004588
Total Users : 4588
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →
জন্ম— জুন, ০৬, ১৯৭৭। জন্মস্থান— উত্তর গোবীন্দর খীল, হাঁদু চৌধুরী বাড়ী, পটিয়া, চট্টগ্রাম। (শৈশব কৈশোর ও তারুণ্যের সময়যাপন) বেড়ে ওঠা (পূর্ব্ব বালিয়াদী, মীরশ্বরাই, চট্টগ্রাম) নানার বাড়ীতে। প্রকাশিত কবিতার বই— ফুলেরা পোষাক পরে না (সাল: ২০১৮, প্রকাশক : মনফকিরা, কলিকেতা)। প্রকাশিতব্য বই— অর্দ্ধনারীশ্বরবাদ : প্রকৃতিপুরুষতত্ত্ব (নন্দনতত্ত্ব), বটতলার বয়ান (ভাষাতাত্ত্বিক গদ্য) ও উদ্ভিদপ্রতিভা (কবিতা)। সম্পাদক— চারবাক।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

সামনের শতাব্দিতে সাম্রাজ্যবাদি পানি ব্যবস্থাপনা: মুনাফা বনাম মানুষ ও পরিবেশ

যতোগুলো অজৈব চক্র গতিশিল থাকার কারণে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং বিকাশ সম্ভব হয়েছে, পানি চক্র তার মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। সকল ধরনের বাস্তুসংস্থান গঠনে প্রাপ্ত পানির পরিমাণ ও গুণগত অবস্থার অন্যতম নির্ধারক ভূমিকা যেকোন ধরনের উৎপাদন কর্মেই পানিকে অত্যাবশ্যকিয় করেছে। আহরণবৃত্তি পরিত্যাগি আদিম মানুষের উৎপাদন ও সভ্যতা নির্মাণের ইতিহাসও নদির পাড় ধরেই এগিয়েছে।

কৃষি সভ্যতা বিকাশের একটা পর্যায় থেকে মানুষ সেচ সুবিধা পাবার জন্য নদি ব্যবস্থাপনায় নিযুক্ত হয়। নিল, সিন্ধু, কিংবা হোয়াংহো তিরে এভাবেই কৃষিজিবি মানুষেরা প্রাচিন সব সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। প্রাচিন মিশরিয়রা হাজার হাজার বছর আগে নিল নদকে কেন্দ্র করে যে জটিল সেচ বন্দোবস্ত গড়ে তুলেছিল তা থেকেই মিশরিয় শাসনব্যবস্থা ও সভ্যতার সূত্রপাত। আবার অনেক সমৃদ্ধ প্রাচিন সভ্যতার পতন বা বিলয়ে পানি ও ভূমির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারজনিত প্রাকৃতিক বিপর্যয় বস্তুগত কারণ হিসেবে সক্রিয় ছিল। সেচের তদারকি প্রাচ্যে শাসকদের শাসন কার্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো। উপনিবেশিক আমলের আগ পর্যন্ত কৃষিনির্ভর অঞ্চলগুলোর ভূমি ও সেচ ব্যবস্থাপনা বহু প্রাচিন সময় থেকেই মোটামুটি অপরিবর্তিত ছিল, যদিও নতুন নতুন এলাকায় আবাদ ও জলসেচের ব্যবস্থা প্রায় নিয়মিতভাবেই করা হতো।

ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের পর থেকেই বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল উৎপাদন ও যোগান সুলভ করার জন্য সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নতুন নতুন সড়কপথ নির্মাণের প্রয়োজনে পানি প্রবাহ ও জলাশয়গুলোর প্রাকৃতিক আকৃতির ওপর যথেচ্ছ হস্তক্ষেপ করা হয়। এর সাথে যুক্ত হয় ক্রমবর্ধমান হারে শিল্প ও কৃষিবর্জ্যজনিত দূষণ। শিল্পবর্জ্য দূষণের পরিনামে ইংল্যান্ডের টেমস নদি ঊনিশ শতকের শেষার্ধে পরিণত হয় একটি অস্বাস্থ্যকর, ব্যবহার অনুপযোগি ও মৎস্যশূন্য প্রবাহে। বিপুল ব্যয়বহুল প্রকল্পের মাধ্যমে স¤প্রতি নদিটিকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভবপর হয়েছে। ইউরোপে এভাবে শিল্পায়নের তাগিদে প্রাকৃতিক পরিবেশের যথেচ্ছ পরিবর্তন করা হয়, উপনিবেশিত দেশগুলোতেও পশ্চিমের চাহিদা মতো বিবেচনাশূন্য এবং অনিয়ন্ত্রিত ধ্বংস সাধন করা হয়। ঔপনিবেশিক আমলে সারা পৃথিবীই ইউরোপিয় শাসকদের এই বর্বর অরণ্য, জলাভূমি ও নদি ধ্বংস প্রত্যক্ষ করেছে। বিজিত দেশগুলোতে তারা নিজেদের প্রয়োজনের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ উৎপাদন ও পরিবহনের সব ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলে যা পরবর্তিতে স্থায়ি বিরূপ প্রতিক্রিয়া রেখেছে।

কিন্তু উপনিবেশের যুগ সমাপ্ত হবার পরও ধ্বংসযজ্ঞের অবসান হয়নি মোটেই, বরং বিশেষ করে গত পঞ্চাশ বছরে পানি ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার ধরন পরিস্থিতিকে আজ এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে যে পানির বিশ্বে আজ ব্যবহারযোগ্য পানির অভাব ঘোষিত হচ্ছে, বিভিন্ন মহল থেকে বারবার জানান হচ্ছে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে পানি পাবার দিন ফুরিয়েছে-পানি এখন কিনতে হবে এবং উচিত দামেই।

একেবারে শুরু থেকেই পানি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, একে অপরকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে, পানি ব্যবস্থাপনার সাথে জীবজগতের টিকে থাকার প্রশ্নটিও জড়িত, এ কারণেই এ আলোচনায় এমন বিষয় আসে যা নিরেট পানি ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পর্কিত না হলেও প্রাসঙ্গিক এবং অতি জরুরি।

৫০ দশক থেকে সাম্রাজ্যবাদি অর্থায়নে পানি ব্যবস্থাপনা
২০০০ সাল নাগাদ পৃথিবীতে মোট বৃহৎ বাঁধের সংখ্যা ৪০,০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে। এই বাঁধগুলোর ৯০ ভাগেরও বেশি ’৫০ সালের পর নির্মিত। এসময় থেকেই বিশ্বব্যাংক-আইএমএফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋণে বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোতে ব্যয়বহুল পানি অবকাঠামো (আড়াআড়ি বাঁধ, ভেড়ি বাঁধসহ বিভিন্ন ধরনের বিশালাকৃতির বাঁধ, জলাধার, সংযোগ খাল প্রভৃতি) নির্মাণ আরম্ভ হয়। লক্ষ্যণিয় যে একই সময়ে বিশ্বব্যাপি ঐ একই ধরনের সংস্থাসমূহের অর্থায়নে নলকূপের মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনও ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। আর এ দুয়ের সাথে যুক্ত হয়েছিল ‘সবুজ বিপ্লব’-যার মাধ্যমে দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে অভাব, ক্ষুধা, বেকারত্ব দূর করার জন্য প্রয়োজনিয় ব্যবস্থা গ্রহণের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল।

সবুজ বিপ্লবের অংশ হিসেবেই বিশ্বব্যাপি পানি ও ভূমির সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত কৃষি উপকরণ ব্যবহারের ডাক দেয়া হয়। বিশ্বব্যাংক সাধিত এই বিপ্লবে দারিদ্র্য দূর তেমন না হলেও দৈত্যাকার নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, সার, কিটনাশক ও সেচযন্ত্র উৎপাদকদের ব্যবসায় লক্ষ্যণিয় প্রসার ঘটে। উলে­খ্য যে, বিশ্বব্যাংক তার এ ধরনের প্রকল্পের অনেকগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব স্বিকার করলেও ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা, ঋণ মাফও করে না।

ফাও এর উচ্চ ফলনশিল (উফশি বা এইচওয়াইভি) বিজ ব্যবহার সম্পর্কিত কর্মসূচি, ইউনেস্কোর খাবার পানি সম্পর্কিত কর্মসূচি প্রভৃতির মাধ্যমে এই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও ঋণ, অনুদান, প্রচারণা প্রভৃতির মাধ্যমে এ নীতি বাস্তবায়নের সহযোগি ভূমিকা পালন করেছে। দেখা যাবে যে উফশি বিজ এদের বরাবরই পছন্দের এবং এরাও উফশিকে কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয় করার জন্য সম্ভাব্য সবকিছুই করেছে। সাধারণ প্রকরণগুলোর সাথে উফশির পার্থক্য এই যে উফশি চাষে বাড়তি জলসেচ, কিটনাশক ও সার অত্যাবশ্যক। তাই উফশির প্রবর্তন বাঁধ নির্মাণ থেকে শুরু করে নলকূপ, সার ও কিটনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধির যৌক্তিকতা প্রদান করেছে। বিংশ শতকের শুরুতে শুধু কৃষি বাবদ প্রত্যাহৃত পানির পরিমাণ ছিল ৫১৩ ঘন কিলোমিটার, ’৫০ সালে ছিল ১১২৪ ঘন কি.মি., ’৯৫ সালে এসে এটা দাঁড়ায় ২৫০০ ঘন কি.মি.-এ। পানিয় জল ও শিল্পসহ মোট ব্যবহার ধরলে এই তিনটি সালের অংকগুলো হচ্ছে ৫৭৯, ১৩৬৫, ৩৭৮৮। কিটনাশক ও সার প্রয়োগেও এই সময়ে নাগাদ একই রকম উচ্চ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এভাবে এই গোটা পর্ব জুড়েই অর্থনৈতিক নীতি-কৌশল যেভাবে নির্ধারিত হয়েছে তার সাথে এই সব বহুজাতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার বিকাশ অবিচ্ছেদ্যভাবে ঘটেছে এবং পানি সংকটের যে আতংক আজ সবাইকে গ্রাস করছে তা এদের এতোদিনকার পানি ও ভূমি ব্যবস্থাপনারই ফলাফল। এদের কর্তৃত্ব ও চাপিয়ে দেবার ক্ষমতা কেমন ছিল তা বোঝা যাবে সরকার, এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে রাষ্ট্র পরিবর্তনের পরও এই বিপর্যয়কর প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়িত না হওয়া থেকে, বরং নিরবচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। বাংলাদেশ যেমন ‘… ১৯৬৫ সালের মাস্টার প্ল্যানের নকশা বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখে। এ সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক যা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়নি তা হচ্ছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধিনে বিশেষজ্ঞের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ফলে নানা দির্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের পূর্বাভাষ থাকলেও স্বাধিনতা উত্তর সময়ে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রকল্পগুলো স্থগিত বা পরিবর্তনের কোন পদক্ষেপ গৃহিত হয়নি’ (মাহমুদ হানিফ, সংস্কৃতি, জুলাই ২০০০)। পানি ব্যবস্থাপনায় একই সাম্রাজ্যবাদি নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতা অনুন্নত বিশ্বের পুরোটা জুড়েই অব্যাহত থেকেছে বহু ক্ষেত্রেই স্থানিয় বিশেষজ্ঞদের বাধা, বিপর্যয়ের হুশিয়ারি ও সুপারিশ উপেক্ষা করে কিংবা ধামাচাপা দিয়ে।

পানির এই ঘাটতি (দূষণ কিংবা বিরূপ অবকাঠামোর ফলশ্র“তিতে) নতুন শতাব্দিতে পানিকে এমন লোভনিয় পণ্যে পরিণত করেছে যে শুধু পানি অবকাঠামো বাবদ বর্তমানে নিয়োজিত বেসরকারি বিনিয়োগ ১৬-২০ বিলিয়ন ডলার থেকে সামনের বহু বছর ধরে ১২৫ বিলিয়ন ডলার হারে বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে, স্থানিয় বিনিয়োগ হবে ৮০ বিলিয়ন ডলার। এর সাথে বর্তমানের সরকারি বিনিয়োগ প্রতিস্থাপনের জন্য থাকবে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে দেয়া সরকারি ও ওডিএ ভর্তুকি যার পরিমাণ বার্ষিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। পানি ব্যবসায় নিয়োজিত পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলো তো বটেই, অন্য অনেক প্রতাপশালি বহুজাতিকও সঙ্গত কারণেই পানির কারবারে আগ্রহি হয়ে উঠেছে, গড়ে উঠছে নতুন আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।

এরকম একটি প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপি পানি ব্যবস্থাপনার পুনর্মূল্যায়ন, সম্ভাবনাময় নতুন বিনিয়োগের নীতি-কৌশল নির্ধারণ ও তার পরিসর ঠিক করে দেবার জন্যেই গড়ে উঠেছে ওয়ার্ল্ড ওয়াটার কাউন্সিল। নিজেদের ওয়েবসাইটে ওয়াটার ভিশন এর জন্ম সম্পর্কে যে তথ্য দেয়া হয়েছে সেটা অনুযায়ি কাউন্সিল এর উদ্যোগে মরক্কোতে ১৯৯৭ সালে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ওয়াটার ফোরামে অংশগ্রহণকারিরা ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াটার ভিশন’ আহবান করে যা বিশ্বে পানির বর্তমান অবস্থা এবং আসছে শতকে ‘অংশিদারিত্বের মাধ্যমে’ পানি ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে গঠিত বৃহত্তম উদ্যোগ এর অংশিদারদের মাঝে সরকার থেকে শুরু করে সুশিল সমাজ, এনজিও, বেসরকারি খাত সবকিছুই রয়েছে। কমিশন নিজেকে স্বাধিন বলে দাবি করলেও এর কো-স্পন্সর হিসেবে রয়েছে বিশ্বব্যাংক, ফাও, ওএএস, ইউএনডিপি, ইউএনইপি, ইউনেস্কো, হু, ইউএনইউ, ডব্লিউএমও প্রভৃতি সংস্থা। কমিশন এর বর্তমান সভাপতি ইসমাইল সিরাজেলদিন বিশ্বব্যাংক ও গ্লোবাল ওয়াটার পার্টনারশিপ এর সহসভাপতি। এদের সম্মিলিত উদ্যোগে সরকার, বেসরকারি বিনিয়োগকারি, এনজিও, বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারিদের দির্ঘ মতবিনিময় ও আলোচনার ভিত্তিতে ভিশন রিপোর্ট প্রণিত হয়। ভিশন রিপোর্টের ভাষায়, চূড়ান্ত বিশ্লেষণে ওয়াটার ভিশন এর অবস্থান ও গঠন নির্ধারণ করে দিয়েছে ওয়ার্ল্ড ওয়াটার কমিশন।

বিশ্বব্যাপি পানি সংকটের হাল অবস্থা : ভিশন রিপোর্ট থেকে
ভিশন রিপোর্ট উদ্ধৃতি থেকেই পানি সংকটের একটা চিত্র পাওয়া যাবে। যেমন: খাদ্য ও গ্রাম উন্নয়নের জন্যে পানি অংশ থেকে-
ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা না থাকলে সেচ প্রাপ্ত এলাকাগুলো জলাবদ্ধতা বা ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা বৃদ্ধির শিকার হতে পারে যা ভূমির উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। প্রাচিন সেচ নির্ভর সভ্যতাগুলোর পতনের জন্য দায়ি এই সমস্যা বর্তমানেও বিশাল পরিমাণ এলাকাকে আক্রান্ত করছে। ’৮০ সাল নাগাদ ৫০ মিলিয়ন হেক্টর জমি (সেচ প্রাপ্ত জমির ২০ ভাগেরও বেশি) লবণাক্ততা বৃদ্ধির শিকার হয়েছে। এটা এখন নিশ্চয়ই আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাঁধ জনিত ক্ষতির মাত্রা বোঝার জন্য খেয়াল রাখা দরকার যে ২০ বছর আগের এই হিসাব মতো শুধুমাত্র লবণাক্ততার শিকার হয়েছে এ পরিমাণ জমি, জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে কতখানি কিংবা বাঁধের বাইরে পরে যাবার জন্যে স্থায়িভাবে নদি স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়েছে কত জমি তা এ হিসাব থেকে জানা যাচ্ছে না, এবং লবণাক্ততার সমস্যার চেয়ে এ সমস্যায় আক্রান্ত জমির পরিমাণ কম নয়।

আজকের দিনে পানি সম্পদের ব্যবহার অংশ থেকে
উন্নত এবং উন্নয়নশিল দেশগুলো তাদের সমৃদ্ধি অর্জন করেছে প্রকৃতির ভয়াবহ ক্ষতিসাধন করে। জলাভূমির মোট পরিমাণ এ শতাব্দিতে অর্ধেকে নেমে এসেছে যা জৈব বৈচিত্র্যকে বিপর্যস্ত করেছে।… সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাবগুলোর কারণে বৃহৎমাপের পানি অবকাঠামোসমূহ, বিশেষত বড় বাঁধগুলো বিতর্কিত হচ্ছে এবং গণসমর্থন হারাচ্ছে।

অবলুপ্তিপ্রাপ্ত প্রজাতিরা অংশ থেকে জৈববৈচিত্রের ক্ষয়ক্ষতি কেবল আংশিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বড়সড় জীবদের কয়েকটিকেই বিবেচনা কিংবা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। শতকরা ২০ ভাগ স্বাদু পানির মাছ অসুবিধাজনক অবস্থায় আছে বা বিপদগ্রস্ত বা বিলুপ্ত; লার্ভা অবস্থায় জলজীবন কাটানো ২০ ভাগ পতঙ্গ বিপদগ্রস্ত, ৫৭ ভাগ স্বাদু পানির ডলফিন (শুশুক) বিপদগ্রস্ত বা খারাপ অবস্থায় আছে, একই অবস্থা ৭০ উদবিড়াল এর, ৭৫ ভাগ স্বাদু পানির শামুক জাতিয় খোলসওয়ালা প্রাণি বিপদগ্রস্ত বা বিলুপ্তপ্রায়। অন্যান্য অনেক কারণের সাথে ২৫ মিলিয়ন কিলোমিটার বাঁধ এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, অর্ধেকের বেশি জলাশয় এ শতাব্দিতেই বিলুপ্ত হয়েছে।

ক্ষুদ্র প্রাণিদের ভূমিকা প্রসঙ্গে একটি কথা বলে রাখা দরকার, খাদ্যশৃঙ্খলের মূল ভিত্তি হচ্ছে ক্ষুদ্রকায় উদ্ভিদ ও প্রাণিরা, এদের অনুপস্থিতিতে কোন প্রকার খাদ্য উৎপাদন, জৈব বৈচিত্র এমনকি প্রাণের অস্তিত্বই কল্পনা করা যায় না।
উন্মুক্ত এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির মান অংশ থেকে ভূ-গর্ভস্থ পানি যা পৃথিবীর বেশিরভাগ লোকের কাছে খাবার পানির বাঞ্চিত উৎস হিসেবে বিবেচিত, শহরে শিল্পবর্জ্য এবং গ্রামে কৃষিকর্মে ব্যবহৃত সার ও রাসায়নিক দ্রব্য দ্বারা দূষিত হচ্ছে। পশ্চিম ইউরোপে শস্যক্ষেত্রে সার প্রয়োগ এতো বেশি যে ভূ-গর্ভস্থ পানিতে বাড়তি নাইট্রেট মিশে গিয়ে ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ড, ফ্রান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একবার দূষিত হয়ে গেলে ভূ-গর্ভস্থ জল পরিষ্কার করা, ভূ-স্তর থেকে বর্জ্য নিষ্কাশনের কাজটি ব্যয়বহুল এবং দুরূহ।

তিব্র বন্যা ও খরা অংশ থেকে
গত ১০ বছরে বৃহৎ বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি ৬০ দশকের তুলনায় ১০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে…। ভিশন রিপোর্টে বাংলাদেশের কথা বলা হয়েছে, বাঁধের ফলে যে জলিয় পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ ও মানুষ বিপদগ্রস্ত হচ্ছে সে স্বিকৃতি রয়েছে।
ভিশন রিপোর্টে আজকের দিনে পানি সম্পদের ব্যবহার অংশে ইতিবাচক অর্জন হিসেবে সহযোগি সংস্থাগুলো কর্তৃক এইভাবে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর গুণকির্তন করা হয়েছে এ তথ্য জানিয়ে যে, আন্তর্জাতিক পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন দশকে (৮১-৯০) এবং এর ধারাবাহিকতায় সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সহযোগিতায় ৮০ ভাগ লোকের কাছে নিরাপদ ও সুলভ্য খাবার পানি ও ৫০ ভাগের কাছে শৌচাগার সুবিধা পৌঁচেছে। আরও আছে কৃষি বিপ্লবের সাফল্য যা সার-কিটনাশক-সেচ যন্ত্রপাতি ও উচ্চ ফলনশিল বিজ উদ্ভাবনের মাধ্যমে ৩০ বছরে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া মানুষকে খাদ্য জুগিয়েছে।

ভিশন রিপোর্টে উলে­খিত ‘নিরাপদ ও সুলভ’ খাবার পানি প্রাপ্ত ৮০ ভাগ মানুষের মাঝে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের আর্সেনিক আক্রান্ত কোটি কোটি মানুষও অন্তর্ভুক্ত। এই আর্সেনিক বিষক্রিয়ার সাথে এ যাবতকাল বাস্তবায়িত ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও নদি থেকে পানি প্রত্যাহার প্রকল্পগুলোর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। আর্সেনিক দূষণ এখন যে মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং আরও যাচ্ছে তাতে এই মানুষগুলোর জন্য খাবার পানি এখন মোটেই সুলভ কিছু নয় বরং উচ্চমূল্যের এবং দুর্লভ পণ্য। এর প্রতিফলন কিছুটা পাওয়া যাবে জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য ও বিশ্লেষণভিত্তিক রিপোর্টের পরিষ্কার ঘোষণায়-২.৩ বিলিয়ন মানুষ পানি ঘাটতিতে আক্রান্ত, যা পূর্বের ধারণার চেয়ে ষাট ভাগ বেশি (টাইম, বিশেষ এপ্রিল-মে সংখ্যা, ২০০০)। অতীতের এই সব প্রকল্পের বদৌলতে এই সংখ্যা যে অচিরেই আরো বিপুল হারে বাড়বে তার নমুনা আমরা ভিশন রিপোর্টেই পাব।
একই রকমভাবে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি সম্পর্কে বক্তব্য দেয়ার পর পরই বলা হচ্ছে ৪০০ মিলিয়ন মানুষ (বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১০%) প্রতিদিন ২০০০ ক্যালরির কম খাদ্য গ্রহণ করে। এটাও সকলেরই জানা যে এদের বড় অংশ খয়রাতি সাহায্যের ওপর নির্ভরশিল, উৎপাদন সম্পর্কের মৌলিক কোন পরিবর্তন না এনে কেবল খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে যে সত্যিকারের খাদ্যের অধিকার অর্জন হয় না সে অভিজ্ঞতাটির সরাসরি উলে­খ না থাকলেও তারও পরোক্ষ স্বিকৃতি পাওয়া যাবে ব্যবহার, কর্তৃত্ব ও অংশিদারিত্ব অংশে যখন বলা হয় পৃথিবীতে সবার জন্য যথেষ্ট খাদ্যই উৎপাদিত হয় কিন্তু ৮০০ মিলিয়ন মানুষ অপুষ্টিতে ভোগে।

ওয়াটারভিশন রিপোর্ট পর্যালোচনা
বিশ্বব্যাপি পানি সংকটের এই বিপর্যয়কর সংবাদসমূহ পাঠ করার সময়ে আমাদের যা স্মরণ রাখা দরকার তা হচ্ছে এই যে এগুলো নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলি নয়, এরা বিশ্বব্যাপি একটি নির্দিষ্ট ‘উন্নয়ন নীতি’রই পরিণতি। এবং এই নীতি যারা বাস্তবায়ন করেছে তারা সকলেই ওয়ার্ল্ড ওয়াটার ভিশন ও ওয়ার্ল্ড ওয়াটার কাউন্সিলের অংশিদার, ভিশন রিপোর্টের প্রণেতাও তারাই। কাজেই বিশ্বব্যাপি পানির সংকটের একটা চিত্র এ রিপোর্ট হাজির করলেও পানির এই দুর্লভ হয়ে পড়ার পেছনে কোন ধরনের উন্নয়ন নীতি কাজ করেছে, কারা তার সুফলভোগি, কাদের অপরাধতুল্য কার্যকলাপ অসংখ্য জনগোষ্ঠিকে পানি বঞ্চিত করেছে তার কোন স্পষ্ট হিসাব-নিকাশ এই রিপোর্টে পাওয়া দুষ্কর। তথ্য আর উপাত্তের গুণে এটা অবশ্য পরিষ্কার যে পানির খুব আক্রা। ভিশন রিপোর্ট হিসেবে আখ্যায়িত এই রিপোর্টে যেমন ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাবার সমস্যাটিকে সঠিকভাবেই চিহ্নিত করা হচ্ছে, কিন্তু বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে এই সংকটের সম্পর্ক সংগত কারণেই অনুলে­খ্য থেকে গিয়েছে, অনুলে­খ্য থেকে গিয়েছে সেচযন্ত্র উৎপাদকদের সাথে বিশ্বব্যাংকের সম্পর্কের প্রসঙ্গ। বাঁধের ক্ষেত্রেও একই নিরবতা। কিন্তু ব্যবসার বিস্তারের একটা সম্ভাবনা থেকেই রাষ্ট্রের ভূমিকার সমালোচনা করা হচ্ছে। এদের পর্যালোচনা বা সংকটের অনুসন্ধানের মধ্যে তাই নৈর্ব্যক্তিকতা নেই, আছে মুনাফার তাড়না।

ওয়াটার ভিশন এর এই রিপোর্টে করা প্রস্তাবসমূহ এবং সেগুলোর প্রদত্ত ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করলে সংকটকে আরো দির্ঘস্থায়ি করার মাধ্যমে পুঁজি বিনিয়োগের নতুন নতুন ক্ষেত্র উদ্ভাবনের ও একে যুক্তিসিদ্ধ করার বিপৎজনক প্রচেষ্টাই দৃষ্টিগোচর হবে।
প্রথমত, গত ৫০ বছরে নদি শাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন অর্থাৎ নির্মাণ সংক্রান্ত অংশটিই ছিল বিনিয়োগকারিদের আগ্রহের মূল অংশ। পানি সরবরাহ ও বিপণনের দায়িত্ব সাধারণত স্থানিয় সরকারগুলোই পালন করতো। ভিশন রিপোর্টের সুপারিশসমূহ এবং সা¤প্রতিক নড়াচড়া যা নিশ্চিত করছে তাহলো এই যে, পানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ কৃষি, শিল্প এবং গৃহস্থালি ব্যবহারসহ সকল ধরনের পানি সরবরাহ পর্যন্ত স¤প্রসারিত করা এবং এ জন্য প্রয়োজনিয় কাঠামোগত সংস্কার সাধন করা।
ভিশন রিপোর্টের এই সুপারিশ, কার্যত আদেশ বাস্তবায়নে সরকারগুলো কেমন সাড়া দিচ্ছে তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে গত ২০ জুলাই ভারতের কেন্দ্রিয় মন্ত্রিসভা পানি দূষণে আক্রান্ত রাজ্যগুলোর বিশুদ্ধ জলের জন্য আর অর্থ বরাদ্দ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উলে­খ্য ভারতের অন্তত ১৪টি রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে নানাভাবে পানিয় জল বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। এর মাঝে পশ্চিমবঙ্গেই ৩০ লক্ষ মানুষ আর্সেনিক বিষক্রিয়ার শিকার। ফ্লোরাইড বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, বিহার, জম্মু-কাশ্মির, দিলি­ প্রভৃতি রাজ্য, ইনওয়ার্ম পোকার কারণে জল দূষণের সমস্যা আছে অরুণাচল, কর্নাটক, মধ্যপ্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যে (দৈনিক গণশক্তি, ২১ জুলাই, ২০০০)। পানিয় জলের জন্য প্রয়োজনিয় বিনিয়োগ এখন কারা করবে তা স্পষ্ট।

কৃষিব্যবসায় ও পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে ভারত ও মেক্সিকোতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের দিকে অগ্রসর মনসাণ্টো সরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সুবাদে ২০০৮ সালে ৪২০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক উৎপাদনের জন্যে কুখ্যাত এই প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে কৃষিখাতে বৃহত্তম বহুজাতিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পুনরুৎপাদন ক্ষমতাহীন বিজ প্রচলনের মাধ্যমে কৃষককে বিজের অধিকারচ্যুত করাকে কৌশল হিসেবে গ্রহণ করা মনসাণ্টো পানির ওপর একচেটিয়া দখল কায়েমের মাধ্যমে পুরো খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের স্পষ্ট বাসনা প্রকাশ করেছে তার এ সংক্রান্ত স্ট্রাটেজি পেপারে (বন্দনা শিবা: মনসাণ্টো’স এক্সপান্ডিং মনোপলিজ ফ্রম সিড টু ওয়াটার, থার্ড ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক)।

দ্বিতীয়ত, ভিশন রিপোর্টের স্থানিয় জনসাধারণের অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সংক্রান্ত অংশটি তাৎপর্যপূর্ণ। এই যৌথ অংশিদারিত্ব গড়ে উঠবে কিভাবে? কারা স্থানিয় জনসাধারণের প্রতিনিধিত্ব করবেন? না, জনগণের কোন নির্বাচিত সংস্থা নয়, এই অংশিদারিত্বের দায়িত্ব পালন করার অর্থে বরাবরই এনজিওদের বোঝান হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদি বিশ্বব্যবস্থায় রাষ্ট্রিয় সংস্থার ভূমিকা যেমন হ্রাস পাচ্ছে এবং সংকুচিত হয়ে ধিরে ধিরে শাসন ও ব্যবস্থাপনায় এসে ঠেকেছে, বহুক্ষেত্রেই আরও কার্যকরভাবে সেই ভূমিকা পালন করবার জন্য বিকশিত হয়েছে বেসরকারি সাহায্য সংস্থা-যাদের ওপর দাতাদের তদারকি অনেক বেশি প্রত্যক্ষ, সরাসরি ও বাধামুক্ত। বিএডিসি ধরনের সংস্থাগুলো যেমন বাংলাদেশে সেচ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে বেসরকারি সাহায্য সংস্থার নিয়ন্ত্রণে দিয়ে দিয়েছে, একই ধরনের ঘটনা বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে ভূগোলময় ঘটেছে কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচির নামে। সাম্রাজ্যবাদি বিশ্বব্যবস্থার অংশিদার হিসেবেই গ্রাম পর্যন্ত এরা কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে। নতুন শতাব্দির পানি ব্যবস্থাপনায়ও এই জো হুজুর অংশিদাররা যে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, তাতে আর সন্দেহ কি? ওপরে ভারতে মনসাণ্টোর পানি ব্যবসার যে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে, এনজিও-রা সেখানেও সরবরাহ ও বিতরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তৃতীয়ত, পরিবেশ, জৈব বৈচিত্র প্রভৃতি বিষয়ে উদ্বিগ্ন ওয়াটার ভিশন এদের রক্ষা করার লক্ষ্য ঘোষণা করে বিপরিতক্রমে এতোদিন ধরে প্রকৃতি ধ্বংসকারি বহুজাতিকদের হাতে এদের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়ার কর্মসূচি বাস্তবায়নের সুপারিশ করছে। এমনকি এ প্রসঙ্গে পরস্পরবিরোধি মূল্যায়ন ভিশন রিপোর্টেই পাওয়া যাবে। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ভূগর্ভস্থ জলাধার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওগালানা ব্যক্তি মালিকানায় সেচযন্ত্রের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ফলে আজ বিপর্যস্ত ও স্থানিয় বাস্তুসংস্থান আঘাতপ্রাপ্ত এ উদাহরণ রিপোর্টেই রয়েছে। কিন্তু ওয়াটার ভিশন বেসরকারি মালিকানাতেই প্রাকৃতিক সম্পদগুলোকে ছেড়ে দেয়াটাকে বরং পরিবেশ রক্ষার কার্যকর উপায় হিসেবে বর্ণনা করেছে। সামাজিক যৌথ সম্পদ সংরক্ষণের গুরুত্ব স্বিকার করে আওয়াজ দিলেও কর্মসূচিতে তার কোন প্রতিফলন নেই।

ভিশন রিপোর্ট পানি সংকট মোকাবেলায় ‘ফোটা প্রতি বাড়তি ফলন ও কর্মসংস্থান’ এর যে শ্লোগান হাজির করেছে এবং তার ব্যাখ্যা যা দিয়েছে তা থেকেও পরিবেশ নিয়ে তাদের মাথা-ব্যথা কতোখানি তা বোঝা যাবে। বাঁধ ও অন্যান্য অবকাঠামো লবণাক্ততা তৈরি করেছে, পানির দু®প্রাপ্যতা দেখা দিচ্ছে। সমাধান- জৈব প্রযুক্তি, সবচেয়ে কম সেচে সমান ফসল দেয় এমন শস্যবিজ কিংবা লোনা পানিতে জন্মাতে সক্ষম কলা আবাদ। আপাতদৃষ্টিতে নিরিহ মনে হলেও কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

ক. ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে যাওয়া পরিবেশে ফলনক্ষম ফসল উদ্ভাবন সম্ভব হলেও ঐ পরিবর্তিত পরিবেশ অন্যান্য উদ্ভিদ, পশু, পাখি, কিট-পতঙ্গের সমন্বয়ে গঠিত বাস্তুসংস্থান ‘যা মানুষের সেবা প্রদান করে’ তা যে ধ্বংস করে ফেলছে তার কোন প্রতিকার কিন্তু হচ্ছে না। কেননা ঐ এলাকার জৈববৈচিত্র তো পানির নির্দিষ্ট একটি ধরন (গুণাগুণ) কিংবা পরিমাণের ওপর নির্ভরশিল। বরং জৈব প্রযুক্তির ব্যবহার এক্ষেত্রে ঐ বাস্তুসংস্থানের ক্ষতি না পুষিয়ে তাকে স্থায়ি করারই
নামান্তর।

খ. জৈব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কেবলমাত্র নির্দিষ্ট ধরনের শস্য আবাদ কিংবা গবাদি পালন ফসল ও প্রাণি বৈচিত্র্যের পক্ষেই হুমকিস্বরূপ। তাছাড়া এর জন্য অতিরিক্ত সার ও কিটনাশক প্রয়োগ করতে হয় যা পরিবেশ দূষণকে ত্বরান্বিতই করে। প্রাণিদেহে এর কুপ্রভাবের কারণেও আপত্তির যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
গ. অনুকূল পানির প্রবাহ ও পরিবেশ ধ্বংসের ফলে কৃষকরা নির্দিষ্ট ধরনের উচ্চ প্রযুক্তির বিজের ওপর নির্ভরশিল হতে বাধ্য হবে যা মেধাস্বত্ব আইন অনুযায়ি কৃষকরা সরবরাহকারি বিজ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই ক্রয় করতে বাধ্য থাকবে। কৃষক যাতে স্বাধিনভাবে বিজ সংগ্রহ করতে না পারে তার ব্যবস্থাও জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে করা হচ্ছে। এভাবে কৃষক বিজের ওপর এবং জৈববৈচিত্রের ওপর অধিকার হারাবে, যে গ্রামিন কৃষকদের ভিশন রিপোর্ট ‘জৈববৈচিত্রের রক্ষক’ ভূষণে বিভূষিত করেছে!
ভিশন রিপোর্টে জৈবপ্রযুক্তির প্রসঙ্গটি এমনভাবে আলোচিত হয়েছে যেন এটা ব্যবহারে একমাত্র বাধা হচ্ছে ইউরোপিয় ভোক্তাদের জৈবপ্রযুক্তি প্রযুক্ত কৃষিপণ্য ব্যবহারে অনিহা। বাস্তুসংস্থান, জৈববৈচিত্র কিংবা কৃষকদের সমস্যাদির আলোচনার প্রশ্নটি এখানে একবারেই আসেনি। উপরন্তু একটি আন্তর্জাতিক দৈনিক ইণ্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন-এর মন্তব্য তুলে দেয়া হয়েছে যেখানে উন্নাসিক ইউরোপিয় কৃষকদের চেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর কৃষকরা যারা জৈবপ্রযুক্তির শস্য চাষ করতে মোটেই গররাজি নয় তারা কত সুবুদ্ধির পরিচয় দিচ্ছেন তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সারা বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষের কথা চিন্তা করেই যে জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহারে কোন আপত্তিকেই অগ্রাহ্য করা দরকার দৈনিকটির বক্তব্যসার এটুকুই। কিন্তু ভিশন রিপোর্টের আলোকে আগেই আমরা দেখেছি খাদ্য সংকটের কারণ খাদ্যাভাব নয়, প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি খাবারই উৎপন্ন হয়।
চতুর্থত, ভিশন রিপোর্টে পানি ব্যবহার বাবদ উচ্চমূল্য আদায়ের প্রস্তাবকে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে মানুষের সকল ধরনের পানি ব্যবহারের ওপর পূর্ণ মূল্য হাসিলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এর পেছনের যুক্তিগুলো হচ্ছে… অবকাঠামোর জন্য প্রয়োজনিয় বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে এবং কার্যক্রম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কর আদায় হবে, …ব্যবহারকারিদের প্রতি সরবরাহকারি দায়বদ্ধ হবে… বাস্তুসংস্থান থেকে পানি প্রত্যাহার ও দূষণ হ্রাস পাবে ও পানি অপচয়রোধকারি অভ্যাস ও প্রযুক্তি আবিষ্কার, গবেষণা ও উদ্ভাবন উৎসাহিত হবে… অবশ্য সব মানুষ তো আর উচ্চমূল্যে পানি ক্রয় করতে পারবে না, তাদের জন্য ভর্তূকি মূল্যে পানি সরবরাহ করা হবে। এ সুপারিশটি পর্যালোচনা করা যাক-
ক. এটা নিছক যুক্তির কারসাজি যখন বলা হয় অপচয় কমানোর জন্য মূল্য হাসিলের ব্যবস্থা থাকতে হবে, কেননা এখানে একজন ব্যক্তি মালিককে উসুলকারি হিসেবে দেখান হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে পানির উৎসের ওপর তার মালিকানা স্বিকার করে নেয়া হচ্ছে সাধারণের মালিকানার বদলে। প্রকৃতির ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা ব্যক্তিমালিকের মুনাফার মাধ্যমে কিভাবে সম্ভব? সেটা কেবলমাত্র সম্ভব সামাজিকভাবে ঐ সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রকৃতির কাছেই মূল্য হাসিলের বা প্রকৃতির কাছেই প্রকৃত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে।

খ. স্থানিয় জনগণের যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার কথা ভিশন রিপোর্ট বারবার উচ্চকণ্ঠে বলছে পানি সম্পদের ওপর বৃহৎ বহুজাতিকের নিয়ন্ত্রণ তার সরাসরি বিরোধি। সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা নিজেদের হাতে থাকলে স্বেচ্ছায় ও সচেতনভাবে বহুজাতিকের হাতে পানির নিয়ন্ত্রণ তুলে দেবার কোন কারণই নেই এবং দুনিয়ার সর্বত্র বলপ্রয়োগ, গোপনিয়তা এবং মিথ্যাচারের মাধ্যমেই জনগণের সম্পদের ওপর এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেয়া হয়।
রাজনৈতিক চাপ, প্রচার যন্ত্র, কমিশন এবং অন্য অনেক আইনি-বেআইনি পথে বহুজাতিকেরা তাদের ফায়দা হাসিল করে যা প্রাইভেট মনোপলিস্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ যেহেতু সুনির্দিষ্ট চুক্তির অধিনস্ত থাকে, যেমন পরিবেশ স্ট্যান্ডার্ড ও রেগুলেশন মেনে চলে এ বক্তব্যের সাথে খাপ খায় না। মাগুড়ছড়া বিপর্যয়ের মতো অসংখ্য বিপর্যয় বহুজাতিকেরা দেশে দেশে ঘটিয়েছে, শেল কর্তৃক নদি ও পরিবেশ দূষণের প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলন করে নাইজেরিয়ার কবি কেন সারো ওয়ে সারা দুনিয়ার মানুষের প্রতিবাদের মুখেও মিথ্যা মামলার ফাঁসিতে ঝুলেছেন। এশিয়া, আফ্রিকা আর দক্ষিণ আমেরিকায় তাদের সৃষ্ট দূষণের ফলে অজস্র মানুষের জীবিকা ধ্বংস হবার পরও এ ধরনের হাস্যকর কথা বহুজাতিকের সাথে ওয়াটার ভিশনের ঘনিষ্ঠতারই প্রতিফলন।

গ. কম আয়ের জনগোষ্ঠিকে ভর্তুকি মূল্যে পানি দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। এই ভতুর্কি রাষ্ট্র বহুজাতিককে দেবে। অর্থাৎ চূড়ান্তভাবে জনগণই নিজেদের সম্পদের জন্য বহুজাতিককে মূল্য পরিশোধ করবে। ভর্তুকির অর্থ অবশ্য সদয় দাতারা ক্ষেত্রবিশেষে ঋণ হিসেবে দেবেন।

ঘ. রিপোর্টের সুপারিশে একটা বিষয় পরিষ্কার যে অর্থবানের প্রচুর পানি খরচের অধিকার থাকবে, দরিদ্রতর পানি ব্যবহার করবে ন্যূনতম পরিমাণে। উৎপাদন ক্ষেত্রে এটা সম্পদের পুঞ্জিভবন বৃদ্ধি ও শ্রেণিবৈষম্য তিব্রতর করবে, যেমন গরিব চাষিরা চাষের খরচ বাড়িয়ে তার দুর্দশা বৃদ্ধি করবে।
ওয়াটার ভিশন রিপোর্টে পানি বিশোধন সমস্যার সহজ সমাধান দেয়া হয়েছে, বিশোধন বাবদ ভোক্তাদের দাম দিতে হবে। শিল্প কারখানার বর্জ্য দূষণ বন্ধের তেমন কোন কার্যকর পরিকল্পনা ভিশন রিপোর্টে নেই। রিপোর্টে প্রদর্শিত টেবিল ১.১ এর তথ্য অনুযায়ি ২০২৫ সাল নাগাদ শিল্পখাতে পানি প্রত্যাহার ৭৫০ ঘন কি.মি. থেকে ৯৫০ ঘন কি.মি., অর্থাৎ ২৭ ভাগ বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে, সাথে জানান হচ্ছে দরিদ্র দেশগুলোতে শিল্পে পানি ব্যবহার বিপুল পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও উত্তরের দেশগুলোতে ব্যবহার হ্রাসের মাধ্যমে অংশত ভারসাম্য হবে। রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ি ধনি দেশগুলোতে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে গত ৩০ বছরে ভূ-উপরিস্থ পানির উন্নতি হয়েছে বা অন্তত অপরিবর্তিত রয়েছে, অন্যদিকে দরিদ্র দেশগুলোতে অবস্থার অবনতি হয়েছে। এ থেকে এটা স্পষ্ট যে দূষণকারি শিল্প-কারখানা বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোতে আরও বেশি হারে প্রতিস্থাপিত হতে যাচ্ছে এবং ধনিদেশগুলোতে শিল্প বাবদ পানি দূষণ আরও বেশি হারে প্রতিস্থাপিত হতে যাচ্ছে এবং ধনিদেশগুলোতে শিল্প বাবদ পানি দূষণ আরও হ্রাস পাবে। পানি দূষণ বন্ধ করার কোন ব্যবস্থা না গড়ে তুলে বর্জ্য শোধন বাবদ ভোক্তাদের দাম দিতে বলার অর্থ দরিদ্র বিশ্বের জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া দূষণকেও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের ফন্দি। এটা থেকেও পরিবেশ প্রিতির চেয়ে পানি সংকটকে ব্যবসায়িকভাবে ব্যবহারের বাসনা পরিষ্কার।

পঞ্চমত, ওয়াটার ভিশন রাষ্ট্রকে অপদার্থ, অকর্মণ্য বলে গালিগালাজ করছে, কেননা রাষ্ট্র খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির দায়ে অভিযুক্ত। তারা পানি খাতে ভর্তুকি দেয়। গভীর নলকূপ চালনার জন্য বিদ্যুত ও অন্যান্য ভর্তুকি দেয়া হয় বলেই না ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আজ এই হারে নেমে গিয়েছে। অভিযোগ সর্বাংশে সত্যি, কিন্তু যা আড়াল করা হয়েছে তা হচ্ছে এই ভর্তুকির ব্যবস্থাপনায় বিশ্বব্যাংকের অংশগ্রহণ ছিল, সেচযন্ত্র উৎপাদকদের, ট্রাক্টর উৎপাদকের স্বার্থ ছিলো। এই ‘খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গিওয়ালা সরকারগুলো’র এবং এর থেকে লাভবানরা আজকে নতুন ব্যবসার খাতিরে পুরনো যন্ত্রটিকে অকর্মণ্য বলছে। আর তাদের নতুন ব্যবসার পরিকল্পনা পরিবেশ ও মানুষের জন্য আরও ভয়াবহ। দূষণের কারণে পরিবেশ পাল্টে গেলে বাস্তুসংস্থানের অন্যান্য উপাদানগুলোর অবস্থা মোটেই না ভেবে জৈব প্রযুক্তির শস্য ব্যবহারের সুপারিশের চেয়ে বেশি মারাত্মক খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির দৃষ্টান্ত আর কি হতে পারে?

ভিশন রিপোর্টে দেখানো স্বপ্ন বনাম বাস্তব পূর্বাভাষ
বলিভিয়ার টিটিকাকা হ্রদের পাড়ের বাসিন্দা আসানসিওন লাঙকোয়ে জনগোষ্ঠি প্রতি তিন বছর পর শহুরে ও শিল্প মালিক স¤প্রদায়সমূহের সাথে বৈঠক করে পরিষ্কার পানির নিশ্চয়তা আদায় করছে। এই স¤প্রদায়সমূহ একটি ঐচ্ছিক আচরণ বিধিপ্রণয়ন করেছে যা গত দশকে এদের লাগামহীন বর্জ্য নিক্ষেপ নাটকিয় রকম কমিয়ে দিয়েছে।-পানির সুষ্ঠু সরবরাহের জন্য বেসরকারি খাত, সুশিলসমাজ টিটিকাকা হ্রদ এলাকায় বিনিয়োগ করেছে; সংরক্ষণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমে যার মধ্যে রয়েছে ভূমিক্ষয় রোধ, বনভূমি ও জলাভূমি সংরক্ষণ। নারি, পুরুষ, যুবা, বয়স্ক, লোকদের ক্ষমতায়নের জন্য অনেক স্থানে প্রথাগত ও সৃজনশিল কায়দা ব্যবহার করা হচ্ছে। সব জনগোষ্ঠি ও সামাজিক শ্রেণির লোকেদের সম্পদের ওপর অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগের ক্ষেত্রে এখন রয়েছে অনেক বেশি সাম্য।

এই হচ্ছে ভিশন রিপোর্টের ভিশনে ২০২৫ সাল, অর্থাৎ ২৫ বছর পরেকার আজকের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি বলিভিয়ার চিত্র; শিল্প মালিক, বেসরকারি পানি সরবরাহকারি আর সুশিলসমাজের নেতৃত্বে ভবিষ্যৎ মানবসমাজের সাম্য আর শান্তির স্বর্গে পরিণত হবার কাহিনি। আলোচনার মাধ্যমে সেই কল্পরাজ্যে শিল্প মালিকরা কতটা পানি দূষণ করবে, সরবরাহকারি কিভাবে দায়বদ্ধ থাকবে জনগোষ্ঠির কাছে, সুশিল সমাজের তদারকি কেমন থাকবে, পরিবেশ উপযোগি জৈব প্রযুক্তি আবিষ্কার করে মনোপলি প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে জনস্বার্থ ও পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখবে, বিস্তারিত সব বর্ণনাই সেখানে আছে। ’৬০ দশকে কৃষি বিপ্লবের সময়েও সারমর্মের দিক থেকে একই রকম স্বপ্ন দেখান হয়েছিল। সবুজ বিপ্লবের অন্যতম প্রবক্তা ও রকফেলার ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা লেস্টার ব্রাউন যেমন ঘোষণা করেছিলেন যে, বহু প্রত্যাশিত যিশুর শাসনকাল এসে গিয়েছে, মানুষ আর না খেয়ে থাকবে না (সুসান জর্জ: হাউ দি আদার হাফ ডাইজ, অনাহার ও মৃত্যু নামে বইটি বাংলায় অনুদিত হয়েছে)। নতুন পানি ব্যবস্থাপনাতেও কি ঘটতে যাচ্ছে তার পূর্বাভাষ পাওয়া যেতে পারে নিচের সংবাদ সারাংশটুকুতে।
৬ এপ্রিল বলিভিয়ার কোচাবামবা শহরের নতুন পানি ব্যবস্থাপক ইণ্টারন্যাশনাল ওয়াটার লি. কর্তৃক পানির দাম ৩৫% বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভরতদের ওপর সামরিকবাহিনি কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও পরে গুলিবর্ষণ করলে ৬ জন নিহত ও ১৭৫ জন আহত হয়েছেন। আন্দোলনকারিদের কয়েকজনকে আলোচনার আমন্ত্রণ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি ভবনে গ্রেফতার করা হয়। ইণ্টারন্যাশনাল ওয়াটার লি. বৃটিশ বহুজাতিক হলেও বৃহত্তর একটি মার্কিন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বেচটেল কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। কোচাবামবা হত্যাকাণ্ডের পরপরই আরও বিক্ষোভের মুখে প্রেসিডেন্ট হুগো বানজার জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও কারফিউ জারি করেন এবং নাগরিক অধিকার রহিত করা হয়। সামরিক আইন জারির পর পরই বিশ্বব্যাংকের পরিচালক জেমস উলফেনসন সাংবাদিকদের কাছে তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন ‘আমি আনন্দের সাথে জানাচ্ছি বলিভিয়ার দাঙ্গা পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসছে।’ (অবজারভার (লন্ডন), ২৩ এপ্রিল, ২০০০) বলিভিয়ার ওই পানি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ইভো মোরালেস। পরবর্তিকালে তিনি দেশটির প্রথম আদিবাসি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বেচটেল নামের বহুজাতিক পানি-ব্যবসায়ি প্রতিষ্ঠানটি পাততাড়ি গোটাতে বাধ্য হয় বলিভিয়া থেকে।

পুঁজিবাদ যেমন তার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যের কারণেই পানির ওপর জনগোষ্ঠির চিরায়ত অধিকার হরণ করে তার পণ্য রূপ দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে সকল সম্পদের সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকেও সে নতুন প্রেক্ষিত প্রদান করেছে। বলিভিয়ার লড়াই তাই নিশ্চিতভাবেই শেষ হয়ে যায়নি, শত্র“র চেহারাই শুধু স্পষ্টতর হয়েছে।

শেয়ার করুন: