004637
Total Users : 4637
Charbak magazine logo
sorolrekha logo

লেখক তালিকা

জন্ম. ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে। সম্পাদনা করছেন ‘চারবাক’ ও ‘সরলরেখা’। যুক্ত আছেন সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা ‘শুক্কুরবারের আড্ডা’র সাথে। লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহ ও প্রদর্শন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: মায়াহরিণ, কাব্যগ্রন্থ ২০০৮, চারবাক, বুদ্ধিজীবীর দায়ভার, সম্পাদনা ২০০৯, সংবেদ, পক্ষ—প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু—মিত্র, প্রবন্ধ ২০১০, চারবাক, নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা ২০১১, চারবাক, নাচঘর, কবিতা, ২০১২, চারবাক, ভাষা সাম্প্রদায়িকতা অথবা সাম্রাজ্যবাদি খপ্পর, প্রবন্ধ, ২০১৩, চারবাক এবং মুখোশ, কবিতা, ২০১৬, চারবাক, করোনাকালে, কবিতা, ২০২২, চারবাক।
View Posts →
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
View Posts →
প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ
View Posts →
বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার পথিকৃৎ ফয়েজ আলম একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক। উপনিবেশি শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশি আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। রুহানিয়াত সমৃদ্ধ দার্শনিক ভাবচর্চা আর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক তত্ত্বচর্চাকে একসাথে কবিতার দেহে ধারণ করতে সক্ষম ফয়েজ আলমের সহজিয়া কবিতা। তার কবিতায় তিনি মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষার প্রতি উন্মুক্ত। যে ভাষাকে আমরা ব্রাত্য বানিয়ে রেখেছি একেই তিনি জায়গা করে দিয়েছেন কবিতায়। তাই প্রচলিত কাব্যভাষা থেকে তার কবিতার ভাষা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি এ ভাষাকেই বলেছেন মান কথ্যবাংলা, আঞ্চলিকতার বাইরে সর্বাঞ্চলীয় বাঙালির প্রতিদিনের মুখের ভাষা। কবিতাগুলো কখনো কখনো বিভিন্ন ধ্বনি ও শব্দে বেশি বা কম জোর দিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে পারে, যেভাবে আমরা হয়তো আড্ডার সময় কথা বলি। এবং তা একই সাথে বক্তব্যের অতিরিক্ত ভাষারও অভিজ্ঞতা। খোদ ‘আওয়াজের সাথে ইশক’ যেন। প্রাণের আকুতি ও চঞ্চলতার সাথে তাই শূন্যতাও হাজির আছে। সেই সাথে জারি আছে ‘শব্দের দিলের ভিতরে আরো শব্দের আশা’। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা মরহুম শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাশ করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল. ডিগ্রী লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি ( গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশি মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২)।
View Posts →
কবি ও গল্পকার। যুক্ত আছেন চারবাক সম্পাদনা পরিবারের সাথে।
View Posts →
কবি। জন্ম মৌলভীবাজার জেলায়।
View Posts →
প্রাবন্ধিক। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। বর্তমানে প্রান্তীয় কৃষক-মধুচাষি, বেতবাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন নিয়ে কাজ করছেন।
View Posts →

সম্পূর্ণ লেখক তালিকা

সেলিম মোরশেদ-এর কথাবিশ্ব : সরল চোখে তাকানোর প্রস্তাব

‘সময়’ গত তিন-টি দশক ধরে কিভাবে একজন লেখকের মনন তৈরি করেছে; লেখক কিংবা পাঠক, এক এবং অভিন্ন এই সত্তা, কিভাবেই-বা স্থানিক উপাদানসহ যাপিত সময়কে নিয়ত সৃষ্টি করে চলেছেন-তা হয়তো আমাদের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব যখন একজন লেখকের বহুবিচিত্র লেখনির সংগৃহিত রূপটাই গ্রন্থভুক্ত হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে, কথাকার সেলিম মোরশেদ-এর রচনাসংগ্রহ এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করে যে, তাঁর তাবৎ কথাবস্তুসহ কবিতা কিংবা চিত্রকর্ম আসলে পাঠকের কাছে একজন সৃজনশিল লেখকের বৈচিত্র্যময় জগতেরই উন্মোচন। যেখানে পাঠক লক্ষ করে লেখকের কালানুক্রমিক রচনাসমূহ : কাটা সাপের মুণ্ডু-প্রথম গল্পগ্রন্থ, সাপলুডু খেলা-নভেলেট, পাল্টা কথার সূত্রমুখ অথবা বুনো শুয়োরের গোঁ-ছোটোকাগজ ও প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা বিষয়ক গ্রন্থ, নির্বাচিত গল্প-নতুন-পুরাতন মিলিয়ে গল্প-সংকলন, রাতে অপরাজিতা গাছে ফুল-গল্পগ্রন্থ এবং বাঘের ঘরে ঘোগ-সর্বশেষ প্রকাশিত গল্প-সংকলন।… তো, সামগ্রিকভাবে এই হল সেলিম মোরশেদ, তাঁর রচনাসংগ্রহ এখন পাঠক সমিপবর্তি…

সরাসরি প্রসঙ্গে চলে আসা যাক : দীর্ঘ কালখণ্ডে সেলিম মোরশেদের যে গল্পটি পাঠকদের প্রাণিত করবে সেটি ‘কাটা সাপের মুণ্ডু’। এই গল্পের সাথে সেলিম মোরশেদের নাম অনিবার্যতায় চলে আসে। হয়তো কোনো কোনো পাঠকের প্রত্যাশা তৈরি হয় যে, এহেন নিম্নবর্গিয় অন্যান্য চরিত্র-সখিচান, সুশীল দা, কর্তাভজা স¤প্রদায়ের ব্রাত্য মানুষজন ‘কাটা সাপের মুণ্ডু’র হেমাঙ্গিনী চরিত্রের মতো শৈল্পিক উপলব্ধিত যা আসলে ‘উত্তরণ’-আমরা আবার তা প্রত্যক্ষ করবো। তবে, শিল্পের বক্রতলে লেখক সেলিম মোরশেদ সেই সম্ভাবনাকে যথার্থ-ই নস্যাৎ করে দিয়ে আলাদা আলাদা গল্প তৈরি করেন-কি ভাষায় কি চরিত্র চিত্রণে তাঁর গল্পবিশ্ব পাঠান্তে এই ধারণা পুনঃপ্রতিষ্ঠা পায় যে : গল্প তো অনেক রকম। উপলব্ধিও বহুমাত্রিক। সমশ্রেণি হওয়া সত্তে¡ও সখিচান কিংবা সুশীল দা অথবা বিজয় মোহন-সদানন্দ, হেমাঙ্গিনীর মতো উচ্চণ্ড নয়, হবে না। তাবৎ পরিস্থিতি ‘কান্নাঘর’ গল্পের নিত্যানন্দকে ব্যতিক্রমি উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ‘কাটা সাপের মুণ্ডু’ গল্পে হেমাঙ্গিনীর বুদ্ধিবৃত্তিক অন্তর্ভাবনা নেই, নেই স্বগত চিন্তা, শুধু ক্ষুধা ও আতংকে স্বতশ্চল তৎপরতায় হেমাঙ্গিনীর অবিশ্বাস্য সর্প ভক্ষণের দৃশ্য-এইখানে লেখক স্বয়ং, তাঁর ভাষায় “আর অদ্ভুত হেমাঙ্গিনীকে আমি এখন সাহস যোগাই।”-প্ররোচনা দেন। কেবল কয়েকটি গল্পে অন্ত্যজ আর সব চরিত্রে লেখক সাহস যোগান না বটে, তবে নিজস্ব স্বর-সুরসহ বিশ্লেষণি ভাষা তাদের মুখে কখনো-বা এমনধারায় আরোপন করেন যে, লেখকের প্রকট উপস্থিতি-ই পাঠকের কাছে আপাত প্রতিয়মান হয়। ‘আপাত’ এই জন্য যে, শ্রমনিষ্ঠ পাঠক, সে-তো লেখকের অর্ধ-সত্তা, নিশ্চয়ই জানেন, সমাজ আর ভাষা যদি হয় পরস্পরের পরিপূরক সেক্ষেত্রে সামাজিক পরিবর্তনের ফলে ব্রাত্যজনের ডিসকোর্সে ভিন্ন ভিন্ন পেশার শব্দ মায় দার্শনিক ভাবনা পর্যন্ত ঢুকে পড়তে পারে।

উদ্ধৃতি প্রাসঙ্গিক : ঠোঁটে বাঁশি নিয়ে সখিচান ভাবলো : আসল আবহটা… আকাক্সক্ষাটা আসন্ন হলেও গৌরচন্দ্রিকা আরও আছে। নামযজ্ঞের আগে অনেক অধিবাস প্রস্ফুটিত তথাপিও শ্রীকৃষ্ণের অন্তরাত্মা তার আত্মায় বারবার ধাক্কা দিতে লাগলো। সে রাজাও না-জল­াদও না-ঝাড়ূদারও না। প্রেমিক সে। আর তার পৌরুষ একজন বংশানুক্রমী পেশাজীবী মানুষ হিসেবে সম্মানিত হতে চায়।-‘সখিচান’

লোকধর্মে অশ্রিত ব্রাত্যজনের ভ‚য়োদর্শি জ্ঞান লক্ষণিয় : ইন্দ্রিয় পরিপাটি করে আনাই তো শূন্যতা, তখন দেখো, নৌকায় হীরা আর হীরা, সোনা রাখার জায়গা কই? যেমন সরল তেমনই গুহ্য একথা। সবাই স্তব্ধ হয়ে শুনছিলো।-‘কান্নাঘর’
অথবা : এক বৃদ্ধ কাঁদতে কাঁদতে প্রশ্ন করেছিলেন, জগতে সবচেয়ে কঠিন কাজ কী? দুনিয়ার সবচেয়ে মূল্যবান কী? আর এই মূল্যবান বিষয়টির গন্তব্য কী?

চারপাশে অসামান্য এক নিস্তব্ধতার পরিবেশ বিরাজ করছিলো। যশোদা মিনিট দশেক সময় নিলেন। নাকে এবং চিবুকে সামান্য ঘাম এসে জড়ো হলো। ‘জগতের সবচেয়ে কঠিন কাজ আত্মপ্রেম থেকে বের হওয়া। দুনিয়ার সবচেয়ে মূল্যবান হলো প্রেম আর এর গন্তব্য আত্মতৃপ্তি।’-‘কান্নাঘর’

এই চরিত্রগুলো ‘লাবণ্য যেভাবে এগিয়ে’ গল্পের শিক্ষিত গ্রাজুয়েট লাবণ্য কিংবা অমিত নয়, ‘সাপলুডু খেলা’ নভেলেটের স্ববিরোধি সলোমান-যে শেষ পর্যন্ত লক্ষহীন-তেমনও নয়, নয় ‘বাঘের ঘরে ঘোগ’ গ্রন্থভুক্ত আমজাদ হোসেন, টুটুল, হোসেন ডাক্তার, রুমির মতো লেখাপড়া করা বাম-ধারার রাজনৈতিক কর্মি, অথবা ‘চিতার অবশিষ্টাংশ’ গল্পে শ্মশানচারি জীবনের হলাহলের ভেতর নিজেকে সংশ্লিষ্ট রাখতে তৎপর সাজাদের মতো তো নয়-ই, এসব চরিত্র ‘পরম্পরা’র টুম্পা, ‘শিলা, অনন্তে’র প্রকৃতি-সংবেদি শিলা অথবা সর্বশেষে মুদ্রিত গল্প ‘কাজলরেখা’র মূল চরিত্রের মতোও নয়। এই অমিল, এজন্য যে, বরাবর সমাজকাঠামোর বাইরে থেকে যাওয়া এসব জীবনচরিত আসলে অন্ত্যজ। সমাজতাত্তি¡কদের বিশ্লেষণে নিম্নবর্গিয়-সাব-অলটার্ন এসব চরিত্র থেকে যায় কেবল তাদের পরিচয়ের সীমাবদ্ধ ভূমিতে। তথাপি, পাঠক দেখতে পারে, নিম্নবর্গিয় সাব-অলটার্ন চরিত্রসমূহ কিভাবে ভারসাম্যপূর্ণভাবে যৌক্তিক-আর যুক্তির বাইরে যে বোধি তা-ও অনুভব করা যায়। প্রকারান্তরে লেখক এসব চরিত্রের কতোটা নিকট কতোটা সুদূর-পাঠঅন্তে তা অবান্তর। সেলিম মোরশেদ তাঁর সকল চরিত্রের জীবনপ্রবাহ, সংলাপ, স্বগত চিন্তা আকাক্সক্ষা আসক্তি-যোগ্যতাসহ যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন তাতে আখ্যানবিশ্বে তাঁর অংশগ্রহণ কথাবস্তুর সরল চলমানতাকে কখনো কখনো ধ্বংস করে। এবং হয়তো স্বেচ্ছানির্মিত এই দুরূহতা মহান জেমস জয়েস বা মার্শেল প্র“স্ত অথবা কমলকুমার মজুমদারের মতো সেলিমের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকেই প্রচিহ্নিত করে। পাশাপাশি, ‘কান্নাঘর’ গল্পে লেখকের সূত্রধর ভূমিকা-‘তথাকথিত শিক্ষার বাইরে থেকে এরা এতো মৌলিক এতো শুদ্ধ-স্বশিক্ষিত যে আমন্ত্রিত অনেকেই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন’-যদি পাঠকের সংলক্ষ্যে আসে তো লেখকের অস্তিত্ব মেনে নিয়ে পাঠক এইখানে নিরস্ত হবেন বলে মনে হয়। সেলিম মোরশেদ উত্তমপুরুষে গল্প বয়ান না করেও পূর্বোলি­খিত ‘কাটা সাপের মুণ্ডু’ গল্পে ‘আমি’র হঠাৎ উপস্থিতি অনুপ্রবেশকারির (ওহঃৎঁফবৎ) মতো মনে হয় না। বরং এক্ষণে মনে পড়লো ‘আমি, মীরা ও সুশীল দা’ শিরোনামের গল্প-যেখানে প্রধান চরিত্র হলো নির্বাণ; আর ‘আমি’ বর্ণনার এক পর্যায়ে সেই ‘আমি’-কিন্তু চলে আসে : নির্বাণকে নিয়ে মীরার মনের স্বচ্ছতা কেমন ছিলো-এ-কেউ জানতে পারতো না, অবশ্য আমি জানতাম। আমি নির্বাণকে চিনি, যতোটুকু ও নিজেকে চেনে, তার চেয়ে বেশি।

অর্থাৎ নির্বাণও লেখকের ‘আমি’-মনে হয় না যে, আমিত্বের এই ভার পাঠকের মনের ওপর অনাবশ্যক চাপ সৃষ্টি করছে। ঈশ্বরপ্রতিম স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ যদি ওঠে তুলনারহিত না-থেকে অন্তত এটুকু বলা যায়, সাহিত্যে এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয়। অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, আধুনিক থিয়েটারের পরিচালক রঙ্গমঞ্চে দৃশ্যান্তরে আবিভর্‚ত হন অথবা চলচ্চিত্র পরিচালক যেমন, ক্রিসলফ কিয়েসোলস্কি সেলুলয়েডে তার ছবির পাত্র-পাত্রির সঙ্গে এসে উপস্থিত হন, দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি কমিউনিকেট করার জন্য। আর অমিয়ভূষণ মজুমদার, তাঁর অনেক রচনায় পাঠকদের উদ্দেশে বলেন, ‘দ্যাখো’, ‘বলো’ ইত্যাদি আহŸানসূচক শব্দ; এমনি এমনি তো নয়, পাঠকের সক্রিয় অংশগ্রহণের নিমিত্তেই লেখকের এই আহŸান। যা নিশ্চয়ই ভাষাসচেতন কথাশিল্পি সেলিম মোরশেদেরও আরাধ্য; কি? ঐ পাঠক-যে নমস্য-যে মনস্ক।

দুই
ক্ষুৎকাতর হেমাঙ্গিনী, যৌনকাতর বেড়ালের মতো লাবণ্য, আর নিত্যানন্দ, সখিচান, অমিত ও রাহুল, শ্মশানবাসি সাঈদা, দিলীপকুমার সেন, লিলিরানী কিংবা অতসী, পুষ্পরেণু এবং শ্মশানচারি সাজাদ (লেখকের ভাষায়, শ্মশানের সৌন্দর্য অন্বেষণকারি), সুব্রত সেনগুপ্ত, আবু হোসেন, দুলারী আর রামপিয়ারী, শিলা ও মোশতাক… এরা সব প্রেমিক, দ্বা›িদ্বকতাময় সব আখ্যান-নানা জীবনপ্রবাহে লেখক এদেরকে বর্ণনা করলেও দেখি, অনেক চরিত্রের মনোলোক থেকে উঁকি দিচ্ছে প্রবল যৌনতাড়না। ইয়ুংয়ের লিবিডোয় এরা সব অতি সামান্যই নিয়ন্ত্রিত। ফলে, যৌন প্রেরণার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা এদের পক্ষে সম্ভব হয় না। লেখকের অনেক চিন্তার ভারবাহি এসব চরিত্রের সঙ্গে মিশে থাকে রাজনৈতিক মতাদর্শ-যা শেষতক ক্ষয় এবং ধ্বংস ডেকে নিয়ে আসে (‘বাঘের ঘরে ঘোগ’); আর আছে অধ্যাত্মবোধ ও দার্শনিক উপলব্ধি (‘সাপলুডু খেলা’, ‘কান্নাঘর’-কান্নাঘরে বিজয়মোহনের শূন্যবাদের ধারণা সম্বন্ধে পাঠক অবগত হয়।)-যা একান্তভাবেই সেলিম মোরশেদের নিজস্ব একটা প্রবণতা। নিজস্ব এই রসায়নের প্রকাশ ঘটে লেখকের ইচ্ছাভ্রমণের নির্মিতিতে, যখন তিনি অতীত ও বর্তমান এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎতের মধ্যে পরিভ্রমণ করেন। এ-ও একজন লেখকের বিশেষত্ব। বস্তুতপক্ষে তাঁর রচনা পাঠে নজরে আসে গদ্যশৈলির নিবিষ্ট নির্মাণ; তাতে লোকভাবনার বিচিত্র প্রয়োগ ও ভূয়োদর্শিতা মিলেমিশে এক গোলাপি কোমল অনিন্দ্য চেতনার সৃষ্টি করে। ফলে, এই অনুভবের মুখোমুখি হয়ে পাঠকের মনে হয়তো মহান কথাশিল্পিদের নাম ভেসে ওঠে। এই কথা লেখার পর মনে হলো, এর মধ্যে কোনো ক‚টাভাস নেই তো? একজন লেখক তো অনেক লেখকেরও প্রতিবিম্ব। কখনো-কখনো তাঁর স্বরে প্রতিভাধর লেখকের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতে পারে। যদিও সকল শ্রেণির পাঠক একই মাত্রাতলে লেখক-কৃতিকে দেখবেন তা আশা করা যায় না। এবং যদিও একজন পরিশ্রমি লেখককে অমুক বিখ্যাত লেখক অথবা তমুক মেধাবি সাহিত্যিক দ্বারা প্রভাবিত বলার রেওয়াজ থাকলেও এভাবে হয়তো ভাবা যায় যে, আলোচ্য লেখকের এতাবৎ অর্জন বিখ্যাতদের শিল্পকীর্তির প্রতিসাম্য হতে পারে। অতিশয়োক্তি নয়, তুলনামূলক আলোচনায় বিষয়টিকে এভাবেও দেখা যায় কি-না তার প্রস্তাব। পাঠক, সেলিম মোরশেদ ভাষাশিল্প নির্মাণ করেন-নির্মিত এবং সেখানে শব্দের পর শব্দচিত্র স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে যতোটা নয় তার চেয়ে বেশি থাকে লেখকের অতিসচেতন প্রয়াস। ফলে, এই অতিসচেতনতা তাঁর গদ্যের গতিধারায় এক প্রকার জাড্যতা নিয়ে আসে বলে মনে হয়। তথাপি, আলো-অন্ধকার, ছায়া-প্রচ্ছায়া, সহজবোধ্যতা আর দুরূহতা এই সবগুলো অবস্থার প্রয়োগে কারিগরের দক্ষতায় সেলিম মোরশেদের গদ্যভাষা কতোটা শিল্প-সৌন্দর্যে পরিণত হয়েছে দেখে নেয়া যাক :

নিত্যানন্দ বলে, ‘আমি ক্ষুদ্র, এই প্রচণ্ড-গম্ভীর-গভীর দূর উথাল-পাথাল সমুদ্রে-যার গ্রীবা পাহাড়ের মতো উন্নত অথচ চলমান আর বড়ো বড়ো অজগরের মতো কুণ্ডলী পাকানো স্রোতের পাকের অবিরত গুমগুম গর্জনে আমি সন্ত্রস্ত।-তবু হে সমুদ্র আমার অভিলাষ-এই ভক্তের বাসনা পূর্ণ করো।’ অশেষ পরিশ্রমের পর সে একটা কিনারা দেখে। বিস্তৃত বেলাভূমি ধু ধু বালি। আশ্চর্য, সেখানে একটা ডুমুর গাছ নিত্যানন্দ লক্ষ করে। এই বেলাভূমিতে?
কাছে যেতেই গাছ বলে ওঠে, ‘জন্ম নিয়েছি তারাবৃক্ষ হয়ে।’
নিত্যানন্দ তৎক্ষণাৎ বলে, ‘আমি ওর দ্যুতির তীব্রতা।’
নিত্যানন্দ দেখে-ডুমুর গাছে কতো ফুল!
যাহ্, ডুমুরের কখনও ফুল হয়!
যা হয় না তাই তো দেখতে হয়। নিত্যানন্দ দেখে।-‘কান্নাঘর’

আউল চাঁদের ভক্ত-অনুসারিদের লোকায়ত দর্শন, ভক্তিরসের অন্বেষণ আর মানবিয় ক্রন্দন এভাবেই শব্দের পর শব্দ, শব্দচিত্রে বর্ণিত হয়। শব্দচিত্রগুলো দিয়ে লেখক তার অন্বিষ্ট মায়াজগত(?) তৈরি করেন। সেই জগতে অবিরল ধারায় সৌন্দর্যচেতনার সঞ্চার হয়। মৃত্যুর পাশে জীবনের এমন মহিমান্বিত সৌন্দর্য : চোখের সামনে শ্মাশানের মানুষের শেষ দৃশ্য যেন কালিদাসীকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করে না। তবু এই চৈত্রে, খরতাপে, রাতে, চিন্তায়, কালিদাসী অনুভব করে, বায়ুহীন, নিষ্কম্প, শান্ত নিশীথিনীর সে যেন আজ একমাত্র অবয়ব। বিরাট এক কায়া, ঘন নিবিড় কালো চুলের মতো এই ধরা-এই সরা একাকার করে সূচিবিদ্ধ অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে, জানিয়ে দেয় : কালিদাসী তোমার রূপ, তোমার যৌবন আর আলোকিত করে না সত্য; তবে তুমি মুক্ত, শুভ্র, নির্মল-শাদা রাজহাঁসের মতোই পঙ্কিলতা তোমাকে স্পর্শ করে না। তুমি শরতের আকাশের মতো ধবল, কাশফুলের মতোই শুক্ল, শ্বেতপায়রার ডানার মুক্ত আহŸানে তোমার উড়ে যাওয়ার সময় আসন্ন।-‘চিতার অবশিষ্টাংশ’
আর মৃত্যুকে দলিত করার মানসে জীবনের পাশে একটা জীবন হয়ে বেঁচে থাকতে বয়োবৃদ্ধ কালিদাসীর প্রার্থনায় জীবনচেতনা এরকম সৌন্দর্যবোধের জন্ম দ্যায়। আর পাখির প্রতিকে জীবনাকাক্সিক্ষ ডোম সখিচান ভাবে, মৃত্যুদূত হয়েও সে মৃত্যু বুঝলো না। সেলিম মোরশেদ সখিচানের মৃত্যুভাবনা তার গল্পভাষায় বর্ণনা করেন এভাবে: মৃত্যু রাতের মতোই নিস্তব্ধ আর মৃত্যুভাবনাটা মদের মতো ঝাঁঝালো। নরসুন্দর সুশীল কুমার শীলের মৃত্যু-পরবর্তি দৃশ্য লেখকের বর্ণনায় চিত্রধর্মিতা পায় : … ধুলোর স্তরের ভেতর থেকে সুশীলদার লাশ যখন তোলা হয়, চৌকির ওই জায়গাটুকুতেই শুধু নির্জন-শুভ্র, সুশীলদার নিভৃত ছায়া। লেখকের অন্তর্গত অনুভবে এই সৌন্দর্যচেতনা ফ্রয়েডিয় লিবিডো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে কখনো কখনো মিশিমা উকিও’র মতো তীক্ষè যৌনবিলাসি সৌন্দর্যেও রূপ পরিগ্রহ করে। পরন্তু, লেখকের নিরপেক্ষ বর্ণনায় সৃষ্ট চরিত্রের কথকতায় লোকাচার, বিশ্বাস, গুপ্তজ্ঞান-যা আসলে লোকভাবনার প্রায়োগিক দিক-সেলিমের রচনার শিল্প-সৌকর্য বাড়িয়েছে নিঃসন্দেহে। ‘কান্নাঘর’-এ দেখা যায় প্রতিকধর্মি ভাবকল্প : একবার একটা লোকের ঘুম পেয়েছিলো তাই সে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। ঘুমের ভেতর লোকটার আত্মার পানি-পিপাসা লাগে, আত্মা এ ঘর-ও ঘর সব ঘর খোঁজে।… আত্মার পিপাসা আত্মাকে অমর করে।-‘কান্নাঘর’

লোকজীবনের সংস্কার ও বিশ্বাসের বাস্তবধর্মি ভাবকল্প সেলিমের ভাষার
অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য বাড়িয়েছে :
সুদর্শন, সুঠাম যুবক দিলীপকুমার সেন একদিন গোসল করছিলো হরিনাকুণ্ডুর কুমার নদীতে। সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পড়ে মুহূর্তে দিলীপের তলপেট থেকে দুই পা পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে যায়। ক্যানো? রঙ্গমঞ্চের অভিনেতার মতো শ্মশানবাসি দিলীপের ওপর আলো পড়লে তার জবানিতে জানা যায় : নারীর সঙ্গে সম্পর্ক না করলেও কুমার জীবনে তাদের মানসিক কষ্ট দিলে অভিশাপ লাগে।-‘চিতার অবশিষ্টাংশ’

অথবা : লাবণ্য বিছানায় এপাশে ওপাশে করে। মা জানে লাবণ্য ফিরোজা আর সবুজের মধ্যবর্তী রঙের সেলোয়ার-কামিজ পরলে বৃষ্টি হয়, হবে। লাবণ্য ভাবে, আশ্চর্য। বারবার বিষয়টা কাকতালীয় হবে-না-না কোথায় যেন কী একটা হচ্ছে।-‘লাবণ্য যেভাবে এগিয়ে’

‘কাটা সাপের মুণ্ডু’ গল্পে নুলো ভিখারি হেমাঙ্গিনীর জন্ম-পঙ্গুত্বের নেপথ্যে যে কারণ হিসেবে হেমাঙ্গিনীর মা’র দুঃখিত বিশ্বাসের বর্ণনা দেন লেখক এরকম নিস্পৃহ ভঙ্গিমায় : হেমাঙ্গিনী পেটে থাকতে তার মা বটি দিয়ে ঢ্যাঁড়স টুকরো করে আগুনে সেদ্ধ করে খেয়েছিলো, তাই ৫টা আঙুল সে সময় পেটের ভেতর গলে গেলো।… এভাবে আরো অনেক, সুপারি ফল এতো কঠিন কেন? প্রশ্নোত্তর ‘শিলা, অনন্তে’ শীর্ষক দীর্ঘ গল্পে পাঠক শিলার বয়ানে জানতে পারে লোকশ্র“ত ব্যাখ্যা, অন্যের অনিষ্টাকাক্সক্ষায় আছে কুফরি কালামের ব্যবহার, লাশকাটা ঘরে সখিচানকে পিতা ভাচু ডোমের শিখিয়ে দেয়া তন্ত্রমন্ত্র, রামপ্রসাদ আর অনুক‚ল ঠাকুরের মরমি গান, আছে শ্লোক, টুকরো টুকরো ভেদ জ্ঞান। বিজ্ঞাপন-চিহ্নিত হবার আশংকা আছে বিধায় এ বিষয়ে ইতি টেনে প্রসঙ্গান্তরে যাওয়াটাই এখন শ্রেয় : সেলিম মোরশেদের গল্পকৃতিতে অন্যধারার সংযোজন—‘অম্লানদের গল্প’ এবং ‘দি পার্ভার্টেড ম্যান’। ‘অম্লানদের গল্প’ আখ্যানে মধ্যবিত্তের আকাল-জীবনের অবনমন লেখক দেখিয়েছেন শ্লেষ আর প্রচ্ছন্ন কৌতুকে। গল্পের শুরুটাই যেন ‘গোপালের’ ন্যায় শিষ্টজনের কর্ণকুহরে তীব্র বিষ ঢেলে দ্যায় :
দাদন, মদন, চোদন-তিনজন।

দাদন সুদের ব্যবসা করে। যারা টাকা দিতে অক্ষম-দাদন তাদের ক্ষেত থেকে কাঁচামাল নিয়ে নেয়। মদন তা দিয়ে মোদক বানায়। চোদন তা কেনা-বেচা করে চোদে।

‘গোপাল অতি সুবোধ…’ বহু পরিচিত এই বাক্যের চেতনাধারি সুশীল পাঠকের অন্তঃকরণে পুনর্বার অভিঘাত সৃষ্টির মানসে লেখক একদা বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত জেল-ফেরত ক্ষুধার্ত মাকালকে চিত্রিত করেন এভাবে :
একদিন বিকেলবেলা কাগজ বিক্রিওয়ালার কাছে কিছু কাগজসহ ‘উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত¡’ বইটি দাঁড়িপাল­ায় দিয়ে মাপ দেয়াচ্ছিলো মাকাল; উদ্দেশ্য : কাগজওয়ালার কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে খাবার কিনবে সে। ‘এটাই বাস্তবতা। বই আর কাগজগুলো তুমি ওকে দিচ্ছো, ও ফড়কা ব্যবসায়ী, ও মোটেও ধনী নয়, ও এখন যে দাম দেবে ঠিক তাই তোমাকে নিতে হবে-তুমি বারগেন করতে পারো কিন্তু বিপ্লব করতে পারবে না, কেননা এটাই প্রতিষ্ঠিত-আর ভাঙতে তো গিয়েছিলে…’

ক্ষুধার্ত মাকাল ঘাড় নিচু করে, তারপরে মাথা উঠিয়ে, যে এই কথাগুলো বললো, তাকে আপাদমস্তক লক্ষ করলো। অম্লান!
এ ধরনের কথা-উদ্ধারে, এমন সম্ভাবনা থেকে যায়, গল্প পাঠ-পর্বে সুশীল পাঠক সৌন্দর্যপীড়নে কাতর হতে পারে। আর এই ধারায় অন্য এক উপস্থাপনা ‘দি পার্ভার্টেড ম্যান’-এ গল্পবস্তু যাই হোক না ক্যানো, একটি পর্নোগ্রাফিক সম্ভাবনাকে সেলিম মোরশেদ ভারসাম্যপূর্ণ দক্ষতায় ভিন্ন সাংস্কৃতিক উপলব্ধিতে নিয়ে গেছেন :

আমেরিকা ফেরত সুমনের ধৈর্যও আছে অনেক। অনেকক্ষণ ধরে সে পারচু করতে থাকে। ক্যামেরা ক্লোজ শট আনতে পারে না। তবুও মিলির অভিব্যক্তি চমৎকার। সুমনকেও ভালোভাবে দেখা যায় না। মিলির বডি ল্যাঙ্গুয়েজ স্মার্ট অথচ লাজনম্র। ছেনালি ব্যাপারটা নেই, নিখাদ প্রেমিকা। অথবা : সাবরিনার চোখে পানি। সুগঠিত দেহের মেয়েদের দুঃখী হওয়া ভাতে দেয়া সিদ্ধ হওয়া পেঁপের মতো। রাহুল ভাবে। বিব্রত হয়। সাবরিনার ধর্ম তাকে বিশ্বাসী হতে শিখিয়েছে। সাবরিনার সংস্কৃতি তাকে সমাজের বিপক্ষে গিয়ে শ্যামল মিত্রের সাথে ঘুমুতে চাওয়া শিখিয়েছে। এই আকাশ বৃষ্টি উদরে নিয়ে চোখ ছলছল করে তাকায়। এই পাহাড় নিজের ঋজুতা নিয়ে শিরদাঁড়া সোজা করে। এই সাগর সাবরিনার চুলের মতো লম্বা লম্বা ঢেউ নিয়ে জীবনের গতিকে শনাক্ত করে। আর এই সকাল সামুদ্রিক ঝিনুকের পেটে সতেজ সুপুষ্ট করে রোদের মুক্তা। রাহুল নিজের চোখে নিজে বালি দেয়। চোখ ধোয়। সাগরের লবণ, ঘর্মাক্ত স্তনের মতো, স্তন মানুষের প্রথম পিপাসা, প্রথম দাবি, রাহুল তার দাবি নিয়ে ঘুমুতে চায়।

যেহেতু, মহান সাহিত্যিকদের প্রতিষ্ঠিত সৌন্দর্যচেতনার ইতিবাচকতার বিপ্রতিপে লেখকের অবস্থান পাঠকের লক্ষে আসে, কিন্তু পিউরিটান দৃষ্টিভঙ্গির উল্টোরথযাত্রায় লেখক কতটুকু স্বতঃস্ফ‚র্ত, নির্মিতির প্রশ্নে কতোটুকু সংবেদি কল্পনা বা অসহ আরোপন-শেষ পর্যন্ত সে বিবেচনা একমাত্র পাঠকের। কেননা, লেখক তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধি অবস্থান বা বিশ্বাস থেকে, বোদ্ধা পাঠকের বাইরে যে বিপুল সংখ্যক সাধারণ পাঠক রয়েছে, তাদের হাতে তাঁর যাবতিয় কর্মসংস্কৃতি মূল্যায়নের জন্য ব্যারোমিটার বা নিক্তিস্বরূপ একটি প্রেক্ষিত- গ্রন্থ তুলে দিয়েছেন। ফলে, ৮০’র দশক থেকে অদ্যাবধি তার সকল কর্মযজ্ঞ পাঠক কিভাবে নেবে, লেখক-প্রণিত “পাল্টা কথার সূত্রমুখ অথবা বুনো শুয়োরের গোঁ” গ্রন্থটির নিরিখেই লেখক তা নির্ধারণ করে দেন। এক্ষেত্রে লেখকের সমমনা একদেশদর্শি বোদ্ধা পাঠকের বাইরে সাধারণ পাঠকরা যে-যে সমস্যায় পড়তে পারেন, তা হলো : গ্রন্থভুক্ত বিষয়ের সাথে বিষয়ানুগ করে লেখককৃতিকে দেখার জন্য পাঠকের মনোজগতে এক রকম প্রভাব বিস্তার। ফলে, লেখকের রচনা নির্দিষ্ট একটি মাত্রার তরফেই বলে মনে হচ্ছে এখন। তবে, লেখকের প্রতিষ্ঠানবিরোধি দর্শনতাড়িত ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পচর্চা কৌত‚হলি পাঠক, দর্শনের শিক্ষার্থি, সর্বোপরি, লিটলম্যাগাজিন কর্মিদের বিতর্কমূলক উপলব্ধিতে পৌঁছতে প্ররোচিত করবে। ‘পাল্টা কথার সূত্রমুখ অথবা বুনো শুয়োরের গোঁ’ গ্রন্থটি সেই ইতিবাচক শক্তি ধারণ করে।

তিন
সেলিম মোরশেদ-এর একমাত্র নভেলেট ‘সাপলুডু খেলা’। প্রবল মানসিক ক্রিয়াশিলতার বিপ্রতিপে নিরাসক্ত সলোমানকে নিয়ে লেখকের পরিণতিহীন আখ্যান। যে আখ্যানে দেখা যায়, কেন্দ্রিয় চরিত্র সলোমানের অনিশ্চিত যাত্রাপথের চড়াই-উৎরাই : এই নিরুদ্দেশ যাত্রায় সময়বাস্তবতাকে লেখক তুলে এনেছেন ব্রাত্যভাষার সারল্যে। সলোমানকে দেখি একই সময়ে দু’টি ভিন্ন স্থানিক বাস্তবতায় পরিভ্রমণরত; লেখক বুবলি গদ্যে এই মায়াভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে বাস্তব করে তুলেছেন এই নভেলেটে। প্রধান চরিত্রসহ ক্যাটালিস্ট সব চরিত্রের প্রাসঙ্গিকতা এই নভেলেটে পরিব্যাপ্ত হয়েছে আরো বৃহৎ স্থানিক পরিসরে, অর্থাৎ লেখক স্থানিক উপাদানকেও সময়ের সঙ্গে নিয়েছেন সমান দক্ষতায়। দক্ষিণ ভারতিয় লেখক ভৈকম মুহম্মদ বশীরের সাথে সেলিম মোরশেদের সাদৃশ্যটা হলো-দু’জনই অনেক শিরোনামায় পশু নাম ব্যবহার করেছেন। ‘রাতে অপরাজিতা গাছে ফুল’ প্রধানত এই গল্পগ্রন্থটি বিবেচনায় রেখে দ্বিতীয় মিল বা সদৃশতা হলো : সরল ভাষ্যের ছদ্মবরণে পাঠকের জন্য চোরাবালি রেখে যাওয়া। লঘু চালে বৈঠকি মেজাজে বলে যাওয়া গল্পগুলো পড়া শেষ হলে পাঠক আবিষ্কার করে অবচেতনে বোধিসত্ত গুপ্তগহŸর। বন্ধুসম্মিলন, পানশালা, ফুটপাতের বেঞ্চে কয়েক ঘণ্টা সময়ের স্বল্প পরিসরে জন্ম নেয়া সেলিম মোরশেদের এ গল্প মূলত তাৎক্ষণিক উত্থাপিত প্রসঙ্গ ঘিরে আবর্তিত-যেখানে রয়েছে তাঁর সৃষ্ট চরিত্রের বেদনানীল হতাশা, সংক্ষোভ, বিকৃতি আর প্রতর্ক।

সর্বশেষ ‘বাঘের ঘরে ঘোগ’ সেলিম মোরশেদের রাজনৈতিক চেতনা-জড়িত গ্রন্থ। প্রধানত গ্রন্থের প্রতিটি গল্প-ই অতিমাত্রায় রাজনৈতিক সংবেদি হওয়ায় চরিত্রগুলোও স্বাভাবিক সাধারণ কথাবার্তার বাইরে কেবল সচেতনতায় ‘রাজনীতি’ বিষয়ে কথা বলে-যেখানে লেখক স্বয়ং এদের কাঁধের ওপর কখনো নিঃশ্বাস কিংবা বচনে প্রকটভাবে সওয়ার হন। বিষয়টিকে এভাবে দেখা যায় কি-না, ‘সুব্রত সেনগুপ্ত ও সমকালীন বঙ্গসমাজ’ গল্পের সুব্রতকে লেখক ‘বাঘের ঘরে ঘোগ’ গ্রন্থভুক্ত গল্পসমূহের বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনুসন্ধিৎসু চরিত্রগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। অল্প বয়সের তরল আবেগে অন্ধ সুব্রতের পরিপক্ক রাজনৈতিক ভাষ্যের বহুরূপতা হলো ‘বাঘের ঘরে ঘোগ’। যেখানে রাজনীতি আর মানবিয় বিপর্যয় চরিত্রগুলোর সহজাত গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণপূর্বক লেখক মানসিক ক্রিয়াশিলতার দৃষ্টিকোণ থেকে অনেকগুলো বনসাই-চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। শিল্পের বহুবাদিতা স্বীকার করে নিলে রাজনৈতিক কথামালাসমৃদ্ধ ‘বাঘের ঘরে ঘোগ’ বইটির ভূ-রাজনৈতিক আবেদন, সুদূর রাজনৈতিক স্মৃতি, বিরোধ, মানবিক সম্পর্কের জটিলতাসহ সমকাল কিংবা ভবিষ্যতের পাঠকদের আকৃষ্ট করলেও করতে পারে। সংশয়-কেননা, রাজনীতি একসময় সৌন্দর্যকে ধ্বংস করে ফেলে।

চার
সেলিম মোরশেদের আখ্যানবিশ্বের আরো দু’-একটি বৈশিষ্ট্য উলে­খ্য। তিনি একটি আখ্যানের সমান্তরালে অন্য একটি আখ্যান বলেন। একমাত্র ‘সাপলুডু খেলা’ ছাড়া লেখকের গল্পবিশ্ব একাধিক ঘটনার দৃশ্যবর্ণনায় গুণাত্মক প্রভাবের প্রয়োগে অদ্ভুত গল্পমুহূর্ত তৈরি ক’রে পাঠকের কাছে নতুন অনুভব নিয়ে আসে। দ্বিতীয়ত ঈশপের কতো পরে এসে পিটার বিকসেল, বোর্হেস-এর স্মরণিয় প্যারাবলসগুলোকে মাথায় রেখে বলা যায়, সেলিম মোরশেদ ‘নীল চুলের মেয়েটি যেভাবে তার চোখ দুটি বাঁচিয়েছিলো’ এবং ‘মহান সূর্য আর অভিমানী মেয়েটি এবং তুচ্ছ বালির গল্প’ লিখে পাঠকদের মুগ্ধ করেছেন। বোর্হেস যেমন বলেছেন, ইতোমধ্যে যা করা হয়েছে-সৃষ্টি; প্রাচিন ফর্ম ও প্রতিষ্ঠিত লেখকের সেই সৃষ্টি পুনর্লিখনের মাধ্যমেও একজন লেখক তাঁর সক্ষমতা দেখাতে পারেন। তৃতীয়ত এ ধারায় ‘কাজলরেখা’ বা ‘লাবণ্য যেভাবে এগিয়ে’ সে-বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত লেখা; যা নির্মিত হয়েছে নতুন ভাষ্য ও বিশ্লেষণে।

জীবনের নিগূঢ় বাস্তবতার সন্ধানে স্থান থেকে স্থানান্তরে বিষয়ের কাছাকাছি যান সেলিম মোরশেদ, তথ্য-উপাত্তের ডিটেল ওয়ার্ক করেন। সমঝদার কেউ বলবে, এটা ভালো ধরন, শুধু কল্পনাশক্তির পাশাপাশি এটা ইতিবাচক প্রবণতা। এই বিবেচনায় তাহলে কান্নাঘর, চিতার অবশিষ্টাংশ, সখিচান, বোধিদ্রুম, উল্টোপিঠে কিশান সৃষ্টির নেপথ্যে রয়েছে বিষয় সন্নিকটে লেখকের অভিগমন; বিষয়কেন্দ্রিক লেখকের অনুধ্যান। আর সাপলুডু খেলা, সুব্রত সেনগুপ্ত ও সমকালীন বঙ্গসমাজ, আমি, মীরা ও সুশীল দা… এরকম অনেক, এগুলো তবে লেখকের আত্মজৈবনিক-এই প্রকার তকমা এঁটে দেয়াটা হয়তো অনেকের মর্জি। লাইসিয়ামের গুরু-শিষ্য পাঠকুল, জ্ঞানের আগুনে পোড়া মুখ-এঁদের অভ্রান্ত ধারণার বিপরিতে কোনো এক সরল হৃদয়ের দৃঢ় অবস্থান সকল, সব, স-ব লেখাই আত্মজৈবনিক-এই সিদ্ধ বাক্যে ‘আমরা’ অর্থাৎ সাধারণ পাঠক মতি রাখি।
উপসংহারে এসে চৈতন্যে অস্থির দোলা। আলোক প্রক্ষেপণ সত্তে¡ও অনেকটাই অন্ধকার-বোধহীনতা। কতো বুদ্ধিমান লেখক-পাঠক শ্রেণি, সূ² শিল্পচেতনায় ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’র সরলতাকে ব্যবচ্ছেদ করেন অসামান্য দক্ষতায় … তাঁদের গাণিতিক পারমুটেশন-কম্বিনেশনের ব্যবহারিক জ্ঞানে। কিন্তু আমাদের মগ্নচৈতন্যে নিহিত রয়েছে শিল্প অথবা সাধনার সৌন্দর্যবোধ, যেখানে যুক্তির পরাকাষ্ঠা অর্থহীন-কেননা, মনষ্ক পাঠক তার যুক্তিবোধ, যথেষ্ট কল্পনাশক্তি আর সুগভীর অনুভূতি নিয়ে অপেক্ষমাণ থাকে। এই রচনাসংগ্রহের দুই মলাটের ভেতর সবল, দুর্বল, ঝকঝকে উজ্জ্বল, ধূসর-অগ্নি সকল গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ-নিবন্ধ-নভেলেট-চিত্রকলা যাবতিয় শিল্পসম্ভারের মননশিল স্রষ্টা সেলিম মোরশেদকে তাহলে এখন পাঠকের ভুবনে সরল আকাঙ্ক্ষায় স্বাগত জানানো যায়।

শেয়ার করুন: