004588
Total Users : 4588
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

সরলরেখা’র সরলকথন-২

সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র এবং অধ্যাপক লিয়াকত আলি

সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র এবং অধ্যাপক লিয়াকত আলি বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাজগতে নিরবে কাজ করে যাচ্ছেন বাইশ বছরেরও বেশি সময় ধরে। সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র, দর্শন ক্লাব আয়োজিত চিন্তার ইতিহাস, অর্থনীতি-রাজনীতি-সাহিত্যের ক্লাব আয়োজিত পাঠচক্র মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে। আর এসবই সম্ভব হয়েছে অধ্যাপক আলি’র নির্মোহ সত্যনিষ্ঠ দার্শনিক প্রত্যয়ে। ডামাঢোলে না গিয়েও সৎভাবে কাজ করা যায় তার জ্বলন্ত নজির স্থাপন করেছেন তিনি। অধ্যাপক আলি বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাজগতের পুরোধা ব্যক্তিত্বই নন, আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানিও। চিকিৎসা-বিজ্ঞানের নানা শাখায় গবেষণার পাশাপাশি নিজেকে একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠান এপর্যন্ত গড়ে তুলেছেন সেসব একদিকে মানবসেবায় অনন্য অন্যদিকে তাঁর কর্মযজ্ঞেরও পরিচয়বাহি। তার অন্যতম সৃষ্টি ‘সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র’ পথিকৃৎ ফাউন্ডেশনের অধিনে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। আনন্দের কথা ‘সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র’ যাত্রার বিশ বছর পূর্ণ করেছে। মুক্তবুদ্ধির চর্চা যেখানে দিন দিন হতাশাব্যঞ্জক বিপৎজনক অবস্থায় চলে যাচ্ছে সেখানে অধ্যাপক আলির জ্ঞানের মশাল জ্বালিয়ে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা অনুপ্রাণিত করে। মুক্তবুদ্ধির চর্চাই নয় ভবিষ্যতের যোগ্য-দক্ষ নাগরিক তৈরিতেও নিরলস শ্রম-মেধা-মনন নিযুক্ত রাখছেন তিনি। ‘সরলরেখা’র চলতি সংখ্যার মাধ্যমে আমরা অধ্যাপক আলি’র প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

রবীন্দ্রনাথকে যেন ঈশ্বর বানিয়ে না ফেলি

রবীন্দ্র জন্মের সার্ধশত বর্ষে বাঙালি প্রাণের আকুতি প্রকাশ পাচ্ছে নানাভাবেই। কবিতা-গান-নৃত্য-নাটকে তাঁকে স্মরণ করার চেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। তাঁকে কেন্দ্র করে নানা কিসিমের নানা বিষয়ের বই এরই মধ্যে বেরিয়েছে, যার কয়েকটা পঠনযোগ্য হলেও বেশির ভাগই পঠন অযোগ্য। অতি মানবিক প্রবণতা আরোপের ইচ্ছাকৃত প্রয়াস আছে কোন কোন লেখকের রচনায়। অবশ্য তার জন্য খানিকটা রবীন্দ্রনাথকেই দায়ি করা চলে; প্রাচ্যের ঋষি হবার গোপন বাসনা কমবেশি দায়ি এর জন্য। পাশ্চাত্যও চায়নি রবীন্দ্রনাথ নিজস্ব পরিচয়ে পরিচিত হয়ে ওঠুন, তাঁর শ্রেষ্ঠ মৌলিক কাজগুলোকে বড় না করে এমন কিছু রচনাবলিকে বড় করে দেখিয়েছে, গীতাঞ্জলির এমন কিছু কবিতাকে আলোয় নিয়ে আসা হয়েছে যেখানে মৌলিক রবীন্দ্র প্রতিভা বিরল। ভারতে কর্মবাদি দর্শন বেদ এবং জ্ঞানবাদি উপনিষদের লড়াই সেতো ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকেই। উপনিষদের ভেলায় চড়ে রবীন্দ্রনাথ জ্ঞানকাণ্ডকে গুরুত্ব দিতে যেয়ে কর্মকাণ্ডকে প্রকারান্তে অস্বীকারই করলেন, আমাদের বড় ট্রাজেডির জায়গা সম্ভবত এটিই, আজ পর্যন্ত টোটাল বাঙালি যার থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি, শুধু বেরিয়ে আসা নয়, ক্রমশ যেন আরো বেশি করে তাতেই নিমজ্জিত হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠত্ব যেখানে সেগুলো বড় করে তুলে ধরাতে আপত্তি নেই, কিন্তু আপত্তি হলো যেখানে বিশেষ মৌলিক অর্জন নেই সেখানে তাঁকে অহেতুক টেনে বড় করে দেখাবার প্রাণান্ত চেষ্টা। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন কিংবা বিজ্ঞানচর্চা আজকের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে কতটা গুরুত্ববহন করে সেটা অবশ্যই প্রশ্নসাপেক্ষ। উপনিষদের আলোকে প্রণিত রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন শুধু গুরুত্বহীনই নয়, প্রয়োগ অযোগ্যও। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় জাতি হিসেবে আমরা পিছিয়ে যেতে চাইবো না। কথা হলো প্রকৃতই যেখানে রবীন্দ্রনাথ বড় সেখানে তাঁকে প্রাপ্য সম্মান দিতে কুণ্ঠার কোনো কারণ নেই, গর্ব করার মতো অর্জন অবশ্যই আছে, কিন্তু অহেতুক তাঁকে টেনে এনে ঈশ্বর করে ফেলা যেন না হয়।

বাংলাদেশ যখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় কারাগার

প্রায় ৪০৯৬ কিলোমিটার (স্থলে ২৯৭৯, জলে ১১১৬) জুড়ে থাকা ভারত-বাংলাদেশ সিমান্ত দুটি আলাদা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ঘোষণা করলেও ঐতিহাসিক অবস্থানগত কারণে স্থানিয় জনপদ কখনো আলাদা ছিল না। পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম সিমান্তে হাজার হাজার পরিবার অন্যায় রাষ্ট্র ঘোষণার খড়গে বিভক্ত হয়ে গেছে। ‘সিমান্ত’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার আগে দু’পারের পরিবারের মধ্যে আত্মিয়তার বন্ধন ছিল, ছিল অর্থনৈতিক লেনদেনও। ১৯৮৬ সাল থেকে ভারত বাংলাদেশের চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করে। ভারতে কেন্দ্রিয় সরকারের বারবার রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও কংগ্রেস-বিজেপি সবাই বাংলাদেশ সিমান্তে কাঁটাতার প্রকল্প বিষয়ে আশ্চর্য ঐকমত্য বজায় রাখে। কাঁটাতারের সপক্ষে ভারতিয় রাজনীতিবিদদের বক্তব্য ইসরাইল ও ফিলিস্তিন সিমান্তে দেয়াল নির্মাণের পক্ষে ইসরাইলি নেতৃবৃন্দের বক্তব্যের অনুরূপ। তবে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন সিমান্তে নির্মিত দেয়ালের চেয়ে (নির্মাণ শেষে এই দেয়ালের পুরো দৈর্ঘ্য হবে ৭৬০ কিলোমিটার) তা অনেক বড়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সিমান্তে নির্মিতব্য দেয়াল (যার দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে ১১২৩ কিলোমিটার) এবং ইসরাইল-ফিলিস্তিন সিমান্তে নির্মিতব্য দেয়ালের সম্মিলিত দৈর্ঘ্যরে চেয়েও বাংলাদেশ-ভারত সিমান্তের দেয়ালের দৈর্ঘ্য অনেক বেশি। ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে তার সিমান্তেও ১৮০০ মাইল জুড়ে দেয়াল নির্মাণের প্রকল্প নিয়ে এগোচ্ছে, তবে বাংলাদেশ সিমান্তেই তার এরূপ প্রকল্পে অগ্রগতি বেশি এবং ইতিমধ্যে ভারত কর্তৃক নির্মিত এই সিমানা প্রাচির বিশ্বের সর্ববৃহৎ আন্তঃসিমান্ত দেয়াল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ইসরাইল-ফিলিস্তিন সিমান্তে নির্মিতব্য দেয়াল এবং যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো সিমান্তে নির্মিতব্য দেয়াল নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দুটি দেশে এবং বিশ্বজুড়ে সংশ্লিষ্ট সরকার ও মানবাধিকার কর্মিরা সোচ্চার হলেও বাংলাদেশে এ নিয়ে নেই কোনও উচ্চবাচ্য। ২০১০ সালের ১৫ মে তৎকালিন স্বরাষ্ট্র সচিব আবদুস সোবহান শিকদার বলেছিলেন, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকালে ভারত অন্তত ৪৬ স্থানে আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করেছে। স্বরাষ্ট্র সচিব এও জানিয়েছিলেন কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকালে সিমান্তের জিরো পয়েন্টের ১৫০ গজের মধ্যে কোনো ধরনের কাঠামো বা নির্মাণের যে আইনগত বাধ্যবাধকতা লংঘিত হয়েছে সেটি ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে জরিপ করেও
অন্তত ১২ স্থানে প্রমাণিত হয়েছে।
এ পর্যন্ত প্রায় তিনহাজার কিলোমিটার সিমান্তে কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন সম্পন্ন হয়ে গেছে। বেড়াগুলো তিন মিটার উঁচু করে নির্মিত। বেড়ার আশেপাশে আনুষঙ্গিক অনেক স্থাপনা নির্মিত হচ্ছে, হবে। ভারতের তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর স্থানিয় নাগরিকেরা এ সম্পর্কিত যেসব তথ্য প্রকাশে সরকারকে বাধ্য করেছেন তাতে দেখা যায়, দেশটি বাংলাদেশকে ঘেরাও করে ফেলার জন্য ওই সময় পর্যন্ত ৫২০৫.৪৫ কোটি রুপি অর্থবরাদ্দ দিয়েছে এবং সর্বমোট ৩৪৩৬.৫৯ কিলোমিটার সিমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া হবে তখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত রয়েছে। পরবর্তিকালে ভারতিয় বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, কাঁটাতারের প্রাচির নির্মিত হবে সর্বমোট ৩৭৮৩ কিলোমিটার। আসাম অঞ্চলে কয়েকটি স্থানে কাঁটাতারের বেড়া বিদ্যুতায়িতও করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন মেক্সিকো সিমান্তে বেড়া বা দেয়াল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় তখন সেখানে দু’দফায় অন্তত দুটি আইন পাশ হয়। সর্বশেষ যে আইনের মাধ্যমে এই কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয় তাহল ‘সিকিউর ফেন্স অ্যাক্ট ২০০৬’। ২০০৬ সালে ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে এই আইন কার্যকর হয়। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে কোন ধরনের আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মধ্যদিয়ে নয়, স্রেফ প্রশাসনিক উদ্যোগে ভারত বাংলাদেশকে ঘেরাও করে ফেলার এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক মেক্সিকো সিমান্তে বেড়া বা দেয়াল নির্মাণের কথিত যুক্তি হল মেক্সিকো থেকে মাদকের চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করা, আর ইসরাইল কর্তৃক পশ্চিম তীরে দেয়াল তৈরি করা হয় কথিত সন্ত্রাসি হামলা বন্ধ করার অভিপ্রায়ে। অথচ বাংলাদেশ সিমান্তে, বাংলাদেশের তরফ থেকে ভারতে এইরূপ সমস্যার কোনোটিই নেই। বরং ভারত থেকেই বাংলাদেশে ফেনসিডিল, অস্ত্র-সহ নানা ধরনের জিনিস চোরাচালান হয়ে আসে যা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। তাসত্তে¡ও বাংলাদেশ কখনোই সিমান্তে এরূপ মানবতাবিরোধি অবকাঠামো গড়ে তোলার দাবি জানায়নি। সিমান্তে এভাবে কাঁটাতারের বেড়া ও সড়ক নির্মাণ ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিরও লংঘন। ওই চুক্তি অনুযায়ি কোনো দেশ অপরের জন্য হুমকিমূলক সামরিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে না। নীতিনিয়মের তোয়াক্কা না করে ভারত বিভিন্ন সিমান্তে ইসরাইল থেকে পাওয়া গ্রাউন্ড সেন্সর টেকনোলজিও ব্যবহার করছে। কেবল কারিগরি দিক থেকে নয়, মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির অন্তর্নিহিত আকাক্সক্ষাও ভারত কর্তৃক সিমান্ত ব্যবস্থাপনায় ভুলুণ্ঠিত। যেখানে প্রথম অনুচ্ছেদেই ‘দীর্ঘস্থায়ি শান্তি ও বন্ধুত্ব’, ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’-এর পাশাপাশি ‘অপরের প্রতি বর্ণবাদি মনোভাব’ পোষণ না করার জন্য বলা হয়েছে। কিন্তু হাজার হাজার মাইল জুড়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ মোটেই বন্ধুত্বের স্মারক নয়, বরং বর্ণবাদি ঘৃণারও প্রকাশ।
বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মিরা যেসব যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো এবং ইসরাইল-প্যালেস্টাইন সিমান্ত বেড়ার বিরোধিতা করছেন তার সবগুলোই বাংলাদেশ-ভারত সিমান্তে উপস্থিত। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সিমান্তে দেয়াল নির্মাণের কারণে তিনটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির মানুষ আত্মিয়-স্বজনগতভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। অনুরূপভাবে ভারত কর্তৃক বাংলাদেশ সিমান্তে প্রাচির নির্মাণের কারণে হাজার হাজার পরিবার বিভক্ত। সিমান্ত এলাকার মানুষ আশপাশের গ্রামে বিয়ের মাধ্যমে আত্মিয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। তারা ভাবতেও পারেনি একই ভাষাভাষি ও জাতিসত্তার মাঝে এরূপ একটি দেয়াল নির্মিত হবে।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই কাঁটাতারের বেড়া বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনকেও বিভক্ত করবে-যা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিবেশবাদিদের নজরে এসেছে। কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে আনুষঙ্গিক উপাদান পরিবহনের জন্য সুন্দরবনে ব্যাপক সড়ক অবকাঠামোও নির্মাণ করতে হবে। বেড়া এবং সড়ক অবকাঠামোর ফলে সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্য নিশ্চিতভাবেই হুমকির মুখে পড়বে। বাঘ-সহ অনেক বিপন্ন প্রাণি কাঁটাতারের বেড়ার ফলে বিচরণভূমি হারিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের আগে বা পরে বাংলাদেশ কখনও এই প্রকল্পের পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের উদ্যোগ নেয়নি। অথচ পরিবেশবিষয়ক একটি অধিদপ্তর রয়েছে আমাদের এবং সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক সপ্তাচার্য নির্বাচিত করার নানা আয়োজনও লক্ষ করা যাচ্ছে। কাঁটাতারের বেড়া খুলনা-সাতক্ষিরার সুন্দরবন সন্নিহিত অঞ্চলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক নৃ-গোষ্ঠি-বাওয়ালি, মৌয়ালদের রুটি-রুজিতেও বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। কারণ এসব জনগোষ্ঠি সুন্দরবনের প্রাণসম্পদের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে।
অপরিণামদর্শি ও মানবিকবিপর্যয় সৃষ্টিকারি প্রকল্পের উৎস বরাবরই হয়ে থাকে সামরিক-আমলাতান্ত্রিক মনোভাব থেকে। যে কারণে দেখা যায়, বিশ্বে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টিকারি সবচেয়ে বেশি আলোচিত তিনটি সিমান্ত প্রাচির নির্মাণকারি দেশই (ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত) একই ধাঁচের। বাংলাদেশের মতো শান্তিপূর্ণ সিমান্তে অতি ব্যয়বহুল বেড়া নির্মাণ থেকে কল্পিত নিরাপত্তা খোঁজার যে চেষ্টা ভারত করছে তার সর্বোত্তম বিকল্প হতে পারতো দুদেশের মাঝে ন্যায্য সম্পর্কের মধ্যদিয়ে বন্ধুত্ব ও আস্থার মনোভাব ফিরিয়ে আনা। সিমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম কারাগারে বাংলাদেশকে পরিণত করার নিন্দা জানাই। সিমান্তে সব ধরনের হত্যা বন্ধে সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে আসবেন এমনটিই প্রত্যাশা আমাদের। বিশ্বের অন্যতম সম্পদ সুন্দরবন ধ্বংসে ভারত কাঁটাতারের বেড়া ও সুন্দরবনের ভেতর রাস্তা নির্মাণ বন্ধ করে সময়োচিত পদক্ষেপ নেবে সেটি আমাদের চাওয়া, এব্যাপারে পরিবেশবাদিদের এখনই রুখে দাঁড়াতে হবে।

বাঁধের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে

ভারত উত্তরপূর্ব অঞ্চলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেসব জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সেগুলো ডিহিং বহুমুখি বাঁধ প্রকল্প (ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদির ওপর), সুবানসিঁড়ি বহুমুখি বাঁধ প্রকল্প (ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদির ওপর), লোহিত বহুমুখি বাঁধ প্রকল্প (ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদির ওপর), যাদুকাটা বহুমুখি বাঁধ প্রকল্প (মেঘনার শাখা নদির ওপর), সোমেশ্বরি বহুমুখি বাঁধ প্রকল্প (মেঘনার শাখা নদির ওপর), ভৈরবি বহুমুখি বাঁধ প্রকল্প (বরাক নদির শাখার ওপর), নোয়া ডিহিং বহুমুখি বাঁধ প্রকল্প (ব্রহ্মপুত্রের শাখার ওপর), কুলশি বহুমুখি বাঁধ প্রকল্প (ব্রহ্মপুত্রের শাখার ওপর) ইত্যাদি। একটা সময় ছিল যখন বাঁধকে আশির্বাদ হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু বিজ্ঞানের ক্রমউন্নতি ও গবেষণায় আজ একথা দিবালোকের মতো সত্য ছোট-বড় যেকোনো বাঁধই মানবসভ্যতার জন্য অভিশাপ, বিপর্যয় সৃষ্টিকারি, শান্তি নাশক। বাঁধ যেমন প্রকৃতির উপর মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে তেমনি জীবনযাপন প্রণালিতেও অবিশ্বাস্য রকমের পরিবর্তন নিয়ে আসছে। টিপাইমুখসহ সব ধরনের বাঁধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আজ উচ্চকিত। ভারতের জলবিদ্যুৎ নিগম যতই যুক্তি দেখিয়ে বলুক, টিপাইমুখ দিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে বরাক নদের বন্যাও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, যুক্তি ধোপে টিকছে না। কারণ এই ড্যাম ২৯১৫০ হেক্টর আবাদি জমি পানিতে তলিয়ে দেবে। ফলে পশ্চিম মণিপুরের হমার ও জেলিয়াংগ্রং নাগা এবং উত্তর মিজোরামের কুকি-সহ বিপুল আদিবাসি জনগোষ্ঠির বাস্তুচ্যুতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। পানিতে ডুবে যাওয়ায় গাছপালা বৃক্ষ-সহ প্রাণি ও পরিবেশের নিদারুণ ক্ষতি হবে। টিপাইমুখ ড্যাম প্রকল্পে ওয়ার্ল্ড কমিশন অন ড্যামস্-এর নীতিমালাও মানা হয়নি, যে নীতিমালায় ড্যাম নির্মাণে আদিবাসি জনগোষ্ঠির স্বাধিন মতামত নেয়ার কথা। এনএইচপিসি মধ্যপ্রদেশের ইন্দিরাসাগর ও ওমকারেশ্বর, হিমাচল প্রদেশের চামেরা ১ ও ২, মণিপুরের লোকতাক, ঝাড়খন্ডের কোয়েল কারো, অরুণাচলের নিম্ন সুবানসিঁড়ি ইত্যাদি প্রকল্পে বাস্তুচ্যুত মানুষের যথাযথ পুনর্বাসন আজো হয়নি; বরং পরিবেশ ধ্বংস ও দুর্ভোগ বেড়েছে।
ভূ-বিজ্ঞানিরা মনে করেন টিপাইমুখ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। বাঁধ নির্মাণের পর যদি সেখানে ভূমিকম্প ঘটে তাহলে ভাটি অঞ্চলের আসাম ও বাংলাদেশে দুর্যোগ ঘটবে। ড্যাম নির্মাণের সম্ভাব্য সামাজিক ক্ষতিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে না। পরিবেশের ওপর বাঁধের প্রভাব কি হবে তা বিশ্লেষণের জন্য আগে থেকেই প্রাপ্ত কিছু তথ্যের ওপরে নির্ভর করা হচ্ছে, হয়েছে-যার বেশির ভাগই ভুল তথ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত।
বাংলাদেশের দুটি বড় নদির সরাসরি উৎস হচ্ছে বরাক নদ, যার ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে টিপাইমুখ ড্যাম। বরাক নদ সিলেট সিমান্তের অমলশিদে এসে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে একটি নাম নিয়েছে সুরমা, অপরটি কুশিয়ারা। সুরমা ও কুশিয়ারা বৃহত্তর সিলেটের প্রাণ, এ দুটি নদি নানা শাখা নদি দিয়েও সিলেটের হাওড়গুলোতে পানির যোগান দিয়ে যাচ্ছে। এসব বড় হাওড় আবার অনেক ছোট হাওড় ও বিল-বাঁওড়ে পানি যুগিয়ে থাকে এবং ছোট-বড় এই হাওড়-বিলই জীববৈচিত্র্যের উৎস ও শস্যভাণ্ডার। যেমন হাকালুকি, শনির হাওর, মাটিয়ান হাওর ইত্যাদি। সুরমা-কুশিয়ারা ভৈরবে এসে মেঘনা নামে বিশাল জলধারা হয়ে পানির যোগান দিচ্ছে কিশোরগঞ্জ-সহ বিস্তির্ণ এলাকায়। মেঘনার সঙ্গে সম্পর্কিত কিশোরগঞ্জ-নেত্রকোনার হাওড়-বাঁওড়, নদিনালা। বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চল তথা সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভিবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রা²ণবাড়িয়া, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ এই ৭টি জেলা তার হাওড়গুলোর জন্যই অনন্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। হাওড় এই অঞ্চলকে জীবিকা ও প্রাণবৈচিত্র্যের সঙ্গে দিয়েছে সংস্কৃতি ও সাহিত্য।
টিপাইমুখ ড্যাম কাজ শুরু করার পর এর একশ কিলোমিটার নিম্নে তৈরি করা হবে ফুলেরতল ব্যারেজ। ড্যাম নির্মাণ সম্পন্নের পর বরাকে ৩১ শতাংশ পানি আটকে রাখা হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এবং ফুলেরতল ব্যারেজ নির্মিত হওয়ার পর বরাক প্রবাহের ১০০ ভাগ পানির নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে ভারত সরকারের হাতে। ফুলেরতলে যে ব্যারেজ নির্মিত হবে সেটি সাধারণ বিবেচনা শক্তি প্রয়োগেই বোঝা যায়। কারণ টিপাইমুখ ড্যামে বিনিয়োগকৃত অর্থ তুলতে গেলে ফুলেরতলে ব্যারেজ বানিয়ে তার সেচ সুবিধা থেকেই তা গুণতে হবে। ফল ফারাক্কার মতো বিপর্যয় সৃষ্টিকারি হবে আমাদের ধারণা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরাকের বাংলাদেশ অংশ তথা সুরমা-কুশিয়ারার স্রোতের গতি ও বালু বহনের ক্ষমতা পদ্মার চাইতেও বেশি। টিপাইমুখ ড্যাম হলে নদিগর্ভে বালি কিংবা পলি সঞ্চালনের পরিমাণ বেড়ে যাবে। এতে করে কয়েক বছরের মধ্যেই বালুস্তর জমে সিলেট অঞ্চলের হাওড়-বাঁওড়, নদিনালা ভরাট হয়ে যাবে। ধ্বংস হবে কৃষি। সুরমা-কুশিয়ারা ভরাট হলে টান পড়বে মেঘনার অস্তিত্বেও।
শুকনো মওসুমে নদিকেন্দ্রিক জনপদ এবং হাওড়কেন্দ্রিক জনপদের অবস্থা ভিন্ন থাকে। রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের নদিগুলোতে শুকনো মওসুমে পানি ছাড়লে সেটিতে লাভ এবং তা প্রয়োজন। কিন্তু হাওড় অঞ্চলের নদিগুলোতে তা হবে আত্মঘাতি। কারণ শুকনো মওসুম তথা হেমন্ত, শিত ও বসন্তের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ে টিপাইমুখ ড্যাম থেকে জল ছাড়া হবে আর ওই সময়ে হাওড়গুলো জেগে ওঠে ও ফসল ফলে। এসময় প্রথমে হাওড়ের জেগে ওঠা উঁচু ভূমিতে বিজ বপন করা হয়, সেগুলো দুই তিনমাস পরে চারা তথা জালা হয় এবং জালা হওয়ার পরে নিম্নভূমি ততদিনে জেগে ওঠলে সেখানে রোপণ করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার সময় হাওড়গুলোর পানি নদির মাধ্যমে নিষ্কাষিত হয়। কিন্তু টিপাইমুখ থেকে ওই সময়ে যখন পানি ছাড়া হবে তখন হাওড়গুলো জেগে ওঠতে পারবে না। ফলে বোরো ধান ফলানোও অসম্ভব হয়ে পড়বে। তথা ওই দিনগুলোতে টিপাইমুখ থেকে পানি ছাড়ার ফলে নদির পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় নদি আর হাওড়ের পানি নিষ্কাশন করতে পারবে না, উল্টো এমনও হতে পারে যে, নদির পানি হাওড়ে গিয়ে ঢুকবে। ফল হবে ভয়াবহ।
টিপাইমুখ ড্যাম দিয়ে আগাম বন্যা নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। সর্বোচ্চ পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে গিয়ে ড্যাম সবসময় পূর্ণ রাখতে হবে। ড্যামের গঠন অনুযায়ি অতি বৃষ্টিতে পানি কেবল স্পিলওয়ে দিয়ে উপচে পড়ে ভাটিতে যায়। যেমন হচ্ছে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে বর্ষার বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বরাক অববাহিকায় অতিবৃষ্টিপাত ঘটলে সেক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে ঠিকই, তবে অতিরিক্ত পানি আটকে না রেখে বিকল্প পথে তা নিকাশ করতে হবে। এ কারণে নিম্নাঞ্চলে বন্যারোধ করা সম্ভব হবে না। উদাহরণ হিসেবে ভারতের ভকরা বাঁধকে আনা হয়। ১৯৭৮ সালে বাঁধটি থেকে জরুরি ভিত্তিতে পানি ছেড়ে দিলে পাঞ্জাবের প্রায় ৬৫ হাজার মানুষকে ঘরবাড়ি ত্যাগ করতে হয়েছিল। তাছাড়া বন্যার তোড়ে বাঁধ ভেঙে পড়ার আশংকাও থাকে।
পূর্বেই বলা হয়েছে, টিপাইমুখ বিশ্বের একটি বৃহত্তম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। ভূমিকম্প যদি বাঁধ ভেঙে দেয় তাহলে এই বিলিয়ন বিলিয়ন ঘন মিটার পানি শুধু মণিপুর বা কাছাড়ে সিমাবদ্ধ থাকবে না। বছরের অন্যান্য সময় শান্ত থাকলেও বরাক ও এর শাখা নদিগুলো মৌসুমি বৃষ্টিপাতের সময় স্রোতস্বি হয়ে ওঠে। ভূ-প্রকৃতিগত কারণে বাংলাদেশের সিলেট ও পার্শ্ববর্তি মণিপুর অঞ্চলে বর্ষাকালজুড়ে অধিক পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়। সাধারণভাবে এই বৃষ্টিপাতের ৬০-৭০ ভাগ হয় জুন থেকে অক্টোবরের মধ্যে। বিপরিতে বছরজুড়ে কার্যকর রাখতে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রকে মে-জুনের ভেতরে পূর্ণ পানি ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে বাঁধের ভাটি অঞ্চল তথা মণিপুর ও বাংলাদেশে বন্যা দেখা দেবে।
টিপাইমুখ বাঁধ দিয়ে শুষ্ক মওসুমে পানিপ্রবাহ বাড়ানো প্রসঙ্গটি সমালোচিত হচ্ছে এই বলে যে, ফ্যাপ-৬ রিপোর্টে নাকি আছে, ড্যাম নির্মিত হলে অমলশিদে পানির সর্বোচ্চ প্রবাহ শতকরা ১০০ ভাগ থেকে ২০০ ভাগ বাড়বে এবং পানির পরিমাণ বাড়বে শতকরা ৬০ ভাগ। অন্যদিকে টিপাইমুখ প্রকল্পের পরিবেশগত রিপোর্টেও বলা হয়েছে, বাঁধের কারণে শুষ্ক মওসুমে পানি প্রবাহ ১১০ ভাগ বেড়ে যাবে। ফ্যাপ-৬ এর রিপোর্ট মতে, এই বর্ধিত প্রবাহ নৌ চলাচল, সেচ ও মৎস্য চাষ বৃদ্ধি ঘটাবে। এখানেও আমাদেরকে নদি অঞ্চল ও হাওড় অঞ্চলের ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে হচ্ছে। বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলে ওই সময় পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে ফসল ফলবে কি করে? হাওড় শুকিয়ে গেলে মানুষ যেমন বোরো ধান রোপণ করে, তেমনি হাওড় শুকনো থাকতে থাকতেই বোরো ফসল ঘরে তোলে। টিপাইমুখ ড্যাম নিয়ে ভারত সরকার একটি পক্ষ, কারণ তারা এটিতে লাভই দেখতে পাচ্ছে। এদিকে বাংলাদেশ সরকারও ভারত সরকারের ওপর আস্থাশিল এই কারণে যে, বাংলাদেশের ক্ষতি হয় ভারত সরকার এমন কিছু করবে না এবং টিপাইমুখ ড্যামে বাংলাদেশের কোনও ক্ষতি হবে না। এমন প্রচারণাও চালানো হচ্ছে টিপাইমুখে উৎপাদিত বিদ্যুৎ থেকে বাংলাদেশ লাভবান হবে। কার্যত এই ড্যাম নিয়ে এখন পর্যন্ত নিরপেক্ষ কোনও সমিক্ষা পর্যন্ত হয়নি। ফারাক্কা অভিজ্ঞতাও আমাদের জন্য সুখকর হয়নি। ফারাক্কার কারণে কৃষি, অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের কি ক্ষতি ঘটেছে এবং বাংলাদেশে পরিবেশ উদ্বাস্তু কত দাঁড়িয়েছে তা নিরূপণ করা দরকার। আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট, ছোট বড় সকল বাঁধ এখনই বন্ধ করতে হবে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের এই আত্মহনন, ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য কিছুতেই বিসর্জন দেয়া যায় না। উন্নত দেশগুলো যেখানে প্রকৃতির মুক্তপ্রবাহকে স্বীকার করে নিয়ে বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে, সেখানে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো সাম্রাজ্যবাদি শক্তির প্ররোচনায় হীন স্বার্থে বাঁধ গড়ে তুলছে, যা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। আত্মহনন প্রকল্প বন্ধ হউক এখনই এই কাম্য। আশার কথা জনমত সেদিকেই যাচ্ছে।

সংখ্যা সম্পর্কিত দুয়েকটি কথা

সরলরেখা’র এ সংখ্যায়ও নতুনদের আগমন অব্যাহত থাকলো। নতুন যারা যুক্ত হলেন, তাদের জন্য শুভ কামনা। কবিতা ছাপা হলো এ সংখ্যায়। ভবিষ্যতে কবি ও কবিতার সংখ্যা নিশ্চয়ই বাড়বে আশা রাখি। বাক্য গঠনে নানা দুর্বলতা থাকাসত্তে¡ও বিষয়বৈচিত্র্য থাকায় আশরাফ উদ্দীন আহ্মদ-এর নষ্ট মানুষ আর ছায়ার গল্প ছাপা হলো। লেখক দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে বাক্যগঠনে সতর্ক হলে আরো ভাল গল্প ভবিষ্যতে উপহার দেবেন জোরের সাথেই বলা যায়। সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র ২০বছর পূর্ণ করলো। ২০বছর পূর্তি উপলক্ষে সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে বিভিন্ন ক্লাব কর্তৃক আয়োজিত যে সেমিনার হয় তাতে পঠিত মূল প্রবন্ধগুলো পাঠক/পাঠিকার বিবেচনার জন্য রাখা হলো। সেমিনারে উপস্থিত আলোচকদের কথা ছাপতে পারলে আরো ভাল লাগত, এ অপূর্ণতা মননে রয়েই গেল। শুভানুধ্যায়ি, লেখক-পাঠক, সমালোচক, বিজ্ঞাপনদাতা সবাইকে ধন্যবাদ।
আমিনুল রানা’র নেয়া সাক্ষাৎকার ‘দেয়ালের ওপারে আকাশই আমাদের অন্বিষ্ট’ পুনরায় ছাপা হলো। সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হওয়ার পর কিছু কিছু বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা পরিলক্ষিত হওয়ায় লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ বর্ষ ৩, সংখ্যা ৩, জানুয়ারি ২০১২ থেকে তা হুবহু সরলরেখা’র পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো। উত্থাপিত বিতর্ক/ আপত্তির উত্তর পাঠক সাক্ষাৎকার থেকে পাবেন এমনটিই আশা আমাদের।

পরবর্তি সংখ্যা ‘কবি নির্বাসন অথবা প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র’।

শেয়ার করুন: