004588
Total Users : 4588
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →
জন্ম— জুন, ০৬, ১৯৭৭। জন্মস্থান— উত্তর গোবীন্দর খীল, হাঁদু চৌধুরী বাড়ী, পটিয়া, চট্টগ্রাম। (শৈশব কৈশোর ও তারুণ্যের সময়যাপন) বেড়ে ওঠা (পূর্ব্ব বালিয়াদী, মীরশ্বরাই, চট্টগ্রাম) নানার বাড়ীতে। প্রকাশিত কবিতার বই— ফুলেরা পোষাক পরে না (সাল: ২০১৮, প্রকাশক : মনফকিরা, কলিকেতা)। প্রকাশিতব্য বই— অর্দ্ধনারীশ্বরবাদ : প্রকৃতিপুরুষতত্ত্ব (নন্দনতত্ত্ব), বটতলার বয়ান (ভাষাতাত্ত্বিক গদ্য) ও উদ্ভিদপ্রতিভা (কবিতা)। সম্পাদক— চারবাক।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

সময়ের চিহ্নায়ন, উপনিবেশিকতা এবং সাম্প্রতিক গদ্য

কলম্বাস সত্যিকার অর্থেই একজন আমেরিকান প্রশাসক। তার কৃতিত্ব যতো না সভ্যতায় ততো বেশি জয়, দাস-প্রথার বিস্তার, ধর্ষণ, গণহত্যা ইত্যাদিতে। কেন না আজ আমেরিকানরা যে ঐতিহ্যের ধারক এটা তাই বলে। হয়তো কোনো রোগবালাই একটি নৃ-সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু বর্বর নৃশংসতার দ্বারাও যে একটি জনগোষ্ঠি সম্পূর্ণ নিশ্চি‎হ্ন হয় তা দেখে আমরা হতভম্ব। কোনিং দেখিয়েছেন, কলম্বাস ও তার জাতভাইদের সাতবছরের স্পেনিশ শাসনে অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠি নিশ্চি‎হ্ন হয়েছে এবং এমন ঘটনা ঘটেছে যে স্বর্ণমুদ্রা না দিতে পারায় কারও হাত কেটে নেয়া হয়েছে। একটি সংস্কৃতির এহেন বিচিত্র ও জটিল বিষয়গুলোর সিদ্ধান্ত আমরা জর্জ বুশের উদাত্ত আহবান আকারে শুনি, ‘আসুন আবার আমরা নতুন পৃথিবী গড়ি’। ইরাক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বারংবার উচ্চারিত এ আহবান আমাদের মাঝে এ ছাপই ফেলে যে, ৫০০ বছর আগে কলম্বাসের আমেরিকা আগ্রাসনের মাধ্যমে যার শুরু হয়েছিল তারই হয়তো পুনরাবৃত্তি ঘটবে। উপনিবেশবাদ ও উত্তর-উপনিবেশিক পাঠ, সম্পা. ফকরুল চৌধুরী, পৃ. ৬৫, ২০০৭

 

আমি ভারতের দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ঘুরেছি এবং একটিও ভিখিরি অথবা চোর আমার নজরে পড়েনি। এমন সম্পদ আমি দেখেছি এই দেশে, এই উঁচু নৈতিক মূল্যবোধ, এত মেধাবি মানুষজন-আমি মনে করি না, এই দেশকে প্রকৃত অর্থে জয় করা যাবে, যদি না এই জাতির মেরুদণ্ড আমরা ভেঙে দিতে পারি-যা হ’ল তার আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সুতরাং আমার প্রস্তাব হল, তার পুরনো ও প্রাচিন শিক্ষাব্যবস্থা, তার সংস্কৃতিকে প্রতিস্থাপিত করা-যাতে ভারতবাসিরা ভাবতে শুরু করে যে, যা কিছুই বিদেশি ও ইংরেজি তা-ই ভালো এবং নিজেদেরটির চেয়ে ঢের ভালো-যার ফলে তারা তাদের আত্মসম্মানবোধ, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে হারাবে এবং তারা হয়ে উঠবে, যা আমরা চাই, একটি বিশ্বস্ত পরাধিন জাতি। ২ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৩ বৃটিশ পার্লামেন্টে প্রদত্ত লর্ড মেকলে’র ভাষণ

 

ক’বছর আগে প্রায় প্রতিটি দৈনিকে ফলাও করে একটি খবর বেরিয়েছিল- ‘গ্রামিণ ফোন এবছর সরকারকে ২০০ কোটি টাকা দেবে’। খবরটি এমনভাবে পরিবেশন করা হয় যাতে মনে হতে পারে দয়া করে গ্রামিণ ফোন সরকারকে ২০০ কোটি টাকা দিচ্ছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে আজ প্রমাণিত সত্য এই বিভিন্ন কর্পোরেট কোম্পানিগুলো শুধুমাত্র করফাঁকিই দেয়নি, তাদের ফাঁকির পরিমাণও অসামান্য। এরই মাঝে বিটিআরসি গ্রামিণ ফোনের কাছে পাওনা ৩০৩৪ কোটি টাকা দাবি করেছে, এবং অমিমাংসিত প্রায় ১৫টি খাতের তালিকা দিয়েছে সেখান থেকেও পাওনা আরো বাড়বে আশা করা যায়। শুধুমাত্র কথাবিক্রি করে কি পরিমাণ টাকা কর্পোরেট কোম্পানিগুলো সরিয়েছে তা ভাবতে গেলেও অবাক মানতে হয়। ব্রিটিশের দুশ বছরের শাসন এবং ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণ নিয়ে যতটা উচ্চকণ্ঠ আমরা ততটাই নিম্নকণ্ঠ মোবাইল কোম্পানিগুলোর কথা ভেল্কিবাজির মহোৎসব নিয়ে। বলা হয়, ব্রিটিশের দুশ বছরের শাসনেও এত টাকা পাচার হয়নি যতটা হয়েছে ক’বছরের কথার যাদুতে। উর্দু কিংবা আরবি হরফে বাংলা লেখাবার চেষ্টা বেশি দিন আগের নয়, বুকের তাজা রক্তে প্রতিবাদ-প্রতিরোধে সে চেষ্টা বাদ দিতে হয়। কালের নিয়তি বহুজাতিক আগ্রাসন-বিপণনে আজ আমরা অজান্তেই ইংরেজি হরফে বাংলা লিখছি কোনো প্রতিরোধ বা প্রতিবাদের কথা চিন্তা না-করেই। আগ্রাসনের, উপনিবেশের প্রত্যক্ষ ধরনধারণায় পরিবর্তন এসেছে। বলা হচ্ছে, সাম্রাজ্যবাদি শক্তির প্রত্যক্ষ শারীরিক উপস্থিতির দরকার নেই আজ কোন দেশের উপর খবরদারি নজরদারি বজায় রাখার জন্য। এবং প্রত্যেক দেশে সাম্রাজ্যবাদি শক্তি তাদের প্রয়োজন অনুযায়ি সৃষ্টি করে অনুগতশ্রেণির। গণমাধ্যমকে পরিণত করে প্রভুশক্তির স্বেচ্ছাবৃত দাসে। নব্য-উপনিবেশবাদ উপগ্রহ প্রযুক্তিকে কব্জা করে মহাকাশে জাল বিছিয়ে দিয়েছে। অজপাড়া থেকে মহানগর পর্যন্ত বিজলিবাতির চমক-ঠমক, গণমাধ্যম তাদের মোহিনিমায়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। দেশিবিদেশি টেলিভিশন, চ্যানেলের পর চ্যানেল, ইথারতরঙ্গে ভাসছে সস্তা মজা, আমোদ ও মাদকের সমারোহ। পণ্যসর্বস্ব দুনিয়া, বাজারের বিক্রয়যোগ্যতাই তার মূল্য নির্ধারক। যন্ত্রপ্রযুক্তির ঔদ্ধত্য আজ উপনিবেশবাদ শৃঙ্খলিত পিছিয়ে পড়া দেশগুলির সামাজিক ও নান্দনিক স্বকিয়তাকে মুছে ফেলছে কৌশলে। সাম্রাজ্যবিস্তারের প্রধানতম উদ্দেশ্য বাণিজ্য প্রবণতার সাথে জড়িত তাই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো আখের ভালোই গোছাচ্ছে। আর এখনতো ব্রাণ্ডযুগ। নামের কি বাহার, হরেক নামে সরব উপস্থিতি তাদের-কোকাকোলা, স্প্রাইট, বাটা, ক্রোকোডাইল, আইবিএম। এককালে বলা হতো ব্রিটিশ সূর্য কখনো অস্তমিত হয় না। তার জায়গায় এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারি, পৃথিবীর রাজা। তাবৎ পৃথিবীর উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ। জাতিসংঘ, আইএফএম, বিশ্বব্যাংক তাদের করতলে। রাশিয়ার পতনের পর শিতলযুদ্ধের অবসান ঘটেছে বলা হলেও আসলে একক নিয়ন্ত্রণের কবলে পড়ে গেছি আমরা।


অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ, অনুকূল পরিবেশ, কৃষিপ্রধান এই দেশে সহজেই জীবিকা নির্বাহ করা যেত, ফলে জীবিকানির্বাহের জন্য ভাবতে হত না কখনোই। বহির্বিশ্বে বেরিয়ে পড়বার আকুতি ছিল না মানুষের মনে। অতিথিপ্রিয়তা, বন্ধুবাৎসল্য, ন্যায়পরায়ণতা, আত্মজিজ্ঞাসা প্রাধান্য পেত। একসময় প্রবল শারীরিক উপস্থিতি ছিল সাম্রাজ্যবাদি শক্তির। ভারতিয় প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখা যায় ভারতের অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ লোভি দস্যুদের সবসময়ই হাতছানি দিয়েছে, ফলে একের পর এক বিদেশিরা এদেশে এসেছে,-ভাগ্যান্বেষণে, কখনো ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে, কখনো শুধুমাত্র লুণ্ঠন করবার অভিপ্রায় নিয়েই। অবশ্য কেউ কেউ পরবর্তিতে থিতু হয়েছেন, কেউবা থাকেননি। আর্য থেকে শুরু করে আরববণিক, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ব্রিটিশ সবার আকর্ষণ ছিল এদেশের প্রাকৃতিক সম্পদে। সাম্রাজ্যকে স্থায়ি এবং দীর্ঘমেয়াদি করতে তাই কিছু কিছু আইন-কানুন, তথ্য তথা ডাকবিভাগ যোগাযোগব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হয় তাদের। এটি এমন নয় যে শুধু উপনিবেশিক জনগণস্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছিল, মোদ্দাকথা হল নিজের প্রয়োজন।

আর্য-অনার্যের দ্ব›দ্ব-সংঘাতে আর্যদের বড় করে দেখাবার বাতিক আজকের নয়। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের বিভেদ রেখায় ইচ্ছাকৃতভাবে প্রাচ্যকে হেয় করে দেখাবার প্রবণতাও সুদীর্ঘকালের। সচেতনভাবেই আমরা ভুলে আছি যে, পাক-ভারত অথবা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ নিজেকে পাশ্চাত্য মানুষের কাউন্টার প্লেয়ার কিংবা প্রতিপক্ষ ভাবেনি কখনোই, আর এভাবে ভাবার কারণও নেই। প্রাচ্যে যেদিন থেকে পাশ্চাত্য হাওয়া সঞ্চারিত হতে শুরু করে সেদিন থেকেই অনেক কিছুর মতো এই দিকটিরও পরিবর্তন হল। মধ্যযুগে মধ্যপ্রাচ্যে অনেক ইউরোপিয়ই আসতেন এ্যরিস্টটল পড়তে। ওয়ারেন হেস্টিংস-এর মতো প্রথম প্রজন্মের অনেক উপনিবেশিক প্রতিনিধিরাও মনে করতেন, ভারতবর্ষ থেকে তাদের শেখার আছে অনেক। উপনিবেশ বিস্তারের প্রথমপর্বে ‘ব্যান্ডিট-কিং’রা উপনিবেশগুলোকে বল-প্রয়োগমূলক পদ্ধতির সাহায্যে দখলে নিয়েছিল। সরাসরি তারা মানুষ হত্যা করত, অঙ্গচ্ছেদ ও সম্পদ লুঠ করত। দ্বিতীয় পর্বে উপনিবেশিক-চৈতন্যের বিস্তারের ক্ষেত্রে পরিশ্রমি, দায়বদ্ধ, মধ্যবিত্ত মিশনারিদের ভূমিকা ছিল প্রধান। দ্বিতীয়পর্বে সাম্রাজ্যবাদিরা শরীরের সঙ্গে সঙ্গে চৈতন্যের যোগে সমাজকাঠামোর অন্তর্লিন স্তর থেকে এমন কিছু শক্তি সঞ্চয় করতে পেরেছিল, পরিণতিতে সংস্কৃতির প্রাথমিক চরিত্রকেও স্থায়িভাবে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয় তারা; যার রেশ আমাদের টানতে হচ্ছে এখনো। উপনিবেশিক মানুষের মননকাঠামোয় বদ্ধমূল ধারণা সঞ্চার করতে সক্ষম হয় যে জ্ঞানের আলো জ্বালানোর জন্য সাম্রাজ্যবাদিদের দরকার। আর একথা তো সত্যিই বাষ্পিয় ইঞ্জিনের আবিষ্কার, যন্ত্রসভ্যতার অভাবনিয় উন্নতি সাম্রাজ্য বিস্তারকে দ্রুত করেছে।


প্রকৃত অর্থেই প্রাকৃতিক সম্পদ আমাদের জন্য দুঃখের কারণ হয়ে গেল। সভ্যতার যে নিদর্শন একান্তভাবেই ভারতের তা হারিয়ে গেল। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জায়গায় আমরা অন্যের শেখানো বুলিতে বুঁদ হয়ে রইলাম। নিজস্বতা বলতে আমাদের যা তা ক্রমশ (একদিনে নয় দিনে দিনে) হারিয়ে গেল। বৃহত্তর অর্থে আধুনিককালে রাষ্ট্র বলতে যা বোঝায় তা না থাকলেও ছোট ছোট নগরকেন্দ্রিক রাষ্ট্র ছিল আমাদের। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধ বিগ্রহের ঘটনাও কম নেই। কিন্তু বৃহত্তর অর্থে সাধারণ নাগরিকের অংশগ্রহণ, দায় কিংবা মাথাব্যথা কোনোটাই ছিল না। রাষ্ট্রনীতি ছিল রাজার। সম্রাট অশোকের সময় বুদ্ধযুগে বৃহত্তর সাম্রাজ্যবিস্তারের চেষ্টা দেখেছি আমরা। বেদ এবং উপনিষদের লড়াইয়ে উপনিষদের একচ্ছত্র প্রভাব এখনও বর্তমান। আবার গোড়া ব্রাহ্মণ কর্তৃক বুদ্ধধর্ম অনুসারিদের নিধন সেও তো ইতিহাসেরই নির্মম সাক্ষি। ব্রাহ্মণ্যবাদি কর্তৃক নিম্নশ্রেণির হিন্দুদের অত্যাচার নির্যাতনের ফলে বুদ্ধধর্মাবলম্বি ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ধর্মত্যাগের কাহিনিও ইতিহাসবিধৃত। বিপরিত দিকে মানুষের মুক্তিকাক্সক্ষা অথবা সব মানুষ যে এক সাম্য-মৈত্রি-বন্ধুত্বের বার্তাও প্রচারিত হতে দেখেছি। মানবজাতির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আদিম প্রস্তর যুগ থেকে শুরু করে ধাতু যুগের বেশ কিছুদিন পর্যন্ত মানুষ চলেছিল সরল প্রকৃতিবাদি চিন্তাধারায়। কিন্তু সভ্যতায় পৌঁছে যখন থেকে মানুষ দার্শনিক সূক্ষèবিচার করতে শিখল, যেমন, চিনে কনফুসিয়াস, ভারতে যাজ্ঞবল্ক্য, গ্রিসে প্লেটো প্রমুখের দর্শন, তখন থেকেই ভাববাদ-অধ্যাত্মবাদের বৌদ্ধিক অনুশিলন চর্চা শুরু হয়ে গেল। প্রকৃতিবাদ ও আদি বস্তুবাদ তার সমস্ত বৌদ্ধিক অনুশিলনকে গ্রাস করে নিল। ধর্মতাত্তি¡করা ও ধর্মিয় সংগঠনের কর্তাব্যক্তিরা ধর্মিয় আধ্যাত্মিকতার বাইরে কোনো চিন্তাকে আমল দিতে নারাজ ছিলেন। বিপক্ষিয় মতকে হত্যার মতো ঘটনাও তখন সংগঠিত হয়েছিল। রাজনীতি রাষ্ট্রনীতিও এই ঘরানায় বিবর্ধিত হয়েছিল স্বাভাবিক কারণেই।


পালাবদলের সময় সমগ্র বাংলাদেশে শুধুমাত্র বাঙালি জাতির বসবাস ছিল, অথবা হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল এমন নয়। বাঙালি মানে তখনকার ধারণায় মোঘলদের অভিধায় পূর্ববঙ্গের মানুষকেই বোঝাত। উপনিবেশিক কালখণ্ডে সাম্রাজ্যবিস্তারের ধান্ধা ছিল, মোহ ছিল, নিজেদের প্রয়োজনে, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব, ঔদ্ধত্য প্রতিপন্ন, অপরকে হেয়, নিচ, অধিনস্ত করার দুর্বার ইচ্ছা-কাঙ্খা থেকে। তখনো বলা হতো আলোকিত সভ্যতার সোনালি পরশ দেবার জন্যই সাম্রাজ্যবাদিদের প্রয়োজন, প্রয়োজন উপনিবেশিক শাসন টিকিয়ে রাখা। আর এজন্য সাম্রাজ্যবাদিরা চেষ্টা তদ্বির ধান্ধা করতো। প্রধানত যে সক্রিয় ইচ্ছা কাজ করতো তার মূলে ছিল সাম্রাজ্যবিস্তারকারিদের অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা, প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব, বৈরি প্রকৃতি, নতুন দেশ নতুন জ্ঞান আহরণের দুর্দমনিয় ইচ্ছা। চতুর্দশ পঞ্চদশ শতাব্দিতে পৃথিবীব্যাপি ইউরোপিয় নৌবহর যে বেরিয়ে পড়েছিল, কলম্বাস, ক্যাপ্টেন কুক, ভাইকিং, মার্কো পলো, ডারউইন, আপাত সরল অর্থে মনে হতে পারে নির্দোষ এই অভিযান শুধুমাত্র জ্ঞানচর্চা এবং বিজ্ঞানের উন্নতির জন্যেই নিবেদিত ছিল। বিজ্ঞানচর্চা প্রাথমিক এবং প্রধানতম লক্ষ হয়তো ছিল কিন্তু তার পেছনে ছিল সাম্রাজ্যবাদি শক্তির নিগূঢ় স্বার্থচিন্তা। অন্যান্য জাতি-উপজাতি সম্পর্কে তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ এবং তাদের দুর্বলতা, সম্পদ সম্পর্কে অবহিত হওয়া, বাস্তবতার আলোকে নিজেদের শক্তিমত্তা যাচাই। এ কারণেই আমরা দেখি ফ্রান্সিস বেকন সগর্বে ঘোষণা করছেন, জ্ঞানই শক্তি। তিনি সুস্পষ্টভাবেই বোঝতে পেরেছিলেন তথ্যশক্তিই দিতে পারে বিশ্বের উপর তাবৎ ক্ষমতা, হয়তো এখান থেকেই সাম্রাজ্যবিস্তারের মোহ কাজ করছিল তাদের মধ্যে, নিয়েছিল দিকনির্দেশনা বেকনিয় ঘোষণা থেকে। সংগৃহিত তথ্যউপাত্ত ইউরোপিয় মানসে জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা জন্ম দিয়েছিল। শুরুতে সাম্রাজ্যবাদি ও উপনিবেশিকশক্তিগুলো তাদের ক্ষমতা শুধু বাণিজ্যবিস্তারেই সীমাবদ্ধ রাখে। নিত্যনতুন দেশ আবিষ্কার এবং প্রাকৃতিক ও শ্রমশক্তি তাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। ক্রমে বাণিজ্য থেকে আসে লিপ্সা, শাসন করায়ত্ত করবার প্রবল ইচ্ছা। বৈধতা দেয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল এমন সব শব্দের, যাতে করে প্রমাণ করা যায়, দখলকৃত দেশসমূহ চিন্তা, সভ্যতা, সংস্কৃতির দিক থেকে পিছিয়ে আছে, তাদেরকে আলোকিত করবার জন্যই শাসনক্ষমতা দখল করা প্রয়োজন। সাম্রাজ্যবাদিরা স্পষ্ট বুঝেছিল উপনিবেশগুলোর সস্তা শ্রম ও শ্রমিকের (দাস) মাহাত্ম্য। তথ্যই শক্তি, এ ধারণা বদ্ধমূল হতে বেশি দিন লাগেনি। ফলে যোগাযোগ রক্ষা করবার নিত্যনতুন কলাকৌশল, রাস্তা আবিষ্কার হতে লাগল।

দীর্ঘ উপনিবেশিক শাসন থেকে আমরা যেমন নিয়েছি অনেক কিছুই, চলতি রাজনীতির সবটুকু, রাষ্ট্র-সরকার-গণতন্ত্রের পুরো কনসেপ্ট, তেমনি আবার নেইনি অনেক কিছুই আমাদের নিজস্ব দেশজ স্বভাব আমাদের শিখিয়েছে সবকিছু একটু ঔদাসিন্য একটু শৈথিল্যের সাথে দেখতে। দীর্ঘ উপনিবেশিক শোষণ-শাসন শিক্ষা একটু একটু করে আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। আমরা ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি তাদের ভাবনাকে নিজেদের ভাবনা বলে। পশ্চিম হল সভ্য, প্রাচ্য বর্বর। পশ্চিমি মানুষের রয়েছে পরিণত মানসিকতা। কালো মানুষ অপরিণতমনস্ক। ইউরোপিয় সমাজ উন্নত, এশিয়া আফ্রিকার সমাজ অনুন্নত। পাশ্চাত্য আধুনিকতা প্রগতিশিল, কিন্তু অ-পাশ্চাত্য আজও প্রাগাধুনিক, আদিম। চতুর্দশ, পঞ্চদশ, ষোড়শ শতকের ইউরোপিয় রেনেসাঁস, সতের শতকের বিজ্ঞানবিপ্লব এবং অষ্টাদশ শতকের এনলাইটেনমেন্ট জ্ঞানের আলোকে উদ্ভাসিত। বাকি দুনিয়ার অন্ধকার বৃত্তে না ঘটেছে রেনেসাঁস, না বিজ্ঞান, না বিপ্লব। মলয় রায়চৌধুরী চমৎকার একটি উদাহরণ দিয়েছেন এ প্রসঙ্গে। নেতিবাচক, খারাপ কিছু বোঝাতে আমরা বলি, ‘তিক্ত অভিজ্ঞতা’। কথাটা উপনিবেশিক। খারাপ তাৎপর্যের দ্যোতক। প্যারাডাইমটি স্বাদ-সংক্রান্ত। অথচ, বাঙালি প্রথম পাতেই করলা-উচ্ছে খেতে ভালবাসে। ফাল্গুন-চৈত্রে নিম-বেগুন দিয়ে ভাত খায়। শুক্তো তার প্রিয়। মেথিফোড়ন তার পছন্দের। বরং ইংরেজদের মধ্যে তেতো খাবার চল নেই। শাসকের অভিব্যক্তি হয়ে গেছে বাঙালির অভিব্যক্তি। সাম্রাজ্যবাদির সাংস্কৃতিক দ্যোতকের ওপর নির্ভর করে সে। বলতে চায় বাঙালির জীবনের কথা, অথচ বলে ইউরোপের কথা। ডিসকোর্সের মধ্যে ক্ষমতা লুকিয়ে, ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটেছে ডিসকোর্সের মাধ্যমে। তেমনি কালো দিবস, ব্ল্যাকশিপ, কালা-কানুন, কালো বাজার, কালো টাকা। কালো রঙ খারাপ, অনৈতিক এরকম মূল্যবোধের পত্তন ইংরেজের দৌলতে হয়।

পাঞ্জাবি যোদ্ধার জাত বাঙালি নয় উপনিবেশিক এই মিথ্যা ভারতিয় উত্তর-উপনিবেশিক এস্টাব্লিশমেন্টেরও প্রথম পাঠ। পৌত্তলিকতা খারাপ এই ভাবনা সাম্রাজ্যবাদি সেমেটিক চিন্তাপ্রসূত এবং একে প্রত্যয়সিদ্ধ করতে বাঙালি ভাবুক এখনও সমান উদ্বিগ্ন। একটি পাঠবস্তুকে অপরিহার্যভাবে বর্ণনামূলক ছাপ দেয়ার মধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে চালান করা হয় শাসকের নিজস্ব অভিব্যক্তি, চিন্তা, ধ্যান-ধারণা। চেষ্টা চলে দার্শনিক ভিত্তি দেয়ার যার ওপর দাঁড়িয়ে এই মিথ্যাচার করা চলে অবাধে। উপনিবেশের মহাশক্তিধর শাসনকারিদের চেষ্টা উত্তর-উপনিবেশিক জমানায়ও সমান ক্রিয়াশিল; এখনো প্রতিটি সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্ত¡শাসিত প্রতিষ্ঠান, পুলিশ চিন্তা-চেতনা-ক্রিয়ায়-কার্যে উপনিবেশিক, অংশত অথবা সম্পূর্ণ মননে।
পেরেস্ত্রৈকা আর গ্লাসনস্তের পর পৃথিবীকে তিনটে বিশ্বে ভাগ করার উপনিবেশিক চেষ্টাই মাটি হয়ে গেল। ইউরোপ-আমেরিকায় ভারতবর্ষের বিষয়ে বলতে-লিখতে গেলে, টিভি-সিনেমা-নাটক বানাতে গেলে, উপনিবেশিক অবধারণায় নিশ্চিতভাবেই জুড়ে দেয়া হয় সাপুড়ের দড়ির খেলা, পাগড়ি পরা মহারাজা, ব্রিটিশ রাজত্বের ক্যাপ্টেন কর্নেল, ঝুঁকে থাকা চাকর বা আমলা, রাস্তায় ধর্মের ষাঁড়, হাফল্যাংটো সাধু।


উত্তর-উপনিবেশিক ধারণায় প্রচ্ছন্নভাবে বলা হচ্ছে বেছে নেবার জন্যে দুটি পথ খোলা স্পষ্টত স্বাদেশিক জাতিয়তাবাদ কিংবা আন্তর্জাতিক পোস্টমডার্ন সংস্কৃতি। যারা মার্কসবাদি তাঁরা বলেন, আরেকটা পথ ছিল উত্তর-উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর জন্যে-সমাজবাদের পথ। তা-ও বেমালুম উবে গেল সোভিয়েত কাঠামো ভেঙে পড়ার পর। উৎপাদনব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে একটি সমাজকে পরিভাষিত না করে যদি রাষ্ট্রের ভেতরকার সম্পর্ক দিয়ে পরিভাষিত করতে হয়-শ্রেণি, লিঙ্গ, রাষ্ট্র, জাতি, ধর্ম ইত্যকার পারস্পরিক সংঘর্ষ ও সংগ্রামের পরিবর্তে অভিজ্ঞতাই হয়ে ওঠে প্রধান ভিত্তি, তাহলে মানুষ হয়ে দাঁড়ায় চৈতন্যে দীন, মননে চাকর। তিন বিশ্বের ধারণা গ্রহণযোগ্য কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অবশ্য। উপনিবেশ আর সাম্রাজ্যবাদের অভিজ্ঞতা তো কেবল অনুন্নত দেশগুলোর নয়; ওই অভিজ্ঞতা থেকে ছাড়া পায়নি একদা যারা সাম্রাজ্যের মালিক ছিল তারাও। তৃতীয় বিশ্বের ধারণায় এসেছে প্রথম বিশ্বের পক্ষ-প্রতিপক্ষ বিভাজন। ঐতিহাসিকভাবে এশিয়া আফ্রিকা লাতিন আমেরিকার নিজেদের মধ্যে কোনো মিল নেই। এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের তফাৎ অনেক। ইউরোপিয়রা স্বভাবতই যুক্তিবাদি, উদ্যমি, সৃজনকর্মি ও প্রগতিশিল। এসব গল্প চালু করার জন্য ম্যাক্স ওয়েবার, লি হোয়াইট, জন হল প্রমুখ বিস্তর শ্রম ও মেধার অপচয় করেছেন। যেহেতু সাদা চামড়াই অদ্বিতীয়, এইসব গুণের অধিকারি বর্ণবাদি এই চিন্তার স্বপক্ষে নানা মত খাড়া করতে হয়। বলার চেষ্টা চলে ইউরোপিয়ানরা অন্যান্যদের থেকে উন্নত কারণ ইউরোপের জলবায়ু এককভাবে কৃষিকাজের অনুকূল। গ্রিষ্মমণ্ডল কবলিত এশিয়া আফ্রিকাতে মানুষের যে নাভিশ্বাস তাতে তারা স্বাভাবিক কারণেই হতোদ্যম ও অলস হয়। কৃষিকাজে তাই এশিয়া আফ্রিকার দেশগুলোতে উন্নত-প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ ঘটেনি। ইউরোপের আদর্শ জলবায়ু কৃষিকাজে সাফল্য ঘটিয়েছে প্রাকৃতিকভাবেই, একে নাম দেয়া হল ঐতিহাসিক নিমিত্তবাদ (ঐরংঃড়ৎরধষ ফবঃবৎসরহরংস)। প্রচারের চেষ্টা চলে ইউরোপিয়রা অন্যান্যদের থেকে উন্নত হওয়ার জন্য নির্বাচিত মানবগোষ্ঠি-ঈশ্বরপ্রদত্ত, এটাই নিয়তি, ভবিতব্য।
ইউরোপিয়দের উন্নত চারিত্রিক গুণাবলির পাশাপাশি এশিয়া আফ্রিকার মানুষদের চারিত্রিক স্খলনের কথাও প্রচার করা হয়। তারা নির্মম, প্রতারক, শঠ, কামুক, নোংরা, উদ্ধত এবং অযৌক্তিক। ইউরোপ-শ্রেষ্ঠত্বের মিথ এমনভাবে মগজে প্রোত্থিত করা হয় যে ক্রমে ক্রমে তা বিশ্বাসের রাজত্বে প্রবেশ করে। ইউরোপিয়দের উৎকর্ষতা এবং কালো চামড়ার নিকৃষ্টতার মনোভাব লঘু আলোচনাতেও পাচার করা হয়। ম্যারাথন দৌড়ে সর্বদা বিজয়ি কেনিয়ান বা ইথিওপিয়ান খেলোয়াড়দের সম্পর্কে ঠাট্টার ছলে বলা হয়, বন্য জন্তুদের হাত থেকে প্রাণভয়ে পালানোর অভ্যাসের জন্যই কালোরা ওই রকম বিদ্যুতবেগে ছুটতে পারে। আফ্রিকানদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণের আরেকটি লজ্জাজনক ঘটনা এইডস রোগের উৎপত্তি সংক্রান্ত নিদারুণ মিথ্যাটি। খ্রিস্টিয় মতবাদ ও উপদেশাবলি মিলিয়ে ইউরোপিয়ানদের এই উৎকর্ষতার গল্পগুলো বিশ্বাসযোগ্যভাবেই উপস্থাপন করা হয়।


১৭৮৩ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার পর উপমহাদেশের ভাষা-সংস্কৃতি ও ইতিহাস নিয়ে বৃটিশদের মধ্যে দেখা যায় তুমুল উৎসাহ। রিচার্ড জোন্স, কোলব্রুক, উইলসন এবং এলফিনস্টোন এগিয়ে আসেন। অবশ্য কর্নওয়ালিশ, মেকলেসহ পাশ্চাত্যবাদিরা খোলাখুলিভাবেই ভারতিয় সমাজ-সংস্কৃতি ও ইতিহাসের নিন্দা করতে থাকেন। এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৮০০ সালের আগে ভারতিয়রা এর আঙিনা মাড়াতে পারেননি, প্রবেশের অনুমতি পান আরো পরে। উপনিবেশিক শক্তিসমূহ কেবল যে অস্ত্রের জোরে শত শত বছর টিকে থাকেনি তাতো প্রমাণিত সত্য। সাথে যোগ করতে হয়েছিল বিভিন্ন ধারণা ও মতবাদ। তাদের নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ি উপনিবেশিত অঞ্চলে সৃষ্টি করতে হয়েছিল একদল তথাকথিত শিক্ষিতশ্রেণি যারা শাসকদের ঘনিষ্ঠ সহযোগি হিসেবে কাজ করত। শাসকদের তৈরি মতবাদসমূহ প্রচার করত। প্রচার করত তাদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং উপনিবেশিত জনগণের নিকৃষ্টতা। যার ফলে উপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিতশ্রেণি শাসকদের বিরুদ্ধে কখনো মাথা তুলে দাঁড়ায়নি এবং উপনিবেশিক বাস্তবতাকেই স্বাভাবিক বলে মনে করেছে। এ প্রসঙ্গে লর্ড মেকলের কথা উলে­খ করা যায়। কোনো ভারতিয় বা আরবি ভাষা না জেনেই মেকলে মন্তব্য করেন; ‘ভারত ও আরবের সমস্ত দেশিয় সাহিত্যের যা মূল্য তা ইউরোপের ভাল গ্রন্থাগারের একটিমাত্র সেলফে সাজানো বইয়ের সমান’। এদেশিয় শিক্ষিতশ্রেণি এধরনের মন্তব্যে পূর্ণ-আস্থা রেখেছিল এবং ইংরেজ শাসনকে দেখেছিল ‘অসভ্য’ ভারতকে ‘সভ্য’ করার মিশন হিসেবে। মেকলে যখন ঘোষণা করেন-‘আমরা নিশ্চিত যে ভারতবর্ষ একটি অবাধ সরকার পেতে পারে না, কিন্তু ভারতবর্ষ ঠিক পরের শ্রেষ্ঠ জিনিসটা পেতে পারে-একটি সুদৃঢ় পক্ষপাতহীন স্বৈরাচার’, তখনও ‘ভদ্রলোকশ্রেণি’ কেঁপে উঠেনি। রাজা রামমোহন রায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি, নওয়াব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আহমদ খান, মোহাম্মদ আলি জিন্নাহসহ ইংরেজসৃষ্ট রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতারা ইংরেজ শাসনকে চ্যালেঞ্জ করার দুঃসাহস দেখাতে পারেননি। সরাসরি স্বাধিন ভারতের দাবি উত্থাপন করতে পারেননি। স্বরাজ, স্বায়ত্তশাসন, দায়িত্বশিল সরকার, ডমিনিয়ন স্ট্যাটাস ইত্যাদির নামে দাক্ষিণ্য ভিক্ষা করেছিলেন বরং।

১৭৫৭ সনে সিরাজকে হারিয়ে মিরজাফরকে সিংহাসনে বসাবার পর ইংরেজরাই প্রচার চালায় মিরজাফর অকর্মণ্য, লোভি, নেশাখোর। শাসন করবার অনুপযুক্ত এটিকে ঐতিহাসিক সত্যতা দেয়ার জন্য সচেতন ডিসকোর্সও বানিয়ে ফেলে তারা। নেটিভের ভাষা এবং ভাষার মাধ্যমে তার মস্তিষ্কে সাম্রাজ্যটি বসানোর উদ্দেশ্যে ১৭৭৮ সনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোং-এর হ্যালহেড প্রকাশ করেন ‘দি গ্রামার অব দি বেঙ্গল ল্যাংগোয়েজ’। ১৭৯৩ সনে আপজোন লিখিত ইংরেজি ও বাঙালি ‘ভোকাবুলারি’, ১৯১৭ সনে মিলার রচিত ‘শিক্ষা গুরু’, ১৭৯৯-১৮০২ সনে দুই খণ্ডে ফরস্টারের অভিধান ‘ভোকাবুলারি’ একই স্বার্থে প্রকাশিত হয়। শ্রিরামপুর মিশন থেকে বাইবেল ও অন্যান্য ধর্মপুস্তক বাংলায় বেরোতে থাকে ১৮০০ সনের পর যার উদ্দেশ্য ছিল দেশিয় কোডগুলো নষ্ট করা, কেবল ধর্মান্তরিত নয়।

জনৈক মিশনারি জশুয়া মার্শমান ১৮৫৩ সনে আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, কালক্রমে বাঙালির ধ্র“পদি ভাষা হয়ে উঠবে ইংরেজি। উপনিবেশিক ব্যবস্থায়, পাশ্চাত্য শিক্ষা কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে গভীর ভাবনাচিন্তা করা হয়েছিল। ধর্মশিক্ষা দেবার অসুবিধে ছিল বলে, ইংরেজি সাহিত্য থেকে যে গদ্যপদ্য নেয়া হত তার মাধ্যমেই শাসকশ্রেণির ধর্মের সারকথা পৌঁছে যেত ছাত্রছাত্রিদের মনে। দেশ স্বাধিন হওয়া অব্দি বজায় ছিল পদ্ধতিটি। শিক্ষা আধিকারিক আলফ্রেড ক্রফট ১৮৮৬ সনে, বাঙালি সমাজকে তাঁবে রাখতে স্কুলঘরেই সিলেবাসের মাধ্যমে রাজভক্তি, আনুগত্য আর নিয়মানুবর্তিতা শিক্ষার কথা বলেছিলেন। ধর্মিয় নৈতিক শিক্ষার মুলা দেখিয়ে আলোকিত সমাজ গড়বার দোহাই দিয়ে বিষয়টি এখনো চলছে ভালভাবেই, এই বাংলাদেশে। উপনিবেশিকরা একথা বুঝতে পেরেছিল সহজেই শক্তি নয়, উপনিবেশ স্থায়ি দীর্ঘস্থায়ি করতে, সাম্রাজ্যের সিংহাসনটি বসাতে হবে নেটিভের মগজে। উপনিবেশিক প্রভুদের শেখানো অনেক-অনেক ব্যারামের মধ্যে একটি হল গ্রন্থস্বত্ব বা কপিরাইট, যা প্রাচ্যের ধারণায় মেলে না, ভারত বরাবরই স্বত্বকে অপ্রয়োজনিয় বিষয় বিবেচনা করেছে। রামায়ণ মহাভারত ব্যক্তিনামে প্রচারিত হলেও এগুলো একক ব্যক্তির অবদান নয়, যৌথতায় লীন হয়ে গেছে একক ব্যক্তিকৃতিত্ব। সৃষ্টিকর্তা গুরুত্বপূর্ণ না হয়ে সৃষ্টিকেই প্রাধান্য দেয়া হত বরাবর, ইংরেজরা আসার পর এই কোডটিও নষ্ট করে দেয়া হল চিরতরে, তার জায়গায় স্বত্ব আইনের ধারণা মগজে প্রোত্থিত হল।


উপনিবেশিক শক্তি যে বিষবৃক্ষ রোপন করেছিল নিজেদের স্বার্থে, ধর্মবিদ্বেষ সা¤প্রদায়িক উস্কানি জিইয়ে রেখেছিল তাই মহিরুহ হয়ে দেখা দেয় পরবর্তি সময়ে। একই ব্যক্তির মধ্যে যে বৈপরিত্য দেখা দিতে পারে তা আমরা টের পাই ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির সময়ে। অন্ধ-ধর্মানুগত্য যাকে গ্রাস করেছিল সেই নেহেরু ইতিহাসের কারণে হয়ে যায় ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিক, আর কায়দে আযম জিন্নাহ ভালভাবে নামাজ না জেনেও ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। আবার ইংরেজদের প্রয়োজনে যে শ্রেণির জন্ম দিয়েছিল তারাই কালক্রমে নিজেদের উকিল, মোক্তার, ডাক্তার, শিক্ষক ইত্যাদি নামে চিহ্নিত করে। উনিশ শতকের নব্য ইংরেজি শিক্ষিত এই পেশাজীবী সমাজ, শিল্পবিপ্লবই এই শ্রেণির স্রষ্টা। এরাই মধ্যবিত্ত শ্রেণি। আর্য আগমনে অনার্যরা কোনঠাসা হয়ে পড়ল। আরববণিক, গ্রিস, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ব্রিটিশ আগমন এদেশের সংস্কৃতিতে বিরাট ধাক্কা। নির্বিচার লুণ্ঠন, লুটতরাজ স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে করে তুলল উত্তাল। ভারতে যা কিছু নিজস্ব তার সাথে অবশ্যম্ভাবিভাবে বিজাতিয়তার অনুপ্রবেশ ঘটল। শাসনক্ষেত্রে নিস্পৃহতার কারণে বিদেশিরাই হয়ে উঠল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। যার স্পষ্ট প্রভাব ছাপ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে এখনকার প্রজন্মকে। বেদ এবং উপনিষদের লড়াইয়ে উপনিষদ জয়ি হওয়ায় অর্থাৎ উপনিষদের আধ্যাত্মিকতা শিক্ষানীতি রবীন্দ্রভাবনায় আমাদের মন উজ্জিবিত হওয়ায় কর্মের চেয়ে ভাবনা প্রধান হয়ে গেছে এখনও এসময়ে। প্রাচিন ভারতে চরক ও শুশ্রƒতার পরিচালনায় চিকিৎসাবিদ্যা একটা সুসংবদ্ধ কাঠামো নিয়ে অনেকদূর পর্যন্ত বিকশিত হয়েছিল। গাণিতিক সংজ্ঞা হিসেবে শূন্যের ধারণা ভারতবর্ষের প্রাচিন মনিষিই প্রথম আয়ত্ব করতে পেরেছিলেন। উপনিষদিক যুগে, যখন ভাববাদের ভালরকম বিকাশ ঘটে গেছে, ঈশ্বর-আত্মার ধারণা এসে গেছে। ঠিক সেই সময়ে আধ্যাত্মিক অন্বেষণ, আত্মা কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়- চর্চা শুরু হয়ে গেছে। দর্শন জগতের আচার্যরা প্রায় সবাই তখন ধ্যানমগ্ন ভূমাদর্শি ভূমিহীন ভাবচাষি। তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি রাজদরবারে যত প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ততই প্রকৃত জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা কমে গেছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ জ্ঞানি-গুণি ব্যক্তি এই ভাববাদি দর্শনচর্চাকেই বিশাল গুরুগম্ভির, ভাবসমৃদ্ধ জ্ঞানের আকর বলে মনে করেন, এখনও। ফলত রবীন্দ্র-উপনিষদিয়চর্চা বৃদ্ধি পায় অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায়। আখেরে আমাদের জন্য এ এক বিরাট ক্ষতির কারণ হয়ে রইল।

প্রচলিত অর্থে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রনীতি, রাজনীতি উপনিবেশিক বিক্ষাজাত শ্রমের ফসল, যা উত্তর-উপনিবেশিকপর্বে উপনিবেশিক-উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছি আমরা। পৃথিবী আদৌ উপনিবেশিক শাসনের করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পেয়েছে কি-না?-উত্তর-উপনিবেশিক কালখণ্ডে বিষয়টি ভাববার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রান্তিয় এবং কেন্দ্রিয় আলোচনার ফাঁকগলে আসল আলোচনাই ঢাকা পড়ে যায়। বেনিয়াবৃত্তি, দারিদ্র্যবাণিজ্যকে পুঁজি করে নতুন নতুন ঈশ্বর সৃষ্টি হচ্ছে। আচরণে কুলিন, জ্ঞানে উজ্জ্বল, প্রতিপত্তিতে সর্বেসর্বা এই সকল নব্য ঈশ্বরগং সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষদোসর হিসেবে নিজেদের আখের গোচাচ্ছে সমাজকল্যাণের বাতাবরণে, কাজ করছে বহুজাতিক কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে।


জাতিসংঘ, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, কর্পোরেট পুঁজি নিয়ে ধন্দ কাটে না, মনোজগতে প্রভাবক শক্তি হয়ে ঢেলে দেয়া হয় বিষ। বুর্জোয়া-পুঁজিবিশ্বের দোহাইয়ে ব্যক্তিকে করে ফেলার চেষ্টা চলে নিরন্তন নিঃসঙ্গ-একক। নিঃসঙ্গ-একক করে ফেলা গেলে অনেক দিক থেকে বাঁচা যায়। একক নিঃসঙ্গ ব্যক্তি হয় অস্থির। চিত্তচাঞ্চল্যের কারণে সে কখনো শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াতে পারে না- নিজস্ব সাহস নিয়ে। মিডিয়ার সাহায্যে নিরন্তন মগজ-ধোলাইয়ের কারণে চিন্তাশূন্য-অথর্ব-পঙ্গু সত্তা গড়ে ওঠে। সে সহজেই বিশ্বাস করতে চায়। প্রভু হয়ে ওঠে কর্পোরেট খেইল; ভার্চুয়াল জগতের অদৃশ্য হাত ক্রিয়া করতে থাকে সমানে। আর এক্ষেত্রে সহজ টার্গেট সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ। আগ্রাসন চালানো হয় কৌশলে ধীরে ধীরে। দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যের স্বার্থে এমন কিছু কোড আবিষ্কার করা হয় যাতে আখেরে ফল ভাল হয়। বাণিজ্য করতে গেলে একটা ভাষা বাচনভঙ্গি আনতে হয় যা টার্গেট পিপল বা দর্শকরা চেনে, বুঝতে সুবিধে হয়, সহজে মর্মে প্রবেশ করিয়ে দেয়া যায়। মাধ্যম নিয়ে গবেষণা চলে তাই নিরন্তর। যাদের এতদিন ভোক্তা ভাবা হয়নি, না ভাবলেও চলত, এখন তাদের ভোক্তার অধিকার দিতে হচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে কৌশলে চলে পুঁজির অবাধ বিপণন, বিজ্ঞাপন তেসেলমাতি, মগজের কোষে চেষ্টা চলে উপনিবেশ স্থাপনের।

মানবসভ্যতাকে আধুনিক প্রযুক্তির যে বিস্ময়কর অগ্রগতি ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট, মানুষের ওপর মানুষের কর্তৃত্ব ফলাবার আকাক্সক্ষা শুধু ভ্রান্ত পলিটিক্যাল অর্থনীতি উপজাত নয়, এই আকাক্সক্ষা এক ধরনের বিশ্ববিক্ষাজাত ফলও। অন্তর্জাল, উন্মুক্ত আকাশসংস্কৃতি, ভোগ মানুষকে গিনিপিগে পরিণত করছে অথবা কৌশলে করানো হচ্ছে, ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে ম্যালা ধরনের উপকরণ। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সা¤প্রতিক আবিষ্কারগুলোকে সুপরিকল্পিত ও সুচারুভাবে ব্যবহার করে স্যাটেলাইট চ্যানেলের আবিশ্ব পরিব্যাপ্ত যে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে তাতে বিশাল জনসংখ্যার মেরুদণ্ডহীন মানসিকতা ও চাহিদাসম্পন্ন এক জনগোষ্ঠি, একক বাজার তৈরির চেষ্টা চলছে সচেতনভাবেই। মানবচৈতন্যের এই হোমোজিনোইজেসেন প্রক্রিয়ায় বিশেষ করে তৃতীয়বিশ্বের দেশগুলোতে নতুন সমাজ মনস্তাত্তি¡ক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে, তাতে জাতিগত-কৌমগত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স¤প্রদায়ের অভিজ্ঞানকে আক্রমণ করা হচ্ছে, যাতে করে ক্ষুদ্র-প্রান্তিয়-নিম্নবর্গের মানুষেরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে মারাত্মকভাবে।


স্বাধিনতার ৪০ বছর যেকোন রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠবার পক্ষে কম সময় নয়, আবার বেশিও নয়, কেননা মৌলিকত্ব বা ধারাবাহিকতা প্রশ্নটিও এর সাথে জড়িত। গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের দীর্ঘ ইতিহাস প্রকৃত অর্থে আমাদের নেই। গণতন্ত্র যদি চর্চার বিষয় হয়, এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের চর্চা বিষয়টির সাথে জড়িত থাকে তাহলে বলবার কথা হল আমাদের এখানে বারবার সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, দলতন্ত্রে এর চর্চার প্রকট-সংকট চলছে স্বাধিনতা পর পরই। স্বাধিনতা বলতে প্রকৃত অর্থে যা বোঝায় তা কোনভাবেই আমরা পাইনি। আর্য জনজাতিরা অনার্যদের সঙ্গে এবং নিজেদের মধ্যে বিস্তর যুদ্ধ বিগ্রহ করলেও বিস্তৃত কোন সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা করেনি তারা। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দিতে ভারতবর্ষের অনেকটা অংশ জুড়ে ষোলটি মহাজনপদ গড়ে উঠে। এদের নাম অঙ্গ, মগধ, কাশি, কোশল, বজ্জি, মল­, চেদি, বৎস, কুরু, পঞ্চাল, মৎস্য, সুরসেন, অশ্মাক, অবন্তি, গন্ধার এবং কম্বোজ। ক্রমে এদের মধ্যে মগধ প্রধান হয়ে যায়। মৌর্য সম্রাটদের যুগে এই উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল সর্বপ্রথম একটি রাজশক্তির প্রাধান্য স্বীকার করে। কিন্তু এই প্রাধান্যের অনেকটাই ছিল বাস্তব শাসনের দ্বারা অসমর্থিত এবং এই ঢিলেঢালা সাম্রাজ্য টিকে ছিল খুবই অল্পকাল।

অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন ছাড়া স্বাধিনতা অর্থহীন, তেমনি ব্রিটিশ প্রণিত উপনিবেশিক চিন্তাচেতনা কালাকানুন বহাল রেখে কতটা এগোনো সম্ভব বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা দরকার। সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ইশতেহার ছাড়া মুক্তির পথ অন্ধের হাতি দেখার মতো বিবেচিত হবে। নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য দিয়ে, সুযোগভোগি কিছু ব্যক্তির সুবিধা দেখা হলে কাজের কাজ কিছু না হওয়ারই কথা। তেল-গ্যাস-জ্বালানি ইস্যুতে অভিজ্ঞ জনদক্ষতার দোহাই, বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ প্রাধান্য দিয়ে নীতি প্রণয়ন আখেরে খারাপ ফলই আনবে তার সা¤প্রতিক উদাহরণ কম নয়। চোখ বন্ধ রেখে জেগে ঘুমানোর ভান জাতি হিসেবে আমাদের আরো পিছিয়ে দেবে, কেননা কর্পোরেট বুর্জোয়া পুঁজির অবাধ প্রবাহ, আন্তর্জাতিক-দেশিয় চর-দালাল সাম্রাজ্যবাদি শক্তি সদাতৎপর নানাভাবেই; সক্রিয় তাদের সহযোগি দেশিয় মিডিয়া, পরিচিত কিছু ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান যাদের লালন করা হয় সাম্রাজ্যবাদি স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যেই।

ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ক্রমেই তার ডালপালা বিস্তার করছে। বিশ্বায়নে, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ভাষার ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করছে প্রথমবিশ্ব বলে দাবিদার সাম্রাজ্যবাদি নয়া-উপনিবেশিক শক্তিগুলো। আর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, সাংস্কৃতিক বিপর্যয় ঘটছে নানাভাবেই। উন্মুক্ত-উদার আকাশসাম্রাজ্যে টিকতে পারছে না স্বদেশি কিছু। আন্তর্জাল ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে এমনভাবে ভোক্তা অনেক সময়ই জানে না কি সে নিচ্ছে, গ্রহণ করছে। মোবাইল ফোন সহজিকরণের মাধ্যমে মানুষকে আরেক ধাপ বিপর্যয়ে ফেলে দেয়া হয়েছে, জীবন সাজাবার জীবন বাঁচাবার নামে। নগ্ন অযাচার নগ্ন শরীরী তোয়াজে জীবন নানাভাবেই অস্থির। ভোগের উপকরণ বেড়েছে। কৌশলে মানুষকে ভোগবাদি করে ফেলা হচ্ছে ধীরে ধীরে। অজান্তেই মানুষ হচ্ছে অবস্থার শিকার। সে জানে না ভোগ উপকরণের পেছনে ছুটতে ছুটতে সে নিজেই হয়ে উঠছে জীবন্ত পণ্য। অস্থিরতা বাড়ছে, পণ্যদুনিয়া কনজিউমারিজম কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে মানুষকে এই মুহূর্তে আমরা জানি না। সাথে সাথে নিরাপত্তাসংকট বিশ্বব্যাপি অস্থিরতার তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে। জাতিভিত্তিক, এথনিক, ধর্মিয়, যৌনতা, লিঙ্গভিত্তিক পরিচয়সত্তা যেকোনো ব্যক্তির মধ্যে অবচেতনে থাকে। তাকে সে খুঁজে পেতে চায় আপন ভুবনে। তার ভেতরে কৌমবোধ, কোমলতা নিঃশেষিত করে ফেলা গেলে, অনুভূতির ধ্বংস সাধন করা গেলে, অনেক কিছুই সহজ হয়ে যায়। উত্তর-ঔপনিবেশিক জামানায় বহুজাতিক আগ্রাসন চলছে কনজিউমারিজমের নামে। ঔপনিবেশিক প্রভু, মিশনারি, ব্যবসায়ি, নৃতাত্তি¡কদের সংস্পর্শে এসে এখানে বহু নামে পরিচিত হচ্ছে অনেকেই।

পশ্চিমের দীর্ঘকালিন সাংস্কৃতিক আধিপত্য সম্ভব হয়েছিল উপনিবেশের প্রভাবেই। পূর্বেই বলেছি, উপনিবেশিক চর্চা ও সংস্কৃতি তথা ইউরো-আমেরিকান প্রচার মানুষকে আদর্শায়িত করার চেষ্টা চালায়-সাদামানুষ, আদর্শ মানুষ, আলোকিত মানুষের সবক দেয়া হয় কৌশলে। প্রচারক মেলে, বাহবা মেলে প্রচার কৌশলে।

জ্ঞানের হাত ধরে আসে মারণাস্ত্রের অধিকার। যার যতো বেশি করায়ত্ব তার তত বেশি শক্তির প্রদর্শনি। আমেরিকা তাই লাখে লাখে ঝাঁকে ঝাঁকে বোমা ফেললেও মানবতার নামেই বিপণন হয় এর, তেলের প্রসঙ্গ গৌণ হয়ে পড়ে। আইবিএম, মাইক্রোসফট একচেটিয়া তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রভাব বিস্তার করে। ধর্মের ক্ষেত্রেও মতান্তর থাকতে পারে কিন্তু সারা পৃথিবী চলে মাইক্রোসফটের এক কমাণ্ডের মাধ্যমে। আশ্চর্য সাম্য। বহুজাতিক কোম্পানি তার পৃথিবীব্যাপি বাণিজ্য তথা ক্ষমতাকে যার মাধ্যমে টিকিয়ে রেখেছে তাহলো পেটেণ্ট আইন, স্বত্ব আইনের মাধ্যমে। জ্ঞানকে পুঁজি করেই টিকে আছে উন্নত আমেরিকা। বলা হয় যদি কোনোদিন আমেরিকার পরাশক্তি খর্ব হয় তা হবে তার জ্ঞানকেন্দ্রিক বিপর্যয়। তাই নতুন উপনিবেশিক কালখণ্ডে জ্ঞানের অন্বেষণের বিকল্প থাকে না। যাদের হাতে জ্ঞানের ক্ষমতা স্থানান্তর ঘটবে তারাই হবে আগামি পৃথিবীর উপনিবেশিক শাসক। তবে কি সাম্রাজ্যবাদি আগ্রাসন থেকে নিস্তার পাবার কোন সম্ভাবনা নেই?-আছে আর তাহলো জ্ঞান, জ্ঞানের উপর একচ্ছত্র ক্ষমতা অর্জন।

১০
কলম্বাসের পৌরাণিক লোভ মণিকাঞ্চনযোগে খাপ খেয়েছে ইউরোপের সাম্রাজ্যবিস্তারের ব্যাকুলতায়, যা পরিণত হয়েছে বিষবৃক্ষে। মধ্যপ্রাচ্য কিংবা আফ্রিকার সা¤প্রতিক ঘটনাগুলোকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হবে? যুক্তি যেখানে অচল অবোধগম্য, ভাষা যেখানে নির্বাক, প্রতিবাদ কিংবা প্রতিরোধ যেখানে বিস্ময়কর-আর এসব হচ্ছে মানবতার দোহাইয়ে, যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে, নানা নাটকের জন্ম দিয়ে। আত্মশক্তির উদ্বোধন, দেশজ ঐতিহ্যবোধে ফেরা, যন্ত্র ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা-সক্ষমতাই পথ দেখাতে পারে সাম্রাজ্যবাদি ও উপনিবেশিক শক্তি থেকে নিষ্কৃতির, মুক্তির। আগামির মোকাবেলায় আমরা আদৌ প্রস্তুত কি-না ভেবে দেখতে হবে।

সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের ২০ বছর পূর্তি উৎসবে পঠিত
শেয়ার করুন: