004633
Total Users : 4633
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

শেক্সপিয়রের স্মৃতিসম্ভার

(গ্যোটের জন্য, প্রাচীন স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সাহিত্যের জন্য, এমনকি জার্মান মহাকাব্যিক গাঁথার জন্যও আত্মোৎসর্গকারি নিবেদিতপ্রাণ বহু ব্যক্তি আছে। কিন্তু আমার নিয়তি নির্ধারিত ছিল শেক্সপিয়রের জন্য। এখন পর্যন্তও তাই। বিষয়টা এমন অদ্ভুত যে কারও পক্ষে তা অনুমান করা সম্ভব নয়। এমনকি কারও পক্ষেই বাঁচানো সম্ভব নয় ড্যানিয়েল থ্রপিকে— প্রিটোরিয়ায় যিনি কিছুদিন আগে মারা গেলেন। আরেকজন মানুষও এ ব্যাপারে জড়িত হয়ে পড়েছেন। যার চেহারা আমি কখনও দেখিনি।

আমি হারম্যান সরহেল। আপনাদের মধ্যে যারা কৌতূহলি পাঠক, তারা হয়ত কোনো এক সময়ে আমার লেখা— শেক্সপিয়রের জীবনীগ্রন্থের পাতা উল্টানোর সুযোগ পেয়েছেন। আমি একসময় মনে করতাম, শেক্সপিয়রের মূল রচনা বুঝার জন্য বইটি খুব দরকার। আমার ঐ বইটি অবশ্য স্প্যানিশসহ বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

পাঠকদের এ-ও মনে হতে থাকা অসম্ভব নয় যে, একটি সংশোধনির বিরুদ্ধে প্রবল নিন্দার ঝড় ওঠে। থিওবোল্ড সেই সংশোধনিটি একটি গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। একটি সর্বজনসম্মত বিষয়ের ওপর সংশোধনিটি আনা হয়েছিল। ঐ অমার্জিত ভঙ্গির লেখাটি এখন আর আমার নিজের বলে মনে হয় না। এমনকি আমি এ-ও বলতে পারি যে এটা অন্য মানুষের লেখা।

১৯১৪ সালে নাট্যকার জর্জ চ্যাপম্যানের উদ্ভাবিত যৌগিক শব্দের ওপর, আমি একটি প্রবন্ধের খসড়া করি। হোমারের রচনাবলি ইংরেজি তর্জমা করতে গিয়ে চ্যাপম্যান ঐ শব্দগুলো ব্যবহার করেছিলেন। তিনি আসলে বুঝতে পারেননি যে ঐ সব ধারার শব্দ প্রয়োগ করে তিনি ইংরেজি ভাষাকে তার সূচনাবিন্দু অ্যাংলো স্যাক্সন যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। চ্যাপম্যানের কণ্ঠস্বর এখন আমি প্রায় ভুলেই গেছি, অথচ এক সময় তা আমার কত পরিচিত ছিল।

আমার কাছে আমার আগের স্বাক্ষরিত দর্শন ও সমালোচনামূলক কিছু লেখা আছে, যা সম্পূর্ণ করতে পারলে হয়ত তা আমার সাহিত্যিক জীবনী হিসেবে বিবেচিত হত। এছাড়া অসমাপ্ত অবস্থায় ম্যাকবেথের একটি অনুবাদও আমি রেখে দিয়েছি। এটা আমি লেখা শুরু করেছিলাম আমার ভাইয়ের মৃত্যুশোক ভুলবার জন্য। ১৯১৭ সালে পশ্চিম রণাঙ্গনে তার মৃত্যু হয়। ঐ নাটকটি আমি আর শেষ করিনি। আমি উপলব্ধি করেছিলাম, ইংরেজি ভাষা তার শব্দভাণ্ডার সংগ্রহ করেছে জার্মান ও ল্যাটিন এই দুই ভাষা থেকে। কিন্তু আমাদের জার্মান ভাষা এত গীতি-মাধুর্যময় হওয়াসত্ত্বেও তার শব্দের উৎস মাত্র একটি।)

ড্যানিয়েল থ্রপির কথা তো আমি আগেই উল্লেখ করেছি। মেজর ব্রাকলে তার সাথে আমার প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন, শেক্সপিয়রকে নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায়। কবে এবং কোথায় এসব বৃত্তান্তে আমি যাব না। এইসব খুঁটিনাটি তথ্য আমার কাছে অর্থহীন মনে হয়।

আমার আংশিক অন্ধ স্মৃতিশক্তির কারণে তার চেহারা আমার তেমন মনে নেই। অবশ্য তার গোলমেলে, কুখ্যাত দুর্ভাগ্যকেই আমি বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি তার চেহারার চাইতে। একটা বয়সে পৌঁছে মানুষ বহুবিষয়ে চমৎকারভাবে ভান করতে পারে। তবে চেহারার মধ্যে সুখি-সুখি ভাব ফোটানো আসলেই কষ্টকর। কিন্তু ড্যানিয়েল থ্রপিকে দেখে মনে হত তিনি যেন মূর্তিমান বিষাদ। তার চারপাশে সবসময় গুমোট আবহাওয়া বিরাজ করত।

সেদিন আমরা দীর্ঘক্ষণ কথাবার্তা বললাম। তবু আবার রাতে সবাই একটি পাবে এসে জড়ো হলাম। এইরকম পাব লন্ডন শহরে বহু আছে। আমরা ইংল্যান্ডে আছি, এই ব্যাপারটিকে আমরা অনুভব করতে চাইছিলাম (যদিও আমরা ইংল্যান্ডেই ছিলাম)।

সেটা বোধ করার জন্য আমরা প্রথামাফিক একের পর এক ধাতুর মগভর্তি বিয়ার পান করতে লাগলাম। সে পানিয় ছিল গাঢ় এবং উষ্ণ। আমাদের কথাবার্তার মধ্যে মেজর কথা-প্রসঙ্গে হঠাৎ বললেন, ‘পাঞ্জাবের একটি ঘটনা শোনেন। একবার হল কি পাঞ্জাবে এক লোক আমাকে এক ভিখারিকে লক্ষ করতে বললেন। ইসলাম ধর্মের সেই কিংবদন্তির কথা নিশ্চয়ই আপনাদের জানা আছে। সলেমান বাদশাহের একটি আংটি ছিল যা দিয়ে তিনি পশু-পাখির ভাষা বুঝতে পারতেন। আংটিটি হাতবদল হতে-হতে এখন ঐ ভিখারিটির হাতে এসে পৌঁছেছে। অন্তত সেখানকার লোকেরা তাই বিশ্বাস করে। আংটিটি অমূল্য তাই ভিখারি তা বিক্রির কোনো চেষ্টাই করেনি। লাহোরে ওয়াজির খান মসজিদের কোনো এক প্রাঙ্গণে তার মৃত্যু হয়।

আমার মনে হল, চসার নিশ্চয়ই এই আশ্চর্য আংটির কথা জানতেন। তবে এই সব ভাবনা আপাতত মুলতবি থাক, না হলে মেজর ব্রাকলের চমকপ্রদ গল্পটি শোনায় ছেদ পড়বে।

‘তারপর আংটিটির কি হল’, আমি জানতে চাইলাম।

‘হারিয়ে গেছে অবশ্যই। যা হয়, এই সব যাদুর জিনিসের ক্ষেত্রে। মনে হয় মসজিদের কোনো গোপন কুঠুরিতে এখনো আংটিটি লুকিয়ে আছে। অথবা যে ব্যক্তির আঙুলে আছে, সে হয়ত এমন কোনো জায়গায় থাকে যেখানে কোনো পাখি নেই।’, ব্রাকলে উত্তর দিলেন।

‘কিংবা সে জায়গায় এত পাখি যে তাদের কিচির মিচিরে কোনো পাখির ভাষা আলাদা করে বোঝার কোন উপায় নেই। ব্রাকলে তোমার গল্প মনে হচ্ছে এসব নিয়ে রূপক-জাতিয় কিছু।’ ড্যানিয়েল থ্রপি অন্যদিকে তাকিয়ে বেশ জোরালো স্বরে কথাগুলো বললেন। তাকে বেশ নৈর্ব্যক্তিক দেখাচ্ছিল। সম্ভবত বহুকাল পূর্বে থাকার কারণে থ্রপির ইংরেজি উচ্চারণে অদ্ভুত একধরনের টান ছিল।

‘না রূপক নয়। যদি রূপকও হয় তবু এটা সত্য গল্প। পৃথিবীতে এমন অনেক বস্তু আছে যা আকাশছোঁয়া মূল্যের, যাদের বিক্রি করা যায় না।’ ব্রাকলে উত্তর দিলেন।

ব্রাকলের কথাগুলো আমি বোঝার চেষ্টা করলাম। তবে তার উচ্চারণের দৃঢ়তাই আমাকে আপ্লুত করল বেশি। মনে হল তিনি যেন আরও কিছু বলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। যেন এত সব বলে ফেলে অনুতপ্ত বোধ করছেন।

আমাদের শুভরাত্রি জানিয়ে কিছুক্ষণ পর ব্রাকলে বিদায় নিলেন। আমরাও একটু পরে হোটেলের দিকে রওয়ানা হলাম। যদিও তখন অনেক রাত হয়ে গেছে, থ্রপি বললেন, আমার সাথে তার না-কি কিছু কথা আছে। হোটেলের রুমে গিয়ে বলবেন।

প্রথমে আমাদের মধ্যে সাধারণ কিছু কথাবার্তা হল।

তারপর থ্রপি হঠাৎ করে বললেন, ‘আপনি কি বাদশা সলেমানের আংটি পেতে চান? আমি আপনাকে তা দিতে পারি। যদিও আংটি শব্দটি উপমা হিসাবে ব্যবহার করেছি। তবু উপমেয় বস্তুটি উপমার চাইতে কম আশ্চর্য নয়।

শেক্সপিয়রের স্মৃতিসম্ভার তার একদম ছোটবেলা থেকে ১৬১৬ পর্যন্ত; নেবেন আপনি? আমি একটি কথাও উচ্চারণ করতে পারলাম না। মনে হল, আমাকে একটি মহাসমুদ্র উপহার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

থ্রপি বলে চললেন, ‘আমি কোনো ভণ্ড নই; উন্মাদও নই, তবু আজকে আমার কথা শেষ-না-হওয়া পর্যন্ত, আপনার বিচার-বিবেচনা শক্তিটুকু একটু স্থগিত রাখলে ভাল হয়। আমার এই গল্পের পটভূমি হচ্ছে প্রাচ্য ভূ-খণ্ড। এক ভোরবেলা, কোনো এক হাসপাতালে গল্পটির শুরু। আপনাকে তো বলেছি, আমি একজন মিলিটারি চিকিৎসক ছিলাম। অ্যাডাম ক্লে নামক একজন সৈনিক ছিলেন, যার দু’বার গুলি লেগেছিল। আক্ষরিক অর্থেই, তিনি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছেন, তখন আমাকে এই মহামূল্যবান উপহারটি দিয়ে যেতে চান। জানেন তো, দুঃখ এবং ভোগান্তি আমাদের সৃজনশিল করে তোলে। আমি ঠিকমতো বিশ্বাস না করেই উপহারটি গ্রহণ করলাম। এছাড়া, যুদ্ধের পর এটাই একমাত্র ঘটনা, যা আমাকে বিস্ময় ও উত্তেজনার যোগান দিল। সৈনিকটির শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছিল, উপহারটি হস্তান্তর করতে হলে যে শর্তগুলো বলা দরকার, সে সব উচ্চারণের সময়ও তার ছিল না। যে এটা দান করবে, তাকে তা দান করার কথা জোরে জোরে বলতে হবে। আর যে গ্রহণ করবে, তাকেও একইভাবে উপহারটি গ্রহণ করার কথা শব্দ করে উচ্চারণ করতে হবে।

‘আক্ষরিক অর্থ’ শব্দটি সর্বোচ্চ খারাপ অর্থে গ্রহণ করলে যা দাঁড়ায় তাহল সৈনিকটির নাম এবং তার উপহার প্রদান করার করুণ দৃশ্য আমাকে দারুণভাবে আঘাত করল। আমি পুরো ব্যাপারটিকে কিছুটা বাঁকা চোখে দেখলাম।

‘তাহলে আপনি এখন শেক্সপিয়রের স্মৃতিসম্ভারের মালিক?’ আমি জানতে চাইলাম।

‘আসলে আমার করোটির ভেতর দু’ধরনের স্মৃতি কাজ করে। একটি আমার নিজস্ব, অন্যটি শেক্সপিয়রের— সেটাও অংশত আমার। অথবা বলা যায়, এই দুইটি স্মৃতি যৌথভাবে আমার দখল গ্রহণ করেছে। যে বিন্দুতে এই স্মৃতি দু’টি পরস্পরকে ছুঁয়ে আছে, সেখানে একটি মেয়ের মুখ মনে পড়ে। জানি না, সেটা কোন শতকের স্মৃতি।’ থ্রপি বললেন।

‘শেক্সপিয়রের স্মৃতি দিয়ে আপনি কি করেছেন?’ জিজ্ঞাসা করলাম।

ঘরের মধ্যে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা বিরাজ করল।

ধীরে ধীরে থ্রপি উত্তর দিলেন, ‘আমি একটা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস লিখি যা সমালোচকের ভৎর্সনা লাভ করে। অবশ্য আমেরিকা ও কলোনিগুলোতে এই উপন্যাসটির কপালে কিছু আর্থিক সাফল্যও জোটে। আমার মনে হয়… এছাড়া আর কিছুই ঘটেনি। তবে আমি আপনাকে সতর্ক করে দিতে চাই আমার উপহার কিন্তু এমন আরামদায়ক কোনো জিনিস নয় যাতে শুধু সুবিধাই পাওয়া যাবে, ঝামেলা হবে না। আপনি যদি রাজি থাকেন তাহলে বলুন। আমি এখনো আপনার উত্তরের অপেক্ষা করছি।

আমি ভাবতে শুরু করলাম। আমি কি আমার সারাজীবন শেক্সপিয়রের অন্বেষণেই কাটাইনি? যত জৌলুসহীন আর সাদামাটা হোক না কেন সে জীবন। এটাই কি ভাল না আমার সব পরিশ্রমের শেষে তাঁকে আমি খুঁজে পাব।

প্রতিটি শব্দ আমি খুব ধীরে-ধীরে যত্নের সঙ্গে উচ্চারণ করলাম।

‘আমি শেক্সপিয়রের স্মৃতিসম্ভার গ্রহণ করলাম।’

কিছু একটা ঘটল যে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তবে খুব জোরালোভাবে আমি তেমন কিছু অনুভব করলাম না। সম্ভবত ক্লান্তির কারণে এরকম ঘটল। … অথবা কল্পনাও হতে পারে। থ্রপির কথাগুলো এখনো আমার স্পষ্ট মনে পড়ছে।

তিনি বলেছিলেন, ‘এই স্মৃতি আপনার মস্তিষ্কে প্রবেশ করেছে। তবে একে আবিষ্কারের দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে। হয়ত আপনার ঘুমের ভেতর সে আত্মপ্রকাশ করবে কিংবা যখন আপনি জেগে আছেন, বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছেন, রাস্তার মোড় ঘুরছেন— এমন সময়ও তার আবির্ভাব ঘটতে পারে। অস্থির হবেন না, জোর করে স্মৃতিচারণ করার দরকার নেই। এই বস্তুর রহস্যময় কার্যকলাপ এমনিতেই শুরু হয়ে যাবে। কিংবা সে হয়ত কিছুটা ইতস্তত করবে তার কাজ শুরু করার আগে। আমি যে ভাবে ধীরে-ধীরে ভুলে যাব আপনারও সেভাবে আস্তে-আস্তে মনে পড়বে। কি জানি, কত দিন লাগবে আপনার ভেতর ঐ স্মৃতির জাগরণ হতে।

সারারাত শাইলক চরিত্রটি নিয়ে আমরা আলোচনা করলাম। শেক্সপিয়র ব্যক্তিগতভাবে কোনো ইহুদি চরিত্রকে চিনতেন কি-না সেটা আমি মনে করার চেষ্টা থেকে নিজেকে বিরত রাখলাম। আমি চাইছিলাম না যে থ্রপি ভাবুক, আমি তাকে পরীক্ষা করে দেখতে চাচ্ছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি বুঝতে পারলাম (জানি না এতে বিচলিত না আশ্বস্তবোধ করলাম) যে থ্রপির চিন্তাধারা প্রায় আমার মতোই গতানুগতিক আর প্রাতিষ্ঠানিক ধারার।

সারারাত ঘুম এল না। পরের রাতেও দু’চোখের পাতা এক করতে পারলাম না। অতীতে যেমন বহুবার মনে হয়েছে তেমনিভাবে এবারও মনে হল আমি আসলে একটা কাপুরুষ। ভয় আর বিষাদ আমাকে ঘিরে ধরল। নিজেকে আশার উদার বাহুতে সঁপে দিতে পারলাম না। আমি ভাবতে চাইলাম, থ্রপির এই উপহার আসলে কাল্পনিক। কিন্তু আবার আশা আমাকে ঘিরে ধরল। আমি শেক্সপিয়রকে পেয়েছি— এমনভাবে পেয়েছি যেমনভাবে আর কেউ তাকে কখনও পায়নি। ভালবাসা, ঘৃণা কিংবা বন্ধুত্বের সম্পর্ক এ নয়। আমি নিজেই শেক্সপিয়র। তার মানে আবার এই নয় যে, আমি ঐসব জটিল সনেট কিংবা ট্রাজেডির  স্রষ্টা। কিন্তু আমি সেই সব মুহূর্তকে মনে করতে পারব যখন ডাকিনির (যাদের ভাগ্যও বলতে পারি) কল্পনা মনের ভেতর জেগে উঠত কিংবা সেই সব আশ্চর্য পংক্তি সৃষ্টির মুহূর্ত।

And shake the yoke of inauspicious stars

From this world wearied flesh.

আমি এ্যানি হ্যাথওয়েকে মনে করতে পারব, যেমন আমি মনে করতে পারি সেই নারীকে, যে লিউবেক এক অ্যাপার্টমেন্টে আমাকে শিখিয়ে ছিল কিভাবে ভালবাসতে হয়। সে বহুবছর আগের কথা। আমি সেই নারীর মুখ মনে করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু আমার শুধু মনে পড়ল তার রুমের হলুদরঙা ওয়াল পেপারটির কথা ; যা খোলা জানালা দিয়ে এসে পড়া আলোয় ভেসে যেত। আমি তাকে মনে করতে পারছি না হয়ত এটা আমার মস্তিষ্কে শেক্সপিয়রের স্মৃতি আবির্ভাবের প্রথম পূর্বাভাষ।

আমি ধারণা করেছিলাম, এই আশ্চর্য স্মৃতির সমারোহ আমার চোখের সামনে একের পর এক ছবির মতো ভেসে উঠবে। কিন্তু সে রকম কিছু ঘটল না। কিছুদিন পরের ঘটনা। আমি শেভ করছিলাম এমন সময়, আয়নার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ টানটান, ঋজু কিছু শব্দ উচ্চারণ করলাম— যা আমাকে হতবাক করে দিল। একজন সহকর্মীর কাছ থেকে জানতে পারলাম এই পংক্তিগুলো চসারের। একদিন বিকালে যাদুঘর থেকে বের হবার সময় আমি খুব সাধারণ একটি সুরে শিস দিয়ে গাইতে শুরু করলাম। এই সুরটি আমি আগে কখনো শুনিনি। আমার মস্তিষ্কে এভাবে দু’বার দু’ধরনের স্মৃতির ঝিলিক খেলে গেল। পাঠকরা নিশ্চয়ই এই দুই স্মৃতির মধ্যে সাধারণ একটি সূত্র লক্ষ করেছেন— এরা দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়, শ্রুতিগ্রাহ্য।

ডি-কুইনসির ভাষায় মানুষের মস্তিষ্ক হচ্ছে এমন এক ধরনের পাণ্ডুলিপির মতো যাতে নতুন কিছু লেখার জন্য পুরাতন লেখা মুছে ফেলতে হয়। নতুন স্মৃতি পুরাতন স্মৃতির অধ্যায়গুলোকে ঢেকে দেয়।

শেক্সপিয়রের যে উইল পাওয়া গেছে তাতে তার রেখে যাওয়া সম্পদের মধ্যে বইয়ের কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি বাইবেল ও অন্যান্য বই যেগুলো তিনি ঘন ঘন বাঁধাই করতে দিতেন যেমন, চসার, গাওয়ার, স্পেন্সার, ক্রিস্টোফার মার্লো, হলিন শেভেন, প্লুটার্ক এসবও নেই।

আমি আমার মস্তিষ্কে ধারণ করেছি এমন স্মৃতিসম্ভার যা সম্ভবত শেক্সপিয়রের ছিল। তার বইয়ের খণ্ডগুলো আবার পড়া আমার জন্য খুব উদ্দিপক ছিল। তার সনেটগুলো আমি আবার পাঠ করলাম যেগুলো তার তাৎক্ষণিক সৃজনশিলতার এক অপূর্ব নিদর্শন ছিল। মাঝে মধ্যে এই সব রচনার মধ্যে এক বা একাধিক ব্যাখ্যার নাগাল পেতাম। ভাল লাইনগুলো জোরে-জোরে না পড়লে তৃপ্তি হয় না। কিছু দিনের মধ্যে আমি ষোড়শশতকের কর্কশভাবে উচ্চারিত ৎ এবং মুক্ত স্বরবর্ণ আয়ত্ত করে ফেললাম।

‘Zeitschrift fur Germanische Philigic’এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে আমি লিখেছি ১২৭ নং সনেটটি স্পেনিশ আর্মাডার সেই স্মরণিয় পরাজয়কে উদ্দেশ্য করে লেখা। আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে, স্যামুয়েল বাটলার ১৮৯৯ সালে এই কথা লিখে গেছেন।

স্টার্টফোর্ড-আপন-আভন এ বেড়াতে যাওয়া সঙ্গত কারণেই যথেষ্ট নিষ্ফলা হল।

এরপর দেখা গেল ক্রমে ক্রমে আমার স্বপ্নও পরিবর্তিত হচ্ছে। লা ডি কুইনসির মতো জমকালো দুঃস্বপ্ন কিংবা তার গুরু জ্যাঁ পল-এর মতো ধর্মিয় প্রতিকি দৃশ্য দেখা আমার ভাগ্যে ছিল না। আমার স্বপ্নের ভেতর দেখা দিতে লাগল অচেনা সব মানুষ আর কক্ষের দৃশ্য।

একদম প্রথমে চ্যাপম্যানকে আমি সনাক্ত করতে পারলাম। তারপর চিনতে পারলাম বেন জনসনকে। আরেক জনকে চিনলাম, যিনি ছিলেন শেক্সপিয়রের প্রতিবেশি। তার কথা অবশ্য জীবনীগ্রন্থগুলোতে উল্লেখ পাই, কিন্তু শেক্সপিয়র তাকে প্রায়ই দেখতেন।

একজন মানুষের কাছে একটি এনসাইক্লোপিডিয়া থাকতে পারে তার মানে এই নয় যে তার প্রতিটি বাক্য, অনুচ্ছেদ, পৃষ্ঠা কিংবা অলংকার সে মুখস্থ বলতে পারবে। সে শুধু এই সব বিষয়ের সাথে ভালভাবে পরিচিত হবার একটি সম্ভাবনার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয়।

নিখাদ বাস্তব জিনিসের ক্ষেত্রে যদি এমন ঘটনা ঘটে। (আমি বলতে চাইছি যা বর্ণনানুক্রমে সাজানো) তা হল যা তুলনামূলকভাবে বিমূর্ত ও পরিবর্তনশিল তার ক্ষেত্রে কি ঘটতে পারে একজন মৃত মানুষের অলিক স্মৃতিসম্ভারের ক্ষেত্রে?

সমগ্র অতীতকে এক মুহূর্তে ধারণ করা কারো পক্ষেই সম্ভব না। যতদূর জানা যায়, শেক্সপিয়রের এমন কোনো ক্ষমতা ছিল না। আমি শেক্সপিয়রের অংশত উত্তরাধিকারি আমার পক্ষে সেই সম্ভাবনা তো আরও কম।

মানুষের স্মৃতি কোন কিছুর সার-সংক্ষেপ নয় এটা আসলে বহু বিমূর্ত সম্ভাবনার বিশৃংখল সমারোহ।

যদি আমি ভুল বুঝে না থাকি, সেন্ট অগাস্টিন স্মৃতির বিভিন্ন মহল ও গহ্বরের বর্ণনা দিয়েছেন। দ্বিতীয় অলংকারটি আমার কাছে বেশি লাগসই মনে হয়। কারণ আমি তো স্মৃতির সেই গহ্বরেই পতিত হয়েছি। আমাদের সবার মতোই শেক্সপিয়রের স্মৃতির জগৎ, বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত; ছায়াঘেরা অঞ্চল। আবার স্মৃতির এমন কিছু অঞ্চল আছে; যেগুলো থেকে তিনি দূরে থাকতে চান।

রীতিমতো তড়িতাহত হলাম, যেদিন প্রথম মনে করতে পারলাম বেন জনসন শেক্সপিয়রকে দিয়ে কিভাবে ল্যাটিন এবং গ্রিক ষটপদি কাব্য আবৃত্তি করাতেন।

আমি মানুষের জীবনকে উত্তাল করে দেয়া আনন্দ ও দুঃখের মুহূর্তগুলোর কথা জানলাম।

খুব সচেতনভাবে না হলেও এক ধরনের মনোসংযোগ ও ধ্যানের মধ্যে দিয়ে আমি প্রস্তুত হচ্ছিলাম, সেই অলৌকিক স্মৃতিসম্ভারকে আয়ত্তে আনতে। একসময় সেই মৃত ব্যক্তির স্মৃতিসত্তা আমার মধ্যে প্রবলভাবে জীবন্ত হয়ে উঠল। এর মধ্যে একটি সপ্তাহে নিজের মধ্যে উদ্দিপনার জোয়ার লক্ষ করলাম। নিজেকে শেক্সপিয়র মনে হল। তার অসামান্য সৃষ্টিগুলো আমার জন্য নতুন হয়ে উঠল। আমি জানতে পারলাম শেক্সপিয়রের কাছে চাঁদ ছিল দেবি ডায়ানা।

আমি আরেকটি জিনিস আবিষ্কার করলাম, লেখার ব্যাপারে শেক্সপিয়র খুব বেশি নিখুঁত ছিলেন না। এ-সম্বন্ধে হুগোর কৈফিয়তগুলো খুব সুচিন্তিত ছিল। শেক্সপিয়রের বইগুলোতে শব্দ-ব্যবহার নির্ভুল ছিল। তাই তার নাটকের চরিত্রগুলো মঞ্চে যে বক্তৃতা দিত তা এত জীবন্ত ও স্বতস্ফূর্ত মনে হত। কৃত্রিম বা আরোপিত শুদ্ধতা তাদের মধ্যে ছিল না।

একইভাবে তাঁর অলংকারগুলোকে মিশ্র বৈশিষ্ট্যময় করে তুলতেন তিনি।

My way of life

Is fall’n into the sear, the yellow leaf.

আমার জীবন ঝলসে গেল

হয়ে গেল হলদে পাতা।

একদিন সকালে তাঁর মনের মধ্যে এক ধরনের অপরাধবোধের অস্তিত্ব আমি টের পেলাম। আমি তার ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলাম না; যা শেক্সপিয়র সারাজীবন করেছেন। আমার মনে হয়, এটা বলাই যথেষ্ট যে পাপ আর বিকৃতি এক জিনিস নয়। আমি বুঝতে পারলাম, মানুষের আত্মা তিনটি ভাগে বিভক্ত। স্মরণ, মনন ও ইচ্ছাশক্তি। আমি কিন্তু পাণ্ডিত্য দেখানো কোনো মিথ্যে গালগল্প করছি না।

শেক্সপিয়রের স্মৃতিজগৎ আমাকে মানুষ শেক্সপিয়র ও তার পারিপার্শ্বিকতা বুঝতে সাহায্য করল। একজন অসাধারণ কবির সামাজিক বা পারিবারিক পরিস্থিতি নিশ্চয়ই সেই কবির মতো অসাধারণ কিছু হয় না। তবু চারপাশের এই সব তুচ্ছ ক্ষণস্থায়ী বিষয় নিয়েই একজন কবি তার কাব্যরচনায় ব্রতি হন।

আমি লেখক নই। লেখার কলাকৌশল আমার আয়ত্তে নেই। থ্রপির মতো জীবনীগ্রন্থ লেখা আমার পক্ষে সম্ভব না। শিঘ্রই বুঝতে পারলাম সাহিত্যসৃষ্টি প্রতিভার ব্যাপার যা আমার নেই। আমার নিজের জীবনের গল্প কিভাবে লিখব, তা-ই আমি জানি না। যদিও সেই জীবন শেক্সপিয়রের চাইতে কম আকর্ষণিয় নয়। কিন্তু প্রতিভা ছাড়া যে কোনো বই তাৎপর্যহীন হয়ে যেতে পারে।

জীবন বা অদৃষ্ট শেক্সপিয়রকে এমন সব পরিস্থিতির সম্মুখিন করেছে, যার মুখোমুখি কমবেশি সব মানুষকেই হতে হয়। তাঁর অপূর্ব প্রতিভাই জীবনের প্রাত্যহিক ঘটনাগুলোকে অপরূপ গল্পে পরিণত করেছে; আশ্চর্য সব চরিত্র সৃষ্টি করেছে যে সব চরিত্র ঐ স্রষ্টা মানুষটির চেয়ে অনেক বেশি বর্ণিল ও জীবন্ত। কোনো প্রজন্মের পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না, সেই সব অসাধারণ চরিত্র আর সংগীতময় ভাষাকে পেছনে ফেলে চলে আসা।

কি হবে তার জীবনকে উন্মোচন করে? বিস্ময়কর সৃষ্টিগুলোর জট খুলে? প্রতিভার দুর্গকে অবরোধ বা ধ্বংস করে?

কোন বাস্তবধর্মি উপন্যাস, তথ্যচিত্র কিংবা জীবনীর পক্ষে কি সম্ভব ম্যাকবেথের সেই জমকালো আতংকের পৃথিবীকে নির্মাণ করা?

জার্মানির আনুষ্ঠানিক ধর্ম হচ্ছে গ্যোটে। কিন্তু শেক্সপিয়রের সাথে আমাদের সম্বন্ধ যেন কিছুটা আন্তরিক। যাকে স্মরণ করার মধ্যে এক ধরনের অতীত স্মৃতিবিধুরতাও জড়িয়ে থাকে। ইংল্যান্ডের আনুষ্ঠানিক ধর্ম হচ্ছে শেক্সপিয়র। অথচ ইংরেজদের চেয়ে তিনি কত ভিন্ন। অবশ্য ইংল্যান্ডের পবিত্রতম বই হচ্ছে বাইবেল।

প্রথম প্রথম জীবনের এই নতুন অধ্যায় আমাকে পুলকিত করে তুলত। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই ভয় আর দুশ্চিন্তায় আমি অস্থির হয়ে উঠলাম। শুরুতে দু’টো স্মৃতি পৃথকভাবে প্রবাহিত হত; পরস্পরের সাথে মিশে যেত না। কিন্তু একসময় দেখা গেল, বন্যার তোড়ের মতো শেক্সপিয়রের স্মৃতির প্রবাহে আমার অসহায় স্মৃতিগুলো তলিয়ে যাচ্ছে।

বলতে অস্বস্তি লাগছে যে, আমি আমার মা-বাবার শেখানো ভাষাও যেন ক্রমে ক্রমে ভুলে যেতে লাগলাম। অতীতের কথা স্মরণ থাকে বলেই আমরা আমাদের পরিচয়কে চিহ্নিত করতে পারি। আমি আমার মানসিক ভারসাম্য হারাবার আতংক অনুভব করলাম।

বন্ধু-বান্ধবরা প্রায়ই আসত আমার বাসায়। অথচ আশ্চর্য ব্যাপার যে, তারা কেউ অনুভব করতে পারত না আমি কোন নরকে আছি।

একদিন সকালে প্রচণ্ড বিশৃংখল শব্দে কানে তালা লেগে গেল। কাঁচ, লোহা, কাঠ ইত্যাদির মিশ্র শব্দে মনে হল কামারশালায় কোনো জিনিস তৈরি করা হচ্ছে। আমি যে একটি স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি, চারপাশে গাড়ি যাচ্ছে; তাদের ইঞ্জিনের শব্দ শুনছি, এটা বুঝতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগল। মনে হল যেন অনন্তকাল ধরে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রতিটি মানুষকে তার বর্ধিত স্মৃতির ভার বহন করে যেতে হয়। আর আমি হাবুডুবু খাচ্ছি দু’টো স্মৃতির মাঝখানে। আমার এবং যোগাযোগহীন তাঁর স্মৃতির মাঝপথ দিয়ে আমি যেন টলতে টলতে হেঁটে চলেছি।

স্পিনোজা বলেন— প্রতিটি জিনিস নিজের মতো থাকতে চায়। পাথর থাকতে চায় পাথরের মতো। বাঘ বাঘের মতো। আর আমি হারম্যান সরহেল আমার মতোই জীবন কাটাতে চাই।

কবে এই অবস্থা থেকে আমি সম্পূর্ণ মুক্তি চাইলাম তা আমার মনে নেই। সব চেয়ে সহজ একটি পদ্ধতি খুঁজে নিলাম। এলোপাথাড়ি বিভিন্ন ফোন নাম্বারে ডায়াল করতে লাগলাম। সবসময়ই অপরপ্রান্ত থেকে মহিলা বা শিশুকণ্ঠের উত্তর শোনা যেত। আমি বিশ্বাস করি, তাদের কোনো ধরনের নাজুক পরিস্থিতিতে ফেলা খুবই গর্হিত কাজ। অবশেষে একদিন একটি মার্জিত পুরুষ কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম।

‘তুমি কি’, আমি জানতে চাইলাম ‘শেক্সপিয়রের স্মৃতিসম্ভার গ্রহণ করতে চাও?’ চিন্তা করে তারপর উত্তর দাও। এটা পবিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার কিন্তু প্রমাণসাপেক্ষ নয়।’

অবিশ্বাস্যভাবে উত্তর আসল, ‘আমি ঝুঁকি নিলাম’।

আমি উপহার বিনিময়ের শর্তগুলো ব্যাখ্যা করলাম। আমি পরস্পরবিরোধি দুইটি অনুভবে আপ্লুত হলাম। যে বইটি আমার লেখা উচিত ছিল তার জন্য কাতরতা বোধ করতে লাগলাম। আবার ভয় হচ্ছিল, এই ভেবে যে, এই অশরীরি স্মৃতির দঙ্গল আমাকে ছেড়ে যাবে না।

রিসিভার ছেড়ে দিয়ে আমি বাতিল হয়ে যাওয়া শব্দগুলো প্রার্থনার মতো করে উচ্চারণ করলাম।

Simply the thing I am shall make me live.

সেই দুর্লভ প্রাচীন স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে আমি কত চেষ্টা ও পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলাম। আবার সেটা মুছে ফেলার জন্য আমাকে অন্যের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। সুইডেনবার্গ-এর বিদ্রোহি শিষ্য উইলিয়াম ব্লেকের কিংবদন্তি সম্পর্কে পড়াশোনা করা অনেক চেষ্টার মধ্যে একটি। যেকোনো মিশ্র বিষয়ের চেয়ে এটা তুলনামুলকভাবে কম জটিল ব্যাপার মনে হল।

তবে আমি জানি, যেকোনো পথ অন্বেষণই নিষ্ফল। সব রাস্তাই শেক্সপিয়রের দিকে ধাবিত। অবশেষে অপ্রত্যাশিতভাবে আমি একটি পথেরই সন্ধান পেলাম। তা হচ্ছে বাখের নিখুঁত, বিশাল সংগীত জগৎ।

আমি এখন বহু মানুষের ভিড়ে একজন মানুষ। জাগ্রত অবস্থায় আমি প্রফেসর হারম্যান সরহেল। বহু পাণ্ডিত্যপূর্ণ বাজে জিনিস লিখি।  কিন্তু ভোরের দিকে কখনও কখনও মনে হয়, যে মানুষটি সারারাত স্বপ্ন দেখেছে, সে হয়ত অন্য কেউ ছিল। সন্ধ্যের সময় কিছু-কিছু স্মৃতির ঝিলিক আমাকে বিচলিত করে তোলে, সেই সব স্মৃতি কিন্তু অলিক গল্প নয়।

মূল: হোর্হে লুইস বোর্হেস

অনুবাদ : নাহিদ আহসান

বর্ষ ২, সংখ্যা ৪, আগস্ট ২০০৩

শেয়ার করুন: