার এমন ধারণা বরাবরই এরা পোষণ করে এসেছে। বহিরাগত বা অনুপস্থিত শাসকদের খাজনা দিয়ে নিজেদের যাপিত জীবন নিরুপদ্রব রাখাটাই তাদের বিবেচনায় জরুরি ছিল। মার্কসের নিজস্ব ইতিহাসতত্ত¡ যত পরিশিলিত হয়েছে, ভারতবর্ষের ইতিহাস ও সমাজ সম্পর্কে তাঁর পরিচয় যত গভীর হয়েছে ততই তিনি সরে এসেছেন তাঁর পূর্ববর্তি অবস্থান থেকে।
উপনিবেশিকতা বা সা¤প্রতিক সময়ে ভিন্ন কোন উপায়েই হোক, অন্যের সংস্কৃতি গ্রহণ বরাবর দখলেরই নামান্তর। ইতিহাসের সব দাপুটে পণ্য সভ্যতাই তার ঐতিহাসিক অধিকারভুক্ত পথে মুখোমুখি হওয়া সমস্ত পূর্বাপর সমাজকে চূর্ণবিচূর্ণ করে। প্রাক-ধনতান্ত্রিক সমাজ ও তার অর্থনীতি ধনতান্ত্রিক সমাজের বাজারের কবলে পড়ে এত দুর্বল আর শক্তিহীন হয়ে পড়ে যে নিজের সনাতন সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে পারে না। এই অবস্থায় টলায়মান সমাজগুলো, তার মানুষ ব্যক্তি হিসেবে বেঁচে থাকবার কসরত করতে থাকে অপেক্ষাকৃত সক্ষম সংস্কৃতির আশ্রয়ে। এই গ্রহণ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত নয়, অনেকটাই বলপ্রয়োগমূলক অথবা অনিবার্য ঐতিহাসিক নিয়তি। স্ট্যানলি ডায়মন্ড চমৎকারভাবে একে নামকরণ করেন, ‘পশ্চিমা সভ্যতার আবশ্যিক গ্রাহক’ বলে। প্রায় দুইশত বছরের ব্রিটিশ শাসনের মধ্য দিয়ে আমরা আবশ্যিক গ্রাহক হিসেবে পশ্চিমা সভ্যতার প্রধান সাংস্কৃতিক মানদণ্ড গ্রহণ করেছি। ব্রিটিশ শাসন ভারতের কৃষি উদ্বৃত্ত নির্ভর অভিজাতদের বড় অংশেরই চিন্তা, মনন, মানসকাঠামোয় ধনতান্ত্রিক ইউরোপিয় সভ্যতাকে মোহনিয় রূপ দিতে পেরেছে। ধনতান্ত্রিক সভ্যতার সবচেয়ে উদ্ভিন্ন রূপটিকে স্থানিক ক্ষমতা কাঠামোতে নিজের অবস্থানের সাথে মেলাতে গিয়ে এই অংশটির মনে অবচেতনে রোপিত হয়েছে স্বাধিন আধুনিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন। ক্ষমতা কাঠামোর ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অসম সামাজিক বিন্যাসের অভিভাবকত্বে এবং পরবর্তিতে ব্যক্তি মানুষের মানবিক অস্তিত্ব হন্তারক ভূমিকা পালনের কারণে আধুনিক রাষ্ট্র তার অর্জিত অবস্থান থেকে দ্রুত সরে আসে, হারায় মানবিক প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি, আর তা ঘটতে থাকে খোদ পাশ্চাত্যেই যারা একে মানবিকতার তকমা সেঁটে দিতে চেয়েছিল। স্বনির্ভর অর্থনীতির গ্রামসমাজ যখন ধনতান্ত্রিক বিকাশের ধারায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল, নিজের অর্থনৈতিক নিয়তিকে মোকাবেলার তাগিদ থেকেই এই মানুষেরা অংশিদার হয় এর। ঐতিহাসিকভাবে ভারতের দরিদ্রতর নিম্নবর্গিয় মুসলমান জনগোষ্ঠি ধর্মকে আশ্রয় করে স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু অর্জিত নতুন রাষ্ট্রে মুসলিম জাতিয়তাবাদি নেতৃত্বে অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্যে গতি পায়, মুখ্যত ধর্মিয় পরিচয় বড় হয়ে যায়। শাসন, আইন, অর্থনৈতিক উৎপাদন, শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তিসহ রাষ্ট্রের যা কিছু অর্জন, যুথবদ্ধ মানুষের মতোই তারও যে আদি ও মৌলিক আশ্রয় ভাষা ফারসিভাষি মুঘল ও ইংরেজিভাষি ব্রিটিশ রাষ্ট্রের সাথে যুঝতে গিয়ে এই উপলব্ধি সহজেই সঞ্চারিত হতে পেরেছিল। ফলে ধর্মভিত্তিক জাতিয় একাত্মবোধের ধারণা শুরুতেই হোঁচট খায়, প্রতিরোধের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠে ভাষা। ভাষাভিত্তিক জাতিয়তাবাদের মানবিক আদ্যগুণ নিয়ে উদ্ভূত আমাদের জাতিরাষ্ট্র শুরুতেই মৌলিক প্রশ্নটিকে উপেক্ষা করেছে, সরে গেছে নিজস্ব অবস্থান থেকে, প্রান্তিক ও স্বতন্ত্র জাতিসত্তাকে গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজনও বোধ করেনি। একমেরু, ভুবনগ্রাম, বিশ্বসমাজ, বিশ্বায়নের মতো ধারণাকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে এক অঘোষিত লড়াই। ধনতান্ত্রিক পণ্য সভ্যতার কারণেই হোক, মানবিকতার দোহাইয়ে হোক এরই মধ্যে অস্তিত্বসংকট, পরিচয়সংকট বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিকতা পাচ্ছে, গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হচ্ছে। সমাজ-সংস্কৃতি-ভাষার আদি উৎস নিয়ে মনোজেনেসিস আদিকল্পে যে একিভূত সমাজের দেখা মেলে, ইতিহাসের কালচক্রে সেই সমাজই টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে গিয়ে মানুষের মানচিত্রকে অভূতপূর্ব বৈচিত্র এনে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রিয় পুঁজিকে পেছনে ফেলে কর্পোরেট পুঁজির বৈশ্বিক বিস্তার শেকড় ধরে নাড়া দিয়েছে সংস্কৃতির। দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্য সব যুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে নির্মম লড়াইটি চলছে ভাষাকে কেন্দ্র করে। জাতি মাত্রেরই সমস্ত অর্জিত সম্পদের আদি ও প্রধানতম কোষাগার হচ্ছে তার ভাষা। কোন জাতির ভাষাকে মেরে ফেলতে পারলে সেই ভাষাহীন জাতিটিকে আর না মারলেও চলে, কারণ তার ভাষা চলে গেলে তার কীর্তি, সংস্কৃতি, জ্ঞান-প্রজ্ঞা-দর্শন সবই চলে যায়। নতুন অধিপতি সভ্যতায় সে তখন অনায়াসেই বিলীন হয়ে যায়। কাজেই মানবিক অস্তিত্ব রক্ষার যত রকম সংগ্রাম চলছে তার মধ্যে ভাষার লড়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কলিম খান-এর জবানিতে ভাষাবিজ্ঞানিদের বরাতে এই লড়াইয়ের লোমহর্ষকর সংবাদ পাওয়া গেছে। তারা জানাচ্ছেন আগামি শতাব্দিতেই মানুষের মাঝে প্রচলিত প্রায় ৫০০০ ভাষার মধ্যে শতকরা ৯০টি অর্থাৎ ৪৫০০ ভাষাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সারা পৃথিবীতে বহু ভাষাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ভাষাভাষির সংখ্যা দশ হাজারেরও কম এরকম বিলুপ্তপ্রায় ভাষার তালিকাটিও আশংকাজনকভাবে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলেছে। ৫০ বছরের মধ্যেই পৃথিবীতে জীবিত ভাষার সংখ্যা কমে অর্ধেকে দাঁড়াবে বলে পূর্বাভাস দিচ্ছেন ভাষাবিদরা। পৃথিবীর জনসংখ্যা ৬০০ কোটি ধরলে এর মধ্যে ৫৭০ কোটি জনসংখ্যাই কথা বলে একশটিরও কম ভাষায়। ভাষাযুদ্ধের এই চিত্র ভূ-ভাগের এই অংশেও কম ভীতিকর নয়। অবিভক্ত ভারতে প্রচলিত ১৫০০ ভাষার মধ্যে ৪৩৩টি ভাষারই নাম উঠে গেছে বিপন্ন ভাষার তালিকায়। পণ্য সভ্যতা পরিবাহিত বাজার সংস্কৃতি কোন ভাষা তথা জাতিসত্তার টিকে থাকবার প্রশ্নে কিছু শর্ত নির্ধারণ করে দেয়। পণ্যের দেহ অলংকৃত করে মুনাফা নিয়ে আসবার দাপট নিয়ে বিশ্ববাজারের ‘মাস্তান-ভাষা’গুলোর সমকক্ষ হয়ে না উঠতে পারলে কোন ভাষারই আর অস্তিত্ববান থাকবার সম্ভাবনা নেই। বেঁচে থাকতে হলে সব ভাষাকেই হয়ে উঠতে হবে তাদের মত সর্বত্রগামি ও সর্বজনগ্রাহ্য, হয়ে উঠতে হবে কম্পিউটার, কমোডিটি আর কনজুমার ফ্রেন্ডলি। বিশ্বায়নের শুরু থেকেই যে কায়কায়বারগুলো ফেনিয়ে বাড়িয়ে প্রতিষ্ঠা দেবার চেষ্টা চলেছে ভাষা আগ্রাসন তার একটি। ভাষাসাম্রাজ্যবাদিরা মুখিয়ে থেকে দিনের পর দিন প্রচেষ্টা চালিয়ে কর্পোরেট স্বার্থে এমন একটি ভাষাকে সারাবিশ্বের মানুষের উপর চাপিয়ে দেবার চেষ্টা চালাচ্ছে যাতে করে তাদের ব্যবসা নির্বিঘœ হয়। কেননা পণ্যের ব্যবসা স¤প্রসারণ করতে হলে প্রথমেই সেই জাতির অস্তিত্বসংকট প্রকটিত করে তুলতে না পারলে, নিজস্বতা, সার্বজনিনতা ধ্বংস করে পরামুখাপেক্ষি করে ফেলতে না পারলে আখেরে ফল ভাল না হবার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। আবার যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম তো ভাষাই। তাই কৌশল চলে প্রচার প্রচারণার। এক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি মিডিয়া সেবা করে যায় নিরন্তর। উন্মুক্ত অবারিত আকাশের হাতছানি আমাদের অস্তিত্ব সংস্কৃতির জন্য যেমন হুমকি, সেখানে আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রচারে ততটা সাফল্য দেখাতে পারিনি। প্রতিবেশি দেশের কালচার যেমন অনায়াসে প্রবেশ করতে পারছে, পারছে সুদূর পাশ্চাত্য সংস্কৃতিও। দেশিয় মিডিয়া অথবা মিডিয়াকর্মিদের দক্ষতা যোগ্যতা অদূরদর্শিতা, ব্যবসায়িক হীন স্বার্থের বলি হচ্ছে ভাষা। ভাষাসাম্রাজ্যবাদিদের প্রচারণা কৌশল, দীর্ঘদিনের নিবেদিত শ্রম, মেধাশক্তির কাছে ক্রমেই আমরা হয়ে পড়ছি অসহায়। দেশিয় সংস্কৃতির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যে প্রচার প্রচারণা তাতে অর্থলগ্নির পরিমাণ সামান্য নয়। অন্যপ্রেক্ষাপটে দেশিয় প্রান্তিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির ভাষাও হুমকিতে পড়ে যাচ্ছে প্রধানতম ভাষার কাছে, বৈশ্বিক প্রভাবতো থাকছেই। তাই লড়াইটা একতরফা হচ্ছে না। ক্ষমতার লড়াইয়ে টিকে থাকতে হলে, ভাষাকে ভাষাসাম্রাজ্যবাদি শক্তির বিপক্ষে দাঁড়াতে হলে, আপন ঐতিহ্যের অনুসন্ধান জরুরি, জরুরি আত্মোপলব্ধি। কেননা অন্তর্জাল কিংবা আকাশসংস্কৃতির অন্তহীন প্রচারণা অবাধ প্রবাহ বন্ধ করা সম্ভব নয় কিছুতেই। বিশ্বায়নের খপ্পরে পড়ে যাতে নিজস্ব ভাষা হারিয়ে না যায়, নিজস্ব ইতিহাস ঐতিহ্যের সোনালি গাঁথায় প্রত্যাবর্তনই হবে একমাত্র মৌল সমাধান। আবার দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল যে ভাষাকৃষ্টিসংস্কৃতি তা আমাদের অর্জন, তা কোনোভাবেই হারিয়ে যেতে দেয়া যায় না।

শেয়ার করুন: