004637
Total Users : 4637
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
জন্ম— জুন, ০৬, ১৯৭৭। জন্মস্থান— উত্তর গোবীন্দর খীল, হাঁদু চৌধুরী বাড়ী, পটিয়া, চট্টগ্রাম। (শৈশব কৈশোর ও তারুণ্যের সময়যাপন) বেড়ে ওঠা (পূর্ব্ব বালিয়াদী, মীরশ্বরাই, চট্টগ্রাম) নানার বাড়ীতে। প্রকাশিত কবিতার বই— ফুলেরা পোষাক পরে না (সাল: ২০১৮, প্রকাশক : মনফকিরা, কলিকেতা)। প্রকাশিতব্য বই— অর্দ্ধনারীশ্বরবাদ : প্রকৃতিপুরুষতত্ত্ব (নন্দনতত্ত্ব), বটতলার বয়ান (ভাষাতাত্ত্বিক গদ্য) ও উদ্ভিদপ্রতিভা (কবিতা)। সম্পাদক— চারবাক।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

রিসি দলাই’র সাক্ষাৎকার – দেয়ালের ওপারে আকাশই আমাদের অন্বিষ্ট

দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানবিরোধি প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে প্রকাশিত হয়ে আসছে ‘চারবাক’। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় উজান বেয়ে চলতে চলতে এ পত্রিকাটি তৈরি করে নিয়েছে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। এ পত্রিকাটির সম্পাদনার দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন কবি রিসি দলাই। ছোটকাগজটি এবার ‘লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ পুরস্কার ২০১০’-এ ভূষিত হয়েছে। ‘লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ’র সাথে আলাপচারিতায় উঠে এসেছে পত্রিকাটির নানা ঘাত-প্রতিঘাতের প্রকৃত স্বরূপ। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন আমিনুল রানা।

লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: দীর্ঘদিন ধরে আপনারা ‘চারবাক’ করছেন। হঠাৎ করেই ২০১০ সালে এসে ‘চারবাক ইশতেহার’ ঘোষণার কারণ কি, অন্যভাবে বললে এতোদিন পর ইশতেহারের দরকার হলো কেন? বিস্তারিত জানতে চাই।
রিসি দলাই: এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় শক্তি-ভারসাম্য নানা কারণেই বিপর্যস্ত, ধ্বংসপ্রাপ্ত। মানবিক মূল্যবোধ ক্ষয়প্রাপ্ত। রক্তনেশার উন্মাদনা মানুষকে পেয়ে বসেছে, ছলচাতুরি, আগ্রাসন, অস্ত্র-পেশির সীমাহীন বিস্তারে বিবেকের ক্ষয়প্রাপ্তি ঘটছে অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায়। এতো গেল মানবিক বিপর্যয়। অন্যদিকে পুঁজির সীমাহীন লাম্পট্য ব্যক্তিপর্যায়ে মানুষকে একক, নিঃসঙ্গ করছে। রুদ্রপ্রলয় তাণ্ডবে ব্যতিব্যস্ত রাখছে। এরজন্য নানা ভোগের আয়োজন মহাসমারোহ চলছে উৎসবের মেজাজেই। কর্পোরেট পুঁজির অঢেল প্রাচুর্য বিস্তার ছড়িয়ে দেয়া অর্থ, মেধা, শ্রম কাজে লাগছে ভালভাবেই। আকাশসংস্কৃতিকে তাবে রাখতে যেমন আকাশব্যাপি ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে অন্তর্জাল, ভূ-উপগ্রহ প্রযুক্তিকে কব্জা করে মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে প্রযুক্তিগত ফাঁস, নানা কায়দা কৌশলে মুদ্রণ-তথ্য-কম্পিউটারকে কাজে লাগানো যাচ্ছে। ছাপার হরফে মানুষের বিশ্বাস-আস্থা দীর্ঘকালিন। ইন্টারনেট, রেডিও, টিভি চ্যানেল দৈনিক-সাপ্তাহিক-পাক্ষিক কর্পোরেট-পুঁজির প্রচারের ভূমিকায় সহযোগি হিসেবে কাজ করছে। কর্পোরেট পুঁজির প্রধান বিষয়ই ভোক্তা। সম্মানিত ভোক্তাকে ঠকাতে, আরেকটু ভদ্রভাবে বললে গছিয়ে দিতে চেষ্টা চলে নিরন্তর। প্রচার প্রচারণা গুণে আশাব্যঞ্জক সাড়াও মেলে। পিছিয়ে পড়া মানুষ হিসেবে উন্নতবিশ্বের খেতাবে তৃতীয়বিশ্বে পরীক্ষা-নিরিক্ষা চলে। অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারি এইসব দেশগুলোর উপর শ্যেনদৃষ্টি সেতো অনেকদিনের। পশ্চিমা দেশগুলো কখনো কৌশলে, কখনো সভ্যতার দোহাইয়ে, কখনোবা স্রেফ মারণাস্ত্রের সাহায্যে দখল-লুণ্ঠন সম্পদের পাচার আকছার ঘটনা। সা¤প্রতিক উদাহরণ কম নয়। তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের মানুষকে যেমন বোমা-গুলি খেতে হচ্ছে, তেমনি হত্যা করা হচ্ছে শিশু-নর-নারি। ধ্বংস করা হচ্ছে প্রকৃতি, বিশাল প্রাকৃতিক ভাণ্ডার। জিনতত্ত¡কে কাজে লাগিয়ে জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান স্ফীতির কথা বলে বিজভাণ্ডারকে এরই মাঝে তুলে দেয়া হয়েছে কর্পোরেট কোম্পানির হাতে। তেল-গ্যাস প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়েতো নাটকের খামতি নেই। এখেলায় নট যেমন শাসকশ্রেণি, তেমনি শাসনক্ষমতার বাইরে আছেন যারা তারাও। বোমার আঘাতে নিঃস্ব ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে প্রাচিন সভ্য জনপদ। বিশ্বনাগরিক হিসেবে আপনি চাইলেও এখেলা থেকে রেহাই পাবেন না। কোনো-না-কোনো ভাবে আপনাকে এখেলার অংশবাক হয়ে যেতে হচ্ছে। সোভিয়েত রাশিয়ার পতন মানবসভ্যতার জন্য সিমাহীন ক্ষতি। শুধুমাত্র সাম্রাজ্যবাদি আগ্রাসি শক্তির কারণে নয়, অন্য কারণেও। বৈশ্বিক শক্তিসাম্য নষ্ট হওয়ায় একক শক্তির কবলে পড়ে গেছি আমরা। বিশ্ব এখন একক নির্দেশে বাঁদর নাচ নাচছে। আমেরিকা পৃথিবীর প্রভু হয়ে বসেছে।
এতদঅঞ্চলের দেশগুলো দীর্ঘদিন উপনিবেশিক শাসনের অধিনে ছিল। ভাবনা-চিন্তা-মনন-শিক্ষায় উপনিবেশিক প্রভাব রয়ে গেছে এখনো। স্বাধিনতার ৪০বছর অতিক্রম করছি আমরা। প্রত্যক্ষ পরাধিনতা হয়তো এখন নেই, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদি লুটেরাশক্তির দাপট আধিপত্য রয়ে গেছে। স্বাধিনতার দীর্ঘকাল পরেও আমরা অনেককিছুতেই এখনো নিজেদের মতো করে গুছিয়ে নিতে পারিনি। চিন্তাচেতনা কর্ম ভাবনা প্রয়োগে। শেকড় সন্ধানে আমাদের প্রতœখনন আরাধনা চলছে অনেকটা নিরবেই। ‘চারবাক’ এইসব বিষয় নিয়ে ভাবে, দেশজ নিজস্বতা তুলে আনে। একথা ঠিক ‘চারবাক’ বের হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু ইশতেহার প্রকাশিত হয় ১৩ আগস্ট ২০১০-এ এসে। আমরা মনে করি এতদিন ধরে যে বিষয়গুলো নিয়ে ভেবেছি, কাজ করেছি তার একটি সামগ্রিক রূপ দেয়া দরকার। ইশতেহার আকারে বিষয়গুলো প্রকাশিত হলেও এইসব বিষয় নিয়ে ভাবনা দীর্ঘদিনের। প্রতিটি সংখ্যার পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে চিন্তার এই বিস্তার। সভ্যতার ইতিহাসে ইশতেহার কিন্তু নতুন নয়। পৃথিবীব্যাপি চিন্তারাজ্য ইশতেহারকে সামনে রেখেই এগোয়। সেটি রাজনৈতিক দলিয় ইশতেহার হতে পারে, হতে পারে ব্যক্তিগতও। ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’ বিখ্যাত ঘটনা ইতিহাসে। গত নির্বাচনে আওয়ামিলিগের ইশতেহারও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। দুঃখিত এই মুহূর্তে নাম মনে করতে পারছি না-চিনের একজন লেখক ব্যক্তিগত ইশতেহার রচনার দায়ে স¤প্রতি (২০১১ সাল) দেশ থেকে বহিষ্কৃত হন শাসকগোষ্ঠির কোপানলে পড়ে। বাংলাদেশে যে কয়টি ইশতেহার প্রকাশিত হয়েছে- স্বাধিনতা আন্দোলন, রাজনৈতিক কিংবা নির্বাচনি সবগুলোর লক্ষ এবং উদ্দেশ্য ছিল বলেই তা প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে আশির দশকে কবিতাকর্মিদের কবিতা বিষয়ক ইশতেহারের কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। কলকাতায় পঞ্চাশ ষাট সত্তর দশকে ইশতেহার প্রকাশের ঘটনা এখনো অতীত হয়ে যায়নি। তবে ‘চারবাক ইশতেহার ২০১০’ নানা কারণেই একটু আলাদা। কারণ ‘চারবাক’-ই প্রথম সাহিত্যকে বৈশ্বিক পুঁজিবাদি কর্পোরেট বিশ্বের সাথে মিলিয়ে, রাজনৈতিক সচেতনতা উদ্ঘাটনের চেষ্টা চালাচ্ছে চলমান সাম্রাজ্যবাদবিরোধি আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণার মাধ্যমে।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: ‘চারবাক’ করছেন কেন? আমাদের জানামতে ‘চারবাক’ একটি সম্পাদনা পর্ষদ কর্তৃক পরিচালিত হয়। এসম্পর্কে বলবেন কি?
রিসি দলাই: শিল্পের জন্য শিল্পচর্চা করি না আমরা। ‘চারবাক’ বরাবরই রাজনৈতিক চেতনা বিশ্লেষি কাগজ। বিপ্রতিপ চিন্তার কাগজ। দেশজ আকাক্সক্ষার সাথে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট মিলিয়ে নিজস্ব অবস্থানে বোধ ও বোধির সংশ্লেষ ঘটাতে আগ্রহি। অস্থির সময়ের নির্বাক দর্শক হতে পারি না। রক্তক্ষরণ, ক্লেদ, জুগুপ্সা, একাকিত্বের অদ্ভুত পুঁজিবাদি সভ্যতায় স্নাত মনন ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়েও বাঁশি বাজাতে চায়। পুঁজির ক্রমস্ফীতি লক্ষ করে বেকন বলেছিলেন, জ্ঞানই শক্তি। স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন তিনি জ্ঞানের শক্তি যার হাতে আগামি পৃথিবী হবে তাদেরই করায়ত্ব। অপরদিকে গ্রিক দার্শনিক বলেছিলেন, মানুষই সবকিছু নির্ণয়ের মাপকাঠি। তো মানুষ ও জ্ঞানের পরম্পরা, মানুষের উপর মানুষের পুঁজিবাদি বলাৎকার সহজভাবে নিতে পারিনি, বিষয়টি একটু খতিয়ে দেখবার চেষ্টা করেছি। একই প্রশ্ন অগ্রজ দুই সম্পাদক কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন এবং মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকাখ্যাত মীজানুর রহমানকে করা হয়েছিল। খোন্দকার আশরাফ হোসেনের উত্তর ছিল, বেঁচে আছি কেন এটিতো জানতে চাইছেন না। অর্থাৎ যাপিত জীবনের অংশ হয়ে গেছে তাঁর সম্পাদিত কাগজ। মীজান ভাই’র উত্তর ছিল সোজাসাপটা বেঁচে থাকার জন্যই তিনি কাগজ করেন। আসলে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দেয়। ‘চারবাক’ প্রকাশের আগেও আমাদের আরো কয়েকটি কাগজ ছিল। ‘অঙ্গিকার’, ‘তরুণকণ্ঠ’, ‘নান্দী’, বুলেটিন ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’। স¤প্রতি প্রকাশ করছি ‘অযান্ত্রিক’, ‘সরলরেখা’। সবগুলো কাগজই প্রকাশিত হচ্ছে মূলত সাপ্তাহিক পাঠচক্র ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’ অথবা আমাদের রাজনৈতিক প্লাটফর্ম ‘জনঅধিকার আন্দোলন’কে কেন্দ্র করেই। আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’ ১৩ বছরে পদার্পণ করলো। এই দীর্ঘসময়ে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক যে বিষয়গুলো নিয়ে দ্বিধা-দ্ব›দ্ব, তর্ক-বিতর্ক, আপত্তি-অনুরাগ অর্থাৎ পাঠচক্রে যে বিষয়গুলো আলোচনা করেছি তার একটি প্রকাশনারূপ দেয়ার তাগিদেই। সেই তাগিদ থেকেই সংখ্যাগুলোর প্রকাশ। প্রকাশিত সংখ্যার বিষয় লক্ষ করুন, ‘আত্মা ও অস্তিত্বসংকট’, ‘উত্তর-ঔপনিবেশিকতা: তথ্য ও শৃঙ্খল মুক্তির দায়’, ‘রাষ্ট্র, সরকার ও সুশীলসমাজ’, ‘বুদ্ধিবৃত্তিকচর্চা, বুদ্ধিজীবী ও বুদ্ধিজীবীর দায়’, টিপাইমুখ বাঁধ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ কিংবা ক্রসফায়ার, ভারতের বাংলাদেশ সিমান্তে হত্যাকাণ্ড, ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্ট অথবা ইরাক আফগানিস্তান তথা মধ্যপ্রাচ্যের সংকট। চলমান আভ্যন্তরিণ রাজনীতিও গুরুত্ব পেয়েছে। সবশেষ করেছি ‘সরলরেখা’য় ‘ভাষা, বিশ্বায়ন ও ক্ষমতা’ নিয়ে। এটা একটা দীর্ঘভ্রমণ। সাম্রাজ্যবাদ ও আগ্রাসি শক্তি গোষ্ঠি চি‎িহ্নত করার তাগিদ, তাগিদ উত্তর-উপনিবেশিক সময়ে দাঁড়িয়ে উপনিবেশিক কলঙ্কগুলো উন্মোচন করার সরল আকাক্সক্ষা। একটা নৈতিক দায়িত্বও। জাতি হিসেবে নিজেদের চিনবার জানাবার প্রয়োজনও। কবিতা গল্প অনুবাদ সাক্ষাৎকারও চারবাক প্রকাশ করেছে। আরেকটি কথা নতুনদের আগমন। প্রতি সংখ্যায়ই নতুন নতুন লেখক যোগ দিয়েছেন। অনেকের প্রথম লেখা ‘চারবাক’ ছেপেছে গুরুত্ব দিয়ে। এটাও ‘চারবাক’ এর একটি লক্ষ, নতুনের অনুসন্ধান। ফলে ‘চারবাক’ এ অনেক দুর্বল লেখাও প্রকাশ করতে হয়েছে। আসলে ‘চারবাক’ লেখার বিষয়টাকেই গুরুত্ব দেয়, লেখক কিংবা শিল্পমান নয়। আমাদের বিশ্বাস উন্নত বলে দাবিদার পরাশক্তির যদি পতন ঘটে তবে তা হবে একমাত্র জ্ঞানকেন্দ্রিক বিপর্যয়ে। ফলে জ্ঞানের চর্চার বিকল্প থাকে না। দুঃখজনক হলেও সত্যি বাংলাদেশ জ্ঞানের চর্চায় ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে। আরেকটি কথা জরুরি অবস্থা চলাকালিন সময়েও চারবাকে কিন্তু আমরা এর বিরোধিতা করেছি। বলবার চেষ্টা করেছি তৃতীয় বা বিকল্প কোন পথ নয় নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারই সংকট থেকে উত্তরণের উপায়।
‘চারবাক’ গোষ্ঠির কাগজ। চার জন নাহিদ আহসান, মজিব মহমমদ, আরণ্যক টিটো এবং রিসি দলাই বলতে পারেন এর চালিকাশক্তি। প্রতিদিনই এর সাথে যুক্ত হচ্ছে নতুন চিন্তা তরুণ মনন। প্রথম দিকের সংখ্যাগুলোতে সম্পাদনায় নামের পরিবর্তন আছে। ক’বছর ধরে সম্পাদনা পরিবারে চার জনের নাম ছেপে নিচে সম্পাদক হিসেবে আমার নাম ছাপা হচ্ছে। কৌশলগত কারণে, বিতর্ক এড়ানোর জন্যই। ‘চারবাক’ আড্ডাকেন্দ্রিক, আড্ডাকে কেন্দ্র করেই ‘চারবাক’। অনেকেই আড্ডায় এসেছেন সবার লেখা ছাপতে পারিনি, পৃষ্ঠাস্বল্পতা বা অন্যকারণে। যাদের লেখা ছাপা হয়েছে কিংবা হয়নি সবাইকে ‘চারবাকগোষ্ঠি’রই মনে করি।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: কিভাবে ‘চারবাক’ শুরু করলেন? আঁতুর-কথন জানতে চাই।
রিসি দলাই: ঢাকায় এসেছি বটে তবে থিতু হয়ে বসা যাকে বলে তেমন হয়নি তখনো। নাগরিক জীবন, কঠিন দেয়াল, তপ্ত উষ্ণতা, যানজট, দুর্গন্ধ অচেনা অচেনা ঠেকে। উন্মুক্ত উদার প্রকৃতি হাতছানি দিয়ে ডাকে। কথা বলার কায়দা থমকে যায় আঞ্চলিকতায়। খোয়ারি ভেঙে জেগে থাকা, স্বপ্ন বুনন চলছে সবে। রাত জেগে কবিতার চর্চা হয়। জগন্নাথের কলাভবনের সিঁড়ি নিজস্ব অধিকারে চলে এসেছে যদিও। মধুর কেন্টিনে যাওয়া-আসা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতের সূত্রে ছোট্ট একটি পোস্টারে থমকে যায় চোখ। সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের ‘চিন্তার ইতিহাস’ পাঠচক্রের কথা জানতে পারি। চিন্তার ইতিহাস পাঠচক্র কেমন রহস্য রহস্য ঠেকে। নির্দিষ্ট দিনে হাজিরা দেই। সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের বারান্দা-ক্যাফে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদ, মধুর কেন্টিন, চারুকলা আমাদের নিরাপদ অভয়ারণ্য, ততদিনে বেশ জমিয়ে বসেছি বলা চলে। কেন্দ্রে আসা-যাওয়ার সুবাদে পরিচয় হয় অনেকের সঙ্গে। নতুন মুখ নতুন স্বপ্ন নতুন আকাক্সক্ষা, দু’একজন লেখক বন্ধুও জুটে যায়। কেউ কেউ আবার নাটক-চলচ্চিত্র বানাবার স্বপ্ননেশায় উন্মাদ। নিজের লেখা অন্যকে শোনানো; কার লেখা হয়নি, কোথায় দুর্বলতা এই সব চলছে আর কি। চমকে দেয়ার মতো শব্দ-বাক্যও শুনি, মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে যায়। আমাদের কেউ কেউ রোমান্টিক, কেউবা অতিমাত্রায় বিপ্লবি। পাল্টে দেবার স্বপ্ন বিশ্বাসে রঙিন, ভরপুর। ঠিক হয় নিজেদের লেখা, বিশ্বসাহিত্যের সেরা বই নিয়ে একটি পাঠচক্র করার। সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদ নির্ভার মিলনকেন্দ্র। কিছুদিন পাঠচক্র চলার পর মনে হলো একটি কাগজ করা দরকার, নিজেদের মুখপত্র, প্রয়োজনও। আত্মপ্রকাশের উদগ্র আকাক্সক্ষাও হয়তো কাজ করেছে শেষাবধি। ‘নান্দী’ সাতজনের লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয়। ৩ সংখ্যা মাত্র। এগোয়নি, অনেক ব্যর্থতা অপূর্ণতার সহযোগ। বন্ধু মজিব মহমমদ প্রস্তাব করে ভিন্ন নামে আরেকটি কাগজের। তখনো জানতাম না কিভাবে অর্থ পাব। পাঠচক্র চালিয়ে যাবার পক্ষপাতি ছিলাম আমি। সিদ্ধান্ত হলো পাঠচক্র ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’ নামে চলবে সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে প্রতি শুক্রবার সকাল ১০টায়। সেই থেকে চলছে, ১৩ বছর হলো। ভাবলে অবাক লাগে। নতুন কাগজের নাম, লেখক, বিষয় নিয়ে আলোচনা হরদম। কে কোন বিষয় লিখবে, কাকে কাকে রাখা যায় এইসবও। প্রস্তাব আসে প্রথম বুদ্ধিবাদি দার্শনিক স¤প্রদায় চার্বাক এর নামে পত্রিকা করার। নাহিদ আহসান, আরণ্যক টিটো যুক্ত হয় আরো কিছুদিন পর। শুরুতে চারজন হওয়ায় চার্বাক বানানটা একটু পরিবর্তন করে ‘চারবাক’ নামে পত্রিকার নাম ঠিক হয়। নিম্নবর্গিয় প্রান্তিকতায় আগ্রহ ছিল আমার, আকাক্সক্ষা ছিল নিজস্বতা বিনির্মাণের, স্বতন্ত্র পরিকাঠামোয় চি‎িহ্নত, সময়ের কণ্ঠস্বর ধারণে। ১০ বছরে ১৩ সংখ্যা বের হয়েছে ‘চারবাক’ এর। একুশে বইমেলা, ফেব্র“য়ারি ২০১১-তে ১০বছরের প্রকাশিত সংখ্যা থেকে বাছাই লেখা নিয়ে বের হয়েছে ‘নির্বাচিত চারবাক’।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: কারা কারা লিখেন, লেখার ধরনইবা কেমন।
রিসি দলাই: ‘নির্বাচিত চারবাক’ এর সম্পাদকিয় থেকে একটি প্যারা টুকে নেয়া যাক: ‘বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, ডব্লি¬উটিওর মতো সাম্রাজ্যবাদি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রভু হয়ে বসেছে, ঋণের বোঝা বাড়ছে তো বাড়ছেই। বিশ্বায়ন গোলোকায়নের ধাঁধায় নিঃস্ব মধ্যবিত্ত। প্রকৃতি, প্রকৃতির সবুজ, বিজ, গাছ-গাছড়া পেটেন্ট রসায়নের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। ফলে অবাধ অবারিত মুক্ত প্রকৃতির মালিক বনে যাচ্ছে রাতারাতি চিহ্নিত বহুজাতিক কোম্পানি। চিরচেনা সবুজ, প্রকৃতি, লালিত স্বপ্ন ফিরিয়ে আনতে হয়ত একদিন ধর্না দিতে হবে এইসব লুটেরাদের কাছে। শত বছরের ঐতিহ্য কৃষি ধ্বংস করা হচ্ছে জিন প্রযুক্তির দোহাইয়ে। উন্নত চাষ, অধিক ফলনের লোভে হারিয়ে যাচ্ছে বিশাল বিজভাণ্ডার। কৃষি, গাছগাছড়া, প্রাণ ও প্রাণিকুল, নারির জরায়ু, ডিম, পুরুষের বির্য মুনাফা কামানোর হাতিয়ার। পুঁজি ক্রমশ চেপে বসছে, বিষাক্ত নিঃশ্বাস ফেলছে ঘাড়ের উপর; স্বপ্ন উসকে দিয়ে আকাক্সক্ষা ও চাহিদা সৃষ্টি করা হচ্ছে। অস্পষ্ট, ধ্র“ব, আপোসকামি সত্তা অজান্তেই তৈরি হচ্ছে। বহুজাতিক পণ্যায়ন, আগ্রাসন, সাম্রাজ্যবাদের নীল-থাবায় সবকিছু এলোমেলো, অসংলগ্ন, আত্মবিনাশক। জীবনযাপনের নিয়ন্ত্রক শক্তি বাড়ছে, অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা মানুষ বিভ্রান্ত, বাস্তুচ্যুত, চিন্তাশূন্য, অথর্ব, জড়। হয়ে পড়ছে কর্পোরেট নিয়মের অধিন। পুঁজির অসম বিকাশ, কর্পোরেট সময়ের নীল থাবায় দাঁড়িয়ে চিহ্নায়ন সম্ভব নয় আসল লড়াই কোথায়, কার বিরুদ্ধে। সস্তা আজগুবি কেচ্ছাকাহিনিসমৃদ্ধ চলচ্চিত্র-পুঁথি-বইয়ের মাধ্যমে যা করা গেছে, বাঁধ দিতে পারিনি আমরা তাতেও। আধুনিকতার নামে, মিডিয়া ভেল্কিবাজির তোপে-প্রভাবে, প্রতিদিনের মস্তিষ্ক ধোলাই কর্পোরেট পুঁজিবাদিপ্রকল্প শৃঙ্খলে শৃঙ্খলায়িত মানুষের মুক্তিকাক্সক্ষা-মুক্তিস্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। শ্রেণি-সংগ্রাম শ্রেণি-লড়াই যেমন তেমনি পুঁজির অসম বহুজাতিক আগ্রাসন, উত্তর-উপনিবেশিককালেও বর্তমান, উপনিবেশিকতার মায়া অথবা মোহ আজো সমানমাত্রায় ক্রিয়াশিল। আবার, প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট, মানুষের ওপর মানুষের কর্তৃত্ব ফলাবার আকাক্সক্ষা আসলে শুধু ভ্রান্ত-পলিটিক্যাল অর্থনীতি উপজাত নয়। অন্তর্জাল, উন্মুক্ত আকাশসংস্কৃতি, ভোগ মানুষকে গিনিপিগে পরিণত করছে অথবা কৌশলে করানো হচ্ছে, ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে নানা উপকরণ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সা¤প্রতিক আবিষ্কারগুলোকে সুপরিকল্পিত ও সুচারুভাবে ব্যবহার করে স্যাটেলাইট চ্যানেলের আবিশ্ব পরিব্যাপ্ত যে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে তাতে বিশাল জনসংখ্যার মেরুদণ্ডহীন মানসিকতা ও চাহিদাসম্পন্ন এক জনগোষ্ঠি, একক বাজার তৈরি করে ফেলা সম্ভব হয়েছে। মিডিয়ার আগ্রাসন, সাম্রাজ্যবাদি তৎপরতা, ফাস্ট ফুড-এফএম রেডিও-ফেসবুক সংস্কৃতির এই দশকে চিন্তাও ঢেলে সাজাতে হচ্ছে। জরুরি হয়ে পড়েছে পক্ষ প্রতিপক্ষ নির্ধারণ, শত্র“ মিত্র চিহ্নিতকরণ।’ সম্পাদকিয় এই অংশটিতে সম্ভবত ‘চারবাক’ এর বৈশিষ্ট্য কিছুটা পাওয়া যাচ্ছে, লেখার ধরনও। প্রচল স্রোতের বাইরে গিয়ে যারা চিন্তা করেন, অচল ঘূণেধরা সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন চান তারাই ‘চারবাক’-এর লেখক। ‘চারবাক ইশতেহার ২০১০’ থেকেও জানা যাবে ‘চারবাক’-এর অবস্থান।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: লেখকের স্বকিয়তা বজায় রেখে সম্পাদনা করা কতোটা কঠিন, এবিষয়ে আপনার মত?
রিসি দলাই: প্রশ্নটি ঠিক বোধগম্য হলো না। লেখকের স্বকিয়তা আছে বলেই তো সে লেখে, অন্য লেখকসত্তার সাথে মিলে যায় না। প্রশ্ন যদি হয় লেখকের লেখায় সম্পাদনা কতটা জরুরি, সেক্ষেত্রে আমি বলব সম্পাদনা অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সম্পাদনায় একটি লেখা গুণগত মানে উলে­খযোগ্য পরিমাণে উৎকর্ষতা লাভ করে। সম্পাদনার ক্ষেত্রে আমি এর বিস্তর প্রমাণ পেয়েছি। লেখক যে দিকগুলো নিয়ে ভাবেননি, অথবা অহেতুক যে প্রসঙ্গগুলোর অবতারণা করলেন সেগুলো তাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে তিনি সচেতন হন, পাঠক একটি ভাল লেখা পড়ে আনন্দ লাভ করে। দুঃখজনক হলেও সত্যি এখনো সম্পাদনা ততোটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি, যার কারণে ভাল সম্পাদক যেমন নেই, তেমনি বিরল ভাল লেখকও। আরেকটি বিষয় সম্পাদক কর্তৃক প্রকাশিত হওয়ার বাসনার অর্থই হলো লেখক প্রত্যাশা করেন তার লেখাটির একটি উত্তম সম্পাদনা। ‘চারবাক’-এ সম্পাদনা ছাড়া কোনো লেখা ছাপা হয় না। ‘চারবাক’-এ প্রকাশিত সকল লেখার দায় সম্পাদকের। যেহেতু ‘চারবাক’ স্বত্ব ধারণায় বিশ্বাস করে না, এটি উপনিবেশিক প্রভুদের চাপিয়ে দেয়া অনেক ব্যারামের একটি বলে মনে করে, তাই চারবাকে প্রকাশিত কোনো লেখার স্বত্ব নেই। ইচ্ছে করলেই ‘চারবাক’-এ প্রকাশিত যেকোনো লেখা যে কেউ পুনরায় ছাপতে পারেন, অনুমতিরও দরকার নেই।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: আপনাদের শুরু এবং আজকের প্রেক্ষাপট কিভাবে মেলান?
রিসি দলাই: আসলে এটা একটা রিলে রেস। ইতিহাস পাঠ যদিও মুহূর্তের, শুরুর এবং শেষের কয়েকটি পৃষ্ঠা যেখান থেকে বেমালুম গায়েব করে ফেলা হয়। আমি একটু ভিন্নভাবে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করতে আগ্রহি। বাংলাদেশ রাজনৈতিক স্বাধিনতার ৪০ বছর উদ্যাপন করছে। মহাকালের বিবেচনায় ৪০বছর যেমন খুব বেশি নয়, খুব কমও বলা যাবে না। কচ্ছপ গতিতে হলেও পরিবর্তনগুলো হচ্ছে। আমার বিশ্বাস যেকোনো পরিবর্তনই রাজনৈতিক, তারপর অর্থনীতি লাগামগুলোকে একটু টেনে ধরে। বাইরের দুনিয়ার একটা প্রভাবতো থাকেই, যেহেতু বাইরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ আগের চাইতে বেড়েছে। যোগ হয়েছে হাওয়াই চ্যানেল, ল্যাপটপ, অন্তর্জাল, ফেসবুক, টুইটার। ছাপাখানার প্রভাবও বেড়েছে। সস্তা শ্রমের শ্রমিক হয়ে যাওয়া কর্মিদের পাঠানো অর্থ জীবন অর্থনীতিতে পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। গার্মেন্টস, এনজিও অনেককেই ঘরের বাইরে পা রাখার সাহস জুগিয়েছে। মুঠোফোনে অর্থহীন প্রলাপ কথাবাণিজ্য, এফএম রেডিও অভ্যস্ত জীবনযাত্রাই পাল্টে দিচ্ছে। দীর্ঘসময় কেটেছে বন্দিত্বে, সামরিক শাসনের যাতাকলে। স্বশাসন তথা গণতান্ত্রিক পরিবেশে চিন্তা এতো সেদিনের ঘটনা। স্বভাবতই প্রকাশনা ক্ষেত্রেও এর ছাপ আছে। হাল্কা চটুল উপন্যাস গল্পের যতো কদর চিন্তামূলক সিরিয়াস চর্চায় ততোটাই বিরাগ অনিহা। আশির দশক একটি উলে­খযোগ্য মাইলফলক শিল্পসাহিত্য চিন্তার ইতিহাসে। এসময় চিন্তা চর্চার বেশকিছু সিরিয়াস কাগজ বের হয়। লেখকরা একটু ভিন্নভাবে চিন্তা করার ফুসরত পান। ষাটের দশক ছিল উন্মাদনার, সত্তরের দশক স্বাধিনতার স্বপ্ন আকাক্সক্ষা এবং প্রাপ্তিতে রঙিন। আশিতে এসে আত্মকেন্দ্রিক সত্তা নিজেকে নিয়ে ভাববার ফুসরত পায়। নব্বইয়ে কিছুটা থিতু হয় এবং এই সময়ে (সোনালি দশক শূন্য দশকে এসে) পূর্ণতা পাচ্ছে নানা ক্ষেত্রে। ফলে ভাবনাগুলোও পরিপক্ক হচ্ছে। আরেকটি কথা সামরিক শাসন এবং জরুরি অবস্থাও পিছিয়ে দিয়েছে অনেক। এখন অনেক বিষয়ের বই প্রকাশিত হচ্ছে, প্রকাশক তা প্রকাশ করতে সাহস পাচ্ছেন, যা ক’বছর আগেও সম্ভব ছিল না। বিপ্রতিপ প্রকাশনাগুলোর কারণেই সম্ভব হচ্ছে। সিরিয়াস বিষয় নিয়ে লিখতে যেমন লেখক আগ্রহি হচ্ছেন তেমনি পাঠকও বেড়েছে এসব বইয়ের না হলে প্রকাশনাগুলো হচ্ছে কি করে? আকাক্সক্ষা এবং প্রাপ্তিযোগ এভাবেই মেলানোর চেষ্টা আমার, রাজনৈতিক এবং আন্তঃসম্পর্কের ভিত্তিতে।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: দেখতে দেখতে ‘লিটলম্যাগ’ আন্দোলন একটি পূর্ণাঙ্গতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে… এ-বিষয়ে আপনার মতামত।
রিসি দলাই: ‘লিটলম্যাগ’ চর্চাকে একটি মুভমেন্ট হিসেবে চি‎িহ্নত করতেই বেশি আগ্রহি আমি। চলমান জীবনের প্রতিচ্ছবিও অনেকটা। সময়ের প্রতিভূ। এক একটি সংখ্যা যেন সে সময়ের জীবন, রাজনীতি, অর্থনীতির জীবন্ত দলিল; সাক্ষ্য-প্রমাণও। সময়ের চি‎হ্নায়ন না থাকলে তাকে ব্যর্থ বলে মনে করি। আর পূর্ণাঙ্গতা বলেতো কিছু নেই। পূর্ণ হওয়া মানে মৃত্যুর দিকেই ধাবিত হওয়া। এরপর আর কিছু থাকে না। নতুন সম্ভাবনা, লড়াইয়ের ক্ষেত্র তৈরি হবে লিটলম্যাগকর্মিরা সেসব লড়াইয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ করবেন এমনটিই প্রত্যাশা। সাম্রাজ্যবাদি পুঁজিবাদি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই। মানুষের মানবিক জীবনযাপন, সাম্যচিন্তা-সামাজিক রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা কতটুকু সম্ভব হয়েছে এখন পর্যন্ত তা অবশ্য প্রশ্ন সাপেক্ষ। উপসাগরিয় যুদ্ধের পর তেল-গ্যাসের দখল নেয়ার লড়াই কি থেমেছে? বিশ্বব্যাপি অস্ত্রের মহড়াতো এখনো চলছে। অর্ধেকেরও বেশি মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারছে না, স্বাস্থ্য-চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: লিটল ম্যাগাজিন এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা একে অপরের পরিপূরক। একজন লিটল ম্যাগাজিনকর্মি হিসেবে টার্মটিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করেন?
রিসি দলাই: আসলে কি জানেন ‘লিটল ম্যাগাজিন’ চাপিয়ে দেয়া একটি শব্দ, বুদ্ধদেব বসু এই শব্দটি চাপিয়ে দিয়েছেন; অবশ্য স্বজ্ঞানে তিনি এই কুকর্মটি করেছেন কি-না আমার জানা নেই। ছোট কাগজ কিংবা লিটলম্যাগাজিন বলে কিছু নেই, এভাবে ভাবতে পছন্দও করি না। পূর্বসুরিদের অনিচ্ছাকৃত ভুল মাধ্যমটিকে জটিল করে ফেলেছে, বিপর্যস্তও খানিকটা। কথা ও কাজ এবং যাপিত জীবন ও মুভমেন্টে বিস্তর ফারাক ক্ষতির কারণ হয়ে গেছে। অসংলগ্নতাও খানিকটা দায়ি। অবশ্য দীর্ঘদিনের প্রচার প্রচারণায় শব্দটি যদিও বেশ জনপ্রিয়, ফ্যাসানের অংশও বটে এখন। থিয়েটার করা যেমন অনেক নাটককর্মির হবি, লিটলম্যাগও অনেকটা তাই। সম্ভবত লিটলম্যাগকে কেন্দ্র করে যত বিতর্ক-উত্তাপ-বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে অন্য কোন মাধ্যমে হয়নি। ভুলভাল ব্যাখ্যা, যাপনিয় জীবনের সমস্যা মাধ্যমটিকে আক্রান্ত ও জটিল করে গুলিয়ে ফেলায় এই দৈব উৎপাত। ফ্যাশন তাড়নায় উদ্দিপ্ত কতিপয় উর্বর-মস্তিষ্ক তরুণের উ™£ান্ততাও দায়ি কমবেশি। আদর্শ ও দর্শনগত দিক মুখ্য না হয়ে প্রধান হয়েছে কতিপয় ব্যক্তিখেয়াল, নিজস্ব উদ্ভাবিত কিছু সস্তা অস্ত্র। ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে পক্ষ-প্রতিপক্ষের নির্ণায়ক সূত্র হারিয়ে প্রধান হয়েছে কিছু দুর্বৃত্তশক্তি। প্রতিপক্ষ কে চিহ্নিত করা যায়নি। আবার ছদ্মবেশি লিটলম্যাগওয়ালাদের সংখ্যাও বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। কোনটি লিটলম্যাগ, কোনটি নয় এমন বিতর্ক যদিও উত্থাপিত হয় হামেশাই। কল্পিত লিটলম্যাগের ছাপানো তালিকাও অহেতুক বিভ্রান্তি উসকে দেয়। পুঁজির অসম বিকাশ দৈত্যায়নের যুগে, আগ্রাসন-সাম্রাজ্যবাদ কর্পোরেট সময়ের নীল থাবার নিচে দাঁড়িয়ে চিহ্নায়ন সম্ভব হয় না এখনো লড়াই আসলে কোন জায়গায়, কার বিরুদ্ধে। সেই একই কথা একই বুলি আওড়ে চলেছি তোতাপাখি লক্ষ-উদ্দেশ্যহীন। অস্ত্র তুলে দেয়া হয়েছে অজান্তেই প্রতিপক্ষের হাতে। তরুণমননে সস্তা আজগুবি কেচ্ছাকাহিনিসমৃদ্ধ চলচ্চিত্র-পুঁথি-বইয়ের মাধ্যমে যা করা গেছে, বাঁধ দিতে পারিনি আমরা তাতেও।
প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা নিয়ে ভাবনা দীর্ঘদিনের। কাকে প্রতিষ্ঠান বলব, কাকে বলব না তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিরোধিতার সূত্রমুখটি। পরিবার একটি প্রতিষ্ঠান-ধর্ম, বিবাহ, বিদ্যালয়, মোটাদাগে রাষ্ট্রও। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা বলতে আমরা এগুলোকে বোঝাই না। এ প্রসঙ্গে আমি বহুবার বলেছি। পরিষ্কার করেছি আমার অবস্থান। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা বলে আসলে কিছু নেই, বৃহত্তর অর্থে ধরলে, হয়ও না। প্রচলিত ছকে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা বলতে যা বোঝায় তার পক্ষে আমি নই। ব্যক্তিও কখনো কখনো প্রতিষ্ঠান হয়ে যেতে পারেন-রবীন্দ্রনাথ। মানুষের ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষা ধ্যান ধারণা পুঞ্জিভূত ক্ষোভ জ্ঞান আসলে প্রাতিষ্ঠানিকই বলা চলে খানিকটা। নিশ্চয়তার ধারণার সাথে যার সাদৃশ্য কল্পনা করা যায়। অনিশ্চিত কিছু মানুষ সইতে পারে না। মানুষের গতিমুখ সরল অথবা জটিল যাই হোক প্রতিষ্ঠানমুখিই। তাহলে বিরোধিতা করছি কার, নিজেরই? নিজের অস্তিত্বের বিরোধিতা করা যায় কি? প্রচল সময়ে দাঁড়িয়ে অসংলগ্ন আত্মবিনাশক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা প্রতিষ্ঠানবিরোধিতায় খ্যাতি পেয়ে গেছে। যা কিছু সভ্যতার গতিমুখের বিপরিত তার বিরোধিতাই আমাদের কাম্য। আরেকটি কথা, বুদ্ধবাবুর সময়ে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তরুণদের আত্মপ্রকাশের পথে। তাঁকে কিছুতেই অতিক্রম করা যাচ্ছিল না। তাই তরুণদের প্রতিষ্ঠার স্বার্থে দরকার ছিল এমন শব্দের যাতে করে আলাদাভাবে মঞ্চে জায়গা করে নেয়া যায়, রবীন্দ্রবিরোধিতার মূল সুরটি খানিকটা একারণেও। বর্তমান সময়ে তরুণদের সামনে এমন কোনো বাঁধা নেই যাকে অতিক্রম করতে হবে। অনুকরণিয় দৃষ্টান্ত বা আদর্শও নেই। মঞ্চ প্রায় পুরোটাই ফাঁকা। যেখান থেকে শুরু করবেন সেটাই প্রথম কাজ হবে। দৃষ্টতাপূর্ণ শোনালেও এটিই সত্য।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: অসংখ্য কাগজ বের হচ্ছে, কিছু নিয়মিত কিছু অনিয়মিত। বিষয়টিকে কোন দৃষ্টিতে দেখেন?
রিসি দলাই: আসলেই কি অসংখ্য কাগজ বের হচ্ছে? বিষয়টিকে আমি বরাবর সদর্থক দৃষ্টিতেই দেখে থাকি। তুলনা করি প্রবহমান নদির সাথে। চিন্তার গতিমুখ রুদ্ধ হয়ে যাবে কাগজ প্রকাশিত না হলে। চলমান জগৎ জীবন নিয়ে আমরা যে ভাবি, আমাদের যে কিছু বলার আছে তা এইসব প্রকাশনা প্রমাণ করে। যত ক্ষুদ্র তুচ্ছ হউক না কেন চলমান চিন্তার স্রোত সচল রাখতে প্রকাশনা দরকার, অনেক বেশি। চিন্তার স্ফুলিঙ্গ কোথায় লুকিয়ে আছে তা প্রকাশিত না হলে কিভাবে জানা যাবে? যত বেশি কাগজ বের হবে তত সমৃদ্ধ হবে আমাদের চিন্তাসাম্রাজ্য। লেখক বাড়বে, পাঠকও নিশ্চয়ই। ক্ষুদ্র তুচ্ছ প্রকাশনাগুলো ভবিষ্যৎ সময়ের চিন্তাসাম্রাজ্যের অধিশ্বরকে লালন করে নিরবেই। প্রকাশনা নিয়মিত হওয়া দরকার। নিয়মিত হলে প্রকাশনাকেন্দ্রিক লেখকগোষ্ঠি গড়ে উঠে। পুরোনো প্রকাশনার মধ্যে চালচিত্র, নিসর্গ, অনিন্দ্য, প্রতিশিল্প, গাণ্ডিব, ঊষালোকে, একবিংশ, পুষ্পকরথ, লিরিক, দ্রষ্টব্য এখনো আশা জাগিয়ে রেখেছে। শূন্য দশকে প্রকাশিত হয়ে এখনো টিকে আছে উতঙ্ক, সুনৃত, শিরদাঁড়া, ঘুড়ি, যোগাযোগ, থিয়েটারওয়ালা, চি‎হ্ন, পর্ব, কথা, শালুক, লোক, সমুজ্জ্বল সুবাতাস, চারবাক। দু’এক সংখ্যা বের হওয়ার পর বন্ধ হয়ে গেছে এমন অসংখ্য সম্ভাবনা পীড়া দেয়। চোখ, সহজ, জাঙ্গাল, জোড়াসাঁকো, যুক্তি, প্রান্ত, মানুষ, চন্দ্রাবতী, লাস্টবেঞ্চ, কাকতাড়–য়া, ব্রাত্য’র প্রকাশনা অব্যাহত থাকলে আমাদের চিন্তাজগৎ ঋদ্ধ হতো। অযান্ত্রিক, অদ্রি, ঊর্মিলা, মাদুলি, ওপেনটেক্সট, জঙশন, সরলরেখা সবে শুরু করেছে। আমি আশাবাদি।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: কাগজগুলো বেরুনোর পাশাপাশি কি খানিকটা ‘ঘরাণা’কেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে না…
রিসি দলাই: ছোট কাগজকে যদি আমরা বিপ্রতিপ চিন্তার কাগজ বলি তাহলে অনিবার্যভাবে একটা ঘরাণা তৈরি হবেই। এটা ছোট কাগজের নিয়তি। একই চিন্তা, লক্ষ, উদ্দেশ্য নিয়ে যারা ধাবিত চালিত হবেন তারা একটি প্লাটফর্মে একত্রিত হবেন এটাই স্বাভাবিক। লক্ষ-উদ্দেশ্যহীন কিছু লেখক মিলেমিশে আর যাই হোক লিটল ম্যাগাজিন হয় না।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: কিছু কাগজে নবিন প্রবিনের সহাবস্থান লক্ষ করা গেলেও কোন কোন কাগজ নবিনের নিরীক্ষা বাদ দিয়ে প্রতিষ্ঠিতদের নিয়েই পড়ে থাকে এ বিষয়ে আপনার মত কি?
রিসি দলাই: নবিন প্রবিনের সহাবস্থান বিষয়টি পরিষ্কার হলো না। নতুন চিন্তার কথা বললে নিরীক্ষা থাকবে। নিরীক্ষা না থাকলে নতুন চিন্তা হয় কি করে? নবিন বলতে আপনি হয়তো নতুন লিখিয়ের কথাই বলছেন। নতুন পুরাতন লিখিয়ে নিয়ে কাগজ, হতেই পারে। একেবারে নতুনদের নিয়েও কাগজ হয়। শুরুতেই বলেছিলাম আত্মপ্রকাশের তাড়না, উদগ্র বাসনা। তরুণদের মধ্যে চি‎িহ্নত হবার বাসনা থাকবে, না হলে তারা কেন কাগজ করবে। আবার দীর্ঘদিন ধরে যারা লিটল ম্যাগাজিনের সাথে যুক্ত আছেন- সেলিম মোরশেদ, আহমদ নকীব, মারুফুল আলম, তপন বড়–য়া, রাজা সাহিদুল আসলাম, সরকার আশরাফ, হাবীব ওয়াহিদ, শহিদুল আলম, সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ আপোষ করেননি বলেই লিটল ম্যাগাজিন আজ এই পর্যায়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। পুরোপুরি লিটল ম্যাগের লেখক না হয়েও লিটল ম্যাগের কাজ করছেন এমন লেখকও কিন্তু আছেন- সেলিম রেজা নিউটন। নবিন কিংবা প্রবিন নয়- চিন্তা, চিন্তনপ্রক্রিয়া কিভাবে সাজানো হল সেটাই আসল কথা। প্রচল ধারার বাইরে গিয়ে কিছু করা, কিছু করতে পারার নামইতো লিটল ম্যাগাজিন।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: সাহিত্য পত্রিকা এবং লিটল ম্যাগাজিন এই সীমারেখা বা বিভাজন আপনি কিভাবে দেখেন? সাহিত্য পত্রিকা বা দৈনিকের সাহিত্য পাতায় লিখলেই কি সেই লেখক লিটলম্যাগ চেতনাবিরোধি হয়ে যান? বিষয়টি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবেন।
রিসি দলাই: লিটল ম্যাগাজিন আসলে সাহিত্য পত্রিকাই। অবশ্য সাহিত্য বাদ দিয়েও লিটল ম্যাগাজিন হতে পারে। সাহিত্য পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন বিভাজন করতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। দৈনিকের সাহিত্য পাতাকে আমি আলোচনার অযোগ্য মনে করি। দৈনিক পড়ি খবরের জন্য। অবশ্য কালেভদ্রে সাহিত্যের খবরও থাকে। বেশির ভাগসময়ই বারোয়ারি সাহিত্য ছাপা হয় এসব কাগজে। সেখানে একটা মনোরঞ্জনের বিষয় থাকে, পাঠকরুচিরও। পাঠক কি পছন্দ করছে সেভাবেই তারা তাদের পণ্যবস্তুকে গছিয়ে সাজিয়ে দেয়। লিটল ম্যাগাজিনের সে দায় থাকে না। লিটল ম্যাগাজিনের লেখক তার রুচি অনুযায়ি পাঠক গড়ে নেয়। কে কোন জায়গায় লিখলো তা নিয়ে আমি ভাবি না। এটা মোটেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বিষয় হল শিল্প, প্রকাশবস্তু। নীতি-নৈতিকতা মূল্যবোধ সমাজ পরিবর্তনের কথা বলবো; বলব প্রচল সমাজ ভেঙে নতুন সময় বিনির্মাণের কথা, লিখব এসব পণ্য কাগজে তাতো হয় না। এসব কাগজের মালিক কারা- অসৎ, কালোবাজারি, দুর্বৃত্ত, লুটেরা, ভূমিদস্যু। অবৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ বৈধ করতেই অধিকাংশ দৈনিকের আত্মপ্রকাশ। ব্যক্তির চরিত্রস্খলন, হলুদ সাংবাদিকতা এদের প্রধান হাতিয়ার। এটা নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন। ‘সাপ্তাহিক একতা’ অথবা কলকাতার বামঘরাণার কাগজ ‘দৈনিক গণশক্তি’-তে লিখতে আপত্তি দেখি না। কোথায় প্রকাশিত হলো সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয় এই সময়ে, আপনার প্রকাশিত মতের সদগতি একটা বড় কথা। যা বলছেন তা কোথায়, কোন প্লাটফর্ম থেকে বলছেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: এক্ষেত্রে ‘চারবাক’ এর পক্ষপাত কোন দিকে?
রিসি দলাই: ‘চারবাক’ শুরু থেকে লেখা ও জীবনযাপনে সংগতি রক্ষা করতে চেয়েছে। লেখা ও লেখক নির্বাচনেও। কখনো কখনো ব্যর্থতা জুটেছে যদিও। চারবাকগোষ্ঠির লেখক যারা তারা ‘চারবাক’ এর বাইরে কমই লিখে থাকেন। নিশ্চয়ই জানেন ‘চারবাক’ ঘরাণার অনেকগুলো কাগজ প্রকাশিত হচ্ছে। বাইরে লেখার দরকার হয় না। আর এখনতো অনেক অনেক কাগজ। এছাড়া প্রকাশ মাধ্যমেও উলে­খযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ইন্টারনেট, ফেসবুকে চাইলে আপনি আপনার লেখা ছড়িয়ে দিতে পারেন।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: জাতিয় লিটল ম্যাগাজিন মেলা বিগত ৪বছর ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মেলার প্রয়োজনিয়তা কতটুকু বলে মনে করেন। এ মেলা লিটলম্যাগ সম্পাদক-লেখক-কর্মিদের একটি মিলনমেলায় পরিণত হতে পারে। ‘চারবাকগোষ্ঠি’ বিষয়টি নিয়ে কি চিন্তা করছে?
রিসি দলাই: জাতিয় লিটল ম্যাগাজিন মেলার শুরু নিয়ে বলা দরকার, যাতে পাঠক বিভ্রান্ত না হন। নিসর্গ সম্পাদক সরকার আশরাফ সবে বগুড়া থেকে ঢাকা এসে থিতু হয়েছেন। শাহবাগে, কখনো কখনো বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ব. পূবালি ব্যাংকের সামনে কথা হয়। তিনি (সম্ভবত কবি খলিল মজিদ সঙ্গে ছিলেন) প্রস্তাব করেন লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে কোন সার্বজনিন মেলা করা যায় কি-না বিষয়টি ভেবে দেখতে। জানান আরো দুয়েকজনের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। শুরুতে সন্দেহ পোষণ করলেও বেশ কয়েকদিনের আলাপ আলোচনার পর মনে হলো এরকম একটি মেলা হলে মন্দ হয় না। অনেকের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়। লোক সম্পাদক অনিকেত শামীম বিষয়টির সাথে যুক্ত হন। অনিন্দ্য সম্পাদক হাবীব ওয়াহিদও ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আর থাকেননি। ‘জাতিয়’ শব্দ নিয়ে আপত্তি ছিল আমার। প্রথমবার স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মেলা হয়। অংশগ্রহণকারি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকরা মেলার ব্যয়ভার বহন করেন। বিষয়টির সাথে বিজ্ঞাপন এবং অন্যান্য বিষয় জড়িয়ে খানিকটা বাণিজ্যপ্রবণ হয়ে উঠলে সমস্যার সূত্রপাত হতে থাকে। লিটলম্যাগাজিনের নামে অনেক বাণিজ্যিক কাগজের প্রদর্শনি যেমন ঠেকানো যায়নি, তেমনি ঠেকানো যায়নি লিটল ম্যাগাজিন চেতনাবিরোধি অনেক আলোচনাও। তৃতীয়বার অনুষ্ঠিত হবার পর আমরা বিবৃতি দিয়ে মেলা থেকে সরে আসি। বিবৃতিটি পাঠকের সুবিধার্থে এখানে তুলে দিলাম: ‘কয়েক বছর যাবৎ অনুষ্ঠিত ‘জাতিয় লিটলম্যাগ মেলা’র উদ্যোক্তা ও অংশগ্রহণকারি হিসেবে অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের দরুণ মনে হয়েছে এ ধরনের মেলা কার্যক্রম প্রকৃত লিটলম্যাগের আদর্শ, উদ্দেশ্য, লক্ষের বিপরিতে অবস্থান করে। যথার্থ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা ও এন্টি-মিডিয়া মুভমেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লিটলম্যাগ প্রদর্শনের নামে বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাগজের ছড়াছড়ি পাঠককে বিভ্রান্ত করে; তাঁরা প্রতারিত হন। সংগতিবিহিন সাহিত্যকাগজের দৌরাত্ম্য ও মিডিয়ার আস্ফালন প্রকৃত মুভমেন্টকেন্দ্রিক আন্দোলনে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। ব্যক্তিচর্চার প্রাধান্য এবং কারো কারো নিরাপদ চারণক্ষেত্রে মেলা পরিণত হওয়ায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি মেলা থেকে সরে যাওয়ার।’ বিষয়টি দুঃখজনক। প্রকৃত লিটলম্যাগাজিন নিয়ে মেলা নিঃসন্দেহে লেখক-পাঠক-কর্মিদের মিলনক্ষেত্র। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি অনেকেই মেলায় আসেন যাদের সাথে পূর্বে কখনো পরিচিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। কেন কাগজগুলো বের হয় লক্ষ-উদ্দেশ্য সম্পর্কেও সরাসরি কথা বলা যায়। এটি বাড়তি পাওনা। এখন কিন্তু সারাদেশেই লিটলম্যাগ মেলা হচ্ছে। লিটলম্যাগ সংগ্রাহক কমলেশ দাশগুপ্ত দুইদিনব্যাপি মেলা করলেন চট্টগ্রামে। কিছু মতপার্থক্য সৃষ্টি হওয়ায় চট্টগ্রামের অনেক লিটলম্যাগকর্মি সে মেলায় অংশ নেননি। ময়মনসিংহে মেলা হয়েছে। চি‎হ্ন এর উদ্যোগে রাজশাহিতে মেলা হলো। ‘সমুজ্জ্বল সুবাতাস’ করলো পার্বত্য চট্টগ্রামে। ‘চারবাক’ ও ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’ থেকে শহিদ আসাদ স্মরণে টিএসসিতে ৫দিনব্যাপি প্রতিবাদি লিটলম্যাগ মেলা এবং আহমদ ছফা স্মরণে দিনব্যাপি প্রতিবাদি লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনি হয় সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের উন্মুক্ত চত্বরে। প্রতিবাদি লিটলম্যাগ প্রদর্শনির উদ্বোধন করেন বিপ্রতিপ চিন্তার লেখক সেলিম মোরশেদ। বিপুল সংখ্যক দর্শকের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত ছিল এই প্রদর্শনি।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: ফেসবুকে দেখলাম গণ-গ্রন্থাগারে ‘লিটল ম্যাগাজিন বিপনন’ নিয়ে তুমুল তোলপাড়। এ বিষয়ে আপনার প্রস্তাবনা জানাবেন কি?
রিসি দলাই: স¤প্রতি গণ-গ্রন্থাগার কর্তৃক লিটল ম্যাগাজিন ক্রয় নিয়ে ‘লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্র’-এর সভাপতি হিসেবে দুইটি বিবৃতি প্রদান করি। পাঠকের সুবিধার্থে তার একটি এখানে উপস্থাপন করা হলো:
‘গণ-গ্রন্থাগার কর্তৃক লক্ষাধিক টাকার লিটল ম্যাগাজিন ক্রয়ে দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি এবং তথ্যবিভ্রান্তির প্রতিবাদে:
স¤প্রতি পাবলিক লাইব্রেরি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিনা টেণ্ডারে প্রচার প্রচারণা ছাড়াই লক্ষাধিক টাকার লিটল ম্যাগাজিন ক্রয় করে, যা আমাদের দৃষ্টিগোচর হলে আমরা পাবলিক লাইব্রেরির অনিয়মের বিরুদ্ধে আমাদের যৌক্তিক অবস্থান জানাই, এবং প্রক্রিয়াটি যে ঠিক হয়নি সে কথা বলবার চেষ্টা করি। লিটল ম্যাগাজিনের কয়েকজন সম্পাদক সরাসরি পাবলিক লাইব্রেরিতে যান এবং স্পষ্ট বক্তব্য উপস্থাপন করেন। পাবলিক লাইব্রেরি একটি জাতিয় প্রতিষ্ঠান। আমাদের অধিকার রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি অনিয়ম স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে কথা বলার। আমরা মনে করি না কোন মধ্যস্বত্ত¡ভোগি সৃষ্টি করে পাবলিক লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষকে লিটল ম্যাগাজিন ক্রয় করতে হবে।’
এ-বিষয়ে আমার বক্তব্য স্পষ্ট। একটি জাতিয় প্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই অস্বচ্ছ কিংবা নিয়ম বহির্ভূতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। লিটল ম্যাগাজিনের সাথে অনেকের শ্রম মেধা রক্তক্ষরণের ইতিহাস জড়িত। প্রথমবারের মতো ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে সম্ভবত এই অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে। ক্রয় কমিটির অনেকের সাথে ব্যক্তিগত আলাপে মনে হয়েছে তারাও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অসন্তুষ্ট। যাই হোক গণ-গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ লিটলম্যাগ সম্পাদক, কর্মিদের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে মিমাংসায় পৌছুতে পারতো। অন্তত চায়ের দাওয়াতে আমন্ত্রণ জানিয়ে পরামর্শ চাইলেও একটি সুন্দর সমাধান আসত। কারণ লিটল ম্যাগাজিনকর্মিরাও চান তাদের কাগজ, বই জাতিয় প্রতিষ্ঠান ক্রয় করুক। এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ক্রয় কার্যাদেশ দেয়ায় লিটলম্যাগকর্মিদের ক্ষোভ প্রকাশিত হয়েছে ফেসবুকে। বিষয়টি নিয়ে লিটলম্যাগকর্মিদের একাধিক সভাও অনুষ্ঠিত হয় শাহবাগ, আজিজ সুপার মার্কেট, অন্তরে রেস্তোরায়। সেখান থেকে প্রতিনিধিও পাঠানো হয়। তবে, ফেসবুকে দু’জন সম্পাদকের প্রতি যে বিষোদ্গার করা হয় তার প্রতি আমার সমর্থন নেই। স্পষ্ট বলতে চাই, গণ-গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষের অসৌজন্যমূলক ব্যবহার, অনিয়মের বিরুদ্ধে ছিল আমাদের যৌথ অবস্থান, কোনো ব্যক্তি বা লিটলম্যাগ সম্পাদকের বিরুদ্ধে নয়।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ উদ্যোগি হয়ে ১৬০টির মতো পত্রিকা গণ-গ্রন্থাগারে সরবরাহ করেছিল। লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণের এ উদ্যোগকে আপনি কিভাবে দেখেন?
রিসি দলাই: এ বিষয়ে বলার কিছু নেই। লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ উদ্যোগি হয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লিটলম্যাগ সরবরাহ করে থাকে। উদ্যোগটিকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। লিটলম্যাগের প্রধান সমস্যা বিপণন, এক্ষেত্রে তাদের ভাল ভূমিকা আছে। অনেকের অভিযোগ অর্থ প্রাপ্তি নিয়ে, আশা করি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ভাববেন।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: একুশের বইমেলা এবং লিটলম্যাগ চত্বর নিয়ে আপনার ভাবনা কি?
রিসি দলাই: একুশের বইমেলা জাতিয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। লেখক পাঠকের সারাবছরের মিলনমেলাও বটে। লেখক পাঠকের সান্নিধ্যে, নৈকট্যে আসেন এই এক মাসে। তাদের লেখা নিয়ে পাঠক কি ভাবছেন, পাঠকের সাথে পরিচয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। দেশের বাইরে থেকে অনেক কবি-লেখক এ সময়ে আসেন মেলায়। বাংলা প্রকাশনার সার্বিক অবস্থা-মান টের পাওয়া যায় এ-মাসে। বেশির ভাগ লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় এসময়। মাসব্যাপি যে প্রদর্শনি তাতে প্রকাশিত প্রায় সব লিটলম্যাগই প্রদর্শিত হয় এটিও বাড়তি পাওয়া। একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে ম্যাগাজিনটি আলোর মুখ দেখলো তাও কর্মিরা নিয়ে আসেন মেলায়। এই যে বিশালকর্মযজ্ঞ তা বিপননবাণিজ্যে অসহায় হয়ে পড়ছে ক্রমশ। সারা বইমেলা জুড়ে যেখানে বিক্রয়ের প্রতিযোগিতা মহোৎসব সেখানে লিটল ম্যাগাজিন চত্বর জ্ঞানচর্চার প্রকৃত জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে এরই মধ্যে। নানা বিষয়ের বৈচিত্র্যময় বই, মাসব্যাপি অব্যাহত নানা লিটল ম্যাগাজিনের প্রকাশনা, লেখক-পাঠকের আড্ডা’য় চত্বরটি মশহুর। এই চত্বরে অনেক পাঠকই আসেন লেখকদের সাথে আড্ডা দিতে, লিটলম্যাগকর্মিতো আছেনই। তরুণদের সাথে প্রবিণ লেখক-কবিও আড্ডা দিতে সামিল হন এই চত্বরে। কয়েক বছরের অব্যাহত প্রচেষ্টায় লিটল ম্যাগাজিনকর্মিদের দাবির মুখে কর্তৃপক্ষ এই চত্বরকে ‘লিটল ম্যাগাজিন চত্বর’ হিসেবে ঘোষণা দেন। দুঃখজনক হলেও সত্যি লিটল ম্যাগাজিন চত্বরটি নানা অবহেলা অযতেœর শিকার। লিটলম্যাগের জন্য যে স্টল বরাদ্দ দেয়া হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই ছোট, একসাথে কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনের জন্য রাখা যায় না। আড্ডা লিটলম্যাগের প্রাণ সেখানে একটি স্টলে একজনের বেশি বসা যায় না। প্রতিবার মেলার শুরুতে কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দেন স্টল বড় করা হবে, কমপক্ষে দুই সারি লিটল ম্যাগাজিনের জন্য বরাদ্দ দেয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে তা দেয়া হয় না। আমাদের দাবি পুরো চত্বরটিকে লিটল ম্যাগাজিনের জন্য বরাদ্দ দেয়া হোক। তাতে মেলার সৌন্দর্য বাড়বে, পাঠকও আমাদের বৈচিত্র্যময় চিন্তাসাম্রাজ্যে অবগাহন করতে পারবেন স্বচ্ছন্দে। চত্বরটিতে আড্ডা’র প্রকৃত পরিবেশ ফিরে আসবে।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: লিটলম্যাগের বিজ্ঞাপন প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে আপনি উচ্চকিত… যদি বিষয়টি খোলাসা করে বলতেন।
রিসি দলাই: প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে নয়, আসলে কোন বিজ্ঞাপনগুলো ছাপবো, আর কোনগুলো ছাপবো না, সে বিষয়ে কিছু বলার আছে। সাম্রাজ্যবাদ, কর্পোরেট পুঁজির বিরুদ্ধে কথা বলবো আর তাদের অর্থে কাগজ করবো এটি হয় না। ‘চারবাক’ প্রায় বিজ্ঞাপনবিহিন একটি কাগজ। বিজ্ঞাপন ছাড়াইতো এতগুলো বছর চলছে। এতে আত্মশক্তি বেড়েছে। এখনো বিশ্বাস করি টাকা ব্যাপার নয় কাগজ বের করতে, উদ্যোগ চিন্তাটাই প্রধান, অন্যসব বিষয় গৌণ। অবস্থানগত কারণেও আমাদের পক্ষে বিপরিত চিন্তা/প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন নেয়া সম্ভব হয় না।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ ২০০৮ থেকে প্রতি বছর প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনগুলো থেকে একটি লিটলম্যাগকে পুরষ্কৃত করছে, বিষয়টি কিভাবে দেখেন?
রিসি দলাই: লিটলম্যাগ প্রাঙ্গন ২০০৮ থেকে প্রতি বছর একটি লিটল ম্যাগাজিনকে পুরস্কৃত করছে। তাদের নিশ্চয়ই একটি লক্ষ-উদ্দেশ্য আছে। কলকাতায় লিটলম্যাগ নিয়ে পুরস্কার আছে, বাংলাদেশে ছিলো না। সে অপূর্ণতা থেকেই হয়তো প্রাঙ্গণের এই উদ্যোগ। তবে পুরস্কার দেয়া নেয়া নিয়ে আমার কিছু বলার আছে। বেশির ভাগ পুরস্কারই কর্পোরেট পুঁজি তাদের স্বার্থে প্রবর্তন করে। শ্রদ্ধেয় বদরুদ্দিন উমর ‘ড. ইউনূসের দারিদ্রবাণিজ্য’ বইয়ে একটি তালিকা দিয়েছেন, তালিকাটি পড়লে স্পষ্ট হয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অনেক পুরস্কারের ভেতরের খবর। পুরস্কারের ভাল দিকও থাকে অবশ্য। ‘লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ পুরস্কার’টি ব্যক্তিউদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত। এই দুর্দিনে যখন কেউ কাউকে স্বীকৃতি দিতে চায় না সেখানে তাদের উদ্যোগটি আলো দেখায়, সীমাবদ্ধতা সত্তে¡ও।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: লিটলম্যাগ সংগ্রহ প্রদর্শন বিপনন নিয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাই।
রিসি দলাই: বেশির ভাগ লিটল ম্যাগাজিনই ক্ষীণায়ুর হয়ে থাকে। কয়েক সংখ্যা বের হবার পর বন্ধ হয়ে যাওয়াই অনিবার্য নিয়তি। বাংলাদেশে ২০বছর অতিক্রম করে এখনো টিকে আছে এমন কাগজের সংখ্যা হাতে গোণা। যারা এখনো টিকে আছে তাদের জন্য তিন উল­াস। সে হিসেবে এক একটি লিটলম্যাগ শিল্পকর্মে অনন্য, মাস্টারপিস, সংগ্রহযোগ্য। দুঃখজনক হলেও সত্যি সংগ্রহের কোনো ব্যবস্থা এখনো নেয়া হয়নি- না সরকারি না বেসরকারি পর্যায়ে। লিটলম্যাগ সংগ্রহের জন্য মিউজিয়ম গড়ে তোলা দরকার, এটি একটি আন্দোলন হতে পারে। শিল্পি জয়নুল, শিল্পি সুলতানের জন্য যেমন জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ব্যক্তিউদ্যোগে কেউ কেউ লিটলম্যাগ সংগ্রহ করেন কিন্তু প্রকৃত সংগ্রহের পর্যায়ে তা পড়ে না, বৈজ্ঞানিক পন্থা অনুসরণ করা হয় না। অনেক লিটলম্যাগই সংগ্রহের বাইরে থেকে যায়। কিছু কিছু প্রদর্শনি হচ্ছে সারাদেশে। বিপনন এবিষয়ে না বলাই ভাল। চেষ্টা করছেন কেউ কেউ তাদের ধন্যবাদ।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: ‘চারবাক’ ২০১০ সালের লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ পুরস্কার পেলো। আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাচ্ছি।
রিসি দলাই: বিস্মিত হয়েছি, খানিকটা অবাকও। বিপরিত দৃষ্টিভঙ্গি, আদর্শ, লক্ষের কাগজ হিসেবে লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ পুরস্কার পাওয়ায় নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। ‘চারবাক’ আসলেই নতুন চিন্তার সূতিকাক্ষেত্র হয়ে উঠতে পেরেছে কি-না প্রশ্ন জাগছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত দুটো কাগজ (লোক ও চারবাক) সে হিসেবে স্বীকৃতিটা আলোড়িত করছে। নিজেদের সময়ের কেউ কাউকে স্বীকার করতে চায় না, স্বীকৃতি দেয়া! লিটল ম্যাগাজিন হয়ে ওঠার বিষয়, দীর্ঘকালিন চর্চায় তা সম্ভব হয়। ‘চারবাক’ হয়ে উঠেছে কি-না সেটিতো বলবেন অন্যরা। ‘চারবাক’ আসলেই কোনো আদর্শ-লক্ষ-চিন্তার মানদণ্ডে নিজেকে উন্নিত করতে পেরেছে কি-না, খানিকটা নিজের কাছে প্রশ্নও।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: সম্পাদকের বাইরেও আপনার আরেকটি পরিচয় আপনি কবি। আপনার লেখালেখি নিয়ে যদি কিছু বলেন।
রিসি দলাই: প্রকাশিত গ্রন্থ ‘মায়াহরিণ’ (২০০৮), ‘বুদ্ধিজীবীর দায়ভার’ (২০০৯), ‘পক্ষ-প্রতিপক্ষ অথবা শত্র“-মিত্র’ (২০১০) এবং ‘নির্বাচিত চারবাক’ (২০১১)। একুশের বইমেলা ২০১২-তে ‘চারবাক’ থেকে বের হবে ২য় কাব্যগ্রন্থ ‘নাচঘর’। পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করছি। স¤প্রতি বের করলাম ‘সরলরেখা’র ‘ভাষা, বিশ্বায়ন ও ক্ষমতা’ সংখ্যা। লিখছি, পড়ছি আর আড্ডা দিচ্ছি এইতো। বইমেলায় ‘চারবাক’-এর নতুন সংখ্যা বের করার ইচ্ছে আছে।
লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ: আপনাকে ধন্যবাদ।
রিসি দলাই: ধন্যবাদ আপনাকেও।

সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হওয়ার পর কিছু কিছু বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা পরিলক্ষিত হওয়ায় লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ বর্ষ ৩, সংখ্যা ৩, জানুয়ারি ২০১২ থেকে তা হুবহু সরলরেখা’র পাঠকদের জন্য ছাপা হয়। উত্থাপিত বিতর্ক/ আপত্তির উত্তর পাঠক সাক্ষাৎকার থেকেই পাবেন এমনটিই আশা আমাদের।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন আমিনুল রানা
শেয়ার করুন: