004636
Total Users : 4636
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

রাষ্ট্র, কারাগার ও সাহিত্য: কিছু শৃঙ্খলিত অভিজ্ঞতা

সাহিত্যের চেয়েও অধিক কিছু

জেলখানা। সাহিত্যের ভাষায়, ‘লাল দালান’। ছোট্ট এই বাংলাদেশেও ৭০/৮০টি জেলখানা আছে। জেলখানা সংশোধনের জন্য হলেও, এদেশে সভ্য ও সৎ মানুষের জন্যও তা এক মূর্তিমান আতংক। রাষ্ট্রের অন্যতম সংগঠন হিসেবে কারাব্যবস্থা এ-অঞ্চলে সুসংবদ্ধ রূপ পায় বৃটিশদের হাতে। তারা বোধগম্য কারণেই ব্যবস্থাটিকে নির্যাতনমূলক চরিত্রে গড়ে তুলেছিল। মাত্র কিছুদিন আগে এই উপমহাদেশের সকল দেশ তাদের স্বাধীনতার ৫০বছর উদ্যাপন করেছে সাড়ম্বরে। এই দীর্ঘ সময়ে বৃটিশ প্রবর্তিত এ-অঞ্চলের রাষ্ট্রসমূহ কি রূপ নিয়েছে, তার সঙ্গে কারাব্যবস্থার কোন ধরনের বিবর্তন ঘটেছে, বিশেষত কারা ব্যবস্থাপনার গুণগত আদৌ কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি-না বা হচ্ছে কি-না তা বোঝার জন্য বাংলা ভাষায় প্রকাশিত কারা সাহিত্যগুলোর শরণাপন্ন হয়েছিলাম আমরা। ১৫টি বই আমরা পড়েছি। এইসব বইয়ের লেখকরা বৃটিশ শাসনামল, পাকিস্তান শাসনামল এবং বাংলাদেশ শাসনামলের বিভিন্ন পর্যায়ে (১৯২১-১৯৯৪) ‘জেল খেটেছেন’। বইগুলো বাংলাদেশের আজকের কারা পরিস্থিতির অভ্যন্তরিণ চিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে অধ্যয়ন করতে গিয়ে আমরা দেখেছি বৃটিশদের উৎখাতের পর তাদের রেখে যাওয়া রাষ্ট্র, আইন, বিচারব্যবস্থার মতোই কারাব্যবস্থারও সংস্কার সাধিত হয়নি এখনো। বরং তা আরো দমনমূলক রূপ নিয়েছে। এই বইগুলোকে আমরা শুধু ‘সাহিত্য’ বলতে নারাজ। ১৫জন বন্দির একান্ত নিজস্ব অভিজ্ঞতার ধারাভাষ্য এগুলো, যা সাহিত্যের চেয়ে অনেক অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য; এক একটি মানবিক দলিল। বলাবাহুল্য, এই লেখা একান্তই কয়েকটি বই পাঠের ফল; এতে বর্তমান লেখকের মৌলিকত্বের কোনো দাবি নেই।

‘আমরা জেলে ছিলাম’
যে ১৫টি বইয়ের অনুসন্ধান চালিয়েছি তার পাঁচটি লিখিত বৃটিশ শাসনামলে আটক ব্যক্তিদের দ্বারা। পাকিস্তান শাসনামলে বন্দিত্বের বিবরণ আছে চারটিতে। বাংলাদেশে আটকাবস্থার কথা লিখেছেন চারজন। স্বাধীন ভারতের কারা অবস্থা বোঝার জন্য আমাদের সংগ্রহে একজন ভারতিয় বাঙালি এবং একজন বৃটিশ নারীর বইও ছিল।
এই ১৫টি বইয়ের অধিকাংশ সাধারণভাবে আত্মজীবনীমূলক। অর্থাৎ জীবনের একটি বিশেষ খণ্ডকালে ঐসব লেখক এ অঞ্চলে জেলবাসি হয়ে বা সরকারি কোনো বন্দিশিবিরে থেকে যা ভেবেছেন এবং দেখেছেন, মুখোমুখি হয়েছেন যেসব পরিস্থিতির-তারই বিবরণ পাওয়া যায় তাদের লেখনি থেকে। শুধু কারা পরিস্থিতি বা কারা ব্যবস্থাপনা নয়, এ অঞ্চলে রাষ্ট্র ও রাজনীতিরও এক যথার্থ সাক্ষি এসব বই। এর মধ্যে তিনটি বই জেলে বসে লেখা। যেমন, মানবেন্দ্রনাথ রায়ের ‘জেলের চিঠি’, সত্যেন সেনের ‘জেল থেকে লেখা’ এবং কর্নেল (অবঃ) শওকত আলীর ‘কারাগারের ডায়েরী’। এই তিনটি বইয়ের প্রথম দুটি জেল থেকে লেখা চিঠির সংকলন। মানবেন্দ্রনাথ চিঠি লিখেছিলেন প্রবাসি প্রেমিকার কাছে। আর সত্যেন সেন তার সেজদি প্রতিভা সেনের কাছে। চিঠিতে রাজনৈতিক, সামাজিক ও কারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোকপাত করা নিষিদ্ধ ছিল বলে এ গ্রন্থদ্বয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিবরণই ঠাঁই পেয়েছে বেশি। ঠিক উল্টোটা ঘটেছে ভারতিয় লেখক মীনাক্ষী সেনের বেলায়। তাঁর ‘জেলের ভেতর জেল’-এ আত্মকথন নেই মোটেই। জেলবাসিদের জীবনই অনুসন্ধানি চোখে চিত্রিত হয়েছে পুরো-গ্রন্থে। আমাদের তালিকায় এ বইটি সবচেয়ে সুলিখিত। প্রায় একই ধাঁচের কারা সাহিত্য রাণী চন্দ-এর ‘জেনানা ফাটক’। সেখানেও আত্মকথা কিছু নেই। তবে বোঝা যায় বৃটিশবিরোধি সংগ্রামের অংশ হিসেবেই জেল খাটতে হয়েছে তাঁকে, ১৯৪২-এর আগস্ট থেকে। দীর্ঘদিন তিনি রাজশাহি জেলেও ছিলেন।
১৫টি বইয়ের মধ্যে ১২টির লেখকই পেশাদার রাজনীতিবিদ। এরা রাজনৈতিক কারণে জেল খেটেছেন এবং তার বর্ণনা দিয়েছেন। কমিউনিস্ট সংগঠক আবদুস শহীদ ১৯৪৮ সালে গ্রেফতার হয়ে সাত বছর চারটি কারাগারে বন্দি ছিলেন। তার জেলজীবনের ভাষ্য ‘কারাস্মৃতি’।
জিতেন ঘোষের ‘জেল থেকে জেল’-এর বিস্তৃতি ১৯২১ থেকে ১৯৪৭। এর মধ্যে কয়েক দফা জেলে যেতে হয়েছিল এই লেখককে এবং তা ‘সমাজ পরিবর্তন করতে চাওয়ার অপরাধে’। একই কারণে ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৭ পর্যন্ত নলিনী দাসকে জেল খাটতে হয়েছিল সুদূর আন্দামানে। সে বর্ণনা পাওয়া যায় ‘স্বাধীনতার সংগ্রামে দ্বীপান্তরের বন্দী’ গ্রন্থে। আন্দামান জেলজীবন সম্পর্কে আরেকটি গ্রন্থ (আন্দামানে নির্বাসিত পাঁচ বছর) আছে ডা. কেশব চন্দ্র সমাজদারের। ১৯৩২ থেকে পাঁচ বছর এই বিপ্লবিকে ‘দ্বীপান্তর দণ্ড’ ভোগ করতে হয়। সে সময় আন্দামান জেলকে বলা হত কালাপানি বা মরণ জেল।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় মতিয়া চৌধুরী এবং শাহ্ মুয়াজ্জম হোসেন জেলে ছিলেন পাকিস্তান শাসনামলে বাংলাদেশপন্থি ছাত্ররাজনীতির জন্য। শাহ্ মুয়াজ্জম ১৯৬২ পরবর্তী বিবরণ দিয়েছেন ‘নিত্য কারাগারে’। সেবার ’৬৭ পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন তিনি। গত পাঁচ বছরও কারাগারে কাটিয়েছেন তিনি। আর মতিয়া চৌধুরীর ১৯৬৭ থেকে জেলখাটা শুরু। সে দফায় ’৬৯ পর্যন্ত। এই আটকাদেশ ছিল বিনাবিচারে। লিখেছেন ‘দেয়াল দিয়ে ঘেরা’।
ভারতে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে এসে ১৯৩১-এ ধরা পড়েছিলেন এমএন রায়। উত্তর-প্রদেশে পাঁচ বছর চার মাস বন্দিত্বের সময় বার্লিন ও প্যারিসে প্রেমিকা এলেন গটসচাককে লেখা পত্রের সংকলন তার গ্রন্থ। মানবেন্দ্রনাথকে কানপুর (কমিউনিস্ট) ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছিল। এ মামলার অন্যান্য আসামি ছিলেন মুজাফফর আহমদ, এসএ ডাঙ্গে প্রমুখ প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা। সত্যেন সেনের চিঠিগুলো ১৯৪৯ থেকে ১৯৭৮ পর্যন্ত কয়েক দফায় কারাবরণের সময় নিকটজনদের কাছে লেখা। ‘যাতে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ বা ইংগিত উত্থাপন একেবারে নিষিদ্ধ’।
কর্নেল শওকত আলী তার ‘কারাগারের ডায়েরী’ লিখেছেন ১৯৮২ সালে যশোর কেন্দ্রিয় কারাগারে। তিনি তখন আওয়ামিলিগের এক অংশের নেতা। আর দেশে তখন সামরিক শাসন। সম্ভবত সে কারণে উৎসর্গপত্রে লিখেছেন তিনি- ‘কারাগারের চেয়ে বড় বন্দিশালা আজকের বাংলাদেশ’।
আগেই বলেছি, মীনাক্ষী সেন নিজের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছেন-তবে বইয়ে এমন ইংগিত আছে যে, ’৭০-এর নকশাল আন্দোলনের দায়েই জেলজীবন তাঁর। ছিলেন প্রেসিডেন্সি জেলে। তবে বইয়ের শেষে প্রশ্ন করেছেন, ওরা কি বহরমপুর, আলিপুর, দমদম, হাওড়া আর হুগলিসহ সব জেল থেকে মুছে ফেলছে সব রক্তের দাগ? পারবে? অর্থাৎ প্রেসিডেন্সি জেলের কাহিনি ওপার বাংলার অন্য জেলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের সশস্ত্র প্রতিবাদকারি বিশ্বজিৎ নন্দীর বইটি কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী। আটক ও জেলবাসি হওয়ার মাঝামাঝি সময়ে ১১৫ দিন সশস্ত্র বাহিনির অজ্ঞাত নির্যাতন শিবিরে থাকতে হয়েছে তাঁকে। ১৯৭৬-এর ১৪ আগস্ট থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত কারাগার-বহির্ভূত সেই আটক জীবনের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি ‘কারাগার থেকে কারাগারে’।
আমাদের তালিকায় তিনটি কারাভাষ্য ছিল যার লেখক রাজনীতিবিদ নন। তবে তাদেরও রাজনৈতিক কারণেই জেলে যেতে হয়। এদের একজন সাংবাদিক বোরহান আহমেদ, জনকণ্ঠ পত্রিকায় কাজ করেন। নির্বাহি সম্পাদক। গ্রেফতার হন ১৯৯৪ সালে। মাত্র সপ্তাহ তিনেকের জেলজীবন তাঁর। ‘কারাগারের দিনগুলো’ শীর্ষক তাঁর বইটি আমাদের তালিকায় সবচেয়ে কম সময়ের কারা বিবরণ এবং সবচেয়ে সা¤প্রতিক।
বিবি বিশ্বাস পেশায় ছিলেন আমলা। জেলে ছিলেন ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত। লিখেছেন কারাগারের ‘বিভীষিকাময় দিনগুলো’। জনাব বিশ্বাস তার বইয়ের মুখবন্ধে লিখেছেন-একজন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট এবং একজন ‘জেলা প্রশাসক’ হিসেবে অনেকবারই আমাকে কারাগার পরিদর্শনে যেতে হয়েছিল। সেইসব আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনকালে সাধারণ বন্দিদের সত্যিকারের অবস্থা বুঝতে পারিনি। কারণ সে সময় কর্তৃপক্ষ এমনভাবে ব্যবস্থা নিয়ে রাখতেন যাতে কারাগারের ভেতরকার অবস্থা বুঝতে না পারি আমি, কোনো অভিযোগ আমার কানে না পৌঁছায়। কিন্তু বন্দি হয়ে নিজের অভিজ্ঞতায় জানতে পেরেছি এখানে সাধারণ বন্দিরা কি মানবেতর অবস্থায় দিন কাটায় এবং কি মানসিক অশান্তিতে বাস করেন!
একজন বিদেশির চোখে এ-অঞ্চলের কারাগারগুলোর অভ্যন্তরিণ পরিবেশ বোঝার জন্য আমরা মেরি টাইলারের ‘ভারতের কারাগারে’ বইটি বেছে নিয়েছিলাম। টাইলার একজন বৃটিশ। বন্ধুর খোঁজে ভারতে এসে নকশালবাড়ি আন্দোলনে যুক্ত থাকার অভিযোগে জেলবাসি হন।

১৯২১ থেকে ১৯৯৪ : পরিবর্তন কিছু হল?
জিতেন ঘোষ ১৯২১ সালে গান্ধির অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে জেলে যান। জেল গেটে উলঙ্গ করে তল­াসি করা হয়েছিল তাকে। ঢোকার পরের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে: জেলে আমার কাজ ছিল যাঁতা পেষা-রোজ বিশ সের গম পিষতে হত। যাঁতা ঘুরিয়ে দু দিনেই হাতে ফোস্কা পড়ে গেল। তিন চার সের গমের বেশি পিষতে পারিনি কখনো। ঢাকা ছাড়াও কলকাতা এবং বর্মায়ও জেল খেটেছেন জিতেন ঘোষ। তাঁর ৭৩ বছর পর ১৯৯৪ সালে ঢাকা জেলে যেতে হয়েছিল জনকণ্ঠের নির্বাহি সম্পাদক বোরহান আহমেদকে। তাঁর ভাষায়, ২৯৫ক ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে গত ৫০ বছরে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা ছিলেন প্রথম শিকার। জেলে যেয়ে তিনি কি দেখলেন? ‘সকাল বেলা লকআপ খুলে দেয়ার পর ভয়াবহ দৃশ্যের অবতারণা। সব ক’টা খাতায় হাজারখানেক লোক একসঙ্গে চিৎকার করে তাণ্ডব গতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটে যায় বাইরের পায়খানায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রত্যেকটি পায়খানার সামনে বিরাট লাইন। পায়খানা শেষ হতে না হতেই সব ক’জন একই সঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ে চৌবাচ্চার ধারে গোসলের জন্য। কয়েক মগ পানি ঝটপট মাথায় ঢেলেই হুড়াহুড়ি করে নাস্তা সংগ্রহ করা। ভূষির মোটারুটি, সঙ্গে এক টুকরো গুড়। বৃটিশ আমলে ক্রিতদাসদের প্রতি যে আচরণ করা হত, স্বাধীন দেশের নাগরিকদের প্রতি আজও সেই একই আচরণ করা হচ্ছে।’
জিতেন ঘোষ ছিলেন কৃষক সংগঠক। পাশাপাশি উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা। জেলজীবনেই জাতিয়তাবাদি থেকে কমিউনিস্টে রূপান্তরিত হন। তার বন্দিত্বের সময় ১৯৪২ সালে কয়েদিদের আন্দোলন দমাতে বড় ধরনের এক হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল। প্রায় ১০০ জন মারা যায় তাতে। বাংলায় তখন ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা। কারা বিভাগের আইজি ছিলেন কর্নেল অনুরূপ সিংহ। আর ঢাকা জেলার সুপারিন্টেন্ডেন্ট ছিলেন মি. নোবল।
জেলে কয়েদিদের মধ্য থেকে কর্মচারি নিয়োগের প্রথা আছে এখনো। এই প্রথার গোড়াপত্তন সম্পর্কে জিতেন ঘোষ লিখেছেন, ইংরেজ এ-দেশে তাদের রাজত্ব পাকাপোক্ত করার জন্য দুটো নীতির বিশেষ আশ্রয় নিয়েছিল। একটা হল বিভেদ সৃষ্টি ও শাসন। আর একটা হল: বকশিস ও অনুগ্রহ দিয়ে একদল দালাল মোসাহেব সৃষ্টি। সুচতুর ইংরেজ জেলেও এই নীতি আমদানি করে। কয়েদিদের ভেতর থেকেই তৈরি করা হত ‘পাহারা’, ‘মেট’ ও ‘কালা-পাগড়ি’। কাজে নির্ভরযোগ্যতা আর দালালিতে পরিপক্কতাই হল এদের সেরা গুণ। এই পাহারা, মেট আর কালা-পাগড়ির কাজ হল কয়েদি ঠ্যাঙানো, আইন মানানো, ‘খাটুনি’ আদায় করা।

এদের দিয়েই কয়েদিদের মধ্যে দলাদলি, ভাগাভাগি, ঝগড়া-ঝাঁটির সৃষ্টি করা হত। রাখা হত শাসনে। পাশাপাশি কয়েদিদের সামনে প্রলোভন ধরা হয়-‘মার্কা’, ‘রেমিসান’। জেলের আইন-কানুন মেনে ভালোভাবে কাজ করলে আসল সাজা হতে যা মাফ করা হয়, তাতে কয়েদিদের ১২ মাসের বছরটা নয় মাসে এসে দাঁড়ায়। কারাগারে এটা এক মস্তবড় প্রলোভন। মুক্তির দিন কত বেশি এগিয়ে আনা যায়-এর জন্যই চলে দারুণ প্রতিযোগিতা। এই প্রলোভনেই বাইরের দুর্দান্ত চোর-ডাকাত এখানে এসে শান্ত, নিরীহ একেবারে বশংবদ দালাল হয়ে যায় জেলার, জমাদারদের। ধন্য ইংরেজের প্রশাসনিক বুদ্ধির! জেলে মারের ভয়ের চেয়ে মার্কা কাটার ভয়ই বেশি। এ ভয়ে সবাই সন্ত্রস্ত থাকে। এছাড়া খাবার-দাবার আর কাপড়-চোপড়ের সুবিধা দিয়েও দালাল তৈরি করা হয়। মীনাক্ষী সেনের ভাষ্য থেকেও এই জেল-সংস্কৃতির সমর্থন মেলে। তিনি লিখেছেন, ‘মার্কা’ পাওয়ার আসল উপায় কর্তৃপক্ষের মনোরঞ্জন করে চলা। নিঃশর্ত প্রশ্নহীন আনুগত্য দেখানো। এই বাধ্যতামুলক আনুগত্য লাগানো হয় দুর্বলকে পীড়নের কাজে, বন্দিদের বিরুদ্ধে বন্দিকে দিয়েই নির্যাতন করানোর কাজে। কাউকে অমানুষিক প্রহার গণ্য করা হয় তখন সদাচরণ হিসেবে। অত্যাচারি হওয়াই জেলে সুখি হওয়ার চাবিকাঠি। যেমন, বিবি বিশ্বাস আমাদের জানাচ্ছেন, ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা এবং এ-সংক্রান্ত কাজ করার জন্য ঘাতক ও তার সাহায্যকারিকে পারিতোষিক হিসেবে তিন মাসের কারাদণ্ড মাফ করে দেয়া হয়। ঐ দিন তাদের নেশা করার মদ-গাঁজাও খেতে দেয়া হয় অফিসিয়ালি।
এই দালালি ব্যবস্থার স্রষ্টা ইংরেজ হলেও তাদের উৎখাত করে স্বাধীন ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের শাসকরাও ব্যবস্থাটি কিন্তু বহাল রেখেছেন। মতিয়া চৌধুরীর কারা অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি-‘জেলের কাজকর্ম চালায় দু’দল লোক। প্রথম দল সরকারের মাইনে প্রাপ্ত কর্মচারি। আর দ্বিতীয় দল হচ্ছে-দীর্ঘদিনের সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের মধ্যে যারা সিনিয়র তারা। সরকারি খাতায় এদের দুটো নাম-মেট ও পাহারা। মেট হচ্ছে উচ্চপদ, তারপর পাহারা। কর্মদক্ষতা ও জেলের আইনকানুনের প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্যের পরিচয় দিয়ে এবং সেই সঙ্গে জমাদারদের মনতুষ্টি সাধন করে চলতে পারলে বেশ কয়েক বছর কাটার পর কয়েদিদের এসব পদোন্নতি ঘটে। বছরে এক জোড়া স্যান্ডেল, শীতের সময় চামড়ার মতো মোটা কম্বলের কোট, খাওয়া-দাওয়া বা অন্যান্য ব্যাপারে কিছু সুবিধা, খবরদারি বা সর্দারির লোভ ইত্যাদি সবকিছু ছাপিয়ে যে কারণে এই মেট-পাহারা হওয়ার জন্য এরা প্রাণান্তর প্রচেষ্টা চালায় সেটি হচ্ছে জেলের ভাষায় বেশি ‘মার্কা’ বা রেমিসান পেতে হবে তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে হবে। একজন সাধারণ কয়েদি বছরে যে ক’টি দিন সাজা মাফ বা রেমিসান পায়, মেট পাহারার সাজা মাফের দিন-সংখ্যা তাদের চেয়ে গড়পড়তা দশ-পনের দিন বেশি। এই কটা দিনের জন্য সাধারণ আসামিদের ওপর জমাদারদের নানা অন্যায় নিপীড়নের সঙ্গি হয় এরা। কোনো ঘটনার তদন্তের সময় তাদের পক্ষ নেয়।
জিতেন ঘোষের বর্ণনা এবং মতিয়া চৌধুরী ও বোরহান আহমেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেই বর্ণনার তুলনা থেকে দেখা যায় গত শতাব্দিতে এ-অঞ্চলে কারা পরিস্থিতিতে গুণগত কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। অথচ যে ঔপনিবেশিক নিপীড়নমূলক কারাব্যবস্থার অবশেষ আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি সেই বৃটিশরা কিন্তু নিজ দেশে কারাগারের পরিবেশ ক্রমাগত শোভন রূপ দিয়ে চলেছে। বোরহান আহমেদ তাঁর বইতে সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।

খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড : ডেটলাইন ২৪ এপ্রিল ১৯৫০
এদেশের কারা ইতিহাসে ‘খাপড়া ওয়ার্ড’ হত্যাকাণ্ড সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা, যশোর, কুমিল­া ও খুলনার কারা গণহত্যার মতোই ভয়াবহ। ‘জমিদার ও ধনিদের উৎখাতের জন্য ‘বক্তব্য প্রদানের’ অভিযোগে’ ১৯৪৮ সালে গ্রেফতার হওয়া পিরোজপুরবাসি আবদুস শহীদ খাপড়া ওয়ার্ডের আক্রান্ত বন্দিদের অন্যতম। তাঁর ‘কারাস্মৃতি’তে খাপড়া হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আছে। রাজশাহি জেলের ঐ ওয়ার্ডে তখন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃস্থানিয় অনেক নেতা আটক ছিলেন। ঐ ওয়ার্ডটি ছিল রাজবন্দিদের জন্য নির্দিষ্ট ও সুরক্ষিত টালির ছাদবিশিষ্ট আট চালা বিরাট ঘর। কমিউনিস্ট পার্টি এ-সময় কারা আন্দোলনের মাধ্যমে বাইরের গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে উজ্জীবিত করার ‘লাইন’ নিয়েছিল। আর জেল কর্তৃপক্ষ চাইছিল খাপড়া ওয়ার্ডের নেতৃস্থানিয় বন্দি-যেমন, কমরেড আবদুল হক, বিজন সেন প্রমুখকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে। এই দ্ব›দ্ব চলাবস্থাতেই আসে ১৯৫০-এর ২৪ এপ্রিল। সরাসরি আবদুস শহীদের জবানিতেই শোনা যাক কারা ইতিহাসের সে দিনের বিভৎসতা: ‘২৪ এপ্রিল আমাদের কিচেনের রাজবন্দিরা রুটি, চা নিয়ে আসছে। কেউ কেউ খাটের কোনায় কেটলি, রুটির থালা রেখে আলোচনা শুনছে। পার্টির অভ্যন্তরিণ কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনায় আমরা সবাই অত্যন্ত অবসাদগ্রস্ত, ক্লান্ত, নিদ্রাকাতর। তারপরও আলোচনা চলছিল। বেলা প্রায় ৯টার দিকে খাপড়া ওয়ার্ডের বাইরে অনেকগুলো বুটের খট খট আওয়াজ পেলাম। বৈঠকের সভাপতি হানিফ উঠে দাঁড়াতেই আমরা পিছন ফিরে দেখি জেলসুপার মি. বিল, ডাক্তার, দুইজন ডেপুটি জেলার, সুবেদার আকবর খাঁ কয়েকজন মেট এবং সিপাহিদের প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ জন ঢুকে পড়েছে ওয়ার্ডের মধ্যে। সুপার সরাসরি পূর্ব দিকে হক সাহেবের (যশোহর কমিউনিস্ট নেতা আবদুল হক, বর্তমানে প্রয়াত) কাছে গিয়েই বলল, ‘Be ready Haque, some of you are to be segregated now’| হক সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বললেন: ‘Just sit down please. We have talks with you about this matter.’ আমি তখন ঠিক বিলের পাশেই দাঁড়ানো। হকের কথা শেষ না হতেই ‘Shut up the door’ বলে চিৎকার করে উঠল বিল। মনে হল এই আদেশ দেওয়ার পরই তার খেয়াল হয়েছে খাপড়ার একটি মাত্র গেট বাইরে থেকে আটকে দিলে তাতে সবাইকে নিয়ে আটকা পড়বে। তাই সে অর্ডার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে বেরিয়ে যেতে চাইল। গেটে দাঁড়ান ছিল পাবনার উল­াপাড়ার বাবর আলী, কুষ্টিয়ার দেলওয়ার, বরিশালের আবু (রশীদউদ্দীন)। তারা গেটটি প্রায় বন্ধ করে আনছিল, এরই মধ্যে বিল এসে বাবর আলীর হাতে হান্টার দিয়ে সজোরে আঘাত করে তার কব্জি ভেঙে দিল এবং বুট দিয়ে প্রচণ্ড ধাক্কা মেরে গেটের বাইরে বেরিয়ে গেল। বিলের ঠিক পশ্চাতে ছিল কমরেড সদানন্দ। সে সুবেদারের পাগড়ি ধরে টান দেওয়ায় সুবেদার পাগড়ি রেখেই বেরিয়ে গেল। এদিকে বিল বেরিয়েই বাঁশিতে হুইসেল দিল। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় চলি­শ জন সিপাহি লম্বা বাঁশের লাঠি নিয়ে খাপড়ার বারান্দায় এসে উপস্থিত হল। ইতিমধ্যে আমরা ভিতর দিয়ে গেট আটকিয়ে দেওয়ায় ওদের কেউ ভিতরে ঢুকতে পারল না। কিন্তু ওরা সমস্ত জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে লাঠি ছুঁড়ে মারতে লাগল। উন্মত্ত আক্রোশে সিপাহিরা গরাদের উপর লাঠি দ্বারা প্রচণ্ড আঘাত করতে লাগল। আমরাও আমাদের লোহার খাটগুলো এগিয়ে নিয়ে জানালার কপাটগুলো আটকাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু ওদের লাঠির সামনে এগোতে পারছিলাম না। এরই এক ফাঁকে আমি জানালার কাছে গিয়ে উর্দুতে সাধারণ সিপাহিদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলাম: ‘সিপাহি ভাইও ইয়ে লড়াই তোমলোগো কা নেহি হায়। মগার ইস সরমায়াদার সরকারকা সাথ জো তোমকো আওর হামকো ভি দুশমন হ্যায়’।
বলা শেষ হতে না হতেই এক মেট এসে হাতে এমন বাড়ি মারল যে আমার ডান হাতের তর্জনীটি কেটে সামান্য একটু চামড়ার সঙ্গে ঝুলে রইল। আমি দৌড়ে ভিতরে গেলে কমরেড সত্যেন সরকার আমার আঙুল বেঁধে দিলেন। তারপর আবার খাট দিয়ে জানালার দিকে এগোতে লাগলাম। আমরা এবার কাঁসার থালা, ঘটি, বাটি, শিশি, দোয়াত যাবতিয় জিনিস জানালার ফাঁকা দিয়ে ওদের দিকে ছুঁড়তে লাগলাম। ওরা এমনভাবে লাঠি দিয়ে জানালায় দেওয়া আমাদের লোহার খাটগুলোকে ধাক্কা দিয়ে ফেলতে লাগল যে আমাদের দিনাজপুরের কমরেড কালী সরকার এবং মিরপুরের নাসির খাটের নিচে পড়ে গেল। মনে আছে খাপড়ার দক্ষিণ দিকে আমি একটি দোয়াত নিয়ে বাইরে সজোরে নিক্ষেপ করছি এমন সময় ফায়ার শব্দে খাপড়া যেন বিদীর্ণ হল। চকিত দৃষ্টিতে দেখলাম, খাপড়ার প্রায় পঞ্চাশটি জানালায় বন্দুকের নল লাগিয়ে সিপাহিরা দাঁড়িয়ে আছে। আমি তৎক্ষণাৎ উপুড় হয়ে বালিশের নিচে মাথা গোঁজার সঙ্গে সঙ্গে রাইফেলের গর্জনে খাপড়ার ভিত যেন ফেটে চৌচির হতে চাইল। গেটের দিকে একটু চোখ পড়তেই দেখলাম ফিনকি দিয়ে রক্ত একেবারে ছাদ পর্যন্ত উঠছে। আমার মাথা একটি সাপোর্টিং ওয়ালের আড়ালে বালিশের নিচে গোঁজা ছিল, পা-কনুই ছিল বাইরে। হঠাৎ লক্ষ করলাম হাঁটু দু’ফাঁক করে স্পিলিন্টার ঢুকে গেল। বালিশের নিচ থেকে দেখলাম পাশেই কমরেড হানিফের বাহুর উপরিভাগ ছিঁড়ে গেছে এবং সেখান থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছে। একটু পরেই কমরেড হানিফকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখি। দেখলাম আমার অদূরেই কুষ্টিয়ার কমরেড নন্দ স্যানাল রক্তাক্ত শরীরে মেঝের উপর লুটিয়ে পড়েছেন। আমার হুঁশ হারাবার পূর্বে যতটুকু মনে আছে দেখলাম খাপড়া ওয়ার্ডে রক্তের স্রোত বইছে। রক্তে বুক পর্যন্ত ডুবন্ত আমার শরীর।
এরপর কিছু মনে নেই। সংজ্ঞা হারাবার পূর্বে গুলিবিদ্ধ রাজবন্দিদের বিভৎস আর্তনাদের কথা আমার মনে পড়ে। যখন হুঁশ হল তখন বেলা দশটা। তখনকার দৃশ্য বর্ণনা করা যায় না। সে দৃশ্য ভয়ংকর। রক্তের গন্ধে অসংখ্য মাছি এসে জুটেছে। মাছিগুলো আহতদের ঘিরে ধরেছে। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত লোহার খাটগুলো, রাইফেল নির্গত অসংখ্য স্পিলিন্টার, বুলেট, সারা মেঝেতে ছড়ানো থালা, গ্লাস, দোয়াত, ওষুধের শিশি, রক্তে ভেজা স্তুপীকৃত কাপড়-চোপড়, বইপত্র সব মিলে যে দৃশ্যের অবতারণা করেছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে কেউ যদি কোনো কাল্পনিক নরকের চিত্র কোনোদিন কল্পনা করে, তার কল্পনার সঙ্গে এই বাস্তব দৃশ্যের সাদৃশ্য থাকবে নিশ্চয়ই। মানুষ কর্তৃক রক্তের হোলি খেলার পর মাছি এবং বালুকণার আক্রমণ শুধু এই কথাটাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল যে, পুঁজিবাদি সমাজে দেশপ্রেম এক বিভৎস অভিশাপ। এ অভিশাপ বাস্তব রূপ নিয়ে সেদিন খাপড়া ওয়ার্ডে মাংস টুকরো টুকরো করে ছিঁড়তে আসছিল। গুলি চালনা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খাপড়ার গেট খুলে দেওয়া হল। অমনি মোটা বাঁশ নিয়ে সিপাহিরা ঝড়ের বেগে ঢুকে অন্যান্য কমরেডদের উপর লাঠিচার্জ শুরু করল। তা দেখলে হৃৎকম্প উপস্থিত হয়। খুটির মতো এক-একটা মোটা বাঁশ দুই হাতের উপরে তুলে যেন কলাই পিটানোর মতো এক-একজনকে পিটাচ্ছে। লাঠির প্রচণ্ড আঘাতে সিলেটের অনন্ত দেবের মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে গেল। এক-একটা বাড়িতে যেন কমরেডরা খাপড়ার সিমেন্টের মেঝের সঙ্গে মিশে যেতে লাগল। লাঠির আঘাতে কমরেড আবদুল হকের হাত অকেজো হয়ে গেল। যে সমস্ত কমরেড গুলিবিদ্ধ হয়নি অথচ লাঠির আঘাতে শুয়ে পড়তে হয়েছে, তারা গড়িয়ে গড়িয়ে মুমূর্ষু আহত কমরেডদের কাছে এগুচ্ছিলেন। এ দেখে সিপাহিরা দ্বিতীয়বার লাঠিচার্জ করল। এই দ্বিতীয়বার লাঠিচার্জের পর বিল সাহেব নিজে হান্টার হাতে আমার সামনে ক্ষণিকের জন্য দাঁড়িয়ে আমাকে দেখতে লাগল। আমি তখন কেমন করে যেন একটা লোহার খাটের নিচে বারো আনি ঢুকে রয়েছি। এ অবস্থায় না থাকলে হয়ত আমি লাঠিচার্জ এড়াতে পারতাম না। যতদূর মনে পড়ে, খাটের উপর কমরেড বিজন সেন চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। তার পেটে গুলি লেগেছিল এবং পেট অসম্ভব রকম ফুলে উঠেছিল। সে চিৎকার করে বলেছিল, ‘কমরেড, আমরা মরি নাই, আমরা জয়লাভ করেছি। ভবিষ্যৎ আমাদের।’ আমি নিচু থেকে চিৎকার করে বললাম: বিজনদা আমরা মরি নাই, বেঁচে আছি। এরপরই বিজনদা আর কথা বলেনি। ঐ খাটের উপরই তার মৃতদেহ পড়ে রইল।
ইতিমধ্যে বিল সাহেব এসে গেছে। বিল কমরেড হককে খুঁজছিল। আমাকে হক মনে করে খাটের তলা দিয়ে বিশেষভাবে লক্ষ করছিল কিন্তু যখনই বুঝতে পারল আমি হক নই, তখনই একটু সরে গিয়ে হককে পেয়েই তার মাথায় হান্টার দিয়ে আঘাত করল। আঘাতের চোটে কমরেড হক চিৎকার করে উঠে বসে আবার ধপাস করে পড়ে গেল এবং তার মাথা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত উপরে উঠতে লাগল। দেখলাম, বিল এরপর আহত কমরেডদের গা মাড়িয়ে হন হন করে বেরিয়ে গেল। এরপরও যে সমস্ত কমরেড কোনো রকম হামাগুড়ি দিয়ে আহত কমরেডদের কাছে আসছিলেন সিপাহিরা তৃতীয় দফায় তাদের উপর প্রচণ্ড লাঠি চালায়। এই তৃতীয় বার লাঠি চালনার পুরোভাগে ছিল ভাগলপুরের মনছুর জনৈক বিহারি সিপাহি।
‘যাহোক, ইতিমধ্যে আহত কমরেডদের ক্ষতের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হল। ডাক্তার এসে আমাদের অনেককে ক্যাথিটার দিয়ে প্রস্রাব করাল এবং সবাইকে মরফিয়া ইনজেকশন দিয়ে দিল। আমরা যখন জ্ঞান ফিরে পেলাম, তখন দেখি রাইফেল হাতে প্রায় চলি­শজন সিপাহি দাঁড়িয়ে আছে। তাদের একজন অধিনায়ক বলল, ‘আমরা মিলিটারিতে ছিলাম। যুদ্ধও করেছি, কিন্তু আবদ্ধ ঘরে এরূপ নৃশংসভাবে গুলি করে মারার নজির কোথাও আছে জানি না। এর চেয়ে নিষ্ঠুরতা যে কি হতে পারে জানি না।’ জেলে পাগলাঘণ্টি পড়লে বাইরে থেকে সশস্ত্র সিপাহিদের ভিতরে আসতে হয়। তাই এরা এসেছে। আমরা তাদের কাছে আমাদের মৃত কমরেডদের লাশ দেখবার জন্য চিৎকার করে আবেদন করলাম। আমার মনে আছে আমি তাদের উদ্দেশ্যে বললাম, ‘আজ আমরা বন্ধুদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে পারলাম না। কিন্তু জনতা এর প্রতিশোধ নেবেই।’
খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডে যারা নিহত হয়েছিলেন: ১. হানিফ শেখ (কুষ্টিয়া), ২. কম্পরাম সিং (দিনাজপুর), ৩. বিজন সেন (রাজশাহি), ৪. দেলওয়ার (কুষ্টিয়া), ৫. আনোয়ার (খুলনা), ৬. সুখেন ভট্টাচার্য (ময়মনসিংহ), ৭. সুধীন ধর (রংপুর)। এ ছাড়া ঘটনায় আহত হন ২৯ জন।

কারাগারে নারী: রানী চন্দ, মীনাক্ষী সেন ও মতিয়া চৌধুরীর অভিজ্ঞতা
মতিয়া চৌধুরী ১৯৬৭ সালে যখন জেলে যান তখন ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রি। মীনাক্ষী সেন জেলে যান ১৯৭০-এর পরে। ১৬ বছর বয়সে। আর রানী চন্দ কারাবন্দি ছিলেন দেশ বিভাগের আগে ১৯৪২-এ। সে-ও দেশ হিতৈষণার জন্যই।
এপার বাংলার মতিয়া চৌধুরী এবং ওপার বাংলার রানী চন্দ ও মীনাক্ষী সেন কারাগারে থাকার সময় মেয়ে বন্দিদের খুব কাছ থেকে দেখেছেন। ফিমেল ওয়ার্ডেই ছিলেন তাঁরা। মীনাক্ষী সেনের বইটি শুধু নারী ও শিশু বন্দিদের কাহিনি। সে কাহিনি হৃদয়বিদারক, আবেগে উদ্বেল করা, ক্ষোভের বহ্নি জাগানো।
কেমন আছে মেয়েরা কারাগারে? মতিয়া চৌধুরীর বর্ণনা অনুযায়ি, ‘ফিমেল ওয়ার্ড’ হল জেলের মধ্যে জেল। জেলখানার জমাদারদের ভাষায়, ফ্যামিলি ওয়ার্ড। আবার রানী চন্দ যাকে বলেছেন, ‘জেনানা ফাটক’। জেলের মধ্যে ঢুকতে হলে পার হতে হয় দুটো তালাবদ্ধ গেট। ফিমেল ওয়ার্ডে ঢুকতে হলে পার হতে হবে তিনটি। সর্বশেষ তালাটি ফিমেল ওয়ার্ডের ভেতরের দিকে। এখানে হরেক রকমের মেয়েরা আছে। কেউ অপরাধ করে শাস্তি পেয়ে ছেলেপুলে নিয়ে থাকেন, কেউ আছে প্রেম করে জুডিশিয়াল কাস্টডিতে। সংখ্যাগরিষ্ঠই ৫৪ ধারায় গ্রেফতার হওয়া যৌনকর্মী। আর আছে ধর্ষিত কিছু বিচারপ্রার্থী। ধর্ষিত হওয়া বোধ হয় অপরাধ। না হয় এরা জেলে থাকবেন কেন। অর্থাৎ নিরপরাধের বন্দিদশা, বিচারাধীন দুঃখ, দণ্ডিতের অস্বাভাবিক জীবনযাপন এবং শিশুদের দুঃসহ দিনরাত্রি-সবই এখানে আছে। এখানকার কয়েকজন কিশোরির জন্য মতিয়া চৌধুরী একদিন জেলের বাইরে থেকে কিছু বেলুন আনিয়েছিলেন। তারপরের বর্ণনা শোনা যাক তাঁর লেখনি থেকে, ‘কুসুম রওশন সবাইকে ডাকলাম, কেউ বেলুন ছুঁচ্ছে না। আমি তো প্রথমে বুঝতেই পারিনি। পরে ওদের মার কাছে শুনলাম, জন্মের পর কেউ বেলুন দেখেনি বা দেখলেও মনে নেই, তাই নিতে ভয় পাচ্ছে। আরেকদিন বাজের থাবা ফসকে একটা আধমরা হাঁসের বাচ্চা ফিমেল ওয়ার্ডে পড়ে গিয়েছিল। দশ বছরের রওশন সেই আধমরা বাচ্চা দেখে ভয়ে এমন চিৎকার করে উঠেছিল তা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। অথচ ঐ মেয়ে বাজপাখি যখন আকাশে ওড়ে বা এসে এখানকার জামগাছটায় বসে, বিশ্রাম নেয় তখন সেগুলো দেখে ভয় পায় না। কারণ জেলের আকাশে বাজপাখি ও বহু দেখেছে কিন্তু ওর দশ বছরের জীবনে হাঁস দেখেনি।’
এর নাম জেল। এই জেলের ফিমেল ওয়ার্ডে শুধু অপরাধি বা সন্দেহভাজনরাই আটক থাকে না। অনেক সময় ‘পতিতাপলি­র দালালরা ভুয়া কেসে পরিকল্পিতভাবে জেলে ঘুরে যায় দু’চার দিনের জন্যে। তুলে নেওয়ার মতো সাবালিকা বা নাবালিকা কে কে জেলে আছে তা দেখে নির্দিষ্ট বন্দিকে নানান প্রলোভন ‘তৈরি করে’ তারা। দেখেশুনে গিয়ে সাবালিকাদের ছাড়িয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করে। নাবালিকাদের ক্ষেত্রে নকল অভিভাবক সেজে আদালতে দাঁড়ায়। এভাবে তাদের ছাড়িয়ে জেল থেকে নিয়ে তোলে পতিতাপলি­তে। কোনো ‘টার্গেট’কে এভাবে নেওয়া না গেলে আরও দুর্ধর্ষ ব্যবস্থাও আছে। মীনাক্ষী সেন প্রেসিডেন্সি জেলের একটি কাহিনি বলেছেন: চব্বিশ পরগণার মেয়ে হাসিনা বিবি। ‘হারিয়ে যাওয়া মেয়ে’ হিসেবে জেলে ছিল সে। শুদ্ধ, সৎ এবং সরল এই মেয়ে জেলে থাকতে নকশালদের সংস্পর্শে এসে লালফৌজের স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু কিভাবে যেন জেলের বাইরে বেশ্যার দালালরা অভিভাবকহীন হাসিনার কথা জেনে যায়। তারপর ফালতু কেসে ২/৩ দিনের জন্য জেলে এসে তারা হাসিনার সামনে টোপ ফেলে। ব্যর্থ হয়। কিন্তু হাল ছাড়ে না। জেলে অজ্ঞাত কর্মচারিদের সহায়তায় এবার হাসিনার রিলিজ অর্ডার আসে। মীনাক্ষী সেন লিখেছেন, ‘নাবালিকা বা সাবালিকা যাই হোক-কোর্টে হাজির না হলে কোনো ঝঃৎধু মরৎষ-এর জবষবধংব আসতে পারে না। হাসিনা নাবালিকা। জেলে সে একবার যখন ঢুকেছে, তাকে ছাড়াতে হলে অভিভাবক লাগবে। কোর্ট অভিভাবকের অভিভাবকত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হলে, হাসিনা কোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে সেই অভিভাবক সনাক্ত করলে, তবেই তার হাতে হাসিনাকে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দেবে কোর্ট। কিন্তু তারপরও হাসিনার ‘রিলিজ’ আসে। ও কখনো কোর্টে যায়নি। এ তো সরাসরি ছিনতাই। এর অর্থ হল: হাসিনা যায়নি। কিন্তু জেল থেকে হাসিনার ওয়ারেন্ট গেছে কোর্টে, সেখানে বাইরে থেকে সাজানো একটি মেয়ে বন্দিনি সেজে হাসিনার জায়গায় দাঁড়িয়ে নকল অভিভাবক সনাক্ত করেছে। একি কেউ বিশ্বাস করবে? আসলে জেলব্যবস্থা, তার পরিবেশ বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ঊর্ধ্বে। বৃটিশ চলে যাওয়ার অর্ধশতাব্দি পরও চলছে তা।
ধর্ষিত হওয়ার ‘অপরাধে’ অনেক মেয়ের জেলে বন্দি থাকার কথা বলা হয়েছে আগে। এটা জেলে অতিপরিচিত বিষয়। মীনাক্ষী সেন তার বইতে এ রকম অনেক মেয়ের কাহিনি বলেছেন।

আন্দামান: নিপীড়নের কিংবদন্তি
নলিনী দাস লিখেছেন ১৯৩৩ সালে গ্রেফতার হওয়ার মুহূর্তেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। এই হল বৃটিশ শাসন: তাদের বিচার। ভোলা জেলার সন্তান নলিনী দাসকে চার বছর আন্দামান জেলে কাটাতে হয়। আর ঝালকাঠির ড. কেশব চন্দ্র সমাজদার ছিলেন পাঁচ বছর। এদের দু’জনের বর্ণনা থেকে কিংবদন্তির আন্দামান জেল সম্পর্কে জানা যায় অনেক কিছু। সেটাও আমরা উলে­খ করছি কারণ আমাদের জেলব্যবস্থারই ঐতিহ্য তা! আন্দামান জেলে ৭০০ কুঠুরি ছিল। অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে প্রতি মাসে গড়ে তিনজন বন্দি আত্মহত্যা করত এ জেলে। কোমরে দড়ি, পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি, হাতে হাতকড়া পরিয়ে চার দিন সমুদ্র পথ পাড়ি দিয়ে আন্দামান নিয়ে যাওয়া হত বন্দিদের। বঙ্গোপসাগরে কলকাতা থেকে ৬০০ মাইল ভেতরে ছিল আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ। ১৯৩৮-এর ১৯ জানুয়ারি এখান থেকে রাজবন্দিদের সর্বশেষ ব্যাচ দেশে ফেরে। এ জেলের পরিবেশ ছিল ভারতের অন্যান্য জেলের চেয়ে খারাপ। রাজবন্দিদেরও খাট, বাতি, বিছানা, বালিশ কিছু দেওয়া হত না, শুধু দুটো কম্বল। শুধু আলোর দাবিতে ৪০ দিন অনশন করতে হয়েছে এ জেলের বন্দিদের। আশ্চর্যজনক বিষয় হল, এই জেলে বৃটিশরা উদ্যোগি হয়ে কমিউনিস্ট সাহিত্য সরবরাহ করত-তারা চাইত দীর্ঘমেয়াদের বন্দি বিপ্লবিরা (অধিকাংশ যারা বৃটিশবিরোধি সশস্ত্র আন্দোলনের কর্মী) সন্ত্রাসবাদ ছেড়ে কমিউনিজমের পথ নিক। ভারতে ব্রিটিশ সরকারের ঘোষিত ‘এক নম্বর শত্র“’ ছিল জাতিয়তাবাদি বিপ্লবি দলগুলো। আন্দামান রাজবন্দিদের মধ্যে বেশি সংখ্যক ছিলেন বাঙালি। তারপর ছিল পাঞ্জাবিদের স্থান। অনেক বন্দি এ জেলে পাগল হয়ে যেত।

আন্দামানে কারা নির্যাতনের খণ্ড চিত্র [১৯১০ থেকে ১৯৩৮ সাল]
সেলুলার জেলে অনশন ও মৃত্যু:
১. ইন্দুভূষণ রায় : সেলুলার জেলে আত্মহত্যা। ১৯১৮ সাল।
২. ভানু সিং : জেল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পিটিয়ে হত্যা। ১৯১৮ সাল।
৩. হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য : অসুখে মৃত্যু। ১৯১৮ সাল।
৪. পণ্ডিত রামরক্ষা : তিন মাসের অনশনে মৃত্যু। ১৯১৭ সাল।
৫. মহাবীর সিং : অনশনের ৬দিনে মৃত্যু। ১৭ মে ১৯৩৩ সাল।
৬. মোহনকিশোর নমঃদাস : অনশনের ১৩ দিনের দিন মৃত্যু। ২৪ মে ১৯৩৩ সাল।

অসুস্থ অবস্থায় বাংলাদেশের জেলে চিকিৎসার জন্য আনার পর মৃত্যু:
১. ফণিভূষণ নন্দী : আলিপুর জেল। ১৯৩৭ সাল।
২. মহেশ বড়–য়া : রাজশাহি জেল। ১৯৪০ সাল।
জেল কর্তৃপক্ষের নৃশংস অত্যাচারে আন্দামানের অনেক অধিবাসি উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে পরে রোগমুক্ত হন। দুই-একজন মৃত্যুও বরণ করেছেন। এখানে শুধু সেই সমস্ত বন্দিদের নাম উলে­খ করা হল যাঁদের সরকারি চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল:
১. উল্লাস দত্ত
২. সুরেন কর
৩. ফণী দাশগুপ্ত
৪. ভুপেশ ব্যানার্জী
৫. সরোজ গুহ
৬. ভূপেশ গুহ
৭. হৃদয় দাস
৮. বিমল চক্রবর্তী
৯. কুমুদ মুখার্জী
১০. ধীরেন ভট্টাচার্য
১১. অভয় দাস।

১৯৩৪ সালে যে সমস্ত বন্দিদের আন্দামানে বর্বর মধ্যযুগিয় আইনে ১৫টি বেত্রদণ্ড দেওয়া হয়েছিল:
১. প্রবীর গোস্বামী (ময়মনসিংহ)
২. সুখেন্দু দাস (ময়মনসিংহ)
৩. চন্দ্রকান্ত ভট্টাচার্য (কুমিল­া)

কারামুক্তির পর আন্দামানের যেসব বন্দি গণ-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে মৃত্যুবরণ করেছেন:
১. সুশীল দাশগুপ্ত : কলকাতার সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতি রক্ষার মিছিলে নিহত।
২. লালমোহন সেন : নোয়াখালির দাঙ্গায় স¤প্রীতি রক্ষার কাজে যেয়ে স›দ্বীপে নিহত।
৩. হাজরা সিং : টাটানগরে মজুর-ধর্মঘটে মালিক পক্ষের ষড়যন্ত্রে নিহত।
৪. বিজয় সেন : ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহি কেন্দ্রিয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে আরো ছয় জন বন্দিসহ মুসলিমলিগ সরকারের গুলিতে নিহত।
৫. কালী ব্যানার্জী : ২৪ পরগণায় কৃষক-আন্দোলন করতে গিয়ে কৃষকের বাড়িতে মৃত্যুবরণ।
৬. প্রিয়দা চক্রবর্তী : পলাতক অবস্থায় কৃষক-আন্দোলন করতে গিয়ে চট্টগ্রামে মৃত্যুবরণ।
৭. ভূপেন ভট্টাচার্য (হিটু) : ময়মনসিংহের হাজং এলাকায় লড়াইয়ের ময়দানে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ।
৮. ধন্বন্তরি : কাশ্মির কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। পার্টির কাজে গ্রামাঞ্চলে মৃত্যুবরণ।
৯. সুরেন ধর চৌধুরী : পশ্চিম বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা। মিছিলের মধ্যে আততায়ীর ডাণ্ডায় গুরুতর আহত এবং পরে হাসপাতালে মৃত্যু।
আন্দামান জেলজীবন সম্পর্কে আলোকপাত করতে যেয়ে ডা. কেশব চন্দ্র সমাজদার লিখেছেন-‘১৯৩২ সালে আমি আন্দামানে গিয়ে পৌঁছি। গাড়ি থেকে বের করে আমাদের আলাদাভাবে রাখা হল। ১৪ দিন পর ভ্যাক্সিন দিয়ে অন্যান্য কয়েদিদের সঙ্গে মিশতে দেওয়া হয়। একেকজনকে একেক সেলে রাখা হত। ৪/৫ শত রাজবন্দি ছিলাম। জেল অথোরিটি আমাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করতেন না। লবণ জলে গোসল করতে হত। খাওয়ার জল ছিল সীমিত। ঘুম হত না রাতে। মশার জন্য কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাতে হত। খাওয়াও ছিল নিম্নমানের। আমাদের প্রতিনিধিরা জেল অথোরিটির কাছে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তাতেও কোনো সুযোগ-সুবিধা মেলেনি। অবস্থা পাল্টাতে অনশন করেছিলাম আমরা। ৩৫ দিন পর শরৎবসু ও গান্ধিসহ অনেকের অনুরোধে অনশন ভাঙ্গেন সকলে।’ নলিনী দাস কেশব চন্দ্ররা যখন আন্দামানে তখন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল। যার রেশ বইছিল আন্দামানের সেই নির্জন সেলগুলোতে।

কারাভাষ্যে শিশু-কিশোর প্রসঙ্গ
বাইরের জগতের অনেক মানুষ হয়ত বিশ্বাস করতে চাইবেন না, জেলের বিরাটসংখ্যক বাসিন্দা নিরপরাধ। যার মধ্যে শিশু-কিশোররাও আছে। বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৮২ ধারা মতে সাত বছরের কম বয়সের কারও বিরুদ্ধে কোনো অপরাধে মামলা দায়ের আইনসঙ্গত নয়। একই বিধির ৮৩ ধারা মতে সাত বছরের বেশি এবং ১২ বছরের কম বয়সের কোনো শিশু বা কিশোরের কোনো কাজকে অপরাধমূলক বলে গণ্য করা যাবে না। এসব আইনের উলে­খ করে সাংবাদিক বোরহান আহমেদ তার কারাস্মৃতিতে জানাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় সময় গড়ে পাঁচ শত শিশু-কিশোর থাকে বন্দি অবস্থায়। কেউ শাস্তি ভোগ করছে, কারও মামলা চলছে। প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিকতা ও দায়িত্বহীনতায় কিভাবে শিশু-কিশোরদের দ্বারা জেল ভরছে তার একটি কেসস্টাডি দিয়েছেন বোরহান আহমেদ।
ছেলেটির নাম বাসেত। বয়স ১০ কি ১১ হবে। গায়ের রঙ শ্যামলা। পরনে হাফপ্যান্ট আর গায়ে ময়লা একটা গেঞ্জি। নীলক্ষেতের একটা ঝুপড়িতে ওরা থাকত। দু’ভাই আর মাকে নিয়ে ছিল সংসার। মা কোনো বাড়িতে হয়ত ঝি’র কাজ করেন। দিনান্তে এক বাসন ভাত আর কিছু তরকারি নিয়ে আসেন। ওই খেয়ে রাত কাটায় দু’ভাই। দিনের বেলায় ওরা ফুল বেচে; বেচে ফুলের মালা। আর মা’র দিনটা কাটে অন্যের বাড়ি রান্নাবান্নার কাজ করে।
অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও বাসেতের ঘুম ভেঙেছিল কাকডাকা ভোরে। চুপি চুপি উঠে সে গিয়েছিল ছাত্রাবাসের বাগানে ফুল ছিঁড়তে। রকমারি ফুল দিয়ে ও মালা গাঁথত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল­াহ হলের সিঁড়ির গোড়ায় বসে। তারপর বেচত সে মালা। এলিফ্যান্ট রোডে সিগন্যাল পয়েন্টে গাড়ি থামলে গাড়ির কাছে যেয়ে ও মালা ধরত। এগিয়ে দিত ফুল। কেউ দয়া করে নিত এক-আধটা, কেউ ধমক দিত। কেউ আবার তেড়ে আসত। এমনিভাবেই ওর দিন কাটত। সন্ধ্যা হলে ঘরে ফিরত কোনো দিন ৮/১০টা টাকা নিয়ে। মা’র হাতে তুলে দিত টাকাটা। ওতেই ওর মা খুশি হত। উজ্জ্বল হয়ে উঠত তার মুখ। এমনিভাবে দিন যাচ্ছিল। একদিন বাগানে ঢুকতেই দারোয়ান ওকে ধরে ফেলল। ভীষণ মার দিল। এর আগেও দু’একবার ধরা পড়েছিল। মারও খেয়েছে। কিন্তু কখনও আটকিয়ে রাখেনি। ঐ দিন দারোয়ান বাসেতকে আর ছাড়ল না। পুলিশের হাতে তুলে দিল। পুলিশ নিয়ে গেল থানায়। দিন আর রাতটা বাসেতের থানায়ই কেটেছিল। পরের দিন ওকে চালান করেছিল কোর্টে। সেখান থেকে বাসেতকে আনা হয়েছে জেলখানায়। সেই থেকে বাসেত জেলে আছে। বাসেতের সঙ্গে ঐ সেলে আর যারা আছে তাদের সকলের বয়সই বিশ বছরের কম। প্রথম ক’দিন কিছু খেতে পারেনি বাসেত। দিন-রাত কেঁদেছে শুধু। মা’র কথা মনে হয়েছে। মনে হয়েছে ওর ভাইর কথা। দশ দিন পার হয়ে গেছে। কেউ খোঁজ করেনি। খোঁজ করবেই বা কে? মা ছাড়া আর কেউ নেই। ওর মা জানবেই-বা কি করে? ও ভয় পায়, আর যদি কোনো দিন এই জেলখানা থেকে বের হতে না পারে? ওর মাকে যদি কোনোদিন না দেখতে পায়? এই তো বাংলাদেশ রাষ্ট্রে মানবতা। এই তো অপরাধ দমনের বিদ্যমান বিধান।
মীনাক্ষী সেনের মন্তব্য : আমাদের সঙ্গে যে শিশু-কিশোরদেরই দেখা হয়েছে, আমরা জিজ্ঞাসা করেছি-দেখেছি দু’একজন বাদ দিলে প্রায় সকলেই তাদের বাড়ির নিশানা বা হদিস বলতে পারে। সে নিশানা শুনে খোঁজ করলে শিশু বা কিশোরিটির বাড়ি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল।
জেলে বছরের পর বছর বিপুলসংখ্যক শিশু-কিশোর আটক রাখা হলেও তাদের সুস্থ বিকাশের কোনো ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে শিক্ষার সুযোগ নেই। ১৯৮২-তে যশোর কেন্দ্রিয় কারাগারে থাকা কর্নেল শওকত আলী লিখেছেন-যশোর কেন্দ্রিয় কারাগারের কয়েদিদের জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। বিদ্যালয়টি আপাতত সংশোধনমূলক কর্মসূচির কেন্দ্র হিসেবে শিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু বাইরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যা পড়ানো হয়, এখানে তা হয় না। কারণ বইয়ের অভাব, কাগজের অভাব ইত্যাদি। ছাত্রদের বসার জন্য কোনো বেঞ্চ নেই, যা অতি সহজেই কারাগারে তৈরি করা যায়। কর্তৃপক্ষ একজন শিক্ষক নিয়োগ করেছে। তার দুরবস্থা দেখে ব্যথিত হতে হয়। ভদ্রলোক বিএ পাস। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেতনক্রম তার বেলায় প্রযোজ্য নয়। কারণ সে কারাবিভাগের কর্মচারি। নিম্নমান সহকারির চেয়েও কম বেতন দেওয়া হয় তাকে। তার কোনো পদোন্নতির সুযোগ নেই। কারাবিভাগের অন্যান্য কর্মচারির ঐ সুযোগ আছে। বিদ্যালয় ছাড়াও মাস্টার সাহেবকে কারা লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ানের দায়িত্ব পালন করতে হয়, ফলে বিদ্যালয়ের অবস্থা খুবই করুণ।

আমলাতান্ত্রিক অ-ব্যবস্থাপনা, বিনাবিচারে আটক
জেলখানায় মজার ব্যাপার হচ্ছে থাকার জায়গাটা নোংরা, এবড়ো-থেবড়ো, অপরিচ্ছন্ন। কিন্তু রাস্তার দুপাশে সুন্দর করে চুন লাগানো। গাছগুলো পর্যন্ত কেটে পরিপাটি করা। আর গাছের গায়েও তিনফুট পর্যন্ত চুনকাম করা।
কারাসাহিত্য পর্যালোচনা থেকে স্পষ্ট জেল কখনোই এ অঞ্চলে সংশোধনাগার ছিল না। ছিল দমননীতির বড় এক হাতিয়ার। ‘বড়জোর, পঞ্চাশজন থাকতে পারে যে ঘরে সেখানে পাঁচশো বন্দি গরু-ছাগলের মতো গাদাগাদি করে শুয়ে থাকে। এর মাথা ওর পায়ের তলে, এর পা ওর পেটের ওপর। সেই খোঁয়ারে অসহায় শিশুদের স্থান হয় পায়খানার কাছে। পায়খানা বাথরুম ভরে মেঝেতে উপচে পড়ে সেখানেই শুয়ে থাকতে হয় ওদের। ফলে গায়ে থিক থিক করে ঘা। পুঁজ গড়িয়ে পড়ে মাথা বা কান বেয়ে। জামা-প্যান্ট কিছু নেই। শত ছিদ্র একটা প্যান্ট, নোংরা ছেঁড়া একখানা ফ্রক মাত্র সম্বল করে শিশু-কিশোররা কাটায় শীত ও গ্রীষ্ম।’ এ বর্ণনা মীনাক্ষী সেনের। তিনি আরো লিখেছেন-জেলে পোকা ধরা ছোলা খেতে খেতে মনে হত বোধহয় কোনো দিন পোকা ছাড়া ছোলা ছিল না। হয়ও না। জেলে অনেক নিপীড়ন ও হয়রানি হয় স্রেফ শুধু শুধু। দাপট দেখানোর মনোভাব, আমলাতান্ত্রিকতা, অ-ব্যবস্থাপনা এসব হয়রানির মূল উৎস। এমএন রায়ের মতো ব্যক্তিত্বকে জেলে লেখালেখির জন্য মাসে এক পাতা কাগজ দেওয়া হত। রায় সেই কাগজটির কিছু অংশ ব্যয় করতেন চিঠি লিখতে বাকিটা বিভিন্ন ধরনের লেখার জন্য। জেল থেকে প্রেমিকাকে লেখা তার চিঠিগুলোর ওপর ব্রিটিশ ও জার্মান উভয় সরকার কাঁচি চালাত। এমএন রায় তার জেলের চিঠিতে লিখেছেন, উপমহাদেশের সমাজ আজও পঞ্চদশ শতাব্দিতেই দাঁড়িয়ে আছে। আর আমাদের সমস্ত সমস্যাই নিহিত সেই সামাজিক জড়তায়।
রায় ১৯৩৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর দেরাদুন জেল থেকে প্রেমিকাকে লিখেছেন, ‘বন্দিদের যখন এক জেল থেকে আর এক জেলে নিয়ে যাওয়া হয় তখন তাদের পরানো হয় মোটা লোহার বেড়ি। জনাসাধারণের কাছে ঐ অবস্থায় প্রদর্শিত হওয়াটা ন্যাক্কারজনক।’ ৬০ বছর পর আজকের বাংলাদেশেও ব্রিটিশদের এ কালচার রয়ে গেছে। তা কি স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের লজ্জার নয়।
খোদ আজকে ঢাকা জেলের অবস্থা সম্পর্কে বোরহান আহমেদ লিখেছেন-ঢাকা কেন্দ্রিয় কারাগারে জুমার নামাজ পড়া নিষিদ্ধ। শুধু জুমার নামাজের কথাই-বা বলি কেন? আসলে তো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার ওপরও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। এ নিষেধাজ্ঞা কে কবে জারি করেছেন তা অবশ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনিটি এরকম: এক ‘মিয়াসাব’ (প্রহরি) পশ্চিম পাশের দেয়ালের কাছে আছরের নামাজ পড়ছিলেন। এমন সময় কারাগারের একজন কর্মকর্তা সেখানে এসে হাজির। ‘মিয়াসাব’কে নামাজ পড়তে দেখে তিনি দারুণভাবে ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠলেন। কাছে গিয়ে তার পাছায় বুট দিয়ে এমন একটা লাথি মারলেন-‘মিয়াসাব’ ৫/৬ হাত দূরে ছিটকে পড়লেন। তারপর ঐ মিয়াসাব জেলখানায় আর কোনোদিন নামাজ পড়েননি। ঘটনাটি আজও ‘২৬ সেলে’র অনেকের মনে রেখাপাত করে আছে।

নিপীড়ন আছে, আছে সংগ্রামও
জেলের অবস্থা সহনীয় করতে এ-অঞ্চলের কারাগারগুলোতে বন্দিদের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস বেশ পুরোনো এবং সমৃদ্ধ। অনেক আন্দোলনের সমাপ্তি ছিল বেদনাদায়ক। জেলে সাধারণত অসহায় বন্দিদের কাছে উপেক্ষা ও জুলুমের প্রতিবাদের অন্যতম অস্ত্র হয়ে থাকে অনশন। অতীতে এবং বর্তমানেও ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত দাবি মানাতে কারাবাসিরা অনশন করেন। অনশন শুরু হলেই জেল কর্তৃপক্ষ জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করে থাকে। নাকের ভেতর নল দিয়ে খাবার ঢোকানোর এই প্রচেষ্টায় মারা যায় অনেক বন্দি। খাবার ফুসফুসে চলে গেলেই মৃত্যু ঘটে।
জেলের অবস্থা উন্নয়নের জন্য ৬৩ দিনের এই রকম এক অনশনে ১৯২৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর লাহোর জেলে বিপ্লবি যতীন দাস মারা যান। একই সময়ে আন্দামানেও ফোর্স ফিডিং-এ কয়েক জন রাজবন্দি মারা যায়। পাকিস্তান শাসনামলে ১৯৫০ সালে ঢাকা জেলে কুষ্টিয়ার শিবেন রায় অনশন করে জীবন দেন। তবে কোনও কাগজে সেদিন শিবেন রায়ের মৃত্যু কিংবা রাজবন্দিদের এই অনশন ধর্মঘটের খবর খাপা হয়নি। এসব সংগ্রামি মৃত্যুর দাবি ছিল একটি-বন্দি এবং রাজবন্দিদের ন্যূনতম সুবিধাদি বাড়ানো। যতীন দাসের মৃত্যুর পর ইংরেজ সরকার ব্যাপক নিন্দার মুখে ‘কারাসংস্কার’ নামে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। পরবর্তীকালে তার কিছু সুপারিশও বাস্তবায়িত হয়।
জেলে অনশন কিংবা অন্য যেকোনো আন্দোলনই হোক-তাতে থাকে নির্যাতনের ঝুঁকি। তারপরও বন্দিরা কেন এ ঝুঁকি নেয়? নেয় আসলে তাদের অবস্থার কারণে। জেলে বন্দিদের অবস্থা বর্ণনা করতে যেয়ে কর্নেল শওকত আলী লিখেছেন-‘অনাবৃত গায়ে নেংটি ও গামছা পরা অবস্থায় অনেক কয়েদিকে এক সঙ্গে দেখলে আদিম যুগের চিত্রই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নিকৃষ্টতম এ্যালুমিনিয়ামের তৈরি একটা থালা ও একটা বাটি দেওয়া হয় সাধারণ বন্দিদের। পানি পান করা, খাওয়া-দাওয়া, হাত-পা ধোয়া, গোসল করা, পায়খানা প্রস্রাব করা-সব কিছুই তা দিয়ে করতে হয়। আবার থালা বা বাটি মাথায় দিয়ে ঘুমোতেও হয়। তাই কারাগারে একটি প্রচলিত বাক্য আছে-‘থালা বাটি কম্বল, জেলখানার সম্বল।’
এই সম্বল নিয়েই ব্রিটিশ কারাবন্দিরা যখন অনশন করতেন তখন বাইরে রাজনৈতিক নেতারা, বিশেষ করে শরৎ বসু অনেক আন্দোলন করেছেন। কিন্তু পাকিস্তান শাসনামলে এবং বাংলাদেশ হওয়ার পর কারাবাসিদের সংগ্রামে বাইরের রাজনৈতিক সাড়া একেবারেই নগণ্য। সমসাময়িককালে খুলনা, ঢাকা ও যশোর বিদ্রোহের সময় আমরা তা দেখেছি। কারাসংস্কার এখনো শক্তিশালি এজেন্ডা নয়।
কারাগারে কোনো আন্দোলন পরাজিত হলে পরিণতি হয় ভয়াবহ। অধিকাংশ বন্দিকে তখন নির্মম সাজা ভোগ করতে হয়। এই ‘সাজা’ সম্পর্কে জিতেন ঘোষ লিখেছেন-কয়েদিকে সাজা দেয়ার বহুবিধ পন্থা ও যন্ত্রপাতি ছিল। এখানেও আবিষ্কারকদের মৌলিকত্ব রয়েছে। হাতকড়া, দাঁড়ানো অবস্থায় বা নিদ্রায় পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি, শিকলবেড়ি, আউড়াবেড়ি, পরনে চট, মার্কা কাটা, ডিগ্রি বন্ধ করা, ফেন খেতে দেওয়া, কম্বল ধোলাই ইত্যাদি আরও বহু রকম শাস্তি ছিল। সর্বোপরি ছিল বেত মারা। এই সময়ে জেলের মধ্যে আইনভঙ্গকারি কয়েদিকে জেলে বড় সাহেবই বেত মারার হুকুম দিতে পারতেন। বেত মারা একটা বিভৎস ব্যাপার। ক্রসের মতো এক খণ্ড কাঠে কয়েদিকে হাত-পায়ে কড়া দিয়ে আটকে দেওয়া হত। কোমরে বেঁধে দেওয়া হত চামড়ার বেল্ট। যিশুকে ক্রসে যে অবস্থায় দেখা যায় অবিকল সেই রকম। তার পরে উলঙ্গ করে মারা হয় বেত-কোমরের পিছনের দিকে নিচের নরম মাংসের ওপর। প্রতিটি বেতের আঘাতে মাংস কেটে রক্ত বেরুত। তিন চারটি আঘাতের পরেই বেহুঁশ হয়ে পড়ত কয়েদি।
এই বেহুঁশ কয়েদিকে আবার যখন সেলে নেওয়া হয় তখন একটু জল খেতে চাইলেও দেওয়ার উপায় থাকে না। মীনাক্ষী সেন লিখেছেন-বন্দি মানুষকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়াকে ‘চালান’ বলে। এই চালানের মানুষগুলো ওয়ার্ডে ঢুকেই পানি চায়। কিন্তু কোথায় পাওয়া যাবে পানি? সেটা রাখার যে কোনো ব্যবস্থা নেই। পাত্র বলতে আছে এক এবং অদ্বিতীয় থালা। ওতেই ভাত খাও, ওতেই পানি খাও। কল থেকে ধরাবাধা সময়ে পানি পাওয়া যায়। এর বাইরে তেষ্টায় পানি মেলে না সেখানে। থালায় করে এক থালা পানি নিয়েই হয়ত সবাই সেলে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপের প্রভাবে সে পানি হয়ত অনেক আগেই খরচ হয়ে গেছে কিন্তু বিকেলে নির্দিষ্ট সময় না হওয়া পর্যন্ত পানি পাওয়া যাবে না।

সাক্ষাৎকার, হাসপাতাল ও সমকামিতা প্রসঙ্গে
উপরে কারাগার সম্পর্কিত যেসব বইয়ের উলে­খ করেছি তাতে সাক্ষাৎকার ব্যবস্থা, হাসপাতালসহ নানা বিষয়েই আলোকপাত করা হয়েছে।
কারাগারে ‘দেখা’ সকল বন্দিদের প্রত্যক্ষিত ঘটনা। আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর ছাড়াও বাড়ি থেকে আনা কিছু খাবারও মিলে ‘দেখা’ থেকে। অধিকাংশ কারাবন্দিরই ‘দেখা’ আসে না। কারণ আসা-যাওয়ার খরচ এবং কারা-কর্মচারিদের সেলামি সংগ্রহ করে অনেকের স্ত্রী-পুত্র বা বাবা-মা দূর-দূরান্ত থেকে আসতে পারে না। তাছাড়া সাধারণ বন্দিদের দেখা হয় লোহার রড ও নেটের ফাঁক দিয়ে। দু’পাশে লোহার নেট বা জাল, মাঝখানে লোহার রড। লোহার রড থেকে নেটের দূরত্ব থাকে দুই ফুট। লোহার নেটের ভেতর দিয়ে কেউ কারো মুখ ভাল করে দেখতে পারে না। এরই মাঝে একসঙ্গে হয়ত দশজনের দেখা হচ্ছে। সবাই কথা বলছে। সাক্ষাতপ্রার্থী ও বন্দি ঠিকমতো কেউ কারো কথা ভালভাবে শোনে না এবং বোঝে না। অধিকাংশ কারাভাষ্যে এ ধরনের বিবরণ আছে। লিখেছেন কর্নেল শওকত আলীও। তাঁর ভাষায়, বন্দিদের সাক্ষাত বা দেখা করার জন্য অবৈধ লেনদেন প্রচলিত বিধানে পরিণত হয়ে গেছে। ডিভিশন বন্দিদের জন্য ৭দিনে একদিন (কোনো কোনো কারাগারে ১৫দিনে একদিন) এবং সাধারণ বন্দিদের জন্য ১৫ দিনে একদিন (কোনো কোনো কারাগারে ৩০ দিনে একদিন) ‘দেখার’ বিধান আছে। কিন্তু সাধারণ বন্দিদের এ অধিকার ভোগ করতে টাকা খরচ করতে হয়। আবার বেশি টাকা খরচ করতে পারলে নিয়মের বাইরেও দেখা হতে পারে। এমনকি বন্দিকে ডেকে এনে সাক্ষাতপ্রার্থীর সঙ্গে অফিসের ভিতরেও দেখা করানো হয়, যাকে কারাগারে অফিস কল বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। টাকাটা অবশ্য সাক্ষাতপ্রার্থীরাই খরচ করে।
সাক্ষাতকার সমস্যার মতো আরেক দুর্ভোগ পোহাতে হয় জেলে শারীরিক অসুস্থতার সময়। বিনা চিকিৎসায়, ইচ্ছাকৃত অবহেলায় এখানে এমন অনেক মৃত্যু ঘটে-যাকে বলা হয় ঠাণ্ডা মাথায় খুন।
বন্দিদের অধিকাংশ শারীরিক সমস্যার উৎস কারা পরিবেশ ও অপ্রতুল খাবার। মীনাক্ষী সেন খাবার সম্পর্কে লিখেছেন, ‘অসহ্য একঘেয়ে খাবার। সেই পোকা ধরা তেতো গুড়ি গুড়ি ছোলা; লাউ-কুমড়া ঢ্যাঁড়োসের অদ্ভুত ঘ্যাঁট, ভূষির রুটি; রোজ, প্রতিদিন। প্রতিটি দিন। কোনো ব্যতিক্রম নেই। তিনটি রুটি মাথাপিছু- একটার বেশি খেতে পারে না কেউ।’ রানী চন্দ লিখেছেন, ‘ভাত টিনের থালায় পড়ে ঝনঝন করে উঠত।’
ইট, পাথর মেশানো এসব খাবার থেকে হত অনিবার্য শারীরিক সমস্যা। কিন্তু চিকিৎসা মেলে না সবার বরাতে। চিকিৎসক, বেড সবই আছে, কিন্তু চিকিৎসা নেই। রোগিদের নামে বরাদ্দ ওষুধ পাচার হয়ে যায়। শয্যাগুলো ভরে থাকে সুস্থ মানুষে। এই সুস্থ মানুষেরাই রোগির পথ্য হিসেবে আসা দুধ, ডিম, কলা, মাখন খায়। এরও অর্ধেক বাইরে যায়। বোরহান আহমেদ লিখেছেন, অবস্থাপন্ন কয়েদিদের অনেকেই জেল কর্মচারিদের মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে জেল হাসপাতালে থাকার ব্যবস্থা করে নেন স্থায়ীভাবে। কেউ কেউ মাসের পর মাস জেল হাসপাতালে কাটাচ্ছে। প্রতি মাসে সিটের জন্য তাদের পাঁচশত থেকে দু’হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।
একই ভাষ্য মেলে বিবি বিশ্বাসের বর্ণনা থেকে। তিনি লিখেছেন, ‘অন্যায়ভাবে টাকা উপার্জনের শত সহস্র পথ আছে জেলের মধ্যে। মনে হয়, জেলের প্রতিটা ইটও টাকার জন্য হা করে থাকে। জেলের ঊর্ধ্বতন প্রশাসনও অনেক সময় এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।’
জেলের আরেক সমস্যা সমকামিতা। ‘জেলের সব ঘরেই সন্ধ্যা থেকে অতি মৃদু আলো জ্বলে। রাতেও এই আলো নেভানো হয় না। এই আলোর মধ্যেই সারারাত ধরে এসব কাণ্ড চলে। শিশুদের সামনে, কিশোরদের সামনে, বৃদ্ধদের সামনে, সকলের সামনে।’ হ্যাঁ, জেল ব্যবস্থাটি তার সকল নোংরামি সত্তে¡ও দিব্যি টিকে আছে, আমাদের সকলের সামনে।

বর্ষ ১, সংখ্যা ১, ফেব্র“য়ারি ২০০২

শেয়ার করুন: