004637
Total Users : 4637
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →
জন্ম— জুন, ০৬, ১৯৭৭। জন্মস্থান— উত্তর গোবীন্দর খীল, হাঁদু চৌধুরী বাড়ী, পটিয়া, চট্টগ্রাম। (শৈশব কৈশোর ও তারুণ্যের সময়যাপন) বেড়ে ওঠা (পূর্ব্ব বালিয়াদী, মীরশ্বরাই, চট্টগ্রাম) নানার বাড়ীতে। প্রকাশিত কবিতার বই— ফুলেরা পোষাক পরে না (সাল: ২০১৮, প্রকাশক : মনফকিরা, কলিকেতা)। প্রকাশিতব্য বই— অর্দ্ধনারীশ্বরবাদ : প্রকৃতিপুরুষতত্ত্ব (নন্দনতত্ত্ব), বটতলার বয়ান (ভাষাতাত্ত্বিক গদ্য) ও উদ্ভিদপ্রতিভা (কবিতা)। সম্পাদক— চারবাক।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী হয়ে ওঠা অথবা সন্ধ্যা-রাতের গল্পগাথা

এত এত ফিসফাস আর কানাঘুষার ভেতর ইচ্ছে করলেই কি আর শুয়ে থাকা যায়! যায় না। সারাদিন খাটাখাটনির পর শরীরও তো শরীরের জায়গায় নেই। শরীরের হাড়হাড্ডি ছেড়ে রক্ত-ঘাম-মাংস-হৃদপিন্ড শুধু না, হাড়ের ভেতরকার মজ্জা পর্যন্ত হেলে পড়তে চাচ্ছে। হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী এইসব ছেড়েছুড়ে নিজেকে শক্তপোক্তভাবে দাঁড় করায় কী করে? আর ওদিকে শুধুই কি কানাঘুষা-ফিসফাস! দলাপাকানো ভয় আর আতঙ্ক নোংরা দাঁত বের করে গিলে খাবার থাবা মেলে আছে না!
সন্ধ্যা থেকেই ভয় আর আতঙ্কের নোংরা দাঁতগুলো গলির এমাথা থেকে ওমাথা দৌড়ে চলেছে। কখনো কখনো আবার গলির ভেতর গলি হয়ে সরু গলির গলি হয়ে ঢুকে পড়ছে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর স্ত্রী নূর বানুর হাত ফসকে ফ্রিজের খোলা পাল্লার লুকিয়ে থাকা হিম ঠান্ডায়। ভয়েরও বিশ্রাম থাকা লাগে। একারণেই কি-না দৌড়াদৌড়ির ক্লান্তি দূর করার জন্য ফ্রিজের ভিতর ঢুকে একেবারে স্থির। স্থির হলে কী হবে? বাইরের উত্তেজনা, আতঙ্ক টিকাটুলির গলি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া সায়দাবাদের রোঁয়া ওঠা গন্ধের ভেতর লুকিয়ে থাকা মানুষগুলোকে ঘাড় ধরে আছড়ে মারছে না! সেখানকার মানুষগুলো কি হাত-পা ছুঁড়েও স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারছে! না পারুক। এরই ভেতর যাত্রাবাড়ি তো যাত্রাবাড়ি, নারায়ণগঞ্জের বড় রাস্তা মাড়িয়ে ছুটতে ছুটতে টানবাজার অবধি মীনাক্ষী কিংবা সোনালি বেন্দ্রে কিংবা কিংবা টালিউডের শাবনূর বা হালের জয়শ্রীর বেডরুমের খাটে বিছানো বোঁটকা গন্ধওঠা চাদর সরিয়ে তোষকের ঝুটের গুটির ভেতর গুটি হয়ে উম নেয়ার চেষ্টা করছে।
এত যে ভয় ভয় আর ফিসফাস চারদিকে তবুও হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী গুটিসুটি বিছানায় পড়ে থাকতে পারেনি। সারাদিন সময় করে উঠতে পারে না বলে বায়তুল মোকাররমে ভোরভোর ফজরের নামাজ পড়া হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর অভ্যাস। আজও তার ব্যতিক্রম হয় কী করে! হয়নি। রাতে ঘুমুতে যেতে দেরি হলেও ফজরের আজানের আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে টিকাটুলি থেকে বঙ্গভবনের প্রাচীর ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে গুলিস্তান হয়ে বায়তুল মোকাররম এসে পৌঁছায়। কাবা ঘরের আদলে গড়ে ওঠা মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ার প্রশান্তিই আলাদা। নাকের ডগায় মক্কা-মক্কা একটা সুবাস খেলা করে। তাছাড়া ভোরের ঝিরঝিরে বাতাস নামাজ শেষে সারা শরীরে যে পবিত্র আমেজ বুলিয়ে যায় তা কি সারাদিনের তাপ আর শ্রম সবটুকু ধুয়ে নিতে পারে? পারে না। পারে না বলেই হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী মধ্যবয়সী স্ত্রী নূর বানুর ঘুমের ঘোরে জড়িয়ে ধরা বাম হাতটাকে আলতো করে ছাড়িয়ে শুধু গায়ের পাঞ্জাবিটা ঘাড়ের উপর ফেলে কোনো মতে বেরিয়ে আসে। সারাদিনের খাটাখাটনিতে নূর বানুর শরীরও তো বিশ্রাম চায়। তবে চাইলেই তো আর পারে না। সবশেষ এটাসেটা করেও ঘুমাতে ঘুমাতে তার রাত ১২টা। তারপর কাদা হয়ে ঘুমের ভেতর ডুবে থাকা নূর বানুকে জাগাতে গেলে বেচারি আর ঘুমাবে কখন? ফলে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকে নিঃশব্দেই ঘর থেকে বেরুতে হল।


হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী যখন ঢাকায় টিকাটুলির ২ নম্বর গলির শেষ মাথার ২২ নাম্বার বাসার সিঁড়ির নিচে আশ্রয় পায়, তখন আর তার বয়সই কত। ১৪ কি ১৫। এই বয়সেই অনেকের সাথে সেও একদিন নবীনগর থেকে ঢাকায় এসে মশলাপাতির আড়তদার দূর সম্পর্কের মামা হাজি মো. আবুবকর সিদ্দিকীর দোকানে ফাইফরমাস খাটা শুরু করে। ফাইফরমাস খাটতে খাটতে কয়েক বছরের মধ্যে নিজেই একদিন হাজি মো. আবুবকর সিদ্দিকীর নেকনজরের বদৌলতে গলির ভেতর মশলাপাতির ছোট্ট একটা দোকান দিয়ে বসে। তখন তার বয়স ২২/২৩-র বেশি হওয়ার কথা নয়। এই তাগড়া বয়স আর অর্থনৈতিক সততার জন্য হাজি মো. আবুবকর সিদ্দিকীর ঔদার্য মো. আবুল হোসেনকে ফাইফরমাশ খাটা থেকে রেহাই দিয়ে দোকানী হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
সেই থেকে মো. আবুল হোসেন নিজের বুদ্ধি আর হাজি মো. আবুবকর সিদ্দিকীর বদান্যতায় ধীরে ধীরে বড়বেশি হিসেবী কায়দায় ছোট্ট দোকানটিকে ডানে-বাঁয়ে-পিছে বাড়িয়ে পাকাপোক্ত একজন ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে। তার দোকানেও এখন দুই-দুইজন কর্মচারী। হউক না ছেলে-ছোকরা। কাজ তো চলছে। তাছাড়া সবসময় গায়ে-গতরে খাটার জন্য মো. আবুল হোসেন নিজেকে তো একপায়ে দাঁড় করিয়েই রেখেছে।
এতো গেল মো. আবুল হোসেনের ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার কথা। এখন? পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার সাথে সাথে মো. আবুল হোসেন এখন হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী। ঘরে বউ, ২ মেয়ে, ১ ছেলেসহ ৫ জনের সংসারের কর্তা। শুধু সংসারের কর্তা আর ব্যাপারী হয়ে থাকলেই তো মো. আবুল হোসেনের চলে না। পাড়ার মসজিদ মসজিদুল আকসার ইমাম সাহেবের সাথে শলাপরামর্শ করে ওমরা হজ করার পাকা নিয়ত করে ফেলেছে। এখন শুধু কাগজপত্র ঠিক করার ব্যস্ততা। তাও হয়ে গেল ইমাম সাহেবের তৎপরতাতেই।
দিন সাতেক পরেই উড়াল পথে ওমরা করার নিয়তে মো. আবুল হোসেনের মক্কা যাওয়ার কথা। তবে এসব খবর পাড়ার মুরুব্বিদের না জানালে তো আর চলে না। ফলে জুম্মাবারে সকলের দোয়া চাওয়ার উছিলায় আয়োজন করে ফেলে মসজিদ কমিটির সদস্যসহ ইমাম মোয়াজ্জিনকে বাদ রেখে গণমিষ্টি বিতরণের। শ-তিনেক মানুষের জন্য একপিস কালোজামের সাথে একপিস নিমকি আর একপিস লাড্ডুর প্যাকেট। আর মসজিদ কমিটির সদস্যসহ ইমাম মোয়াজ্জিনের জন্য মিষ্টির প্যাকেটের সাথে মোরগ পোলাওয়ের ব্যবস্থা। মো. আবুল হোসেনকে এটুকু খরচ করতেই হয়। ওমরা করল আর কেউ জানল নাÑ এটা কি হয় না-কি! ওমরা শেষে সকলে যদি হাজি সাহেবই না বলল তো হজ করে ইহজগতে পেলটা কী!
তারপর থেকেই মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী। চেনাজানা লোকজন যখন হাজিসাব বলে ডেকে ওঠে তখন কিছুটা শরমই পায় হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী। তবে এই শরম পাওয়াটাকেও সে উপভোগ করে। ব্যবসাপাতি অন্যের উপর ছেড়ে গাঁটের টাকা খরচ করে হজ করতে গিয়ে মক্কা-মদিনা ঘুরে আসার ধকল কি আর কম। ফলে কেউ কখনো মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকে ডাকতে এসে মোহম্মদের আগে হাজি বসিয়ে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী বলে ডেকে উঠলে দুই ঠোঁটের বামকোণ বেয়ে একচিলতে হাসি গড়িয়ে পড়ে মাটিতে। মাটিতে গড়িয়ে পড়া হাসিটিও হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর মুখের দিকে তাকিয়ে মাঝে মধ্যে ফিক করে হেসে উঠে। হেসে উঠে মক্কা-মদিনা ঘুরে আসার পর গায়ে গায়ে লেপ্টে থাকা ক্লান্ত-শ্রান্ত-অবসন্নতার গুড়া গুড়া পুস্তদানাগুলিও। আর তখনই তার সামনে এসে হাজির হয় মক্কার কাবা শরিফ। বাদশার নেতৃত্বে রাজপরিবারের সদস্যদের ব্যবস্থাপনায় প্রতি হজের আগে স্বর্ণখচিত গিলাফে যখন কাবাশরিফ ঢেকে যায়- কী স্বর্গীয় সুবাস ছড়িয়ে যায় মক্কার চারপাশ ছাড়িয়ে ইরান, ইরাক, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, আরব আমিরাত, ইয়েমেনসহ লাল সাগর পেরিয়ে সুদান কিংবা ইজিপ্টে। ঈসরাইলেও কি তার সুবাস ছড়িয়ে পড়ে না? পড়ে বইকি। বাতাস তো আর কোনো ধর্মের বেড়ায় আটকে থাকে না। তখন স্বর্গীয় সুবাস ইহুদি খ্রিস্টান নাসারাদের নাকের উপরও মৃদু সুড়সুড়ি তোলে। হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী ওমরা করতে গিয়ে সেই স্বর্গীয় সুবাসও গায়ে মেখে এসেছে কি? অসম্ভব কিছু নয়। তা না হলে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর স্ত্রী নূর বানু সবসময় হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর গায়ে গায়ে লেগে থাকে কেন? পায় বলেই সারারাত হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকে বাঁহাতে বুকের মাঝ বরাবর জড়িয়ে রাখে। এতে একটু উসখুস লাগলেও ব্যাপারী খুব একটা আপত্তি করে না। সারাদিন খাটাখাটনির পর বউয়ের খোলা বুকের সাথে বুক লাগিয়ে শুয়ে থাকাটা তো মন্দ নয়। ভালোবাসা! ভালোবাসার ওম।


প্রতিবছর সৌদি বাদশার প্রতিনিধির উপস্থিতিতে মসজিদুল হারামের তত্ত্বাবধায়কদের তত্ত্বাবধানে যে গিলাফ পরানো হয় তা কি শুধুই গিলাফ! ৬৭০ কেজি রেশমের সাথে ১৫০ কেজি সোনা আর রুপার চিকন তারে তৈরি গিলাফ। এর সাথে জড়িয়ে আছে মুসলিম উম্মার স্বর্গীয় আবেগ আর রোমাঞ্চ। তবে পুরোনো গিলাফ কেটে বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানদের সৌদি বাদশার উপহার দেয়ার কথা হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী শুনেছে। শুনলে কী হবে! সে তো কোনো সরকার প্রধান নয়, সে হাজি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় চলমান এহরামধারী মাত্র। তার কি আর উপহার পাওয়ার সুযোগ আছে? না থাক। তবে আরাফাত থেকে ফিরে এসে নিয়মিত হাজিরা কাবার গায়ে নতুন গিলাফ দেখে নিজের ভেতর যেরকম রোমাঞ্চিত হত, মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর রোমাঞ্চও কম নয়। একারণে মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী কাবা শরিফ তওয়াফ করার সময় কাবার খুব কাছে থাকার চেষ্টা করেছে। যতক্ষণ পারা যায় চোখের পাতা না ফেলে গিলাফের ৬৭০ কেজি রেশম, ১৫০ কেজি সোনা আর রুপার ক্যালিগ্রাফি দেখে দেখে পুরো গিলাফটি বুকের ভেতর গেঁথে নিয়েছে। ফলে এখন চোখ বন্ধ করলেও গিলাফের রেশম, সোনা আর রুপার ক্যালিগ্রাফি দেখতে কোনো অসুবিধা হয় না তার। একারণে হাজিসাব শব্দবন্ধটি তার কানে উঁকি দেওয়ার সাথে সাথে চোখের সামনে থির হয়ে দাঁড়িয়ে যায় রেশম, সোনা আর রুপার ক্যালিগ্রাফি করা গিলাফে মোড়ানো পবিত্র কাবা। তখন তার পা মাটি থেকে আর সরে কী করে! দাঁড়িয়ে পড়তে হয় হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকে। এতে অবশ্য সুবিধেই হল। কিছু পয়সার মুখ দেখার সাথে ওমরার বদৌলতে সামাজিক সম্মানটা একটু বেড়ে যাওয়ায় সারা শরীরে সুখের একটা রেশমি প্রলেপ পড়ে। প্রলেপটা গাঢ় হয় ইঞ্চি দেড়েক লম্বা কালো দাড়ির গলি-ঘুপচি জুড়ে। তখন কথা বলতে গেলেই বাঁ হাতটা অটোমেটিক চলে আসে দাড়ির অন্দরমহলে। দাড়ির প্রতিটি চুলে জড়িয়ে আছে সত্তরটি ফেরেশতা। হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপরীর চাপ দাড়ি না থাকায় ফেরেশতার সংখ্যাও কম- এটা সে ভালোই বোঝে। একারণেই একটা কষ্টবোধ তাকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায়। দীর্ঘ-চাপদাড়িওয়ালা কোনো মুসল্লি দেখলেই তার ভেতরটা আফসোসে খানখান হয়ে যায়। এসব ভুলেও হাতের আঙুলগুলো যখন দাড়ির গলিঘুপচির ভেতর খেলা করে, তখন তার আঙুলগুলো কি ঠিকঠাক চলতে পারে! কখনো কি আঙুলগুলো দাড়ির ভেতর চলাফেরা করতে গিয়ে কোনো কিছুর সাথে ঠেলাঠেলি বা ঠুকাঠুকি করে ফেলে? যা পারে করুক। তবে দাড়ির ভেতর আঙুলগুলো চলাচলের সময় একটা স্বর্গীয় কোমল পবিত্র অনুভূতি হাতের আঙুল থেকে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। কখনো দৌড়ায় বা হাঁটু ভেঙে বসে থাকে অথবা ফিক করে হেসে ওঠে।
তবে মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী নামের আগে হাজি বসাতে পারলেও নিজের ভেতর একটা শূন্যতা, একটা হাহাকার সারাক্ষণ অনুভব করে। বিশেষ করে কারও মুখ নিঃসৃত হাজি সাব শোনার সাথে সাথে। সে তো জানে হজ করতে গিয়ে রাসুলের শহর মদিনায় গিয়ে তার কী বাজে একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। পরিস্থিতি এমন একটা যে হবে তার আন্দাজ অবশ্য মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর কানের কাছে সব সময় বলাবলি হচ্ছিল। হবে নাই বা কেন? তার যে মৃগী বেরাম আছে সে আর কেউ না জানলেও তার নিজের তো অজানা নয়। কোনোদিন পরিচিত মানুষের সামনে খিঁচতে খিঁচতে পড়ে যায়নি বলেই না রক্ষা। নইলে নূর বানু কি তাকে একা হজ করতে দিত কোনোদিন! দিত! দুইজনে একসাথে হজ করার খরচটা মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর ভালো করেই জানা। খামাকা রক্তজল করা টাকা জলে ফেলে দেওয়া। তাছাড়া বেকার স্ত্রীর ওপর হজ তো আর ফরজ না। সে কেন শুধু শুধু দায় নিতে যাবে!
তবুও, সব দায় নিয়ে নূর বানুকে সাথে আনলে কি রাসুলের রওজা জিয়ারত করার সময় দুড়–ম করে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেত? খিঁচুনির সাথে নাক-মুখ নিয়ে লালা-থুথু-শ্লেষ্মা আটকানো যেত! কিছুই হত না। নূর বানুর সাধ্যি কি তাকে পাজাকোলা করে রাসুলের রওজা মোবারকের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে। আনতে তো হত সেই অচেনা সাহাবিদেরই। মাঝখানে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার শ্রাদ্ধ।
শুধু মনে পড়ে, পড়ে যাবার আগ মুহূর্তে রাসুলের রওজা শরিফ থেকে পশ্চিম দিকে রাসুলের মিম্বার পর্যন্ত হৃদয় আলো করা রিয়াজুল জান্নাত যাকে রাসুলের উম্মতেরা বেহেশতের বাগিচা বলে ডাকে। এই রিয়াজুল জান্নাতই দুনিয়ায় একমাত্র জান্নাতের অংশ। তবে এই বাগিচায় বাদশার নির্দেশে স্বতন্ত্র রঙের ধূসর সাদাটে কার্পেট বিছানো থাকে। হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর আফসোস, বেহেশতের এই বাগিচায় তার প্রবেশ করা হল না। অথচ, মোয়াল্লেম কতভাবেই না বুঝিয়ে দিয়েছিলেন রিয়াজুল জান্নাতে প্রবেশের মাহাত্মের কথা। এখন, এই ওমরা শেষ করে আসার পর হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী কি কাউকে বলতে পারে রিয়াজুল জান্নাতে প্রবেশের অনুভ‚তিহীনতার কথা! বরং তাকে একটু বাড়িয়ে বাড়িয়ে নিজের সৌভাগ্যের কথা সকলকে জানান দিতে হয়। রিয়াজুল জান্নাত। আহা কী প্রশান্তিময় পবিত্র বাগিচা। বাগিচায় বিছানো ধূসর সাদা কার্পেট। কার্পেটে পা রাখার সাথে সাথে নিজেকে পবিত্র আত্মায় বাঁধা স্বর্গীয় মেহমান মেহমান ভাবার মাদকতার কথা কাকে কীভাবে বোঝাবে এমনই তো ভাবার কথা ছিল হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর। হল না। এই না-টা কীভাবে ফাঁস করে সে! ফাঁস করলে কি আর হজের ইজ্জত বলতে কিছু থাকে!
এদিকে ওমরার উপরি সুবিধায় হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর ব্যবসাভাগ্যও কি একটু নড়েচড়ে বসল? বসলই তো। আগের যেসব মুসল্লি-ব্যবসায়ী মো. আবুল হোসেনকে পাশ কাটিয়ে অন্য দোকানে যেত, এখন শুধু তারা না, তাদের কল্যাণে আরও কিছু কাস্টমার জুটতে শুরু করেছে। ফলে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকে এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ব্যতিব্যস্ত সময়ই পার করতে হচ্ছে। ছোটকাটরা-বড়কাটরা-নবাবপুর-লক্ষীবাজার-ইসলামপুরের পাইকারী আর খুচরা দোকানে মালামালের তল্লাশি করে করে দিন শেষ।


নূর বানুর বুক থেকে অন্যসব দিনে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী নিজেকে খুব সতর্কতার সাথে সরিয়ে নিতে পারলেও আজ, গুনে গুনে ওমরা করে ফিরে আসার ৫ মাস ১৭ দিন পর, আর কিছুই করতে হল না। হবে কেন? নূর বানু কি সে সুযোগ দিয়েছে? সারারাত জেগে থেকে অনেকটা পাহারাদারের মতো হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকে আটকে রেখেছে না! না রেখেই বা করবে কি! এত সুন্দর একটা ব্যবসা, এভাবে, হঠাৎ স্থবির হয়ে পড়লেও তাকে তো ভেসে যেতে দিতে পারে না!
ছোটকাটরা-বড়কাটরার ব্যবসায়ীরা এমনিতেই আন্দোলন সংগ্রামের একটু বাইরে বাইরে থাকার লোক। গুলিস্তান কি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রাজনৈতিক উত্তাপ একটু ছড়াল কি ছড়াল না, স্লোগানের শব্দও হয়তো আকাশমুখী হতে হতে থেমে গেল, ততক্ষণে ছোটকাটরা-বড়কাটরার দোকানের সাটার ফেলার ক্যারেত ক্যারেত সাট সাট শব্দ স্লোগানের সুর তুলতে গিয়েও গলায় আটকে পড়া ভাতের মতো থির হয়ে পড়ে। কোনোক্রমে মহাজনকর্মচারী মিলে দোকানে তালা দিল কি দিল না- দে দৌড়। তারপর সুনশান নীরবতা। কেবল ঘাটের দু’একটি ডিঙ্গি নৌকার বাড়তি প্যাসেঞ্জার গোনার মধ্যে না রেখেই যত দ্রুত সম্ভব বুড়িগঙ্গার বুক চিরে ছুটে চলা। এ অবস্থায়ও, স্লোগান আর মিছিলের ফিসফিসের ভেতর কোনোবারেই হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী দোকান ছেড়ে যায়নি। তার য্ুিক্ত সোজাসাপ্টা। হায়াত মৌত কি দূরে দূরে হাঁটে? হাঁটে তো গায়ের সাথে গা লাগিয়ে। ছায়ার সাথে ছায়া হয়ে।
বছর দুই আগে, গণঅভ্যুত্থানের সময়, তখন তো মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী আর হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী হয়ে ওঠেনি, কোনোদিন দোকান ছেড়ে পালায়নি, তালা লাগিয়ে দোকান বন্ধ করারও চেষ্টা করেনি। কই, তার তো কিছু হয়নি। হয়েছে যারা গুলি ফুটার আগেই বারুদের গন্ধে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। তারা দোকান তো দোকান, বালবাচ্চা রেখেও বুড়িগঙ্গা পেরুতে সময় নেয়নি। কেউ কেউ তো ডিঙ্গি নৌকার অপেক্ষায় না থেকে বুড়িগঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়তেও দ্বিধা করেনি। সেদিক থেকে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী দলছুট বৈকি। সে বরং গণআন্দোলনে নিজেও আন্দোলিত হয়ে দোকানের সাটার ফেলল কি ফেলল না, ছেলে ছোকরাদের হাতে দোকান রেখে মাঝেমধ্যে বেরিয়ে পড়ত মিছিলের লেজের সাথে লেজ হয়ে। তবে লেজে আর কতক্ষণ, স্লোগানের সাথে গলা মিলাতে মিলাতে এগিয়ে গিয়েছে সামনের দিকে। এগার দফা এগার দফা, মানতে হবে মানতে হবে। জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব- ইত্যাকার স্লোগানের উত্তেজনায় নিজেকে উত্তেজিত হতে দেখে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী নিজেকে মিছিলে ছেড়ে দিয়েছে। একারণেই কি-না কে জানে, এখন ছোটকাটরা-বড়কাটরার ফুটপাথের দোকানি থেকে শুরু করে আড়ত নিয়ে বসা ব্যবসায়ীরাও হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকে একটু সমীহ হলেও করে।
নূর বানুর হাত তো নূর বানুরই হাত। এতো আর কোন যুবা-পুরুষের হাত নয় যে আঁকড়ে ধরল আর হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর হস্ত-পদ-কর্ণ বরফশীতল জাড্যতায় পড়ে থাকল। নূর বানু ব্যাপারীকে কতক্ষণই আর আটকে রাখে! নূর বানুর জড়িয়ে ধরা হাত দুটি একটু আলগা হল কি হল না হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।
এভাবে বেরিয়ে আসাটাই নূর বানুর একেবারে অপছন্দের। বিশেষ করে ওমরা করে মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী হয়ে ওঠার পর থেকে। সারাদিন খাটাখাটনির পর রাতে বাঁ হাতে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকে খোলা বুকের সাথে জড়িয়ে রাখা নূর বানুর নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজি স্বামীকে খোলা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকা তো শুধু স্বামী সোহাগ নয়, স্বামীর বুক থেকে কাবার যে খোশবু বেরিয়ে আসে তা-কি সে, নূর বানু ছাড়া অন্য কেউ টের পাবে? পাবে কোত্থেকে? হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী তো শুধু তারই স্বামী। খোলা বুকে অন্য কেউ জড়িয়ে রাখবে কী করে। আর জড়িয়ে ধরে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর বুক থেকে কাবা-কাবা যে পবিত্রতার ঘ্রাণ নূর বানু বুক ভরে টেনে নেয় শুধু না, গায়ে গতরে আঠার মতো মাখিয়ে নেয়, সে তো অন্য কেউ পারে না। একি কম ভাগ্যের কথা!
নূর বানু নিজের ভাগ্য নিয়ে কোনোদিনই সন্তুষ্ট থাকতে পারেনি। বিয়ের বছর প্রথম দিকে ঢাকার ব্যস্ত জীবনে সারা দিন মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর টিকিটি দেখতে না পাওয়া, একা একা এটা সেটা করেও দিন পার করতে না পারার যন্ত্রণা, সময়-অসময়ে স্বামীসঙ্গ না পাওয়ার বেদনা, সবকিছু নিয়ে যে একটা শূন্যতা তার ভেতর জমে উঠেছিল, পর পর তিন সন্তানের মা হওয়ার পরও সে শূন্যতা ভরাট হয়নি। তবে মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী ওমরা করে আসার পর থেকে সারা রাত খোলা বুকের ভেতর ধরে রাখায় মক্কার যে একটা মাদকতা সারাশরীরে লেপ্টে থাকে, তাতে শারীরিক আর কোনো কামনাই দিনমান মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। তাছাড়া হাজি সাবের বউ হয়ে থাকাটাও বা কম কিসে! সে তো আর কোনোদিন মক্কায় পা ফেলে কাবার চারপাশ ঘুরে ঘুরে হজরে আসওয়াকে চুমুও খেতে পারবে না। নিজের বাড়ি থেকেও তো এমন কোনো বিষয়সম্পদ নিয়ে আসতে পারেনি যে মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী ওমরা করতে যাওয়ার সময় নিজেও ওমরা করার বায়না ধরে বসে! নিজেকে হাজি করে তোলার সম্ভাবনার জায়গায় কিছুতেই যখন জায়গা দিতে পারে না নূর বানু, তখন সারারাত স্বামী হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকে নিজের খোলা বুকের সাথে লেপ্টে রেখে কাবার সুবাস গায়ে মাখার সুযোগ ছাড়া কেন!


আন্দোলন হোক আর সংগ্রামই হোক, মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী হয়ে ওঠার পর থেকে সবকিছুতেই জড়িয়ে যাচ্ছে কি? তা হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী বুঝুক আর নাই বুঝুক, ধীরে ধীরে পাড়ামহল্লার সকলের সাথে আগের চেয়ে যোগাযোগ বেড়ে যাওয়ার কারণেই কি-না, শেখ মুজিবের নামে স্লোগান হোক কিংবা ১১ দফা নিয়ে স্লোগানই হোক, দোকান ফেলে মিছিলের লেজ ধরে বেরিয়ে যাবেই। সাথে পবিত্র মদিনা থেকে আনা দানায় দানায় আল্লাহু লেখা মেড ইন চায়না তসবিহটাও পকেটে ঢুকিয়ে নেবে। মিছিলের লেজে লেজে হাঁটবে, আর মাঝে মধ্যে পাঞ্জাবির বাম পকেটে রাখা তসবিহ দানায় হাত রেখে কালেমা তৈয়্যেবা পড়বে। মিছিলের স্লোগানে গলা মেলানো, আর তসবিহ দানা গুনে গুনে লা ইলাহা ইল্লাললাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ পাঠ করে যাওয়া- এ দুইয়ের তালে তাল মেলাতে অন্য কারও সমস্যা হবে কি-না কে জানে, হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর কোনো সমস্যা হয় না। স্লোগানের তালে তালে রপ্ত করে ফেলেছে। একারণে মিছিলের লেজে থাকলেও হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী ধীরে ধীরে সবার নজরে পড়ে। পবিত্র কালেমা তৈয়্যেবার বদৌলতেই হবে হয়তো, মিছিলটি পাকিস্তান কিংবা ইয়াহিয়াবিরোধী হলেও মিছিলে একটা রোহানী মাদকতা সকলের মাথার উপর সন্ধ্যা-মাঠের এক দঙ্গল ঝিঁঝি-পোকার-কুন্ডলী হয়ে ঘুরে বেড়ায়। যতক্ষণ মিছিল গুলিস্তান থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে নবাবপুর রোড হয়ে ছোট কাটরা থেকে বড় কাটরায় গিয়ে না পড়ে- ঠিক ততক্ষণ।
হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী মিছিলের ভেতর মিছিল হয়ে স্লোগান দিতে গিয়ে লক্ষ করেছে স্লোগানের ১১ দফা কিবা বঙ্গবন্ধু বলার সাথে সাথে তার গলা থেকে নিজের স্বরের ফাঁকফোকর গলে আরও কার কার গলার স্বর যেন বেরিয়ে আসার জন্য ঠেলাঠেলি জুড়ে দেয়। প্রথম কয়দিন হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব না দিলেও এখন আর গুরুত্ব না দিয়ে পারে না। পারবে কী করে! স্বরগুলো তো ক্রমেই তার নিজের কাছেই পরিচিত হয়ে উঠছে। পোলা জজ মিয়া, মাইয়া মেহেরজান, মাইয়া দিল আফরোজ আর স্ত্রী নূর বানুর স্বর তো তার কাছে আর অপরিচিত না। মিছিলের স্লোগানের সাথে গলা মেলালে গলার ভেতর ওদের উৎপাত শুরু হয় কেন- এনিয়ে ভাবতে গিয়ে বেশ কিছু সময় নষ্ট করেছে সে। যা হবার হয়েছে। আর না- ভাবতে ভাবতে সাতসকালেই হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী স্ত্রী নূর বানুকে সব খুলে বলে। মিছিলে স্লোগান দিতে গিয়ে স্বামীর গলা দিয়ে স্ত্রী-সন্তানের গলার স্বর বেরিয়ে আসা- এতো কেমন গোলমেলে ব্যাপারই মনে হয়। মিছিল-মিটিংয়ে নিজে কোনোদিন গিয়েছে বলে মনে পড়ে না। নূর বানুই কি কোনোদিন গিয়েছে? তাও তো মনে হয় না। তবে পোলা জজ মিয়া গিয়ে থাকতে পারে। ওকে তো আর কোনোকিছুতে আটকে রাখা যায় না। যেখানেই হইচই, গন্ডগোল, চিৎকার আর মারামারি সেখানেই জজ মিয়া দর্শক হয়ে হাজির। আশপাশের কেউ এসবে মনোযোগ দিক বা না দিক, জজ মিয়া দিবেই।


সন্ধ্যা কেন, বিকাল থেকেই তো রাতে একটা কিছু হতে পারে এরকম একটা খবর কান থেকে কানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তাতে কি আর হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর কান রাখার সময় আছে? নেতা তো বলেছেন, আলোচনা না এগুলে আলোচনা চালাচ্ছি কেন?- একথা শোনার পর অন্যকিছু ভাবার আর সময় কোথায় হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর? তবুও বিকাল গড়িয়ে গোধূলিবেলা থেকেই শহর কেমন ফাঁকা ফাঁকা ঠেকে ব্যাপারীর কাছে। মিছিলের সামনে থেকে গলা ছেড়ে যে মানুষেরা আকাশ বিদীর্ণ করা স্লোগানে স্লোগানে মাতিয়ে রাখত সকলকে, এলোমেলো হাঁটতে গিয়ে তাদের দু-একজনের সাথে দেখা হয়ে গেলে শুকনো, পানি শূন্যতায় জড়িয়ে আসা কতগুলো মুখ চোখে পড়েছে কেবল। চোখের সেই ক্ষিপ্রতার জায়গা দখল করে আছে অচেনা কোনো দিশাহীন সময়। গন্তব্যহীন। হয়তো হতাশাগ্রস্তও। হাতাশা কি হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকেও চেপে ধরল? হয়তো। তা না হলে বড় কাটরার বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া নির্মল বসাকের সাথে দেখা হলে এমন অচেনা-অচেনা দ্রুত-সরে-পড়াভাবে চলে গেল কেন? জগন্নাথ কলেজে পড়া আলাউদ্দিন কি তাকে চিনতে পারেনি? ও না কতদিন কতবার তার দোকান থেকে এটাসেটা কেনাকাটা করেছে। তবুও চিনল না? না-কি নির্মল বসাকের মতো অশনি একটা কিছু আঁচ করতে পেরে পাশ কেটে চলে গেল? যাক্। যে যেভাবে পারে যাক্। সে সামান্য হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী রাজনীতির এতশত কী করে বুঝবে?
সন্ধ্যা উতরে গেছে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী বায়তুল মোকাররমে থাকতে থাকতেই। মাগরিবের নামাজে বায়তুল মোকাররমের দোতলা-তিনতলা ছাড়িয়ে মুসুল্লির কাতার বরবারই মসজিদের ভেতর-বারান্দা ছাড়িয়ে যায়। আজ আর তেমনটি নেই। সবকিছুই যেন উল্টো। মসজিদের বারান্দা তো বারান্দা, ভেতরটাই তো ফাঁকা পড়ে আছে! যে কজন মুসল্লি ফিসফাসের ঠেলাঠেলি মাড়িয়ে মসজিদে আসতে পেরেছে, তারা আসবেই। শত দুর্বিপাকেও বায়তুল মোকাররম মসজিদেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়বে। এর ব্যত্যয় হয় একমাত্র শারীরিক অসুস্থতার কারণে। হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীরও ফজরের নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে দু-একবার এরকম হয়েছে। কী আর করা। সবই তো তাঁর ইচ্ছা। উপরওয়ালা না চাইলে কী করার থাকে সকলের। তবে শরীরযন্ত্র বেঁকে না বসলে বায়তুল মোকাররমে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ভেতর ফজর বাদ যায় না তার।
ধীরে ধীরে চারদিক নীরব হয়ে এলে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী মাটির গভীর থেকে উঠে আসা এক ধন্দের পাঁকে পড়ে যায়। সন্ধ্যার সেই নীরব-কোলাহল, মিটিং মিছিলের ঘুমিয়ে-থাকা-উত্তেজনা, তারুণ্যের ম্রিয়মান-গলায়-স্লোগান ‘সামরিক আইন মানি না মানব না’ নিভু-নিভু-উত্তেজনায় এপাশওপাশ ঘুরে বেড়াচ্ছে কেবল। সাধারণ জনগণ বলতে যা বুঝায় তাতো সেই বিকাল থেকেই তাড়া-খাওয়া ঘুরমুখো হুড়োহুড়ি। দূরে গুলিস্তান হয়ে নবাবপুর রোড মাড়িয়ে সদরঘাটমুখী রাস্তার টিমটিমে রোডলাইটগুলিও কি এরই মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল? পড়লই তো। তা না হলে শেষ শীতের সন্ধ্যা-উৎরানোবেলায় সবদিক এমন ভ‚তুড়ে মনে হচ্ছে কেন? শুধু পার্টিঅন্তপ্রাণ কিছু কর্মী সমর্থক ছাড়া আর কাউকেই তো চোখে পড়ছে না।
কী মনে করে আবুল হোসেন ব্যাপারী বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ প্লাজা থেকে নেমে উত্তরদিকে পুরানো পল্টনে পার্টি অফিসের দিকে হাঁটা শুরু করে। পরিচিত কাউকে যদি পাওয়া যায়; যদি কেউ এসে বলে যায় আলোচনা মোটামুটি একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, আওয়ামী লীগই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, সেনাবাহিনীও ব্যারাকে ফিরে যাচ্ছে- কী যে স্বস্তি, কী যে স্বস্তি।
চাইলেই তো আর হয় না। পার্টি অফিসের চারপাশে বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত কিছু উঠতি নেতাকর্মী ফিসফাস কথা বলে যাচ্ছে। পরিচিত কাউকেই খুঁজে না পেয়ে পার্টি অফিসের চাপানো দরজা একটু ফাঁক করে মাথা ঢুকিয়ে দেখার চেষ্টা করে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী। হ্যাঁ, আছেই তো কয়েকজন সিনিয়র নেতা। তারা কথা বলছেন খুবই মৃদু, চাপা স্বরে। বাইরে থেকে যাতে কেউ শুনতে না পারে সে বিষয়ে খুবই সজাগ মনে হচ্ছে নেতাদের। এঅবস্থায় হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী ভেতরে ঢুকে কী করে! সরে এসে পার্টি অফিসের বিপরীত দিকে টংদোকনের সামনে ছোট্ট একটি জটলার ভেতর থেকে সারাদিনের হাবভাব বুঝে নেয়ার চেষ্টা করে। চেষ্টা করলেই তো আর হয় না। কেউই তো মুখ খুলছে না। একজন আর একজনের কানে ফিসফিস করে কীসব বলে যাচ্ছে। এভাবে কতক্ষণ হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী এ-জটলা থেকে ও-জটলায় ঢুকে ঢুকে পরিস্থিতি বুঝে নেয়ার চেষ্টা করেছে তা সে নিজেই জানে না।
এতসব দুঃশ্চিন্তার ঘাট মাড়িয়ে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী গুলিস্তান সিনেমা হলের মাথায় আটকানো ‘চান্দ সুরুজে’র শাবানা, রোজিনা, নাদিম, ওয়াহিদ মুরাদদের হাতের ডান পাশে রেখে ধীরে ধীরে টিকাটুলির ২ নাম্বার গলির মায়ায়, নাকি পোলা জজ মিয়া, মাইয়া মেহেরজান, দিল আফরোজ আর স্ত্রী নূর বানুর দরদমাখা মুখগুলো সামনে এনে হাঁটতে থাকে তা হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী বুঝে উঠতে পারে না। তাছাড়া এই নীরব সন্ধ্যা-উৎরানো আধোআলো আধোঅন্ধকারে এতসব মুখের কথা ভেবেই বা কী হবে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর।
হাঁটতে হাঁটতে টিকাটুলির মোড়ে আসার পরই একটা প্রশিক্ষিত ট্রাক চোখে পড়ে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর। ট্রাকটি নিশ্চল। স্থির দাঁড়িয়ে আছে পশ্চিম দিকে মুখ করে। ট্রাকের হুডের ভেতর থেকে কীসব রাইফেল-না-এলএমজি’র দুই তিনটি মাথা বেরিয়ে অন্ধকারেও চোখ রাঙাচ্ছে। রাঙাক। রাঙাক- এশুধু কথার কথা হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর। মুহূর্তেই ভেতরে ভেতরে ঘেমে উঠে। পরক্ষণেই খেয়াল করে রাইফেল-না-এলএমজি’র মাথাগুলি ট্রাকের উপরে থেকেও নিশানা তাক করা তার ঠিক বুক বরাবর। এতে করে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর শরীরের ঘাম এবার স্রোত হয়ে পায়ের দিকে নামতে শুরু করে। ঘাম স্রোত হয়ে নামলেও কি তার দাঁড়িয়ে থাকার উপায় আছে? পিছনে ফিরে যাওয়ার উপায়ও তো নেই। যদি রাইফেল-না-এলএমজির মুখ দিয়ে গুলি বেরিয়ে আসে! বরং সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই ভালো। এক পা আগায় কি এক পা পিছায় এই করে করে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী সামনের দিকে মোড়ের ডানদিক ঘুরে বাঁয়ের গলির ভেতর ঢুকে যাওয়াটাকেই ঠিক মনে করে এগিয়ে যেতে থাকে। না গিয়ে তো কোনো উপায়ও নেই তার। দুই নম্বর গলির ১৩/সি-এর দোতলার দেড় রুমের বাসাটাতেই তো পোলা জজ মিয়া, মাইয়া মেহেরজান, দিল আফরোজ আর স্ত্রী নূর বানু হয়তো অপেক্ষায় অপেক্ষায় ভয়ের কুন্ডলি পাকিয়ে বসে আছে।
গলির মুখে পড়তেই আর বেশি কিছু ভাবার সুযোগ পায়নি হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী। সামনেই নূর বানু ভীত সন্ত্রস্ত দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে। আধোআলো, আধোঅন্ধকারের ভেতর হঠাৎই দুই হাতে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকে জাপটে ধরে ডুকরে ওঠে- আল্লাগো, তুমি এতক্ষণে আইলা? একটা কাকপক্ষি বাইরে নাই, একলা একলা কেমনে তুমি বাইরে বাইরে ঘুরাফিরা করো!
স্ত্রী নূর বানুর বগলদাবা হয়ে ঘরে ফেরার পর দোকানের কথা মনে পড়ে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর। সেই যে বিকাল বিকাল দোকান থেকে বেরিয়েছিল, তারপর তো দোকানের কথা আর মনে হয়নি। ছেলেছোকরারাই সামলিয়েছে। আর সামলাবে কী? এত এত ফিসফাস কানাঘুষার ভেতর কেউ কি একেবারে জরুরি কিছু ছাড়া কেনাকাটা করতে বেরোয়! সকলেই তো একটা ভীতির ভেতর আগাম কিছু একটার সংকেত নিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছে। শেখ মুজিবের সাথে কদিন ধরে শুধু বৈঠক আর বৈঠক, ফয়সালা কিছু তো দিচ্ছে না ইয়াহিয়া। শেখ মুজিবই-বা কিছু বুঝতে পারছে না কেন? ইয়াহিয়া কি ক্ষমতা ছাড়বে? যদি ক্ষমতা ছাড়ে তবে তো দুই পাকিস্তানই শেখ মুজিবের হাতে চলে আসে। তখন তো জয় পুরা বাংলারই জয়।
হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর মাথায় এতকিছু ঢোকার জায়গা কই? জায়গা যতটুকু ছিলো তা তো দখল করে আছে হলুদ, মরিচ, এলাচ, দারচিনি, লং, লবঙ্গ, জিরা, কাজুবাদাম, পেস্তাবাদাম, চিনাবাদাম, চিরঞ্জি, কাঠবাদাম, কারিপাতা, কিসমিস, জাফরান, আমশি, গোলমরিচ, গরম মশলা, জয়ত্রী, জায়ফল, জইন, ধনে, পোস্ত, চারমগজ, মেথি, মৌরি, যষ্ঠিমধু, হিং, জামীর, তিল, তুলসী, কাতিলা, কাবরা, কুকোম, ইত্যাদিসব মশলাপাতি। তার ভেতর নগদ তো নগদ, বাকির হিসাবপত্তরও কম নয়। এখানে ১১ দফা, স্বায়ত্তশাসন, শিক্ষা কমিশন, সংসদীয় গণতন্ত্র, শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, জরুরি আইন, নিরাপত্তা আইন, ইয়াহিয়ার গোলবৈঠক এইসব ঢোকার জায়গা কোথায়? তবুও নাই বললেই তো হয় না। এরই মধ্যে ফাঁকফোকড় বের করে একটু জায়গা দিতেই হয় হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকে। তা না হলে আর দশজনের মতো দোকান আর সংসার এই করেই তো দিন পার করে দিতে পারত।
সন্ধ্যার পর থেকে কোনো নেতার মুখ থেকে কিছু শোনার জন্য এদিক সেদিক তো কম ঘুরাফেরা করেনি হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী। ঘোরাফেরাটাই সার হল। দেখাদেখি হল আর কই? আর দেখা হলেই কি কোনো নেতা হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকে গোনে? তাকে তো নেতার কথা শুনতে হয় অন্যকে বলার সময় আড়ি পেতে। নয়তো পাতি নেতার মুখ থেকে। তাও বারবার এটাসেটা জিজ্ঞেস করার গলিঘুপচি দিয়ে।
এখন? এখন তো রাত ১০টা ছুঁই ছুঁই। নেতারা কিছুই বলেনি। অন্তত হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী কিছু শোনেনি। কিন্তু রাস্তাঘাট সব তো সন্ধ্যার পর থেকেই ফাঁকা। সর্বত্রই কিছু একটা ঘটার বারুদ বারুদ গন্ধ। গন্ধ তো ঠিকই আছে। তা না হলে টিকটুলির মোড়ে ভ‚তুড়ে ট্রাকের ভেতর থেকে রাইফেল-না-এলএমজি মাথা বের করে ভয় দেখাচ্ছে কেন? একি শুধু শুধু টিকাটুলির মোড়ে গাঁটছড়ে বসা? অন্য কোথাও কি নেই! আছেই তো। সে তো আর সারা শহর পইপই করে ঘুরে দেখেনি।
এদিকে বারবার রাতের খাবারের জন্য তাগিদ দিয়ে যাচ্ছে নূর বানু। দিক। ও তো আর স্বামী সন্তানের সেবা করা ছাড়া জীবনে আর কিছুর খবর রাখার প্রয়োজন মনে করেনি। রাখবেই-বা কী করে। কিশোরীবেলায় বিয়ে হওয়ায় চোখকান খোলার সময় আর পেল কই? যতটুকু জানে তা তো হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর কাছ থেকেই। এ নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না কখনো।
হাতের কাছেই পড়ে ছিল ন্যাশনাল টু ব্যান্ডের রেডিওটা। হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী হাত বাড়িয়ে রেডিওটার বোতাম ঘুরিয়ে ভয়েস অব আমেরিকার খবর শোনার চেষ্টা করে। খবর কোত্থেকে শোনবে। রেডিওর সাঁ সাঁ সোঁ সোঁ শব্দের ভেতর সব খবরই চাপা পড়ে যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ দু-একটি শব্দ রেডিওর কাঠের বাক্স থেকে লাফিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলে ভাঙা ভাঙা শোনা যায় ভ-য়ে-স … ব আ মে রি সোঁ সোঁ … খ ব র প ড়… সোঁ … খ ব র গু লো … লো… পূ র্ব পা কি স্তা নে র ঢা কা… রা স্তা … সোঁ সোঁ … সোঁ সোঁ। না, আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। রেডিওর গায়ে দু-একবার থাপ্পড় দিয়েও ভয়েস অব আমেরিকাকে বাগে আনতে পারছে না হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী। সাঁ সাঁ সোঁ সোঁ একটানা আর কত শোনা যায়! বিরক্তির সাথে রেডিওটিকে পাশে রেখে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী।
সন্ধ্যা থেকে রোড লাইটগুলো জ্বললেও এখন আর রোড লাইটে কোন আলোর চিহ্ন নেই। তবে উৎসুক কারও কারও বাড়ির জানালা দিয়ে হালকা কাঁপা কাঁপা আলো এসে গড়িয়ে পড়ছে এবাড়ি থেকে ওবাড়ির গায়ে। এতে অবশ্য রাস্তার পরিস্থিতি কিছু বোঝা যাচ্ছে না। মাঝে মধ্যে দু-একটা গাড়ি হেড লাইট জ্বালিয়ে দ্রুততার সাথে সরে গেলে পশ্চিম দিকের ফাঁকা রাস্তাটাই আবছা দেখা যায় শুধু। কোনো জনমানুষের ছায়াও চোখে পড়ে না।
নূর বানু ঘর থেকে বারবার তাগাদা দিয়েও হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকে খাবার টেবিলে বসাতে না পেরে এবার বারান্দায় এসে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়। নিলে কী হবে। হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর তো খাবারের প্রতি ন্যূনতম কোনো আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না। এ অবস্থায় কি খাওয়া যায়? ভ‚তুড়ে শহর, রাস্তার মোড়ে প্রশিক্ষিত ট্রাক, ট্রাকের উপর রাইফেল-না-এলএমজির শাসানো চোখ রাঙানি- এসবে তো ভেতর বাহির ঠান্ডা হয়ে আসে।
‘বানু থাক। এখন আর কিছু খাব না’ বলে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী বিছানায় পড়ে থাকা রেডিওটাকে আবারও টেনে নিয়ে বোতাম ঘুরাতে থাকে। এখন রাত এগারটা। এতক্ষণে ভয়েস অব আমেরিকার ভয়েস তো থেমে যাওয়ার কথা। তবু নব ঘুরায় হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী। রেডিও পাকিস্তান এফএম ৯৩ বরাবর রেডিওর কাঁটা রাখার সাথে সাথে ভারী গলায় বেরিয়ে আসে রেডিও পাকিস্তান। খবরিক পড় যাইয়ি হেÑ ভেসে আসার পর মুহূর্তেই চুপ। একটানা সোঁ সোঁ শব্দ ছাড়া আর কিছুই বেরুচ্ছে না কাঠের বাক্স থেকে। হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী রেডিও পাকিস্তানের আর কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে এবার রেডিওর অন্য চ্যানেলগুলোতে দৌড়াতে শুরু করে। কোথাও কোনো সাড়া নেই। তবে রেডিওর বোতাম ঘুরাতে ঘুরাতেই টিকাটুলির মোড় থেকে তার কানের উপর হামলে পড়ে শুঁ করে দ্রæত একটা কিছু ছুটে যাবার শব্দ। এটা কি গুলি? এরপর একটানা আরও কয়েকটা। শুঁ শুঁ করে ছুটছে দিগ্বিদিক।
মনে পড়ে, দিন তিনেক আগে যখন সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধুকে গোল টেবিল বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন করেছিল- ‘আলোচনা কতদূর কী হল?’ বঙ্গবন্ধু তো তখন সকলকে আশ্বস্থই করেছিলেন। তিনি তো বলেছিলেন- আলোচনায় অগ্রগতি কিছু না হলে আলোচনা করছি কেন? একথা তো নেতাদের কাছ থেকে শুধু হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী না, সকলেই শুনেছে। বিশ্বাসও করেছে।
বঙ্গবন্ধু কি মিথ্যে আশ্বাস দেওয়ার মানুষ! ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকে সারাদেশ যখন বঙ্গবন্ধুর ইশারায় চলছে তখন বঙ্গবন্ধু কী জন্য মিথ্যে আশ্বাস দেবেন? তাই যদি হবে তবে আজ এসব কী হচ্ছে? তবে কি বঙ্গবন্ধুকে ভুল বুঝানো হচ্ছিল কিছু? বঙ্গবন্ধুও ভুল বুঝবেন? একি সম্ভব? হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর মাথায় এখন এসবই ঘোরপাক খাচ্ছে। এছাড়া মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা আর মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর কী একটা মেসাকারের পরিকল্পনা বাতাসে ঘুরছিল তা কি বঙ্গবন্ধু জানতেন না? না, আর ভাবতে পারছে না হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী।
এদিকে নূর বানু খাবার নিয়ে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকে বারবার তাগিদ দিয়েই যাচ্ছে। বাইরে যে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে তা নূর বানু গ্রাহ্যই করছে না। এই মধ্যরাতে গোলাগুলির ভেতর হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকে খাওয়ানোটাই কি জরুরি হয়ে উঠল তার কাছে! মানুষ দু-এক বেলা না খেয়ে থাকে না? থাকেই তো। নূর বানু জানে। তবু তার এককথাÑ একটু খেয়ে নিন। এ নিয়ে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী মনে মনে বিরক্ত হলেও কিছু না বলে বরং গম্ভীর হয়ে ওঠে।
দূরে কোথাও থেকে মানুষের আর্তনাদ ভেসে আসছিল। চিৎকার। হাহাকার। মাগো। বাঁচাও। শু শু গুলির শব্দ। দড়িতে ঝুলানো জানালার পর্দা সরিয়ে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী মাথা বাড়িয়ে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করে। শুঁ শুঁ গুলির শব্দ চলছেই। হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী দেখে আকাশের দক্ষিণ পশ্চিম দিকটা লাল হয়ে উঠেছে। বাতাসের ঘুর্ণির সাথে কোনো কিছু উড়ে যাচ্ছে কি? কি জানি হবে হয়তো। এতদূর থেকে স্পষ্ট কিছু বুঝতে পারছে না হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী। তবে এটুকু তার কাছে স্পষ্ট হয়েছে, না, কোনো কিছুই আর আগের মতো ঠিকঠাক নেই।
গোলাগুলি আর আগুনের হলকায় পুরান ঢাকা পুড়ে যাচ্ছে। সেই তাপ হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী টিকাটুলির দুই নম্বর গলির ১৩/সি-এর দোতলায় বসেই টের পাচ্ছে না? পাচ্ছে। ভালোভাবেই পাচ্ছে। তার মেসার্স হোসেন স্টোরেও কি আগুনের ছোঁয়া লাগল?
অন্যান্য দিন পোলা মাইয়ারা এত রাত পর্যন্ত কখনো জাগে না। আজ এই মধ্যরাতে মাইয়া পোলা তিন ভাইবোন ভয় আর আতঙ্কের ভেতর চৌকির উপর চুপচাপ বসে একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। চুপচাপ বসে থাকলেও পোলা জজ মিয়া কি বেশি ভয় পেয়ে গেছে? তা না হলে নূর বানুর হাতে ধরা হারিকেনের আলোয় জজ মিয়ার চোখ দুটি চিকচিক করে উঠল কেন?
কাছে এসে জজ মিয়ার মাথায় হাত রাখে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী। আর তখনই একসাথে তিন ভাইবোন চিৎকার করে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীকে জাপটে ধরে- বাবা, বাইরে গুলি হচ্ছে কেন?
হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী কী জবাব দেবে সন্তানদের। শুধু ওদের মাথায় আর পিঠে হাত বুলাতে থাকে। নূর বানুর চোখেও জল। জল ভয় আর আতঙ্কের। সাক্ষাৎ বিপদে সাঁতার দেওয়ার অবস্থা।
কী করব আমরা এখন- বলতে বলতে নূর বানু অবুঝের মতো হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। নূর বানুর মুখের রঙ হালকা শ্যামলা থেকে কালচে হয়ে উঠছে। কোথাও আলোর চিহ্ন নেই। চোখের তারাটিও মিশমিশে কালো হয়ে উঠল কি? কী জানি। হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে, না না, মানুষগুলোকে না, নিজের আত্মার স্পন্দনকে কী সান্ত¦না দেবে?
চারদিকে গুলির ভেতর যেভাবে মিলিটারি জিপগুলি দ্রুত ছোটাছুটি করছে, যেভাবে শুঁ শুঁ শব্দে বেরিয়ে যাচ্ছে এক একটি গুলি, এর ভেতর বাইরে যাওয়ার কল্পনাও তো করতে পারছে না হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী। তবে কি ঘরেই ভয় আর আতঙ্কে নিজেদের সারারাত আটকে রেখে ভোরের অপেক্ষা করবে? সে কোন ভোর? গুলি আর আগুনে পোড়া যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লাশ কিংবা, কিংবা…।
আসো, নামাজে দাঁড়িয়ে আমরা আল্লাহকে ডাকি। তিনিই তো রক্ষাকর্তা। তিনিই তোমার আমার সকলের জানের মালিক। তিনিই আমাদের বাঁচাবেন। তিনিই একমাত্র সহায়Ñ বলতে বলতে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী সবাইকে ওজু করার তাগিদ দিয়ে নিজেও ওজু করে আসে। ওমরা করে আসার পর যে পাঁচটি জায়নামাজ এতদিন ট্রাঙ্কে তুলে রেখেছিল, আজ এই আধো আলো আধো অন্ধকারের ভেতর হাতড়ে হাতড়ে ট্রাঙ্কের ভেতর থেকে জায়নামাজগুলো বের করে আনে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী। ট্রাঙ্কের এক কোণায় পড়ে থাকা ঠোঙায় মুড়ানো পাঁচটি তসবিহও বের করে আনে। ওমরা করে ফিরে আসার সময় সাথে নিয়ে আসা মেসকাম্বারের ছোট্ট শিশিটার মুখ কোনোদিন খুলে দেখেনি হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী। আজ ট্রাঙ্ক হাতড়ে তাও বের করে আনে।
এরই মধ্যে পোলা জজ মিয়া, মাইয়া মেহেরজান, দিল আফরোজ আর স্ত্রী নূর বানু একে একে অজু সেরে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর বিছিয়ে রাখা জায়নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। নফল আর কাজা নামাজে ইমামতির প্রয়োজন নেই। তবুও সবার সামনে ইমামের মতো দাঁড়িয়ে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী। ‘তোমরা সবাই বিশ রাকাত নফল নামাজ পড়ো’Ñ বলেই আবুল হোসেন ব্যাপারী নিজেও নামাজ পড়া শুরু করে। পোলা জজ মিয়া শুক্রবারে মাঝে মধ্যে বাপের হাত ধরে জুম্মার নামাজের জন্য মসজিদে গেলেও মাইয়া মেহেরজান, দিল আফরোজ ওরা তো কোনোদিন জায়নামাজে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েনি। অনেকটা খেলাচ্ছলে মাঝে মধ্যে মা নূর বানুর পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়লেও নামাজের নিয়মকানুন কিছুই জানে না। তারাও ভয় আর আতঙ্কের ভেতর কোনো প্রশ্ন না করে মা নূর বানুর পাশে দাঁড়িয়ে যায়। মা নূর বানু নিয়ত বাঁধেন তো মাইয়া মেহেরজান, দিল আফরোজও কানের লতি বরাবর হাত তুলে নিয়ত বাঁধে। মা নূর বানু হাঁটুতে হাত রেখে রুকুতে যায় তো মেহেরজান, দিল আফরোজও রুকুতে যায়। নূর বানু সেজদায় তো মেহেরজান, দিল আফরোজও সেজদায় যায়।
নামাজ শেষ হলে সবার হাতে হাতে তসবিহগুলো তুলে দেয় হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী। জজ মিয়া, মেহেরজান, দিল আফরোজ, নূর বানু তোমরা সবাই মন দিয়া শোনো। আজ আমরা কঠিন একটা রাতের মধ্যে আছি। স্পষ্ট আমি চারদিকে গুলির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। না জানি কতজন মারা গেছে। আল্লা আমাদের রক্ষা করার মালিক। আসো, আমরা সবাই হাতে তসবিহ নিয়ে আল্লাহ রাসুলের নাম জপি। আল্লাহ, একমাত্র আল্লাহই আজ আমাদের রক্ষা করবেন। জপোÑ লা ইলাহা ইল্লাললাহু মোহাম্মাদুর রাসুল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাললাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাললাহু, লা ইলাহা. লা… । জপো, এইভাবে হাজারবার জপো। জপতেই থাকো। লা ইলাহা ইল্লাললাহু মোহাম্মাদুর রাসুল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাললাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাললাহু, লা ইলাহা. লা…
তসবিহ জপতে জপতে ছোট মাইয়া দিল আফরোজ একঘেয়েমিতে পড়ে গেলে বলে ওঠে- মা, আর পারছি না। কালেমা উল্টাপাল্টা হয়ে যাচ্ছে যে।
চুপ, কথা বলবি না। নূর বানু শাসন করে মেয়েকে। পাশে থাকা মাইয়া মেহেরজান সব শুনতে পেয়ে সে আর কোনো সাড়া শব্দ করে না। তসবিহ জপায় গলার স্বর ক্রমশ নিচে নামতে নামতে এক সময় থেমে যায় তার। ঢলে পড়ে মা নূর বানুর গায়েই। মেহেরজানের দেখাদেখি দিল আফরোজও মেহেরজানের অন্যপাশে নূর বানুর গায়ে ঠেস দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
বাপের নেওটা হয়ে জজ মিয়া বাবা হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর সাথে তাল মিলিয়ে এতক্ষণ ভালোই তসবিহ জপছিল। কিন্তু পেচ্ছাবের কথা বলে সেই যে উঠে গেল, আর এল না। সবকিছু খেয়াল করলেও এ নিয়ে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী কোনো মন্তব্য করল না। তবে নিজের ধ্যানে তসবিহ জপতে জপতে একসময় নিজেও কি ক্লান্ত হয়ে পড়ল? এরকম মনে হতেই হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী পিছনে থাকা নূর বানুকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে আবারও তসবিহ জপায় মনোযোগী হয়। এবার কালেমা শাহাদত। আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারিকালাহু ওয়াশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আ’বদুহু ওয়া রাসুলুহু। আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারিকালাহু ওয়াশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আ’বদুহু ওয়া রাসুলুহু। আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারিকালাহু ওয়াশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আ’বদুহু ওয়া রাসুলুহু। আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারিকালাহু ওয়াশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আ’বদুহু ওয়া রাসুলুহু। …
তসবিহ জপতে জপতেই নূর বানুকে একবার দেখে নেয়ার জন্য ঘাড় ঘুরায় হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী। নূর বানু ঢুলছে। মুখ থেকে কোনো শব্দ বেরুচ্ছে না তার। না বেরুক। তবুও আছে তো কাছে। থাকুক। কিন্তু বাইরে গুলির শব্দ কি কিছু থামল? থামলই মনে হয়। আগের মতো একটার উপর আর একটা গুলি শুঁ শুঁ করে উড়ে যাচ্ছে না। সে আর কতক্ষণ। এবার বেশ দূর থেকে ভেসে এল ভারী কোনো গোলার শব্দ। মর্টার হতে পারে কি? অসম্ভব কিছু নয়। সম্ভব যে এটাই-বা হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী কী করে বলে! সে কি কোনোদিন মর্টার দেখেছে? ঠিকঠাক থ্রিনটথ্রি রাইফেলই দেখেনি। মর্টার দেখবে কী করে! তবে এসবই হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর লোকমুখে শোনা থেকে অভিজ্ঞতা।
মর্টারের শব্দে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী তসবিহ হাতে নিয়েই কালেমা শাহাদাত জপতে জপতে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। বারান্দা থেকে যতদূর দেখা যায়, ততদূরই শুধু আঁধার আর আঁধার। মাঝে মধ্যে দু-একটা গুলির শব্দ। তারই মধ্যে আকাশের দক্ষিণ পশ্চিম দিকটা সোনালি-লাল আলোয় আলোকিত। তারই ভেতর হাউই ফোটার আগুনের বিন্দুর মতো ফুলকি। দূর থেকে আগুনের ফুলকিগুলোকে বিন্দু ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছে না হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর কাছে।
বারান্দা থেকে ঘরে ঢোকার মুহূর্তে টিকাটুলির মোড়ের দিক থেকে গুড়–ম করে বিকট একটা শব্দ পায়ের কাছে ছিটকে পড়লে হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী লাফিয়ে উঠে। সাথে সাথে তিন আঙুলে ধরে রাখা চায়না তসবিহটা হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর আঙুল ছেড়ে বারান্দা থেকে নিচে পড়ে যায়। নিচে তো ময়লা আবর্জনার স্তূপ ছিল। সেখানে পড়ল কি? পড়লে পড়–ক। এখন আর এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই। হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারী বরং দ্রুত বারান্দা ছেড়ে ঘরে ঢুকে জানালার পাশে বিছানায় পড়ে থাকা নূর বানুকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করে- নূর বানু, ও নূর বানু, এত গুলি আর শব্দের মধ্যে তুমি চুপ কইরা আছ ক্যামনে? সাক্ষাৎ মৃত্যু যে ঘরে ঢুকে যাচ্ছে তা কি টের পাচ্ছ না? নূর বানু, ও নূর বানু, কথা বলছ না কেন?
কথা কী আর বলবে নূর বানু। ততক্ষণে নূর বানুকে জড়িয়ে ধরা হাজি মো. আবুল হোসেন ব্যাপারীর ডান হাতে নূর বানুর মাথা থেকে একটা উষ্ণ প্রবাহ ছলকে উঠতে গিয়ে গড়িয়ে পড়ে। নূর বানুর শরীরটা তখনও কাঁপছে কি? থর থর?

শেয়ার করুন: